তিতুন ও টারজান

 

লীলা মজুমদারের জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোররায়চৌধুরীর ময়মনসিংহের বাড়িতে দুটো হাতি ছিল। একটার নাম যাত্রামঙ্গল আরেকটার নাম কুসুমকলি।যাত্রামঙ্গল মেজাজে ছিল খুব রাশভারি। রাগিও। পান থেকে চুন খসলে তার মেজাজ যেত সপ্তমেচড়ে। নোংরা জিনিস সে মোটেই দেখতে পারতো না, এমনকি পছন্দও করতো না। সবাই যাত্রামঙ্গলকেএকটু সমঝে চলতো। কুসুমকলি ছিল ঠিক তার উলটো। মেজাজেও যেমন শান্ত। তার মুখটাও ছিল খুবমিষ্টি। চোখ দিয়ে মিটিমিটি হাসতো আর মাথার ওপর শুঁড় তুলে প্রনাম করতো। কমলালেবু পেলেখুশি হতো সে।

এগুলো সব তিতুন পড়েছিল বইতে। সেই থেকে তার হাতি দেখার খুব শখ। শীতকালে যখন সিঁথিরমাঠে সার্কাস এসেছিল তখন দূরে গ্যালারি থেকে সে হাতির ফুটবল খেলা দেখেছিল। কিন্তু বাবাবলেছিল, এগুলো ভালো নয়। পৃথিবীর আদিমতম প্রানীদের এইভাবে আটকে রেখে, জোর করে ট্রেনিংদিয়ে খেলা শেখালে পৃথিবীর ভালো হয় না। বরং ঢেড় ক্ষতি হয়। ঠিক কি যে ক্ষতি হয় সেটা সেদিনতিতুন বুঝতে পারেনি। আগেকার দিনের রাজা মহারাজারা তো হাতি পুষতো। যুদ্ধের জন্য ট্রেনিংদেওয়া হতো হাতিকে। তাহলে এখন সার্কাসে দেখালে ক্ষতি কী? বাবা বলেছিল সেগুলোও যে খুবভালো ছিল তা কিন্তু মোটেই নয়। তুমি একটা প্রাকৃতিক শৃঙ্খলকে ভাঙছো। আরও একটু বড় হলেসব আস্তে আস্তে বুঝতে পারবে। 

তিতুনের অবশ্য ভালোই লাগছিল যখন তিনচারটে বড় হাতি আর একটা বাচ্চা হাতি মিলে পা দিয়ে বল মারছিল। শুঁড় দিয়ে লোফালুফি করছিল।কিন্তু খেলা দেখাতে দেখাতে ওদের মধ্যে কেউ একজন একটু ভুল করলেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাদাপোষাকের টুপি পড়া ট্রেনার হাতে ধরা লাঠি দিয়ে মারছিল। সেটা তিতুনের খুব খারাপ লেগেছিল।মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার। ভুল করলে অমন করে মারবে কেন? ব্যাথা লাগেনা বুঝি? ছোট্টবাচ্চা হাতিটা কেমন ভয়ে ভয়ে থাকছিল সেটাও লক্ষ্য করেছিল তিতুন। ওদের হয়তো খেলা দেখাতেতখন ইচ্ছেই করছিল না। মনের ওপর এক আকাশ মেঘ চাপিয়ে মুখ ব্যাজার করে সার্কাসের তাঁবুথেকে বেরিয়ে এসেছিল। ঠিক করেছিল এমন সার্কাস সে আর কোনোদিন দেখবে না।   

তিতুনের মন খারাপ দেখে সেবার বাড়িরসবাই মিলে তাকে নিয়ে চিড়িয়াখানায় গিয়েছিল। শীতটাও তখন বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে। সবাই ভেবেছিলকড়াইশুটির কচুরী, জয়নগরের মোয়া খেতে খেতে দারুন হই হুল্লোড় করা যাবে আর সেই সঙ্গে পিকনিকও।কিন্তু সেখানেও ভালো লাগেনি তিতুনের। এতো ভিড় দেখে তার মনে হয়েছিল সবাই মিলে যেন ঠাকুরদেখতে এসেছে। কেউ কারো ঘাড়ে পড়ে যাচ্ছে। পা মাড়িয়ে ঠেলে ঠুলে চলে যাচ্ছে কেউ। আর সবপশু পাখিরা খাঁচার মধ্যে আটকানো। ওদের দেখে মনে হচ্ছে সবাই কেমন যেন জেলের মধ্যে বন্দি।কারও মনে কোনো আনন্দ নেই। এতো লোকজনকে সামনে হামলে পড়তে দেখে তারাও যেন বেশ খানিকটাঘাবড়ে গেছে। খাঁচার সামনে দাঁড়ালে বাঘটা ঘুরেও দেখলো না। আর দেখবেই বা কেন? বেশ কিছুলোক তাকে নানারকম নামে ডেকে, ভেঙিয়ে বিরক্ত করছিল। সেই যে সে ঘরের মধ্যে ঢুকলো আর বেরোলোনা। কুমীরটা হাঁ করে রোদের দিকে মুখ করে শুয়ে আছে তার আর নড়াচড়ার কোনো লক্ষণ নেই। দূরথেকে দেখে মনে হচ্ছে ধ্যান করছে যেন। এই চিৎকার চেঁচামেচিতে তার কিচ্ছু এসে যায় না।এখানেও সেই হাতির পায়ে শিকল দিয়ে বাঁধা। সে বেচারা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে কেমন যেন দুলেযাচ্ছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন মিউজিক চালিয়ে দিয়েছে আর সে তালে তালে দুলে চলেছে। কলা,ভিজে ছোলা এইসব দিলে চটপট শুঁড় দিয়ে তুলে নিয়ে মুখে পুরে দিচ্ছে।

দাদা কানে কানে বলেছিল এটা হচ্ছে ওদেরএকটা সাংকেতিক ভাষা।

তিতুন জানতে চেয়েছিল কোনটা?

