গল্পঃ দ্য বিগেস্ট ডীল
✭✭✭১✭✭✭
পার্কের দূরবর্তী কোণে বসে ছিল জাহিদ আর ফারিহা ।
জাহিদ ছেলেটার মাঝে কি যেন আছে । ওর আশেপাশে থাকলে ফারিহার নিজেকে অনেক নিরাপদ লাগে ।
এই মুহূর্তে জাহিদের হাতে হাত তুলে দিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছে ফারিহা ।
কিছু কিছু সময় কথা বলার প্রয়োজন হয় না ।
কথার চেয়ে নিস্তব্ধতাকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয় ।
আড়াল থেকে ওদের দেখছিলাম ।
বুক ভরে একটা শ্বাস নিলাম । এই লাইনে আমার এটাই সবচেয়ে বড় কাজ ।
আস্তে করে বেল্টের পেছনে আটকে রাখা গ্লক23 টা স্পর্শ করলাম ।
জিনিসটার দাম আছে । তবে আমার স্পন্সরও মালদার পার্টি ।
আড়াল থেকে বের হয়ে ওদের দিকে হেঁটে যাই আমি ।
আমাকে দেখে মেয়েটা সরে যায় ছেলেটার বুক থেকে । দুইজনই সরু চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।
আমার দৃষ্টি সরাসরি ফারিহার ওপর নিবদ্ধ – সেটাও একটা কারণ হতে পারে ।
মেয়েটা পাঁচ ফিট ছয় । বড় বড় চোখদুটো সাথে কপালে এসে পড়া চুলগুলোতে একেবারে রাজকন্যার মত লাগছে ।
‘টাকা আর আভিজাত্যের সাথে সৌন্দর্যের সম্পর্ক কোথায় কে জানে’- মনে মনে ভাবলাম ।
তবে এসব ফালতু ডিটেইলসে কাজ নেই । ইটস শো টাইম ।
‘ফারিহা !’ গলায় যুগপৎ বিস্ময় ঢেলে বললাম । ‘তুমি এখানে কি করছ ?’
এক মুহূর্ত পরেও আমাকে চেনার কোন লক্ষণ দেখা যায় না ফারিহার মুখে ।
‘রিজভী আংকেল আমার বাবার বন্ধু । আমাদের দেখা হয়েছে আগে । ভুলে গেছ নাকি ? আমি ইরফান ।’
সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা । তবে ছেলেটা ত্রস্ত্র পায়ে উঠে দাঁড়ায় । বয়েসে আমার জুনিয়র ।
লুকিয়ে প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে এমন ভাব ওর চোখে মুখে ।
‘ইরফান ভাই ।’ হাত বাড়িয়ে দেয় । ‘আমি জাহিদ । ফারিহা আর আমি – ইয়ে আরকি ।’
সব বুঝে ফেলেছি এভাবে একটা হাসি দিয়ে হাত মেলালাম ছেলেটার সাথে ।
‘হু দ্য হেল আর ইউ ?’ উঠে দাঁড়ায় ফারিহাও । ‘আমি কোন ইরফানকে চিনি না ।’
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায় জাহিদ ।
ঘাড়ের পেছনে মাঝারি আকারের একটা রদ্দা মারতেই চোখ উলটে যায় ছেলেটার ।
কাটা কলাগাছের মত পড়ে যায় মাটিতে ।
চিৎকারটা চলে এসেছিল ফারিহার মুখে – ঝটপট পিস্তলটা ওর মুখ বরাবর ধরতেই থেমে যায় ওটা মাঝপথেই ।
প্রেমিকযুগলকে ধন্যবাদ – নির্জন একটা জায়গা বেছে নিয়েছিল ওরা ।
দেখার কেউ নেই ।
‘আমার সাথে হাঁটো । যদি প্রাণের মায়া থাকে ।’ কড়া গলায় ওকে বললাম ।
আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফারিহা ।
‘আর শোন মেয়ে – তোমাকে জীবন্ত ধরে নিয়ে যাওয়াটা আমার জন্য খুব জরুরী এমনটা ভাবলে ভুল করবে । তোমাকে মেরে ফেলার জন্যই যথেষ্ট টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে । তবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য টাকার অংকটা ডাবল হয়ে যাচ্ছে বলেই এত কথা । নাহলে চোখের মাঝ দিয়ে বুলেট ঢুকিয়ে একটা ছবি তুলে চলে যেতাম । সুতরাং – কোন ধানাই পানাই নয় । বুঝেছ ?’
একটা কথা বলে না মেয়েটা ।
গা থেকে জ্যাকেটটা খুলি আমি । হাতের ওপর ফেলে রাখি এভাবে যাতে পিস্তলটা ঢাকা পড়ে যায় ।
ডানহাতে আড়াআড়ি ভাবে ওটা ধরে ফারিহাকে আবার বলি, ‘আমার বাম হাত ধরে হাঁটবে এখন ।’
নড়ে না মেয়েটা একচুল । ‘নাউ !’ চাপা ধমক দেই । মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।
এই অজ্ঞান দেহের আশে পাশে বেশিক্ষণ দাঁড়ালেই সমস্যা ।
ফারিহা আমার বাম হাত জড়িয়ে ধরতেই আড়াআড়ি ডান হাতে ধরা পিস্তলটা একেবারে ওর বুক বরাবর থাকে ।
এটা বুঝতে অবশ্য ওরও কোন সমস্যা হচ্ছে না ।
কাজেই ভদ্র মেয়ের মতই হেঁটে যায় ও আমার সাথে ।
মেইন রোডে উঠতেই বাতাস কেটে ছুটে আসে গাড়িটা ।
আস্তে করে ব্রেক কষে আমাদের সামনে ।
পেছনের সীটের দরজা খুলে ফারিহাকে ঢুকিয়ে দেই ।
তারপর নিজেও উঠে বসি আমি ।
ড্রাইভিং সীট থেকে রাসেল হাস্যোজ্জ্বল মুখে একটা সিগারেট ধরায় ।
‘ইজি মানি, হাহ ?’ আমার উদ্দেশ্যে বলে ও ।
‘আনন্দে ডিগবাজি না খেয়ে ঠিকমত ড্রাইভ করো, গর্দভ ।’ নিশ্চিত হতে পারি না আমি । ‘সেফ হাউজে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আমরা কেউই নিরাপদ না ।’
তবে আমার ধমকে হাসি মোছে না রাসেলের মুখ থেকে ।
মেয়েটার দিকে চোখ রাখি আমি ।
জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে ও ।
নাহ – এই মেয়ের নার্ভ আছে । মনে মনে স্বীকার না করে পারলাম না ।
অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হাউ-কাউ লাগিয়ে দিত ।
অবশেষে এক যুগ পরে আমাদের গাড়ি সেফ হাউজে এসে পৌঁছে । আমার অন্তত তাই মনে হল ।
জ্যাকেট হাতে ফেলে আবারও সেভাবে হেঁটে উঠে যাই আমরা ।
বাসাটা আর সব বাসার মতই ।
ফারিহাকে কিডন্যাপ করার জন্য তিনতলাটা গত চারমাস ধরে ভাড়া নেয়া হয়েছে ।
শুধু তাই না – দোতলা আর চারতলাও ভাড়া নেয়া আছে গত চারমাস থেকে – মালদার পার্টির কাজ – যথেষ্ট প্রোফেশনাল এরা ।
কাজেই কারও সন্দেহ না তুলেই ওকে সহজে রাখা যাবে এখানে ।
রাসেলটাকে গাড়ি সহ ভাগিয়ে দিয়েছি ।
বিশাল বেডরুমটায় এসে ঢুকি আমি আর ফারিহা ।
ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা সরিয়ে টেবিলে ছুঁড়ে মারি ।
একাকী অচেনা একজন কিডন্যাপারের সাথে এক রুমে ঢুকে ফারিহার মুখে ভীতির ছাপ পড়ল কি না খেয়াল করার চেষ্টা করলাম ।
উঁহু – ভীতি না ; অসহায়ত্বের ছাপ পড়েছে । এই মেয়ে কঠিন ধাতুতে গড়া ।
বিশাল বিছানাটার এক প্রান্তে একটা হ্যান্ডকাফ লাগানো ।
এক প্রান্ত আটকে আছে বিছানার সাথে ।
আরেকপ্রান্ত খোলা ।
ইশারা করে ওটা দেখালাম । ‘বাম হাতে পড়ে ফেল ।’
চুপচাপ তাই করে ফারিহা । অবশ্য হাতে পড়ার আগে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে ।
তারপর আমার ডান হাতের অকম্পিত পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে ওর মুখের অসহায়ত্ব আরেকটু বাড়ে ।
কিছু না বলে বাম হাতে আটকে ফেলে ও হ্যান্ড কাফটা ।
টেবিলে খোলা ল্যাপটপটা অন করি আমি এবার ।
ভিডিও কল দেই স্কাইপ থেকে একটা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে । ওপাশে ক্যামেরা অবশ্য বন্ধ করা ।
কাজেই দেখা যাবে না কাকে কল করলাম – যদিও ওপাশ থেকে আমাদের দেখতে পাচ্ছে স্পষ্ট ।
‘কাজ শেষ ?’ ওপাশ থেকে ভরাট গলা ভেসে আসে ।
‘হুম ।’
‘মেয়েটাকে দেখাও ।’
ওয়েব ক্যাম ঘুরিয়ে বিছানায় বন্দী ফারিহাকে দেখালাম ।
‘গুড । মেইল চেক করে দেখ ।’
অফলাইনে চলে যায় ওপাশের আগন্তুক ।
মেইল চেক করে দেখলাম বিস্তারিত নির্দেশ দেয়া হয়ে গেছে ।
ফোনকলটা দিতে হবে রাত বারোটাতে।
কলেজ ফাঁকি দিয়ে প্রেম করার হ্যাপা বুঝুক মেয়ে ।
পাঁচটার সময় কলেজ ছুটি – ছয়টার মাঝে পৌঁছে যাওয়ার কথা । কিন্তু আমরা যোগাযোগ করব আরও ছয় ঘন্টা পর ।
এটা কিডন্যাপিং-এর একেবারে ব্যাসিক – যাকে বলে অ আ ক খ ।
কিডন্যাপিংটা হয়ে যাওয়ার পর পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দাও । তারপর যোগাযোগ কর ।
ওই মুহূর্তে যা চাওয়া হবে দিয়ে দেয়ার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে পরিবার ।
‘খিদে পেয়েছে ?’ জানতে চাইলাম ফারিহার কাছে ।
মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলে ও ।
সেই তখন থেকে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি মেয়েটা ।
‘খিদে পেলে বলবে ।’ আর কি বলব বুঝতে পারলাম না ।
‘আপনার বোনটা কোন ক্লাসে পড়ে ?’ হঠাৎ - একেবারে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল ফারিহা ।
এতটাই চমকে যাই আমি - আমার হাত কেঁপে ওঠে ।
এক সেকেন্ড পরেই নিজেকে সামলে নেই অবশ্য । তবে পরিবর্তনটা চোখে পড়ে গেছে ফারিহার ।
নিজের ওপর রাগ হতে থাকে আমার । পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল ।
‘শাট আপ !’ দ্রুত এগিয়ে পিস্তলটা ওর মাথায় চেপে ধরি । ‘এরপর থেকে আমি প্রশ্ন করব যদি দরকার হয় । একটা প্রশ্ন না – বোঝা গেছে ?’
বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে মেয়েটা ।
সে দৃষ্টিতে ভীতি নেই – আহত একটা দৃষ্টি ।
চোখ সরিয়ে নিলাম ।
আমি কিডন্যাপার মানুষ – এত অনুভূতির কোন দাম নেই আমার কাছে ।
চোখ সরালেও পিস্তল সরালাম না ।
‘মোবাইল কোথায় ?’
‘ব্যাগে ।’ আর্দ্র গলায় বলে মেয়েটা ।
কান্নাকাটি শুরু করলে বিপদ । মেয়েমানুষের ট্যা-ফোঁ একেবারেই অসহ্য আমার কাছে ।
পিস্তলটা কোমড়ে গুঁজে টেবিল থেকে মোবাইলটা বের করলাম ।
সুইচড অফ রাখতে হবে ।
মোবাইলের ডিসপ্লের ওপরে একটা ব্লিপ দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলাম ।
দ্রুত ফিরে যাই মেয়েটার কাছে । ‘এটা কি ?’
