চলচ্চিত্র তত্ত্বে লাকাঁর মনোসমীক্ষণ

মঁসিও জাক লাকাঁ (১৯০১–১৯৮১) একজন ফরাসি মনোবিদ। চলচ্চিত্র তত্ত্ব অধ্যয়নে তাঁর মনোসমীক্ষণ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। 

লাকাঁ বলছেন, মানব সন্তানের জন্ম থেকেই তার মধ্যে একটি অভাববোধ থাকে। সে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। এই বোধকে লাকাঁ বলছেন ‘হতে-চাওয়া’। একজন ব্যক্তি তার সারা জীবনই এই অভাববোধকে পূরণ করতে চায়। বাস্তবে যা কখনো পূরণীয় নয়। সে যার অভাব বোধ করে লাকাঁ তার নাম দিয়েছেন ‘ছোট অপর’। মানব জীবনের একেক পর্যায়ে এই অভাবের আকার ও অভিজ্ঞতা ভিন্ন ভিন্ন হয়। যেমন, জন্মের পর মানবশিশু জৈবিক চাহিদা (ক্ষুধা-তৃষ্ণা-যৌনতা) নিবারণের জন্য সার্বক্ষণিকভাবে তার মায়ের ওপর নির্ভরশীল থাকে। তাই সন্তান মাকে ও নিজেকে মিলিয়ে নিজের সম্পূর্ণতা কল্পনা করে। সে ও তার মা অভিন্ন। মায়ের স্তন হলো ‘ছোট অপর’ যার মধ্য দিয়ে সন্তানের সেই অভাববোধ মেটে। একে বলে প্রাক-ঈডিপাস পূর্ণতা। স্তন এখানে পেটের ক্ষুধা ও যৌন ক্ষুধা নিবারণের একের-ভিতর-সব প্যাকেজ।

প্রাক-ঈডিপাস ধাপ শেষ হলে সন্তানের বিকাশে তিনটি নির্ণায়ক পর্যায়ের কথা বলছেন লাকাঁ। এই তিনটি হলো: আরশি পর্যায় (আমাকে চেনা), টুকি ঝাঁ খেলা (ভাষা শেখা), ইডিপাস কমপ্লেক্স (সমাজের নিয়মের কাছে আত্মসমর্পণ)।

আরশি পর্যায় ছয় থেকে আঠারো মাসের মধ্যে শুরু হয়। এই সময় শিশু নিজেকে আর পৃথিবীকে আলাদা করতে শেখে। এই ধাপে আরশি বা আয়নার সামনের সন্তান নিজেকে দেখে। এই নিজেকে দেখা বস্তুত নিজের ছবিকে দেখা, নিজের অবাস্তব প্রতিবিম্বকে দেখা। সাধারণত মা সন্তানকে কোলে নিয়ে আয়না বা যেকোন প্রতিফলকের সামনে দাঁড়ায় এবং বলে ‘দেখ, এটা কে? এটা তুমি।’ এভাবে সন্তান নিজের একটা সম্পূর্ণ ছবিকে দেখতে পায় এবং তার ধারণা হয় এটাই ‘আমি’। লাকাঁ এই চেনাকে বলছেন ‘ভুল-চেনা’। এই ভুল চেনার সাক্ষী হয় একজন প্রাপ্তবয়স্ক, সাধারণত তার মা। ‘এটা আমি’ ভাবার সাথে সাথে শিশু এও ভাবে যে আমার মায়ের চাওয়া অনুযায়ী এটা আমি। 

এদিকে শিশু বাস্তবে নিজের নড়াচড়ার ওপর তেমন বশ আনতে পারেনি। কিন্তু আয়নায় সে যাকে দেখছে তাকে মনে হয় গোছানো, আত্মনিয়ন্ত্রণসম্পন্ন, স্বনির্ভর ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। ওই ছবির ব্যক্তি একজন আদর্শ মানুষ। মানুষ আজীবন ‘আমি’ বলতে সেই ছবিটাকেই বোঝে। অর্থাৎ অন্যের (নিজের প্রতিফলনের) মধ্য দিয়ে নিজেকে চেনে। আরশি ধাপের আরশি আক্ষরিক অর্থে আয়না হতে পারে, আলোকচিত্র হতে পারে কিংবা কোনো ব্যক্তি হতে পারে (অর্থাৎ সন্তানের মা)। মায়ের মধ্যেও সন্তান নিজের সম্পূর্ণতার প্রতিফলন দেখতে পারে। 

