১৯১৮ সাল। বাবার মৃত্যুর দুঃখকে সঙ্গি করে মাধবগঞ্জে পা রাখে নসিব। উদ্দেশ্য; সাহেব আলী নামের এক রহস্যময় বাউলের জীবন আর কর্ম সম্পর্কে জানা। কিন্তু সেই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের আড়ালেও, অন্য কোন লক্ষ্য লুকিয়ে নেই তো?
একজন অঘোরনাথ তান্ত্রিক, মোস্তফা মাস্টার অথবা চায়ের দোকানদার সুবোধ ঘোষের গল্পে মৃত্যুর স্থান কোথায়? বিকলাঙ্গ এক বালকের তাতে কতোটুকুই বা ভূমিকা থাকতে পারে?
নীল বিদ্রোহ থেকে ভাগ্যের ফেরে বেঁচে যাওয়া জাদুকর অ্যান্ডারসনের কল্যাণে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো অনুপ্রবেশ ঘটে সার্কাস নামক প্রথার। রহস্যময় এক কটেজের গোঁড়াপত্তনও তার হাত ধরে ঘটেছিল; সাতান্ন বছর আগে একদল ঠগির মৃত্যুর পর যেখানে ভয়ে কেউ পা বাড়ায়নি। ধরে নেয়া যাক, এই গল্পটা তারই।
গল্পটা হয়তো ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ নাবিক অ্যামরিক গিরাল্ডোর। একই সাথে অনিন্দ্য সুন্দরি অনিতার গল্পও বলা যেতে পারে।
দৃষ্টির অগোচরে লুকিয়ে থাকা নৈঃশব্দের জগতে যখন চেতনার স্পন্দন অনুভব করা যায়, নীলচে আলোতে ভাস্বর হয়ে আবির্ভাব ঘটে তাঁর। রঙ হারিয়ে সাদাকালো হয় পৃথিবী। একে একে সব হারায়... হারিয়ে যায় আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে।
এই কাহিনির সূত্রধর বেশ কিছু রহস্যময় চরিত্র— যারা ছড়িয়ে আছে কালপ্রবাহের নানা বিন্দুতে। তাদের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে জীবন, মৃত্যু, আলো আর অন্ধকার। আর আছেন এক দেবী! কখনও ভাগ্যচক্রে, কখনও বা লোভের বশে তাঁর অনুগামী হয়েছে মানুষ। কেটে গেছে যুগ-যুগান্ত। জোনাকির আলোয় ঝিলমিল করে উঠে গহন তমসায় ডুব দিয়েছে সময়। তারপর? কী আছে সেই পথের শেষে? না। এই বইয়ের কনটেন্ট নিয়ে আর কিছু লিখব না। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি লিখে ফেলেছি ইতিমধ্যেই। বরং লেখাটা পড়ুন।
ইতিহাস, কিংবদন্তি, কল্পনা আর সম্ভাব্যতা মিশিয়ে লেখা এমন সুলিখিত ফ্যান্টাসি আমি কমই পড়েছি। সত্যি বলতে কি, পরিমিত লেখনী এবং বর্ণনানৈপুণ্যে ওয়াসি আহমেদ অনেক পোড়খাওয়া লেখকের কাছেও দৃষ্টান্ত হতে পারেন। কিন্তু এতটা সময় জুড়ে থাকা কাহিনি আরও অনেক বেশি জায়গা দাবি করে। এই নাতিদীর্ঘ আকারে লেখাটি নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চকর হয়েছে। তবে উপজীব্য বিষয় ও চরিত্রদের সবার সঙ্গে সুবিচার করা যায়নি এর ফলে। আগামী দিনে লেখকের কাছ থেকে আমরা একটি যথার্থ মহাকাব্যিক লেখা পাব— এই আশায় রইলাম।
শেষ কবে বাংলায় গথিক হরর পড়েছিলেন? নাকি পড়েননি? তাহলে আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে পড়তে পারেন :) আশাহত হবার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। নিজস্ব টাইমলাইনের বাইরে গিয়ে কাহিনী বর্ণন খুব একটা সহজ নয়, অন্তত নিজের প্রথম উপন্যাসের ক্ষেত্রে। তবে ওয়াসি আহমেদের এটা প্রথম উপন্যাস হলেও লেখালেখিতে তিনি যে সিদ্ধহস্ত এটা তার করা অনুবাদগুলো পড়লেই বোঝা যায়। ১৬০ পাতার উপন্যাসে ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের সুযোগ খুব কম থাকে, কিন্তু সেখানেও দক্ষতা দেখিয়েছেন লেখক। আর গল্পটা একদমই আলাদা। ইতিহাস, ১০০ বছর আগের অবিভক্ত বাংলা আর নিকষ ভয়ের দারুণ সংমিশ্রণ।
"দিন হলো রাত্রি ,আর রাত্রি হলো দিন মাথার ভেতর উঠলো বেজে এক সহস্র বীণ" - ওমর খৈয়াম - উনবিংশ শতকের অবিভক্ত বাংলা। চারদিকে নীলকরদের আনাগোনা। এ রকমের এক নীল কুঠির ছোট সাহেব এন্ডারসন , জাদুকর হিসেবে খুব বেশি নাম কামাতে না পেরে যে আস্তানা গেড়েছে এক নীল কুঠিতে। কিন্তু ভাগ্যের এক পরিহাসে সে জড়িয়ে পরে এক অভিশপ্ত শক্তির সঙ্গে। - এদিকে এ ঘটনার অনেক বছর পরে মাধবগঞ্জ নামক এক এলাকায় আসে নসিব। ঘটনাক্রমে সে আসার পরপরেই ওই জায়গায় ঘটতে থাকে নানা অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা। অদ্ভুত ভাবে মারা পড়তে থাকে নানা ধরনের প্রাণী। গ্রামের লোকদের সব সন্দেহ এসে পরে তার উপর। - এদিকে গ্রামে এরকম অতিপ্রাকৃত ঘটনাগুলোর কোন ব্যাখ্যা না পেয়ে নসিব ও শুরু করে সে অতিপ্রাকৃত শক্তির খোঁজ। এখন গ্রামের অদ্ভুতুড়ে ঘটনাগুলো কি সত্যিই কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির কাজ ? আর যদি হয়েও থাকে তাহলে সে শক্তির উদ্দেশ্য কি আর এর সাথে নসিবের ই কিরকম সম্পর্ক ? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে পড়তে হবে " আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে . " - "আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে " লেখার আগে বেশ কিছু বই অনুবাদ করলেও এটাই লেখকের লেখা প্রথম মৌলিক উপন্যাস। কিন্তু পড়তে গিয়ে মনেই হয়নি যে কোন নতুন লেখকের লেখা পড়ছি। লেখনী প্রথম মৌলিক হিসেবে বলা যায় অত্যন্ত ভালো হয়েছে। - এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট মনে হয়েছে এর সেটিং। বর্তমানে বসে একশো - দেড়শো বছর আগের সেটিং এ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে গল্প ফাঁদা বেশ কঠিন ই। তবে এ দিক থেকে লেখক ভালো ভাবেই উৎরে গেছেন। দুই টাইমলাইনের গল্প সমানতালে এগিয়ে চলেছে। লেখার ভিতরে গথিক ফিকশন এর গা ছমছম দিয়ে উঠা ভাবটাও ভালোভাবে ফুটে উঠেছে। গল্পের নামকরণ আর প্রচ্ছদটাও কাহিনীর সাথে বেশ মানানসই। - মাত্র ১৪৪ পৃষ্ঠার এ বইতে রাঁধুনি , বাউল ,তান্ত্রিক ,নাবিক সহ নানা ধরণের অদ্ভুতুড়ে চরিত্র উঠে এসেছে যার ভিতরে সাহেব আলী বাউল ,তার গান আর জাদুকর এন্ডারসনকে সবচেয়ে ভালো লেগেছে। তবে এত কম পেইজের ভিতরে অনেক চরিত্র আসায় প্রধান চরিত্র সহ প্রায় কারোরই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট খুব একটা নজরে পড়েনি। আশা করি সামনের বইতে লেখক প্লট আর সেটিং এর পাশাপাশি এদিকটাতেও খেয়াল রাখবেন। - এক কথায় ,লেখকের প্রথম উপন্যাস হিসেবে বেশ ভালো একটি বই " আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে "। যারা ড্রাকুলা, দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অফ ডক্টর জেকিল এন্ড মিস্টার হাইড , ফ্রাঙ্কেনস্টাইন , দ্য ফ্যান্টম অফ দ্য অপেরা ইত্যাদি গথিক হরর পছন্দ করেন তাদের " আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে " অত্যন্ত ভালো লাগবে এই আশাই করছি।
বইটা গাথিক হরর ঘরনার। দুই সময়কালের গল্পে আঁকা। শেষটা হয়েছে বর্তমানে এসে। এক দিকে সমসাময়িকে ঘটে চলা ঘটনা, অপরদিকে ওই সবের সূচনার উপাখ্যান। দুই-ই সমান তালে চলেছে। কীভাবে একটা সাধারণ গ্রাম পরিণত হলো রহস্যময় গ্রামে? কে বা কারা রয়েছে এই রহস্যের পেছনে? কি তাঁর বা তাদের উদ্দেশ্য? এইসবের উত্তর নিয়েই গল্পটা ফেঁদেছেন ওয়াসি আহমেদ রাফি ভাই। শুরুতেই একটা কথা বলে নেই। গল্পের নামকরণ ভালো লেগেছে সাথে প্রচ্ছদটাও। সাথে প্রতি চরিত্রের নাম আর তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার ভঙ্গিও ছিল সুন্দর। কাহিনী যে কীভাবে কোথা থেকে কোথা যাচ্ছে তা বলাটা কিঞ্চিত মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছিল শুরুতে। সাহেব বাবুদের উপমহাদেশে চায়ের ঘুষ দিয়ে কাজ করিয়ে নেয়া থেকে নীল চাষের এক ঝলক বিদ্রোহ, সাথে এই বাংলায় সার্কাসের সর্ব প্রথম প্রচলন। গল্পের ফাঁকে ইতিহাসও নেড়েছেন লেখক। সাথে ছিল সব ব্যাখ্যাতীত ঘটনা। জায়গা জায়গা মরা পশু পাখি পাওয়া। রাত-বিড়াতে অ্যান্ডারসনের তৈরি কটেজ থেকে গানের শব্দ ভেসে আসা। আর ছিল জুঁই ফুলের সুবাস। সব মিলিয়ে গল্পটা একটা পূর্নাঙ্গ রূপ ধারণ করেছে। মাধবগঞ্জ নামের এক রহস্য ঘেরা গ্রামের গল্প এটা। সাথে এক রহস্যময় কটেজের। আরো আছে রহস্যে ঘেরা কিছু লোক। যেমন সুবোধ ঘোষ। একেলা তার উপর বৃদ্ধ। বার্ধক্যের কাছে পরাজিত ঘোষ বাবুর বাজারের ভেতরে একটা মিষ্টির দোকান। যদিও সেটা এখন চায়ের দোকান নামেই বেশি পরিচিত। দোকান চালিয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছিল সুবোধ কাকার। একদিন কানাইকে পেয়ে যায় রাস্তায়। মায়া হয়, সাথে নিয়ে আসে। তখন তো সুবোধ বুড়া জানত না যে ছেলেটার মাথায় ঘিলু নেই! তাই একদিন কি হলো, গায়ের রাগ ঝেড়ে দিল ছেলেটার উপর।আর কি, ওমনি কানাই মনে ক্ষোভ নিয়ে হারিয়ে গেল অন্ধকারের গহীন নিরুদ্দেশে। আছে একজন ছিঁচকে চোর থেকে তান্ত্রিক হয়ে ওঠা, অঘোর নাথ। তাকেও বেঘোরে পড়ে থাকতে দেখা যায় একদিন কবরস্থানে... মোস্তফা মাস্টারের ছেলে, মৈলই বা কোথায় কোন গহীনে নিরুদ্দেশ হলো কে জানে। মাখন লালা-ই-বা কেনও ভিটে জমি বেঁচে নৌকা করে অনিতাকে নিয়ে পূর্ণিমা রাতে নিরুদ্দেশের আশায় পাড়ি জমালো? কি হবে এর পরিণতি? যেখানে নদীর বুকে রূপালী চাঁদের আলো পড়ে মনে হচ্ছে গলিত রূপার স্রোত বইছে। সাথে জুঁই ফুলের সুবাস। আরো আছে একজন অন্ধ বাউল। তাঁর গানের কণ্ঠকে কেউ উপেক্ষা করতে প��রে না। অপার্থিব সে কণ্ঠ। যখন গেয়ে উঠে তখন সময়ও যেন থমকে যায়। রাঁধুনি যতিন। যার হাতের রান্না খাওয়ার জন্য দূর দূরান্ত থেকেও লোক আসে পাড়ার ওই হিন্দু হোটেলটায়। আর এই রাঁধুনির গল্পের ফাঁকেই লেখক নিয়ে এসেছে নসিব কে। ছেলেটা গ্রামে গঞ্জে ঘুরে ঘুরে পুরাতন সব ঐতিহ্য সন্ধান করে। তো মাধব গঞ্জে আসতে নিয়েও আসা হয় না। পরে বাবার কাছে গল্প করতে গিয়ে এই গ্রামের নাম বলে। গ্রামের নাম শুনতেই বাবাকে একটু চমকে উঠতে দেখে ও। যাইহোক, বাবার মৃত্যুর দুঃখকে সঙ্গী করে নসিব পরে ঠিকই আসে মাধবগঞ্জে, আসতে যে ওর হতোই। আর মাধবগঞ্জে আসার পরে থেকে একের পর এক ঘটনা ঘটতে থাকল। শেষে এক পর্যায়ে নসিব ঘোরের মাঝে হাটতে হাটতে অন্ধকারের গহীন নিরুদ্দেশের দিকে চলে যায়। ভাগ্য ভালো যে বাউল এসে ওরে বাঁচায়। তবে কথা হলো বাউল দাদু ওখানে কি করতেছিল? একে তো অন্ধকার, অপর দিকে সে অন্ধ। বলেছিলাম না দুই সময়কালের গল্পে আঁকা বইটা। এই গেল এক সময়। নিচে দিলাম আরেক সময়ের গল্প। তবে দুইটাই পাশাপাশি এঁকেছে লেখক। যদিও শুরুতেই আগমনী বার্তা। দৃষ্টির অগোচরে লুকিয়ে থাকা নৈশব্দের জগতে যখন চেতনার স্পন্দন অনুভব করা যায়, নীলচে আলোতে ভাস্বর হয়ে আবির্ভাব ঘটে তাঁর। রঙ হারিয়ে সাদাকালো হয় পৃথিবী। একে একে সব হারায়... হারিয়ে যায় আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে। যে তাকে সন্তুষ্ট করবে, ইচ্ছে পূরণের বর পাবে। তবে শর্ত একটাই। কি শর্ত? বিস্মৃত থেকে বিস্তৃত করতে হবে তাকে। সহস্র বছরের শক্তির আধার হয়েও আজ কিনা কালের পরিক্রমায় বিবর্জিত তিনি!
