ভাগানো ডট কম (শেষ পর্ব)

আমার বাক্স পেটরা থেকে বের করলাম দা কাঁচি চুরি পিস্তল। মানে আমার বেশ কয়েক গোছা দড়ি,একটা ক্লোরোফর্মের ছোট বোতল আর একটা ছোট ছুরি।
মইন একবার আমার দিকে আরেকবার আমার সহায় সম্পত্তির দিকে তাকিয়ে বলল "শুধু এইটুকু জিনিস নিয়ে আপনি আমাকে উদ্ধার করবেন!"
-"তো কি ভেবেছেন পিস্তল নিয়ে আসবো? আপনারে পিস্তলের মুখে উদ্ধার করবো?"
-"ওইটাই আপনার জন্য সহজ হত।বাইরে দেখেছে অবস্থা? দরজার পর্যন্ত গার্ড। আর বাইরের অবস্থা তো দেখেই এসেছেন।প্রতিটা পয়েন্টে পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো আছে।" মুখ গোমড়া করে বলল মইন।
-"ভেবে দেখি কিছু একটা করা যায় কিনা। আপাতত চুপচাপ থাকেন।"
মইনের ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।দেখি বাইরে দাঁড়ানো গার্ডদের সাথে চেষ্টা করে খাতির জমানো যায় কিনা। এদের যদি কোনভাবে জায়গা থেকে সরানো যায় তাহলে হয়তো কিছু একটা করা যেতে পারে।
বাইরে বেরিয়ে দেখি ষণ্ডা মার্কা গার্ডদের একজন দাঁড়িয়ে আছে। আরেকজনের দেখা নাই। আমি দাঁড়িয়ে থাকা গার্ডকে একটা সিগারেট অফার করলাম। কে কত দিনের চেনা জানা বন্ধু এমন ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলাম,
"ভাইসাবের ছেলেম্যে কয়জন?"

লোকটা সিগারেটে আগুন ধরিয়ে বলল "বিয়ে করি নাই ভাইজান।"
-"কেন?কেন? পছন্দের কেউ আছে নাকি?"
কথাটা শুনে গার্ড মুচকি হাঁসি দিল। মাই উৎসাহ দিয়ে বললাম।
"আরে পছন্দের কেউ থাকলে বলে ফেলেন।দেরি করতে নাই শুভ কাজে।না হলে আমাকে বলেন।সব সেটেল করে দেই।"
"তার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে" করুণ স্বরে বলল বেচারা গার্ড।
তাহলে চলেন উঠিয়ে নিয়ে আসি। আমি মেয়ে উঠানোয় খুব এক্সপার্ট।
করুণ চেহারা করে তার পিছনের বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে দুখভারাক্রান্ত কন্ঠে বলল "যাকে পছন করি সেই তো আমাকে বুঝল না।"
যা বুঝার বুঝে নিলাম।নিপদ। এর ব্যাটার কাছ থেকে দুরে থাকতে হবে। চলে যাওয়ার জন্য ঘুরছিলাম এমন সময় একটা আইডিয়া মাথায় আসল।আবার ফিরে গেলাম গার্ডটার কাছে। কোনমতে সহ্য করে গার্ডের গায়ে হাত দিয়ে আশ্বস্ত করে বললাম, "আপনি কিন্তু ভুল ধারণা করছেন। আপনি যাকে পছন্দ করেন সেও কিন্তু আপনাকে মানে...... বুঝতেই পারছেন।"
আমার কথা শুনে তড়াক করে লাফিয়ে উঠল গার্ড। প্রায় উড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে পিষে ফেলল গার্ডটি।
-"সত্যি? সত্যি বলছেন?"