এই আরশি পর্যায়ে আসে প্রতীকী বন্ধন, যা জীবনের অন্যান্য পর্যায়েও থাকে। প্রতীকী বন্ধনের তিনটি অংশ, কল্পিত, প্রতীকী আর আসল। মানুষ আজীবন যেসকল ছবির মধ্য দিয়ে নিজেকে চেনে সেই চেনার নাম হলো কল্পিত। আরশি পর্যায়ে শিশু যে অন্যকে দেখতে পায় আয়নার মধ্যে সেই হলো কল্পিত (আমি)। এই আমি-র সাথে সংযোগটা হয় বাইরে থেকে, ‘বড় অপরের’ মধ্য দিয়ে। বড় অপর কে? বড় অপর হলো সমাজ, সমাজের আইনকানুন, রীতিনীতি, কৃষ্টি-কুলাচার। এরাই সব মিলিয়ে প্রতীকী। শিশু জন্মানোর আগেই এই বড় অপর (সমাজ ইত্যাদি) তাকে একটা অবস্থান, একটা পরিচয় দিয়ে রাখে। আরশি পর্যায়েও আয়নার প্রতিবিম্বকে শিশুর পরিচয় হিসেবে মূলত বাইরে থেকে আরোপ করা হয়। আর এই আরোপকারী হলো শিশুর মা। 

আর, আসল হলো একটা ঋণাত্বক সত্ত্বা। মায়ের কোলের শিশু আর আয়নার শিশুর প্রতিবিম্বের মধ্যে যেটা হারিয়ে যায়—যে ফাঁক থেকে যায়—সেটাই হলো আসল।   

এরপর আসে টুকি-ঝাঁ খেলা। এই খেলায় বাচ্চার থেকে ‘টুকি’ বলে মা হারিয়ে যায় এবং ‘ঝাঁ’ বলে ফেরত আসে। এই খেলার মধ্য দিয়ে শিশু মায়ের অনুপস্থিতির সাথে একরকম বোঝাপড়ায় আসে। মা সবসময় থাকে না এবং মাঝে মাঝেই চলে যায়—এই ব্যাপারটাকে সে ভাষার মধ্য দিয়ে আত্মস্থ করে। 

ভাষার মধ্য দিয়ে শিশু সমাজে প্রবেশের টিকিট পেয়ে যায়। তার জন্য যোগাযোগ ও সহযোগিতার দ্বার খুলে যায়। এখন সে ‘দুধ খাব’ বলে নিজের তৃষ্ণা মেটানোর দাবি করতে পারে। এই দাবিটা সে করে বড় অপরের কাছে—এই পর্যায়ে সাধারণত যে হলো মা, যার কাছে হতে-চাওয়া প্রকাশ করা যায়। কিন্তু চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তি সবসময়ই কম পড়ে। সন্তান যতটা চায়, যতক্ষণ চায়, ততটা ততক্ষণ সে মায়ের কাছ থেকে পায় না। চাওয়া ও পাওয়ার মাঝের এই খামতিটা বাসনার পূর্বশর্ত—চিরতরের জন্য হারিয়ে ফেলা ছোট অপরের নিষ্ফল সন্ধান। সন্তানের এই চাওয়াটাকে লাকাঁ একইসাথে বলছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসার চাহিদা। যে চাহিদা কখনো পূরণ হবার নয়, কারণ নিঃস্বার্থ ভালোবাসার অস্তিত্বই নাই। ফলতঃ লাকাঁর বিখ্যাত উক্তি “যা নাই তা দেবার নাম ভালোবাসা।” 

আবার, ভাষা আয়ত্ত্ব করার সাথে সাথে শিশু এও জানতে পারে বড় অপর (সমাজ, আইন, সংস্কার) তার জন্য কোন জায়গাটা আগাম বরাদ্দ রেখেছে। অপর আছে বলেই সে আছে। সে নিজেকে ‘আমি’ সর্বনাম দ্বারা ব্যক্ত করতে শেখে। কিন্তু যে বলছে ‘আমি’, আর ‘আমি’ বলার মধ্য দিয়ে যাকে বোঝাচ্ছে এই দুইজন আলাদা। আয়নার সামনে ও আয়নার মধ্যে অবস্থানরত দুই ব্যক্তির মতো। 

শৈশবের তৃতীয় বড় পর্যায় হলো ইডিপাস কমপ্লেক্স। এই পর্যায়ে শিশু লৈঙ্গিক পার্থক্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়। প্রাক-ইডিপাল পর্যায়ে সন্তান ধরে নেয় মা ও সে পরস্পরের অভাবকে পূর্ণতা দেয় ও বাসনাকে প্রতিফলন করে। মায়ের যা নাই, মা যা চায় তাকে সন্তান ভাবে ‘শিশ্ন’ (পুং লিঙ্গ নয়, লাকাঁর মতে শিশ্ন নারী-পুরুষ কারোই থাকে না)। সন্তান নিজেকে কল্পনা করে সেই শিশ্নের অধিকারী হিসেবে। কিন্তু কিছুদিন পর তার ও তার মায়ের মাঝখানে তৃতীয় একজন ভদ্রলোক এসে হাজির হয়। যার নাম বাবা। শিশু দেখতে পায় মায়ের বাসনা তাকে ঘিরে নয় বরং তার বাবাকে ঘিরে। বাবা সেই আইনকানুনের প্রতীক যার কারণে সন্তান তার মাকে কামনা করতে পারে না। এই কামনা নিষিদ্ধ হয়। 

