তরতাজা কঙ্কাল

গল্প: তরতাজা কঙ্কাল

কঙ্কাল বিক্রির যে রমরমা ব্যবসা চলছে, সেখানে হঠাৎ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো নতুন এক ব্যবসায়ী। মেডিকেলের স্টুডেন্টরা তার কাছ থেকেই বেশিরভাগ নিচ্ছে কঙ্কাল। এটি সহজে সহ্য হচ্ছে না সোবহানের। প্রায় এক যুগেরও অধিক সময় ধরে চালিয়ে নেওয়া পাতে এভাবে কেউ লাথি দিবে ভাবতে পারেনি। খুবই দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলো। প্রতিযোগিতা ব্যবসায়ে থাকবে কিন্তু সব কাস্টমার ঐ দোকানে গেলে সে কি বিক্রি করে প্রতিযোগিতা দিবে? তবে যে কথাটি এই মাত্র সে গোপন ভাবে জানলো, সেই খবরটা তার প্রতিযোগী ব্যবসায়ীকে চিরতরে দমিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সে এইমাত্র জেনেছে, পলাশ মাহবুব যে কঙ্কালগুলো বিক্রি করে তার পাশাপাশি বেশি দামে স্পেশাল কাস্টমারদের বিক্রি করে তরতাজা কঙ্কাল!



দৈনিক সময়ের আলো পত্রিকা। পত্রিকার নবম পৃষ্ঠায় চোখ বুলাচ্ছে নাসরিন তমা। একটা চাকুরীর বিজ্ঞাপনে চোখ আটকে রইলো তার। 'সেন্টার ফর ল্যাবরেটরী' প্রতিষ্ঠানের জন্য দুক্ষ চারজন মহিলা আবশ্যক বলছে। যে ঠিকানা দেওয়া হলো সেটা লাল দাগ করে রাখলো তমা। মোবাইল বের করে নম্বরটায় কল দিলো। ওপাশে একজন গমগমে কণ্ঠ ভেসে উঠলো।

'হ্যালো আসসালামু আলাইকুম, আমি নাসরিন তমা বলছি। আপনার প্রতিষ্ঠানের ল্যাব সহকারী পোস্টের বিজ্ঞাপন দেখে কল দিলাম।'

'ওহ... হুম, আপনি কাল ঠিকানায় চলে আসুন, বাকিরাও আসবে। সরাসরি সাক্ষাৎকার নিয়ে যোগদান করা যাবে।'

'সম্মানীটা যদি বলতেন একটু...'

'ওটা কাল আসলে আমাদের সমঝোতায় হবে।'

'কিছু মনে করবেন না, চাকুরীটা খুব দরকার তো তাই বললাম। ওকে, ধন্যবাদ।'

'ওকে'

লাইনটা কেটে দিয়ে মনে খুশির একটা ঝিলিক কোণাকোণিভাবে মিলিয়ে গেলো। অন্তত বৃদ্ধ বাবার ঔষধ খরচের একটা উপায় বের হলো।



পুলিশের এসআই সাদিকুল আলমের সামনে ঘটনার বিবরণ দিচ্ছে কঙ্কাল ব্যবসায়ী আজম সোবহান। সাদিকুল আলম তো রীতিমতো আশ্চর্য হয়ে শুনছেন কথাগুলো।

'তোমার কথার সত্যতা কী, আজম সোবহান?'

'স্যার, নিজে গিয়ে একবার দেখুন। আমি গোপন সূত্রে খবর পেয়েছি।'

সাদিকুল আলম চোখের ইশারায় এএসআই জামালকে ঐ দোকান সম্পর্কে খবর নিতে জানিয়ে দিলো। যেটা শুধু সে আর জামাল বুঝেছে।

'ওকে আমি দেখছি। তুমি যাও। কিন্তু মনে রেখো কারও সুনাম যেন ক্ষুণ্ণ না হয় অপরাধ প্রমাণ না হওয়া পর্যন্ত।'

'ওকে স্যার'

কি মনে হয় তোমার? প্রশ্নটা করে এএসআই জামালের দিকে তাকালো সাদিকুল আলম।

'স্যার দোকানটা সম্পর্কে খবর নিয়ে যা জানলাম; ও খুব বিরাট ব্যবসায়ী। তার সাথে রাজনৈতিক নেতার সাথে মেলামেশা আছে। দোকানে সরাসরি রেইট দিতে গেলে ঝামেলা হয়ে যাবে।'

'ঠিক আছে, তাহলে সিভিলে চলো।'



একটা অন্ধকার রুমকে ল্যাবের অফিস হিসেবে চালানোটা কতোটা যুক্তিযুক্ত সেটা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না তমা। আরও প্রার্থী থাকার কথা থাকলেও সে নিজের ছায়া ছাড়া আর কাউকেই দেখছে না। ভয় জমতে শুরু করলো। মোবাইলের পরিচিত কন্ঠস্বরটা শুধুমাত্র 'বসো' বলে কোথায় যে গেলো, গত পঁয়তাল্লিশ মিনিট ধরে খবর নেই।

'তাহলে তুমিই এসেছো?'