তারপরেই অ্যান্ডারসনের কথা একটু বলতে হয়। প্রখ্যাত জাদুকর হওয়ার বাসনা মনে নিয়ে অ্যান্ডারসনের আবির্ভাব। নীল চাষের বিদ্রোহের মুখে পরে, মরতে মরতেও জীবন ফিরে পায় বেচারা। কিন্তু দিতে হয়েছে এক চড়া মূল্য। আর বানায় এক রহস্যময় কটেজ।
এখন আসা যাক ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ নাবিক অ্যামরিক গিরাল্ডোর কথায়। খুবই ছোট একটু ভূমিকা দেয়া হলেও মূল গল্পের প্রয়োজন এইটুকুর প্রভাব প্রচুর বলেই মনে হয়েছে আমার।
লেখকের প্রথম লেখা মৌলিক। ভালো লেগেছে। সাধারণত হরর পড়া হয় না আমার। সাউন্ড ইফেক্ট ছাড়া হরর যেন জমে না। যাইহোক, বইয়ের পাতায় হররকে টেনে আনা সহজ নয়। তবে কেনও যেন মনে হলো শেষের দৃশ্যটা নিয়ে আরেকটু ফ্যান্টাসি করা যেত হয়তো। যাইহোক, অল্প কিছু ত্রুটি ছিল বইটাতে। তবে পড়ার তালে থাকলে চোখে পড়ার সম্ভাবনা কম। আর যাদের সন্দেশ পছন্দ তাদের বলে রাখি, গরম সন্দেশ আর চা এক সাথে খাওয়া যায় না কিন্তু। রেটিং- ৪/৫
নিজস্ব টাইমলাইনের বাইরে গিয়ে কিছু লেখা আমার কাছে সবসময় কঠিন মনেহয়। ২০১৮ তে বসে ১৯১৮ সালের প্রেক্ষাপটে গোথিক হরর লেখা সহজ কথা না। ভাষাগত দিক আর গল্পের সেটিংস-এ ১৯১৮ সালটা কিভাবে যেনো মিলেমিশে গিয়েছিলো। পুরনো প্রেক্ষাপটে কাহিনী কল্পনা করা, সেটা পাঠক আর লেখক দু'জনের জন্যই একটা চ্যালেঞ্জ। লেখক পাশে থাকায় এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কোন সমস্যা হয়নি। গাঢ় আনন্দ নিয়ে পড়েছি। এছাড়াও গল্পের প্লট খুব ভালো লেগেছে। বিশেষ করে প্রেক্ষাপট আর সংলাপ বর্ণনার ভঙ্গি খুব পছন্দ হয়েছে। এই উপমহাদেশে চায়ের আগমন এবং নীল চাষের ইতিহাস গল্পচ্ছলে বলার বিষয়টাও খুব উপভোগ করেছি।
বইটাকে অনায়েসে ৫* দেওয়া যায়। কিন্তু ইচ্ছেই করেই দিলাম না। কারণ লেখককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চেনায় জানি যে এর থেকেও হাজারগুণে ভালো লেখার ক্ষমতা আছে তার। পরবর্তী বইয়ে তিনি সেই ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করবেন বলে আমার শতভাগ বিশ্বাস আছে। কারণ এই কাজ করতে আমি ব্যক্তিগত ভাবে তাকে বাধ্য করবো।
অসংখ্য শুভকামনা থাকলো। লিখেন যান। লিখেই যান। এবং লিখে যান।
It's a pleasant surprise. With this book I found a new promising author. From the beginning it was rich with narration and vivid with description. Characters and events felt real because of that. The end was a bit rushed though, could have taken more time there. But, enjoyed it overall. Will be waiting for his next book.
৩★ শুধুমাত্র লেখকের প্রচেষ্টাকে যিনি ইতিহাস কে সংগে রেখে পড়াশুনা করে মোটামুটি একটা ভালো প্লট নিয়ে লিখিতে বসেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেও জানতেন না যে প্লট নিয়ে লিখতে বসেছেন তা বিশালতা অনেক। তাই তাড়াহুড়ো সব চ্যাপ্টারেই!! বেশ তো লাগছিল প্রথম আর মাঝখান, হতাশ হলাম শেষে এসে! সব কিছু কেমন অযৌক্তিক মনে হয়েছে! শেষটা সত্যি লেখক মিলাতে পারেন নি!! আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। গল্পের শেষটা আমাকে আশাহত করেছে!
পথচলা...আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশের পথে... কার? নসিবের। পিতার মৃত্যুর দুঃখকে ভুলে যে পা রাখে মাধবগঞ্জে। সাহেব আলী নামের এক রহস্যময় বাউলের জীবন সম্পর্কে, কর্ম সম্পর্কে জানা যে যুবকের উদ্দেশ্য। কিন্তু সেই উদ্দেশ্যের আড়ালেও, অন্য কোন লক্ষ্য লুকিয়ে নেই তো? পথচলা তাঁর...যিনি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অপেক্ষায় আছেই মুক্তির...অপেক্ষায় আছেন প্রস্ফুটিত হবার। কিন্তু তাঁর সেই ইচ্ছা পূরণের জন্য কতটা উতসর্গ দরকার হতে পারে? মাধবগুঞ্জে নেমে আসা অভিশাপটা কি তাঁরই দেয়া? কেন পাওয়া যাচ্ছে পোষা প্রাণীর লাশ? কেনই বা মৃত্যু হলো সুবোধ ঘোষের? এসবের সাথে বিকলাঙ্গ কানাইয়েরই বা সম্পর্ক কী? নাকি এসব অনেক আগে ঘটে যাওয়া নীলকুঠিতে দুর্ঘটনার ফসল। আসুন পাঠক...পা বাড়াই... আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে...
আমন্ত্রণ নাহয় বোঝা গেল, কিন্তু আমন্ত্রণ রক্ষা করবেন নাকি সেটা নিয়ে দুই একটা কথা বলে যাই। প্রথম কথা, বইটা মৌলিক। মৌলিকের প্রতি আসলে বাড়তি মমতা থাকা উচিত না। কেননা টিকে থাকতে হলে, ওয়ার্ল্ড ক্লাসের সাথে লড়েই টিকে থাকতে হবে। তাই মৌলিক-অনুবাদ, আলাদা করে ম্যাটার করা উচিত না। বাট করে। দ্বিতীয় কথা, লেখক কাছ থেকে পরিচিত (তাই বায়াসনেস থাকার সম্ভাবনা থাকে)। লেখালেখি করে প্রায় বছর খানেক। হিসাবমতে এরইমাঝে মৌলিক বের হয়ে যাবার কথা কয়েকটা। কিন্তু নিজের সীমাবদ্ধতা জানে সে, তাই যখন একেবারে নিশ্চিত হয়েছে যে এখন লেখা উচিত, তখনই লিখেছে। বইটাকে কোন জনরায় ফেলা যায়, সেটা নিয়ে একটা কনফিউজড। থ্রিলার বলাটা ঠিক হবে না। হরর বললেও অতৃপ্তি থেকে যায়। বলা যায় আরবান ফ্যান্টাসি। কথা হলো, ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে এই জনরার লেখকরা অলরেডি প্রতিষ্ঠিত চরিত্র নিয়ে লেখেন। নতুন করে নিজের মতো একটা চরিত্র সৃষ্টি করা একটু কঠিনই বটে। সাহসী এই কাজটা খুব কম মানুষই করেন। এই বইতে করা হয়েছে। হরর মুভির ক্ষেত্রে একটা টার্ম আছে-জাম্প স্কেয়ার। মানে সব ঠিকঠাক মতো চলছে, এমন সময় একটা ভূত এসে পর্দা দখল করে নিল। হরর বলতে যদি এটাই কেউ বুঝে থাকেন, তাহলে এই বই তা না। বলতে কষ্ট হচ্ছে, এ জন্য সম্ভবত কিছু ক্ষেত্রে বইটা সফল হবে না। কিন্তু হরর বলতে যদি বোঝায় মনের ভেতর ‘কী হয়, কী হয়’ একটা ভাব, তাহলে পুরোপুরি সফল। সেই আবহ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে দক্ষ হাতে। আসলে এটাই বইয়ের স্ট্রং পয়েন্ট, আবহ তৈরি। চোখে আঙুল দিয়ে ভয় না দেখিয়ে, আলতো করে ভয়ের দিকে ঠেলে দেয়া। নাহ, ঘুম হবে না রাতে-এমন ভয়ের বই এটা না। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অদ্ভুত আবেশে ভরে থাকবে মন নিঃসন্দেহে। অ্যাজ ইউজুয়াল, পণ্ডিত মানুষ আমি। পণ্ডিতামি তো করা লাগবেই, একটানা বইয়ের মাঝে পাঠককে রেস্ট নেয়ার একটু অবকাশ দেয়া উচিত। কিন্তু সেটাও যেন কাহিনিকে বিসর্জন দিয়ে না হয়, একটা জায়গায় মনে হয়েছে যে কাহিনিকে পাত্তা দেয়া হলো না। অব্যাখ্যাত অনেক প্রশ্ন আছে। যদি সেটাকে সিকুয়েল বানাবার জন্য রেখে দেয়া হয়, তাহলে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাষানো হবে। আর যদি উপন্যাসিকার ধরন মেনে সেগুলোকে ছেড়ে দেয়া হয় পাঠকের উত্তর বানিয়ে নেয়ার জন্য-তাহলে হ্যাটস অফ। ব্যাক্তিগত রেটিং-৪.৫ (০.২৫ স্বজনপ্রীতি)
আমার পড়া বাংলায় লেখা সেরা গথিক হরর উপন্যাস। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি বাংলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে অপদেবীর আত্মপ্রকাশ থেকে শুরু হয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে অশুভ পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার অসাধারণ কাহিনী। বইয়ের ভাষা, কাহিনীর গাঁথুনি, দর্শন (!!!) রীতিমত তাক লাগিয়ে দেয় :)
১৯১৮ সাল। বাবার মৃত্যুর দুঃখকে সঙ্গি করে মাধবগঞ্জে পা রাখে নসিব। উদ্দেশ্য; সাহেব আলী নামের এক রহস্যময় বাউলের জীবন আর কর্ম সম্পর্কে জানা। কিন্তু সেই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের আড়ালেও, অন্য কোন লক্ষ্য লুকিয়ে নেই তো?
