ইতিহাস কথা বলে – বিজয়ীদের কথা । ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – অতীত গৌরবের সাক্ষ্য । কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনাবলির কতটুকু তাতে অটুট থাকে ?
বর্তমান-এ বর্ণিত কাহিনীর ব্যাখ্যা পেতে যেতে হবে অতীত-এ, জানতে হবে মহাকালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া সেই সব ঘটনাবলি যার ফলশ্রুতিতে ঢাকার বুকে আজ জমে উঠেছে এক অতিপ্রাকৃত নাটক ।
ডুব দিতে হবে 'সুদূর অতীতে' - অ্যালেক্সান্ডার, আটিলা, চেঙ্গিস আর বাবরের দরবারে । শুনতে হবে বীরযোদ্ধা বাঘাতুর আর পুরোহিত অবলোহিতের গল্প । কীসের ধারাবাহিকতায় শৈলেন ভট্টাচার্য আর যংকসুর আজ সমবেত ? ফিরতে হবে 'নিকটে' – জানতে হবে তরঙ্গের বেড়ে ওঠার প্রেক্ষাপট । রুমী নামের একটি ছেলের কারণে কী ঘটেছিল ‘পিশাচের গ্রাম’-এ ?
কী কারণে তিক্ত হয়েছে সাদা হাত আর অর্ধ জীবন্মৃত ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াসের সম্পর্ক ? কেনই বা মীরানা মোরেসকে বারো বছর আগে ফিরিয়ে দিয়েছিল অবলাল ? কী অসমাপ্ত কাহিনী লুকিয়ে আছে ওদের অতীতে ?
সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে রক্তের উপাখ্যানে – শোণিত উপাখ্যান ।
বাংলাদেশের লেখকদের দুর্ভাগ্য যে, তাদের স্বাধীনভাবে লেখার সুযোগ কম। কখনো তাদের চিন্তা করতে হয় নিজের ঘাড়ের উপর বসানো কল্লাখানার কথা, কখনো পাঠকদের কথা, আর অতি অবশ্যই প্রকাশকদের কথা। প্রথমটা যেহেতু দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে, সেখানে নিজের কল্লাখানা বন্ধক রেখে কেউ লিখবেন অতটা আশা করি না। তবে পরেরগুলো পাঠক-প্রকাশক মিলে চাইলে খানিক বদলাতে পারেন। বই বেশি বড় হয়ে গেলে পাঠক পড়তে বা কিনতে চায় না, ওদিকে প্রকাশকও পয়সার চিন্তা করে ছাপাতে চায় না। যদিও একবেলা রেস্টুরেন্টে খেয়ে যা বিল আসে আমাদের দেশে মোটাসোটা একটা বইয়ের দাম তারচেয়েও কম, কিন্তু আলীসাহেব তো শতবর্ষ আগেই লিখে গেছেন--সিনেমার টিকিটের কিউ থেকে, নাকি ফুটবল মাঠ থেকে?" শোণিত উপাখ্যানের ২য় খণ্ডে এই "পাঠক-প্রকাশকের চাহিদা" স্পষ্ট। বাবুর-আটিলা-চেঙ্গিজ, এদের প্রত্যেককে নিয়েই একটা না হলেও আধাটা করে বই লেখা যেত, মানে কিনা, এই খণ্ডটাকে কম করেও দু'টো খণ্ডের সমান করা যেত। লেখকের মাঝে সেই সামর্থ্য ছিল, শুরুতে মনে হয় ইচ্ছেও ছিল, কিন্তু শেষমেশ তাড়াহুড়ো করে কোনমতে বাবরের লেজ ধরে বাকিদের হাওয়া করে দিলেন (পরের খণ্ডে আছি বলেই জানি)। মূল কাহিনীর সাথে এরপরেও চমৎকার জোড়া লেগেছে (এটাও পরের খণ্ডে), কিন্তু সবকিছু নিয়ে আরেকটু গুছিয়ে বড় করে সময় নিয়ে লিখলে এটা একটা মাস্টারপিস হতে পারতো। দায়টা লেখককে দিচ্ছি না, আমাদের পাঠসংস্কৃতিরই দোষ। অনির্বাণ একজন ন্যাচারাল স্টোরিটেলার; কাহিনীর গতি যেমন ধরে রাখতে পারেন, গল্প বুনতে এবং জোড়া লাগাতেও পারেন দারুণভাবে। কিন্তু লেখার ভাষা আর সংলাপ তার সেই দুর্দান্ত স্টোরিটেলিংয়ের তুলনায় রীতিমত ছেলেমানুষি লাগে। তিনি নিজে বা একজন ভাল সম্পাদক যদি বিষয়টা নিয়ে কাজ করতেন, তাহলে ভাল হতো। শেষমেশ ৩ (আসলে সাড়ে ৩) দিচ্ছি এই ভাষাগত দুর্বলতা, কিছু শব্দের বারম্বার বেখাপ্পা প্রয়োগ আর তাড়াহুড়ো করার কারণেই, কিন্তু সত্যি বলতে কি, কাজীদা'র পর (তাঁর মৌলিক লেখাগুলো ধরলে) এত দুর্দান্ত স্টোরিটেলার এই রোমান্ঞ্চোপোন্যাসের (আরবান ফ্যান্টাসি-থ্রিলার-স্পাই-হরর-নয়্যার-ডিটেকটিভ সবকিছুকে একসাথে ধরলাম) লাইনে আর দেখিনি। দুই রাতে বাচ্চাকাচ্চা ঘাড়ে নিয়ে আড়াইটা বই শেষ; ভদ্রলোক লিখে গেলে শুধু তাঁর নয়, আমাদের পাঠকদেরও লাভ। একটাই অনুরোধ, পরের সিরিজগুলো একটু বড়সড় করেই লিখুন, সময় নিন, ভাষার উপর আরেকটু কাজ করুন। পাঠক নাদান হলেও আপনার শুভাকাঙ্ক্ষী, চাটুকারের চেয়ে বেশি উপকারী।
বাংলায় ফ্যান্টাসি উপন্যাস লেখাটা সহজ কাজ নয় মোটেও। অথচ সেই কাজটিই লেখক করিয়ে দেখিয়েছেন দক্ষতার সাথে, সে জন্যে তাকে সাধুবাদ। প্রথম বইটা পড়তে না পড়তেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, সে তুলনায় এটার কলেবর বেশ বড়। তিন ভাগে বিভক্ত। তিনটি অংশই ভালো লেগেছে। :) অনেক প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা, শিঘ্রই তৃতীয় বইয়ের মাধ্যমে লেখক আমাদের সেসব জানার সুযোগ করে দেবেন বলে আশা করছি। *শুধু এটুকু বলবো যে ঐতিহাসিক অংশগুলোর বর্ণণায় আরেকটু গাম্ভীর্যপূর্ণ ভাষার ব্যবহার (হয়তো) আরো আকর্ষণীয় করে তুলতো গল্পগুলোকে। :)
উত্তর খুজতে খুজতে লেখকের শব্দের মেলায় আমরা ঘুরাঘুরি করি ৭০ পেজ এর আশেপাশে। ইতিহাস, ফ্যান্টাসি, অতিপ্রাকৃত অনেক কনসেপ্ট দারুন ভাবে তুলে দিয়েছিলেন। এর পরই শুরু হয় ঝড়! গল্পের পেস আর লেখকের লেখনি, মারাত্মক এক্সিকিউশন! সব মিলিয়ে সিরিজের মাঝের বই হিসাবে আমার এক্সপেক্টেশন থেকেও অনেক অনেক বেটার৷ যেটা খুব কম মৌলিক বই এর ক্ষেত্রে বলার সৎ সাহস হয়।
'শোণিত উপাখ্যান', সৈয়দ অনির্বাণ রচিত জনপ্রিয় বাংলা মৌলিক আরবান ফ্যান্টাসি সিরিজ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গ্রাম শহরের লৌকিক অবস্থানের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সহস্রাধিক বছরের পুরনো অতিপ্রাকৃতের অস্তিত্ব আর সেটাকে ঘিরে ঘটতে থাকা নানা রোমাঞ্চকর কাহিনী, এক কথায় এই সিরিজের মূল থিম এটাই। ট্রিলজির প্রথম বইয়ে দেখা যায় পুলিশ অফিসার কায়েস আর তার সাথে জোট বাঁধা অতিপ্রাকৃতিক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা চরিত্র অবলাল জড়িয়ে যায় এক রহস্যময় হত্যারহস্যের সাথে যা কিনা বিশাল এক ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দেয়।
ক্ষমতাবান শৈলেন ভটাচার্যের অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে কায়েম করতে যাওয়া দুরভিসন্ধি আটকাতে একসাথে লড়ে যায় কায়েস আর অবলাল। সেইসাথে অবলাল যেই সংগঠনে কাজ করে, সেই 'সাদা হাত' থেকে মীরানা, অবলালের প্রাক্তন সহযোদ্ধা ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস যোগ দেয় তাদের সাথে। একদিকে শৈলেন ভট্টাচার্যের পাঠানো নানান টাইপের মন্সটারদের আক্রমণ, অন্যদিকে এই রহস্যময় জগতের সব ব্যাপার পরিষ্কার না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পরে, তখনই কায়েসকে অবলাল জানায় এ সব কিছুর ইতিহাস, শোণিত উপাখ্যানের অতীত ইতিহাস।
এই লৌকিক জগতের সাথে জড়িয়ে আছে দেবলোক অ্যাস্ট্রাল কিংবা এই জগতের মাঝে লুকিয়ে থাকা অতিপ্রাকৃতিক শক্তি। এর ইতিহাস বহুদূর সমাদৃত, যার সাথে জড়িয়ে আছে সম্রাট আলেক্সান্ডার, আটিলা দা হান কিংবা চেঙ্গিস খানের মতো ইতিহাসের মহারথীরা। এই উপাখ্যানের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইতিহাসের অবিভক্ত বাংলা অঞ্চলের এক গোপন শোণিত মন্দির, যাতে আরাধনা করা হয় শোণিত বা রক্তের। এই মন্দিরের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রধান, উপপ্রধান লোকেদের রয়েছে বিশেষ কোনো ক্ষমতা। মৃত্যুগামী পুত্রকে বাঁচাবার জন্যে সম্রাট বাবর তাই চেয়ে বসেন শোণিত মন্দিরের প্রধানকে। বিশেষ এই কাজের দায়িত্ব দেওয়া হলো তার শ্রেষ্ঠ সৈনিক রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুরকে। বাঘাতুরের এই অভিযান কিভাবে বদলে দেয় শোণিত মন্দিরের ইতিহাস?
