আমি যা খুঁজছি, তাকে বলে জুডাস কয়েন। জুডাস কয়েন হলো সেই তিরিশটি রূপার পয়সা, যার বিনময়ে জুডাস ইসকারিয়াত যিশু খ্রিষ্টকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়েছিল। তিরিশটা পয়সা রূপার হলেও জুডাসের হাতে পড়ার পর ওগুলোর রঙ লাল হয়ে যায়। নাম হয় ব্লাড কয়েন। ধরে নেয়া হয় যিশু খ্রিষ্টের রক্ত লেগে আছে ওতে। সেন্ট জনের মতে, জুডাসের ওপর খোদ শয়তান ভর করেছিল। আগে থেকেই এই পয়সাগুলোর বিশেষ ক্ষমতা ছিল। জুডাসের হাতে পড়ে ওগুলো হয়ে ওঠে আরো অভিশপ্ত।
উপন্যাসিকাটা যথেষ্ট ভিন্নধর্মী ও চমকপ্রদ ছিল, কাহিনি-ইতিহাস-অতিপ্রাকৃতিক আবহ-লেখনি সব দিক থেকেই, তবু শেষাবধি তেমন ভাল লাগল না । প্রথম ও প্রধান কারণ এন্ডিংটা খুব খুব বাজে লেগেছে, পড়ার পুরো সময়টা মনোযোগ পুরোপুরি ধরে রেখেও শেষে গিয়ে একেবারে মুখে তিক্ত একটা স্বাদ রেখে দিয়েছে । দ্বিতীয় কারণ পড়ে মনে হয়েছে মূল লেখাটা বোধহয় আরও অনেক বিস্তৃত ছিল, কিন্তু প্রকাশের সময় সেটা কাটছাঁট করে চাপাতে গিয়ে খুব বেশিরকম এক্সপোজিশনাল হয়ে গেছে, শুধু ঘটনা/ইতিহাসের বর্ণনা আর বর্ণনা আর বর্ণনা... পাশাপাশি ক্যারেক্টার ইন্টার্যাকশন, সংলাপ, দৃশ্যায়ণের ডিটেইলিং কম । ফলে চরিত্রগুলো ঠিক প্রাণ পায়নি, ঘটনাপরিক্রমা অনেকটাই যান্ত্রিক, এবড়োখেবড়ো । তবে বলতেই হয় আলমগীর তৈমূরের লেখনি অপূর্ব, তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু ও ইতিহাস-মিথের উপরে দখল অনন্যসাধারণ । বিশেষত অভিশপ্ত "জুডাস কয়েন"-এর মতো রোমাঞ্চকর বাস্তব ইতিহাসনির্ভর অতিপ্রাকৃতিক মিথ-রহস্য সম্ভবত বর্তমান বাংলা সাহিত্যে শুধু তাঁর কলম থেকেই বের হয়ে পারে । শুধু আফসোস উপন্যাসিকাটির অন্যান্য উল্লিখিত দিকগুলো এই দুর্দান্ত আকর্ষনীয় ও কৌতূহলোদ্দীপক টপিকটাকে প্রয়োজন মতো সহায়তা করতে পারলো না ।
তৈমূর স্যারের যেকোনো লেখার মতোই এই লেখারও বৈশিষ্ট্য চারটি~ ১. বৈদগ্ধ্য; ২. লেখনী; ৩. কালচেতনা; ৪. অবচেতনের সূক্ষ্ম আলোড়নকে মূর্ত করে তোলার ক্ষমতা। যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তাহলে একটা খুব ভালো জিনিস থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন। পড়ুন, প্লিজ!
বরাবরের মত বিশাল ঐতিহাসিক সেটিং লেখকের অন্য গল্প গুলোর মতো প্রাচীন মুদ্রা মুদ্ধতার দাবী রাখে। ইতিহাস আমার কাছে অত্যন্ত প্রিয় এক বিষয়, যার কারনে তৈমূর স্যারের গল্প গুলো টেনে ধরে রাখে সাধারণত। প্রাচীন মুদ্রা পড়ার সময় অনুভূতি ছিল আরো দারুন! তবে মাঝে মাঝে টাইমলাইম এত দ্রুত চেঞ্জ হয়েছে যে খেই হারিয়ে ফেলেছি!
মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের অন্যান্য গল্পগুলোর মতোই ইতিহাস, মিথ, রহস্য ও সামান্য অতিপ্রাকৃত দিয়ে লেখা এই গল্পটা। জুডাস কয়েন, ইহুডিজ খ্রিস্টান ও মুসলিম জাতির ইতিহাসের গলি ঘুপচি ভালোই ঘুরিয়ে এনেছেন লেখক। লেখনশৈলী ও বর্ণনাভঙ্গি বরাবরের মতোই সুস্বাদু। তবে বাকি গল্পগুলোর মত এখানেও শেষে একটা ধাক্কা দেয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক, কিন্তু ধাক্কাটা পছন্দ হয়নি। এজন্যই তিন তারা নাহলে অনায়াসে চার তারা দিতাম।
মুহম্মদ আলমগীর তৈমুরের সম্মোহনী লেখনী সবসময়ই মনের ওপর প্রভাব ফেলে। সেজন্য এই উপন্যাসিকাকে পাঁচে তিন দেয়া গেলো। কাহিনী তাঁর আগের লেখাগুলোর পর্যায়ের লাগেনি। গঠনের দিক থেকে একে আলিফ লায়লা ধাঁচের মনে হয়েছে-- একজন আরেকজনের দেখা পেল, সে এক��া গল্প বলল, গল্পের ভেতর আরেকজন কেউ গল্প বলা শুরু করল, কিংবা একজনের জার্নাল পড়ল, সেই বর্ণনার ভেতর একজন আরেকজনকে গল্প বলল, সেই গল্পের ভেতরে আরেকজন গল্প বলল, এইভাবে।
মুক্তিযুদ্ধ, ইসলাম এবং খ্রিষ্টান ধর্মের ঐতিহাসিক বিষয়াদি, হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার স্বল্প চিত্রায়ণ–সবকিছুর নিপুণতম মিশেল খুঁজে পাবেন গল্পে। সমাপ্তিটা অনবদ্য।
গল্প শুরু হল। হিউমারের ছাপ লেখার কায়দায় পেয়ে বোধ হল এক বসায় শেষ হবে হয়ত বইটা।
সামনে এগুতে দেখি একি!!! গল্পের সেটিং হয়েছে দেখি নিজ এলাকায়! মেহেরপুর জেলার বিখ্যাত মুজিবনগরে এক মধ্যরাতে এই ধরায় আগমন হয়েছিল আমার। কুষ্টিয়া হল গিয়ে দাদাবাড়ি। নানুমণির পূর্বপুরুষেরা দোর্দণ্ড প্রতাপে বাস করতেন ভারতে। ছোটাখাটো জমিদারির ধারাও বংশে ছিল। যেই নীলকুঠির কথা বারবার বলা হচ্ছিল সে তো আমাদের আমঝুপিতেই দাঁড়িয়ে কালের সাক্ষী হয়ে!
চিরপরিচিত জায়গায় এমন রহস্যের দানা বেঁধে উঠতে দেখে আগ্রহ উঠে গেল তুঙ্গে। মেহেরপুর থেকে সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা-মহেঞ্জোদারো। সেখান থেকে বেলুচিস্তানের নিষিদ্ধ এলাকা হাউজ অব স্পিরিট। ক্যানিবালিজম আর ব্ল্যাক ম্যাজিকের আখড়া ছিল যে এলাকা। তার সাথে জুড়ে গেল ব্যাবিলন হয়ে জেরুজালেম। এ বিশাল মূলে শাখাপ্রশাখার মত জুড়েছিল সেই নূহ (আ:) এর সময় থেকে শুরু হওয়া ইতিহাসের প্রাচীনতম, রহস্যময় সব কাহিনী। ইতিহাস কি চমকপ্রদই না জিনিস! আজ থেকে ৫ হাজার বছর আগের কোনো বাতাস দক্ষিণে না বয়ে উত্তরে বইলে আজ পৃথিবী অন্যরকম হত! প্রাচীন ইতিহাসের প্রতি আমার সুবিশাল আকর্ষণ এই বইকে তাই ৫ তারা দিয়ে দিল। কত কিছু যে জানলাম নিষিদ্ধ মুদ্রার সন্ধান করতে করতে!