দাদা দেখিয়েছিল, এই যে একই জায়গায়দাঁড়িয়ে বিশাল শরীরটাকে নিয়ে সামনে আর পেছনে ক্রমাগত দুলে যাচ্ছে। কানদুটো পাখার মতোসামনে পেছনে করছে। লক্ষ্য করে দেখেছিস কি শুঁড়টা কেমন একবার মাটিতে ছোঁওয়াচ্ছে আবারতুলে নিচ্ছে। এগুলো দেখে মাহুত হাতিদের মুড বুঝতে পারে। মেজাজ ভালো আছে নাকি খারাপ।তোকে যেমন অঙ্ক করতে দিলে বোঝা যায় ঠিক তেমন। তিতুনের রাগ হয়। দাদাটা না সত্যি সারাক্ষণতিতুনের পেছনে পড়ে থাকে। তার অঙ্ক করতে ভালো লাগে না। ব্যাস। আর অঙ্ক করতে বসলেই সেধৈর্য্য হারিয়ে ফেলে। মেজাজটাও যায় তার খারাপ হয়ে। তাই বলে পৃথিবীর সবচেয়ে আদিমতম প্রানীরসঙ্গে তুলনা? ছোটকা বলেছিল, খারাপ কী? হাতির মতো গায়ের শক্তি আর বুদ্ধি কজনের আছে?

হাতির বুদ্ধিও আছে? অবাক হয় তিতুন।

দাদা বলে সেকি? থাকবে না কেন? পিঁপড়েরযদি বুদ্ধি থাকে ওই টুকুনি মাথাতে তাহলে হাতির মাথাটা একবার ভাব। কতবড়! স্মৃতিশক্তিওভীষণ। যা একবার দেখে সবকিছু মনে রাখে।

এই যে আমাকে দেখলো সেটা মনে রাখবে?জানতে চেয়েছিল তিতুন।

দাদা বলেছিল নিশ্চই রাখবে। এই যে তুইওকে একটা কলা খাওয়ালি সেটাও। ব্রেনখানা যেন একটা বড় হার্ড ডিস্কের মতো। সব ডেটা ফাইলজমা হচ্ছে সেখানে। কত হাজার হাজার বছরের স্মৃতি ওরা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে এক জেনারেশনথেকে আর এক জেনারেশন। তার একটুও যদি মানুষ বুঝতে পারতো রে তাহলে পৃথিবীটা অন্যরকম চেহারানিতো।

তিতুনের তখন এতোসব কিছু ভাবতে ভালোলাগছিল না। চিড়িয়াখানায় একটা প্রাচীন গাছের নীচে বসে সে পরিযায়ী পাখিদের দেখতে দেখতেডিম সেদ্ধ খাচ্ছিল। তারপর কড়াইশুটির কচুরী খেল। আমসত্ত্ব, খেজুরের চাটনি খেল। গোটাতিনেক নলেনগুড়ের সন্দেশ খেল। আর সারাক্ষণ ঘ্যান ঘ্যান করতে থাকলো তাকে সব কিছু আসলদেখাতে হবে। আসল জঙ্গল। আসল হাতি। আসল বাঘ। তাদের খাঁচার মধ্যে থাকলে চলবে না। সার্কাসেওনা। বনের মধ্যে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে হবে। দাদা অমনি মুখ ভেঙিয়ে বললো, গো এজ ইউ লাইক হবেনা? সবাই তোমার নির্দেশ মতো তোমারই সামনে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে আর তুমি হবে কিনা টিচার?যা ওখানে কর্কটা পড়ে গেছে নিয়ে আয়। তিতুন রেগে মেগে কর্ক তো আনলোই না। উঁচু স্লিপটারওপরে গিয়ে মুখ ব্যাজার করে বসে থাকলো। যদিও কেউ তকে খুব একটা পাত্তা দিলো না তখন। বাবা,বাছা করে তুই কত ভালো বলে সেই স্লিপ থেকে নামিয়েও আনলো না। বরং সবাই মিলে শীতের রোদেব্যাটমিন্টন খেলতে শুরু করে দিল। আর খেলতে খেলতেই চুপি চুপি তারা প্ল্যান করলো তিতুনযা চাইছে তা অবশ্যই তাকে একদিন দেখাতে হবে। কিন্তু কবে? কী করে? সেটা তারা তখনই চিড়িয়াখানায়বসে ঠিক করতে পারেনি। তবে সেই সুযোগ এসে গেল খুব তাড়াতাড়ি।

সেবার শীতের শেষে, ভরা বসন্তে স্কুলেরপরীক্ষা শেষ হবার পরদিনই তিতুন বড় মামার চিঠি পেলো চিলাপাতার জঙ্গল থেকে।

স্নেহের তিতুন,

           আশা করি পরীক্ষা দিয়ে ভালোই আছিস তুই।টেনশানে পেট খারাপ হয়নি তো এবার? আর মাঝে মাঝেই তোর সেই রেগে যাওয়া? ধরে নিলাম হয়নি।দিব্যি পরীক্ষা দিয়েছিস আর স্কুলের বাসে হইচই করতে করতে বাড়ি ফিরেছিস। এবার আসি তাহলেএক্কেবারে কাজের কথায়। আমি এখন চিলাপাতায় পোষ্টিং হয়েছি। রোজ আপিসে যাওয়ার পথে হাতিদেখি। সেগুলো সবই অবশ্য বন দপ্তরের ট্রেনিং প্রাপ্ত কর্মচারী। আমার মতোই ওদের ঠিক নিয়মমেনে অফিসের কাজ করতে হয়। সরকার তাদের মাসের শেষে মাইনেও দেয়। এমনকি পেনশনও আছে ওদের।না হলে বুড়ো বয়সে খাবে কী? জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে খাবার অভ্যেস যে নষ্ট হয়ে গেছে। আমরাইঅবশ্য তার জন্য দায়ী। তবে জঙ্গলের হাতিকেও সংরক্ষণ করা হচ্ছে খুব কঠোর কঠিন নিয়ম কানুনমেনে। সেসব না হয় তুই যখন আসবি তখন বিস্তারিত ভাবে বলবো। তার আগে তোকে একটা মজার ঘটনারকথা বলি।