‘আমি কি জানি ?’
কষে একটা থাপ্পড় দিলাম মেয়েটার গালে ।
ফরসা গাল সাথে সাথে টকটকে লাল হয়ে গেল ।
‘হোয়াট – ইজ – দিস ?’ দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করলাম ।
‘যা ইচ্ছে কর তোমরা ...’ এই প্রথম চোখ থেকে একফোঁটা পানি পড়ে ফারিহার, ‘আমার জাহিদ আমাকে খুঁজে বের করবেই ।’
সাথে সাথেই ঘন ঘন কলিং বেল পড়ে বাসায় ।
ঝট করে পিস্তলটা বের করে ফেলি আমি ।
জিপিএস ট্র্যাকার দিয়ে ট্র্যাক করে কি পুরো পুলিশ ফোর্সটাই চলে এসেছে আমাদের পেছনে ?
✭✭✭২✭✭✭
দেয়ালের আড়াল নিয়ে ধীরে ধীরে মেইন গেটের দিকে যাই আমি ।
কান বরাবর তুলে রেখেছি পিস্তলটা ।
কলিংবেল আবারও বেজে ওঠে – বেশ অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে বেল যে টিপছে তার মাঝে ।
আলতো করে ছিটকিনিটা সরিয়ে দরজার হাতলে টোকা দিয়ে খুলে ফেলি দরজা ।
আমি দেয়ালের আড়ালেই আছি ।
মেপে মেপে নিঃশ্বাস ফেলছি ।
হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে দুইজন মানুষ ।
হার্টটা লাফিয়ে এসেছিল গলার কাছে । আরেকটু হলেই গুলি বেড়িয়ে যেত !
রাসেল আর আরেকটা ছেলে ।
রাসেল দ্রুত দরজাটা লাগিয়ে দেয় ।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলি আমি ।
অন্য ছেলেটাকে আমি চিনি ।
জাহিদ ।
*
‘আর কইস না !’ কপাল থেকে ঘাম মোছে রাসেল । ‘আমি ঢুকতে যাচ্ছি বিল্ডিং-এ – এই পোলারে দেখলাম মোবাইলে চোখ রেখে ঢুকতেছে । মনে কেন জানি সন্দেহ হল । কানে বয়রা দিয়ে মোবাইলটা নিয়ে ফারিহার নাম দেখে কাহিনী বুঝতে আর বাকি থাকল না ।’
‘দারুণ কাজ দেখিয়েছিস ।’ পিঠ চাপড়ে দেই ওর । তাকালাম জাহিদের দিকে । ‘তারপর – কি খবর লিটল হিরো ? চলো – কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়া লাগে যে !’
ভয়ে ছোটখাট হয়ে গেছে বেচারার মুখ ।
ওই মুখে একটা মাঝারি মাপের ঘুষি বসালাম । এটা অ্যাডভান্স ।
তাড়াতাড়ি মুখ খুলতে সাহায্য করবে ওকে ।
বেডরুমে জাহিদের কলার ধরে ঢুকতেই আৎকে ওঠে ফারিহা ওর রক্তাক্ত মুখ দেখে ।
‘পুলিশ আসছে ।’ জাহিদ বলে ফারিহাকে অভয় দিয়ে । ‘ওদের খবর দিয়েই ঢুকেছি ।’
চট করে ফারিহার দিকে তাকালাম ।
নিরাশ মুখ হয়ে গেল মেয়েটার ।
জাহিদকে ঘুরিয়ে আরেকটা ঘুষি মারি ওর মুখে । ছিটকে মাটিতে পড়ে যায় ছেলেটা ।
‘প্লিজ !’ অনুনয় ঝরে পড়ে মেয়েটার চোখমুখে । ‘প্লিজ ওকে মারবেন না ।’
‘শাট আপ!’ রুম কাঁপিয়ে ধমক দেই আমি । ‘রাসেল, প্লায়ার্স গরম কর । এই শালা মিথ্যা বলছে । পুলিশকে খবর দিয়ে ঢোকেনি । তবুও সাবধানের মার নেই ।’
‘প্লায়ার্স দিয়ে কি করবেন ?’ ফারিহার চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে ভয়ে ।
‘হারামজাদার আঙ্গুলের নখ তুলব একটা একটা করে । তখন মুখ দিয়ে সত্য কথা হড়হড় করে বের হবে ।’
‘প্লিজ – এই কাজ করবেন না ।’ কেঁদে ফেলে এবার মেয়েটা । ‘ও মিথ্যা বলেছে । ও মিথ্যা বললে আমি বুঝি । পুলিশে খবর দেয় নি ও । প্লিজ ওকে আর কষ্ট দেবেন না ।’
মেঝেতে পড়ে থাকা জাহিদ মুখ তুলে ফারিহাকে ধমক দেয়, ‘তুমি চুপ কর ফারিহা ।’ ওখান থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাকে যতখুশি টর্চার করুন – তাতে এখন আর পুলিশ আসা ঠেকাতে পারবেন না ।’
দুইহাতে ওর কলার জাপ্টে ধরে দাঁড় করালাম ওকে । পেটে মাঝারি আকারের একটা ঘুষি বসাতেই বাঁকা হয়ে গেল জাহিদ ।
‘আর কোন কথা না । শুধু আমি যা বলব তাই উত্তর দেবে । বোঝা গেছে ?’
এই সময় রুমে ঢুকে রাসেল । ‘প্লায়ার্স গরম হচ্ছে ।’ জানায় ও ।
একেবারে আচমকাই নড়ে উঠে জাহিদ ।
আমার পেটে দুবার হাত চালিয়ে মাথায় একটা ঘুষি মারে ও ।
এতটুকু ছেলের গায়ে এত জোর থাকে কি করে ?
মাটিতে ছিটকে পড়ে ভাবি আমি ।
এই সময় সশব্দে ভেঙ্গে পড়ল ঘরের দূরবর্তী কোণার ফুলদানীটা ।
রাসেল, জাহিদ এমনকী ফারিহাও অবাক হয়ে তাকায় ওদিকে ।
হঠাৎ ব্যাপারটা বুঝে ফেলি আমি – শীতল হয়ে আসে রক্ত আতংকে ।
‘গেট ডাউন !’ চেঁচিয়ে উঠি রাসেল আর জাহিদের উদ্দেশ্যে ।
সেই সাথে গড়িয়ে এসেছি একপাশের দেওয়ালের দিকে । দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পুরো খাটটাকে পায়ের ধাক্কায় কাত করে দিচ্ছি – আর্তচিৎকার দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে ফারিহা ।
রাসেল আর জাহিদ আমার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে – মরিয়া হয়ে আবার চেঁচাই আমি, ‘গেট ডাউন ড্যাম ইট !’
হঠাৎ - একেবারেই হঠাৎ রাসেলের মুখমন্ডলের অর্ধেকটা গায়েব হয়ে যায় । রক্ত আর মগজ ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়ে চারদিকে ।
পরিস্থিতি বুঝে ফেলেছি জাহিদ ততক্ষণে । ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ও মেঝের দিকে ।
পরের বুলেটটা ওর মাথা মিস করলেও ঘাড়কে পেয়ে যায় । ঘাড় আর গলা অর্ধেক দ্বিখন্ডিত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যায় জাহিদ ।
পায়ের ধাক্কায় খাটটাকে ততক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি । ফারিহার হ্যান্ডকাফ পড়ানো হাতটা চাপা পড়ে গেছে এর নিচে । ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলেও থেমে গেছে ও এখন ।
মাত্র ছয়ফিট দূরে রক্তাক্ত বয়ফ্রেন্ডকে দেখতে পাচ্ছে ও ।
ঘরটায় এখন শুনশান নীরবতা ।
‘ইরফান ভাই ।’ ঘড়ঘড়ে গলায় বলে ওঠে জাহিদ, ‘পুলিশ ডাকতে পারিনি আমি । একাই এসেছিলাম ...’
গলা থেমে যায় প্রায় ওর । কল কল করে রক্ত পড়ছে ক্ষত থেকে ।
‘ফারিহাকে ...’ বলার চেষ্টা করে ও কিছু একটা ।
ক্রল করে গিয়ে ওর হাত ধরলাম । ‘আ’ম সরি ফর এভরিথিং, জাহিদ । আ’ম রিয়েলি ...’
‘ফারিহাকে দেখে রাখবেন ...’ কোনমতে বলে জাহিদ ।
চোখদুটোর মাঝে প্রাণের আলো নিভে যায় ওর ।
বুকে হেঁটেই খাটের ওপাশে ফারিহার দিকে চলে যাই । এখানে তাও খাটটা কাভার হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে ।
হ্যান্ডকাফের চাবি বের করে আস্তে করে ফারিহাকে বলি, ‘তোমার হাত খুলে দিচ্ছি এখন । পাশের বিল্ডিং-এ একটা স্নাইপার আছে । পুলিশের লোক নয় ওরা । কাজেই – হাত খুলে দিলেই দৌড় দেবে না । বুকে হেঁটে বেরিয়ে যাব আমরা । বুঝতে পেরেছ ?’
ফ্যাকাসে মুখে চেয়ে থাকে মেয়েটা ।
আফটার শক ট্রমা ।
যা আছে কপালে – ওর হাত খুলে দিতে থাকি আমি ।
নিজের এবং মেয়েটার জীবিত থাকাটাই এখন আমাদের ট্রাম কার্ড ।
এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব বেড়িয়ে পড়তে হবে ।
তারপর ছাড়াতে হবে ঘটনার প্যাঁচ ।
যা ঘটছে চারপাশে – তার সাথে বড় কোন কিছুর সম্পর্ক না থেকেই যায় না ।
বড় কিছুটা কি সেটাই বের করতে হবে আমাকে ।
মেয়েটার হাত ধরে ধীরে ধীরে ক্রল করে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যাই আমি ।
গ্যারাজের মটরসাইকেলটার কাছে জ্যান্ত পৌঁছতে পারলে হয় ...
✭✭✭৩✭✭✭
মেঝেতে পড়ে থাকা রাসেল আর জাহিদের রক্তে আমাদের জামার সামনের দিক ভিজে আছে ।
ওই অবস্থাতেই আস্তে করে দরজা খুলে বের হলাম । সিঁড়িঘরটা অন্য অ্যাংগেলে থাকায় আশা করছি – স্নাইপারদের নাগালের বাইরে এটা ।
‘উঠে পড় ।’ ফারিহার হাত ধরে টেনে তোলা লাগল ।
বের হয়ে সাবধানে তাকালাম সিঁড়িঘরের চারপাশে । কোন নড়াচড়া নেই ।
‘জাহিদকে নিয়ে আসি ?’ আমার দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সাথে বলে ফারিহা ।
মেয়েটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে আছে ।
দোষ দিতে পারলাম না । এক দিনের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে ওর জন্য ।
কোন কথা না বলে নিষ্ঠুরের মত ওকে টেনে নিয়ে লিফটে উঠে পড়লাম ।
পিস্তলটা বের করে ফেলেছি ।
লিফটটা গ্রাউন্ড লেভেলে নামতেই প্রস্তুত হলাম । বাইরে আরও আততায়ী থাকতে পারে ।
দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেলেও গ্যারেজে কাওকে দেখলাম না ।
আজ সকালেই নিজের মটরসাইকেলটা গ্যারেজে ইমার্জেন্সী এস্কেপের জন্য রাখায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হল ।
‘ফারিহা, লিসেন !’ মেয়েটার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি আমি – আমার দিকে বিহ্বলদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে ও । ‘তোমার বাবার শত্রু আছে । আমাকে ভাড়া করা হয়েছিল তোমাকে কিডন্যাপ করতে । কিন্তু এখন তারা সম্ভবতঃ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে । আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে ওরা ।’
যদিও যতদূর বুঝতে পারছি – ফারিহার ক্ষতি করার ইচ্ছে এদের নেই । এরা সম্ভবতঃ তৃতীয় পক্ষ ।
আমাদের কষ্টার্জিত জিনিসটা সহজে নিজেদের করে নিতে চায় ।
মুক্তিপণের টাকাটা কম না । একমাত্র মেয়ে কি না !
