ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ২ - পতঞ্জলির সংজ্ঞা ও তার যুক্তি
মহর্ষি পতঞ্জলি তাঁর যোগসূত্রের সাধনপাদে ক্রিয়াযোগকে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন —
তপঃস্বাধ্যায়েশ্বরপ্রণিধানানি ক্রিয়াযোগঃ॥ (যোগসূত্র ২/১)
তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান — এই তিনটি মিলে ক্রিয়াযোগ। পরবর্তী সূত্রে তিনি এর উদ্দেশ্যও স্পষ্ট করেছেন —
সমাধিভাবনার্থঃ ক্লেশতনূকরণার্থশ্চ॥ (যোগসূত্র ২/২)
সমাধির জন্য এবং ক্লেশ ক্ষীণ করার জন্য। লক্ষণীয় যে ক্রিয়াযোগ এখানে কোনো নিছক তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট ফলাফলযুক্ত ব্যবহারিক সাধনপদ্ধতি।
কিন্তু এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই ওঠে — তপঃ, স্বাধ্যায় ও ঈশ্বরপ্রণিধান, এই তিনটিকে বহু ভাষ্যকার ও যোগী প্রধানত আত্মনির্যাতনমূলক পথ হিসেবে ব্যাখ্যা করে এসেছেন — কৃচ্ছ্রসাধন, কণ্টকশয়ন, দীর্ঘ উপবাস, প্রখর রৌদ্রে দণ্ডায়মান থাকা। প্রশ্ন হলো, যোগশাস্ত্রে কি প্রকৃতপক্ষে এরূপ আত্মনির্যাতন বিহিত? এই প্রশ্নের মীমাংসার জন্য সাংখ্য-যোগ দর্শনের মূল কাঠামোয় ফিরে যাওয়া আবশ্যক।
সাংখ্য দর্শনে পুরুষ ও প্রকৃতির দ্বৈতবাদ স্বীকৃত — পুরুষ চৈতন্যস্বরূপ, নিষ্ক্রিয় সাক্ষী; প্রকৃতি জড়, সক্রিয়, সমস্ত সৃষ্টির মূল, এবং সত্ত্ব-রজঃ-তমঃ এই তিন গুণে গঠিত। মানুষের দুঃখের মূল কারণ পুরুষের এই ভ্রান্তি যে সে নিজেকে প্রকৃতি বলে মনে করে — এই অবিদ্যা থেকেই জন্ম নেয় পঞ্চক্লেশ: অবিদ্যা, অস্মিতা, রাগ, দ্বেষ ও অভিনিবেশ। এই পঞ্চক্লেশ নাশের উপায় হিসেবেই পতঞ্জলি তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধান উত্থাপন করেছেন।
পতঞ্জলি স্বয়ং বলেছেন — কায়েন্দ্রিয়সিদ্ধিরশুদ্ধিক্ষয়াত্তপসঃ (যোগসূত্র ২/৪৩) — অশুদ্ধিক্ষয় হলে তপঃ দ্বারা শরীর ও ইন্দ্রিয়ের সিদ্ধি হয়। এখানে 'সিদ্ধি' শব্দটিই প্রমাণ করে যে তপঃ শরীরকে অসংবেদনশীল করে তোলা নয় — তা তমোগুণবৃদ্ধি হতো — বরং তপঃ সত্ত্বগুণবৃদ্ধির প্রক্রিয়া, যার ফলে শরীর-ইন্দ্রিয় আরও সূক্ষ্ম ও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। গীতায় সাত্ত্বিক তপের যে বর্ণনা আছে — দেবতা-গুরু-ব্রাহ্মণপূজা, শৌচ, সরলতা, ব্রহ্মচর্য, অহিংসা (গীতা ১৭/১৪-১৫) — সেখানেও 'সরলতা' শব্দটি লক্ষণীয়; তপের অর্থ আত্মনির্যাতন নয়, জীবনের জটিলতা পরিহার। জীবন সরল হলে আকাঙ্ক্ষা কমে, আকাঙ্ক্ষা কমলে রাগ-দ্বেষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই ক্ষীণ হয় — এ কোনো বলপূর্বক দমন নয়, স্বাভাবিক পরিণতি।
তপঃ দ্বারা চিত্ত যখন স্থির ও স্বচ্ছ হয়, তখনই স্বাধ্যায় সম্ভব হয় — কারণ অস্বচ্ছ, রজঃ-তমোঽচ্ছন্ন চিত্তে আত্মপর্যবেক্ষণ অসম্ভব। পতঞ্জলি বলেছেন, স্বাধ্যায়াদিষ্টদেবতাসম্প্রয়োগঃ (যোগসূত্র ২/৪৪) — স্বাধ্যায় থেকে ইষ্টদেবতার সঙ্গে সংযোগ ঘটে। স্বাধ্যায়ের লক্ষ্য বিবেকখ্যাতি — পুরুষ ও প্রকৃতির ভেদজ্ঞান। পতঞ্জলি বলেন, বিবেকখ্যাতিরবিপ্লবা হানোপায়ঃ (যোগসূত্র ২/২৬) — অটল বিবেকখ্যাতিই ক্লেশনাশের উপায়। "আমি পুরুষ, প্রকৃতি নই" — এই জ্ঞান জাগ্রত হলে অবিদ্যা স্বতই বিলুপ্ত হয়, এবং অবিদ্যার বিলোপে অস্মিতাও বিলীন হয়, কারণ অস্মিতা হলো "আমি কর্তা, আমি ভোক্তা" এই অহংবোধ।