অবলাল, ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস এরা কিভাবেই বা পেয়েছে অতিমানবীয় ক্ষমতা? কিভাবেই বা তারা এসেছে সাদা হাত সংঘ কিংবা অতিপ্রাকৃতিক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পথে? রুমি, কলেজপড়ুয়া এক সাধারণ ছেলে। অল্প বয়স, তাই বন্ধুকে মারার প্রতিশোধ নিতে দলবল নিয়ে হাজির হয় এমন এক চর গ্রামে, যেখানে রাতে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না কেউ। কিন্তু সেখানে যেতেই তার দলের সবাইকে বরণ করতে হয় নৃশংস পরিণতি। কোনোমতে বেঁচে যায় রুমি, তবে আটকা পরে সেই পিশাচের গ্রামে। এখন হয় রুমীকে বরণ করতে হবে বন্ধুদের মতো ভয়ংকর মৃত্যু কিংবা আরও পৈশাচিক পরিণতি। কি হবে তার ভাগ্যে? এই শোণিত উপাখ্যানের শেষটা কোথায়?
ফ্যান্টাসি জনরাটা কেন জানি আমার কখনো সেরকমভাবে পড়া হয় নি। জনপ্রিয় সব ফ্যান্টাসি সিনেমা-সিরিজ হ্যারি পটার, লর্ড অফ দ্য রিংস, গেম অফ থ্রোনস কিংবা তাদের কিংবদন্তিতুল্য সোর্স ম্যাটেরিয়াল বইগুলো আমাকে সেরকমভাবে আকর্ষণ করে নি কখনো। শুধুমাত্র গল্পের গৌণ সাবজনরা হিসেবে কিছু বই সিনেমায় যা পাওয়া আর কি। তবে ফ্যান্টাসি বিশেষ করে আরবান ফ্যান্টাসি জনরাটার সাথে পরিচয় আমার মৌলিক বাংলা বই 'অক্টারিন' আর 'শোণিত উপাখ্যান: বর্তমান' পড়ে।
সেগুলো পড়ে বুঝতে পারলাম আরবান ফ্যান্টাসির স্বাদ নিতে এতো দূরে যেতে হবে না, তরুণদের ক্রেজ (এখন যদিও একটু কমে গিয়েছে) মার্ভেল-ডিসির সুপারহিরো ইউনিভার্সের সিনেমাগুলো দেখা থাকায় এই জনরাটা ভালোই চিনা হয়েছে বলতে গেলে। সেকারণে শোণিত উপাখ্যান: বর্তমান বইটা আমার কাছে খুবই গতানুগতিক ঠেকছিল। যদিও সেটার কাহিনী ছিল গতিশীল, কিছু ইন্টারেস্টিং চরিত্র ছিল, তারপরও সেই গল্পের প্রতি তেমন আকর্ষণ বোধ করছিলাম না। সেকারণেই বিশাল ক্লিফ হ্যাঙ্গার থাকা সত্ত্বেও ট্রিলজির পরবর্তী বই 'শোণিত উপাখ্যান: অতীত' পড়তে ইচ্ছে করে নি।
প্রথম বই শেষ করার প্রায় দুই বছর পর এই বইটা ধরা। একদিকে পড়াশোনার চাপে উপভোগ করে বই পড়ার মতো অবস্থায় নেই, সেইসাথে শেষ দুই মাসে যতগুলো থ্রিলার পড়েছি তারমধ্যে সবই স্লো-বার্ন, সেগুলোর খুব কমই পড়ে আমি তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে পেরেছি। তাই শোণিত উপাখ্যানের সেই টান টান উত্তেজনা, উপভোগ্য অ্যাকশন দৃশ্যগুলোর আশায় এই বইটা ধরা। যদিও বইয়ের শুরুটা ছিল প্রচন্ড স্লো, যা পড়তে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল।
'শোণিত উপাখ্যান: অতীত' বইটা মূলত তার নামের মতোই এই ইউনিভার্সের মূল সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার আর চরিত্রগুলোর অতীত নিয়ে। মূলত তিনভাগে এই অতীতের গল্প বলা হয়েছে। প্রথম ভাগ 'সুদূর অতীত' অধ্যায়ে রয়েছে এই অতিপ্রাকৃত শক্তির সাথে ইতিহাসের কিছু মহারথীদের সম্পৃক্ততার কাহিনী। যারমধ্যে সম্রাট বাবরের অংশটা গল্পের জন্য কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বলতেই হচ্ছে খুবই দূর্বল গল্পের প্রথম ভাগটা। হিস্টোরিকাল থ্রিলারে এর চাইতে আরও ভালো লেখা বাংলা মৌলিকে আছে, আর সেগুলো পড়া থাকায় দূর্বলতাটা আরও চোখে পরে।
এমনকি সেই অংশটাকে খুব একটা দরকারিও মনে হয় নি। লেখক হয়তো ফ্যান্টাসি হিসেবে ওয়ার্ল্ড বিল্ডআপ করতে চেয়েছেন, তবে আমার চোখে তা অপ্রয়োজনীয়। কারণ সিরিজটাই এমন, এখানে লেখক কাহিনীর মধ্যে যা যা আমদানি করবে, গল্পের গাঁথুনির সাথে তা কোনোভাবে মিলে যায়। এই অপ্রয়োজনীয়, বোরিং, দূর্বলভাবে লিখিত ইতিহাসের দরকার ছিল না। একে তো ইতিহাসের কাহিনীগুলোর তেমন ওয়েল বিল্ডআপ নেই, সেইসাথে মূল গল্পের সাথেও তার সংযোগও খুব একটা নেই। বাবরের কাহিনীটার কিছুটা আছে, তবে সেটা অপর্যাপ্ত। তাই এই অংশটা ছিল খুবই হতাশাজনক, সেইসাথে দূর্বল লেখার কারণে খুব বোরিংও।
ফলে ট্রিলজির প্রথম বইয়ের মতো একদম শুরু থেকেই এই বইটা গতিশীল, তা বলা যায় না। তবে এর পরবর্তী পর্ব 'পিশাচের গ্রাম' সব হতাশা মিটিয়ে দিয়েছে। গতানুগতিক হলেও উপভোগ্য গল্প, চমৎকারভাবে চিত্রিত কিছু চরিত্র, অবলালের অরিজিন স্টোরি, সাদা হাত কিংবা অতিপ্রাকৃতিক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করা সংঘের কার্যকলাপের চমৎকার পরিবেশন, কিছুটা নন লিনিয়ারলি ইন্টারেস্টিংভাবে গল্পের প্রেজেন্টেশনের জন্য বইয়ের এই ভাগটা সবচেয়ে বেশী উপভোগ করেছি। তবে এই পর্ব তথা পুরো বইয়ের বেস্ট পার্ট হচ্ছে একটা লম্বা অ্যাকশন দৃশ্য। দূর্দান্তভাবে লেখা সেই অংশটা পড়ার সময় বহুদিন পর টান টান উত্তেজনার স্বাদ পেলাম থ্রিলার বইয়ে।
তৃতীয় পর্বে অবলালের সাদা হাতে রিক্রুট হওয়ার পরের জীবন আর ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াসের অরিজিন গল্প দেখানো হয় নন লিনিয়ারলি। দ্বিতীয় পর্বের তুলনায় তা কিছুটা স্লোভাবে শুরু হলেও, লেখক নন লিনিয়ারলি মোটামুটি আগ্রহোদ্দীপকভাবেই গল্পটা বলেছেন। তাতে ছোটখাটো দুয়েকটা অ্যাকশন দৃশ্য ছিল, যা 'পিশাচের গ্রাম'এর মতো না হলেও উপভোগ করেছি। শেষটা যেভাবে করা হয়েছে আগের ক্লিফ হ্যাঙ্গারে তা খারাপ না।
ট্রিলজির দুই বইয়েই লেখকের সাবলীল লেখনী বিদ্যমান যা এই ধরণের গল্পের জন্য জরুরী। তবে যেদিকটা এই বইকে 'শোণিত উপাখ্যান: বর্তমান' থেকে বিশেষ করে তুলেছে তা হলো চরিত্রায়ন। গতানুগতিক হলেও গল্প বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রগুলোকে লেখক বেশ ভালোভাবেই গড়ে তুলেছে, এরমধ্যে কিছু চরিত্র ছিল পছন্দসই। সেইসাথে বহুদিন পর এমন একটা গতিশীল থ্রিলার পড়ে ভালো লাগছে। তাই সবমিলিয়ে ট্রিলজির আগের বইয়ের চাইতে 'শোণিত উপাখ্যান: অতীত'ই বেশী ভালো লেগেছে।
ভাল বলবো। খুব ভাল হবার সুযোগ তৈরি করেছিলেন লেখক কিন্তু শেষপর্যন্ত যেন সুযোগগুলো কাজে লাগানো হলনা। তবে, “শোণিত উপাখ্যানঃ বর্তমান” এর চেয়ে একটা জায়গায় দারুণ এগিয়ে আছে “শোণিত উপখ্যানঃ অতীত”। সে হল সংলাপ। প্রথম পর্বে সংলাপ নিয়ে অনেক বেশি নাখোশি ছিল। চরিত্রের বর্ণনা’র সাথে সংলাপ একেবারে যাচ্ছিলনা, সংলাপে ভীষণভাবে কলকাতা সাহিত্যের ছাপ, ৮০’র দশকের কথা বলার ঢং এইসব কারণে দারুণ একটা গল্প মান হারাচ্ছিল নিয়তঃ। ২য় খন্ডে সেসব নাখোশি একদম নেই। লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই তার জন্যে। ৮৬ আর ৮৭ পৃষ্ঠায় “হয়েছে আর বাগাড়ম্বর করতে হবেনা” এবং “ডেঁপো ছোকরা” সংলাপ দুটো বাদ দিলে একদম ফ্ললেস বলতে পারি পুরো বইয়ের সংলাপকে। আমি ভীষণ খুশি হয়েছি সংলাপের এই উত্তরণে।
১ম বইয়ের তুলনায় গল্পে খানিক পিছিয়ে যাবে ২য়টা। ঘটনা, চরিত্র, টার্ন এ্যান্ড টুইস্ট মিলিয়ে দারুণ ছিল “শোণিত উপাখ্যানঃ বর্তমান”। “বর্তমান” এর তুলনায় “অতীত” বইটা একটু সরলরৈখিক হয়ে গেল। ফরম্যাটে আপনি নন-লিনিয়ারই পাবেন কিন্তু গল্পের জায়গায় ১ম বইটার তুলনায় সাদামাটা একটু। সেটা খুব দোষের মনে হয়নি আর পড়তেও খারাপ লাগেনি।
বলছিলাম, সুযোগ তৈরি করেও কাজে লাগালেন না লেখক। আটিলা দ্য হান, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, সম্রাট বাবর এর মতো চরিত্রের পেছনে অনেকগুলো পাতা খরচ করা হল এখানে।