হায় খোদা! এই দিনও দেখতে হল? নিজের কাজ করতে এসে এভাবে হেরেস্টমেন্টের শিকার হবো কোনদিন কল্পনা করতে পারি নাই।
পিছলে ফালতু লোকটার কাছ থেকে লাফিয়ে এক হাত সরে গিয়ে বললাম "হ্যাঁ সত্যি।কিন্তু তার তো কোন উপায় নাই। দেখয়েই পাচ্ছ। জোর করে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। তবে তুমি যদি চাও আমি ব্যবস্থা করতে পারি।"
আবার আমার দিকে উড়ে এল গার্ডটি। এবার আমি প্রস্তুত ছিলাম। তার চেয়ে তীরবেগে দূরে সরে এলাম। দূর থেকেই বললাম , " তবে সেক্ষেত্রে আপনার সাহায্য লাগবে।"
-"বলুন কি করতে হবে? তার জন্য আমি সব করতে পারি।"
-"আপনার সাথে যিনি গার্ড দেন উনাকে কোনমতে সরিয়ে রাখতে হবে আজকে রাতের জন্য।তারপর আমি আপনার পছন্দের মানুষকে বের করে এনে আপনার হাতে দিবো।শুধু বাড়ির কেউ যাতে টের না পায় সেই ব্যবস্থা করতে হবে। "
আমার কথায় গার্ড বাবাজি রাজি হয়ে গেল।
এবার হবে খেলা। আফিফার সাথে যোগাযোগ করলাম। ওকে বললাম আমার প্ল্যান। শুনে বলল, "দেরি করা যাবে না। আজকে রাতেই কাজ সারিতে হবে। আগামীকাল আমার বিয়ে। আমি যাতে বুঝতে না পারি তাই কেউ কিছু বলছে না।কিন্তু আমি জানতে পেরেছি আগামীকাল দেখতে এসেই বিয়েটা হবে।আজকে রাতেই আমি বাড়ি থেকে পালাবো।আমি মইনদের বাড়ির পিছনে থাকবো।আপনার ওকে নিয়ে চলে আসবেন।"

রাতের দ্বিপ্রহরে সবাই যখন গভীর ঘুমে মগ্ন ঠিক তখন সবগুলো সিসিটিভি ক্যামেরা অফ করে দিলাম আঞ্জুমের সাহায্যে। ওহ বলতে ভুলে গিয়েছি গার্ডটার নাম আঞ্জুম। আমাকে থাকতে দেওয়া হয়েছিল বাইরের গেস্ট রুমে।নিঃশব্দ পায়ে চলে এলাম মইনের ঘরের নিচে জানলার পাশে।
পাশে থাকা গার্ডটাকে দানা পানি খাওয়ার উছিলায় ছাদে নিয়ে গেল আঞ্জুম।।এই সুযোগে আমি জানলায় দড়ি দিয়ে উঠে গেলাম। হুক ঠিক মতো চেক করে মইনকে নিয়ে দড়ি বেয়ে বের হয়ে এলাম। কোনদিকে না তাকিয়ে দে এক ছুট। কিছু দূর যেতেই দেখি হই হই করে মানুষ ছুটে আসছে। ধরা পড়ে গেলাম নাকি? আমাদের ধরার আগেই আফিফাকে যেখানে থাকতে বলেছিলাম সেখানে পৌঁছে গেলাম। হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আফিফা।
-"চল চল এখান থেকে সরে যাই।" বলল ও
"ওরা তো খবর পেয়ে গিয়েছে।সেই গার্ডটা যে আমাদের সাহায্য করল তার সাথে অন্তত দেখা করে যাই।"বলল মইন।
এই সেরেছে। ওকে যদি বলি গার্ডের লোলুপ দৃষ্টি পরেচে তার উপর তাহলে নিশ্চয় আর এই কথা বলত না। আমি বললাম,"এই দিকটা আপনার চনাত না করলেও চলবে।আপনারা যান।" তারপর আফিফা দিকে তাকিয়ে বললাম, "আমার কাজ শেষে।আপনার এবার গিয়ে বিয়ে করেন নাকি বাসায় ফিরে যাবেন আপনাদের ব্যাপার।আমার বাকি টাকাটা দিয়ে দিন।"
আমাই দিকে চোখ গরম করে তাকিয়ে বলল "আমাদের অসহায় অবস্থা দেখে একটু মায়া দয়াও হয় না আপনার?একটু সবুর করুন টাকা না দিয়ে যাবচ্ছি না কোথাও।"
-"ব্যবসায় মায়া দয়া দেখালে তো ব্যবসা করতে পারবো না।চ্যারিটি খুলে বসতে হবে।" কাটাকাটা স্বরে উত্তর দিলাম।
