পুতুলনাচের ইতিকথা পুতুলনাচের ইতিকথা question


7 views
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর উপন্যাসে সংসার ও বৈরাগ্য (চারটি উপন্যাসের আলোকে)
Saiful Sourav Saiful Nov 18, 2018 09:46AM
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কিছু উপন্যাসে যেমন প্রগাঢ় সংসার ধর্ম রয়েছে, তেমনি কিছু উপন্যাসে সংসার ত্যাগী বৈরাগ্যের ধরণও রয়েছে । কিছু উপন্যাস মানুষকে করে তোলে বিজ্ঞান সচেতন সামাজিক মানুষ । আর কিছু করে খেয়ালী ও খ্যাপাটে আপনভোলা দুরন্ত স্বভাবের ।

'পুতুল নাচের ইতিকথা' সমাজবদ্ধ সাংসারিক মানুষের জাগতিক টানাপোড়েন ও চরিত্রদের নিজেদের প্রতি আবেগ-অনুভূতির প্রলেপ দিয়ে যেন এক পুতুল খেলা অবর্তীর্ণ করেছেন লেখক । শশী ডাক্তার ও কুসুমের মধ্যকার অপত্য আকর্ষণ বারবার তাদের কাছে এনে মনে করিয়ে দেয় আশপাশের জনবহুল উপস্থিতি । কুমুদ ও মতির অদূরদর্শী প্রণয় তাদের ফেলে দেয় এক অপরিণামদর্শী ভোগান্তির জীবনে । বারবার এসে ফিরে যাওয়া কুসুমকে তাই শশী ডাক্তার বলেই ফেলেন- 'কুসুম, তোমার মন নাই?' । যেন যথেষ্ট মনের অনুপুস্থিতিই কুসুমের শরীরকে কাছে এনে ফিরিয়ে নিয়ে যায় কুসুম নিজেই ।

'সংস্কৃতির ভাঙা সেতু' গ্রন্থে সংকলিত 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাগী চোখের স্বপ্ন' প্রবন্ধে লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস মানিকের বিজ্ঞান চেতনা ও উপনিবেশ কালের শ্রেণী শাসিত শরীরের নৃতাত্ত্বিক রূপরেখা নিয়ে আলোকপাত করেছেন । তিনি দেখানঃ মানিক কখনোই মনকে বাদ দিয়ে শরীরের কথা ভাবেন না; প্রয়োজনে চরিত্রকে উপোস করিয়ে সংসারহীন করে দেন । কিন্তু সিভিলিযেশনের প্রক্রিয়ায় ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকই মানুষের শরীর কাঠামো ও তার ভাষাকে শাসন করে এসেছে । পরাধীন জাতির একক মানুষের শরীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য তাই স্বাধীন জাতির ব্যক্তি মানুষের চেয়ে ঢের গুণ আত্মপ্রবঞ্চক । আর যদি সমাজ ব্যবস্থাটি হয় ধর্ম শাসিত, তাহলে ব্যক্তির শরীর তার নিজের কাছেই হয়ে ওঠে অবোধ্য কুহক । ইলিয়াস এই সমস্ত বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে মানিকের প্রেসকিপশন- বিজ্ঞান বা চিকিৎসা বিজ্ঞানের শরণাপন্ন হওয়া এবং শরীরের প্রকৃতি ও ধরণকে আবিষ্কার করার পরামর্শ দেন ।

‘জীবনকে জানা আর জীবনকে মায়া করা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে । একটাকে বড় করে অন্যটাকে তুচ্ছ করা জীবনদর্শীর পক্ষে বীভৎস অপরাধ'- এই কথাটি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় 'লেখকের কথা ও বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা' বইতে বলেছেন । চরিত্রের মূল-কান্ড-ফুল-ফলকে জেনে, তার সজীবতা ও নির্জিবতা অবলোকন করে যে লেখক তার প্রতি প্রয়োজনীয় মায়া অর্পণ করতে পারেন না, মানিকের মতে সেই জীবনদর্শী লেখক বীভৎস অপরাধ করে থাকেন । এবং একই দর্শন যে কোন মানুষের জীবনের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য । এই জীবনকে জানা ও জীবনকে মায়া করার অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকার মধ্যেই মানিকের বিজ্ঞান মনস্ক সংসারধর্ম নিহিত রয়েছে । উদ্ভ্রান্ত কুমুদ ভালোবেসে সরলমতি মতিকে বিয়ে করলেও অধিকাংশ সময় শহরে পড়ে থাকে এবং অপরদিকে মতি টলোমলো আঁখিতে সারাদিন যেন কার পথ পানে চেয়ে আশায় আশায় থাকে । কুমুদ যেন মতির সাথে আর কুসুম যেন শশীর সাথে জীবনকে মায়া না করে পরাধীন শাসিত শরীর নিয়ে আত্মপ্রবঞ্চনা করে সেই বীভৎস অপরাধটিই করে । আর সেই সমস্ত ব্যক্তি প্রবঞ্চনা দেখে মানিকের রাগী চোখ সংযত হয়ে সমাজবদ্ধ মানুষের সংকটের প্রতি বিজ্ঞানের ছোট-বড় মুক্তিকে উপস্থাপন করেন কারণ হেমিংয়ের একটা দার্শনিক উক্তি মানিক জেনে হোক বা না জেনে, অবশ্যই ধারণ করেনঃ 'লেখক হিসেবে আপনার বিচার করা উচিৎ নয়, বুঝতে পারা উচিৎ' । দুঃখজনক হলেও সত্য, বিগত বেশ কিছু দশক যাবত সোনার বাংলার বহু নামধারী ও জনপ্রিয় লেখকরা সমাজ, ধর্ম ও ব্যক্তি মানুষের সংকটকে না বুঝতে চেষ্টা করে বিচার করে বা আঘাত করে বিষবাষ্প সৃষ্টি করেছেন (সে আলোচনা অন্য তবে গুরুত্বপূর্ণ) ।