তাহলে বাবার কাছে কী আছে যেটা সন্তানের কাছে নাই? নিশ্চয়ই শিশ্ন। ছেলে শিশু ধরে নেয় তাকে শিশ্নের অধিকারী হতে হবে। ফলে বাবা হয়ে যায় তার আদর্শ৷ আর মেয়ে শিশু ধরে নেয় শিশ্ন আছে এমন কাউকে তার পেতে হবে। এছাড়াও সন্তান জন্মদানের মধ্য দিয়ে সে সাময়িক শিশ্নের অধিকারী হতে পারে। যার আবার বিচ্যুতি ঘটবে সন্তান বড় হওয়ার সাথে সাথে।  

সন্তান যখন তার মাকে নগ্ন দেখে তখন সে উপলব্ধি করে যে তার মায়ের পুংলিঙ্গ অনুপস্থিত৷ হয় তার লিঙ্গকর্তন করা হয়েছে অথবা সে লিঙ্গ হারিয়েছে। তার এই লিঙ্গকর্তন করে থাকতে পারে বাবা—বড় অপরের প্রতীক। এই দেখে ছেলে শিশুর মধ্যে লিঙ্গকর্তন শঙ্কা তৈরি হয়। সে মনে করে বড় অপরের আইন না-মানার (যেমন, মাকে কামনা করার) কর্মফল হতে পারে লিঙ্গকর্তন। লাকাঁর মতে মানুষের জীবনে নপুংসক হওয়ার ভীতি প্রায়শ বিদ্যমান। 

এদিকে মেয়ে শিশুর মনে হয় শিশ্ন অর্জনের প্রতিযোগিতায় সে পারবে না। তাই সে শিশ্ন আছে এমন কাউকে (বাবাকে) কামনা করতে পারে। কিন্তু যেহেতু বাবাকে কামনা করাও বড় অপর দ্বারা অনুমোদিত নয় তাই সে বাবার স্থলাভিষিক্ত হিসাবে কাউকে কামনা করে যাবে। এর অন্যথা দেখা যেতে পারে মেয়ে যখন নিজেই নিজেকে শিশ্নের অধিকারী ভাবতে শুরু করে এবং সেইমতো জীবনযাপন করতে চায়।



চলচ্চিত্র তত্ত্বে মনোসমীক্ষণ


বলা হয়, চলচ্চিত্রের টেক্সটের রয়েছে একটি সাবটেক্সট যা মনের  অবচেতনের অনুরূপ। 

চলচ্চিত্রে মনোসমীক্ষণের প্রভাবকে সময়ের প্রেক্ষিতে দুই ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। প্রথম ভাগটি দেখা যায় প্রাক সত্তরের দশক চলচ্চিত্রসমূহে। পরের ভাগটি দেখা যায় সত্তর দশক পরবর্তী চলচ্চিত্রে। 


প্রাক সত্তর দশক


১৯২০–৩০ এর দশক থেকেই জাদুবাস্তবতা, স্বপ্ন ইত্যাদি বিষয় চলচ্চিত্রে ঠাঁই নেয়। 

# আঁধারের শক্তিসমূহ–

মৃত্যুবাসনা: মানুষ তার জন্মের আগের অবস্থায় পৌঁছাতে চায় যেখানে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পৌঁছানো সম্ভব, তাই মানুষের মনে অবদমিত অবস্থায় মৃত্যুবাসনা কাজ করে। 

পুনরাবৃত্তির তাড়না: মানুষ তার সাথে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা মনের চোখ দিয়ে বারংবার ঘটতে দেখে। এভাবে পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে সে দুর্ঘটনার সাথে বোঝাপড়া করে। 

ভীতিপ্রদ: অজানাকে ভয় পাওয়া মানুষের অবচেতন মনের মধ্যে রয়েছে। 

চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি উপরোক্ত বিষয়গুলোকে কীভাবে অভিজ্ঞতা করে তা ৭০ দশক পর্যন্ত চলচ্চিত্র তত্ত্বের মূল আলোচ্য ছিল। এছাড়াও চলচ্চিত্রের পর্দায় অবদমিতের ফিরে আসা, ঈডিপাসের নাটক, লিঙ্গকর্তন শঙ্কা, আত্মপ্রেম, খিঁচুনি ইত্যাদির পাশাপাশি আরশি পর্যায়ের উপস্থাপন নিয়ে মনোসমীক্ষণের আলোকে আলোচনা হয়েছে। 


সত্তর দশক পরবর্তী


এই সময় থেকে যন্ত্র তত্ত্ব, নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব, লরা মালভির মনোসমীক্ষণের সমালোচনা, মনোসমীক্ষণের সাথে উত্তর-উপনিবেশ তত্ত্ব, সমকামী তত্ত্ব, শরীর তত্ত্বের আলোচনা প্রাধান্য পায়।



1 like ·   •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on March 24, 2024 07:21
No comments have been added yet.