পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ Quotes
পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
by
রজতকান্ত রায়4 ratings, 4.00 average rating, 1 review
পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ Quotes
Showing 1-9 of 9
“নদীয়ার রাজা কৃষ্ণচন্দ্র তলে তলে ইংরাজদের সাহায্য করেছিলেন। ইংরাজদের সে সব স্মরণ রইল না। তাদের তিন কোটি টাকার দাবি মেটাতে মীরজাফর লিখে দিলেন নদীয়া জমিদারীর খাজনা মুর্শিদাবাদে না এসে ইংরাজদের তখা হয়ে কলকাতায় যাবে। টাকা আদায় করবার জন্য ইংরাজরা কৃষ্ণচন্দ্রকে অশেষ উৎপীড়ন করল। এমন কি সনাতন হিন্দু সমাজের প্রধান ধারক ও বাহক এই রাজার জাতিনাশ করবার ভয় দেখাল। বুড়ো বয়সে তাঁর জমিদারী অপরিমেয় ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ল। রাজা মারা যাবার পর তাঁর বংশধরেরা সে জমিদারী রক্ষা করতে পারলেন না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সূর্যাস্ত আইনে প্রায় সব নিলাম হয়ে গেল। অন্যান্য বড়ো বড়ো জমিদার ও রাজাদেরও সেই অবস্থা হল।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“মীরজাফর 'মহাবৎ জঙ্গ' নামে খ্যাত হতে চেয়েছিলেন কিন্তু 'ক্লাইভের গাধা নামে তাঁর প্রসিদ্ধি হল। রাজকার্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তিনি ভাঙ খেয়ে চুর হয়ে রইলেন। লোকে তাঁর ছেলে মীরনকে বলত ছোট নবাব। যত দিন এই নিষ্ঠুর নবাবজাদা বেঁচেছিলেন তত দিন প্রকৃতপক্ষে তিনিই রাজকার্য চালাতেন। তাঁর হুকুমে গহসেটি বেগম ও আমিনা বেগম—দুই নবাবনন্দিনীকে জলে ডুবিয়ে মারা হল। গহুসেটি বেগম তাঁর সমস্ত লুকানো ধনরত্ন দিয়ে মীরজাফরকে ষড়যন্ত্রে সাহায্য করেছিলেন। আজ সেই কর্মের ফল ফলল। ডুবে মরবার আগে দুই বোন মীরনের মাথায় বজ্রাঘাতের অভিসম্পাত করে গেলেন। মীরনের সব দুষ্কার্যের সাথী ছিলেন খাদেম হোসেন খান—যিনি প্রকাশ্য রাজপথে সদ্য সন্তানহীনা নবাবনন্দিনী আমিনা বেগমকে মারধোর করতে পিছপাও হননি। নয়া জমানায় খাদেম হোসেন খান পূর্ণিয়ার ফৌজদার হয়ে বসলেন। শীঘ্রই মীরন ও খাদেম হোসেন খানের মধ্যে লাঠালাঠি লেগে গেল। বিদ্রোহী খাদেম হোসেন খানের পিছু ধাওয়া করতে গিয়ে খোলা মাঠে তাঁবুর মধ্যে বজ্রাহত হয়ে মীরন মরে গেলেন।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“খোজা ওয়াজিদের মতো বড়ো ব্যবসায়ী নয়া জমানাতে টিকে থাকুক এটা আদপেই ক্লাইভের ইচ্ছা নয়। দু বছর যেতে না যেতে ফরাসী ও ওলন্দাজদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে ইংরাজরা তাঁকে জেলে পুরল। সেখানে তিনি বিষ খেয়ে মরলেন। জগৎশেঠ মহাতাব রায় ও মহারাজা স্বরূপচন্দের পরিণাম হল আরো ভয়াবহ। ইংরাজদের মিত্র বলে নবাব মীরকাশিম আরো অনেকের সঙ্গে এই দুই প্রধান শেঠকে গঙ্গার জলে ডুবিয়ে মারলেন। জগৎশেঠ পরিবার-এর ব্যবসা যে ঘা খেল, তা থেকে আর উঠল না। দেওয়ানী হাতে পেয়ে ক্লাইভ রুক্ষভাবে তাঁদের উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে রাজকোষের চাবি ছিনিয়ে নিলেন। রাজকোষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগের ভিত্তিতে জগৎশেঠের ব্যবসা গড়ে উঠেছিল। সেই সংযোগ ঘুচে যাবার পর তাঁদের ব্যবসাও আর রইল না। ইংরাজরা অসংখ্য প্রকারে এই পরিবারের কাছে ঋণী ছিল। সেই ঋণ তারা এইভাবে শোধ করল।