এত তথ্য অনেকের বিরক্তের কারণ হয়েছে, এন্ডিং নিয়েও বিস্তর আপত্তি চোখে পড়ল। সাহিত্যের ভাষায় যাকে বলে "টাই ব্যাক এন্ডিং", ইতিটা সেভাবেই টানা হয়েছে। ঐ অভিশপ্ত মুদ্রার শেষতক কি হল তা এমন ধোঁয়াশা থেকে যাওয়াই ঢের ভাল।
হায় নিষিদ্ধের প্রতি আকর্ষণ আর তার অন্তিম পরিণতি! মানুষের এই আদি পাপ আর তার পরিণাম তো সর্বজনবিদিত। তাও কি তার শিক্ষা কস্মিনকালে হবে!
এত সুনির্মিত , ইন্টারেস্টিং একটা প্লট কিন্তু গল্প বলার মধ্যে যেন কোথাও খামতি রয়ে গেল। বড্ড abrupt , তাড়াহুড়ো করে একটা খাপছাড়া পরিণতিতে শেষ হয় গল্পটা, অথচ আরো অনেক সম্ভাবনা ছিল। তবু প্লট নির্বাচনের কারণেই লেখকের আরো লেখা পড়ার ইচ্ছা রইল।
ইতিহাস,মিথ,তথ্য,বিভিন্ন জায়গার বর্ননা সবকিছু মিলিয়ে উপভোগ্য একটা উপন্যাস।তবে তাড়াহুড়োর একটা ছাপ স্পষ্ট রয়েছে বইটা তে।আরেকটা জিনিস এই ধরনের গল্পের প্লট খুব প্রেডিক্টেবল হয়।শেষ টা অনেক সময় যা ভাবা হয় সেরকম ই হয়(এবং এই গল্পের ক্ষেত্রেও ব্যাতিক্রম হয় নি)।তবে বর্ননাভংগি,গা ছমছমে ভাব তৈরি করা এই জিনিসগুলোতে আলমগীর তৈমুর আনপ্যারালাল।
উপন্যাসের পটভূমি ৯০ দশক। এম ফিল ডিগ্রির জন্য এক নৃতত্ত্ববিদ অধ্যাপকের দক্ষিণ বঙ্গের কিছু জায়গা ঘোরার ইতিবৃত্ত নিয়ে কাহিনী। তিন যুগের তিন জন মানুষের জবানিতে এগিয়েছে উপন্যাস। বেশ কিছু মিথকে বিস্তারিত ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
#পাঠ_প্রতিক্রিয়া বইয়ের নাম: প্রাচীন মুদ্রা লেখক: মুহম্মদ আলমগীর তৈমুর প্রকাশক: অরণ্যমন মূল্য: ₹১৫০
মাত্র ১৬৬ পাতার বই, কিন্তু সে বইয়ের মধ্যে এত মালমশলা ভরা যে যথেষ্ট সময় নিয়ে পড়তে হলো। বইটিতে আছে ২টি রহস্য নভেলা। 'প্রাচীন মুদ্রা' ও 'অমলকান্তির চাকরি'। 'প্রাচীন মুদ্রা' লেখা হয়েছে ইতিহাসকে ভিত্তি করে। এবং 'অমলকান্তির চাকরি'র ভিত হল কালো জাদু। টানটান গল্পের সঙ্গে উপরি পাওনা হল যে ভিতের ওপর গল্প দাঁড়িয়ে আছে, তার সঙ্গে যুক্ত নানা লোককথা, উপকথার অবতারণা এবং পরিমিত মাত্রায় শব্দ খরচ করে গল্পগুলো বলা। এর বেশি কিছু বলা হলে গল্পদুটোর স্পয়লার দেওয়া হয়ে যাবে। সেটা দিতে চাইছি না। তবে 'অমলকান্তির চাকরি'তে কালো জাদু সম্পর্কে অনেক কিছু জানলাম, এবং সেই সঙ্গে আগ্রহ তৈরি হল 'হাকিনি' পড়ার। শুধু একটু বানান খেয়াল করলে ভালো হত। আর কিছু কিছু জায়গায় 'অমল' হয়ে গেছে 'কমল'। আশা রাখি পরবর্তী সংস্করণে এগুলো শুধরে যাবে।