একজন অঘোরনাথ তান্ত্রিক, মোস্তফা মাস্টার অথবা চায়ের দোকানদার সুবোধ ঘোষের গল্পে মৃত্যুর স্থান কোথায়? বিকলাঙ্গ এক বালকের তাতে কতোটুকুই বা ভূমিকা থাকতে পারে?
নীল বিদ্রোহ থেকে ভাগ্যের ফেরে বেঁচে যাওয়া জাদুকর অ্যান্ডারসনের কল্যাণে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রথমবারের মতো অনুপ্রবেশ ঘটে সার্কাস নামক প্রথার। রহস্যময় এক কটেজের গোঁড়াপত্তনও তার হাত ধরে ঘটেছিল; সাতান্ন বছর আগে একদল ঠগির মৃত্যুর পর যেখানে ভয়ে কেউ পা বাড়ায়নি। ধরে নেয়া যাক, এই গল্পটা তারই।
গল্পটা হয়তো ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ নাবিক অ্যামরিক গিরাল্ডোর। একই সাথে অনিন্দ্য সুন্দরি অনিতার গল্পও বলা যেতে পারে।
দৃষ্টির অগোচরে লুকিয়ে থাকা নৈঃশব্দের জগতে যখন চেতনার স্পন্দন অনুভব করা যায়, নীলচে আলোতে ভাস্বর হয়ে আবির্ভাব ঘটে তাঁর। রঙ হারিয়ে সাদাকালো হয় পৃথিবী। একে একে সব হারিয়ে যায় আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ হাতে সময় না থাকলে সাধারণত কোন বই পড়া শুরু করি না। কারণ আমি বরাবরই এক বসায় বই শেষ করা পাঠক। অসম্পুর্ন রেখে উঠতে খুব বিরক্ত লাগে, পড়ার ফ্লো হারিয়ে ফেলি।
আজ ঘুম থেকে উঠে মনে হল সময় আছে হাতে। তাই বালিশের পাশ থেকে বইটা নিয়ে মুখের সামনে মেলে ধরলাম। অধ্যায় এক থেকেই হুকড হয়ে গেলাম বইয়ের সাথে। কাহিনী চলে গেছে বৃটিশ আমলে। আমি পুরানো আমলের কাহিনীর বরাবরই একনিষ্ঠ পাঠক। তাই সুবোধ ঘোষ নামক ময়রার সাথে জার্নিটা ভালই শুরু হল। কানাই এসে পড়লে রহস্যে প্যাচ শুরু হল।
এরপর শ্বেত শুভ্র পোশাকে নসীব হাজির হল। তার মাধ্যমে মোস্তফা মাস্টারকে জানলাম, যতীনের রান্নার ভক্তও হয়ে গেলাম (খাবারের বর্ণনা দিয়ে আমার লোভ বাড়ানোর জন্য লেখকের কাছে ট্রিট চাওয়া দরকার আমার 😂)।
একে একে সাহেব আলী বাউল, অনীতা, মাখনলাল, অঘোরনাথ তান্ত্রিক এলো। লেখকের প্রাঞ্জল বর্ণনায় তাদের কাহিনী গুলোর সাথে মিল খুঁজে পেলাম। ক্রমান্বয়ে পরিণতির দিকে এগুতে থাকা কাহিনী এন্ডারসনের কাহিনী এর সাথে আরও পরিণতি পেল। পুরো বিষয়টার ভিতর নসীবের ভূমিকাও জানতে পারলাম। ক্লাইম্যাক্স যেটুকু দরকার ঠিক সেটুকুই ছিল।
হালকার উপর ঝাপসা বিশ্লেষণঃ এই ব্যাপারটা আমিও মোটেও ভাল পারিনা। আমার কাছে এই ব্যাপারটা ভাল লেগেছে কিংবা খারাপ লেগেছে এইটুকু ব্যাপারের ভিতর সীমাবদ্ধ।
লেখার আগে লেখক পড়াশোনা করেছেন এটা বোঝা যায়। তবে একগাদা ইতিহাস হাজির করে বিরক্তির উদ্রেক ঘটাননি। ইতিহাস এসেছে প্রয়োজন যতটুকু ঠিক ততটুকু। ভিন্ন টাইমলাইনে স্টোরিটেলিং চলেছে, অধ্যায়ের প্লেসিং গুলা ভাল ছিল। মানে এক টাইমলাইন প্রেজেন্ট করতে গিয়ে অন্যটার ফ্লো টা মিইয়ে যায় নি।
লেখকের বর্ণনা এর ভিতর বেশরকম একটা কাব্যিকতার ছোয়া আছে। বর্ণনাভঙ্গি এর দিক থেকে এটা বেশ ভাল লাগল। অল্পসল্প দার্শনিক লাইন ছিল যেগুলোর সাথে আমি সম্পুর্ন একমত।
এই তো। সময়টা দারুণ কেটেছে বইটার সাথে। পড়ে দেখতে পারেন। আপনাদেরও ভাল লাগবে।
** গথিক হররের মূল রসটা লেখক খুব চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখায়। গা কিলবিল করা অন্ধকার আতঙ্কের ভাব ছিল পুরো বই জুড়েই। **ছোট কলেবরের উপন্যাসের পুরোটা জুড়েই লেখক নিজের ব্যক্তিত্বের ছাপ রেখে গেছেন। কবিতা-গানের প্রতি প্রেম, দর্শন, উপমার ব্যবহার ছিল লক্ষ্যণীয়। তরতর করে পড়া এগিয়ে যেতে কোনো সমস্যাই হয়নি সাবলীল বাক্য ও সহজ বর্ণনাভঙ্গির কারণে। ** গ্রাম্য পটভূমির গল্প সবসময়ই বাঙালীর জন্য একটু বাড়তি আবেদনময় হয়ে থাকে। এই বইও সেই কোটায় বাড়তি নম্বর পাবে। মনে হচ্ছিল মাধবগঞ্জের সাদাসিধে, এঁটেল মাটির তৈরি মানুষগুলোর সাথে চলছি-ফিরছি। ** বর্তমানের সাথে ইতিহাসের মিশ্রণটাও ছিল যথাযথ। মাঝে মাঝে রান্নার বর্ণনাগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছিল ভোজন রসিক হুমায়ুন আহমেদের কথা। ** বইয়ের মাঝে ব্যবহৃত অলঙ্করণগুলো বেশ বৈচিত্র্য এনে দিচ্ছিল বাতিঘরের একঘেয়ে মেকাপের বদলে।
তবে ইচ্ছে হওয়া সত্ত্বেও সাড়ে চার বা পাঁচ তারা দেয়া গেল না দুয়েকটা কারণেঃ ** বেশ কিছু চরিত্রের সাথে পরিচয় ঘটলেও তাদের খুব দ্রুত যবনিকা টেনে দেয়া হয়েছে। নসিব ছাড়া অন্যদের সাথে একাত্মতা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। ** লেখক মহাশক্তিধর অপদেবীর উত্থান ও পতনের গল্পটা এত দ্রুত শেষ করে দেবেন ভাবতেও পারিনি। পুরো গল্প জুড়ে তিলে তিলে তার আবির্ভাবটা জমে ক্ষীর হতে হতেও যেন হলো না। যার জন্য এতকিছু, তার কিচ্ছাই যদি ফুরুত করে শেষ করে দেয়া হয় তাহলে যাত্রার সার্থকতা অনেকটাই ক্ষুণ্ন হয়ে যায়। ** এক জায়গায় সুবোধকে 'সুবল' লেখা হয়েছে, এটা অবশ্য তারা কমানোর পেছনে কোনো ভুমিকা রাখেনি। ** গল্পে সার্কাস দলের পোস্টার যেখানে থাকার কথা ছিল, তার বদলে আগের পৃষ্ঠাতে চলে এসেছে।
মাত্র ১৪৪ পৃষ্ঠার উপন্যাসেও যে শক্তিশালী ঔপন্যাসিক পাঠকের মনে ছাপ ফেলতে পারেন, সেটা আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে পড়লে আরও একবার প্রমাণ হয়ে যাবে। বাংলা সাহিত্যে গথিক হররের জন্য একটা চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বইটি। তবে শেষটা 'শেষ হইয়াও হইল না' হওয়াতে আরেকটা পর্বের আশা রেখে দিলাম।
এতদিন পর এমন একটা বই পেলাম যেটায় বাংলা-ইংরেজি শব্দ একসাথে মিশানো নে���! যেই কারণে পড়তে খুব ভালো লেগেছে।
পাঠকের চোখে মাধবগঞ্জ গ্রাম তুলে ধরার জন্যে লেখক যে চেষ্টা করেছেন তাতে তিনি সফল, আমার মতে। ঐতিহাসিক কিছু ব্যাপার টেনে আনা হয়েছে কিন্তু মূল কাহিনীতে তার বিশেষ কোন ভূমিকা নেই তাও খারাপ লাগেনি।
আমার অভিযোগ যেইটা, যেই রহস্যের কারণে ব্রিটিশ আমলের টাইমলাইন টেনে এনে একটা ভূতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে সেইটা শেষের কয়টা পৃষ্ঠায়ই শেষ হয়ে যায়!
