#Book_Mortem 28
#দ্য_হান্ট_ফর_আটলান্টিস
লেখকঃ আ্যন্ডি ম্যাকডারমট
অনুবাদকঃ আদনান আহমেদ রিজন
প্রকাশনীঃ চিরকুট
প্রচ্ছদঃ আদনান আহমেদ রিজন
মূদ্রিত মূল্যঃ ৫০০ টাকা
হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা "আটলান্টিস" খুঁজে বেড়ানোর জন্য পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে সূত্র মেলানোর পিছনে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন আর্কিওলজিস্ট নিনা ওয়াইল্ড। তাকে এই ব্যাপারে আর্থিকভাবে সাহায্য করে যাচ্ছে ধনকুবের ফ্রস্ট ফাউন্ডেশন। সঙ্গী হিসাবে আছে বৃটিশ আর্মির সাবেক সেনা সদস্য এডি চেয এবং বিলিওনিয়ারের কন্যা ক্যারি ফ্রস্ট। আর তাদের মিশনকে পন্ড করে দেয়ার জন্য পিছনে লেগে আছে ব্রাদারহুড নামক এক সংগঠন। পদে পদে বাঁধা, বিপত্তি আর রহস্যের সমাধাণ করে শেষ পর্যন্ত কি খুঁজে পাওয়া যায় সাড়ে ১১ হাজার বছর পূর্বের এই সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ??
#পর্যালোচনাঃ আটলান্টিস নিয়ে আমার প্রবল আগ্রহ ছিলো আগে থেকেই। তাই বইটা অনেক বেশী এক্সপেক্টেশন নিয়েই শুরু করেছিলাম। শুরুটাও বেশ আশা জাগানিয়াই ছিলো। শুরুর দিকের কিছু অংশ পড়ে মনে হলো কোথায় যেনো পড়েছি হিমলার আর নাৎসী বাহিনীর তিব্বত ভ্রমণের ব্যাপারে 🤔!! পর মুহুর্তেই মনে পড়লো "সাম্ভালা" তে এই ধরণের একটা নাৎসী বাহিনীর মিশনের বর্ণনা ছিলো। তফাৎ হলো সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে "সাম্ভালা" খোঁজার জন্য তারা গিয়েছিলো, আর এখানে বলা হয়েছে "আটলান্টিস" খোঁজার জন্য।
তফাৎ আরো আছে, আমাদের দেশীয় লেখক এই আর্কিওলজিস্ট মিশন গুলোকে যতোটা যত্নের সাথে ফুটিয়েছিলেন, বিদেশী লেখক সেই মিশনে ততটা যত্ন দেননি। লেখকের সম্পূর্ন ফোকাসই ছিলো সম্ভবত একশন, একশন এবং একশনের দিকে। আমি কিছু ঐতিহাসিক রেফারেন্স, কিছু মিথ আর পাজল সমৃদ্ধ একটা গল্প আশা করেছিলাম। এই বইয়ে তার সবই আছে, শুধু প্রপার এক্সিকিউশান কিংবা ডিটেইলসের অভাব মনে হয়েছে। তবে বইটাকে একেবারে হাই স্পিডি কার রেসের সাথে তুলনা করা যায়। প্রচন্ড গতিতে এগিয়েছে বই। আটলান্টিস খোঁজার সূত্রের জন্য ইরান, ফ্রান্স, ব্রাজিল, তিব্বত চষে বেড়ানো ভালো লেগেছে। তবে প্রতিটা সূত্রের সাথেই এসেছে একটা করে একশন সিক্যুয়েন্স। মাত্রাতিরিক্ত একশন সিকুয়েন্স পড়তে পড়তে আমি সত্যি বলতে এক পর্যায়ে কিছুটা বিরক্ত বোধ করেছি। একশন সিক্যুয়েন্সের বর্ণনাগুলো অবশ্য ওয়েল এক্সিকিউটেড ছিলো। আমার এক্সপেক্টেশন ছিলো অনেক বেশী এডভেঞ্চার + সাথে সামান্য একশন, কিন্তু এখানে অনেক অনেক একশনের সাথে সামান্য এডভেঞ্চার জুড়ে দেয়া হয়েছে। বইয়ের অর্ধেক পড়ার পরে আমার কাছে বইটার প্যাটার্ন একই রকম মনে হলেও, এটা একশন লাভার প্রতিটা পাঠকেরই অনেক বেশী ভালো লাগার কথা। কিছু হিউমেরাস সেকশন ছিলো বইয়ে আর ছিলো প্রচুর পরিমাণে স্ল্যাং ল্যাঙ্গুয়েজ 😑!! হিউমার গুলো কখনো কখনো ভালো লাগলেও, মাঝে মাঝেই মনে হয়েছে ভুল সিচুয়েশনে জোড় করে ইমপ্লিমেন্ট করা হয়েছে। ওভারঅল একটানা পড়ে যাওয়ার মতো এনজয়েবল বই, জাস্ট আমার এক্সপেক্টেশনের নিচে ছিলো। তারপরেও এই সিরিজের পরবর্তী বইগুলোর অপেক্ষায় থাকবো। গল্পের আদলে এইসব হারানো সভ্যতা কিংবা মিথগুলা নিয়ে যতোটুকু জানা যায়, ততটুকুই মনের খোড়াক।