* তাতে অবলাল, আন্দ্রিয়াস কিংবা শৈলেনের (এ বইয়ে আসেনি চরিত্রটি) গল্পের লাভ হল কি? * কোন চরিত্রের কি প্রত্যক্ষ সংযোগ তৈরি করা হল তাদের সাথে? (বাবরের সাথে হয়েছে খানিক, সেটা জোরালো কিছু নয়।) * শুধু যদি এটুকু বলাই হত, আটিলা দ্য হান, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট কিংবা সম্রাট বাবর “বেসিলি” সম্বন্ধে জানতেন কিংবা ব্যাবহার করতেন অতিপ্রাকৃত যোগশাজস; তাহলেও কি গল্পের ক্ষতি হত কোন? * শৈলেন ১ম বইয়ে আটিলা দ্য হানের ইঙ্গিত দিয়েছিল। ভেবেছিলাম এ বইয়ে তার বিস্তার পাব, শৈলেনের সাথে যোগটা পাব। সেদিকটা উপেক্ষা করে গেছেন লেখক। * পরবর্তী ভাগের জন্যে যদি “সুদূর অতীত”র কিছু তুলে রাখেন, সে ইঙ্গিতটা পাওয়ারও আশা থাকে পাঠকের। তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।
অবলালের অতীত, পিশাচের গ্রাম, জীবন্মৃত অধ্যায় গুলো এংগেজিং ছিল। কেবল সুদূর অতীত অধ্যায়টি একটা কালোদাগ হয়ে রইলো বইয়ে। উল্লেখিত ৩টি অধ্যায় মিলেই “শোণিত উপাখ্যানঃ অতীত” পরিপূর্ণ হতে পারতো বোধহয়। বর্ণনা একটু বেশি মনে হলেও, ওই ৩ অধ্যায় খুব আরাম করে পড়া গ্যাছে কন্টেন্টের জোরে। বিশেষতঃ পিশাচের গ্রাম আর অবলালের অতীতে যেভাবে মেলানো হল একসাথে; সত্যিই দারুণ। পিশাচের গ্রাম’র পরিণতির সময়টাতে লেখক তার দক্ষতার শীর্ষে ছিলেন। ভীষণ সুখপাঠ্য হয়েছে জায়গাটা।
পাশাপাশি অন্দ্রিয়াসের অতীত, উপন্যাসকে আলাদা একটা স্বাদ দিয়েছে। এই ভিন্ন ধরণের দুটো স্বাদ মগজে ঘুরে-ফিরে বেড়িয়েছে “সুদূর অতীত”কে পাশ কাটিয়ে। “বাঘাতুর” কিছু প্রশ্ন তৈরি করে দিয��ে হাপিশ হয়ে গেল, হয়তো সেটা পরবর্তী ভাগের জন্যে হুক। স্পষ্ট ইঙ্গিতটা ছিল মীরানা। প্রচ্ছদ নিয়ে অাক্ষেপ আছে খানিক। “শোণিত উপাখ্যান” এর দুটো ভাগেই গল্প যে উচ্চতায় রয়েছে, প্রচ্ছদ কোনবারেই সে উচ্চতা ছুঁতে পারেনি। চমৎকার এই গল্পদুটোর জন্যে তাই মায়াই লাগে।
আরও একটা প্রশ্ন রয়ে যায়। “অবলাল” এর এহেন নামকরণের একটা ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে। যৌক্তিকই ব্যাখ্যাটা। কিন্তু নামটা তো পছন্দ ছিলনা অবলাল এর। আর “শোণিত উপাখ্যানঃ বর্তমান” এর শেষ কয়টা পাতার আগে অান্দ্রিয়াসের সাথে দেখা হয়নি তার। তাহলে পছন্দ না হওয়া নামটাই কেন প্রতিষ্ঠিত করলো “অবলাল” ট্রিলজির শুরু থেকে?
অবলাল আর তার বাবার অতীত, অাশিন ডাকাত, পিশাচের গ্রাম, আন্দ্রিয়াসের অতীত; এই হল “শোণিত উপাখ্যানঃ অতীত” এর পিলার। আর ভাল লেখার গুণে (একটু বেশি বর্ণনা বাদ দিয়ে) পিলারগুলো বেশ মজবুতভাবেই প্রোথিত এখানে।
বাংলা সাহিত্যের প্রথম আরবান ফ্যান্টাসি হিসেবে ট্রিলজির প্রথম বই "শোণিত উপাখ্যান- বর্তমান" ইতোমধ্যেই দারুণভাবে পাঠক- জনপ্রিয়তা অর্জন করে ফেলেছে। এ নিয়ে নতুন করে কিছু বলতে যাওয়া অতি বাতুলতা !!
বর্তমান যদি হয় প্রশ্ন, তবে অতীত নিছক কোন ইতিহাস নয় !! সেই ধারাবাহিকতায় "শোণিত উপাখ্যান- অতীত" হচ্ছে "বর্তমান"-এর বিশ্লেষণ। "বর্তমান"-এর ধোঁয়াটে ভাবটাকে উপযুক্ত ব্যাখ্যার মাধ্যমে পাঠক সমাজের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরাই ছিল "অতীত"-এর উদ্দেশ্য। বইটিকে লেখক মূলত তিনটি অংশে ভাগ করেছেনঃ
১। 'সুদূর অতীত'_ হিস্টোরিকাল ফ্যান্টাসি নির্দেশক_ এখানে বলা হয়েছে হাজার বছরের পুরনো রক্তের মন্দির, শোণিত মন্দিরের রচিত ইতিহাস। লেখক সাহেব পাঠকদের জন্য একটা টাইম মেশিনের ব্যবস্থা করেছেন এ অংশে। সেই টাইম মেশিনের বদৌলতে অ্যালেক্সান্ডার, আটিলা, চেঙ্গিস খান আর মুঘল সম্রাট বাবরের দরবার খুব সহজেই প্রত্যক্ষ করা গেছে। বীরযোদ্ধা বাঘাতুর আর শোণিত মন্দিরের উপ-প্রধান, পুরোহিত অবলোহিতের ঐতিহাসিক গল্পের মাধ্যমে অতীত-বর্তমান, ফিকশন- নন ফিকশনের বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তরও মিলেছে। নন ফিকশন, কিংবা ইতিহাসে আগ্রহী নয় এমন কারো কাছে প্রথমে হয়তো এ অংশটা কিঞ্চিত বিরক্তিকর মনে হইতে পারে, তবে আমি হলফ করে বলতে পারি- কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর এই অংশই পাঠকদের মনে দাগ কাটবে বেশি।
২। 'পিশাচের গ্রাম'_ আরবান ফ্যান্টাসির সামান্য অন্তর্ভুক্তিতে গ্রামীণ মিথলজিকাল ফ্যান্টাসি নির্দেশক_ গল্পের ধারাবাহিক গতিশীলতায়- পিশাচ সাধনা এবং তরঙ্গের 'অবলাল' হয়ে ওঠায়ই এ অংশের মূল উপজীব্য। 'সাদা হাত' সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা দেয়া হয়েছে এখানে। আরও বলা হয়েছে তরঙ্গের পরিবার ও পারিবারিক ঐতিহ্যের গল্প। কলেজ পড়ুয়া রুমী, ঝুমুর এবং এক অনন্য মোহিনী সাধক এ অংশে যোগ করেছে এক অভূতপূর্ব মাত্রা, অস্বাভাবিক রকমের পৈশাচিকতা। কুখ্যাত ডাকু অশিন এবং তার দল গল্পকে করেছে জীবন্ত। লেখক তার এ অংশের লেখনীকে পুরোপুরি জ্যান্ত করে ছেড়েছেন। বর্ণনাগুলো যেন চামড়ার চোখে চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি।
৩। 'জীবন্মৃত'_ আরবান ফ্যান্টাসি নির্দেশক_ এ অংশ নিশ্চিত করেছে ট্রিলজির প্রথম বই এ ঝলক দেখানো ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াসের পরিচয় ও 'সাদা হাতের' সাথে তার সম্পর্কের তিক্ততার কারণ। আগের অংশে তরঙ্গ 'অবলাল' হয়ে ওঠার পথে পা বাড়ালেও তা পূর্ণতা পায় এ অংশে। এ অংশ আরও আলোকপাত করেছে অবলাল এবং মীরানা মরেসের পারস্পারিক সম্পর্কের রহস্যময়তার উপর। অনেক অসমাপ্তের সমাপ্তি অপেক্ষা করছে এখানে।
বি দ্রঃ ১। ভূমিকাতে লেখক লিখেছেন যে- 'উনি বইটা লিখে যথেষ্ট আনন্দ পেয়েছেন- এবং পাঠক যদি তার ভগ্নাংশও পান তবে তিনি তার পরিশ্রমকে সার্থক ধরে নেবেন।'_ আমি মোটামোটি নিশ্চিত পাঠক এ বই পড়ে উনার থেকে বেশি বৈ কম আনন্দ পাবেন না। অন্তত আমার বেলায় তাই হয়েছে। উনি চিন্তাও করতে পারবেন না যে মনের অজান্তে তিনি কতোখানি আনন্দের খোরাক জুগিয়ে ফেলেছেন সকল বয়সী পাঠক সমাজের জন্য !! ফ্যান্টাসি ঘরানা দিয়ে পাঠকদের তার একান্ত জগতে টেনে আনতে খুব সম্ভবত, তিনি সফল, পুরোপুরি !! ২। আদী প্রকাশনের বোধহয় বানানের ব্যাপারে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত !! এক বানান ভুলের আধিক্য বিরক্তির উদ্রেক ঘটাইতে যথেষ্ট- তা যত ভাল বিষয়বস্তুই হোক না কেন !!
যারা "শোণিত উপাখ্যান : বর্তমান" পড়েছিলেন এবং আরবান ফ্যান্টাসি জনরার এই ট্রিলজির প্রথম পর্ব ভালোবেসেছিলেন সেই পাঠক মাত্রই জানেন এই দ্বিতীয় পর্বের জন্য কতটা অপেক্ষা করতে হয়েছে। অবেশেষ লেখক আমাদের প্রতিক্ষার মূল্য দিলেন। ট্রিলজির দ্বিতীয় পর্ব আমাদের উপহার দিলেন
শোণিত উপাখ্যান : বর্তমান শেষ হয়েছিল অবলালের সব অতিত ঘটনা বলার শুরু থেকে। এই পর্বে তাই হয়েছে। এই ঘটনার শুরু কোথায় তা বর্ণনা করা হয়েছে।
মূল লেখাটা ভাগ করা হয়েছে তিনটি অধ্যায়ে। প্রথম অংশ : সুদূর অতিত। এই ঘটনার ব্যাপ্তি রয়েছে সুদূর অতিতে। অতিতে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে যার কোন লৌকিক ব্যাখ্যা দেয়া যায়নি। ইতিহাস ভুলে গেছে সেই সব ঘটনা। কিন্তু সেই সব ঘটনার অন্তরালে রয়ে গেছে অনেক না বলা কথা। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, আটিলা দ্য হান, চেঙ্গিস খান বা মোঘল সম্রাট বাবরের জীবনে জড়িয়ে আছে এমন অনেক ঘটনা।
দ্বিতীয় অংশ : পিশাচের গ্রাম। এই অংশে বলা হয়েছে অবলালের বেড়ে উঠার কাহিনী। পিতৃ-মাতৃহীন ছোট্ট ছেলের অসীম ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কাহিনী। এই সাথে রুমী আর ঝুমুরের জীবনে উঠা ঝড়ের বর্ণনা। কি হয়েছিল পিশাচের গ্রামে? ওরা বেঁচে ফিরতে পারবে তো?