'জননী' উপন্যাসে দেখি কয়েদী স্বামীর অনুপুস্থিতিতে অকুল পাথারে পতিত হয়েও একজন মা তার সন্তানদের কিভাবে আগলে রাখেন । হুমায়ুন আহমেদ বলেন শুধুমাত্র 'জননী' উপন্যাসটি লিখতে পারলেই তিনি নিজেকে সার্থক মনে করতেন । এতো শত-শত বইয়ের রচয়িতা কেন মাত্র একটা উপন্যাসের দিকে এমন নির্দেশ করলেন? একে বলে শিল্পীর অল্টার-ইগো । ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতি ছাড়াও 'জননী' উপন্যাসের মায়াময়-ছায়াময় ভাষা ও শৈলী যে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে এই উপন্যাসকে, সেই শিল্পের উচ্চতা ছিল হুমায়ুন আহমেদের অভিপ্সা । দরিদ্রতা, জরাক্লীষ্টতায় পীড়িত মায়ের সংগ্রামের অবর্ণনীয় বর্ণনা উপন্যাসে সংসারের মূল হয়ে কিভাবে ঝড়-ঝাপটায় তার শাখা-প্রশাখাকে ধরে রাখেন তা পাঠককে হৃদয়গ্রাহী করে তোলে ।

'চতুষ্কোণ' উপন্যাসে একা চলে ফেরা 'রাজকুমার' এর দৈনন্দিন জীবনে তার প্রেম-অপ্রেমের বর্ণনা আসে । বই-পত্র, বিছানা আর প্রয়োজনীয় পোষাক ও আসবাব ঘরে । রাজকুমারের কোন একদিন মাথা ধরে । কোন একদিন সে রিনিদের বাড়ি যায় । রিনি পিয়ানোতে গান করে আর রাজকুমারকে দেখেও না দেখার ভান করে । রিনির বাবা উকিল, রাজকুমার তার সাথে আলাপ করে ফিরে যায় । রিনির সাথে লেনাদেনার বনিবনা হয়না দু'জনের জীবনদর্শনের ফারাকের কারণে । বিকালে মাধবীকে পড়াতে যায় । রাজকুমারের প্রতি মাধবীর অবাধ ভক্তি দেখে তার চোখে গভীর হয় সংশয় । শিক্ষকের কর্তব্য যেন তাকে সচকিত করে রাখে মাধবীর সন্মূখে । কোনদিন সন্ধ্যায় হয়ত সারসীর সাথে দেখা হয় । সারসী সংস্কার মুক্ত, আধুনিকা, সমাজ ও রাজনীতি বিষয়ক মাঠকর্মী । রাজকুমারের সাথে অনেক কথা চলতে থাকে, বন্ধুত্বপূর্ণ কথা বলতে থাকে কিন্তু কোথায় যেন তাদের একটা সুর কাটা পড়ে । আর কালী থাকে অন্তর্মুখী হয়ে । নিম্নবর্গ থেকে উঠে আসা সামাজিকভাবে অবহেলিত মেয়ে কালীর আসা-যাওয়া, তটস্থতা যেন সমাজের চিরায়ত তেলে আর জলে মিশতে না পারার গোঁড়া সংস্কার । এক-আধবার রাজকুমারকে গোঁড়া মনে হলেও নারীদের সাথে কথাবার্তায় তার হৃদয়ের উপস্থিতি তার আবেগকে উপস্থাপন করলে মনে হয় রাজকুমারই তৎসময়ে পুরো আধুনিক একজন । উপন্যাসে দেখি প্রত্যেকটা চরিত্রের সাথে আলাদা সম্পর্ক বা সম্পর্কহীন সূক্ষ্ম টেনশন । বহুদিন রিনির ফিরিয়ে দেবার পর সে সূত্রে শেষদিকে হয়ত রিনির চুম্বন অনায়াসে ফিরিয়ে দেয় সে । মাধবীকে পড়াতে গিয়ে যে বিব্রতির সৃষ্টি হয় তা সহজ করতে পারে না । সারসী কাজে-কর্মে বরাবরই উদ্যমী এবং অধরা এক প্রকৃত সারস । কালীর আর্থসামাজিক পরিণতি তাদের সম্পর্ককে অপরিণতই করে রাখে । উপন্যাস শেষ হলেও মনে হয় আরেকটু হলে ভালো হত । জানার ইচ্ছা থেকে যায় শেষ পর্যন্ত রাজকুমার কার কাছে নিজেকে সমর্পণ করে । ব্যক্তিগত আকর্ষণ ও সংঘর্ষে অপরিণত সব সম্পর্ককে নিরূপণ করতে গিয়ে উপন্যাসিক চরিত্রদের পরিপার্শ্বকে তুলে ধরেন এবং তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তার প্রভাব বা প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করেন । রাজকুমার হয়তো পরবর্তীতে সাংসারিক হয়, হয়তো হয় না । কিন্তু তার এই সমাজবদ্ধ অপরিণত প্রেমগুলোতে খাবি খেয়ে বেড়ানো কি সমাজেরই সৃষ্ট ব্যক্তি সংকট নয় যেখানে মানুষ অধিক যান্ত্রিক, অনধিক বিজ্ঞান সচেতন?

