ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ১ - ‘ক্রিয়া’ শব্দের অর্থ থেকে যোগের উদ্দেশ্য
আলোচনার প্রবেশমুখেই একটি পারিভাষিক প্রশ্ন তুলে রাখা আবশ্যক — তথ্য ও তত্ত্বের মধ্যে প্রভেদ কী? তথ্য বলতে বোঝায় যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য, যার প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণযোগ্য অস্তিত্ব আছে — দুই ও দুইয়ে চার হয়, জল একশো ডিগ্রি সেলসিয়াসে ফোটে, এসব তথ্য। অপরপক্ষে তত্ত্ব বলতে বোঝায় কোনো বস্তুর স্বরূপ, তার অন্তর্নিহিত ও অপরিবর্তনীয় সত্য, যা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য নয়, কেবল উপলব্ধিসাপেক্ষ। আগুনে হাত দিলে যে উত্তাপ অনুভূত হয়, তা তথ্য; কিন্তু আগুনের অন্তর্নিহিত তেজস্তত্ত্ব, যা এই উত্তাপের মূল কারণ, তা তত্ত্ব। তথ্য ব্যাবহারিক জ্ঞানের প্রতিনিধি, তত্ত্ব পারমার্থিক জ্ঞানের ধারক।
এই প্রভেদ স্মরণে রাখা জরুরি এই কারণে যে, যে যোগসাধনা পরম ব্রহ্মের সাক্ষাৎকার প্রদান করে, তা কোনো পরোক্ষ মাধ্যমে — গ্রন্থপাঠ, বক্তৃতাশ্রবণ, এমনকি আপ্তোপদেশেও — সম্পূর্ণরূপে সাধিত হয় না। পতঞ্জলির যোগসূত্র শতবার পাঠ করলেও, বা গীতার পাতা মুখস্থ করলেও, ব্রহ্মজ্ঞান অধরাই থেকে যায়, যদি না তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সাধনা যুক্ত হয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে — আজ আমি যা বলতে চলেছি, তা যদি নিছক তথ্যই থেকে যায়, তবে এই আলোচনার তাৎপর্য কোথায়?
এর উত্তর নিহিত আছে দ্বিতীয় একটি পারিভাষিক যুগলে — সিদ্ধান্তপক্ষ ও সাধনপক্ষ।
সিদ্ধান্তপক্ষ ও সাধনপক্ষযোগবিদ্যা মূলত গুরুমুখী বিদ্যা, এবং তার একটি সিদ্ধান্তপক্ষ (তাত্ত্বিক দিক) ও একটি সাধনপক্ষ (ব্যবহারিক দিক) আছে। সাধনপক্ষ বলতে বোঝায় সাধনার উপায়, প্রয়োগকৌশল; সিদ্ধান্তপক্ষ বলতে বোঝায় সেই প্রয়োগের দ্বারা অর্জিত পরম সত্য। সিদ্ধান্তপক্ষের প্রশ্ন — "কী লব্ধব্য", সাধনপক্ষের প্রশ্ন — "কীরূপে"। পতঞ্জলির যোগে সিদ্ধান্তপক্ষ কৈবল্য, সাধনপক্ষ অষ্টাঙ্গযোগ। বেদান্তে সিদ্ধান্তপক্ষ চারটি মহাবাক্যের সত্যতা, সাধনপক্ষ শ্রবণ-মনন-নিদিধ্যাসন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব এই দুটিকে যথাক্রমে বলেছেন 'মত' ও 'পথ'। সাধনা যদি ক্রিয়া হয়, সিদ্ধান্ত তাহলে জ্ঞান — এই দুইয়ের কোনো একটিকে বাদ দিয়ে পরম সত্য উপলব্ধি সম্ভব নয়।
তাহলে আজকের এই বক্তৃতা কোন পক্ষের আলোচনা? সরল উত্তর — এ সিদ্ধান্তপক্ষেরই আলোচনা, একে বলা যায় ক্রিয়াযোগের একটি তাত্ত্বিক সারাংশ, যা পরোক্ষভাবে এর দর্শনকে অধ্যয়ন করায়। এই আলোচনা সাজানো হয়েছে সেই অধিকারীর কথা ভেবেই — দীক্ষিত হোন বা অদীক্ষিত, প্রাথমিক হোন বা উত্তম, যাঁর মধ্যে সত্যজিজ্ঞাসা আছে, তিনিই এই আলোচনার প্রকৃত অধিকারী।
ক্রিয়া শব্দের ব্যাকরণগত ব্যুৎপত্তি
এবার আসি ক্রিয়াযোগ শব্দের প্রকৃত ব্যুৎপত্তিতে, যা কেবল একটি ভাষাতাত্ত্বিক কৌতূহল নয়, বরং এই সাধনার স্বরূপ বোঝার একটি চাবিকাঠি। ক্রিয়াযোগ শব্দটি সংস্কৃত দুটি ধাতু থেকে উৎপন্ন — √কৃ এবং √যুজ্। 'ক্রিয়া' শব্দের মূল √কৃ ধাতু, অর্থ 'করা' বা 'সম্পাদন করা'; এর সঙ্গে '-য়া' প্রত্যয় যুক্ত হয়ে 'ক্রিয়া' শব্দটি গঠিত হয়, যা সক্রিয় কর্ম বা সচেতন অনুশীলনকে নির্দেশ করে। এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য উল্লেখযোগ্য — 'করুণা' শব্দটিও এই একই √কৃ ধাতু থেকেই উৎপন্ন, অর্থাৎ কর্ম ও করুণার ভাষাগত শিকড় অভিন্ন। অপরদিকে 'যোগ' শব্দ √যুজ্ ধাতু থেকে আগত, অর্থ 'যুক্ত করা' বা 'সংযুক্ত করা' — জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন, অথবা চিত্তবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আত্মস্বরূপে অবস্থান তথা সমাধিপ্রাপ্তি। তৎপুরুষ সমাসে গঠিত 'ক্রিয়াযোগ' শব্দের আক্ষরিক অর্থ দাঁড়ায় — 'ক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ', অর্থাৎ সক্রিয় অনুশীলনভিত্তিক যোগসাধনা।
এই ব্যুৎপত্তি থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় — ক্রিয়াযোগ নিষ্ক্রিয় চিন্তন বা নিছক দার্শনিক তর্ক নয়, এ এমন এক যোগ, যা সক্রিয় কর্মের মধ্য দিয়েই সম্পন্ন হয়। আর সেই কর্ম কী, তার উত্তর স্বয়ং পতঞ্জলি দিয়েছেন — সেই প্রসঙ্গেই আমরা এবার প্রবেশ করি।


