ক্রিয়াযোগ কী? পর্ব ৫ -গুরুতত্ত্ব: রূপ ও চমৎকারের অতীত এক সত্য

অধিকাংশ শ্রোতা যখন মহাবতার বাবাজীর কথা শোনেন, তাঁদের কৌতূহল কেন্দ্রীভূত হয় তাঁর দৈহিক রূপ ও চমৎকার-কাহিনির চারপাশে — তিনি দেখতে কেমন, তাঁর বয়স কত, তিনি কীভাবে শিষ্যকে পুনর্জীবিত করলেন ইত্যাদি। এই কৌতূহল স্বাভাবিক, কিন্তু পরম্পরার প্রকৃত মর্ম বুঝতে হলে রূপ ও চমৎকারের স্তর ছাড়িয়ে গুরুতত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করা আবশ্যক — শাস্ত্রে যে তত্ত্বের সুবিস্তৃত আলোচনা আছে।

শাস্ত্রে প্রথমেই স্পষ্ট করা হয়েছে — গুরু ও সদ্‌গুরু একই বস্তু, অসদ্‌গুরু বলে কিছু নেই; পার্থক্য কেবল বোঝাবার সুবিধার জন্য করা হয়। যাঁর কৃপায় পূর্ণ সত্যের রূপ এমনভাবে প্রত্যক্ষ হয় যে তারপর আর কোনো আবরণ অবশিষ্ট থাকে না, তিনিই সদ্‌গুরু। প্রকৃত প্রস্তাবে গুরু একমাত্র ভগবান্‌, দ্বিতীয় কেউ নন। কিন্তু জীব সরাসরি তাঁকে ধরতে পারে না বলেই তিনি যোগ্য আচার্যের দেহকে আশ্রয় করে শিষ্যোদ্ধারের জন্য আত্মপ্রকাশ করেন। দুর্গাপ্রতিমায় যেমন মহাশক্তি জগদম্বার অধিষ্ঠান হয় বলে প্রতিমাকেও দুর্গা বলা হয়, তেমনই যে দেহকে আশ্রয় করে নিত্য গুরুশক্তি কার্য করে, সেই দেহকেই গুরু বলে বর্ণনা করা হয় — ইহাই আচার্যদেহ। কিন্তু আচার্যের সঙ্গে পরমেশ্বরের সাক্ষাৎ অথবা পরম্পরাগত যোগ স্থাপিত না হলে আচার্য ভগবানের প্রতিনিধিরূপে গুরুকার্যে সমর্থ হন না। আচার্য জীবোদ্ধারের নিমিত্তমাত্র; প্রকৃত গুরুরূপী ভগবানই যথার্থ উদ্ধারকর্তা।

এই দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, মনুষ্যগুরু — অর্থাৎ লাহিড়ী মহাশয়ের মতো মানবদেহধারী আচার্য — মূলত একটি আধার বা মাধ্যম, যাঁর ভিতর দিয়ে সেই এক গুরুশক্তি কাজ করে, যিনি নিজে দেহাতীত। শাস্ত্রে গুরুতত্ত্বের এই ক্রম বহু স্তরে বিস্তৃতভাবে বর্ণিত হয়েছে — সর্বোচ্চে পরমশিব বা মন্ত্রমহেশ্বর স্বয়ং, যাঁর থেকে ক্রমে মন্ত্রেশ্বর, রুদ্র, দেব, মুনি, এবং অবশেষে মনুষ্যগুরু পর্যন্ত এই একই গুরুশক্তি ধাপে ধাপে অবতীর্ণ হন। এই সমগ্র ক্রমকে সংক্ষেপে তিনটি স্তরেও বলা যায় — দিব্যগুরু, সিদ্ধগুরু ও মনুষ্যগুরু — এবং শাস্ত্রই জোর দিয়ে বলে যে এঁরা ভিন্ন ভিন্ন হলেও এঁদের গুরুশক্তি অভিন্ন। সাধারণ যোগ্য শিষ্য মনুষ্যগুরু থেকেই জ্ঞান লাভ করে, কারণ সাক্ষাৎ দিব্যগুরু লাভ করবার অধিকার বিরল। কিন্তু মনুষ্যগুরুর মধ্যে যদি প্রকৃত গুরুতত্ত্বের প্রতিষ্ঠা থাকে — অর্থাৎ তিনি যদি জগৎগুরুর সঙ্গে নিজের অভিন্নতা অনুভব করেন — তাহলে সেই গুরুদেহের মধ্য দিয়েই জগৎগুরুর ক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এইজন্যই লাহিড়ী মহাশয় নিজেকে কখনো স্বতন্ত্র গুরুরূপে জাহির করেননি; তিনি সর্বদা মহাবতার বাবাজীর প্রতি ও সেই অখণ্ড গুরুতত্ত্বের প্রতি সমর্পিত থেকেছেন। এই একই কারণে, প্রতিটি ক্রিয়া-অনুশীলনের শুরুতে গুরুবর্গকে স্মরণ করা নেহাত আনুষ্ঠানিকতা নয় — তা এই অখণ্ড গুরুশক্তির প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে সংযুক্ত করার একটি সচেতন সাধনা।

গুরুর প্রকৃত কাজ কী? শাস্ত্রীয় পরিভাষায় তা হলো জ্ঞাননেত্রের উন্মীলন — অজ্ঞানতিমিরান্ধ শিষ্যের চক্ষু জ্ঞানরূপ অঞ্জনশলাকা দ্বারা উন্মোচন করে দেওয়া, যাতে সে অখণ্ডমণ্ডলাকার চরাচর-ব্যাপী পরমপদ প্রত্যক্ষ করতে পারে। এই কাজ সিদ্ধ হয় গুরুশক্তির দ্বারা, যা ঈশ্বরের নিজেরই শক্তি — আর্ত ও অজ্ঞানী জীবকে উদ্ধার করবার জন্য প্রযুক্ত। তাই চমৎকার, দিব্যদর্শন বা অলৌকিক ঘটনা এসব গুরুতত্ত্বের বহিরঙ্গ প্রকাশ মাত্র, সারবস্তু নয়। প্রকৃত সাধকের কাছে গুরুতত্ত্বের গুরুত্ব এইখানেই নিহিত — মহাবতার বাবাজী দেখতে কেমন, কতদিন দেহ ধারণ করে আছেন, বা কী কী অলৌকিক কাজ করেছেন, তা গৌণ প্রশ্ন; মুখ্য প্রশ্ন হলো, সেই এক অখণ্ড গুরুশক্তি কীভাবে লাহিড়ী মহাশয়ের দেহের মধ্য দিয়ে এবং তাঁর পরবর্তী শিষ্যপরম্পরার মধ্য দিয়ে আজও অবিচ্ছিন্নভাবে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।

কেন? — এই প্রশ্নের উত্তরেই আমরা প্রবেশ করব আমাদের তৃতীয় পর্বে, যেখানে আমরা দেখব ক্রিয়াযোগ কেন গুরুমুখী বিদ্যা, এবং এর পেছনে কী বৈজ্ঞানিক যুক্তি নিহিত আছে।

 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on September 08, 2026 05:20
No comments have been added yet.