দশ কোটি টাকা ! এর জন্য আরও পার্টি হন্যে হয়ে থাকতেই পারে ।
‘আমার জাহিদকে কেন মারল ওরা ।’ প্রশ্ন নয় ঠিক – কি বলছে সেটা মেয়েটা নিজেও জানে কি না সন্দেহ হল আমার ।
জাহিদের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা বোধ আমারও আছে । ঠিক সময়ে আমার মুখে ঘুষি মারে ছেলেটা । নাহলে এতক্ষণে ঠান্ডা মাংস হয়ে পড়ে থাকতাম – সন্দেহ নেই । কিন্তু মেয়েটার এ অবস্থা না সরাতে পারলে আমরা কেউ-ই বের হতে পারব না ।
‘পে অ্যাটেনশন !’ এবারে চেঁচিয়ে উঠি । কেঁপে ওঠে মেয়েটা । ‘এই বিল্ডিং-এ থাকা প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে । এই মুহূর্তে কেটে না পড়লে তোমার লাশটাও পড়ে থাকবে এখানে । আমি এখন এই মটরসাইকেলে করে বেড়িয়ে যাব । তুমি আমার সাথে আছ ?’
কিছুটা বাস্তবে ফিরে আসে যেন মেয়েটা । চারপাশে তাকাচ্ছে ।
ভাল লক্ষণ । এতক্ষণ একেবারে মোমের পুতুল হয়ে ছিল ।
মটরসাইকেল স্টার্ট দিলাম ।
নিজে থেকেই এগিয়ে এসে আমার পিছে বসে পড়ে ফারিহা ।
ছোট গেইটটা খোলা গ্যারেজের ।
আমি নিশ্চিত ওদিকে স্নাইপার তাক করে বসে আছে আততায়ী ।
কিন্তু – ঝুঁকিটা নিতে হচ্ছে, গড়গড় করে উঠল ইঞ্জিন ।
বুলেটের মত বেড়িয়ে এলাম আমরা পিচ্চি গেইটটা দিয়ে ।
ভালোমানুষের মত মুখ করে তিনজন কোটধারী এগিয়ে আসছিল বিল্ডিংটার দিকে ।
আমাদের ছিটকে বেড়িয়ে আসতে দেখেই একযোগে কোটের ভেতরে হাত ভরে ফেলে তিনজনই ।
ভেতর থেকে কি অমূল্য সম্পদ বের করে আনতে যাচ্ছিল সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করি না ।
ডান হাত হ্যান্ডেল থেকে সরিয়ে নিমেষে কোমড় থেকে পিস্তলটা বের করে কয়েকটা গুলি পাঠিয়ে দেই ওদের দিকে ।
এদিক ওদিক ঝাঁপিয়ে পড়ে কাভার খুঁজছে তিন ভদ্রলোক – এই ফাঁকে বাম দিকের গলি ধরে ঢুকে পড়লাম আমরা ।
কাঁধের কাছে খামচি দিয়ে ধরে আছে ফারিহা ।
আমার মনে হল, দশ কোটি টাকা কাঁধ খামচে ধরে আছে আমার ।
রক্তে ভেজা জামা নিয়ে তীব্রগতিতে বাইক ছোটাটে থাকা যুবক – আর একটু আগে শোনা গুলির শব্দ – এলাকাবাসী দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নিতে বেশি সময় নিল না মোটেও ।
এদিক ওদিক সরে যেতে থাকে সবাই আমাদের বাইক থেকে ।
একছুটে হতশ্রী বাড়িটার সামনে থামি আমরা আধঘন্টা পর ।
গত ছয়মাস ধরে এটাই আমার হাইডআউট ছিল । এখন অবশ্য আর নিরাপদ নয়
প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়েই কেটে পড়তে হবে । বেশি সময় পাওয়া যাবে না । সেইফ হাউজের ঠিকানা জানলে আততায়ীর দল আমার হাইডআউটের কথাও জানে – এটা নিশ্চিত ।
রাস্তার মানুষজন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে ।
ফারিহাকে নিয়ে সোজা দোতলায় উঠে যাই ।
অ্যাডভান্স তিনলাখ টাকার ব্রীফকেসটা খামচি দিয়ে তুলে নেই । আমার একটা টি-শার্ট ছুঁড়ে দেই ফারিহার দিকে ।
‘রক্তে ভেজা কাপড় পড়ে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না ।’ ব্যাখ্যা দিলাম ওকে । ‘চেঞ্জ করে ফেলো ।’
কোন কথা না বলে টি-শার্টটা নিয়ে বাথরুমে চলে যায় ফারিহা ।
দ্রুত আমার শার্টটা খুলে আরেকটা শার্ট চাপাই গায়ে ।
পিস্তলটা টেবিলের ওপর রেখে কিচেনে গিয়ে ঢুকি । একটা বিস্কুটের টিন থেকে বের করলাম নয়টা ম্যাগাজিন ।
‘আরও কয়েকটা রাখতে পারলে ভালো হত...’ – মনে মনে ভাবি আমি ।
রুমে ফিরে এসে ব্যাকপ্যাকে টাকাগুলো ভরে তার ওপর ম্যাগাজিন সাতটা রাখলাম । দুটো ভরলাম কোটের পকেটে ।
কাজে লাগতে পারে ।
পেছনে খুট করে একটা শব্দ হতেই ফিরে তাকাই আমি । বেরিয়ে এসেছে ফারিহা ।
টি-শার্টে চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে । কিন্তু এইমাত্র টেবিল থেকে তুলে নেয়া গ্লকটার আমার বুক বরাবর তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা মোটেও চমৎকার লাগল না ।
‘ইরফান -’ ঠান্ডা গলায় বলে মেয়েটা । বরফ হয়ে যাই আমি । ‘এটা তোমার আসল নাম কি না আমি জানি না । তবে শোন – আমার মনে হয় না আর কোথাও যাওয়ার দরকার আছে । তোমাদের কিডন্যাপিং প্ল্যান ভেস্তে গেছে । এখন আমি যেদিকে ইচ্ছে সেদিকেই যেতে পারি । আর হ্যা – টিশার্টটার জন্য ধন্যবাদ । ’
‘ফারিহা -’ খুব সাবধানে মুখ খুলি আমি, ‘বোঝার চেষ্টা কর । বাইরে তুমি নিরাপদ না ।’
‘হাহ !’ খুব মজা পেয়েছে এভাবে বলে মেয়েটা । ‘তোমার সাথে আমি নিরাপদ ?’ হঠাৎ খেপে ওঠে মেয়েটা – ‘ইউ বাস্টার্ড !’
নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছি আমি । ‘শুধু মাত্র তোর জন্য খুন হয়ে গেছে আমার জাহিদ । তুই যদি আমাকে তুলে না নিয়ে আসতি এখনও নিঃশ্বাস নিত ও । আই শূড কিল ইউ টু ! ইউ মাদারফা-’
গালিটা সম্পূর্ণ দেয়ার আগেই আমাদের চারপাশে নরক ভেঙ্গে পড়ে ।
বাসার দরজার ঠিক বাইরে বিদঘুটে একটা ভোঁতা শব্দ – সেই সাথে অনেকগুলো ফুটো হয়ে গেল দরজাতে ।
সাইলেন্সড সাব-মেশিনগান !
চমকে উঠে ওদিকে ঘুরে যায় ফারিহা । বদ্ধ জায়গাতে কানে তালা লেগে যায় আমার ।
ফারিহার কাঁপা হাত থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে !
দ্বিগুণ উৎসাহে দরজাকে মোরব্বা বানায় বাইরের ওই ওরা ।
এক থাবাতে আমার হাতে নিয়ে নেই পিস্তলটাকে ।
ম্যাগাজিন সড়াৎ করে বের করে আরেকটা ঢুকিয়ে ফেলতে না ফেলতেই হুড়মুড় করে দরজাটা ভেঙ্গে পড়ে কারও লাথিতে ।
পোশাকে-আশাকে ভদ্রলোক টাইপ দুই ষন্ডার চেহারা দেখতে পেয়ে আর দেরী করলাম না । তরমুজের মত মাথা দুইটায় দুটো বুলেট ঢুকিয়ে দিতেই বিল্ডিং কাঁপিয়ে পড়ে গেল দু’জনেই ।
পেছনে আরও লোক আছে – জানি ।
তবে এরা ঢোকার আগে তিনবার ভেবে ঢুকবে ।
ঝটপট ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে আরেকহাতে ফারিহাকে টান দিয়ে শেষপ্রান্তের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম ।
বারান্দায় নিয়ে আসলাম ওকে টেনে ।
গ্রিলের সাথে ছোট জানালাটা খুলে আগে থেকেই লাগিয়ে রাখা দড়িটা খুলে দিলাম ।
যে পেশায় আছি আমি - এস্কেপ রুটের কথা একটা সবসময় ভেবেই রাখতে হয় ।
এই বিছানায় ঘুমাই প্রতিদিন – বারান্দার গ্রিলের দড়িটা পরীক্ষা করে ।
আজ কাজে দিল ।
ভয়ে ছিলাম ফারিহা নামতে পারবে কি না ।
ভয়টা সত্য করে বারান্দায় দড়িটা ধরে ইতস্তত করতে থাকে মেয়েটা ।
এই সময় বেডরুমের দরজাতেও ছিদ্র হওয়া শুরু করল । আমার শেষ না দেখে ফিরে যাবে না – এই প্রতিজ্ঞা করে এসেছে এরা । আর দশ কোটি টাকা তো আমার সাথেই ।
প্রাণের মায়া বড় মায়া – আমার চেয়েও দ্রুত নেমে পড়ল ফারিহা। নিচে পড়ে ককিয়ে ওঠে ও ।
ব্যাগটা নিচে ফেলে দিয়ে ওকে ধরে তুললাম, ‘আর ইউ ওকে ?’
ব্যাথার চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে মাথা দোলায় মেয়েটা । গোড়ালি মচকেছে ওর – বুঝলাম ।
সময় নষ্ট করা যাবে না – ব্যাকপ্যাকটা তুলে ছুটলাম ।
বাসার পেছনে এই মাটিগুলো আসলে ড্রেনের কাভার ।
মোটামুটি ছয়ফিট গ্যাপ রেখে পরের বিল্ডিংটা তোলা হয়েছে । অর্থাৎ দুটো বিল্ডিং-এরই পিছন দিকে এই ড্রেনের জন্য রাখা ছয়ফিট জায়গা । সামনের দিকে যাতে প্রত্যেকেই রাস্তা পায় সে ব্যাবস্থা ।
ফারিহার হাত ধরে ছোট লোহার বেড়াটার দিকে ছুটে যেতে থাকি আমি ।
আজ সকালেই এই মেয়েটাকে আমার বন্দী করে রাখার কথা ছিল – মুক্তিপণের টাকা না পেলে মাথায় একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল ।
কে বলবে এখন আমাদের দেখে ?
✭✭✭৪✭✭✭
রাত আটটা ।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে সাবধানে চারপাশে তাকাই ।
আমার হাইডআউট থেকে বেরিয়ে এসে রাতের আঁধারে এই হোটেলে উঠেছি আমরা ।
আসার পথেই খেয়ে নেই । সারাদিন আমার বা ফারিহার পেটে দানাপানি পড়ে নি ।
এরপর মেয়েটা তার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয় ।
খাটে চাপা পড়ে হাত মচকে গেছিল এতক্ষণের উত্তেজনায় বোঝেই নি সে । আর পায়ের মচকানীর ধাক্কা সামলাতে ওর আরও সপ্তাহ খানেক লাগবে ।
হোটেলে ওঠার আধ ঘন্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে কাঁদা হয়ে যায় মেয়েটা ।
আস্তে করে বাইরে থেকে লক করে দিয়ে আসি ওকে । টেবিলে নোট রেখে গেছি – দেড় ঘন্টার মাঝেই ফিরে আসব আমি ।
বাইরে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগে । যখন পেছন থেকে ছুটে আসা বুলেটের ভয় না থাকে ।
একটা ল্যাপটপ কিনে বাংলালায়নের কাছে গিয়ে মডেম নিয়ে আসলাম ।
ব্যাকপ্যাকে সব সময় অল্টারনেটিভ কাগজপত্র থাকেই । বেশিরভাগই জাল অবশ্য ।
ফিরে আসার সময় ফারিহার জন্য কয়েকটা ড্রেস কিনে আনলাম ।
*
মাত্র ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে আছে ফারিহা – এই সময় রুমে ঢুকি আমি ।
ঘুম ঘুম চোখেও মেয়েটাকে পরীর মত লাগছে ।
‘ঘুম কেমন হল ?’ টেবিলে হাতের ব্যাগগুলো নামিয়ে জানতে চাই আমি ।
‘ইরফান ?’ কোমল গলায় ডাকে ফারিহা । ‘যদিও তোমার আসল নাম এটা না ...’