তৃতীয় অংশ : জীবন্মৃত। ক্যাপ্টেন আড্রিয়াস কে? কোথা থেকে এলো সে? কেনইবা অতিপ্রাকৃত ঘটনা মোকাবিলা করার সংগঠন সাদা হাতের সাথে তার শত্রুতা? সব জানা যাবে এখন। ক্যাপ্টেন আড্রিয়াসের ছায়াতলে কাজ করা তরঙ্গের নাম কিভাবে অবলাল হয়ে গেল। কেন মিরানা তরঙ্গের সাথে বার বছর আগে রাগ করে চলে গিয়েছিল। কেন ভুল বোঝাবুঝি হয়েছিল। সব সামনে আসবে এবার। মিরানা হয়ত ক্ষমা করে দিবে তাকে। ঠিক এই সময়ে এটা কি হয়ে গেলো? কি করে এর সমাধান করবে তরঙ্গ।
বইটা শেষ করে ঠিক গতবারের মত অনুভূতি। কি যেন হলো না। কেন এখানেই শেষ হয়ে গেল। লেখক কেন বারবার এমন পরিস্থিতিতে ফেলছেন।।।
রেটিং ৩.৫/৫। এনজয়েবল। কাহিনির তিনটে অংশের মাঝে প্রথমাংশটা বেশ ধীরে পড়া হয়েছে। কাহিনিতে ঢুকতেই পারছিলাম না মনে হচ্ছিল। যেই না "পিশাচের গ্রাম" শুরু হলো, তড়িৎ গতিতে শেষ হয়ে গেল বইটা। তবে বানান ভুলের আতিশয্যে পড়ার মজাটা নষ্ট হয়েছে বহুলাংশে। যাই হোক, ট্রিলজির শেষ বইটা শুরু করলাম। লোহিত, ভট্টাচার্য বংশ, এদের কী হয়েছিল এ সবকিছুর উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায়।
এই বইটি শোণিত সিরিজের মধ্যে তিনটি ভূমিকা পালন করতে চেয়েছে। সেগুলো হল: ১. শোণিত বা রক্ত-কে নিয়ে চলা অতিলৌকিক এক ভয়াল সংগ্রামের সঙ্গে মানবেতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী কয়েকটি অধ্যায় ও চরিত্রকে মিশিয়ে দিয়েছে এই উপাখ্যান। এর ফলে এটি ফ্যান্টাসির পাশাপাশি অল্টারনেট হিস্ট্রিও হয়ে দাঁড়িয়েছে কিছু-কিছু ক্ষেত্রে। ২. মূল (ঘটমান বর্তমান) কাহিনিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া চরিত্রদের পুরোনো ইতিহাসের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৩. অতীতের কথা বলেও ঘটনাক্রমকে আবার আপ-টু-ডেট করে দেওয়া হয়েছে, যাতে আমরা শেষ ল্যাপের ঊর্ধ্বশ্বাস দৌড়ের জন্য প্রস্তুত হতে পারি। উইলফুল সাসপেনশন অফ ডিসবেলিফ— যা ফ্যান্টাসি-পাঠের অত্যাবশ্যক শর্ত— মেনে চলতে পারলে বাংলায় অদ্বিতীয় এই সিরিজটি ভরপুর উপভোগ করা যাবে। সুযোগ পেলেই পড়ে ফেলুন।
খুবই ভালো লেগেছে শোনিত উপাখ্যানের ২য় পর্ব টি। লেখক খুবই সুন্দর করে সামঞ্জস্য বজিয়ে রেখেছে প্রথম ও দ্বিতীয় খন্ডের মধ্যে। প্রথমে ইতিহাস দিয়ে শুরু করে পরে বলে গিয়েছেন প্রতিটি চরিত্রের অতীত। কোন তাড়াহুড়ো নেই, নিখুঁত ব্যাখ্যা দিয়েছেন গল্পের প্রতিটি চরিত্রের অতীতের। বলেছেন তাদের উন্থানের ইতিহাস....সাবলীল লেখনী প্রশংসার দাবি রাখে। এই সিরিজটা এখন পর্যন্ত আমাকে খুবই সেটিসফাইড করেছে। অহেতুক কিছু মনে হয় নি। এই সিরিজটার শেষ বইয়ের অপেক্ষায় আছি, আশা করি ওটাও ভালো লাগবে!
এই গল্পটা আগেরটার প্রিকুয়্যাল, তাই এর নামটা অতীত। কিন্তু আসলে এটা একটা গল্পেরই মধ্যম পার্ট। আগেরটা পড়ে শেষ হয়নি বলে দুঃখ পেয়েছিলাম কারণ তখনো এই ব্যাপারটা জানা ছিলো না, এখন জানার পর আগের সেই আক্ষেপটা আর নেই। এমনকি এই গল্পের শেষটা পড়েও একটু দুঃখ পেয়েছি, কিন্তু সেই দুঃখটা শেষটার অপেক্ষা করতে হবে এই জন্য! এটা আমার এই বছরে পড়া বইগুলোর মধ্যে মনে করে রাখার মতো চমৎকার একটা বই! যাই হোক, এবারের কাহিনী আরও সুন্দর! ইতিহাসকে পুঁজি করে তার ভিতরে অতিপ্রাকৃতের ব্যাপারগুলো এনে এর প্রথম পার্টকে একটা হিস্টোরিক্যাল ফিকশনে রূপ দেয়া হয়েছে। এবং এই পার্টটা আমার কাছে বেস্ট মনে হয়েছে! পরের পার্ট এ অবলালের ছোটবেলা, অতিপ্রাকৃতের সাথে ওর পরিচয় এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা অর্জনের যে দীর্ঘ ভ্রমণ তার পাশাপাশি পিশাচ গ্রামের বেশ কিছু ঘটনা যার শেষ অবলালের হাতেই হয়েছিলো; এই সব নিয়েই লেখা। সেই অংশটাও সুন্দর। শেষ পার্টে এসেছে ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াসের কথা, হোয়াইট হ্যান্ডের সাথে ওর পরিচয় ও পরিণয়, অবলালের মানা কন্ট্রোল করার অক্ষমতা, মিরানার সাথে ওর পরিচয় এবং দীর্ঘ সময়ের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণ। তবে প্রতিটা পার্টেই অ্যাকশনের বেশ কিছু রোমাঞ্চকর বর্ননা আছে। আর একদম শেষের দুই পাতা বর্তমানেরই অংশ। ইতিহাস শেষ এবার হবে বর্তমানের সমাপ্তি। আশা করি শেষটার জন্য খুব বেশীদিন অপেক্ষা করতে হবে না! বি. দ্র. ঃ দুইটা বইএর কভারই অসাধারণ। আর এই অবলাল চরিত্রটার উপর রীতিমত ক্রাশ খেয়ে বসে আছি!
ট্রিলজির দ্বিতীয় পর্বটা পড়ে খুব একটা ভাল লাগেনি। এবারের পর্বে মূল চরিত্রগুলার অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করা হয়েছে। খুব সংক্ষেপে অনেক কিছু কাভার করতে গিয়ে আসলে কোনটাই ভাল করে জানান দিতে পারেননি লেখক। মূল মন্দির, শোনিত মন্দির নিয়ে সলিড কোন কিছু পাইনি। আর বিভিন্ন ধরনের যাদু বিদ্যা আর শক্তির সাথে পরিচয় পর্বটাও আমার কাছে অনেক বেশী লম্বা আর এলোমেলো লেগেছে। প্রথম পর্বের তুলনায় দ্বিতীয় পর্বটা অনেক বোরিং লাগল। আশা করি শেষ পর্বটা আশাহত করবে না।
আগের কিস্তির চলমান কাহিনী। গল্পের খাতিরে ঐতিহাসিক চরিত্র সব আসছে, গল্প আগাইছে নিজের গতিতে, উপভোগ করছি। তবে আগের বারের মতো ভয়ের কোনো এলিমেন্ট নাই। হেহে
আমি সাধারণত কোনো বই শেষ করার পর কয়েক ঘন্টা গ্যাপ দিয়ে এরপর আরেকটা বই হাতে তুলে নেই। কিন্তু ১ম পর্বের ক্ষেত্রে যেমনটা বললাম, কোনো প্রশ্নেরই উত্তর না পাওয়ায় আগেরটা শেষ করেই সাথে সাথে এই বইটা হাতে তুলে নেই। কিন্তু একি!! এখানে যে একেবারেই ভিন্ন এক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ভেবেছিলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো আগের গল্পের খেই ধরা হবে। কিন্তু না, একের পর এক আলেক্সান্ডার দ্য গ্রেট, আটিলা দ্য হান, চেঙ্গিস খান এবং মুঘল সম্রাট বাবরের কাহিনী দিয়েই এগুতে থাকে বইয়ের গল্প৷ আর ইতিহাসের এইসব মহারথীদের অলটারনেট হিস্টোরির যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন তা চিন্তা করতে চিত্তাকর্ষক মনে হলেও, লিখনশৈলী ছিলো প্রচন্ড রকমের দূর্বল। লেখক 'শো' এরচেয়ে 'টেল' এর দিকে নজর দিয়েছেন বেশী। এতোটাই যে পাঠকের মনে ঐতিহাসিক ঘটনাগুলোর আলোড়ন জন্ম দেয়ার বদলে, মনে হচ্ছিলো যেনো পাঠককে জোর করে বলা হচ্ছে, 'এটাই ঘটেছে, মেনে নাও'!! আমার মতো ইতিহাস পাগল মানুষেরও বইয়ের এই অংশগুলো পড়তে গিয়ে কেমন বেখাপ্পা লাগছিল। আগের বইয়ে লিখনশৈলী একটু দূর্বল লাগলেও, এই পর্বে মনে হচ্ছিলো যেনো একেবারেই ভেঙ্গে পড়েছে।
কিন্তু না, শুরুর সেই ইতিহাসের অংশ পার করার পর যখন 'পিশাচের গ্রাম' পর্ব শুরু হয়। তখন আবারও লেখক ফিরে আসেন স্বমহিমায়। গোগ্রাসে গলধ:করনের যে ব্যাপারটা, তা আমার ক্ষেত্রে হয় বইয়ের এই অংশের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একটানা। পিশাচের গ্রাম, গ্রামের পরিবেশ, তন্ত্রসাধনা, ভয়াবহতা আর নৃশংসতা সব মিলিয়ে চমৎকার লাগছিলো পড়তে। আর গ্রামের শেষ একশন দৃশ্যটা পড়ার সময় একটাই শব্দ মাথায় আসছিলো বারবার 'মাইন্ডব্লোয়িং'।
এই পর্বে অবলাল এবং ক্যাপ্টেন আন্ড্রিয়াসের ব্যাকস্টোরির মাধ্যমে বেশ অনেক প্রশ্নেরই জবাব পেয়ে যাই। অবলালের ব্যাকস্টোরির সাথে পিশাচের গ্রামের সেতুবন্ধনটা বেশ ভালো লেগেছে। আর সেটার কারনেই অবলালের পুরো অংশটুকু নিয়ে তেমন কোন আপত্তি নেই আমার। তবে অ্যান্ড্রিয়াসের অংশে আবারও সেই রিপিটেশনের সমস্যা চোখে লাগে প্রকটভাবে। একই রকমের কথাবার্তা একই রকম শব্দচয়নের মাঝে বারবার বলাটা আমার খুব একটা পছন্দ নয়। এই পর্বে 'বেসেলি' নামের নতুন আরেকটা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন লেখক। এছাড়া হাফ ব্রিড ভ্যাম্পায়ার, রয়্যাল ভ্যাম্পায়ার, মোহিনী, পিশাচ সাধক সহ নতুন কিছু অতিপ্রাকৃতিক চরিত্র গল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তরপেশ্বরের চরিত্রটার ব্যাপারে আলাদা করে বলতে হয়, প্রচন্ড শক্তিশালী এই তান্ত্রিকের ভয়াবহ ক্ষমতা পড়ার সময় বেশ অসহায় মনে হচ্ছিলো নিজেকে!