সেদিন হয়েছে কি, রাত তখন কটা বাজেঠিক জানি না। হাতের কাছে ঘড়িখানা নেই। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। জানলার একটা পাল্লাহয়তো হাওয়াতেই খুলে গিয়েছিল। সেটা খুট খুট করে নড়ছে। জল ঢুকে যাওয়ার ভয়ে বন্ধ করতেগিয়ে দেখি, আমার বাংলোর বাইরে যে চালতে গাছটা আছে সেখানে দুটো হাতি চুপচাপ মুখোমুখিদাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজছে। ওদের ভালোভাবে দেখবো বলে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কতরাত পর্যন্তবারান্দায় বসে বসে ওদের দেখলাম। ওরা একটুও নড়লো না। চড়লো না। আওয়াজ করলো না। হয়তো ওদেরবৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগছিল জানিস। ছবি তুলতে ইচ্ছে করলেও তুলিনি। পাছে ওদের ডিসটার্বহয়। সেই সময় তোর কথা বারবার মনে পড়ছিল। ইশ তিতুন যদি থাকতো এখানে তাহলে কি ভালোটাইনা হতো। কত হাতি দেখতে পেত। আসবি নাকি একবার চিলাপাতায় হাতি দেখতে? সেরকম যদি ইচ্ছেরজোর রাখতে পারিস মনে তাহলে হয়তো চিতা বাঘের পরিবারের সঙ্গেও দেখা হয়ে যেতে পারে তোর।আর কার কার সঙ্গে দেখা হবে সেই লিস্ট না হয় এখানে ঘোরাঘুরি করেই তৈরি করিস। চলে আয়চটপট আমার কাছে। ভালো থাকিস।

ইতি

মামা।

সারাদিন ধরে কত কত বার যে তিতুন চিঠিখানাপড়লো তার কোন ঠিক ঠিকানা রইলো না। চোখ বন্ধ করলেই যেন সে দেখতে পেল একটা জঙ্গল। সেখানেঘুরে বেড়াচ্ছে হাতি, চিতাবাঘ, ময়ূর, খরগোশ সবাই। ডালে ডালে কত পাখি। ওই বুঝি ছুট্টেচলে গেল হরিণ। মনে হল চিঠিখানা যেন জঙ্গলের নিমন্ত্রণ বয়ে নিয়ে এসেছে তার কাছে। আরসবাই মিলে ডাকছে চলে আয় তিতুন, খুব তাড়াতাড়ি আমাদের কাছে চলে আয়। কিন্তু যাওয়া বললেইকি আর যাওয়া? সামনে দাদার পরীক্ষা আছে। বাবার আপিসে প্রচুর কাজ। ছুটি পাবে না মোটেই।বাবা, দাদা না গেলে মায়েরও যাওয়া হবে না। বাড়িতে ওদের দেখবে কে? তাহলে তিতুন কী করবেএবার? তার যে একটা নেমনতন্নের চিঠি এসেছে জঙ্গল থেকে তারবেলা? মেঝেতে বসে পা ছড়িয়েকান্না পেল তার। বায়না বেড়ে গেল চতুর্গুণ। খিটখিটে হয়ে গেল তিতুন। পরীক্ষা শেষের আনন্দটাইকেমন যেন মাটি হয়ে গেল।

দাদা বললো, চিলাপাতা কোথায় তুই কিজানিস? কেন জানবে না তিতুন? অতো বোকা ভাবো নাকি তোমরা তাকে? ডুয়ার্সের জঙ্গল সে কিজানে না? একবার চিলাপাতা যদি সে যেতে পারে তাহলে অবশ্যই ঘুরে আসবে ওখান থেকে বক্সারজঙ্গলে। ওই রাস্তার ওপরেই পড়বে জলদাপাড়া। আরও খানিকটা এগিয়ে গেলে গরুমারা। সেবার ঝিমলিরাসবাই বেড়াতে গেল না। কত কত ছবি তুলে নিয়ে এসেছিল। দেখিয়েছিল তিতুনকে সব। হাতির পিঠেচেপে ভোরবেলায় ওরা সবাই মিলে জঙ্গল দেখতে বেরিয়েছিল। সেখানে গন্ডার দেখেছিল। হরিণ দেখেছিল।এমনকি একটা সাপ এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছিল শুকনো ঘাসের ঝোপে।

দাদা বললো সেসব তো পরেও থাকবে। জঙ্গলতো আর উবে যাবে না রাতারাতি। সবাই মিলে তখন না হয় যাওয়া যাবে।

ছোটকা শুধু একমাত্র তিতুনের পক্ষ নিলো।কড়া ধমক দিলো দাদাকে। উবেই তো যাচ্ছে জঙ্গলগুলো রাতারাতি। সবাই সব জায়গায় শুধু বড় বড়বাড়ি করবে, রাস্তা বানাবে আর কল কারখানা গড়বে। দেখতে পাচ্ছিস না কি হারে সব প্রাকৃতিকজিনিস নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তুই কোনো চিন্তা করিস না তিতুন। আমি তোকে বড়মামার কাছে দিয়েআসবো তোর বাবা আর মায়ের যদি কোনো আপত্তি না থাকে তবেই।

বাবা, মা কোন আপত্তি তো করলোই না বরংযেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। যাক তাহলে তিতুন অন্তত জঙ্গলটা দেখতে পাবে এবং তারসঙ্গে ছেলেটারপরীক্ষার পর হাওয়া বদল ঘটবে ভেবে। কিন্তু মুশকিলটা হলো ছোটকার নতুন চাকরি। সেখান থেকেতার ছুটি পাওয়া ভীষণ মুশকিলের। তাও সবাইকে বলে কয়ে একদিনের ছুটি ম্যানেজ করেছে সে।কাজেই তার তিতুনের সঙ্গে মোটেই জঙ্গলে থাকা হবে না। তিতুনকে দিয়েই চলে আসতে হবে। সেইসবদেখে শুনে মা বললো এতো কষ্ট করে যাবে কাকা, কোন মানেই হয় না। তিতুন তুই অমন মিছে মিছেবায়না করিস নাতো। পরেই না হয় সবার সঙ্গে যাস। কিন্তু তিতুন এক নাছোড় জেদ ধরেছে। তাকেজঙ্গলে যেতেই হবে। ছোটকা কিন্তু তার সেই বিখ্যাত মিষ্টি মিষ্টি হাসি হাসি মুখ নিয়েবললো, তুমি খামোকা ওকে বকছো বৌদি। আমার কোনো কষ্টই হবে না। কিন্তু তিতুনের কাছে আমারএকটা শর্ত থাকবে।

শর্ত? মানে কন্ডিশন? তিতুন চোখ গোলগোল করে জানতে চায়।

কাকা বলে ইয়েস।   

এই খাতাটায় প্রত্যেকদিন লিখতে হবেতুই সারাদিন ধরে কী দেখলি, কী করলি সবটা গল্পের মতো করে। আমি যেতে পারবো নাতো তাই তুইযখন বাড়ি আসবি তখন সেটা পড়বো। ছোটকা এগিয়ে দেয় সুন্দর দেখতে নোটখাতা আর একটা নীল রঙেরকালি পেন। যে পেনে এর আগে কোনোদিন লেখেনি তিতুন।

কালী ভরে তবেই লেখা যায়। শিখিয়ে দেবোতোকে। লিখবি তো? জানতে চেয়েছিল কাকা খুব সিরিয়াস ভাবেই।

তারমানে তুমি আমাকে পরীক্ষার পরেও,বেড়াতে গিয়েও সেই পড়াশুনোটাই করতে বলছো তো? তিতুন ভুরু কুঁচকে জানতে চায়।

ছোটকা ঘাড় নেড়ে বলে মোটেই না। এটাপড়াশুনো কোথায়? এটা তো গল্প লেখা। আসলে তোর চোখ দিয়ে আমরা পুরো জঙ্গলটা দেখবো। আর শুধুআমিই বা কেন? দাদা দেখবে, মা দেখবে, বাবা আপিস যেতে যেতে দেখবে। স্কুলের টিফিনে বন্ধুদেরসেই খাতা থেকে পড়ে শোনালে তারাও দেখতে পাবে। তখন তোর দেখাটা আর একার থাকবে না সবারদেখা হয়ে যাবে। কি বলেছিলাম, আনন্দ ভাগ করে নিলে কী হয়?

অনেক অনেক বেড়ে যায়। এই এত্তো? তিতুনদুই হাত তুলে পরিমানটা দেখায়।

তখন মজা লাগে না? ছোটকা জানতে চায়।

খুব মজা। ঠিক যেমন গল্পের বই পড়লেহয় তেমন।

তাহলে?

লিখবো ছোটকা। নিশ্চই লিখবো। সবার জন্য।তিতুন প্রমিস করে।

এমন ভাবে আগে কোনোদিন সে ভাবেনি। সত্যিইতো তার গল্প বলতে ভালোলাগে। গল্প করতেও। এমন কতদিন হয়েছে গল্প বলার ক্লাসে শুধু তিতুনইগল্প বলে গেছে দিনের পর দিন। তিতুনের গল্প শুনতে পারলে বন্ধুরাও খুশি হয়। ব্যাগ গোছানোরসময় তিতুন তার অনেক কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসের সঙ্গে ছোটকার দেওয়া সুন্দর খাতাটা আর নীলরঙেরকালি পেনটা নিতে ভুললো না। তারসঙ্গে হলুদ রঙের ছোট্ট চৌকো প্যাকেটে ভরা কালির দোয়াত।সেটা দেখে ঝিমলি খুব বায়না ধরেছিল। ছোটকা তাকেও একটা কিনে দেবে বলেছে। খুশি হয়ে ঝিমলিবলেছে তিতুনের ছোটকার মতো ভালো মানুষ আর হয় না। সেটা শুনে ছোটকাও খুব খুশি হয়েছে। 


আস্তে আস্তে তিতুনের চিলাপাতায় যাওয়ারদিন এগিয়ে এলো। এর আগে তিতুন কোনোদিন এইভাবে হুট করে বেড়াতে যায়নি। তাদের বেড়াতে যাওয়ারপ্ল্যান হতো সারা বছর ধরে। কোথায় যাওয়া হবে? কে কে যাবে? কোথায় কোথায় থাকা হবে? কিকি খাওয়া হবে সব কিছু নিয়ে আগে থেকে চলতো আলাপ-আলোচনা, মিটিং আর তারসঙ্গে ফাউ হিসেবেইটিং তো থাকতোই। বাবা, মা, দাদা, ছোটকা, পিসি, মাসিরা সবাই মিলে একটা বড় ফুটবল টিমেরমতো হতো। ট্রেনে উঠলে প্রায় একটা গোটা কামরা ভর্তি করে দিত তিতুনরা সবাই মিলে। ক্যালোরব্যালোর, চিৎকার চেঁচামেচিতে কান পাতা যেত না। কার সুটকেস পাওয়া যাচ্ছে না। কার ব্যাগসিটের তলায় ঢুকে গিয়েছে। কে জানলার ধারে সিট পায়নি, কার আবার ট্রেনে উঠলে বমি পায় সেসবকত কি বলে শেষ করা যাবে না। কিন্তু এবার সেসব হওয়ার নয়।

রাতের দার্জিলিং মেল যখন শিয়ালদহ স্টেশনছাড়লো তখন এই প্রথম কেমন যেন মনটা হুহু করে উঠলো তিতুনের। চোখটা একটু ছলছল করে উঠলো।সত্যি কি সে একটু বেশি বায়না করে ফেললো? কিন্তু ট্রেন যত স্পিড নিল, রাতে যখন ছোটকামায়ের গুছিয়ে দেওয়া টিফিন কৌটো খুলে তার থেকে লুচি, আলুরদম, ফিসফ্রাই বের করতে লাগলোতিতুনের মন খারাপটাও আস্তে আস্তে কোথায় যেন হারিয়ে গেল। পেটপুরে লুচি, আলুরদম, ফিসফ্রাইখেয়ে শেষপাতে পেল্লাই সাইজের একটা জলভরা সন্দেশ চোখ বন্ধ করে চিবোতে চিবোতে তিতুনেরঘুম পেল। তাকে ছোটকা মাঝের বাঙ্কে শুতে বলেছিল বাইচান্স যদি তিতুন পড়ে যায়। কিন্তুতিতুন কি আর অতো ছোট আছে? দেখছো না সে কেমন নিজেই একা একা বেড়াতে যাচ্ছে। এক সপ্তাহএকা একা থেকে আবার ফিরে আসবে। তাই সে সবচেয়ে ওপরের বাঙ্কেই উঠলো। ছোটকা কোলে করে ঠেলেতুলে দিতে চেয়েছিল কিন্তু তিতুন নিজেই বাঙ্কের পাশের সিঁড়ির মতো মই দিয়ে তরতর করে উঠেগেল। তাই না দেখে ছোটকা মজা করে বললো এই তো তুই কেমন জঙ্গলে যাওয়ার আগে এক্কেবারে শিম্পাঞ্জীহয়ে যাচ্ছিস। তাহলে আমাদের আর কোনো চিন্তাই রইলো না কি বল তিতুন? তিতুন কাকার কথারকোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মুচকি হাসলো। মাথার ওপর রিডিং ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিয়ে, পায়েরওপর সাদা চাদরটা টেনে নিয়ে প্রমদারঞ্জন রায়ের লেখা বনের খবর পড়তে শুরু করলো। এটা তারবরাবরের অভ্যেস। খানিকটা পড়ার পর ট্রেনের দুলুনিতে ঘুম আসতে মোটেই দেরী হলো না তার।

ঘুমের মধ্যে তিতুন একটা স্বপ্ন দেখলো।চিলাপাতার গভীর জঙ্গলে সে হারিয়ে গেছে। কিছুতেই সে হোটেলে ফিরে যেতে পারছে না। চারিদিকথেকে ঘিরে ধরছে তাকে অসংখ্য জোনাকি। তাদের টিমটিম করা জ্বলা আলোয় তিতুন দেখলো সামনেদাঁড়িয়ে আছে একটা বিশাল হাতি। যার দুটো দাঁত চাঁদের আলোয় ঝকমক করছে। হাতিটা শুড় বাড়িয়েতাকে ছুঁতে গেলেই তিতুনের ঘুম ভেঙে গেল। আর সে দেখলো ছোটকা কখন উঠে পড়েছে। ট্রেন নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে ঢুকছে।

বড়মামা বেশ কিছুক্ষণ আগেই স্টেশনেএসে অপেক্ষা করছিল। ছোটকা ওই সকালবেলা বড় মামার কাছে তিতুনকে দিয়ে চলে গেল শিলিগুড়িরদেশবন্ধু পাড়ায় তার এক বন্ধুর বাড়ি। সেখান থেকে রাতের ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরবে। এবার সত্যিকেমন যেন ঝপ করে মন খারাপ হয়ে গেল তিতুনের। এই বেড়ানোটাই কি সে চাইছিল? মোটেই না। একাএকা কার ভালো লাগে? যাইহোক একবার যখন সে জঙ্গলের মধ্যে হাতি দেখবে বলে বায়না করেছেতখন আর কি করা যাবে? তিতুনের শুকনো মুখ দেখে মামা জানতে চাইলো কী রে মন খারাপ করছেবুঝি? তিতুন বললো একটু একটু। মামা বললো চল তাহলে তোর মন ভালো করে দিচ্ছি। জিপে একদমসামনের সিটে বসলো তিতুন। মামা নিজেই ড্রাইভ করছে। তার ছোটবেলা থেকে খুব ইচ্ছে ছিল জঙ্গলেরমধ্যে থাকবে। জীবজন্তুদের নিয়ে কাজ করবে। তারপর সেইমতো কত কত পড়াশুনো করে, কত কত পরীক্ষাদিয়ে পাশ করে এখন ফরেস্ট অফিসার হয়েছে। একাই থাকে। শিলিগুড়িতে অফিসের কি কাজ ছিল তাইআগের দিন রাতে এসেছে। তিতুনদেরও সেই কারণেই নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে নামতে বলেছিল। নাহলে কাঞ্চনকন্যায় আসলে তারা এখানে মোটেই নামতো না আরও খানিকটা এগিয়ে যেতে পারতো। তবেএন জি পি থেকে যাওয়াটাও মজার। একবার ট্রেন থেকে নেমে ফ্লাইওভার দিয়ে বাইরে আসলেই হলো।ড্রাইভাররা ঘিরে ধরবে। দার্জিলিং যাবে? কালিম্পং? মিরিক? সিকিম? কত কত জায়গার যে নামবলবে তারা। মনে হবে সেই সব জায়গায় যদি যাওয়া যেত কি মজাটাই না হতো তাহলে। তবে এইসবভাবনা দূরে সরিয়ে দিয়ে তারা এখন যাবে চিলাপাতা। সেটাও তো অনেকটা রাস্তা। কিন্তু একটুপরেই গাড়ির জানলার ধারের দৃশ্যগুলো পালটে যেতে থাকলো। নদী, চা বাগান দেখতে দেখতে তিতুনেরমন ভালো হয়ে গেল। আরও ভালো হলো যখন বড় মামা রাস্তার পাশের দোকান থেকে তিতুনকে স্টিমমোমো খাওয়ালো।

রাস্তার চারপাশে ধানক্ষেত, গ্রাম,নদী দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিল তিতুন সে নিজেও জানে না। হঠাৎ গালের ওপরে নরমনরম কিসের ছোঁওয়া, আর ফোঁস ফোঁস আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল তার। চোখ খুলতেই সে দেখলো একটালম্বা শুঁড় তার গালের ওপরে, মাথার ওপরে হাত বোলানোর মতো করে আদর করছে। তিড়িং করে লাফিয়েউঠে বসলো তিতুন, দেখলো গাড়ির জানলার বাইরে একটা বড় হাতি। তার ইয়াবড় দুটো দাঁত। মিটিমিটিচোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আর অন্য কোনো কিছুই সে করছে না। আসেপাশে বড়মামাকে দেখতেপেলো না তিতুন। একটু একটু ভয় করতে লাগলো তার। সার্কাসে সে হাতি দেখেছে, চিড়িয়ানাখানায়কলা খাইয়েছে হাতিকে। কিন্তু তারসঙ্গে তখন লোকজন ছিল। আর এমন ভাবে তারা শুঁড় বুলিয়েওদেয়নি তাকে। কিছু কি বলতে চাইছে হাতিটা? তেড়ে আসবে না তো? তেড়ে আসার হলে আগেই সেটাকরতো। এইভাবে শুঁড় বুলিয়ে ঘুম থেকে ডাকতো না। যখন সে ভাবছে এইবার বড়মামাকে ডাকবে কিনাতখনই সেই হাতির পাশ থেকে বেরিয়ে বললো, কীরে? ভয় পেয়ে গেলি নাকি তিতুন? টারজান তোকেদেখতে এসেছে। কালই বলে রেখেছিলাম ওকে। তুই আসছিস সেই কলকাতা থেকে। আয় আয় গাড়ি থেকেনাম। বন্ধুত্ত্ব কর টারজানের সঙ্গে।

গাড়ি থেকে নামবে কি সেই দশাসই চেহারারহাতি, যার নাম টারজান সেই তো পথ আটকে আছে। কোথা থেকে বেঁটে খাটো ফর্সা একটা লোক টারজানেরগায়ে হাত দিয়ে বললো, পিছে পিছে। অমনি টারজান একটু পেছন দিকে সরে এসে তিতুনকে গাড়ি থেকেনামার জায়গা করে দিলো। পরে তিতুন জেনেছিল এই লোকটার নাম রামদাস রাভা। টারজানের মাহুত।যে আসলে টারজানের দেখাশুনো করে। তাকে যত্ন নেয়। খাওয়ায়। আর তার একজন সহকারী আছে চিরু।যে টারজানের জন্য কলাগাছ, ঘাস এইসব নিয়ে আসে। জঙ্গলে তাকে বলা হয় পাতাওয়ালা। একটু ভয়েভয়েই গাড়ি থেকে নামলো তিতুন। আর যেই না গাড়ি থেকে নামা অমনি আবার তিতুনের মাথায় শুঁড়বুলিয়ে দিল টারজান। যেন কতদিন আগে থেকে চেনে। তিতুনকে দেখে যেন তার ভারী ভালো লেগেছে।

বড়মামা তিতুনের কাছে এসে বললো, এমনিএমনি বন্ধুত্ত্ব করলে হবে না কিন্তু তিতুন। টারজান কলা খেতে ভালোবাসে। তারসঙ্গে সোনপাঁপড়িও।গাড়ি থেকে সোনপাঁপড়ির প্যাকেটটা বের কর। তিতুনের ততক্ষণে ভয় কেটে গেছে। তিতুন গাড়িথেকে সোনপাপড়ি বের করে যেই টারজানকে দিলো সে অমনি কপাত করে শুঁড় দিয়ে ধরে মুখে চালানকরলো। আরও খাওয়ার জন্য শুঁড় বাড়িয়ে বায়না করতে লাগলো। মামা বললো, আজ আর নয় টারজান।কাল যখন তিতুন তোমার পিঠে করে কোদাল বস্তি, সিসি লাইন, রাভা বস্তি ঘুরে দেখবে তখন খেয়ো।টারজানও কেমন বাধ্য ছেলের মতো শুঁড় উঁচিয়ে সেলাম ঠুকে মাথা দোলাতে দোলাতে গলায় বাঁধাঘন্টা টুং, টাং করে বাজাতে বাজাতে চলে গেল নিজের আস্তানায়। ততক্ষণে তিতুন জেনে নিয়েছেহাতিদের থাকার জায়গাকে পিলখানা বলে।

সেদিন রাতে ঝেঁপে বৃষ্টি এলো। এর আগেশহরের বৃষ্টি দেখেছে তিতুন। পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে সেখানকার বৃষ্টি। এমনকি গত বছরে সমুদ্রেবেড়াতে গিয়ে সেই বৃষ্টিও দেখেছে। কিন্তু জঙ্গলের বৃষ্টি এই প্রথম। তারসঙ্গে কড় কড় করেবাজ পড়ার আওয়াজ। মামার কাঠের বাংলোর চারপাশে ঘন জঙ্গলে ঘেরা। সেই জঙ্গলে নানা রকম গাছেরপাতায় বৃষ্টির আওয়াজ শুনতে শুনতে তিতুন দেশী মুরগীর ঝোল দিয়ে রুটি খেলো। মামার পাশেশুয়ে শুনলো টারজানের গল্প। এই টারজান সেই বইয়ের টারজান নয়। যে আসলে তার বাবা-মায়েরথেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বনের মধ্যে মানুষ হয়েছিল পশু পাখিদের মধ্যে। অনেকটা ঠিক মোগলিরমতোই। মামা আসলে যে টারজানের গল্প শোনাতে শুরু করলো তারসঙ্গে কয়েক ঘন্টা আগেই বন্ধুত্ত্বহয়েছে তিতুনের।