‘কিছু বলবে ?’
‘থ্যাংকস ফর সেভিং মাই লাইফ ।’ হাতের দিকে তাকায় মেয়েটা । ফুলে আছে বাম হাতটা ।
তাকিয়ে থাকি আমি । আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলে ও, ‘টুয়াইস ।’
কিছু একটা বলতে গেছিলাম – কিন্তু সুযোগ না দিয়ে আবারও বলে, ‘অ্যান্ড আই হেইট ইউ ফর ব্রিংগিং মি ইন দিস মেস ।’
হেসে ফেললাম ।
‘তোমার জন্য কয়েকটা ড্রেস এনেছি । দেখো তো লাগে কি না ।’ ওর দিকে প্যাকেটগুলো ছুঁড়ে দিলাম ।
ওগুলো ধরে আস্তে করে উঠে যায় ফারিহা ।
ল্যাপটপটা অন করে নেট কানেক্ট করলাম ।
এবার আমার টার্ন ।
স্কাইপে ঢুকতেই পাওয়া গেল কন্ট্যাক্টকে ।
‘দিস ওয়াজ নেভার অ্যাবাউট দ্যা মানি, ওয়াজ ইট ?’, ভয়েস কল রিসিভ করতেই ঠান্ডা গলায় বলি আমি ।
‘হাহ হাহ হা ।’ ওপাশ থেকে বেশ হাসিখুশি গলাতেই বলে ওঠে অচেনা মানুষটা । ‘ইরফান – অথবা যাই হোক তোমার নাম – ঘটে বুদ্ধি আছে দেখছি ।’
‘ছেঁদো কথা রাখুন । সেইফ হাউজের কথা আর কারও জানার কথা না । আগেভাগেই স্নাইপার নিয়ে অ্যামবুশ করে থাকাটা তো আরও অসম্ভব – এক যদি না আপনার কাছ থেকে ইনফরমেশন পায় ।’
‘হুমম – কিন্তু ওসব কিছুই হওয়ার কথা ছিল না ।’ গম্ভীর হয়ে যায় গলাটা । ‘দোষ সম্পূর্ণ তোমাদের । থার্ড পার্টি ঢুকিয়েছ তোমরাই । তোমার আর তোমার সহযোগী ছাড়া সেইফ হাউজের লোকেশন কেউ জানবে না – এটাই শর্ত ছিল ।’
বুঝলাম – জাহিদের কথা বোঝাচ্ছে ক্লায়েন্ট ।
‘ওটা একটা ঝামেলা ছিল ।’ মাথায় ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে আমার । ‘তবে আমাদের দুইজনকে সরিয়ে দেয়ার প্ল্যানটা আপনার ছিলই । জাহিদ এর মাঝে না আসলেও তাই করতেন । সম্ভবত রাত বারোটায় কলটা দেয়ার পরই আমাদের পাট চুকে যেত । কেন ? সাধারণ কিডন্যাপিং এটা নয় – আমাকে নির্বোধ ভাববেন না । গোটা ব্যাপারটা আমি জানতে চাই । মনে রাখবেন, মেয়েটা এখনও আমার কাছে ।’
এক মুহূর্ত নীরব থাকে ওপাশে ।
‘ঠিক আছে । তোমাকে জানানো ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই আমার অবশ্য ।’ অবশেষে মুখ খুলে কুটিল ক্লায়েন্ট । ‘দিস ওয়ান ইজ নট অ্যাবাউট কিডন্যাপিং – নট অ্যাবাউট মানি । দিস ওয়ান ইজ অ্যাবাউট রেইপ অ্যান্ড মার্ডার ।’
বিস্ময়ের আঘাতটা এতটাই জোরে আসল । কথা হারাই আমি ।
‘ইয়ংম্যান ! ঠিকই শুনছ তুমি ।’ ওপাশ থেকে কনফার্ম করে ক্লায়েন্ট । ‘তোমাদের দায়িত্ব ছিল কেবল কিডন্যাপ করে ফোনে টাকাটা চাওয়া । শোনা যায় – কিডন্যাপিং-এ এই শহরে বেস্ট হল ফ্যান্টম ইরফান । ফ্যান্টম কেন বলা হয় সেটাও সবাই জানে – তুমি অদৃশ্য থাকতে জানো - তোমার কিডন্যাপিংগুলো হয় শতভাগ নিঁখুত । কিন্তু মার্ডার জিনিসটা তোমার রক্তে নেই – প্রোফাইলে যা পড়েছি এতে সহজেই বোঝা যায় । নেহায়েত আত্মরক্ষার প্রয়োজন না হলে কারও দিকে অস্ত্র তোলে নি ফ্যান্টম ইরফান । কিছু নৈতিক নিয়ম মেনে চল তুমি – যা একজন কিডন্যাপারের মাঝে থাকতে নেই । তোমাকে দিয়ে যে রেইপ হবে না সেটা বোঝার জন্য অবশ্যই ইরফান-বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না ।’
‘ইউ আর ড্যাম রাইট মি. হুয়েভার ইউ আর !’ টেবিলে কিল বসাই আমি । ‘এই ডীল ক্যান্সেল করছি আমি । ফায়ারফাইটটুকু জাস্ট বিজনেস মেনে নিয়ে হয়ত এগিয়ে যেতাম আমি ডীল অনুযায়ী । কিন্তু যেটা আপনি চাচ্ছেন সেটা আমার তত্ত্বাবধায়নে হবে না ।’
‘তোমাদের দুইজনের পাওয়ার কথা ছিল দুই কোটি টাকা, ইরফান ।’ ওপাশ থেকে একঘেয়ে গলায় বলে মানুষটা । ‘তুমি পেতে এককোটি । তোমার পার্টনার মারা গেছে । নতুন প্রস্তাব দিচ্ছি আমি – এই কাজের জন্য সম্পূর্ণ দশ কোটি টাকাই পাচ্ছ তুমি । সহজ কাজ ইরফান । ভিডিও অন রাখতে হবে পুরোটা সময় । তারপর কাজ শেষে কেবল একটা বুলেট । অথবা যে পদ্ধতিতে তুমি চাও মার্ডারটা করতে ।’
‘কিপ ইয়োর মানি ।’ চোয়াল শক্ত হয়ে যায় আমার ।
‘তোমাকে আধ-ঘন্টা সময় দিলাম ।’ ওপাশ থেকে বলে আবারও । ‘তারপর তোমার সিদ্ধান্ত জানাও ।’
লাইন কেটে গেল ।
পেছনে ঘুরে ফারিহাকে দেখতে পাই আমি ।
পুরো কথাবার্তাই শুনেছে ও নিঃসন্দেহে । আমাকে তাকাতে দেখে এই প্রথমবারের মত ওর চাউনীতে ভয় উঁকি দেয় ।
ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেই আমি ।
দশ কোটি টাকা । আবার ভেবে দেখতে থাকি পুরো বিষয়টা ।
এটাই হতে পারে আমার এই জীবনের শেষ কাজ ।
এরপর এই ঘৃণ্য এবং সেই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ পথ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব ।
দশ কোটি টাকা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে কিডন্যাপিং ছেড়ে দেয়াটা সহজ ।
নিরাপদ একটা জীবন সব অপরাধীরই কাম্য – ভাগ্যগুনে সেই সুযোগ আমার হাতে চলে এসেছে ।
কাজটা কঠিন না মোটেও ।
পরীর মত সুন্দর একটা মেয়েকে ধর্ষণ করতে হবে ।
সেটা ভালো মত ভিডিও করে রাখতে হবে যাতে মেয়েটার চেহারা দেখা যায় ।
তারপর যেভাবে আমার মন চাবে সেভাবেই মেরে ফেলতে হবে মেয়েটাকে ।
একেবারেই ছেলে খেলা । ভিডিও জমা দিয়ে দিলেই আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে দশ কোটি টাকা ।
মাথা নিচু করে রুমের মাঝে পায়চারী করছি ।
হাতে পিস্তলটা নিয়েই ।
ফারিহা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
ওর দিকে ফিরলাম, ‘তোমার বাবার ব্যাপারে জানা লাগবে আমার, ফারিহা ।’
‘কেন?’ ঠান্ডা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় মেয়েটা । ‘যতদূর বুঝলাম ব্যাপারটা আমাকে নিয়ে ।’
‘বলে যাও । বাবার প্রফেশনাল লাইফ সম্পর্কে যা যা জানো বলে যাও, প্লিজ ।’ ওকে তাড়া দেই আমি ।
মুখ খোলে মেয়েটা ।
বলে যায় যতদূর পর্যন্ত ও জানে ।
শুনে আর নিরাশ হই আমি । আর দশটা শিল্পপতির মতই জীবনযাত্রা ছিল রিজভী আকন্দের ।
আধঘন্টা প্রায় পেরিয়ে এসেছে ।
ভয়েস কলটা রিসিভ করলাম ।
‘কি সিদ্ধান্ত নিলে ?’
‘আ’ম নট ডুইং দিস ।’ স্পষ্ট উত্তর দিলাম ক্লায়েন্টকে ।
‘জানতাম আমি ।’ খোশমেজাজেই বলে লোকটা ।
‘গুড নাইট মিস্টার ।’ কল কেটে দিতে চাই আমি ।
‘গুডনাইট, ইরফান ।’ স্বাভাবিকভাবেই বলে লোকটা । ‘জাস্ট আ ফ্রেন্ডলি অ্যাডভাইস - তোমার মেইল আইডিতে একটা ভিডিও পাঠানো হয়েছে । ওটা চেক করে দেখো ।’
বেহুদা বক বক করে লাভ নেই ।
কলটা কেটে দেই আমি ।
‘হাত থেকে ফেলে দিলে কেন দশ কোটি টাকা ?’ বিছানা থেকে স্বস্তি আর বিস্ময়ের সাথে বলে ফারিহা ।
‘আমার নিজস্ব কিছু নীতি আছে – যেগুলো আমি ভাঙ্গি না কখনও ।’ মেইলে ঢুকি কৌতুহল মেটাতে ।
‘বাহ ।’ উঠে দাঁড়িয়ে আমার পাশে দাঁড়ায় মেয়েটা । ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে তীব্রভাবে লাগছে । ‘নীতিবান ক্রিমিনাল ?’
আমার শরীর শক্ত হয়ে যায় ।
ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ল্যাপটপের স্ক্রীণে তাকায় ফারিহা ।
ছোট্ট একটা ভিডিও পাঠিয়েছে আমার ক্লায়েন্ট ।
একটা মেয়েকে টান টান করে বেঁধে রাখা হয়েছে বিছানায় ।
পাশেই টেবিলে কার্ড খেলছে চারজন ষন্ডা ।
‘হু ইজ শী ?’ ফিস ফিস করে বলে ফারিহা ।
‘শী’জ মাই সিস্টার ।’ কাঁপা গলাটা আমার – আমি নিজেই চিনতে পারি না ।
✭✭✭৫✭✭✭
‘মত পাল্টেছেন বলে মনে হচ্ছে ?’ খ্যাক খ্যাক করে হাসে ওপাশের গলাটা ।
‘ঈশিতাকে কোথায় পেয়েছ ?’ গলা ঠান্ড
পার্কের দূরবর্তী কোণে বসে ছিল জাহিদ আর ফারিহা ।
জাহিদ ছেলেটার মাঝে কি যেন আছে । ওর আশেপাশে থাকলে ফারিহার নিজেকে অনেক নিরাপদ লাগে ।
এই মুহূর্তে জাহিদের হাতে হাত তুলে দিয়ে ওর বুকে মাথা রেখে চুপচাপ বসে আছে ফারিহা ।
কিছু কিছু সময় কথা বলার প্রয়োজন হয় না ।
কথার চেয়ে নিস্তব্ধতাকেই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে হয় ।
আড়াল থেকে ওদের দেখছিলাম ।
বুক ভরে একটা শ্বাস নিলাম । এই লাইনে আমার এটাই সবচেয়ে বড় কাজ ।
আস্তে করে বেল্টের পেছনে আটকে রাখা গ্লক23 টা স্পর্শ করলাম ।
জিনিসটার দাম আছে । তবে আমার স্পন্সরও মালদার পার্টি ।
আড়াল থেকে বের হয়ে ওদের দিকে হেঁটে যাই আমি ।
আমাকে দেখে মেয়েটা সরে যায় ছেলেটার বুক থেকে । দুইজনই সরু চোখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে ।
আমার দৃষ্টি সরাসরি ফারিহার ওপর নিবদ্ধ – সেটাও একটা কারণ হতে পারে ।
মেয়েটা পাঁচ ফিট ছয় । বড় বড় চোখদুটো সাথে কপালে এসে পড়া চুলগুলোতে একেবারে রাজকন্যার মত লাগছে ।
‘টাকা আর আভিজাত্যের সাথে সৌন্দর্যের সম্পর্ক কোথায় কে জানে’- মনে মনে ভাবলাম ।
তবে এসব ফালতু ডিটেইলসে কাজ নেই । ইটস শো টাইম ।
‘ফারিহা !’ গলায় যুগপৎ বিস্ময় ঢেলে বললাম । ‘তুমি এখানে কি করছ ?’