#চরিত্রায়নঃ চরিত্রায়নও মোটামুটি মানের মনে হয়েছে। ওই যে বললাম, একশন!! ওই জিনিসে ফোকাস করতে গিয়ে লেখক আর সব জিনিসকেই কিছুটা সাদামাটা ভাবে তুলে ধরেছেন। অনেকটা ফিল্মি স্টাইলেই চরিত্রগুলাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। মূল দুই চরিত্র নিনা এবং চেযকেই যতোটা সম্ভব ফুটানোর চেষ্টা করেছেন। এর মধ্যেও আবার যত্রতত্র চেযের করা ভাড়ামো গুলা খুব একটা হজম হয়নি। ক্যাস্টিল চরিত্রটার জন্য ভালো লাগা কাজ করেছিলো।
#অনুবাদঃ এই অংশটুকু কিছুটা সংশয় নিয়ে লিখবো। সম্ভবত উনার অনুদিত ৮টা বই আছে আমার কাছে তার মধ্যে এটাই আমি প্রথম পড়লাম। অনুবাদক হিসাবে আদনান আহমেদ রিজন সুপরিচিত এবং আমার সাথেও উনার ব্যক্তিগত সম্পর্কটুকুও ভালোই। আমি এই অংশটুকু আড়ালে রেখেই একজন পাঠক হিসাবে এই নির্দিষ্ট বইয়ের অনুবাদকে বর্ণনা করবো, যা কিনা একান্তই আমার ব্যক্তিগত মতামত থাকবে।
শুরুতেই বলি অনুবাদ একদম সুন্দর সাবলীল। সু অনুবাদক সায়েম সোলায়মান ভাইয়ের মতো রিজন ভাইও "জ" এর জায়গায় "য" লিখেন। যদিও সায়েম ভাই বলেছিলেন সেবা থেকেই চলে আসা এই জিনিসটা আস্তে আস্তে উনি চেঞ্জ করে ফেলবেন পাঠক চাহিদার উপর নির্ভর করে। তবে আপাতত মনে হচ্ছে রিজন ভাই সেটাকে ধরেই এগিয়েছেন। এইটুকু অস্বস্তি বাদ দিলে, বাকী বইয়ের অনুবাদ একদম ঝরঝর���, কোনো ধরনের কঠিন শব্দের বালাই নেই। যে কারনে এতো এতো জায়গা আর একশন দৃশ্যগুলোর বর্ণনাও অনেক সহজেই কল্পনা করা যাচ্ছিলো। তবে কিছু বিষয় নিয়ে আমার খারাপ লাগা আছে, আশা করি অনুবাদক সেগুলোকে "স্পোর্টিংলি" নিবেন।
"আবার জিগায়" "বেচারা" "ধুশ শালা", এই বাক্যগুলা এতো এতোবার বইয়ে ব্যবহার করা হয়েছে যে, তা আমার কাছে বেশ পীড়াদায়ক মনে হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশী কারেক্টারের মুখে এইসব শব্দ/বাক্য প্রবল ভাবেই বেমানান মনে হয়েছে আমার কাছে। তারপরেও ধরে নিলাম নিজস্ব সিগনেচার রাখার জন্য সেগুলা ব্যবহার করলেও, আমরা সবাইই নিশ্চয়ই একই রকম ভাবে কথা বলি না। আর তাই সকল কারেক্টারের মুখ দিয়েই এই ধরণের বাক্য ব্যবহার করাটা বেশ দৃষ্টিকটু লেগেছে আমার কাছে। নিনা, এডি, ক্যাস্টিল কিংবা স্বল্প সময়ের জন্যেই আসা বইয়ের কারেক্টারও যদি বলে "আবার জিগায়", তা হলে তা বেমানানই বটে। এছাড়া প্রতিটা কারেক্টারের ক্ষেত্রেই বারবার বলা হয়েছে "বেচারা"!! হোক সেটা হিরো কিংবা ভিলেন, বেচারা এখানে সবাইই!! Shit শব্দকে "ধুশ শালা" না হয় মেনে নিলাম, তাই বলে What the Hell এর মতো একটা বাক্যকেও "ধুশ শালা" বলে সম্বোধন করা মানা