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“মুর্শিদাবাদের নবাবরা পুরাতন বছরের মুদ্রায় খাজনা নিতেন না। সরকারি তোষাখানায় বর্তমান বছরের নতুন সিক্কা টাকা ছাড়া খাজনা নেওয়ার নিয়ম ছিল না। অর্থাৎ গত বছরে ছাপা রূপাইয়া বা মাদ্রাজ টাঁকশাল থেকে আনানো ইংরাজদের আর্কট রূপাইয়া আসলে আর টাকা ছিল না। অন্যান্য বাজারের পণ্যের মতো বা রূপার পাতের মতো ঐ মুদ্রাগুলিও পণ্যদ্রব্য হয়ে দাঁড়াত — টাকার বদলে (অর্থাৎ সিক্কা টাকার বদলে) যা বিক্রী করতে হয়। বাজারের অন্যান্য পণ্যের মতোই এই সনওয়ত (ভূতপূর্ব সিক্কা) ও আর্কট রূপাইয়া এমন এক ধরনের ‘ডিসকাউন্টে বেচা-কেনা হত যার নাম 'বাটা' এবং যা অন্যান্য পণ্যের দামের মতোই চড়ায় মন্দায় উঠত নামত। সিকার তুলনায় সনওয়ত ও আর্কটের বাটা ছিল প্রকারান্তরে জনতার উপর এবং বাণিজ্যের উপর একরকমের অদৃশ্য কর বা ইন্ডিরেক্ট ট্যাক্স। এইভাবে সওয়াত ও আর্কটের দাম সিক্কার তুলনায় কমিয়ে দিয়ে এবং পরস্পরের এক্সচেঞ্জ বা বিনিময় হার নিয়ে ব্যবসা করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে নবাব সরকার সিক্কা রূপাইয়া তৈরির একচেটিয়া সরকারি দোকানটাকে (অর্থাৎ টাঁকশাল) ইজারা দিতেন। জগৎশেঠের লোক টাঁকশাল ইজারা নিয়ে সরকারকে বছর বছর থোক টাকা দিত যা আসলে জনতার কাছ থেকে আদায় করা এক প্রকার ট্যাক্স। টাঁকশাল হাতে পেয়ে জগৎশেঠ ফতেহচন্দ সমস্ত পুরাতন বা বিদেশী মুদ্রা কিনে নিয়ে প্রায় নিখরচায় সেগুলিতে ছাপ মেরে নতুন সিক্কা টাকায় পরিণত করতেন এবং পুরো দামে বাজারে ছাড়তেন। ইংরাজদেরও অন্যান্য সাধারণ লোকের মতো বাটা দিয়ে আর্কট ও সনওয়ত বিক্রী করে বাণিজ্যের জন্য সিক্কা টাকা সংগ্রহ করতে হত। বাটার মুনাফা যেত জগৎশেঠের কুঠিতে। মুদ্রা বিনিময়ের হার বা এক্সচেঞ্জ নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ জগৎশেঠের হাতে ছিল বলে ইংরাজরা বছর বছর অদৃশ্যভাবে জগৎশেঠকে খাজনা যুগিয়ে চলত।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“১৭৪০ খ্রীস্টাব্দের পর সুরত বন্দর হয়ে বা হিন্দুকুশ পার হয়ে দেশী বণিকদের হাতে সোনা-রূপা আমদানী প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জলপথে ইংরেজরা যা রূপা আমদানী করত তাই টাঁকশালে টাকা তৈরির বৃহত্তম উৎস হয়ে দাঁড়াল। তার উপর বেশির ভাগ জাহাজ ও ভিনদেশী আমদানী-রপ্তানী ইংরাজদের হাতে। এ অবস্থায় পলাশীর যুদ্ধের অনেক আগে দেশে টাকার সরবরাহের উপর ইংরাজ কোম্পানি নিজেদের দখল কায়েম করে নিতে পারত। তা যে হয়নি তার কারণ টাঁকশালের উপর জগৎশেঠ ফতেচন্দের একচ্ছত্র প্রভুত্ব।