শুরুতে একটা রহস্যময় ভাব আসে ঠিকই , তারপর সেইটা হুট করেই শেষ হয়ে যাওয়াটা যথেষ্ট লাগেনি।
হরর / অতিপ্রাকৃত ঘনারার বই আমার খুব বেশি পছন্দ নয়। তানজীম রহমান এর "আর্কন" এবং হুমায়ুন আহমেদ, জাফর ইকবালের শুরুর দিকের কিছু ভৌতিক উপন্যাস ছাড়া আর কোনোটাই আমাকে তেমন টানে নি। তবুও ইদানীং বেশ কয়েকটা এই জনরার বই পড়া হচ্ছে।
"আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে" - ভালোই ছিল তুলনামূলক। প্লট বেশ ভালোভাবে সেট করে, গল্পের এক্সিকিউশনও ভাল ছিল। লেখকের প্রথম মৌলিক - লেখার মধ্যে অপরিপক্কতা চোখে পড়েছে। ধীরে ধীরে লেখনী আরো ভালো হবে - আশা করছি।
সবমিলিয়ে খারাপ না৷ অতিপ্রাকৃত গল্প যাদের পছন্দ, তাদের কাছে 4Star বই হবে।
ফেসবুকে রাফির বইএর শেল্ফ দেখে হিংসায় জ্বলে যায়নি এমন মানুষ মনে হয় নেই বইয়ের গ্রুপ গুলোতে। তবে আমার যা সবচেয়ে ভালো লেগেছিল তা বইগুলো গুছিয়ে রাখা। ডাক্তাররা সাধারনত একটু গোছানোই হয় কিন্তু ছেলেটার এ গুনটা রীতিমত আর্টের পর্যায়ে পরে। তারপর বলতে হয় বই গুলোর কথা! একটা মানুষ কিভাবে এতো এতো বই পড়তে পারে! পার্ফেক্ট মানুষের সব কিছু পার্ফেক্টই হয় সম্ভবত! পাঠক, চিনতে পেরেছেন নিশ্চয়। বলছিলাম ‘ওয়াসি আহমেদ রাফি’র কথা। আর এরকম পার্ফেক্ট মানুষের সৃষ্টি কিভাবে সৃস্টিশীল না হয়ে পারে বলুন? জ্বি, হয়েছেও তাই। আমার চোখে ‘আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে’ তেমনই একটি সৃস্টিশীল কাজ।
মাধবগঞ্জ। গাঁয়ে গাঁয়ে গান গেয়ে বেড়ানো এক বাউল হঠাৎ করেই নিরুদ্দেশ হয়ে গেলেন। প্রায় ছয় মাস পরে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেল তাকে। গ্রামবাসী অবাক হয়ে দেখলো গানের গলা আরও খোলতাই হয়েছে তার আর অজানা কোন কারনে অন্ধ হয়ে গেছেন বাউল সাহেব আলী।
১৯১৮ সাল। সকালে ঘুম থেকে উঠে উত্তরের মাঠে হাঁটতে বেড়িয়েছিলেন সুবোধ ঘোষ। মাঠের একদিকে বট গাছের গুঁড়িতে ফিনফিনে পাতলা কাপড় পড়া বিকলাঙ্গ এক বালককে দেখতে পেলেন তিনি। অনেক চেষ্টার পরেও ছেলেটির পরিচয় জানা যায়নি। মায়া হওয়ায় ছেলেটিকে খাইয়ে পড়িয়ে নিজের দোকানেই সহকারী হিসেবে রেখে দিলেন। নাম দিলেন কানাই। একদিন প্রচন্ড এক ঝড়ের রাতে সেই কানাই হারিয়ে গেল।
অদ্ভুত অবস্থায় কিছু মৃতদেহ পাওয়া গেল মাধবগঞ্জে। বনের পশুপাখি থেকে শুরু করে গৃহপালিত যন্তু; বাদ গেল না রাস্তার কুকুর বেড়ালও। নাওয়া খাওয়া ভুলে আতঙ্কের চরমে দিন কাটতে লাগলো গ্রামবাসীর। কিন্তু সেই রহস্যের সমাধান হলো না। খুনি খুন করেই চলল।
একই সময়ে কোন একদিন মাধবগঞ্জে পা রাখলো নসিব। উদ্দেশ্য রহস্যময় সেই বাউল সাহেব আলীর জীবন আর কর্ম সম্পর্কে জানা। তবে সেই সুস্পষ্ট উদ্দেশ্যের আড়ালে আরও একটি লক্ষ্য লুকিয়ে রেখেছে সে।
নীল বিদ্রোহ থেকে ভাগ্যের জোড়ে বেঁচে গেলেন জাদুকর অ্যান্ডারসন। জীবন বাজি রেখে গ্রামের শেষ প্রান্তের অভিশপ্ত বনে আশ্রয় নিলেন তিনি। খুঁজে পেলেন বহুকাল আগে হারিয়ে যাওয়া একটি পুঁথী। হালকা নীলচে আলোর মায়ায় ভরে গেল চারপাশ। হারিয়ে গেলেন তিনিও।
বিচ্ছিন্ন কিছু গল্প। যতোই পড়ছিলাম মুগ্ধতা ততোই বাড়ছিল সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছিল কিছু শঙ্কাও, লেখক গল্পগুলোর শেষটা এক বিন্দুতে মেলাতে পারবেন তো? পারলে তবেই না স্বার্থকতা! তবে আমি খুশি, শুরুর সেই মুগ্ধতা শেষ করার পরেও অনুভব করেছি। বলতে দ্বিধা নেই, সফল অনুবাদক রাফির কাছে মৌলিক নিয়ে যে উচ্চাশা তৈরি হয়েছিল তিনি তার ‘সফল’ প্রতিদানই দিয়েছেন। অর্থপূর্ণ প্রতিটি লাইনে শব্দের অসাধারণ গাঁথুনি, গল্প বলার ধরন, ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা প্রতিবারই ‘অবাক হয়ে’ বলছিল, আপনি লেখকের প্রথম মৌলিক পড়ছেন!! আর এই একটা যায়গায়ই আপনি ‘প্রথম’ শব্দটা ‘শেষ’ বার অনুভব করবেন। তাছাড়া, জানবেন লেখক বর্নণা দিতে পছন্দ করেন। পুরো গল্প জুড়ে শব্দের এত জাদুকরি চোখে পড়বে যে শেষ না করে উঠতে মন চাইবে না। পড়ার মাঝেই ভালোবেসে ফেলবেন, গ্রামের সহজ সরল চরিত্রগুলোকে। যেখানে সংলাপে আঞ্চলিকতার যথার্থ প্রয়োগ যেমন ছিল তেমনি ছিল চরিত্রগুলোর সার্থক চরিত্রায়ন। কোথাও বাড়তি কোন বাক্য চোখে পরেনি। বাজি ধরে বলতে পারি প্রকৃতি আর গ্রাম্য আবহের এমন মুগ্ধ করা বর্নণা আপনি বহুকাল পড়েননি। আর ভয়ের হালকা একটা আবেশ তো রয়েছেই।
ভৌতিক হয়েও ‘আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে’ ঠিক ভৌতিক ঘরনার গল্প না। বলতে পারেন গল্পটা ষোড়শ শতকের পর্তুগিজ নাবিক অ্যামেরিক গিরাল্ডোর অথবা গল্পটা নিপীড়িত নীল চাষীদের। বা, কাঠুরে মাখনলালের অনিন্দ সুন্দরী বৌ অনিতার কিংবা তার সাথে নসিবের নিছক ছেলেমানুষী বন্ধুত্বের। গল্পটা হয়তো উপমহাদেশে সার্কাস নামক প্রথার অনুপ্রবেশের অথবা সাতান্ন বছর আগের ভারত কাপিয়ে বেড়ানো একদল ঠগির আকস্মিক মৃত্যুর।
অথবা গল্পটা ‘তাঁর।’ বিশুদ্ধ রক্তের জন্য তাঁর জনম জনম অপেক্ষার!
বানান ভুল খুব কম চোখে পড়েছে। উন্নত প্রুফ রিডিং নিঃসন্দেহে পাঠকদের প্রতি প্রকাশনা সংস্থার দায়বদ্ধতার চমৎকার উদাহরণ। আর ‘বাবাজি’ কে ‘বাবাজীবন’ ছাপাটা ইচ্ছাকৃত নিশ্চয় নয়। সাথে ‘জুলিয়ান’ এর ব্যতিক্রমী প্রচ্ছদ, পরিচ্ছন্ন কম্পোজ, মান সম্পন্ন কাগজ আর বাতিঘর ট্রেন্ড স্কয়ার বাঁধাই অবশ্যই ‘আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে’ এর মর্যাদা বাড়াবে।
ভালো না লাগা অংশে, গওহর জানের নামের ইতিহাস কিংবা বিক্রম-বেতালের গল্পটা বাড়তি মনে হয়েছে, এ অংশটুকু না হলেও পারতো। মোস্তফা চাচার নজাবত আলী চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতার ইতিহাস ভড়া পঞ্চায়েতে বলাটাও ঠিক সামন্জস্যপূর্ণ ছিল না। এভাবেই মাখনলালের গল্প ... শুধু বইটাকে পেট মোটা করানোর জন্যই কিনা তাই বা কে জানে? তাছাড়া ‘তাঁর’ ক্ষমতা হারানো আর ফিরে পাবার খেলায় ‘হ্যারি পটার’ আর ‘লর্ড ভোলডেমর্ট’ এর উত্থানের হালকা একটু ছায়া অনুভব করেছি। শেষটায় মনে হয়েছে আবহটা আরেকটু ভৌতিক করাই যেতো। সাথে লেখক আর কিছু পৃষ্ঠা বেশি লিখলে হয়তো গল্পটাকে আরেকটু পূর্ণতা দিতে পারতেন। অসাধারণ প্লটের কারনেই গল্পের উপস্থাপনা কিছুটা দুর্বল লেগেছে। তবে ব্যাপারটা যখন প্রথম মৌলিকের তখন লেখক ডেব্যু ম্যাচে সেঞ্চুরী করেছেন বলাই যায়। আমি আশাবাদী লেখককে কে নিয়ে। তাঁর দ্বিতীয় মৌলিকের আশায় রইলাম।
১৪৪ পৃষ্ঠার ‘আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে’ ছেপেছে বাতিঘর প্রকাশনী। বইটির মুদ্রিত মুল্য ১৫০ টাকা মাত্র। ঢাকার আজিজ সুপারমার্কেট, বাংলাবাজার, নীলক্ষেত, বাতিঘর ঢাকা/চট্টোগ্রাম, বেঙ্গলবই সহ প্রায় সব অনলাইন বুক স্টোরে পাবেন বইটি। সাথে আকর্ষণীয় ছাড়তো থাকছেই। তাই আর দেরি না করে ঈদের আনন্দের সাথে বাড়তি কিছু আনন্দ উপভোগ করতে বইটি পড়া শুরু করুন। ঠকবেন না এ গ্যারান্টি আমার! ভাল থাকুন, ধন্যবাদ সবাইকে।
প্রথমেই লেখককে ধন্যবাদ একজন নগন্য পাঠককে ক্রমাগত বিরক্তি আর হতাশা থেকে খানিকটা স্বস্তি দেয়ার জন্য। ফ্যান্টাসি (এপিক বা আরবান যা-ই হোক), থ্রিলার, মিস্ট্রি, ডিটেকটিভ এগুলো আমার খুব প্রিয় ঘরানা, সেগুলো যদি ইতিহাস বা মীথাশ্রয়ী হয় তাহলে আরো আগ্রহ পাই। হরর তেমন পছন্দ না, তবে পেলে পড়ি। তো বাংলাদেশে যখন নতুন লেখকরা (এবং পশ্চিমবঙ্গে কয়েকজন) এই ধারাগুলোতে মৌলিক লেখা শুরু করলেন গত কয়েক বছর ধরে, তখন অনেকের বই কিনে বা যোগার করে পড়া শুরু করলাম। বলতে খারাপ লাগছে, মনে রাখার মত বই হাতের আঙুলে গোনা যায়--মাশুদুল হকের 'ভেন্ট্রিলোক্যুইস্ট', সৈয়দ অনির্বানের 'শোণিত উপাখ্যান ট্রিলজি', আমের আহমেদের 'পাপপিঞ্জর', ওপারের অভীক সরকারের 'এবং ইনক্যুইজিশন', প্রীতম বসু'র পাঁচমুড়োর পঞ্চাননমঙ্গল, রনিন-এর 'মরু নেকড়ের কান্না', এই তো! যেগুলো মনে রাখার মত নয়, সেগুলোর মাঝেও আবার অখাদ্য এত বেশি যে, পাঠকের রীতিমত বদহজম চলে বইগুলো পড়ার পর কয়েকদিন ধরে। পয়সা খরচ করে যদি কেনেন, তাহলে গা জ্বালাও করবে কিছুদিন। দৃশ্যটা দুই বাংলায় একইরকম; ফেসবুক-টুইটার-গুডরিডসে ব্যাপক প্রশংসা, কিন্তু পড়তে গেলে দেখা যায় দুর্বল বা অগোছালো প্লট, অবিশ্বাস্য গোঁজামিল, আনডেভেলপড বা আন্ডারডেভেলপড ক্যারেক্টারের ছড়াছড়ি, আর বাংলাদেশের লেখকদের বেলায় বোনাস হিসেবে পাওয়া যাবে ফেসবুকীয় ধরণে আণ্ডাবাচ্চা স্টাইলে লেখা। সমালোচনা করলেও কপালে দুঃখ আছে; লেখক যে কত পণ্ডিত ও জনপ্রিয় এবং এত বুঝলে নিজেই কেন লিখে দেখাই না, অথবা 'আপনি মনে হয় কখনো এই জনরার লেখা পড়েনই নি', এহেন আক্রমণের যন্ত্রণায় এদের বই আর জীবনে কেনা বা পড়া হয় না। পাঠককে মূর্খ আর নিজেদের পণ্ডিত ভাবার এই প্রবণতা থেকে নতুন লেখকরা বের হয়ে এলে তাদের নিজেদেরই লাভ, এটা তারা কবে বুঝবেন? পাঠক যদি আপনাদের শত্রু হতো, তাহলে তো কষ্টের পয়সা খরচ করে আপনাদের বই কিনতো না!