যায় না। আমি মোটামুটি পুরো বইটাই ইংরেজির সাথে মিলিয়ে দেখেছি, এই রকম অসংখ্য শব্দকে চাইলেই ভিন্ন ভিন্ন বিশেষনে কারেক্টার অনুযায়ী ব্যবহার করা যেতো। এছাড়াও বইয়ে বেশ কয়েকবার দেশীয় সারাংশ ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন "বিনা যুদ্ধে নাহি দেবো সূচাগ্র মেদিনী" কিংবা "যাত্রা তব শুরু হোক, হে নবীন। করো হানি দ্বারে, আটলান্টিস ডাকিছে তোমারে"!! এইগুলা যদি আমি "সাহিত্যিক অংশ" হিসাবে চালিয়ে দেইও, তবুও "যেতে যেতে পথে, পূর্নিমা রাতে শালা চাঁদ উঠেছিলো গগনে" এইগুলাকে মেনে নিতে পারি না। পারি না, "But He Had to Try - যতোক্ষণ শ্বাস, ততক্ষণ আশ!!" কিংবা "We Will See About That" কে "একদম হান্দায়া দিমু" অনুবাদ করা 😑😑!! "Mighty Jack" কে সম্বোধন করা হয়েছে "মাননীয় স্পিকার জ্যাক" হিসাবে!! সিরিয়াসলি!! মাইটি জ্যাকই বলা হোক না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ২/৪টা ইংরেজি শব্দকে অবিকল রেখে দিলে সমস্যা দেখি না আমি। আর স্ল্যাং গুলার কথা না হয় এড়িয়েই গেলাম। যেহেতু মূল লেখক প্রবল স্ল্যাং ইউজ করেছেন, তাই অনুবাদকও সেটার ধারা ধরে রাখবেন সেটাই স্বাভাবিক। তবে এখানেও "আকাশ ভরা তারা, *য়ামারা সাড়া" টাইপ নিজস্ব ফ্লেভার ইউজ করেছেন তিনি। মোটকথা মূল লেখক যেমন জায়গায় বেজায়গায় রসিকতা করে বইটার ওজন কমিয়েছেন, অনুবাদক তাতে আরো একটু ঘি ঢেলে দিয়ে একেবারেই হালকা করে ফেলেছেন।
এখনকার জেনারেশনের কাছে হয়তো এই জাতীয় বাক্য/শব্দ মজাদার মনে হতে পারে। সেক্ষেত্রে অনুবাদক পুরোপুরি সফল উনার অনুবাদে। কিন্তু আমার এইগুলা ভালো লাগেনি। আমার ধারণা আমার সাথে একমত হওয়ার মতো মানুষ কমই থাকবেন। তাই যাদের এমন অনুবাদ ভালো লাগে উনাদের কাছে অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তবে রিজন ভাইয়ের বাংলা বিশেষনের দিকে আরো একটু নজর দেয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়েছে।
#প্রোডাকশনঃ "চিরকুট" নাম থাকার পরে প্রোডাকশন নিয়ে আসলে কিছু লেখার থাকে না। টপ নচ পেইজ কোয়ালিটি, বাইন্ডিংস এবং নির্ভূল বানান। তবে প্রচ্ছদ নিয়ে হতাশা আছে। নরমালি যেকোনো সময়ে এই প্রচ্ছদ অবশ্যই ভালো লাগার মতো, কিন্তু ১ম দেখায় সানবার্ডের সাথে সামঞ্জস্যতা চোখে লাগে। বিশেষ করে সানবার্ডের প্রচ্ছদ আগে বের হওয়া এবং এটার চেয়ে বেশী ভালো লাগায়, এই প্রচ্ছদটার আবেদন কমে গিয়েছে। তবে প্রচ্ছদকারক হিসাবে রিজন ভাই আমার টপ ফেভারিট একজন। উনার অন্যান্য বইয়ের প্রচ্ছদ বেশ ইউনিক।
#রেটিংঃ ৬.৫/১০ (ভালো বই, টানা পড়ে যাওয়া যাবে, কোনো ধরণের ঢিলেমির অবকাশ নেই। জাস্ট কোনো ধরণের চিন্তা ভাবনার অবকাশ নেই আর কি!! যেটা আমার পছন্দের সাথে একটু কম যায়!)
#পরিশিষ্টঃ এই সিরিজটার সেকেন্ড বই আসতেছে। এবং আমি সেটাও অবশ্যই কিনবো। শুধু অনুরোধ থাকবে রিজন ভাই যেনো আরেকটু ভিন্নতা আনেন উনার অনুবাদে। শুভকামনা চিরকুট এবং রিজন ভাইয়ের প্রতি।