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“ভবানন্দ কুলীন ব্রাহ্মণ ছিলেন না কিন্তু কৌলীন্য না থাকলেও সরকার সাতগাঁয়ের অস্থায়ী কানুনগো পদ এবং পরগনা উখড়ার ক্রোরী পদ লাভ করে তিনি লক্ষ্মীর ঝাঁপী আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কথিত আছে রাজা প্রতাপাদিত্যের বিরুদ্ধে মোগল সেনাপতি মানসিংহের অভিযানে যানবাহন ও খাদ্য সরবরাহ করে তিনি বাদশাহ্ জাহাঙ্গীরের সুনজরে পড়েন এবং ১৬০৬ খ্রীস্টাব্দে বাদশাহী ফারমানের বলে চোদ্দটি পরগনার জমিদারী প্রাপ্ত হন।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“বাংলাদেশের কর্দমাক্ত জলাকীর্ণ নিম্নভূমিতে অশ্বারোহী বাহিনী অকেজো বিবেচনা করে মুর্শিদকুলী খান খরচ কমাবার জন্য সদরের তিন হাজার সওয়ারী ফৌজ বরখাস্ত করে মনসবদারদের জায়গীরগুলি বহুলাংশে ওড়িশাতে সরিয়ে বাংলা সুবাহর তিন চতুর্থাংশ মালজমি খালিসার অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। এইভাবে জমির উপর মোগল ফৌজী নেতৃবৃন্দের প্রত্যক্ষ প্রভুত্ব কয়েকটি মাত্র সামরিক গুরুত্বপূর্ণ ফৌজদারী এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেল। মোগল শাসনতন্ত্র অনুযায়ী সুবা বাংলার ৩৪টি সরকারের প্রত্যেকটিতে আলাদা আলাদা করে ফৌজদার থাকার কথা, কিন্তু নবাবরা সরকারগুলি তুলে দিয়ে ১৩টি সুবৃহৎ চাকলা গঠন করে তার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন জমিদারী তালুকদারী স্বত্ব একত্রে সমন্বয় করে ২৫টি বড়ো বড়ো ইহতমাম সৃষ্টি করলেন। নিজামতের সামরিক কর্তৃত্বাধীনে মাত্র দশটি নিয়াবতী ও ফৌজদারী এলাকা রইল যেখানে মনসবদার শ্রেণীর সরাসরি শাসন বজায় থাকল।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“দরবারে রেসিডেন্ট বসিয়েও জগৎ শেঠের টাকার জোর ইংরাজরা একদিনে ভাঙতে পারেনি। মীরকাশিমকে মসনদে ভুলে ইংরাজরা প্রথমেই যে নবাবী পরোয়ানা আদায় করে নেয় তাতে হুকুম ছিল কেউ যেন কলকাতার সিক্কার উপরে বাটা না চায়।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
“১৭৫১ খ্রীস্টাব্দে মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি হয়ে যাবার পর চৌথ মেটাবার জন্য এক কালে বহু টাকার প্রয়োজন হয়ে পড়ল। আর কোনো বহিরাক্রমণের আশঙ্কা না দেখে আলিবর্দি খরচ বাঁচাবার জন্য সৈন্য সংখ্যা হঠাৎ অনেক কমিয়ে দিলেন। নবাবী রাজশক্তির তলোয়ারের ধার এইভাবে ভোঁতা হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে মুর্শিদাবাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতা সম্বন্ধে জনাকয়েক তীক্ষ্ণ বুদ্ধি বিদেশী বণিক রাজপুরুষের মাথায় বিদ্যুতের মতো দু একটা চিন্তা খেলে গেল। কিন্তু সেই এক ঝলক ইঙ্গিতের সত্যিকার গুরুত্ব তখনো কারো হৃদয়ঙ্গম হয়নি।”
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
― পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ
