পাসপোর্ট সাইজের ছবি
হারানো প্রাপ্তি নিরুদ্দেশে খবর নিতে গিয়ে হোঁচট খেতে হলো। গুগুল সার্চ বললো আহাম্মক! জানো না তখনও আমার জন্ম হয়নি। একটা ছবি ধরিয়ে দিলেই হলো? তাই তো। ছবিটা যাঁর তখন তিনি কলেজের ফাস্ট ইয়ার। ঊনিশশো তিরানব্বই। বাংলা অনার্সে রোল নাম্বার বারো। আর সিনে সেন্ট্রালের কার্ড নাম্বার ৩৯২৭। গোঁফটা একটু পুরুষ্টু করে রাখতে হয়েছিল না হলে নন্দনে, সরলা মেমোরিয়ালে, নিউ এম্পায়ারে ক্লাবের শোতে ঢুকতে দিতো না দ্বাররক্ষী। কার্ডে ছবি থাকলেও নানা রকমের প্রশ্ন আর কড়া চোখে তাকানো ছিলই। ভাবটা এমন বয়েস ভাঁড়িয়ে এ্যাডাল্ট ছবি দেখতে এসেছে। অসভ্য। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের এডমিট কার্ডে তখন ছবির বালাই ছিল না। সবাই সবাইকে তখনও বিশ্বাস করতো। কিম্বা বিশ্বাসের শেষ তলানিটুকু তখনও জিইয়ে ছিল। থোবড়ার ছবি না থাকলেও আসলে যে পরীক্ষা দিচ্ছে সেই ছাত্র। তাকে ডাবের জল খাওয়াও। দইয়ের ফোঁটা দাও। কিন্তু বেশি বিরক্ত করো না। ঘাঁটিও না। কলেজে ঢুকেই ল্যাজ গজানোর মতো ছবি তুলতে হল। লাইব্রেরির কার্ডে ছবি। আইডেন্টিটি কার্ডে ছবি। টাকা জমা দিতে ছবি। ট্রেনে মান্থলি করালে সেখানেও ছবি। সন্দেহের সেই বাতাবরণে জীবনে প্রথম পাসপোর্ট সাইজের ছবি তুলতেই হল রাসবাড়ির আশা স্টুডিও থেকে। আমাদের লালবাবা কলেজের একদম পাশেই। এখনও আছে মনে হয়। ছবি দেখেই তো ভিরমি খাওয়ার অবস্থা। এটা কি যে ক্যামেরার সামনে বসেছিল সে? নাকি অন্য কেউ? 'আত্ম' এবং 'অহং' সম্পর্কে সেইবড় ধাক্কা খাওয়া। মিশেল ফুকো, সুসান সোনটাগ, দেরিদা তখনও বহুদূরে। ফলে আমি কে? পৃথিবী কী? প্রেম কেন? ইত্যাদি ইত্যাদি ল্যাজে গোবরে মাখামাখি। এমন অবস্থায় কাউকে ছবিটা দেখানো যেত না। কেউই কারো ছবি দেখাতো না ভুল করে। পাসপোর্ট সাইজের এহেন বিমর্ষতা দাগেরোটাইপেও উঠতো কিনা সন্দেহ আছে। সিদ্ধার্থ বাবু অবশ্য বাঙালীর ফটোগ্রাফি চর্চ্চায় এই বিষয়ে আলোকপাত করেননি। করলেও আপামোর জনসাধারণের তাতে কিছু যায় আসতো না। এমনকি এখনও পর্যন্ত। এই রঙীন যুগেও? যেখানে জেন জি'র ফোনের ক্যামেরা পাসপোর্ট ছবি তুলে দেয়। তাতেও কি গম্ভীর! কি বিমর্ষ! কি ক্যাবলা! কেমন হুতুম! ছানাবড়া! বেশ কয়েকবার জীবনে ঠাঁই নাড়া হতে হয়েছে। এদিক থেকে ওদিক। বেশ কিছু জিনিস ফেলা গেছে। কিছু নতুন আবার সঙ্গেও জুটেছে। এখন ফ্ল্যাট তোলপাড় করে চলছে সারানো। এটা ফেলো, ওটা ধরো, ওই যাহ উড়ে গেল এইসব সারাদিন করতে করতে হঠাৎই ইনি হাতে এসে পড়লেন কোনো এক ফাইলের ভেতর থেকে। প্রথমে চিনতে পারিনি। এতো ভাঙা, ধ্বসা, অপমান, সাফল্য প্রতি নিয়ত আপোষে এই ছবির মানুষটি ছিলেন না। তিনি যা ভাবতেন আমি এখন তা ভাবিনা। তিনি যা বিশ্বাস করতেন এখন তার বেশিরভাগটাই তলানিতে। কাজেই ছবিটা নিয়ে হাত কাঁপলো। চোখের দিকে তাকাতে ভয় পেলাম। যদি একসঙ্গে একগাদা প্রশ্ন করে বসে? তাই থতমত খাওয়ার ভান করে পুরনো কাগজের মধ্যে চালান করে দিয়ে দাঁড়িপাল্লায় চাপালাম। দেখলাম মোটেই ভারসাম্যের এদিক ওদিক হলো না। কাগজওয়ালার কাছে কিলোতে পাঁচ টাকায় দিব্যি বিক্রি হয়ে গেল।
Published on January 29, 2025 20:59
No comments have been added yet.