ওয়াসী আহমেদ রাফী'র 'আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে' এই ধরণের প্রায় সকল দোষ থেকে মুক্ত। প্রথমেই বলতে হবে গোছানো প্লটের কথা। অপ্রাসঙ্গিক তেমন কোন চরিত্র বা কাহিনী নেই, এবং আজকাল নবীন ফ্যান্টাসি বা মিস্ট্রি বা অলৌকিক ঘরানার লেখকদের যেটা সবচেয়ে বড় সমস্যা, সুন্দরভাবে কাহিনী শুরু করে মাঝপথ থেকে খেই হারিয়ে গোঁজামিল দিয়ে মিলিয়ে দেয়া, সেটা থেকে পুরোপুরি মুক্ত এই বই। ফুটবলের ভাষায় বলা যায়, ক্লিনিক্যাল ফিনিশ। আর যেটা ভাল লেগেছে সেটা হলো, লেখার ধরণ, বা ভাষা। চরিত্রগুলোর মুখের ভাষা কথ্য হতেই পারে, কিন্তু লেখকের নিজের লেখার স্টাইলটা তো বইয়ের ভাষা হতে হবে (যদি আপনি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস না হন আরকি)! ফেসবুকের স্ট্যাটাস লেখার ধরণ আর উপন্যাস লেখার ধরণ তো এক হতে পারে না। শুধু লেখার ধরণই না, ইনাদের শব্দভাণ্ডারও বিশেষ সমৃদ্ধ নয়; যেমন ধরুন, অনেক সুন্দর, অনেক ভাল, অনেক দূর, অনেক মন খারাপ, অনেক বড়, অনেক ভালবাসা, অনেক কান্না, অনেক হাসি---বাবারে বাবা, বাংলা ভাষায় কি 'অনেক' ছাড়া আর কোন শব্দ নেই? ওয়াসী এদিক থেকে তার সমসাময়িকদের চেয়ে অনেক এগিয়ে, তার লেখা পড়লে বিরক্তি লাগা বা হোঁচট খাওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। তাঁর ভাণ্ডারে শব্দের অভাব নেই, লেখার ধরণ ফর্মাল হলেও পড়তে ভাল লাগে। যদিও যে টাইমলাইনটা তিনি নিয়েছেন, অর্থাৎ ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ আর বিংশ শতকের শুরুর দিকে, সেখানকার চরিত্রগুলোর মুখের ভাষা কিছুটা মিললেও পুরোপুরি মেলেনি; তখনকার লেখকদের বইপত্র নিয়ে আরেকটু মনোযোগ দিয়ে কাজ করলে সম্ভবত এটুকুও ঠিক হয়ে যেত। ইতিহাস বা মীথ নিয়ে যারা গল্প-উপন্যাস লিখেন, তাদের অনেকের একটা সমস্যা হচ্ছে, ইতিহাস বা কিংবদন্তীর প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারা এত বড় লেকচার ফেঁদে বসেন (বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের লেখকরা), যে এটা উপন্যাস পড়ছি নাকি পাঞ্জেরি পাবলিকেশনসের 'সহজ ইতিহাস ও মীথ শিক্ষা' নোটবই পড়ছি বুঝা মুশকিল হয়ে যায়। মূল গল্প থেকে তখন এতটাই সরে যেতে হয় যে, লেকচার শেষ হবার পর বাংলা সিনেমার স্মৃতিহারা নায়কের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বলতে হয়--''আমি কোথায়?" ওয়াসী এ জায়গায় অসাধারণ পরিমিতি বোধ দেখিয়েছেন। লেখক প্রচুর পড়াশোনা করলেও ফিকশনে তিনি একটা গল্প বলতেই এসেছেন, লেকচার দিতে নয়, এটা এই বইয়ে খুব ভালভাবে রক্ষা করেছেন লেখক। সেজন্য গল্প কোথাও ঝুলে যায় না বা হারিয়ে যেতে হয় না। অভিনন্দন এই উপলব্ধির জন্য।
পুরো বইয়ে একটাই বড় সমস্যা; বইয়ের আকার ছোট রাখতে গিয়ে অথবা কাহিনী যাতে খেই হারিয়ে না ফেলে সেজন্য (লেখকই ভাল বলতে পারবেন) চরিত্রগুলোকে তেমন একটা সময় দেয়া হয়নি। সেকারণে এমনকি মূল প্রটাগনিস্টের চরিত্রটাও ভালভাবে ফুটে ওঠেনি, বাকি চরিত্রগুলো তো একেবারেই আন্ডারডেভেলপড। আরো একটু সময় নিয়ে আরেকটু বড়সড় বই লিখলেও সমস্যা নেই; তিনি ভাল লেখেন, খেই ধরে রাখতে পারলে পাঠক পড়বেই। আমি রেটিংয়ের বেলায় খুঁতখুঁতে, আর উপন্যাস যেহেতু গল্প না, সেখানে চরিত্র নিয়ে কাজ না করলে সেটার মজা অনেকটা কমে যায়, সেজন্য সোয়া ৩ দেব।
লেখকের দুইটা বই (আরেকটা হলো 'হান্নান বোতলে পরী আটকে রাখে') একসাথে কিনে বেশ ভয়ে ছিলাম; প্রথমটা পড়ার পর আশা হচ্ছে, পরের বইটাতেও হয়তো জিতে যাব। নতুন লেখকদের বই কেনা বাজি ধরার মত, কি হয় কি হয় অনিশ্চয়তাটাও একটা মজা। অবশ্য এতবার বেলতলায় গিয়ে মাথা ফাটিয়ে এসেছি যে, মাঝে ঠিক করেছিলাম যে, গাছতলায় আর না, তবে আবারও প্রতিজ্ঞা ভুলে এবার গিয়ে যে বেলটা পেয়েছি সেটাকে শরবত বানিয়ে খাওয়াই যায়। আশা করা যায়, এই গতিজড়তায় আরো বেশ কিছু বই কেনা এবং পড়া হয়ে যাবে।
লেখকের প্রথম লেখা! পড়ে মনেই হয়নি। ভাষার কী সুন্দর ব্যবহার আর গল্পের চমৎকার গাঁথুনি।
এই উপন্যাসের কাহিনীবিন্যাসটা বেশি ভালো লেগেছে। কয়েকটি সময়ের ঘটনা একই সাথে বর্ণনা করা হয়েছে, যার প্রত্যেকটিকেই মূল ঘটনার সাথে মিলিয়ে নেয়া যায়। পড়তে গিয়ে একটুও আটকাইনি, এই সাবলীলতাটুকু সবার লেখায় পাওয়া যায় না। মাঝেমধ্যে কাব্যিক ভাব আর কবিতাগুলোও দারুণ ছিলো। ইতিহাসের কিছু অংশ জুড়ে দেয়াতে অনেক বাস্তবিক লাগে পড়ার সময়। সাথে একটুখানি ভয়ও...।
অনেক ভাল লেগেছে। বিস্তারিত লেখার আগ্রহ ছিল বইটা নিয়ে, সে কারণেই এতদিন লিখি নি কিন্তু আজ অব্দি সে সময় বের করা গেল না। ওয়াসি আহমেদ রাফি যে লেখার আগে অনেক ভাল একজন পাঠক; সেটা বোঝা যায় তার লেখায়। কেবল সেই পাঠক সত্ত্বার প্রশংসা করা ঠিক হবে না। লেখক হিসেবেও তিনি চমৎকার, সফল এবং বুদ্ধিদীপ্ত।
শেষ কবে হরর এর বই পড়ে অন্যরকম অনুভূতি হয়েছিল মনে নেই। সম্ভবত তানজিম ভাইয়ের "অক্টারিন" পড়ে এইরকম অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করেছিল ("এক জোড়া চোখ খোঁজে আরেক জোড়া চোখকে" বইকে এর সাথে যোগ করছি না। যেহেতু এই বইটা উইয়ার্ড আর লাফক্রাস্ফটিয়ান জনরার বই।) । যদিও "অক্টারিন" এবং "আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে" সম্পূর্ণ দুই রকম বই। আক্টারিন ছল হরর ফ্যান্টাসি আর "আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে" হল গথিক হরর। উড়ে এসে ঘাড়ে পড়া নয় বুরং শিকদাড়া বেয়ে শিরশির একটা অনুভূতির জানান দেয় গথিক জনরার বই। এই বইটা পড়ে সেইরকম অনুভূতি হল। কোন অজানা একটা ভয়। যার কোন ব্যাখ্যা নেই । তবে বইটার সবচেয়ে বড় প্লাস পয়েন্ট "ক্যাবিক"ঢঙে লেখা। লেখকের কিবোর্ড (এখনার কেউ কলম ব্যবহার করে না মনে হয়।)থেকে নিঃসৃত প্রতিটা শব্দই ছন্দ মিলিয়ে লেখা। গথিক হরর তাও আবার বাক্যে ছন্দের ব্যবহার অনেকটা যেন সুরিয়েলের কথা মনে করিয়ে দেয়। চাইলেও দ্রুত পড়ে ফেলার উপায় ছিল না। কারণ প্রতিটা শব্দ ভেবে তারপরের লাইনে যেতে হচ্ছিল। যে কারণে প্রতিটা ঘটনা প্রতিটা সিকোয়েন্স মাথায় গেঁথে যাচ্ছিল। আর ঠিক তখনই বইটার আসল মজা উপভোগ করা করতে পারছিলাম। সম্ভবত কাব্যের ছন্দে হরর বই আমাদের এখানে এই প্রথম। দারুণ কাজ দেখিয়েছে সন্দেহ নাই :) তবে অভিযোগ যা ছিল তা হল বইয়ের সাইজ নিয়ে । ধরতে না ধরতেই শেষ। তবে লেখক মহাশয় আশা দিয়েছেন সিকুয়েল আসছে । আপাতত তাই মাফ করে দিলাম :p । সিকুয়েলের অপেক্ষায় । আশা করি সিকুয়েল এই বইটাকেই ছারিয়ে যাবে।
এই বইয়ের কাহিনী সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা সম্ভব না। অন্তত আমার ক্ষেত্রে। টুকরো টুকরো বেশ কিছু গল্প এক জায়গায় এসে মিলিত হয়েছে। এবং প্রতিটি গল্পই সতন্ত্র। গল্পটা হতে পারে নসিবের। ১৯১৮ সালে যে কিনা বাবার মৃত্যুর পর মাধবগঞ্জে আসে বাউলদের নিয়ে গবেষণার কাজে। গল্পটা হয়তো সেই অন্ধ বাউলের যে তার সুমধুর কণ্ঠ দিয়ে গান গায়। গল্পটা হয়তো তার দৃষ্টিহীনতার কারণের। একজন অঘোরতান্ত্রিক , যে সর্বশক্তিমান হবার ইচ্ছায় মত্ত , তারও হয়তো এই গল্প। কিংবা উপমহাদেশে প্রথম ম্যাজিক নিয়ে আসা ছোট লাট এন্ডারসনের। গল্পটায় আমরা পাবো নীল বিদ্রোহের সময়কার একদল প্রতিবাদী কৃষককে কিংবা পাবো ১৩ বছর বয়সী এক বালককে। গল্পটা রঙ্গিলার বাড়ির এক বিশেষ মানুষেরও হতে পারে। ও হ্যাঁ দেখা মিলবে ঠগি এবং চা বিক্রেতা সুবোধ ঘোষের। হলফ করে বলতে পারি সুবোধ ঘোষের চা পান করতে না পারায় আপনারও আফসোস হবে আমার মত। অতীত ও অতীতেরও আগের কিছু নিয়েই এই গল্প।
পাঠ পতিক্রিয়া- আমার পড়া প্রথম গোথিক হরর। এ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা। কেন যে আগে হরর পড়তাম না সেটা ভেবেই এখন চুল ছিঁড়ি। রাফি ভাইয়ার প্রথম মৌলিক। অনেক উত্তেজিত ছিলাম বইটা নিয়ে। খুব ভালো লেগেছে। দারুণ উপস্থাপন। ভাষার ব্যবহার চমৎকার। বেশ কিছু দারুণ দারুণ উপমা ও রূপক ব্যবহার করা হয়েছে। কলেবর আরও বড় হলে আরও ভালো লাগতো। আমার লেখালেখির উন্নতির পিছনে যে তিনজন সাহায্য করে যাচ্ছে ব্যাপকভাবে তার মধ্যে উনি একজন। প্রিয় বড় ভাইয়ের বইটি পড়ে তাই অন্যরকম ভালো লেগেছে।
হরর আমার একদমই পছন্দের জনরা না। মানে পুরোই না। হরর পড়তে বা দেখতে আমি ভালোবাসি না। থ্রিলার এবং ফ্যান্টাসি আমার সবচেয়ে পছন্দের জনরা। আমি মূলতঃ এই দুই জনরাই বেশি পড়ি। তবুও কিভাবে কিভাবে জানি "আঁধারের গহীনে নিরুদ্দেশে" আমার পড়ার লিস্টে চলে এসেছে। সম্ভবত ওয়াসি আহমেদ নামটা থাকার কারনে।
মূল প্রসঙ্গে আসি। পড়া শুরু করা মাত্রই পুরো ডুবে গিয়েছিলাম কাহিনীতে। শুরু থেকেই বোঝার চেষ্টা করছিলাম কি হতে যাচ্ছে পরবর্তী পর্বে। অনুভব করছিলাম টানটান থ্রিল আর ভেতরে ভেতরে একটু আশঙ্কা কি হচ্ছে, কি হবে। বললে কেউ বিশ্বাস করবে কিনা জানি না, কিন্তু দু-একবার এমন অনুভব হয়েছে যেন চারপাশ থেকে হঠাৎ সব শব্দ গায়েব হয়ে গেছে, কেমন একটা শিরশিরে অনুভূতি, আমি আঁতকে উঠেছি প্রায়।
আমি মনে করি লেখকের সার্থকতা এখানেই। আতঙ্কের ঠান্ডা পরশই যদি অনুভব না করি, তাহলে আর হরর পড়া কেন। সেক্ষেত্রে লেখক সার্থক, তাইনা? তবে আপনাদের সেই অনুভব নাও হতে পারে। ও আর একটা কথা। রাত্রে পড়তেই বেশি ভাল লাগবে। তাই রাতে পড়ার অনুরোধ রইলো।।।
মেদহীন ঝরঝরে লেখা একদম....একরত্তি বেশি বা কম নাহ....খুবই সুখপাঠ্য লাগসে পড়ার সময়...a perfect combination of dark elements & thriller....double thumbs up for the writer...