-"গার্ড বেচারা আসছে না কেন?বেচারাকে ধরে ফেলল না তো।" পাশ থেকে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করল মইন।
এমন সময় হাঁপাতে হাঁপাতে এসে উপস্থিত হল গার্ড আঞ্জুম।
-"মইন...... আমার মইন..." বলে প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল মইনের উপর।
সবর্নাশ। এই গেল। আমি মইনকে বাঁচাতে এগিয়ে গেলাম। সরিয়ে দিতে চাইলাম যাতে গার্ডের কব্জায় না পড়ে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে মইন তার চেয়ে জোরে চিৎকার করে দৌড়ে গেল গার্ডটার দিকে "আঞ্জুম......আমার আঞ্জুম বলে।" তারপর দুজনে কে কীর্তিকলাপ শুরু করল আমি তার কথা এখানে বলতে পারবো না।
ঘটনার আকস্মিকতায় আমি আর আফিফা বোবা হয়ে গেলাম।
ও আমার দিকে আমি ওর দিকে তাকাই আরেকবার।
আমি বললাম,"মাল ঠিক আছে কিনা টেস্ট করে নেও নাই আগে?এই তো পচা মাল।"
"কেনার আগে কি করে জানবো মাল পচা না খারাপ?" মেয়েটার উত্তর।সম্ভবত এখনও শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি।
ওদিকে দুই কপত কপতী থুক্কু তুই কপোত নিজেদের মধ্যে মধুর সম্ভাষণ করে চলেছে।
"এখন আর কেউ তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না।কেউ না।"
আরেকজন বলল "চল আমরা এখান থেকে দূরে কোথাও পালিয়ে যাই।"
"চল...চল। এখানে আর এই মুহূর্ত নয়।"
আমার তো মাথায় হাত। তাহলে আমার বাকি টাকার কি হবে। আফিফাকে বললাম,"আমি মাল ডেলিভারি দিয়েছি। আমার বাকি টাকা বুঝিয়ে দিন।"
"কখনো না, আমি কি বাতিল মালের জন্য টাকা খবর করবো?"
"সেটা আপনার ব্যপার। আমি কি জানি।"
কথার ব্যাঘাত ঘটল সেখানে মইনের বাবার আগমনে। আমাকে দেখিয়ে বলল "বলেছিলাম না।এরে আমার চোর চোর মনে হয়।ওই তোরা কই..."
পাঁচ ছয় জন ষণ্ডা মার্কা লোক এগিয়ে এল। ভাবলাম এই বুঝি শেষ আমি। কিন্ত ওরা আমাকে ধীরে দুই কপোতকে দুই দিকে টেনে নিচ্ছে।
-"না ওকে ছেড়ে দাও। ছেড়ে দাও ওকে।"
-"তুমি শুধু আমার ।শুধু আমার।"
মইনের বাবা রেগে গিয়ে বললেন ,"রাখ তোর প্রেম। ওর পিরিতি ছুটাইতেছি।বংশের মান ইচ্ছত সব ডূবাইলি।হারামজাদা গার্ড তলে তলে এত কাহিনী কবে করল? হারামজানা তোরে ঘরে বন্দী করেছিলাম আসলাম শেখের পোলার লগে ইটিস পিটিস করার জন্য। আর এখন তুই গার্ড এর সাথেও! তোরে আমি কালকে বিয়ে দিয়েই ছাড়বো।নাইলে আমার নাম.................." এই বলে তিনি টেনে হিঁচড়ে মইনকে নিয়ে গেলেন।
আমি আর আফিফা দুইটি প্রানী যে ছিলাম কেউ মনেও করল না। রাতের আঁধারে দুজনে দাঁড়িয়ে রইলাম।
-"শুনুন আমি বাসায় যেতে পারবো না।বাসা থেকে পালিয়ে এসেছি।তাছাড়া যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে তাকে আমার পছন্দ না। তাই বাসায় যাওয়ার সব রাস্তা বন্ধ।" বলেই আমার দিকে তাকাল আফিফা।
অজানা আশঙ্কায় আমার বুক শুকিয়ে এল। তবে কি? তবে কি? ???

সপাপ্ত
1 like ·   •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on January 12, 2019 10:14 Tags: short-stories
No comments have been added yet.