বইয়ের এন্ডিংটা চমক দিয়েই শেষ করেছেন লেখক। পুরোনো কিছু প্রশ্নের উত্তর পেলেও, বাকী রয়ে যায় মূল রহস্যটুকু আর সাথে যুক্ত হয় নতুন আরো কিছু রহস্য। ওভারঅল সব মিলিয়ে মোটামুটি লেগেছে এই পর্ব। শুরু আর শেষটুকু মন ভরাতে না পারলেও মাঝের দূর্দান্ত অংশটুকুই বইয়ের হাইলাইটস হয়ে থাকবে। আর হ্যা, বানান ভুল আর বাক্য গঠনে অসামঞ্জস্যতা প্রকট আকার ধারণ করেছে এই পর্বে। অত্যন্ত বিরক্ত লেগেছে সেটা।
শোণিত শব্দের অর্থ র ক্ত। যে র ক্তের ধারা প্রবাহিত হয় মানব শরীরে। সে র ক্তের উপাসনা হয় কোথাও কোথায়। রক্তের স্রোতে আরো বেশি শক্তিপ্রাপ্ত হয় কেউ কেউ। অতিপ্রাকৃত এই খেলায় শোণিত মন্দির যেন সেই ধারাটাই বহন করে চলে…
ইতিহাস লেখা হয় বিজয়ীদের দ্বারা। যারা পরাজিত, তাদের কেউ মনে রাখে না। রাখার প্রয়োজন হয় না। বিজয়ীরা বীর খেতাবে ইতিহাসকে ধরে রাখে। উচ্ছ্বাস, উল্লাসে তাদেরই জয়গান গাওয়া হয়। কিন্তু আমরা যে ইতিহাস জানি, তার সবটাই কি সত্য? প্রাচীন সেই সময়ের গল্পের সত্যতা যাচাই করা এখন আর সম্ভব না। তাই সেই সময়ের যে ইতিহাস আমরা জানি, এর পেছনে থাকা গোপন রহস্য আর প্রকাশ্যে আসার উপায় নেই। আড়ালের কুশীলবরা আড়ালেই থেকে যায়।
সম্রাট বাবর জানতে পেরেছেন, তার পুত্র হুমায়ূন মির্জার মৃ ত্যু আসন্ন। দেখা যায় না, এমন এক শক্তি থেকে পুত্রের এই খবর জানার পর দিশেহারা বাবর। এমনকি সময় পর্যন্ত বেঁধে দিয়েছে ওরা। কথা না শোনার শাস্তি যে ভয়াবহ, তারই যেন আভাস। তাই গোপন এক সভাকক্ষে বৈরাম বেগের সাথে পরামর্শ ব্যস্ত বাবর। সেখানেই এক সম্ভাবনার উঁকি দিলো। সেই কাজ সমাধা করলে হয়তো জীবন পাবে হুমায়ূন। ডাকা হলো রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুরকে। দিল্লি থেকে ছুটতে হবে বাঙাল মুল্লুকে। গন্তব্য, শোণিত মন্দির। যার প্রধান পুরোহিতকে নিয়ে আসতে হবে। পথে বিপদ, নানান শঙ্কা। সবচেয়ে বড় সমস্যা, সময়ের স্বল্পতা। এই স্বল্প সময় ফিরে আসতে পারবে তো বাঘাতুর?
ছলনায় ডুবে গিয়ে কত ভুল মানুষ করে ফেলে। ক্ষমতা পরম আরাধ্য এক বিষয়। সে মানুষ হোক বা দেবী কিংবা অতিপ্রাকৃত সত্তা। আর তার জন্য কিছু আচার পালন করতে হয়। অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। ছলনায় তাই কেউ কেউ গলে যায়। অ্যাটিলা দ্য হ্যানকে আমরা চিনে থাকবেন। বিশ্ব জয় যার নেশা। র ক্তের খেলায় একবার কোণঠাসা হয়ে পড়ে সে। ছলনাময়ীদের প্রবল আক্রোশের শিকার হয়। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হতে একটি বিশেষ রিচুয়াল করতে হবে। তার আগে দখল করতে হবে রোম। কিন্তু কেন, অর্ধেক পথ থেকে ফিরে আসে সে?
ছলনার শিকার হয়েছিলেন আরেকজন দিক্বিজয়ী আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট। কিন্তু তিনি নিজের শক্তিমত্তায় বিশ্বাসী। আর তাই সব একা জয় করতে চান। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ইচ্ছা পূরণ হলো না। নিজেই যে জীবন হারিয়ে অতল অন্ধকারে হারিয়ে গিয়েছে। তার কি বিশেষ কারণ আছে? না-কি স্বাভাবিক প্রথাতেই মৃ ত্যু হয়েছে তার?
বন্ধুকে মা র ধর করলে র ক্ত গরম হওয়া স্বাভাবিক। রুমীদেরও তা হয়েছে। সদ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। একটু আধটু মাস্তানি করে। যখন জানতে পারল একটি মেয়ের পেছনে গিয়ে উত্তম মধ্যম খেয়ে ফিরে এসেছে বন্ধু, তখন আর মাথা ঠাণ্ডা রাখার উপায় ছিল না। কিন্তু দলবল নিয়ে যখন নদী, খাল পেরিয়ে সেই গ্রামে উপস্থিত হলো; কে জানত না এভাবে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে!
পুরো নাম সংহার চৌধুরী তরঙ্গ। বাবা বিশেষ এক কাজে লিপ্ত। কী, সেটা জানে না তরঙ্গ। শুধু জানে এর জন্য তার বাইরে যাওয়া নিষেধ। বাবার কাছেই চার দেয়ালের মধ্যেই পড়াশোনা শিখেছে সে। কিন্তু সবকিছুর সমাপ্তি থাকে। বাবার মৃ ত্যু ঘনিয়ে আসছে। তাই রিচার্ড নামের এক বিদেশির কাছে ছেলেকে তুলেছে দিয়েছে। সেই বিদেশি তরঙ্গকে তুলে দিয়েছে এক ডাকাত অশিনের কাছে। সেখানে দীক্ষা পাচ্ছে ভিন্ন এক শক্তির। কিন্তু একদিন সব বদলে গেল। মুখোমুখি হলো তরপেশ্বর নামের এক বিভীষিকার। যে সুপ্ত ক্ষমতা তার অভ্যন্তরে লুকিয়ে ছিল, জাগ্রত হয়ে উঠল হঠাৎ-ই।
আন্ড্রিয়াস জানে না নিজের পরিচয়। ছোটবেলায় এক আচানক ঘটনার পর থেকে অন্য এক ভুবনে জড়িয়ে পড়েছে। বাবা রাতিবরের পরিচয় ভয় ধরায়। তবুও এই প্রভাব, প্রতিপত্তি ছেড়ে নিজেকে খুঁজতে বের হয় সে। সেখান থেকেই সাদা হাতের নজরে পড়ে। সেখান থেকে ঢাকার বুকে চলে আসে। তরঙ্গের শিক্ষার বাকিটা পূর্ণ হয় তার কাছেই। কোনো একদিন মীরানা নামের মেয়ে আসে বাংলাদেশে। একটু ভুল, কিংবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারার মাশুল দিয়ে অবলাল হারিয়ে ফেলে মীরানাকে। ফিরে যায় পুরোনো গন্তব্যে। আন্ড্রিয়াসও চলে যায় নিজের পথে। একা হয়ে যায় সংহার কিংবা তরঙ্গ অথবা অবলাল।
একার লড়াইটা নিজেই লড়ে অবলাল। যার সাথে যুক্ত প্রাচীন এক ইতিহাস। যেই ইতিহাস মানুষ জানে ভিন্নভাবে। কিন্তু আড়ালে থাকা অন্যরকম এক সত্যতা সামনে আসার প্রাক্কালে বিশ্বাস করার মতো সহ্য ক্ষমতা আছে তো?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
“শোণিত উপাখ্যান - বর্তমান” শেষ করার পর বেশ কিছু প্রশ্ন রেখেছিলাম। যার উত্তর মিলেছে “শোণিত উপাখ্যান - অতীত” বইটিতে। আদতেই বইটি অতীত ঘটনাকেই সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান সময়ের যে ঘটনাপ্রবাহ, তার পেছনের সংযোগ বইটিতে প্রাধান্য পেয়েছে। বিশেষ করে ঘটনার মূল কুশীলব অবলাল, অ্যান্ড্রিয়াস, মীরানা এখানে গুরুত্বপুর্ণ।
বইটি মূলত অবলালের অতীত সময়ের ঘটনাকেই বর্ণনা করে। তার এরূপ অতিপ্রাকৃত শক্তির উৎস কী? কীভাবে সাদা হাতের সাথে যুক্ত হলো, ছোট থেকে বড় হয়ে কীভাবে কতটা ভয়ংকর সময় পার করতে হয়েছে, সবই এখানে উপজীব্য। সেই সাথে অ্যান্ড্রিয়াসের অতীত, মীরানার যুক্ত হওয়া সবই বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম বইতে মীরানা কেন অবলালকে ঘৃণা করে, সেই উত্তর দেওয়া ছিল না। দ্বিতীয় বইতে এসে সেই বিষয়টা খোলসা করে হয়েছে।
লেখকের লেখার ধরন ভালো। খুবই সাবলীল। তাই বর্ণনামূলক লেখাগুলোতেও একঘেঁয়েমিতা আসে না। তবে প্রথম বইয়ের তুলনায় দ্বিতীয় বই একটু ধীর গতির মনে হয়েছে। যেহেতু অতীত ইতিহাসকে এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, তাই বর্ণনামূলক লেখার পরিমাণ বেশি ছিল। তাই গল্প কিছুটা মন্থর গতিতে এগিয়েছে।
বইটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে ইতিহাসকে এখানে সংযুক্ত করা। মোঘল সাম্রাজ্যের অধিপতি সম্রাট বাবরকে এখানে যুক্ত করা লেখকের কল্পনার বিস্তৃত পরিধিকেই প্রতিফলিত করে। অতিপ্রাকৃত সত্তা যে এভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমন কল্পনার তারিফ করতে হয়। একই সাথে অ্যাটিলা বা আলেকজান্ডারের কাহিনিও এখানে গুরুত্বপুর্ণ। প্রতিটি মানুষ ক্ষমতা চায়। বেশিরভাগ মানুষ ছলে বলে কৌশলে সেই ক্ষমতা আদায় করতে চাইলেও কেউ কেউ নিজের যোগ্যতা, সক্ষমতার উপর বিশ্বাসী।