তিনি সুপ্ত আছেন সহস্র বছর ধরে। জেগে উঠতে চাচ্ছেন নতুন অবলম্বনকে আঁকড়ে ধরে। কিন্তু অবলম্বন কাছে এসেও যেন আবার হারিয়ে গেল।
নীল বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ের ভারতবর্ষের একটা গ্রাম মাধবগঞ্জ। হঠাৎ করেই অদ্ভুত কান্ড ঘটতে থাকে এই গ্রামে। কারো ছাগল, কারো গরু, অথবা রাস্তায় কুকুর পাওয়া যাচ্ছে মৃত। একপাশ থেকে মাংস খুবলে খাওয়া। অশুভ কিছুর আলামত?
বাবার মৃত্যুর পর নিজের বাবার গ্রামে ফিরেছে নসীব। অথচ ছোটবেলার পর থেকে ওর বাবাই কখনো আর গ্রামে আসেনি। মৃত্যুর সময় ওর বাবার পকেটে একটা রহস্যময় চিঠি, যেখানে তিনি উল্লেখ করেছিলেন গ্রামে যাওয়ার জন্য। গ্রামে যাওয়ার জন্য নসীবের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাউল সাহেব আলীর গান এবং তার জীবনের উপর আর্টিকেল লেখা। আসলেই কি তাই? নাকি এর থেকেও বড় কোনো উদ্দেশ্য আছে?
পুরো গল্পটার প্রেক্ষাপট বলতে গেলে ১৮ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে ১৯ শতকের শুরু পর্যন্ত। সেই সময়ের একটা গল্পে সময়ের ক্রম মেইনটেইন করা খুবই টাফ একটা ব্যাপার। তারমধ্যে লেখক বেশ কয়েকটা টাইম লেয়ার একসাথে লিখেছেন। এবং ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই মেইনটেইন করতে পেরেছেন, সাধুবাদ জানাই তাকে। মৌলিক বই হিসেবে এটাই তার প্রথম বই, প্রথম বইয়েই যে নিজের জাত চেনাবেন এই সম্পর্কে পূর্ব ধারণা ছিল আমার।
এটা একটা গথিক হরর গল্প। গল্প বলে আজকাল মানুষকে ভয় দেখানো খুবই কঠিন কাজ, সেই কাজটাকে সহজভাবে করতে সফল হয়েছেন লেখক। ভাষা এবং উপমার ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মত। শুরুর দিকে অথবা বলতে পারেন গল্পের পূর্বাভাষ পড়ে কিছুই বুঝবেন না, এলোমেলো কিছু অর্থহীন কথাবার্তা মনে হতে পারে। কিন্তু যখন আস্তে আস্তে গল্পে ঢুকে যাবেন তখন বুঝতে পারবেন ঐ অর্থহীন প্রলাপের মানে কী ছিল।
এবার আসি সমালোচনায়। অন্যান্য লেখকের বই পড়ার সময় এই অংশুটুকুতে আমি একটু ভয়ে থাকি। লেখক ব্যাপারটা কিভাবে নিবেন এমন একটা ব্যাপার মাথার ভেতর খোঁচাতে থাকে। কিন্তু রাফি ভাইয়ের ক্ষেত্রে এই ভয়টা কাজ করছে���া।
গল্পের শুরু থেকে শেষপর্যন্ত খুব সূক্ষ্মভাবে হুমায়ূন আহমেদের মধ্যাহ্ন বইয়ের উপস্থিতি পেয়েছি আমি। মধ্যাহ্ন আমার অনেক প্রিয় বই বলেও হতে পারে। গল্প বলার ঢংটা একই রকম লেগেছে। একদম যে সেম টু সেম, এরকম কিছু না। টাইমের লেয়ারগুলো, প্রাত্যহিক জীবন, হিন্দু মুসলিমের একই পরিবেশে বাস, এবং একজন বাউল। এই ব্যাপারগুল্প মধ্যাহ্ন বইয়েও আছে। হতে পারে সম্পূর্ণ কাকতালীয়, হতে পারে লেখক একই স্টাইল ফলো করেছেন।
বানান ভুলের আধিক্য বরাবরই বিরক্তির কারণ। এই বইয়েও একাধিক বানান ভুল আছে, তবে গল্পে ঢুকে গেলে পাঠক হয়তো ভুলগুলো ধরতেই পারবে না, একজন লেখক বা অনুবাদকের চোখ দিয়ে পড়তে গিয়ে ব্যাপারগুলো আমার চোখে পড়েছে । গল্পটা খুবই সুন্দর, চমৎকার একটা প্লট। তবে আমার কাছে মনে হয়েছে গল্পটা আরো শক্তিশালী হতে পারতো, উপস্থাপন আরো সুন্দর হতে পারতো।
পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, হরর বই পড়তে হয় পরিবেশ তৈরী করে এবং অনুভব করে। আপনি দুপুরের কাঠফাটা রোদের সময় এই বই পড়লে যেমন মজা পাবেন না তেমনি রাত তিনটায় এক পাল বন্ধুবান্ধবের আড্ডায় বসে পড়েও পাবেন না। প্রকৃত মজা নিতে হলে মাঝরাতে একা বসে পড়বেন, চরিত্রগুলো এবং গল্পের স্থানগুলো মন দিয়ে অনুভব করবেন, তবেই না মজা পাবেন।
“বিংশ শতাব্দীর একেবারের শুরুর দিককার কথা। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এদেশে চায়ের প্রচলন শুরু করে। প্রথমদিকে বাঙালিকে তারা বিনামূল্যে চা পান করাতো। এমনকি চায়ের দোকান প্রতিষ্ঠাতে সাহায্য করতে এগিয়ে আসতো। তেমনি একজন হলেন মাধবগঞ্জের সুবোধ ঘোষ। ইংরেজরা তাকে তিনমাসের জন্য বিনামূল্যে চা-পাতা সরবরাহ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। যদি জনপ্রিয় হয় তাহলে পরবর্তীতে চা-পাতার নেবার জন্য তাকে মূল্য চুকাতে হবে। চা তো জনপ্রিয় হলোই, সেইসাথে দিন দিন বাড়তে শুরু লাগলো খদ্দেরের সংখ্যা। সুবোধ একা হাতে সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। এমনি এক সকালে ভাগ্যক্রমে তিনি দেখা পেয়ে গেলেন তেরো চোদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরের। সে কথা বলতে পারে না। মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করে। সুবোধ ছেলেটিকে তার দোকানের কাজে লাগালেন।
গ্রাম থেকে হুটহাট উধাও হতে শুরু করেছে গবাদি পশু। গ্রামের মানুষ এটাকে অলক্ষণ বলে মনে করছে। এরই মধ্যে গ্রামে পা পড়লো এক আগন্তুকের। তার পৈতৃক নিবাস নাকি এই গ্রামেই। মুসলমান হওয়ায় সকালবেলা হরিনাথের রুটির দোকানে নাস্তা মিললো না তার। আগন্তুক গিয়ে উঠলো গ্রামের মাস্টারের বাড়িতে। তাকে দেখে গ্রামের অন্ধ বাউল সাহেব আলি বলে উঠলো, এতদিন পর বিশুদ্ধ রক্তের আগমন ঘটেছে।
অজ পাড়া গাঁয়ে জঙ্গলের ধার ঘেঁষে সুদৃশ্য এক প্রাসাদতুল্য বাড়ি। গেটের বাইরে নামফলকে লেখাঃ অ্যান্ডারসন কটেজ। বাড়িটা ফাঁকা। এর দাবীদারেরা কেউ বেঁচে নেই। এত সুন্দর একটা বাড়ি বছরের পর বছর মালিকানাহীন পড়ে থাকলে অনেক আগেই দখল হয়ে যাবার কথা। অথচ আজও হয়নি। এর পেছনে রয়েছে গূঢ় এক রহস্য। গ্রামের লোকেরা এই বাড়িটাকে এড়িয়ে চলে। কেন?”
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ আপাতদৃষ্টিতে ছাড়া ছাড়া ঘটনাগুলোর সুতো আসলে এক জায়গায় বাঁধা। কাহিনী যত সামনে এগোয়, ততই একটু একটু করে উন্মোচন হতে থাকে রহস্যের। আর সমাধান? সেটা জানতে হলে পড়ে যেতে হবে শেষ পাতা অবধি। লেখকের লেখনশৈলী ভালো। সেইসাথে বর্ণনাভঙ্গিও চমৎকার। ওয়াসি আহমেদ তার বইতে তৎকালীন গ্রামীণ সমাজের একটা প্রতিচ্ছবি খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তবে বইটা হরর জনরার হলেও ভয়ের অনুভূতিটা সেভাবে অনুভূত হয়নি। হতে পারে, লেখক সব ভয় শেষের পাতাগুলোর জন্য জমিয়ে রেখেছিলেন বলে। তবে বইয়ের শেষ অবধি আগ্রহ ধরে রেখেছিলেন।
বিভিন্ন অনুবাদ বইয়ের কল্যাণে ওয়াসি আহমেদ নামটা পরিচিত হলেও ফ্ল্যাপের অংশ পড়ে জানতে পারলাম ‘আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে’ তার রচিত প্রথম মৌলিক উপন্যাস। প্রথম বই হিসেবে অনেক ভালো লিখেছেন বলতে হয়। পড়তে গিয়ে একবারও নতুন কোনো লেখকের বই পড়ছি বলে মনে হয়নি। বইয়ের বর্ণনাভঙ্গি এবং লেখনশৈলী দেখে আমার মনে হয়েছে লেখক হরর/থ্রিলার জনরার বাইরে সমকালীন/জীবনধর্মী উপন্যাসেও তার প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবেন।
প্রত্যেক অঞ্চলেরই কিছু কাহিনী থাকে।রহস্যের লতাপাতা দিয়ে আবদ্ধ থাকে কিছু জায়গা।তেমনই গ্রাম মাধবগঞ্জ।গল্পটা মাধবগঞ্জের,কিংবা মাধবগঞ্জের প্রতিটি অধিবাসীর অথবা মাধবগঞ্জের অতীতের।বাবার বন্ধুর বাড়িতে এসে হাজির হয় নসিব উদ্দেশ্য মাধবগঞ্জের বাউল সাহেব আলীর রহস্যময় বাউলে জীবন এবং কর্ম সম্পর্কে জানা।অন্ধ বাউল সাহেব আলী যে এক চাঞ্চল্যকর ইতিহাসের দ্রষ্টা তা কি কেও জানে? মাধবগঞ্জের মানুষের গরু, ছাগল মৃত পাওয়া যেতে লাগল,সুবোধ ঘোষের করুণায় তার চায়ের দোকানে চাকরি পাওয়া এক অল্পবয়সী ছেলে কানাইও একসময় হারিয়ে গেল, সবাই ভাবল সুবোধ ঘোষের রাগে অভিমান করেছে বোধহয়,হঠাৎ করেই যেমন কানাই উদয় হয়েছিল তেমন হঠাৎ করেই চলে গেল যেন,কে এই কানাই?একদিন রাতে সুবোধ ঘোষ ঘুম থেকে হঠাৎ জেগে উঠে দেখেন তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে কানাই...পরেরদিন লাশ পাওয়া গেল সুবোধ ঘোষের তার বাড়িতেই..কে খুন করল সুবোধ ঘোষ কে?কানাই ত বাচ্চা ঢ্যাঙা একটা ছেলে তাছাড়া ওর জীবন যে বাঁচিয়েছে তাকেই বা কেন খুন করবে ছেলেটা? গ্রামে একটা বিশাল বাড়ি,নীল বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীদের হাত থেকে বেঁচে ফেরা জাদুকর অ্যান্ডারসনের বাড়ি।জাদুকর কেনই বা এই গ্রামে এসেছিল?আর এতবড় বাড়ি এখানে বানানোর কারণটাই বা কি?গ্রামের লোকেরা কেনই বা এই বাড়িকে এড়িয়ে চলে? একসময় নসিব যায় ওই বাড়িতে,কারণ নসিবকে দরকার বড়ই দরকার..নসিব জানেও না তার নসিবে কি লেখা আছে... আস্তে আস্তে হারিয়ে যায় সব,অ্যান্ডারসন,সুবোধ ঘোষ,কানাই,নসিব সবাই হারিয়ে যায় আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে শুধু পরে থাকে মাধবগঞ্জ আর সে.. কে?
আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে, ওয়াসি আহমেদ ওরফে আমাদের রাফি ভাইয়ার প্রথম মৌলিক বই।প্রথম মৌলিক বই তারপরে আবার হরর বই এতটা জম্পেশ আগে আমি দেখিনি।সত্যিই দারুণ লিখেছেন।সবদিকে কাহিনী বর্ণনা করে,বিস্তারিত লিখেও যেন কিছু লেখেননি!বইয়ের প্রথম থেকে কাহিনী শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত যেন মনে হয়েছে প্রতিটা দাড়ি,সেমিকোলন খুবই হিসেব করে এবং পারফেক্টভাবে ব্যবহার করা হয়েছে,যেন এতটুকুও বাড়তি কিছু নেই।মোটকথা,ভালোই উপভোগ করেছি।
আর প্রচ্ছদটা অনেক সুন্দর।বাঁধাইও চমৎকার হয়েছে এবং বানানো বেশি ভুল নেই।
গল্পটার প্রেক্ষাপট অবিভক্ত বাংলার কোন এক গ্রামে।পটভূমি বিংশ শতাব্দীর।সে গ্রামে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের রহস্যময় এক প্রাসাদ। গ্রামে গবেষণার খাতিরে পা রাখে কোলকাতা শহুরে এক যুবক।এর মাঝে মৃত্যু হয় এক ময়রা,এক তান্ত্রিক ও কিছু চরিত্রে।এ মৃত্যুর পেছনের রহস্য কি???কার হাত আছে এর পেছনে???জানতে হলে পড়তে হবে এ বইটি।১৪০ পেজের বইটিতে ধ���পেধাপে রহস্য লুকিয়ে আছে।একেবারে পয়সা উশুল বলা চলে।লেখকের ব্যাপারে কিছু না বললেই না। এটা অনুবাদ সাহিত্যের পরিচিত মুখ ওয়াসি ভাইয়ের প্রথম মৌলিক লেখা। উনি যে কতটা দুরন্ত পাঠক এ লেখা থেকে বুঝা যায়।অনেক সুনিপুণ হাতে উনিশ শতকের অজপাড়াগায়ের কথা ব্যাখ্যা করেছেন ও বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পঙক্তি তুলে ধরেছেন এবং প্রাসঙ্গিকতা বজায় রেখেছেন।আশা করি ভালো লাগবে সবার।এটলিস্ট সময়টা বৃথা যাবেনা।
নসিব। কোলকাতায় যার বসবাস। বাংলার লোকগীতি সংগ্রহে গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে বেড়াচ্ছিল সে। ঘুরতে ঘুরতে মাধবগঞ্জে হাজির হয় সে। যা কিনা তার দাদার বাড়ির গ্রাম। বাবাকে নিয়ে গ্রামে আসার ইচ্ছে ছিল তার। যদিও তা সম্ভব হয়নি। বাবা মারা যাওয়ায়।
মাধবগঞ্জে পা দিয়ে টের পেল গ্রামটা অন্য আর দশটা গ্রামের মতন না। কিছু রহস্য লুকিয়ে আছে এই গ্রামে। যদিও তার কাছে সব কুসংস্কার হিসেবে মনে হচ্ছিল। যদিও কিছু হিসেব মিলছিলনা তার পরেও। কি হচ্ছে আসলে গ্রামের কিনারায় বনের মাঝে ওই বাড়িটাতে? গ্রামে কোন পাখি ওড়ে না কেন? যাও ওড়ে তাও ওই বাড়িকে ঘিরেই কেন?
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ গল্পটা অন্য রকম। ভাল লেগেছে। শুরুর দিকে অনেক অগোছাল লেগেছিল। মনে হচ্ছিল দুইটা টাইমলাইনে লেখক লিখে কোন মতন স্টাক করছেন গল্প। শেষের দিকে এসে সব সুতা জোড়া লাগার পর মিলে যাচ্ছিল। ভাল লাগল নিজের প্রফেশনের লিখা এত ভাল কোন বই পড়ে।
"মায়ার বন্ধন বড় কঠিন৷ চোখে দেখা যায় না বটে, তবে ছিঁড়ে-ছুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলে তা আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে যায়। নিজের কাছে রেখে দিলে পাথরের টুকরোর প্রতিও মায়া পড়ে যায়।"
ভয়। মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর মধ্যে অন্যতম একটা। আর ভয় বলতেই বুঝায় 'অজানা কিছু'র একটা অস্তিত্ব। যদিও বিজ্ঞানের আলোয় 'অজানা কিছু'র তালিকা ছোট হয়ে গেছে এবং অন্ধকারের পরিসীমাও কমে আসছে কিন্তু তবুও নিজের অস্তিত্বের ন্যায় অনস্তিত্বে ভয়ের বিশ্বাস মানুষের আরো জোরালো হয়েছে। ভয়কে কেন্দ্র করেই হরর গল্পের খ্যাতিলাভ। আর হরর গল্পের মধ্যে কয়েকটা ধারা বা উপশাখা আছে যার মধ্যে গথিক হরর একটা উপশাখা। গথ নিয়ে এর আগেই একদিন লিখেছিলাম। গথ থেকেই গথিক শব্দের উৎপত্তি। এক কথায় বললে, ভয়ংকর সুন্দরের পূজারী যারা। গথরা আঁধার ভালোবাসে, আঁধারের সেই কালো রঙটা নিজেদের সাথে মেশানোর চেষ্টা করে, মৃত্যুর মতো করুণ একটা বিষয়কে সৌন্দর্যের চোখে দেখে, আপাত দৃষ্টিতে যা কুৎসিত তার ভেতরের সৌন্দর্য অবলোকন করে গথরা। তবে জানার বিষয় হচ্ছে, গথিক হরর গল্পের বিস্তার হয়েছিল একটা অতিপ্রাকৃত আর উদ্ভট ঘটনার প্রেক্ষিতে। ১৭২৬ সালের কথা। অস্ট্রিয়ার মেডভেজিয়া নামক এক স্থানে ঘোড়ায় টানা গাড়ি থেকে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হয় আর্নল্ড পাওয়েল নামে এক লোকের। মৃত্যুর আগে পাওয়েল দাবি করতেন, তাকে খুব সম্ভব ভ্যাম্পায়ার বা রক্তচোষা জাতীয় কিছু একটা কামড়ে দিয়েছিল। পাওয়ালের মৃত্যুর পরপরই সে এলাকায় রহস্যজনকভাবে মানুষ মরতে শুরু করে। প্রশাসন তদন্ত শুরু করে নির্দিষ্ট উত্তর খুঁজে না পেলেও প্রচণ্ড রকমের উৎসাহ পেয়েছিলেন (সম্ভবত) পৃথিবীর প্রথম গথিক হরর উপন্যাসের লেখক হোরাস ওয়ালপোল। বলা হয়ে থাকে, এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই ওয়ালপোল তার বিখ্যাত গথিক উপন্যাস "দ্য ক্যাসল অব অটরান্টো" রচনা করেন। এরপর মেরি শেলী, এডগার এলেন পো, ব্রাম স্টোকার, বডেলিয়ার কিংবা লাভক্র্যাফট এদের লেখা দিয়ে গথিক হররের ধারাটা টিকে আছে। গথিক হরর- অন্ধকার আর অপছায়ার মধ্যে সৌন্দর্যের মায়া।
"আলোর উপস্থিতিতে যা চোখে পড়ে, তাকে সবাই বাস্তব ভাবতে বাধ্য। আঁধারের মাহাত্ম্যটা কিন্তু এখানেই; দৃষ্টির অগোচরে মানুষকে সবকিছুর অস্তিত্ব উপলদ্ধি করায় তা৷ সেই অস্তিত্বকে যেমন পুরোপুরি বিশ্বাস করা যায় না, ঠিক তেমনি অবিশ্বাসেরও সুযোগ নেই।"
গথিক হরর মানেই অস্বাভাবিক রকমের ভুতুড়ে কান্ড, এমন ভাবাটা বোকামি হবে। অবশ্যই ভুতুড়ে কান্ড আছে তার সাথে শিহরিত আর রোমাঞ্চিত হওয়ারও ব্যাপক উপাদান থাকে। আর তাছাড়া, এর সাথে মৃত্যু, অতীতের বেদনাদায়ক ঘটনা, প্রতিহিংসা, প্রেম, অভিশাপ এবং প্রতিশোধ এসবও থাকবে। আর এর সাথে যদি প্রচ্ছদ আর বইটার নামে গল্পের গহীনে আঁধারে হারিয়ে যাওয়া যায় তাহলে তো কথাই নেই। বাতিঘর থেকে প্রকাশিত ওয়াসি আহমেদ এর প্রথম মৌলিক উপন্যাস "আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে" বইটার কথা বলছি। বাতিঘরের পেইজ আর বাইন্ডিং বরাবরের মতোই তবে যেটার বলার তা হলো প্রচ্ছদ আর নাম। নামটা অনেক কাব্যিক শোনালেও গল্পের শেষে নামের সার্থকতাটা টের পাওয়া যায়। আর প্রচ্ছদটাও বেশ ভালো হয়েছে।
“গুণীজন নিজের গুণের কদর শুনতে পছন্দ করে। ভাস্কর মূর্তি গড়ে, গাতক গান গায়, আঁকিয়ে ছবি আঁকে-এখানে মূল উদ্দেশ্যটা শুধু নিজের আত্মার খোরাক মেটানো নয়; সাধারণ লোকে মুগ্ধ হয়ে শিল্পকর্মের প্রশংসা করবে, এতেই তার প্রকৃত আনন্দ।"
কাহিনীপ্রসঙ্গঃ ১৯১৮ সাল। অবিভক্ত বাংলায় তখন ব্রিটিশদের রাজত্ব। তবে এই ব্রিটিশদের রাজত্বে বসেও বৃটিশদেরই শেখানো চা দিয়ে রমরমা ব্যবসা চালাচ্ছে সুবোধ ঘোষ। সকাল সকাল সুবোধের হাতে বানানো এক কাপ চা না খেলে এই তল্লাটের অনেকেরই দিন খারাপ যায়। কিন্তু বাষট্টি বছর বয়সী শরীরটা আগের মতো সাহায্য করে না সুবোধ ঘোষকে। মনের এই কথাটাই দেবতা নাহয় অপদেবতার কানে যায়, যার ফলশ্রুতিতে মাঘের কোন সকালে বিকলাঙ্গর ন্যায় দেখতে এক ছেলেকে খুঁজে পায় সুবোধ ঘোষ। কানাই নাম দেয়, থাকার ঘর দেয়, দুবেলা দুমুঠো খেতে দেয় তার বদলে শুধুমাত্র দোকানটার দেখাশুনা করতে হবে ব্যস এইটুকুই। দিনকাল বেশ ভালোই যাচ্ছিলো কিন্তু একদিন কানাই উধাও হয়ে যায় অভিমান করে। দেবতার আর্শীবাদ তখন অপদেবতার অভিশাপে পরিণত হয়। এক রাতে কানাই ফিরে আসে সুবোধের ঘরে কিন্তু চিরচেনা সেই কানাই হয়ে না; অতিপ্রাকৃত আর অলৌকিক শক্তি সাথে নিয়ে।