অবশেষে ঈশ্বরপ্রণিধান — সমস্ত কর্মফল ঈশ্বরে অর্পণ, কর্তৃত্বাভিমানের ত্যাগ। পতঞ্জলি বলেন, সমাধিসিদ্ধিরীশ্বরপ্রণিধানাৎ (যোগসূত্র ২/৪৫) — ঈশ্বরপ্রণিধান থেকে সমাধিসিদ্ধি হয়। যখন "আমি" সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়, তখনই সমাধি ঘটে, কারণ সমাধির একমাত্র বাধা অহং। এইভাবে তপঃ সত্ত্বগুণ আনে, স্বাধ্যায় আনে বিবেক, ঈশ্বরপ্রণিধানের পরিণামে অহংয়ের লোপ ঘটে — এবং এই ত্রিবিধ প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ফল সমাধি তথা কৈবল্য।
এই তপঃ-স্বাধ্যায়ের যুগলবন্দি নিছক যোগশাস্ত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, তা ভারতীয় সাহিত্যেরও গভীরে প্রোথিত। বাল্মীকি রামায়ণের প্রথম শ্লোকেই আমরা দেখি, বাল্মীকিকে বর্ণনা করা হয়েছে "তপঃস্বাধ্যায়নিরতম্" বলে — তপঃ ও স্বাধ্যায়ে নিরত। আর সমগ্র রামায়ণ রচনার পশ্চাতে বাল্মীকির নিজের কোনো কর্তৃত্বাভিমান ছিল না; ঐতিহ্য অনুসারে তিনি নিমিত্তমাত্র, স্বয়ং ব্রহ্মার আশীর্বাদে আবিষ্ট হয়ে এই মহাকাব্য রচনা করেছিলেন। ফলে গ্রন্থের সূচনাতেই তপঃ ও স্বাধ্যায়ের উপস্থিতি, এবং সমগ্র রচনাকর্মটিই যেন বাল্মীকির নিজস্ব ঈশ্বরপ্রণিধান — এই সংযোগ কোনোভাবেই আকস্মিক মনে হয় না। বরং এ থেকে বোঝা যায়, তপঃ-স্বাধ্যায়-ঈশ্বরপ্রণিধানের এই ত্রিবিধ ভাব ভারতীয় চেতনায় এতটাই সহজাত যে, তা শাস্ত্র থেকে কাব্যে, যোগ থেকে সাহিত্যে অনায়াসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে।
কিন্তু পতঞ্জলির যোগসূত্র মূলত সিদ্ধান্তপক্ষের গ্রন্থ — সেখানে কী করতে হবে বলা আছে, কীভাবে করতে হবে তার বিস্তারিত বিবরণ নেই। পতঞ্জলির দ্বিতীয় ইঙ্গিত পাওয়া যায় প্রাণায়াম-সূত্রে — তস্মিন্ সতি শ্বাসপ্রশ্বাসয়োর্গতিবিচ্ছেদঃ প্রাণায়ামঃ (যোগসূত্র ২/৪৯), আসনসিদ্ধি হলে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতিবিচ্ছেদই প্রাণায়াম। এখানে পতঞ্জলি ইঙ্গিত করছেন যে ক্রিয়াযোগের মূল কৌশল প্রাণায়াম — কিন্তু কোন নির্দিষ্ট প্রাণায়াম, কতবার, কোন ক্রমে, এ বিষয়ে তিনি নীরব। এই শূন্যস্থানই পূরণ করেছে গুরুপরম্পরা — প্রতিটি যুগে গুরুবর্গ নিজ নিজ শিষ্যদের উপযুক্ত সাধনপক্ষের কৌশল প্রদান করেছেন। ভগবদ্গীতায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে এই যোগবিদ্যা তিনি পূর্বে বিবস্বান, মনু ও ইক্ষ্বাকুকে দিয়েছিলেন, কিন্তু কালক্রমে তা লুপ্ত হয়ে যায় (গীতা ৪/২)। এই লুপ্ত সাধনপক্ষই পুনরুদ্ধার করেন মহাবতার বাবাজী মহারাজ, এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে তা প্রদান করেন শ্রী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয়কে।