এখানে লেখক বিপরীত দুটি চরিত্রের দিকে আলোকপাত করেছেন। দুটি চরিত্রই ক্ষমতা চায়, বিশ্ব জয় করতে চায়। এর মধ্যে একজন সেটাকে চায়, অনৈতিকভাবে। আরেকজন চায় নিজের শক্তিতে বিশ্বাস করে। কোনো অনৈতিক কৌশল এখানে খাটবে না দুই বিপরীত মেরুর এই অবস্থান ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক।
বইটিতে ফ্যান্টাসি উপন্যাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক, জাদুবিদ্যার উপর নজর দিয়েছেন লেখক। মায়ালোক আর পৃথিবীর মধ্যে এক ধরণের সংযোগ ঘটিয়েছেন। মানা, বেসিলির মতো ব্যক্তিগত শক্তিকে এর ভিত হিসেবে গড়ে তুলেছেন। পিশাচের গ্রামে যে যু দ্ধটা সংগঠিত হয়েছে, সেই যু দ্ধে জাদুর এক বিশাল ব্যবহার ছিল। এছাড়া পুরো বই জুড়ে জাদুবিদ্যার ব্যবহার বইটিকে অনন্য মাত্র দিয়েছে।
অতিপ্রাকৃত শক্তিতে অশুভ শক্তি বরাবরই শুভ শক্তির চেয়ে এগিয়ে। শুভ শক্তি নিজেদের সীমাবদ্ধতায় বিশ্বাসী। কিন্তু অশুভ শক্ত সেই সীমানার ধার ধারে না, তাই অসীম ক্ষমতার উৎস হয়ে ওঠে। ফলে তাদের বিপক্ষে মোকাবেলা করা কঠিন। তারপরও সম্মিলিত, ব্যক্তিগত সক্ষমতা কখনও কখনও অশুভ শক্তিকে হারিয়ে দিতে পারে।
তুলনা করতে হলে, প্রথম বইয়ের চেয়ে দ্বিতীয় বইটা কিছুটা দূর্বল মনে হয়েছে। যেহেতু বর্তমান ঘটনার সেতুবন্ধন হিসেবে বইটা কাজ করেছে, তাই ওইরকম টানটান উত্তেজনা ছিল না। তবু খুব যে খারাপ, এমন বলব না। বরং ইতিহাসকে গুরুত্ব দিয়ে, গল্পের গাঁথুনি, কাহিনি বিল্ডআপ, চরিত্রদের পূর্ণ প্রকাশ বইটিকে অনন্য মাত্রা দিয়েছে। একটু ধৈর্য নিয়ে পড়তে হয়, এই আর কি!
সিরিজের প্রথম বইয়ে আমি আমি লেখকের সব দিক বিবেচনা করার প্রশংসা করেছিলাম। আক্রমণাত্মক ঘটনায় সবদিক নিয়েই লেখকের বর্ণনা করেন, কিন্তু এই বইয়ে সেটা অনুপস্থিত ছিল। বিশেষ করে পিশাচের গ্রামে যে বিভীষিকাময় লড়াই সংগঠিত হয়, তখন ঝুমুর বা রুমী পুরোটাই অবাঞ্ছিত ছিল। তাদের অনুভূতি সেই সময় ফুটে ওঠেনি।
শেষটা সিরিজের তৃতীয় ও সর্বশেষ বইয়ের শুভ সূচনা বলা যায়। যেখানে থেকেই ঘটনা ঘটবে। তবে কী ঘটবে সেটা জানতে হলে পরের বই পড়া আবশ্যক। বইটিতে অনেক কিছুর উত্তরই লেখক দেননি। যেমন বাবর তার ইচ্ছে পূরণ করতে পেরেছিল কি না, অ্যাটিলা কেন রোম দখল না করে ফিরে এসেছিল— সম্ভবত পরের বইয়ে সব খোলসা হবে। কাহিনির যবনিকা পতনের জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছি।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
আদী প্রকাশনের বানান, সম্পাদনাজনিত ত্রুটি ও ছাপার ভুল এত বেশি যে পড়তে পড়তে বিরক্ত হয়ে গেছি। তাই শিরোনাম প্রকাশন যেন এই বিষয়টা দেখে। সম্পাদনা ভালো না হলে যে উদ্দেশ্যে তাদের এই প্রকাশ, সেই বিষয়টা মাঠে মারা যাবে।
▪️পরিশেষে, আমরা দিক্বিজয়ীদের জিততে দেখি। সব জয় করতে দেখি। তা কি একক যোগ্যতায়, কেবল অস্ত্রের ঝনঝনানি! না-কি অন্য অপার্থিব কোনো শক্তির বলে তাদের এই চলমান বিজয়? কে জানে?
পশ্চিমা সাহিত্যে আরবান ফ্যান্টাসি নিয়ে নানা ধরণের কাজ হলেও বাংলা সাহিত্যে আরবান ফ্যান্টাসি নিয়ে কাজের বেশিরভাগই জঙ্গল বাড়ির ভুত -প্রেতের ভিতরেই সীমাবদ্ধ। আর সেদিক থেকে শোণিত উপাখ্যান : বর্তমান ছিল অনেকটাই অন্যরকম । ২০১৫ সালে প্রকাশিত এই বইয়েরই সিক্যুয়াল / প্রিকুয়াল হলো "শোনিত উপাখ্যান অতীত" যা এই বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে। - শোণিত উপাখ্যান : অতীত বইটি মোটমাট তিন ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগ হলো সুদূর অতীত। সে অতীতে পাওয়া যায় সম্রাট বাবর , আটিলা দ্য হান, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট এবং এক মায়াময় শক্তির কথা । গল্পের পরের ভাগ হলো নিকট অতীতের এক ঘটনা। পিশাচের গ্রাম নামের এ গল্পেই জানা যায় সংহার চৌধুরী তরঙ্গ তথা অবলালের অরিজিন স্টোরি। তবে এ গল্পের পূর্ণতা আসে জীবন্মৃত নামের তৃতীয় ভাগে।এ ভাগে গল্পে আসে প্রথম গল্পের অনেক চরিত্র ,কিছু রহস্যের সমাধান হয় আবার কিছু রহস্য আরো ঘনীভূত হয়। এখন প্রথম ভাগের গল্পের সেই মায়াময় শক্তির আসল রহস্য কি ,আসলে কি হয়েছিলো পিশাচের গ্রামে আর মিরানা ,হোয়াইট হ্যান্ড , ক্যাপ্টন আড্রিয়াস এর সাথে অবলালের কি সম্পর্ক তা জানতে হলে পড়তে হবে শোণিত উপাখ্যান : অতীত। - "শোণিত উপাখ্যান : বর্তমান " যেভাবে শেষ হয়েছিল তাতে এর পরবর্তী বই এর জন্য মুখিয়ে ছিলাম। সে হিসেবে আশাহত হইনি বলা যায়। গল্পের তিন ভাগের ভিতরে সবচেয়ে ভালো লেগেছে পিশাচের গ্রামকে। তারানাথ তান্ত্রিক আমার অতি পছন্দের এক চরিত্র।এ অংশ পড়ার সময় মনে হয়েছে তারানাথ তান্ত্রিকের কোন দুর্দান্ত গল্প পড়ছি। সে হিসেবে প্রথম ভাগে বর্ণনার পরিমান একটু বেশিই হয়ে গেছে , আর সেখানে কিছু প্রশ্নের উত্তর আসলেই পাইনি ( হয়তো ট্রিলজির শেষ অংশে পাব ).শেষ অংশটি প্রথম বইয়ের মতোই এমনভাবে ভাবে শেষ হয়েছে যে পরের পার্ট পড়ার জন্য এখন থেকেই উন্মুখ হয়ে আছি । - কাহিনী বা লেখনীর দিক থেকে বলতে গেলে অতীতের এর চেয়ে বর্তমানকেই বেশি ভালো লেগেছে যদিও পিশাচের গল্পের বর্ণনাশৈলী ছিল দুর্দান্ত । প্রথম পর্বের দুই চরিত্রের অরিজিন স্টোরি এখানে দেখানো হলেও তাদের সাথে বাবর বাদে সুদূর অতীত পার্টের কানেকশন ধোঁয়াশা লাগলো। শৈলেন ভট্টকে মিস করেছি এ পার্টে। প্রচ্ছদ ভালো তবে প্রচ্ছদের ভেতরের লেখায় কিছু বানান ভুল বিরক্তিকর লেগেছে। - ওভারঅল প্রথম পর্বের বেশ ভালো মানের সিক্যুয়াল / প্রিকুয়াল হলো অতীত। যাদের প্রথম পর্ব পড়া আছে তাদের কালবৈশাখী / ঝড়-বৃষ্টির রাতে পড়ার জন্য আদর্শ এক বই এটি। ট্রিলজির শেষ ভাগের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