ছয় মাস পরের ঘটনা। মাধবগঞ্জ নামক রহস্যেঘেরা গ্রামে পা পড়ে কলকাতা থেকে আসা নওয়াজেশ হায়দার চৌধুরী নসিব এর। সাথে বাবার আসার কথা থাকলেও বাবার মৃত্যু তা হতে দেয়নি। বাবা মৃত্যুর আগে নসিবকে কিছু একটা বলতে চেয়েছিল কিন্তু পারেনি। সেই অজানা প্রশ্ন মনে পুষেই গ্রামে এসেই উঠে বাবার খুব কাছের বন্ধু মোস্তফা সিরাজ যাকে মোস্তফা মাস্টার বলে গ্রামের সবাই ডাকে। রসায়নে বি.এড করা মোস্তফা সিরাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী হওয়া সত্ত্বেও কোন এক অজানা রহস্যে গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। নসিব কলকাতা থেকে গ্রামে এসেছে মাধবগঞ্জে থাকা এক বাউলের জীবন আর কর্ম নিয়ে একটা ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের কাজে। নসিবের খাতিরদারি যেন কোন ত্রুটি না থাকে সে বিষয়ে বরাবর সচেতন মোস্তফা মাস্টার; শুধুমাত্র বন্ধুর ছেলে বলে নয় এই পরিবারটার কাছে খুব বেশী ঋণী মোস্তফা ম���স্টার��� পুরানো পরিত্যক্ত স্কুলঘরটা পরিষ্কার করে দেয়া হয় নসিবের জন্যে। এক রাতে গ্রামের অনিতার সাথে পরিচয় হয় নসিবের কিন্তু গ্রামের মানুষ সেটা বাঁকা চোখে দেখে। অন্য এক রাতে নিজের রাঁধুনি যতীনের সাথে চলাচলের সময় খোঁজ পায় রহস্যঘেরা এক প্রাচীন কটেজের যেখানে দিনেদুপুরে গ্রামের মানুষজন যেতেও ভয় পায়। আর ঠিক তার পর থেকেই গ্রামে কিছু অদ্ভুত আর রহস্যঘেরা মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। বাউল সাহেব আলী এক রাতে গান শোনাতে এসে নসিবকে এমন কিছু একটা বলে যাতে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংশয়ে পড়ে নসিব নিজেই।
১৮৫৯ সাল। নীলকুঠিরের ছোট সাহেব জেফরি অ্যান্ডারসন যে কিনা এডিনবার্গে এককালে যাদুর প্রদর্শনী করতো কিন্তু জমাতে পারেনি বলে কোম্পানির হয়ে এখানে আসা। কি খারাপ কপাল অ্যান্ডারসনের? তা নাহলে কি আর নীলকুঠিতে আসামাত্রই নীলকররা বিদ্রোহ করে বসে? নিজের জান বাঁচাতে কুঠিরের পেছনে থাকা জঙ্গলে দৌড় দেয় অ্যান্ডারসন। লোকে ভাবে বাঘের পেটে যাবে সে কিন্তু না অ্যান্ডারসন ফিরে আসে নতুনরূপে মাধবগঞ্জে। মাধবগঞ্জে সার্কাসের পসরা বসায় অ্যান্ডারসন আর সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সাতান্ন বছর আগে একদল ঠগির মৃত্যুর পর যেখানে ভয়ে কেউ পা বাড়ায়নি ঠিক সেখানেই গড়ে তোলে রহস্যময় এক সুন্দর কটেজ। অথচ নিজে থাকেন তাবুতে আর রাত বাড়লেই চলে যান রঙিলাবাড়ির মধুবালার কাছে। এক রাতে মধুবালার কোলে আসা অ্যান্ডারসনের সন্তান আর অন্য এক ভোরে কোন এক অভিশাপ থেকে বাঁচতে নিজের ঔরসজাত সন্তানকে কটেজে রেখে পালিয়ে যান অ্যান্ডারসন।
কানাই কি সুবোধ ঘোষের জন্যে দেবতার আশীর্বাদ ছিল নাকি অপদেবতার অভিশাপ? সুবোধ ঘোষেরই বা এমন কি দোষ ছিল? কানাই বা কোথা থেকে অলৌকিক শক্তির খোঁজ পেয়েছিল? নসিবের বাবা নসিবকে কি বলতে চেয়েছিল? মোস্তফা মাস্টারই বা কেন গ্রামে এসে থাকেন? আর নসিবের পরিবারের তার এত কৃতজ্ঞতা কেন? অনিন্দ্যসুন্দর অনিতার সাথে কি নসিবের প্রণয়ঘটিত কোন সম্পর্ক ছিল? রহস্যঘেরা সেই কটেজটারই বা পেছনের কি ইতিহাস থাকতে পারে? বাউল সাহেব আলী নসিবের সম্পর্কে কিভাবে জানতো? অ্যান্ডারসন কীভাবে বা কার সাহায্যে বেঁচে গিয়েছিল জঙ্গলে? অ্যান্ডারসন কিসের অভিশাপ থেকে বাঁচতে নিজের সন্তানকে উৎসর্গ করেছিল? গল্পে শতাব্দীর ফারাকটা কি কেবলই নিছক নাকি প্রতিটা ঘটনা একে অপরের পরিপূরক?
লেখকপ্রসঙ্গঃ ওয়াসি আহমেদ পেশায় চিকিৎসক এবং নেশায় পাঠক আর বই সংগ্রাহক। ফেসবুকে তার বন্ধুলিস্টে থাকা কমবেশী সবাইই হিংসে করে তাকে কেননা প্রতি সপ্তাহেই কোন না কোন লেখকের রচনাবলী সমগ্র কিনবেই কিনবে। নেশা উঠলে টাকা ভুতে যোগায় ব্যাপারটা অনেকটা এমন। যাই হোক, লেখালেখির শুরুটা সুদূর শৈশবে হলেও পরিণত বয়স হওয়ার পরই সাহিত্যজগতে অনুপ্রবেশ। শুধুমাত্র লেখালেখি কিংবা চিকিৎসা নয় এছাড়াও ছবি তুলা, গান গাওয়া, গল্প বলাতেও দক্ষতা আছে লোকটার। মৌলিক লেখার আগে বেশকিছু অনুবাদ করে পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার অনুদিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে- দ্য জুডাস স্ট্রেইন, দ্য স্পাই, নর্স মিথলজি, মিশর পুরাণ, উই হ্যাভ অলওয়েজ লিভড ইন ক্যাসল, কোরালাইন এবং আফটার ডার্ক। যেই পরিমাণ বই সংগ্রহ করেন এবং পড়েন সে হিসাবে তার মৌলিকই অনেকগুলা হওয়ার কথা। আর তাছাড়া, লেখার ধরনে তাইই প্রকাশ পায়। কিন্তু হয়তো নিজের সীমাবদ্ধতাটা বুঝেন তাই এবারই প্রথম মৌলিক লিখলেন। সে যাই হোক, লেখার সৌন্দর্যতা সম্পর্কে বলার কিছু নেই। এককথায় অসাধারণ লেগেছে। গল্পের ভাজে ইতিহাস জানানোটা অনেকটাই কঠিন। আর সেটাই ওয়াসি ভাই খুব সহজ-স্বাভাবিকভাবেই তুলে ধরেছেন।
"অনুদান পাওয়ার সময় মানুষ লোভী হয়ে উঠে৷ প্রতিদানে অনেক বড় আত্মত্যাগের শর্ত থাকলেও মোহের বশে খেয়াল থাকে না তখন। অবশেষে যখন টনক নড়ে, ততোদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়!"
একজন পুরোদস্তর লেখক হতে হলে আগে একজন পুরোদস্তর পাঠক হতে হয়। তা নাহলে পাঠক লেখকের লেখায় খেই হারিয়ে ফেলে। আর তা যদি বর্তমানে বসে এক-দেড়শো বছর আগের কাহিনী হয় তা হলে তো সেটা খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তাও একেবারেই নতুন আনকোরা একজন লেখকের পক্ষে। কিন্তু, ওয়াসি ভাই বর্তমানে বসেও এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে গল্প বলেছেন যে মনেই হয়নি লেখকের প্রথম মৌলিক এটা। আর একশো-দেড়শো পৃষ্ঠার একটা বইতে বড় পরিসরে গল্প চালিয়ে নেয়া, দুটো প্যারালাল স্টোরিকে একজায়গায় এনে দাড় করানো এবং চরিত্রের মোক্ষম গঠন চাট্টিখানি কথা না। সবকিছুই খুব ভালোভাবে নিজের লেখা আর মেধায় ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। হ্যা অসঙ্গতিও আছে। শব্দগত ভুল একদমই কম ছিল যা ছিল তাও চোখের পড়ার মতো না। অধ্যায়গুলো সব সংখ্যায় লিখা হলেও একটাতে কথায় লেখা হয়ে গেছে। গল্প শেষের আগে আগে অল্প কিছু জায়গা গতিহীন লেগেছে। উপন্যাসের জনরা নিয়ে কিছুটা কনফিউশন আছে। গথিক উপন্যাস বলা হলেও থ্রিলারেরর স্বাদ আছে আবার কিছু জায়গা পড়ে আরবান ফ্যান্টাসির মতো মনে হয়েছে। সে যাই হোক, গল্পের আবহটা এমনভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে লিখেছেন যে ভয় না পেলেও আস্তে আস্তে গল্পের ভিড়ে সেই ভয়ের দিকেই ঠেলে নিয়ে গেছেন লেখক। না খুব বেশী বই পাওয়ার মতো বই এটা নয় কিন্তু অদ্ভুত ভালোলাগার মতো একটা বই। বইটা পড়ার একটা দীর্ঘ সময় ধরে অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করবে। একই সাথে অনেক কিছু জানাটা অদ্ভুত ভালোলাগারই ব্যাপার বটে। পড়ে ফেলুন আশা করি সময়টুকু বিফলে যাবে না।
ভালো লাগা কিছু উক্তিঃ
"উত্তাল সময় জন্ম দেয় উন্মত্ত মানুষের!" "ঈশ্বর যে সৌন্দর্যকে নিজ হাতে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন, তাকে এক জায়গায় সীমাবদ্ধ রাখা মানে সৃষ্টিকুলের প্রতি অবিচার করা।" "বেঁচে থাকার এটাই প্রকৃত আনন্দ, হুটহাট নিজেকে অচল করে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।" "আলোতে পথ চিনতে যে ভুল করে, আঁধারের গহীন নিরুদ্দেশে সে তো হারাবেই।" "সীমা বলে আদৌ কিছু যদি থেকে থাকে-তা সসীম, অসীম যাই হোক না কেন, মানুষের সাধারণ লৌকিক জ্ঞানে সেই পরিমাপ ধরা যায় না। আর সেকারণেই প্রাণের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ যখন মহা-প্রাণ দেখা দেয়, তখন তার স্বরূপ বোঝাও অসম্ভব হয়ে ওঠে।" "আত্মা, সত্তা, শক্তি, উপস্থিতি-যে নামেই ডাকা হোক না কেন, জগতে যখন কারো সহসা আগমন ঘটে তখন তার কারণ সব সময় উদঘাটন করা যায় না।" "অশুভের প্রতি সহানুভূতি, কখনও শুভ ফল বয়ে আনে না!"
“তবুও তো প্যাঁচা জাগে; গলিত স্থবির ব্যাং আরো দুই মুহুর্তের ভিক্ষা মাগে আরেকটি প্রভাতের ইশারায়-অনুমেয় উষ্ণ অনুরাগে।” -জীবনানন্দ দাশ।
বহুদিন পর দূর্দান্ত রকমের "বাজে" বই পড়ার সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য হলো। প্রমিজিং প্লট, মোটামুটি ভালো শুরু হলেও দিনশেষে আরেকটা বাজে বইয়ের তালিকায় রাখতে হচ্ছে বইটাকে। কোনো কিছুরই ঠিক নাই। লেখকের লিখনশৈলী ভালো, কিন্তু অযথা জ্ঞান দানের প্রবণতা লক্ষ্যনীয়। মাত্র ১৪০ পাতার বইয়েও যে বর্ণনার বাহুল্যতা থাকতে পারে তা এই বই না পড়লে বুঝতাম না। অনেক অনেক চরিত্র এসেছে বইয়ে, যাদের পিছনে বেশকিছু পাতা খরচ করা হয়েছে, যেগুলার শেষ পর্যন্ত তেমন কোনো ভূমিকাই চোখে পড়েনি। কারেক্টার ডেভেলপমেন্ট নিম্নমানের। যে সত্ত্বা নিয়ে এত কাহিনী, সেই সত্ত্বা যখন এলো, তখনি বিদায় নিয়ে নিল!! এমন হাস্যকর এন্ডিং যে সেটা নিয়ে কথা বলাও আসলে অপচয়। সময় নষ্ট, টাকা নষ্ট টাইপ বই।