এক মুহূর্ত পরেও আমাকে চেনার কোন লক্ষণ দেখা যায় না ফারিহার মুখে ।
‘রিজভী আংকেল আমার বাবার বন্ধু । আমাদের দেখা হয়েছে আগে । ভুলে গেছ নাকি ? আমি ইরফান ।’
সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মেয়েটা । তবে ছেলেটা ত্রস্ত্র পায়ে উঠে দাঁড়ায় । বয়েসে আমার জুনিয়র ।
লুকিয়ে প্রেম করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে এমন ভাব ওর চোখে মুখে ।
‘ইরফান ভাই ।’ হাত বাড়িয়ে দেয় । ‘আমি জাহিদ । ফারিহা আর আমি – ইয়ে আরকি ।’
সব বুঝে ফেলেছি এভাবে একটা হাসি দিয়ে হাত মেলালাম ছেলেটার সাথে ।
‘হু দ্য হেল আর ইউ ?’ উঠে দাঁড়ায় ফারিহাও । ‘আমি কোন ইরফানকে চিনি না ।’
অবাক হয়ে ওর দিকে তাকায় জাহিদ ।
ঘাড়ের পেছনে মাঝারি আকারের একটা রদ্দা মারতেই চোখ উলটে যায় ছেলেটার ।
কাটা কলাগাছের মত পড়ে যায় মাটিতে ।
চিৎকারটা চলে এসেছিল ফারিহার মুখে – ঝটপট পিস্তলটা ওর মুখ বরাবর ধরতেই থেমে যায় ওটা মাঝপথেই ।
প্রেমিকযুগলকে ধন্যবাদ – নির্জন একটা জায়গা বেছে নিয়েছিল ওরা ।
দেখার কেউ নেই ।
‘আমার সাথে হাঁটো । যদি প্রাণের মায়া থাকে ।’ কড়া গলায় ওকে বললাম ।
আমার দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ফারিহা ।
‘আর শোন মেয়ে – তোমাকে জীবন্ত ধরে নিয়ে যাওয়াটা আমার জন্য খুব জরুরী এমনটা ভাবলে ভুল করবে । তোমাকে মেরে ফেলার জন্যই যথেষ্ট টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে । তবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য টাকার অংকটা ডাবল হয়ে যাচ্ছে বলেই এত কথা । নাহলে চোখের মাঝ দিয়ে বুলেট ঢুকিয়ে একটা ছবি তুলে চলে যেতাম । সুতরাং – কোন ধানাই পানাই নয় । বুঝেছ ?’
একটা কথা বলে না মেয়েটা ।
গা থেকে জ্যাকেটটা খুলি আমি । হাতের ওপর ফেলে রাখি এভাবে যাতে পিস্তলটা ঢাকা পড়ে যায় ।
ডানহাতে আড়াআড়ি ভাবে ওটা ধরে ফারিহাকে আবার বলি, ‘আমার বাম হাত ধরে হাঁটবে এখন ।’
নড়ে না মেয়েটা একচুল । ‘নাউ !’ চাপা ধমক দেই । মেজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে ।
এই অজ্ঞান দেহের আশে পাশে বেশিক্ষণ দাঁড়ালেই সমস্যা ।
ফারিহা আমার বাম হাত জড়িয়ে ধরতেই আড়াআড়ি ডান হাতে ধরা পিস্তলটা একেবারে ওর বুক বরাবর থাকে ।
এটা বুঝতে অবশ্য ওরও কোন সমস্যা হচ্ছে না ।
কাজেই ভদ্র মেয়ের মতই হেঁটে যায় ও আমার সাথে ।
মেইন রোডে উঠতেই বাতাস কেটে ছুটে আসে গাড়িটা ।
আস্তে করে ব্রেক কষে আমাদের সামনে ।
পেছনের সীটের দরজা খুলে ফারিহাকে ঢুকিয়ে দেই ।
তারপর নিজেও উঠে বসি আমি ।
ড্রাইভিং সীট থেকে রাসেল হাস্যোজ্জ্বল মুখে একটা সিগারেট ধরায় ।
‘ইজি মানি, হাহ ?’ আমার উদ্দেশ্যে বলে ও ।
‘আনন্দে ডিগবাজি না খেয়ে ঠিকমত ড্রাইভ করো, গর্দভ ।’ নিশ্চিত হতে পারি না আমি । ‘সেফ হাউজে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত আমরা কেউই নিরাপদ না ।’
তবে আমার ধমকে হাসি মোছে না রাসেলের মুখ থেকে ।
মেয়েটার দিকে চোখ রাখি আমি ।
জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে ও ।
নাহ – এই মেয়ের নার্ভ আছে । মনে মনে স্বীকার না করে পারলাম না ।
অন্য কেউ হলে এতক্ষণে হাউ-কাউ লাগিয়ে দিত ।
অবশেষে এক যুগ পরে আমাদের গাড়ি সেফ হাউজে এসে পৌঁছে । আমার অন্তত তাই মনে হল ।
জ্যাকেট হাতে ফেলে আবারও সেভাবে হেঁটে উঠে যাই আমরা ।
বাসাটা আর সব বাসার মতই ।
ফারিহাকে কিডন্যাপ করার জন্য তিনতলাটা গত চারমাস ধরে ভাড়া নেয়া হয়েছে ।
শুধু তাই না – দোতলা আর চারতলাও ভাড়া নেয়া আছে গত চারমাস থেকে – মালদার পার্টির কাজ – যথেষ্ট প্রোফেশনাল এরা ।
কাজেই কারও সন্দেহ না তুলেই ওকে সহজে রাখা যাবে এখানে ।
রাসেলটাকে গাড়ি সহ ভাগিয়ে দিয়েছি ।
বিশাল বেডরুমটায় এসে ঢুকি আমি আর ফারিহা ।
ওর কাঁধ থেকে ব্যাগটা সরিয়ে টেবিলে ছুঁড়ে মারি ।
একাকী অচেনা একজন কিডন্যাপারের সাথে এক রুমে ঢুকে ফারিহার মুখে ভীতির ছাপ পড়ল কি না খেয়াল করার চেষ্টা করলাম ।
উঁহু – ভীতি না ; অসহায়ত্বের ছাপ পড়েছে । এই মেয়ে কঠিন ধাতুতে গড়া ।
বিশাল বিছানাটার এক প্রান্তে একটা হ্যান্ডকাফ লাগানো ।
এক প্রান্ত আটকে আছে বিছানার সাথে ।
আরেকপ্রান্ত খোলা ।
ইশারা করে ওটা দেখালাম । ‘বাম হাতে পড়ে ফেল ।’
চুপচাপ তাই করে ফারিহা । অবশ্য হাতে পড়ার আগে এক মুহূর্ত ইতস্তত করে ।
তারপর আমার ডান হাতের অকম্পিত পিস্তলটার দিকে তাকিয়ে ওর মুখের অসহায়ত্ব আরেকটু বাড়ে ।
কিছু না বলে বাম হাতে আটকে ফেলে ও হ্যান্ড কাফটা ।
টেবিলে খোলা ল্যাপটপটা অন করি আমি এবার ।
ভিডিও কল দেই স্কাইপ থেকে একটা নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে । ওপাশে ক্যামেরা অবশ্য বন্ধ করা ।
কাজেই দেখা যাবে না কাকে কল করলাম – যদিও ওপাশ থেকে আমাদের দেখতে পাচ্ছে স্পষ্ট ।
‘কাজ শেষ ?’ ওপাশ থেকে ভরাট গলা ভেসে আসে ।
‘হুম ।’
‘মেয়েটাকে দেখাও ।’
ওয়েব ক্যাম ঘুরিয়ে বিছানায় বন্দী ফারিহাকে দেখালাম ।
‘গুড । মেইল চেক করে দেখ ।’
অফলাইনে চলে যায় ওপাশের আগন্তুক ।
মেইল চেক করে দেখলাম বিস্তারিত নির্দেশ দেয়া হয়ে গেছে ।
ফোনকলটা দিতে হবে রাত বারোটাতে।
কলেজ ফাঁকি দিয়ে প্রেম করার হ্যাপা বুঝুক মেয়ে ।
পাঁচটার সময় কলেজ ছুটি – ছয়টার মাঝে পৌঁছে যাওয়ার কথা । কিন্তু আমরা যোগাযোগ করব আরও ছয় ঘন্টা পর ।
এটা কিডন্যাপিং-এর একেবারে ব্যাসিক – যাকে বলে অ আ ক খ ।
কিডন্যাপিংটা হয়ে যাওয়ার পর পরিবারকে দুশ্চিন্তায় ডুবে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় দাও । তারপর যোগাযোগ কর ।
ওই মুহূর্তে যা চাওয়া হবে দিয়ে দেয়ার জন্য একপায়ে দাঁড়িয়ে থাকে পরিবার ।
‘খিদে পেয়েছে ?’ জানতে চাইলাম ফারিহার কাছে ।
মাথা নাড়িয়ে ‘না’ বলে ও ।
সেই তখন থেকে একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি মেয়েটা ।
‘খিদে পেলে বলবে ।’ আর কি বলব বুঝতে পারলাম না ।
‘আপনার বোনটা কোন ক্লাসে পড়ে ?’ হঠাৎ - একেবারে হঠাৎ আমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিল ফারিহা ।
এতটাই চমকে যাই আমি - আমার হাত কেঁপে ওঠে ।
এক সেকেন্ড পরেই নিজেকে সামলে নেই অবশ্য । তবে পরিবর্তনটা চোখে পড়ে গেছে ফারিহার ।
নিজের ওপর রাগ হতে থাকে আমার । পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আমার নিয়ন্ত্রণে থাকার কথা ছিল ।
‘শাট আপ !’ দ্রুত এগিয়ে পিস্তলটা ওর মাথায় চেপে ধরি । ‘এরপর থেকে আমি প্রশ্ন করব যদি দরকার হয় । একটা প্রশ্ন না – বোঝা গেছে ?’
বড় বড় চোখ মেলে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে মেয়েটা ।
সে দৃষ্টিতে ভীতি নেই – আহত একটা দৃষ্টি ।
চোখ সরিয়ে নিলাম ।
আমি কিডন্যাপার মানুষ – এত অনুভূতির কোন দাম নেই আমার কাছে ।
চোখ সরালেও পিস্তল সরালাম না ।
‘মোবাইল কোথায় ?’
‘ব্যাগে ।’ আর্দ্র গলায় বলে মেয়েটা ।
কান্নাকাটি শুরু করলে বিপদ । মেয়েমানুষের ট্যা-ফোঁ একেবারেই অসহ্য আমার কাছে ।
পিস্তলটা কোমড়ে গুঁজে টেবিল থেকে মোবাইলটা বের করলাম ।
সুইচড অফ রাখতে হবে ।
মোবাইলের ডিসপ্লের ওপরে একটা ব্লিপ দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলাম ।
দ্রুত ফিরে যাই মেয়েটার কাছে । ‘এটা কি ?’
‘আমি কি জানি ?’
কষে একটা থাপ্পড় দিলাম মেয়েটার গালে ।
ফরসা গাল সাথে সাথে টকটকে লাল হয়ে গেল ।
‘হোয়াট – ইজ – দিস ?’ দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করলাম ।
‘যা ইচ্ছে কর তোমরা ...’ এই প্রথম চোখ থেকে একফোঁটা পানি পড়ে ফারিহার, ‘আমার জাহিদ আমাকে খুঁজে বের করবেই ।’
সাথে সাথেই ঘন ঘন কলিং বেল পড়ে বাসায় ।
ঝট করে পিস্তলটা বের করে ফেলি আমি ।
জিপিএস ট্র্যাকার দিয়ে ট্র্যাক করে কি পুরো পুলিশ ফোর্সটাই চলে এসেছে আমাদের পেছনে ?