'দিবারাত্রির কাব্য' উপন্যাসে 'হেরম্ব' যেন বারবার ফিরে আসে ফিরে যায়, ধরা নাহি দেবো হায় ধরণের এক প্রেমিক চরিত্র । যৌবনে নিজের প্রেমিকা 'সুপ্রিয়া'কে অভিবাবক সেজে বিয়ে দিয়ে দেয় হেরম্ব নিজে । আবার অনেক বছর পরে দেখা করতে গিয়ে দেখা যায় হেরম্বের প্রতি সুপ্রিয়ার প্রেমের দাবী ভয়াবহ ভাবে ফুটে উঠেছে । যদিও স্বামী সংসারে অভ্যস্থ সুপ্রিয়া কিন্তু পুরোনো অপূর্ণ প্রেমের জাগরণ বারবার হেরম্বকে পা চালিয়ে নিয়ে চলে সুপ্রিয়ার বাড়িতে । কিন্তু একই সময়ে কঠিন হৃদয়ের অধিকারী প্রৌঢ় হেরম্ব এক তরুণী বালিকা 'আনন্দ'র প্রেমে মজে ওঠে । হেরম্ব এক দোলাচলের সাগরে পড়ে উভয়কে দেখা দিয়ে যেতে থাকে । তবু চুড়ান্ত প্রণয় অধরাই থেকে যায় এবং শেষ দৃশ্যে আনন্দের নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে অগ্নিসংযোগ যেন এক প্রতীকী দৃশ্যঃ প্রেমের দাহনে পুড়তে থেকা আত্মপ্রবঞ্চক শরীর । এই উপন্যাসকে সামাজিক-অসামাজিক কাঠামোবদ্ধতার ন্যূন আঙ্গুল তুলে অনেকে তিরষ্কার করেছিল গত শতকের তিরিশের দশকে । অথচ কাঠামোর বাহুল্য বিবর্জিত অন্যতর এক মনোপ্রবৃত্তির দিক উন্মোচনের সরূপ হিসেবে মেনে নিতে অতিবিজ্ঞ পাঠক-সমালোচকদের কয়েক দশক লেগে গেলো ।

লেখক যদি উপন্যসের চরিত্রদের প্রণয় ঘটিয়ে দেন অথবা যদি বিয়ে দিয়ে দেন, তবে যেন সকল পুতুলের নাচকে থামিয়ে একটি নারীকে পূর্ণাঙ্গ করতে জননী করে তুলবেন । আর যদি সংসারহীন করতে চান তার চরিত্রদের, তবে যেন দিবারাত্রির কবিকে চতুষ্কোণ ঘর থেকে বের করে বারবার ঘুরিয়ে বেড়াবেন তার ভ্রমণ পিপাসু মনকে নারীর নাভীতে, নারীদের মনোবাসনার দ্বারে একটা খেয়ালী প্রেমিক করে করে । আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন মানিক পাঠিকাকে বলতে শুনেছি মানিকের উপন্যাস তাকে বিব্রত করে, পীড়া দেয় এবং লেখককে একই সাথে অসহ্য করতে ও ভালোবাসতে উদ্বুদ্ধ করে । হয়ত শিল্পের উন্মোচন করার মত শীল্পিকে উন্মোচিত হতে হয় বলে তার আয়নায় পাঠক-পাঠিকারা নিজেদের মন ও শরীরের কিছুটা দেখতে ও অনুধাবন করতে পারেন বলে প্রকৃত শিল্প মানুষকে বিব্রত করে, পীড়া দিয়ে অধিকতর খাঁটি মানুষ করে তোলে । আর সেরকমই মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর উপন্যাসগুলো কখনো বিব্রত, কখনো পীড়িত, কখনো মায়া প্রবণ করে মানুষকে পথ দেখায় আপন আপন জীব ও প্রাণীসত্ত্বার রূপরেখাকে বুঝে উঠতে ।



back to top