তাও সে প্রায় সাত-আট বছর আগেরকার কথাবুঝলি তিতুন। বলতে শুরু করলো মামা। সেবার খুব বর্ষা। উত্তরবঙ্গের প্রায় সব নদী ফুলেফেঁপে উঠেছে। বন্যার অবস্থা প্রায়। আর এইরকম অবস্থায় জঙ্গলের ওপর আরও বেশি করে নজররাখতে হয় আমাদের। কারণ বন্যা হলে মানুষের মতোই পশু পাখিদের দুর্গতির আর শেষ থাকে না।বাড়ি-ঘরের মতো ভেসে যায় জঙ্গলও। সারা রাত ওয়াচ টাওয়ারে বসে নজর রাখতে হয়। কোনো পশুপাখির অসুবিধে হচ্ছে কিনা। কেউ বিপদে পড়লো কিনা।  হাতিরা তো একজায়গায় বেশি দিন থাকে না। একটা জায়গারখাবার ফুরিয়ে গেলেই ওরা আবার অন্য একটা জায়গায় চলে যায়। এইভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়। সেইকতদিন আগে থেকে মানুষের জন্মানোর বহু বহু আগে। আর মজার কথা কি জানিস তিতুন হাতিদেরএই খাবার জোগাড় করার যে স্মৃতি তারা কিন্তু তাদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলেছে।তারা ঠিক জানে কোথায় তাদের খাবার জল, স্নান করার জল, উপযুক্ত খাবার পাওয়া যায়। কিন্তুমুশকিল হলো আমরা তাদের সেইসব জায়গাগুলো নষ্ট করে ফেলছি। তাদের যাওয়ার রাস্তায় আমরারেল লাইন বসিয়েছি। রাস্তা তৈরী করে দিয়েছি। কোথাও চা বাগান হয়েছে। বড় বড় বাড়ি তৈরিকরে ফেলেছি। আকাশচুম্বী ইলেকট্রিক টাওয়ার বসিয়েছি। এর ফলে ওরা দিন দিন বিপন্ন হয়েছে।ওদের খাবার গেছে কমে। ওদের থাকার জায়গাও বিলুপ্ত। নেই বললেই চলে। অত বড় প্রানী। জায়গাওতো কম লাগে না। একটু নিজেদের মতো করে থাকবে সেই উপায়ও কি রেখেছি আমরা?

তিতুনের কেমন যেন মন খারাপ হয়ে যায়আবার। এবার তাহলে কী করবে ওরা?

মামা বললো, কষ্ট পাচ্ছে। অথচ ভেবেদেখ ওরা কিন্তু খুব সুশৃঙ্খলিত। পরিবার নিয়ে বসবাস করে ঠিক আমাদেরই মতো। আর সেই পরিবারেরযিনি প্রধান তিনি হন একজন মহিলা হাতি। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ওদের। সেই বিচক্ষণ প্রাজ্ঞমহিলা হাতির দায়িত্ত্বেই সবাই থাকে। তিনিই নির্দেশ দেন কোথায় যাওয়া হবে। কারা কারাদলে থাকবে। সেইরকমই খাবারের সন্ধানে যখন তারা একটা জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যাচ্ছিলতখনই তিস্তার খরস্রোতায় রাতের অন্ধকারে একটা বাচ্চা হাতি ভেসে যায়। অনেক ভোরে ওয়াচটাওয়ারে যে ফরেস্ট গার্ডরা ডিউটি দিচ্ছিলেন তাঁরা দেখেন দূরে নদী দিয়ে কালো মতো কিভেসে যাচ্ছে। চটপট দূরবীন চোখে লাগিয়ে তাঁরা বুঝতে পারেন আসলেই ওটা হাতির শুড়। জলেরওপরে ওঠানো। তার পিঠটা শুধু দেখা যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিন চার জন মিলে বড় দড়ি নিয়েঝাঁপিয়ে পড়ে সেই খরস্রোতা নদীতে। কোনো রকমে উদ্ধার করা হয় একটা হাতির বাচ্চাকে। তারতো তখন সারা রাত বৃষ্টিতে ভিজে, জলে চুবে, ভয়ে কাহিল অবস্থা। শীতে ঠক ঠক করে কাঁপছে।

তখন তাকে কী করা হলো? ঘুম-টুম উবেগিয়ে গোল গোল চোখ করে তিতুন জানতে চায়।

কী আবার করা হবে? ভালো করে মোছা হলোতার গা। কম্বল দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। আর একটা লম্বা পাইপে করে এক বালতি দুধ খাওয়ানোহলো তাকে। তারপর সে রয়ে গেল আমাদের কাছে। আদর করে নাম দেওয়া হলো টারজান। কেন বলতো টারজান?

কেন? আমার মতোই খুব ছটফট করতো বলে?তিতুনের কথায় মামা হেসে ফেলে।

ঠিক বলেছিস। তোর মতো ছটফটে ছিল টারজান।সেবারে জলদাপাড়ার পিলখানায় এক বিদেশী পর্যটক এলেন ফটো তুলতে। খুব নাম করা তিনি। হাতিদেরনিয়ে কাজও করেছেন পৃথিবী ঘুরে ঘুরে। বেশ কয়েকটা বই আছে তাঁর। আমরা আগে থেকেই সাবধানকরে দিয়েছিলাম যে পিলখানায় কয়েকটা বাচ্চা আছে তারা কিন্তু ভীষণ দুষ্টু। তা ভদ্রলোকতো ছবি তুলতে শুরু করলেন। আর বেশি ছবি তুলতে লাগলেন বাচ্চা হাতিগুলোর। প্রথমে তারাকিছুই বলছিল না। কিন্তু একটা সময় হলো কি উনি একটু আদর করতে গেলেন তাদের। আর যায় কোথায়।ব্যাস ওরাও মজা পেয়ে গেল। তারমধ্যে একজন অতি উৎসাহে তার পায়ের ওপর একটা পা তুলে দিলো।কোলে উঠতে চায় যেন। এবার হাতির পা বলে কথা। কোথায় হাতির পা বলে কথা। গেল একটা আঙুলভেঙে সাহেবের। ওরা যে ইচ্ছে করে এটা করেছিল তা নয়। মজা করতে করতে লেগে গিয়েছিল। সেইদুষ্টু বাচ্চা হাতিটা কে বলতো?