✭✭✭২✭✭✭
দেয়ালের আড়াল নিয়ে ধীরে ধীরে মেইন গেটের দিকে যাই আমি ।
কান বরাবর তুলে রেখেছি পিস্তলটা ।
কলিংবেল আবারও বেজে ওঠে – বেশ অস্থিরতা প্রকাশ পাচ্ছে বেল যে টিপছে তার মাঝে ।
আলতো করে ছিটকিনিটা সরিয়ে দরজার হাতলে টোকা দিয়ে খুলে ফেলি দরজা ।
আমি দেয়ালের আড়ালেই আছি ।
মেপে মেপে নিঃশ্বাস ফেলছি ।
হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে দুইজন মানুষ ।
হার্টটা লাফিয়ে এসেছিল গলার কাছে । আরেকটু হলেই গুলি বেড়িয়ে যেত !
রাসেল আর আরেকটা ছেলে ।
রাসেল দ্রুত দরজাটা লাগিয়ে দেয় ।
স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেলি আমি ।
অন্য ছেলেটাকে আমি চিনি ।
জাহিদ ।
*
‘আর কইস না !’ কপাল থেকে ঘাম মোছে রাসেল । ‘আমি ঢুকতে যাচ্ছি বিল্ডিং-এ – এই পোলারে দেখলাম মোবাইলে চোখ রেখে ঢুকতেছে । মনে কেন জানি সন্দেহ হল । কানে বয়রা দিয়ে মোবাইলটা নিয়ে ফারিহার নাম দেখে কাহিনী বুঝতে আর বাকি থাকল না ।’
‘দারুণ কাজ দেখিয়েছিস ।’ পিঠ চাপড়ে দেই ওর । তাকালাম জাহিদের দিকে । ‘তারপর – কি খবর লিটল হিরো ? চলো – কিছু প্রশ্নের উত্তর দেয়া লাগে যে !’
ভয়ে ছোটখাট হয়ে গেছে বেচারার মুখ ।
ওই মুখে একটা মাঝারি মাপের ঘুষি বসালাম । এটা অ্যাডভান্স ।
তাড়াতাড়ি মুখ খুলতে সাহায্য করবে ওকে ।
বেডরুমে জাহিদের কলার ধরে ঢুকতেই আৎকে ওঠে ফারিহা ওর রক্তাক্ত মুখ দেখে ।
‘পুলিশ আসছে ।’ জাহিদ বলে ফারিহাকে অভয় দিয়ে । ‘ওদের খবর দিয়েই ঢুকেছি ।’
চট করে ফারিহার দিকে তাকালাম ।
নিরাশ মুখ হয়ে গেল মেয়েটার ।
জাহিদকে ঘুরিয়ে আরেকটা ঘুষি মারি ওর মুখে । ছিটকে মাটিতে পড়ে যায় ছেলেটা ।
‘প্লিজ !’ অনুনয় ঝরে পড়ে মেয়েটার চোখমুখে । ‘প্লিজ ওকে মারবেন না ।’
‘শাট আপ!’ রুম কাঁপিয়ে ধমক দেই আমি । ‘রাসেল, প্লায়ার্স গরম কর । এই শালা মিথ্যা বলছে । পুলিশকে খবর দিয়ে ঢোকেনি । তবুও সাবধানের মার নেই ।’
‘প্লায়ার্স দিয়ে কি করবেন ?’ ফারিহার চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে ভয়ে ।
‘হারামজাদার আঙ্গুলের নখ তুলব একটা একটা করে । তখন মুখ দিয়ে সত্য কথা হড়হড় করে বের হবে ।’
‘প্লিজ – এই কাজ করবেন না ।’ কেঁদে ফেলে এবার মেয়েটা । ‘ও মিথ্যা বলেছে । ও মিথ্যা বললে আমি বুঝি । পুলিশে খবর দেয় নি ও । প্লিজ ওকে আর কষ্ট দেবেন না ।’
মেঝেতে পড়ে থাকা জাহিদ মুখ তুলে ফারিহাকে ধমক দেয়, ‘তুমি চুপ কর ফারিহা ।’ ওখান থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আমাকে যতখুশি টর্চার করুন – তাতে এখন আর পুলিশ আসা ঠেকাতে পারবেন না ।’
দুইহাতে ওর কলার জাপ্টে ধরে দাঁড় করালাম ওকে । পেটে মাঝারি আকারের একটা ঘুষি বসাতেই বাঁকা হয়ে গেল জাহিদ ।
‘আর কোন কথা না । শুধু আমি যা বলব তাই উত্তর দেবে । বোঝা গেছে ?’
এই সময় রুমে ঢুকে রাসেল । ‘প্লায়ার্স গরম হচ্ছে ।’ জানায় ও ।
একেবারে আচমকাই নড়ে উঠে জাহিদ ।
আমার পেটে দুবার হাত চালিয়ে মাথায় একটা ঘুষি মারে ও ।
এতটুকু ছেলের গায়ে এত জোর থাকে কি করে ?
মাটিতে ছিটকে পড়ে ভাবি আমি ।
এই সময় সশব্দে ভেঙ্গে পড়ল ঘরের দূরবর্তী কোণার ফুলদানীটা ।
রাসেল, জাহিদ এমনকী ফারিহাও অবাক হয়ে তাকায় ওদিকে ।
হঠাৎ ব্যাপারটা বুঝে ফেলি আমি – শীতল হয়ে আসে রক্ত আতংকে ।
‘গেট ডাউন !’ চেঁচিয়ে উঠি রাসেল আর জাহিদের উদ্দেশ্যে ।
সেই সাথে গড়িয়ে এসেছি একপাশের দেওয়ালের দিকে । দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে পুরো খাটটাকে পায়ের ধাক্কায় কাত করে দিচ্ছি – আর্তচিৎকার দিয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছে ফারিহা ।
রাসেল আর জাহিদ আমার দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে – মরিয়া হয়ে আবার চেঁচাই আমি, ‘গেট ডাউন ড্যাম ইট !’
হঠাৎ - একেবারেই হঠাৎ রাসেলের মুখমন্ডলের অর্ধেকটা গায়েব হয়ে যায় । রক্ত আর মগজ ফিনকি দিয়ে ছিটকে পড়ে চারদিকে ।
পরিস্থিতি বুঝে ফেলেছি জাহিদ ততক্ষণে । ঝাঁপিয়ে পড়তে চায় ও মেঝের দিকে ।
পরের বুলেটটা ওর মাথা মিস করলেও ঘাড়কে পেয়ে যায় । ঘাড় আর গলা অর্ধেক দ্বিখন্ডিত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে যায় জাহিদ ।
পায়ের ধাক্কায় খাটটাকে ততক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছি । ফারিহার হ্যান্ডকাফ পড়ানো হাতটা চাপা পড়ে গেছে এর নিচে । ব্যাথায় আর্তনাদ করে উঠলেও থেমে গেছে ও এখন ।
মাত্র ছয়ফিট দূরে রক্তাক্ত বয়ফ্রেন্ডকে দেখতে পাচ্ছে ও ।
ঘরটায় এখন শুনশান নীরবতা ।
‘ইরফান ভাই ।’ ঘড়ঘড়ে গলায় বলে ওঠে জাহিদ, ‘পুলিশ ডাকতে পারিনি আমি । একাই এসেছিলাম ...’
গলা থেমে যায় প্রায় ওর । কল কল করে রক্ত পড়ছে ক্ষত থেকে ।
‘ফারিহাকে ...’ বলার চেষ্টা করে ও কিছু একটা ।
ক্রল করে গিয়ে ওর হাত ধরলাম । ‘আ’ম সরি ফর এভরিথিং, জাহিদ । আ’ম রিয়েলি ...’
‘ফারিহাকে দেখে রাখবেন ...’ কোনমতে বলে জাহিদ ।
চোখদুটোর মাঝে প্রাণের আলো নিভে যায় ওর ।
বুকে হেঁটেই খাটের ওপাশে ফারিহার দিকে চলে যাই । এখানে তাও খাটটা কাভার হিসেবে পাওয়া যাচ্ছে ।
হ্যান্ডকাফের চাবি বের করে আস্তে করে ফারিহাকে বলি, ‘তোমার হাত খুলে দিচ্ছি এখন । পাশের বিল্ডিং-এ একটা স্নাইপার আছে । পুলিশের লোক নয় ওরা । কাজেই – হাত খুলে দিলেই দৌড় দেবে না । বুকে হেঁটে বেরিয়ে যাব আমরা । বুঝতে পেরেছ ?’
ফ্যাকাসে মুখে চেয়ে থাকে মেয়েটা ।
আফটার শক ট্রমা ।
যা আছে কপালে – ওর হাত খুলে দিতে থাকি আমি ।
নিজের এবং মেয়েটার জীবিত থাকাটাই এখন আমাদের ট্রাম কার্ড ।
এখান থেকে যতদ্রুত সম্ভব বেড়িয়ে পড়তে হবে ।
তারপর ছাড়াতে হবে ঘটনার প্যাঁচ ।
যা ঘটছে চারপাশে – তার সাথে বড় কোন কিছুর সম্পর্ক না থেকেই যায় না ।
বড় কিছুটা কি সেটাই বের করতে হবে আমাকে ।
মেয়েটার হাত ধরে ধীরে ধীরে ক্রল করে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যাই আমি ।
গ্যারাজের মটরসাইকেলটার কাছে জ্যান্ত পৌঁছতে পারলে হয় ...
✭✭✭৩✭✭✭
মেঝেতে পড়ে থাকা রাসেল আর জাহিদের রক্তে আমাদের জামার সামনের দিক ভিজে আছে ।
ওই অবস্থাতেই আস্তে করে দরজা খুলে বের হলাম । সিঁড়িঘরটা অন্য অ্যাংগেলে থাকায় আশা করছি – স্নাইপারদের নাগালের বাইরে এটা ।
‘উঠে পড় ।’ ফারিহার হাত ধরে টেনে তোলা লাগল ।
বের হয়ে সাবধানে তাকালাম সিঁড়িঘরের চারপাশে । কোন নড়াচড়া নেই ।
‘জাহিদকে নিয়ে আসি ?’ আমার দিকে তাকিয়ে অনুনয়ের সাথে বলে ফারিহা ।
মেয়েটা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে আছে ।
দোষ দিতে পারলাম না । এক দিনের জন্য যথেষ্ট হয়ে গেছে ওর জন্য ।
কোন কথা না বলে নিষ্ঠুরের মত ওকে টেনে নিয়ে লিফটে উঠে পড়লাম ।
পিস্তলটা বের করে ফেলেছি ।
লিফটটা গ্রাউন্ড লেভেলে নামতেই প্রস্তুত হলাম । বাইরে আরও আততায়ী থাকতে পারে ।
দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেলেও গ্যারেজে কাওকে দেখলাম না ।
আজ সকালেই নিজের মটরসাইকেলটা গ্যারেজে ইমার্জেন্সী এস্কেপের জন্য রাখায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হল ।
‘ফারিহা, লিসেন !’ মেয়েটার মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করি আমি – আমার দিকে বিহ্বলদৃষ্টি মেলে তাকিয়ে থাকে ও । ‘তোমার বাবার শত্রু আছে । আমাকে ভাড়া করা হয়েছিল তোমাকে কিডন্যাপ করতে । কিন্তু এখন তারা সম্ভবতঃ সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে । আমাদের সবাইকে মেরে ফেলতে চাচ্ছে ওরা ।’
যদিও যতদূর বুঝতে পারছি – ফারিহার ক্ষতি করার ইচ্ছে এদের নেই । এরা সম্ভবতঃ তৃতীয় পক্ষ ।
আমাদের কষ্টার্জিত জিনিসটা সহজে নিজেদের করে নিতে চায় ।
মুক্তিপণের টাকাটা কম না । একমাত্র মেয়ে কি না !