আরবান ফ্যান্টাসি ঘরানার বাংলা বই এই প্রথম পড়লাম। এই ঘরানার বইয়ের কাহিনীতে মূলত আধুনিক শহরের পরিবেশে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে জাদু, অতিপ্রাকৃত ঘটনা কিংবা কাল্পনিক চরিত্রের মিশ্রণ দেখা যায়। তবে এই বই শুধু আরবান ফ্যান্টাসিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়নি, বরং এর পাশাপাশি ছিল থ্রিলার এবং হররেরও ছোঁয়া। বইটা তিনটা খণ্ডে বিভক্ত: বর্তমান, অতীত ও অতঃপর। . . ফ্ল্যাপে থাকা লেখাটা পড়লেই বইয়ের প্লট সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারনা পাওয়া যায়। "ইতিহাস কথা বলে – বিজয়ীদের কথা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় – অতীত গৌরবের সাক্ষ্য। কিন্তু কালের গর্ভে হারিয়ে যাওয়া ঘটনাবলির কতটুকু তাতে অটুট থাকে? অসামাজিক কিন্তু তুখোড় পুলিশ অফিসার কায়েস হায়দারের কাঁধে চাপল অদ্ভুত এক কেস সমাধানের ভার। পরিস্থিতি এমনই দাঁড়াল যেখানে যুক্তি কাজ করে না। রহস্য মানব অবলালের কাছে সাহায্য চাইল কায়েস। দু’জনে মিলে নেমে পড়ল তদন্তে। কিন্তু কেঁচো খুড়তে গিয়ে এ যে সাপের বাসা! একের পর এক অতিপ্রাকৃতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হলো কায়েস আর অবলাল। আধুনিক ঢাকা শহরে এ কী নাটক জমে উঠেছে! শুধু পিশাচ, স্কন্ধকাটা, চুড়েল আর শক্তিশেলধারী যাদুকরই নয়, এর পেছনে রয়েছে আরও গুঢ় কোন রহস্য। জড়িয়ে পড়ল আরও অনেকে–সুদর্শনা মীরানা মোরেস, যে কি না প্রতি রাতে একই স্বপ্ন দেখে। শখের অকালটিস্ট নাজিম আর ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস–-কারা এরা? ধীরে ধীরে উন্মোচিত হলো ভয়াবহ এক চক্রান্তের জাল। সামনে রয়েছে শৈলেন ভট্টাচার্যের ভয়ঙ্কর দলবল, কিন্তু নেপথ্যে কলকাঠি নাড়ছে অসীম শক্তিধর কেউ, কী তার পরিচয়? দেড় হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া এক প্রলয়ঙ্কর ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় সে। নিষ্ফল বসে প্রহর গোণা ছাড়া কি কিছুই করার নেই? নাকি কেউ বাড়িয়ে দেবে অযাচিত সাহায্যের হাত? সব প্রশ্নের উত্তর রয়েছে রক্তের মাঝে।" . . প্রথম খণ্ডটা শুরু একটা মৃত্যু দিয়ে। কয়েক হাত ঘুরে সেই কেসের দায়িত্ব পরে ইন্সপেক্টর কায়েসের হাতে। ডিপার্টমেন্টের সবচেয়ে দৃঢ় ব্যক্তি সেইই। কিন্তু ওই মৃতদেহ দেখতে গিয়ে কায়েদের প্রায় ভিরমি খাওয়ার মতো দশা। এমনই বিকৃত সেই মৃতদেহ। মানুষ বা কোনো জন্তু-জানোয়ারের পক্ষে এমন কাজ করাটা সম্ভবই না। সেইসঙ্গে একটা গা শিরশিরে অনুভূতি কায়েসের চারপাশে জাঁকিয়ে বসে। এমন অনুভূতি চার বছর আগে আরো একবার পেয়েছিল সে। ঠিক কী ঘটেছিল চার বছর আগে? এসময়েই আচমকা আবির্ভাব ঘটল অবলাল নামক এক রহস্যময় চরিত্রের। অবলালের সাথে কায়েস হায়দারের পরিচয় হয় বেশ কয়েক বছর আগে। পরিচয়ের সূত্রপাত এক অতিপ্রাকৃত কেসকে কেন্দ্র করেই। সেটাও আবার আরেক ঘটনা। তো সেই কেসে একসাথে কাজ করতে যেয়েই দুইজনের পরিচয়, সেখান থেকে বন্ধুত্ব। আস্তে আস্তে আমরা জানতে পারি অবলাল সাদা হাত নামের এক সংস্থার সদস্য। এই সাদা হাতের কাজ হল অতিপ্রাকৃত জগতের এবং অপশক্তির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষদের রক্ষা করা। তো কেসের সমাধান করার জন্য কায়েস চার বছর পর আবারও অবলালের শরণাপন্ন হয়। এরপর শুরু হয় একের পর এক অতিপ্রাকৃতিক আক্রমণ। একে একে আমরা দেখতে পাই যক্ষ,পিশাচ, স্কন্ধকাটা, মায়াবিনী চুড়েল, বৈতাল, জীবনমৃতসহ নানান মিথোলজিক্যাল চরিত্র। সাথে থাকে ভারতীয় উপমহাদেশের তন্ত্রমন্ত্র, হিন্দু মিথ, কিছু ডার্ক এলিমেন্টস এবং চার হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস। . . দ্বিতীয় খণ্ডটা শুরু হয় প্রথমটার লেজ ধরেই। দ্বিতীয় খণ্ডের নামই যেহেতু অতীত, তাই বোঝাই যাচ্ছে যে আম��া চলে যাব একদম পেছনের দিকে, তবে মুঘল সাম্রাজ্যে। এখানে আমরা দেখতে পাই সম্রাট বাবর বেশ চিন্তিত। কারণ অতিপ্রাকৃতিক শক্তির মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন শাহজাদা হুমায়ুনের আয়ু আর বেশিদিন নেই। কিন্তু নিজের উত্তরাধিকার হিসেবে তিনি হুমায়ুনকেই বেছে নিয়েছেন। তাই যেভাবেই হোক হুমায়ুনকে তাঁর বাঁচাতেই হবে। সেই সময় সম্রাট বাবরের দরবারে তাঁর প্রধান দেহরক্ষী রাদু আলাখ ওরফে বাঘাতুরের হাত ধরে হাজির হলো শোণিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লোহিত ও উপপ্রধান অবলোহিত। এভাবে শুরু হয় দ্বিতীয় খণ্ড। একই সমান্তরালে মাঝে মাঝে আমরা বর্তমানের কিছু ঘটনাও দেখতে পাই। যেমন অবলালের রহস্য কী, কেন ঢাকা শহরে অশুভ অতিপ্রাকৃতের ঘটনা বেড়ে চলছে, সাদা হাতের কাজ কী ইত্যাদি। এই খণ্ডে পাঠকদের সাথে পরিচয় করানো হয় বেশ কিছু নতুন চরিত্রের। যার মধ্যে হাফ ভ্যাম্পায়ার ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস ও সাদা হাতের প্রতিনিধি মীরানা মোরেস অন্যতম। . . এই বইয়ের শেষ খণ্ডে ধীরে ধীরে সব সমস্যার সমাধান করা হয়। যেখানে দেখানো হয় শৈলেন ভট্টাচার্যের গড়া অদ্ভুত এক দল। যেখানে আছে ব্যান্ডেজে আগাপাশতলা মোড়ানো যংকসুর, কালো জাদুকর ডমিনিক বায়রান, জীবন্মৃত সত্ত্বাদের উপাসক তান্ত্রিক তরন্দীদেব সহ বেশ কিছু পিশাচ আর চুড়েল। তারা সকলে মিলে প্রাচীন ও ভয়ঙ্কর এক যজ্ঞের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর ওদেরকে খোঁজার জন্য মরিয়া হয়ে আছে সাদা হাতের অপারেটিভ অবলাল ও তার দল। এই যজ্ঞটা যদি শৈলেন ঠিকমতো পালন করতে পারে, তাহলে নরক নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। অতিপ্রাকৃত অন্ধকারে ছেয়ে যাবে সবকিছু। . . রক্তের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই উপাখ্যানের বর্তমান ও অতীতে চলেছে একাধিক সংগ্রাম। ক্ষমতার জন্য লড়াই, টিকে থাকার জন্য লড়াই, ন্যায়ের পক্ষে ও বিপক্ষের লড়াই; সবকিছুই এখানে দেখানো হয়েছে। আর প্রতিটি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক অদ্ভুত শক্তি, যার নাম বেসেলি। এই বেসেলি সবার মাঝে থাকে না। কেবল বীরদের মাঝেই এই রক্তধারার মিলে। বেসেলিধারী ব্যক্তি কখনোই কোনো লড়াইয়ে হারেন না। কিন্তু যখন দুই বেসেলিধারীর মধ্যে লড়াইটা হয়, তখনই তৈরি হয় ভয়াবহ তাণ্ডব। . . লেখক শুরুতেই বলে দিয়েছেন যে ঐতিহাসিক রেফারেন্স টানা হয়েছে তার কিয়দংশ সত্যি হলেও বেশির ভাগই কল্পনা প্রসূত। তবে মূল গল্প ভালো লাগলেও, চরিত্রগুলো নিয়ে আরেকটু কাজ করা যেত। এখানে আমরা শুরু থেকেই দেখতে পাই রাফ অ্যান্ড টাফ পুলিশ অফিসার কায়েসকে। এরপর কাহিনীর সাথে সাথে গল্পের অন্য চরিত্রগুলোরও আবির্ভাব ঘটে। এই যেমন অস্ত্র চালনায় বিশেষভাবে দক্ষ প্যারানরমাল এক্সপার্ট অবলাল, সাদা হাতের প্রতিনিধি মীরানা মোরেস, অকাল্টিস্ট নাজিম, ক্যাপ্টেন আন্ড্রিয়াস, শবসাধক তরন্দীদেব। তো বলা যায় যে এখানে এখানে দেশীয় ভূত-প্রেত যেমন পিশাচ, স্কন্ধকাটা, চুড়েল, তন্ত্রসাধনা, অতিপ্রাকৃত শক্তি, থেকে শুরু করে বিদেশি ভ্যাম্পায়ার বা জীবন্মৃত– সবকিছুই একটু একটু করে পেয়ে যাবেন। প্রথম বইটা পড়ার পর মনে হয়েছিল নিশ্চয়ই পরেরগুলো আরো ভালো হবে৷ কিন্তু তখনও বুঝিনি যে এরপর থেকে ভালো লাগার হার কেবল কমতেই থাকবে। প্রথম খণ্ডে লেখক বেশ ভালো একটা ক্লিফ হ্যাঙ্গার তৈরি করতে পেরেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী বইয়ের ক্লিফ হ্যাঙ্গার ততটা শক্তপোক্ত হয়নি৷ প্রথম বই আগাগোড়া পুরোটাই ভালো ছিল। দ্বিতীয় বইয়ের মুঘল আমল অর্থাৎ অতীতের অংশটা ভালো লেগেছে, বর্তমানের পার্টটা ভালো লাগেনি। আর তৃতীয় বইয়ে আসলে ভালো লাগার মত কিছু পাইনি। জাস্ট শেষে কী হয় সেটা জানার জন্যই পড়ে যাওয়া। লেখার ধরন নিয়ে বলতে হলে বলব যে ভালোই ছিল, সাবলীল লেখা। তাছাড়া দেশীয় প্রেক্ষাপটে লেখা, তাই খারাপ লাগার কথাও না। আগের ভার্সনের তুলনায় নতুন ভার্সনের কভারটা দারুণ লেগেছে৷ বানান ভুলও একটু কম চোখে পড়েছে। বাংলা ফ্যান্টাসি বইয়ের তালিকা তৈরি করতে হলে এই সিরিজকে সেই লিস্টের একটু উপরের দিকেই রাখব। তিন বইয়ের গড় রেটিং ৩.৫/৫।