তিতুন চটপট জবাব দিলো- কেন টারজান।

মামা বললো ঠিক বলেছিস।

কিন্তু তোমরা টারজানকে ওর মায়ের কাছেফেরত দিয়ে এলে না কেন? তিতুন জানতে চায়। ওকে তো মায়ের কাছে দিয়ে এলেই আর কোনো কষ্টহতো না। খুব ভালো ভাবে থাকতে পারতো।

তিতুনের প্রশ্নের জবাবে বড়মামা বললো,তার মা ঠিক কে সেটা খুঁজে বের করা মুশকিল ছিল। তবে আমরা খোঁজার চেষ্টা করেছিলাম। বেশকিছুদিন। কিন্তু পাওয়া যায়নি। এমন অনেকবার আগেও হয়েছে। ভেসে আসা বাচ্চা হাতির দলকেট্রেস করা যায়নি। আর যাদের গেছে, খুঁজে পেতে সেই হাতির দলের কাছে বাচ্চা রেখে এলেওদল যে তাকে ফিরিয়ে নেবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেই দল তাকে আরফেরত নেয়নি। কারণ ততদিনে তার গায়ে মানুষের গন্ধ লেগেছে। সে এক অন্য জীবন যাত্রায় অভ্যস্তহয়ে পড়েছে। এইরকম কত কত হাতি যে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট উদ্ধার করেছে তার কোনো ঠিক ঠিকানানেই। এইসব হাতিরাই বনের মধ্যে বন দপ্তরের হয়ে কাজ করে। পর্যটকদের ঘোরায়। রাতে ফরেস্টগার্ডদের সঙ্গে বন পাহাড়া দেয়। তাছাড়া কারোর ক্ষেতে বনের হাতি ঢুকে পড়লে তাদের তাড়ায়।অনেক অনেক কাজ করে। মাথায় রাখিস আমরা কিন্তু কোনো হাতি ধরিনা। সেটা আইনত দন্ডনীয় অপরাধ।নে এবার শুয়ে পড়। কাল ভোর বেলায় টারজান আসবে। তোকে ঘোরাতে নিয়ে যাবে। পৃথিবীর প্রাচীনতমপ্রানীটির সঙ্গে তোর যদি খুব ভালো বন্ধু হয়ে যায় তিতুন, তাহলে দেখবি কি আনন্দ লাগছে।আর কত কি জানতে পারছিস। মামা ঘরের লাইট নিভিয়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুলো। কিন্তু তিতুনেরঘুম আসতে চাইলো না। এই প্রথম সে হাতির পিঠে চড়বে। সেটা কম কথা নাকি? বৃষ্টিটা একটুথেমে যেতেই কানে তালা দেওয়ার মতো ঝিঁঝি ডাকতে শুরু করলো। সেই ঝিম ধরা ঝিঁঝির আওয়াজেকখন যে ঘুমিয়ে পড়লো তিতুন নিজেই বুঝতে পারলো না।

ভোর বেলায় টুং টুং ঘন্টার আওয়াজে ঘুমভেঙে গেল তিতুনের। টারজান এসে পড়েছে। তারসঙ্গে মাহুত রামদাসও। তিতুনও তাড়াতাড়ি একটাজ্যাকেট পরে বেরিয়ে এলো। কারণ ভোরবেলায় বেশ শীত ছিল। টারজান তিতুনকে দেখেই শুঁড় বাড়িয়েদিলো।

কি বলছে বল তো টারজান তোকে? মামা মুচকিহেসে জানতে চাইলো।

তিতুন বললো সোনপাপড়ি। কিন্তু সক্কালবেলাউঠে সোনপাপড়ি খাওয়া ভালো নয় টারজান। তুমি কলা খাও। তিতুন এক ছড়া পাকা কাঁঠালি কলা খাওয়ালোটারজানকে। সেই কলা খেয়ে কি খুশি টারজান। আবার তিতুনের মাথায় শুঁড় বুলিয়ে আদর করে দিল।

টারজানের পিঠে উঠতে তিতুনের মোটেইকষ্ট হল না। বসার জায়গাটা পিঠের ওপরে বস্তা দিয়ে গদি করা। সেই গদিটা আবার টারজানেরপিঠ বরাবর এসে পেটের তলা দিয়ে বাঁধা। ওই দড়িটা ধরেই তিতুন ট্রেনের কামরায় যেমন ওপরেরবাঙ্কারে উঠেছিল তেমন উঠে পড়লো। সামনে মাহুত রামদাস। আর পেছনে তিতুন।

টারজানের পিঠে চড়ে তিতুন গভীর জঙ্গলদেখলো। কত কত পাখি, কত রকমের গাছ, খরগোশ, ময়ূর, হরিণ এমনকি চিতাবাঘও। চুপটি করে বাঘটাগাছের ডালে বসেছিল। তিতুনদের দেখে ঝাঁপ মেরে পালালো। মাহুত রামদাস তাকে নিয়ে গিয়েছিলকোদাল বস্তি, রাভা পাড়া, মেচ পাড়া। যেখানেই টারজান যাচ্ছিল সেখানেই সবাই তাকে খেতেদিচ্ছিল। আদর করছিল। যেন মনে হচ্ছিল টারজান তাদের ঘরের ছেলে। এরপর তিতুন একদিন সারারাত টঙেও ক
 •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on August 10, 2025 02:23
No comments have been added yet.