দশ কোটি টাকা ! এর জন্য আরও পার্টি হন্যে হয়ে থাকতেই পারে ।
‘আমার জাহিদকে কেন মারল ওরা ।’ প্রশ্ন নয় ঠিক – কি বলছে সেটা মেয়েটা নিজেও জানে কি না সন্দেহ হল আমার ।
জাহিদের প্রতি একটা কৃতজ্ঞতা বোধ আমারও আছে । ঠিক সময়ে আমার মুখে ঘুষি মারে ছেলেটা । নাহলে এতক্ষণে ঠান্ডা মাংস হয়ে পড়ে থাকতাম – সন্দেহ নেই । কিন্তু মেয়েটার এ অবস্থা না সরাতে পারলে আমরা কেউ-ই বের হতে পারব না ।
‘পে অ্যাটেনশন !’ এবারে চেঁচিয়ে উঠি । কেঁপে ওঠে মেয়েটা । ‘এই বিল্ডিং-এ থাকা প্রতিটি সেকেন্ড আমাদের মৃত্যুর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে । এই মুহূর্তে কেটে না পড়লে তোমার লাশটাও পড়ে থাকবে এখানে । আমি এখন এই মটরসাইকেলে করে বেড়িয়ে যাব । তুমি আমার সাথে আছ ?’
কিছুটা বাস্তবে ফিরে আসে যেন মেয়েটা । চারপাশে তাকাচ্ছে ।
ভাল লক্ষণ । এতক্ষণ একেবারে মোমের পুতুল হয়ে ছিল ।
মটরসাইকেল স্টার্ট দিলাম ।
নিজে থেকেই এগিয়ে এসে আমার পিছে বসে পড়ে ফারিহা ।
ছোট গেইটটা খোলা গ্যারেজের ।
আমি নিশ্চিত ওদিকে স্নাইপার তাক করে বসে আছে আততায়ী ।
কিন্তু – ঝুঁকিটা নিতে হচ্ছে, গড়গড় করে উঠল ইঞ্জিন ।
বুলেটের মত বেড়িয়ে এলাম আমরা পিচ্চি গেইটটা দিয়ে ।
ভালোমানুষের মত মুখ করে তিনজন কোটধারী এগিয়ে আসছিল বিল্ডিংটার দিকে ।
আমাদের ছিটকে বেড়িয়ে আসতে দেখেই একযোগে কোটের ভেতরে হাত ভরে ফেলে তিনজনই ।
ভেতর থেকে কি অমূল্য সম্পদ বের করে আনতে যাচ্ছিল সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করি না ।
ডান হাত হ্যান্ডেল থেকে সরিয়ে নিমেষে কোমড় থেকে পিস্তলটা বের করে কয়েকটা গুলি পাঠিয়ে দেই ওদের দিকে ।
এদিক ওদিক ঝাঁপিয়ে পড়ে কাভার খুঁজছে তিন ভদ্রলোক – এই ফাঁকে বাম দিকের গলি ধরে ঢুকে পড়লাম আমরা ।
কাঁধের কাছে খামচি দিয়ে ধরে আছে ফারিহা ।
আমার মনে হল, দশ কোটি টাকা কাঁধ খামচে ধরে আছে আমার ।
রক্তে ভেজা জামা নিয়ে তীব্রগতিতে বাইক ছোটাটে থাকা যুবক – আর একটু আগে শোনা গুলির শব্দ – এলাকাবাসী দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে নিতে বেশি সময় নিল না মোটেও ।
এদিক ওদিক সরে যেতে থাকে সবাই আমাদের বাইক থেকে ।
একছুটে হতশ্রী বাড়িটার সামনে থামি আমরা আধঘন্টা পর ।
গত ছয়মাস ধরে এটাই আমার হাইডআউট ছিল । এখন অবশ্য আর নিরাপদ নয়
প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস নিয়েই কেটে পড়তে হবে । বেশি সময় পাওয়া যাবে না । সেইফ হাউজের ঠিকানা জানলে আততায়ীর দল আমার হাইডআউটের কথাও জানে – এটা নিশ্চিত ।
রাস্তার মানুষজন সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমাদের দিকে ।
ফারিহাকে নিয়ে সোজা দোতলায় উঠে যাই ।
অ্যাডভান্স তিনলাখ টাকার ব্রীফকেসটা খামচি দিয়ে তুলে নেই । আমার একটা টি-শার্ট ছুঁড়ে দেই ফারিহার দিকে ।
‘রক্তে ভেজা কাপড় পড়ে দৌড়াদৌড়ি করা যাবে না ।’ ব্যাখ্যা দিলাম ওকে । ‘চেঞ্জ করে ফেলো ।’
কোন কথা না বলে টি-শার্টটা নিয়ে বাথরুমে চলে যায় ফারিহা ।
দ্রুত আমার শার্টটা খুলে আরেকটা শার্ট চাপাই গায়ে ।
পিস্তলটা টেবিলের ওপর রেখে কিচেনে গিয়ে ঢুকি । একটা বিস্কুটের টিন থেকে বের করলাম নয়টা ম্যাগাজিন ।
‘আরও কয়েকটা রাখতে পারলে ভালো হত...’ – মনে মনে ভাবি আমি ।
রুমে ফিরে এসে ব্যাকপ্যাকে টাকাগুলো ভরে তার ওপর ম্যাগাজিন সাতটা রাখলাম । দুটো ভরলাম কোটের পকেটে ।
কাজে লাগতে পারে ।
পেছনে খুট করে একটা শব্দ হতেই ফিরে তাকাই আমি । বেরিয়ে এসেছে ফারিহা ।
টি-শার্টে চমৎকার দেখাচ্ছে তাকে । কিন্তু এইমাত্র টেবিল থেকে তুলে নেয়া গ্লকটার আমার বুক বরাবর তাকিয়ে থাকার দৃশ্যটা মোটেও চমৎকার লাগল না ।
‘ইরফান -’ ঠান্ডা গলায় বলে মেয়েটা । বরফ হয়ে যাই আমি । ‘এটা তোমার আসল নাম কি না আমি জানি না । তবে শোন – আমার মনে হয় না আর কোথাও যাওয়ার দরকার আছে । তোমাদের কিডন্যাপিং প্ল্যান ভেস্তে গেছে । এখন আমি যেদিকে ইচ্ছে সেদিকেই যেতে পারি । আর হ্যা – টিশার্টটার জন্য ধন্যবাদ । ’
‘ফারিহা -’ খুব সাবধানে মুখ খুলি আমি, ‘বোঝার চেষ্টা কর । বাইরে তুমি নিরাপদ না ।’
‘হাহ !’ খুব মজা পেয়েছে এভাবে বলে মেয়েটা । ‘তোমার সাথে আমি নিরাপদ ?’ হঠাৎ খেপে ওঠে মেয়েটা – ‘ইউ বাস্টার্ড !’
নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছি আমি । ‘শুধু মাত্র তোর জন্য খুন হয়ে গেছে আমার জাহিদ । তুই যদি আমাকে তুলে না নিয়ে আসতি এখনও নিঃশ্বাস নিত ও । আই শূড কিল ইউ টু ! ইউ মাদারফা-’
গালিটা সম্পূর্ণ দেয়ার আগেই আমাদের চারপাশে নরক ভেঙ্গে পড়ে ।
বাসার দরজার ঠিক বাইরে বিদঘুটে একটা ভোঁতা শব্দ – সেই সাথে অনেকগুলো ফুটো হয়ে গেল দরজাতে ।
সাইলেন্সড সাব-মেশিনগান !
চমকে উঠে ওদিকে ঘুরে যায় ফারিহা । বদ্ধ জায়গাতে কানে তালা লেগে যায় আমার ।
ফারিহার কাঁপা হাত থেকে গুলি বেরিয়ে গেছে !
দ্বিগুণ উৎসাহে দরজাকে মোরব্বা বানায় বাইরের ওই ওরা ।
এক থাবাতে আমার হাতে নিয়ে নেই পিস্তলটাকে ।
ম্যাগাজিন সড়াৎ করে বের করে আরেকটা ঢুকিয়ে ফেলতে না ফেলতেই হুড়মুড় করে দরজাটা ভেঙ্গে পড়ে কারও লাথিতে ।
পোশাকে-আশাকে ভদ্রলোক টাইপ দুই ষন্ডার চেহারা দেখতে পেয়ে আর দেরী করলাম না । তরমুজের মত মাথা দুইটায় দুটো বুলেট ঢুকিয়ে দিতেই বিল্ডিং কাঁপিয়ে পড়ে গেল দু’জনেই ।
পেছনে আরও লোক আছে – জানি ।
তবে এরা ঢোকার আগে তিনবার ভেবে ঢুকবে ।
ঝটপট ব্যাকপ্যাকটা কাঁধে নিয়ে আরেকহাতে ফারিহাকে টান দিয়ে শেষপ্রান্তের রুমে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিলাম ।
বারান্দায় নিয়ে আসলাম ওকে টেনে ।
গ্রিলের সাথে ছোট জানালাটা খুলে আগে থেকেই লাগিয়ে রাখা দড়িটা খুলে দিলাম ।
যে পেশায় আছি আমি - এস্কেপ রুটের কথা একটা সবসময় ভেবেই রাখতে হয় ।
এই বিছানায় ঘুমাই প্রতিদিন – বারান্দার গ্রিলের দড়িটা পরীক্ষা করে ।
আজ কাজে দিল ।
ভয়ে ছিলাম ফারিহা নামতে পারবে কি না ।
ভয়টা সত্য করে বারান্দায় দড়িটা ধরে ইতস্তত করতে থাকে মেয়েটা ।
এই সময় বেডরুমের দরজাতেও ছিদ্র হওয়া শুরু করল । আমার শেষ না দেখে ফিরে যাবে না – এই প্রতিজ্ঞা করে এসেছে এরা । আর দশ কোটি টাকা তো আমার সাথেই ।
প্রাণের মায়া বড় মায়া – আমার চেয়েও দ্রুত নেমে পড়ল ফারিহা। নিচে পড়ে ককিয়ে ওঠে ও ।
ব্যাগটা নিচে ফেলে দিয়ে ওকে ধরে তুললাম, ‘আর ইউ ওকে ?’
ব্যাথার চিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করে মাথা দোলায় মেয়েটা । গোড়ালি মচকেছে ওর – বুঝলাম ।
সময় নষ্ট করা যাবে না – ব্যাকপ্যাকটা তুলে ছুটলাম ।
বাসার পেছনে এই মাটিগুলো আসলে ড্রেনের কাভার ।
মোটামুটি ছয়ফিট গ্যাপ রেখে পরের বিল্ডিংটা তোলা হয়েছে । অর্থাৎ দুটো বিল্ডিং-এরই পিছন দিকে এই ড্রেনের জন্য রাখা ছয়ফিট জায়গা । সামনের দিকে যাতে প্রত্যেকেই রাস্তা পায় সে ব্যাবস্থা ।
ফারিহার হাত ধরে ছোট লোহার বেড়াটার দিকে ছুটে যেতে থাকি আমি ।
আজ সকালেই এই মেয়েটাকে আমার বন্দী করে রাখার কথা ছিল – মুক্তিপণের টাকা না পেলে মাথায় একটা বুলেট ঢুকিয়ে দেয়ার দায়িত্ব ছিল ।
কে বলবে এখন আমাদের দেখে ?
✭✭✭৪✭✭✭
রাত আটটা ।
হোটেল থেকে বেরিয়ে এসে সাবধানে চারপাশে তাকাই ।
আমার হাইডআউট থেকে বেরিয়ে এসে রাতের আঁধারে এই হোটেলে উঠেছি আমরা ।
আসার পথেই খেয়ে নেই । সারাদিন আমার বা ফারিহার পেটে দানাপানি পড়ে নি ।
এরপর মেয়েটা তার অবস্থা সম্পর্কে সচেতন হয় ।
খাটে চাপা পড়ে হাত মচকে গেছিল এতক্ষণের উত্তেজনায় বোঝেই নি সে । আর পায়ের মচকানীর ধাক্কা সামলাতে ওর আরও সপ্তাহ খানেক লাগবে ।
হোটেলে ওঠার আধ ঘন্টার মধ্যেই ঘুমিয়ে কাঁদা হয়ে যায় মেয়েটা ।
আস্তে করে বাইরে থেকে লক করে দিয়ে আসি ওকে । টেবিলে নোট রেখে গেছি – দেড় ঘন্টার মাঝেই ফিরে আসব আমি ।
বাইরে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে ভালোই লাগে । যখন পেছন থেকে ছুটে আসা বুলেটের ভয় না থাকে ।
একটা ল্যাপটপ কিনে বাংলালায়নের কাছে গিয়ে মডেম নিয়ে আসলাম ।
ব্যাকপ্যাকে সব সময় অল্টারনেটিভ কাগজপত্র থাকেই । বেশিরভাগই জাল অবশ্য ।
ফিরে আসার সময় ফারিহার জন্য কয়েকটা ড্রেস কিনে আনলাম ।
*
মাত্র ঘুম থেকে উঠে বিছানায় বসে আছে ফারিহা – এই সময় রুমে ঢুকি আমি ।
ঘুম ঘুম চোখেও মেয়েটাকে পরীর মত লাগছে ।
‘ঘুম কেমন হল ?’ টেবিলে হাতের ব্যাগগুলো নামিয়ে জানতে চাই আমি ।
‘ইরফান ?’ কোমল গলায় ডাকে ফারিহা । ‘যদিও তোমার আসল নাম এটা না ...’