গল্প প্রথম খন্ডে যেখানে এসে থেমেছিলো , সেখানে পাঠকের মনে অনেক প্রশ্ন জড়ো হয়েছিলো। সেইসব প্রশ্নের সব উত্তর এখানে দেওয়া আছে।
শোণিত উপাখ্যান অতীত' কে একটি চমৎকার ঐতিহাসিক ফ্যান্টাসি থ্রিলার বলা যায়। প্রথম খন্ডের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার সুরাহা তো হয়েছেই, তারপরে ও আলাদা হঠাৎ কেউ পড়ে ফেললে বইটি উপভোগ করতে কোন অসুবিধা হবেনা। শোণিত মন্দিরের ইতিহাসের সাথে মোঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতার সংযোগ, নানা ঐতিহাসিক ঘটনার সম্ভাব্য প্যারালাল হিস্ট্রি, পাশাপাশি লিড ক্যারেক্টারদের গ্রাউন্ড ক্লিয়ার চমৎকারিত্বের সাথে লেখক করেছেন।লেখকের একশন সিনগুলোর দৃশ্যায়নের দক্ষতা মুগ্ধ করেছে। বর্তমান আর অতীতের সংযোজনা 'অতঃপরে' কি হবে তা জানার স্পৃহা ভীষণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
এই বইতে লেখক গল্পের মূল চরিত্রদের অতীত সম্পর্কে বলে তাদের বিষয়ে বিষদে জানিয়েছেন যেটা গল্পের ধরা অব্যাহত রাখার অত্যাবশ্যক। কারণ কে অবলাল? কে ক্যাপ্টেন আন্দ্রিয়াস? মানা আর বেসেলি কি জিনিষ? সেটা এই খন্ডেই আলোচিত হয়েছে। সর্বোপরি লেখক বেসেলির বিবরণ দিতে গিয়ে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন এবং সেটাকে যথোপযুক্ত ব্যবহার করেছেন। সব শেষে বলতেই হয় এই সিরিজটি একটি অনবদ্য ফ্যান্টাসি।
শোণিত উপখ্যান অতীত লেখক :- সৈয়দ অনির্বাণ প্রচ্ছদ :- হুমাইরা আহমেদ তিহি জনরা :- আরবান ও হিস্টরিকাল ফ্যান্টাসি প্রথম প্রকাশ :- ফেব্রুয়ারি ২০১৭ প্রকাশনী :- আদী প্রকাশন মুদ্রিত মূল্য :- ৩০০ ৳ পৃষ্ঠা :- ২২৩
অনুভূতিকথন :-
শোণিত উপখ্যান অতীত বইটিতে ক্যাপ্টেন অ্যান্ড্রিয়াস ও অবলালের অতীত সম্পর্কে জানা যায়। এক পিশাচ সাধকের গ্রাম সম্পর্কে নিখুঁত ভাবে ফুটে উঠেছে বইয়ে। যেখানে তন্ত্রসাধনা হয় এবং গ্রামটা পিশাচের আস্তানা গড়ে তোলে তরপেশ্বর নামের এক তান���ত্রিক। গ্রাম প্রধান থাকে ঝুমুরের বাবা। ইতিহাস ও অতিপ্রাকৃত বিষয় গুলো এত গুছিয়ে বর্ণনা বেশ ভালো লেগেছে। অশিন ডাকাতের চরিত্রটা মনের এক কোণে গেঁথে গেছে। ঝুমুরদের গ্রামে মোহনি সাধক তরপেশ্বর ও তার পিশাচ বাহিনীর সাথে অশিন ডাকাত দলের লড়াই বেশ উপভোগ করেছি। ঝুমুর ও রুমির প্রেম-কাহিনি বেশ ভাল লেগেছে। পুরো বই বেশ উপভোগ করলেও আচমকা শেষ হওয়ায় ঘটনার একটা অসমাপ্তি থেকেই যায়। পরর্বতী বই পড়ে বাকিটা জানতে পারবো আশাবাদী।
শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজি (ক্রম: বর্তমান, অতীত, অতঃপর) শেষ করে যথেষ্ট ভালো লেগেছে। লেখকের আরেকটা বই যকৃত পড়ে যতোটা বিরক্তি লেগেছিল সেটা কেটে গেছে ভালোভাবেই।
শোণিত উপাখ্যান আরবান ফ্যান্টাসি হলেও অতীতে এসে এটা ঐতিহাসিক ফ্যান্টাসিতে মোড় নেয়, আর তিনটি খন্ডেই থ্রিল আর হরর ছিল পুরোদমে। হরর এলিমেন্টগুলো ভয় জাগানোর চেয়ে রুদ্ধশ্বাস একশনেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। ভালো লেগেছে দেশীয় হরর সাবজেক্ট এর ব্যবহার- পিশাচ, স্কন্ধকাটা, বৈতাল, যক্ষ। ভারতীয় হরর শো এর রেফারেন্স থেকে এসেছে চূড়েল আর ইউরোপ থেকে ভ্যাম্পায়ার।
এই বইয়ের প্লট নিয়ে লিখতে গেলে স্পয়লার দেয়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। তারপরও ফ্ল্যাপে যতোটুকু আছে তিন বইয়ের তার সাহায্য নিয়ে একটা আভাস দেয়া যেতে পারে। কিন্তু দিলাম না।
তিনটি খন্ড সম্পর্কে বরং পাঠপ্রতিক্রিয়া দেয়া যাক।
অতীতের গল্প শুরু হয় দিগবিজয়ীদের দিয়ে। এর সাথে আসে অবলালের শৈশবের গল্প৷ এবং বর্তমান অধ্যায়ে রেখে আসা কিছু প্রশ্নের উপর থেকে পর্দা উঠতে থাকে। এবং প্রথম খন্ডে লেখক প্লট, চরিত্র, গল্প মিলিয়ে যে একটা প্রমিসিং উপাখ্যান এর সূচনা করেছিলেন সে ব্যাপারটা একদমই হারায়নি। পেস একদম ঠিকঠাক, ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো কাঠখোট্টা না হয়ে বরং গল্পের মতোই এসেছে। পড়তে ভালো লাগে। তুমুল একশন আর সুপারন্যাচারাল ফ্যান্টাসির সাথে গল্প একদম জমে ক্ষীর হয়ে গেছে।
বইয়ের প্রোডাকশন এভারেজের চেয়ে ভালো। তবে পৃষ্ঠার মান খুবই ভালো। সে তুলনায় প্রচ্ছদের মান ভালো না। অতঃপরের প্রচ্ছদ কোন মুভি সিনের জানতে ইচ্ছা করছে। তবে প্রচ্ছদশিল্পী অনেক উন্নতি করেছেন তার পরের প্রচ্ছদগুলোতে, এটা ভালো। প্রুফ রিডিং এর অবস্থা যাচ্ছেতাই। বানান ভুল বলবো না, সব টাইপিং মিস্টেক। এমনকি ফ্ল্যাপে 'শখের' হয়ে গেছে 'রসখের'। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অদেখা করলেও শেষমেশ আর ভালো লাগছিল না। আমার গতো একবছরে পড়া বইয়ের টাইপিং মিস্টেক সব মিলেও বোধহয় এই তিনটার টাইপিং মিস্টেকের সমান হবে না।
শোণিত উপাখ্যান বর্তমান পড়েই অপেক্ষায় ছিলাম অতীতের।কি সেই কারন যার জন্য ঢাকার বুকে এত কিছু হচ্ছে? অতীত আমাকে হতাশ করেনি।প্রত্যাশানুযায়ী ভাল লিখেছেন লেখক।আগের বইয়ের চেয়ে লেখার পরিপক্বতা ছিল। পিশাচের গ্রাম পার্টটা সবচেয়ে সুন্দর হয়েছে।এত চমৎকার বর্ননা ছিল যে মনে হচ্ছিল চোখের সামনেই সবকিছু ঘটছে। তবে কিছু কিছু জায়গা টেনে বড় করা হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার।কিছু কাহিনী ছিল অপ্রয়োজনীয়। আলেকজান্ডার, আটিলা,চেঙ্গিস এদের ব্যাপারে এত ডিটেইল না দিয়ে ওদেরও বেসেলি ছিল সেটা বললেই চলতো। বাবরের দরবারে গিয়ে কি হল সেটা আর জানা হল না।শৈলেনের ব্যপারটা পুরোই উপেক্ষিত ছিল অতীতে। হয়তো আগামী বইয়ে সব উত্তর একসাথে সাজিয়ে লেখক আমাদের আরেকটি চমৎকার বই উপহার দিবেন
দুই পর্বের দুটি বই পড়েফেলছি ২৪ ঘন্টায়। টান টান উত্তেজনা না থাকলে এমন সম্ভব হত না। অনেক হরর (ঠিক না) বা পিশাচ কাহিণী এমন আজগুবি ভাবে লেখে যে পড়তে পড়তে বিরক্তি এবং হাস্যকর অবস্থার তৈরি হয়। একমাত্র তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের পর ইনি প্রথম অনেক গুলা ভাল লাগার অনুভূতি দিয়ে গেছেন। গল্পের চরিত্র, বর্ননা শৈলি এবং প্লট এগিয়ে নিয়েছেন তরঙ্গের গতিতে। যদিও প্রথম দিকে অর্ধেক ছিল ইতিহাস ভিত্তিক কিছু আজগুবী কাহিনী কিন্তু কোন শেষ করেন। শৈলেন ভট্টাচার্যএর কাহিনী এখানে শেষ হবে এমন ভেবেছিলাম কিন্তু আর একটা পার্টের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বানান ভুল একধিক। এছাড়া সব মিলিয়ে দূদার্ন্ত
এটাও চমৎকার। সিরিজের ১ম পর্বটা কাহিনীর সূত্রপাত ঘটিয়েছে আর এ পর্বটা চরিত্রগুলোর ব্যাকস্টোরীর সাথে শোণিত মন্দিরের উত্থান নিয়ে ভালো ধারণা দিয়েছে। সুতরাং এটাও জমেছে ভীষণ। তবে দুটোর মধ্যে আমি প্রথমটাকে এগিয়ে রাখলেও ২য় টার ব্যাপারে আমার মতামত হলো, এটা সিরিজের ডেপথ বাড়িয়েছে। যাই হোক, তৃতীয়টা ধরে দেখছি, শেষমেষ ডিশটা হলো কেমন।