গমগমে কন্ঠস্বরটা শুনে চমকে উঠলো সে।

'জি স্যার'

কন্ঠস্বরটার ছায়া দেখা গেলো দূর থেকে। সামনে স্পষ্ট হতে দেখা গেলো তার হাতে ধারালো একটি চুরি চকচক করছে। দড়াম করে দরজা বন্ধ হয়ে গেলো। তমা পালানোর জন্য উঠে দাঁড়ালো। দৌড় দিতেই কিসের সাথে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেলো। মেঝেতে দেখতে পেলো একটা লাশ, পঁচা গন্ধ বের হচ্ছে। শরীরের মাংস ভেদ করে হাড়গুলো দেখা যাচ্ছে সহজেই। রীতিমতো একটা কঙ্কাল। সে নিশ্চিত শরীরে এসিড দিয়ে মাংস গলানো হচ্ছে। গন্ধ আর লক্ষ্মণ তাই বলছে, বিজ্ঞানের ছাত্রী হিসেবে এতটুকু সে জানে। লাশটা একটা মেয়ের। স্তনের মাংসগুলো ছুরি দিয়ে কেটে পেলা হয়েছে। ভয় পেয়ে গেলো তমা। তার জানা হয়ে গেলো কী ঘটতে যাচ্ছে তার সাথে। মানুষটার চেহারার দিকে তাকাতেই আঁতকে উঠলো তমা। মানুষটাকে সে চিনে, ডাক্তার। ডাক্তার মনসুর আলম, সার্জারীর সুপরিচিত ডাক্তার। তারপর একটা চাল দিলো।

'স্যার, এটা আপনার ল্যাব? আপনার অপারেশনে আমার বোন জীবন ফিরে পেয়েছে। না হলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না।'

হতচকিত হয়ে পড়লো একটু সময়ের জন্য ডাক্তার মনসুর আলম। ঐ সময়টাতে দৌঁড়ে গিয়ে জোরে আঘাত করলো ডাক্তারকে লক্ষ্য করে। তারপর এক দৌঁড়ে দরজা খুলে সোজা বাইরে।



'দোকানটা তো তালা দেওয়া জামাল। কি করা যায়?'
'আশপাশ থেকে জেনে নিতে পারি।'

পাশের দোকানে একজন বৃদ্ধ বসে আছে, পানের দোকান। তার থেকে তারা যা জানলো; দোকানটা ডাক্তার মনসুর আলমের। এরকম কোন কঙ্কাল বিক্রিই করে না। ঐ ব্যবসায়ী আজমের সাথে পলাশ মাহবুবের একবার ঝগড়া হয়েছে এ নিয়ে হয়তো মিথ্যা দোষারোপ করেছে আজম।

এসব শুনে মেজাজ বিগড়ে গেলো সাদিকুলের। এমনি রগচটা মানুষ তার উপর এসব ভাঁওতাবাজি। বাইক স্টার্ট দিয়ে সোজা থানায় চলে আসলো। টেবিলের পত্রিকাটা টেনে নিলো। শিরোনাম পড়ে চোখদুটো গোল হয়ে গেলো তার। 'গত চার বছরে শহরে থেকে বাইশজন নারী নিখোঁজ, যাদের এখনো কোন সন্ধান বের করতে পারেনি পুলিশের অনুসন্ধানী টিম!' আর শ্বাস বেড়ে গেলো আরেকটু পর, বিস্তারিত বলা হয়েছে; শহরে গুঞ্জন উঠেছে কেউ একের পর এক নারী খুন করে কঙ্কাল পাচার করছে।

বড় বড় করে গালি দিতে লাগলো ব্যবসায়ী আজমকে। 'সবকিছু এই শালার কাজ। শালাকে আমি দেখছি।'

এমন সময় থানায় প্রাণপণ দৌঁড়ে একটা মহিলা এসে তার সামনের চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়লো।

'স্যার, বাঁচান। ডাক্তার আমার কঙ্কাল নিতে চায়!'



সবিস্তারে সবকিছু বর্ণনা করলো তমা। তাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসলো পুলিশের টিম। একটা জিডি করা হলো। জিডির বিস্তারিত লেখাগুলো আবার শুরু করতে পড়তে লাগলো সাদিকুল আলম। হঠাৎ ডাক্তারের নামে এসে চোখ আটকে গেলো। পানের দোকানের তথ্য আর তমার ডাক্তারের নাম একই! 'ওমাইগড'

মোবাইল বের করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রিসিপশনে কল দিয়ে নিজের পরিচয় দিলো।

'আপনাদের সার্জারী বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মনসুর আলমকে কিভাবে পেতে পারি?'
'সরি স্যার, মনসুর আলম গত চার বছর আগে গত হয়েছেন।'
'কি বলেন! আপনি শিউর?'
'হুম স্যার।'
'তাহলে মোড়ে পলাশ মাহবুব যে দোকানটা দেখে সেটা কার?'
' ঐ বিষয়গুলো আমরা জানি না স্যার। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি দোকানটা ওনার স্ত্রী দেখবাল করেন।'
'ওনার স্ত্রীর নাম?'
'নাসরিন তমা।'
!



একটা অন্ধকার রুম। সে রুমে একটি চেয়ারে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে পলাশ মাহবুবকে। মুখে রুমাল গুঁজে দেওয়া আছে, তাই চিৎকারের চেষ্টা করলেও সেটা সফল হচ্ছে না। ঠিক যে রুমমটার কথা একটু আগে পুলিশকে সুন্দর করে সাজিয়ে বলেছে সেখানে বসে ছুরি হাতে দাঁড়িয়ে আছে নাসরিন তমা। পলাশকে আর বাঁচিয়ে রাখা যাবে না। তার কঙ্কাল নিয়ে সওদা করার সময় এসে গেছে। বৃদ্ধ ইনফরমার তমাকে জানিয়েছে, পলাশের বিষয়টা জেনে যাচ্ছে পাবলিক। এই প্রথম কোন পুরুষের কঙ্কাল নিয়ে সওদা করবে সে, তরতাজা কঙ্কাল!

(বানান ভুলের বিষয়টা ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন)

[] রিয়াজ মো র শে দ সা য়ে ম
1 like ·   •  0 comments  •  flag
Share on Twitter
Published on October 27, 2021 21:53 Tags: গল-প
No comments have been added yet.