‘কিছু বলবে ?’
‘থ্যাংকস ফর সেভিং মাই লাইফ ।’ হাতের দিকে তাকায় মেয়েটা । ফুলে আছে বাম হাতটা ।
তাকিয়ে থাকি আমি । আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলে ও, ‘টুয়াইস ।’
কিছু একটা বলতে গেছিলাম – কিন্তু সুযোগ না দিয়ে আবারও বলে, ‘অ্যান্ড আই হেইট ইউ ফর ব্রিংগিং মি ইন দিস মেস ।’
হেসে ফেললাম ।
‘তোমার জন্য কয়েকটা ড্রেস এনেছি । দেখো তো লাগে কি না ।’ ওর দিকে প্যাকেটগুলো ছুঁড়ে দিলাম ।
ওগুলো ধরে আস্তে করে উঠে যায় ফারিহা ।
ল্যাপটপটা অন করে নেট কানেক্ট করলাম ।
এবার আমার টার্ন ।
স্কাইপে ঢুকতেই পাওয়া গেল কন্ট্যাক্টকে ।
‘দিস ওয়াজ নেভার অ্যাবাউট দ্যা মানি, ওয়াজ ইট ?’, ভয়েস কল রিসিভ করতেই ঠান্ডা গলায় বলি আমি ।
‘হাহ হাহ হা ।’ ওপাশ থেকে বেশ হাসিখুশি গলাতেই বলে ওঠে অচেনা মানুষটা । ‘ইরফান – অথবা যাই হোক তোমার নাম – ঘটে বুদ্ধি আছে দেখছি ।’
‘ছেঁদো কথা রাখুন । সেইফ হাউজের কথা আর কারও জানার কথা না । আগেভাগেই স্নাইপার নিয়ে অ্যামবুশ করে থাকাটা তো আরও অসম্ভব – এক যদি না আপনার কাছ থেকে ইনফরমেশন পায় ।’
‘হুমম – কিন্তু ওসব কিছুই হওয়ার কথা ছিল না ।’ গম্ভীর হয়ে যায় গলাটা । ‘দোষ সম্পূর্ণ তোমাদের । থার্ড পার্টি ঢুকিয়েছ তোমরাই । তোমার আর তোমার সহযোগী ছাড়া সেইফ হাউজের লোকেশন কেউ জানবে না – এটাই শর্ত ছিল ।’
বুঝলাম – জাহিদের কথা বোঝাচ্ছে ক্লায়েন্ট ।
‘ওটা একটা ঝামেলা ছিল ।’ মাথায় ঝড়ের বেগে চিন্তা চলছে আমার । ‘তবে আমাদের দুইজনকে সরিয়ে দেয়ার প্ল্যানটা আপনার ছিলই । জাহিদ এর মাঝে না আসলেও তাই করতেন । সম্ভবত রাত বারোটায় কলটা দেয়ার পরই আমাদের পাট চুকে যেত । কেন ? সাধারণ কিডন্যাপিং এটা নয় – আমাকে নির্বোধ ভাববেন না । গোটা ব্যাপারটা আমি জানতে চাই । মনে রাখবেন, মেয়েটা এখনও আমার কাছে ।’
এক মুহূর্ত নীরব থাকে ওপাশে ।
‘ঠিক আছে । তোমাকে জানানো ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই আমার অবশ্য ।’ অবশেষে মুখ খুলে কুটিল ক্লায়েন্ট । ‘দিস ওয়ান ইজ নট অ্যাবাউট কিডন্যাপিং – নট অ্যাবাউট মানি । দিস ওয়ান ইজ অ্যাবাউট রেইপ অ্যান্ড মার্ডার ।’
বিস্ময়ের আঘাতটা এতটাই জোরে আসল । কথা হারাই আমি ।
‘ইয়ংম্যান ! ঠিকই শুনছ তুমি ।’ ওপাশ থেকে কনফার্ম করে ক্লায়েন্ট । ‘তোমাদের দায়িত্ব ছিল কেবল কিডন্যাপ করে ফোনে টাকাটা চাওয়া । শোনা যায় – কিডন্যাপিং-এ এই শহরে বেস্ট হল ফ্যান্টম ইরফান । ফ্যান্টম কেন বলা হয় সেটাও সবাই জানে – তুমি অদৃশ্য থাকতে জানো - তোমার কিডন্যাপিংগুলো হয় শতভাগ নিঁখুত । কিন্তু মার্ডার জিনিসটা তোমার রক্তে নেই – প্রোফাইলে যা পড়েছি এতে সহজেই বোঝা যায় । নেহায়েত আত্মরক্ষার প্রয়োজন না হলে কারও দিকে অস্ত্র তোলে নি ফ্যান্টম ইরফান । কিছু নৈতিক নিয়ম মেনে চল তুমি – যা একজন কিডন্যাপারের মাঝে থাকতে নেই । তোমাকে দিয়ে যে রেইপ হবে না সেটা বোঝার জন্য অবশ্যই ইরফান-বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না ।’
‘ইউ আর ড্যাম রাইট মি. হুয়েভার ইউ আর !’ টেবিলে কিল বসাই আমি । ‘এই ডীল ক্যান্সেল করছি আমি । ফায়ারফাইটটুকু জাস্ট বিজনেস মেনে নিয়ে হয়ত এগিয়ে যেতাম আমি ডীল অনুযায়ী । কিন্তু যেটা আপনি চাচ্ছেন সেটা আমার তত্ত্বাবধায়নে হবে না ।’
‘তোমাদের দুইজনের পাওয়ার কথা ছিল দুই কোটি টাকা, ইরফান ।’ ওপাশ থেকে একঘেয়ে গলায় বলে মানুষটা । ‘তুমি পেতে এককোটি । তোমার পার্টনার মারা গেছে । নতুন প্রস্তাব দিচ্ছি আমি – এই কাজের জন্য সম্পূর্ণ দশ কোটি টাকাই পাচ্ছ তুমি । সহজ কাজ ইরফান । ভিডিও অন রাখতে হবে পুরোটা সময় । তারপর কাজ শেষে কেবল একটা বুলেট । অথবা যে পদ্ধতিতে তুমি চাও মার্ডারটা করতে ।’
‘কিপ ইয়োর মানি ।’ চোয়াল শক্ত হয়ে যায় আমার ।
‘তোমাকে আধ-ঘন্টা সময় দিলাম ।’ ওপাশ থেকে বলে আবারও । ‘তারপর তোমার সিদ্ধান্ত জানাও ।’
লাইন কেটে গেল ।
পেছনে ঘুরে ফারিহাকে দেখতে পাই আমি ।
পুরো কথাবার্তাই শুনেছে ও নিঃসন্দেহে । আমাকে তাকাতে দেখে এই প্রথমবারের মত ওর চাউনীতে ভয় উঁকি দেয় ।
ওর দিক থেকে চোখ সরিয়ে নেই আমি ।
দশ কোটি টাকা । আবার ভেবে দেখতে থাকি পুরো বিষয়টা ।
এটাই হতে পারে আমার এই জীবনের শেষ কাজ ।
এরপর এই ঘৃণ্য এবং সেই সাথে ঝুঁকিপূর্ণ পথ থেকে বেরিয়ে আসতে পারব ।
দশ কোটি টাকা ঠিকমত কাজে লাগাতে পারলে কিডন্যাপিং ছেড়ে দেয়াটা সহজ ।
নিরাপদ একটা জীবন সব অপরাধীরই কাম্য – ভাগ্যগুনে সেই সুযোগ আমার হাতে চলে এসেছে ।
কাজটা কঠিন না মোটেও ।
পরীর মত সুন্দর একটা মেয়েকে ধর্ষণ করতে হবে ।
সেটা ভালো মত ভিডিও করে রাখতে হবে যাতে মেয়েটার চেহারা দেখা যায় ।
তারপর যেভাবে আমার মন চাবে সেভাবেই মেরে ফেলতে হবে মেয়েটাকে ।
একেবারেই ছেলে খেলা । ভিডিও জমা দিয়ে দিলেই আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়বে দশ কোটি টাকা ।
মাথা নিচু করে রুমের মাঝে পায়চারী করছি ।
হাতে পিস্তলটা নিয়েই ।
ফারিহা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।
ওর দিকে ফিরলাম, ‘তোমার বাবার ব্যাপারে জানা লাগবে আমার, ফারিহা ।’
‘কেন?’ ঠান্ডা দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় মেয়েটা । ‘যতদূর বুঝলাম ব্যাপারটা আমাকে নিয়ে ।’
‘বলে যাও । বাবার প্রফেশনাল লাইফ সম্পর্কে যা যা জানো বলে যাও, প্লিজ ।’ ওকে তাড়া দেই আমি ।
মুখ খোলে মেয়েটা ।
বলে যায় যতদূর পর্যন্ত ও জানে ।
শুনে আর নিরাশ হই আমি । আর দশটা শিল্পপতির মতই জীবনযাত্রা ছিল রিজভী আকন্দের ।
আধঘন্টা প্রায় পেরিয়ে এসেছে ।
ভয়েস কলটা রিসিভ করলাম ।
‘কি সিদ্ধান্ত নিলে ?’
‘আ’ম নট ডুইং দিস ।’ স্পষ্ট উত্তর দিলাম ক্লায়েন্টকে ।
‘জানতাম আমি ।’ খোশমেজাজেই বলে লোকটা ।
‘গুড নাইট মিস্টার ।’ কল কেটে দিতে চাই আমি ।
‘গুডনাইট, ইরফান ।’ স্বাভাবিকভাবেই বলে লোকটা । ‘জাস্ট আ ফ্রেন্ডলি অ্যাডভাইস - তোমার মেইল আইডিতে একটা ভিডিও পাঠানো হয়েছে । ওটা চেক করে দেখো ।’
বেহুদা বক বক করে লাভ নেই ।
কলটা কেটে দেই আমি ।
‘হাত থেকে ফেলে দিলে কেন দশ কোটি টাকা ?’ বিছানা থেকে স্বস্তি আর বিস্ময়ের সাথে বলে ফারিহা ।
‘আমার নিজস্ব কিছু নীতি আছে – যেগুলো আমি ভাঙ্গি না কখনও ।’ মেইলে ঢুকি কৌতুহল মেটাতে ।
‘বাহ ।’ উঠে দাঁড়িয়ে আমার পাশে দাঁড়ায় মেয়েটা । ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ আমার নাকে তীব্রভাবে লাগছে । ‘নীতিবান ক্রিমিনাল ?’
আমার শরীর শক্ত হয়ে যায় ।
ব্যাপারটা লক্ষ্য করে ল্যাপটপের স্ক্রীণে তাকায় ফারিহা ।
ছোট্ট একটা ভিডিও পাঠিয়েছে আমার ক্লায়েন্ট ।
একটা মেয়েকে টান টান করে বেঁধে রাখা হয়েছে বিছানায় ।
পাশেই টেবিলে কার্ড খেলছে চারজন ষন্ডা ।
‘হু ইজ শী ?’ ফিস ফিস করে বলে ফারিহা ।
‘শী’জ মাই সিস্টার ।’ কাঁপা গলাটা আমার – আমি নিজেই চিনতে পারি না ।
✭✭✭৫✭✭✭
‘মত পাল্টেছেন বলে মনে হচ্ছে ?’ খ্যাক খ্যাক করে হাসে ওপাশের গলাটা ।
‘ঈশিতাকে কোথায় পেয়েছ ?’ গলা ঠান্ড
Published on February 18, 2014 16:19
No comments have been added yet.