লেখার বিষয়বস্তু অনেক ইন্টারেস্টিং ছিলো! আর লেখা পড়ে বুঝাই যাচ্ছে যে, লেখক অনেক রিসার্চ করেছে লেখার জন্যে! শুরুর দিকটা মোটামুটিরকম লাগলো, মাঝের ইতিহাস বিষয়ক পার্টটা অসাধারণ ছিলো! কিন্তু শেষের দিকটা? লেখক যাচ্ছেতাইভাবে শেষ করলো লেখাটা। লেখাটা পড়ার পর আমার মনে হচ্ছে, পরীক্ষার হলে আমরা কোন একটা প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় যেমন অনেকটা সময় নিয়ে যত্ন করে লিখি, কিন্তু সময়ের অভাবে শেষের দিকে কোনমতে লেখাটা শেষ করি, এই উপন্যাসিকাটাও ঠিক সেরকম। এজন্যেই কম নাম্বার দেওয়া হলো! :3
ব্রিলিয়ান্ট ,জাস্ট ব্রিলিয়ান্ট। শুধুমাত্র লেখনীর দ্বারা কিভাবে টিপিক্যাল কোন গল্পকে অত্যন্ত আকর্ষনীয় করা যায় তার অনেক বড় উদাহরণ। পুরো গল্পটাই অতিরিক্ত পরিমান ভালো লেগেছে।
একটা অতিপ্রাকৃত লিখা যখন হয়ে যায় অতিপ্রাকৃত থেকেও বেশী কিছু, বই হাতে নিয়ে যখন সময় ভুলে যেতে হয়, সেই বইকেই তো আমরা বলি অসাধারণ। জনরা দিয়ে পরিমাপ অযোগ্য এক মুগ্ধতার নাম- "প্রাচীন মুদ্রা"
বর্তমান সময়ের লেখকদের মধ্যে আলমগীর তৈমুর স্যার আমার প্রিয় লেখক। তার লেখা মানেই ভিন্ন স্বাদের এক উপভোগ্য পাঠ যাত্রা। এক ভিন্ন ধরনের শীতল আবহাওয়া তার কাহিনিতে বিরাজ করে। ইতিহাসকে কল্পনার সঙ্গে যেভাবে তিনি মেলাতে পারেন, তা নিঃসন্দেহে তাঁকে সমসাময়িক লেখকদের ভিড়ে আলাদা করে তোলে। এই বইটিও তার ব্যতিক্রম নয়। আমি যেই ধরনের জনরা, যেই ধরনের কাহিনি প্যাটার্ন পছন্দ করি স্যার যেন ঠিক তাই লেখে। তার গল্পের অন্যতম একটা বৈশিষ্ট্য হলো কাহিনির ভিতরে কাহিনি আবার তার ভিতরে কাহিনি। এবং সেইসব কাহিনির পটভূমি ছড়িয়ে থাকে, বিভিন্ন পুরাণ,কিংবদন্তি এবং বিস্তৃত ইতিহাসজূড়ে।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এক ভয়ংকর ও অভিশপ্ত প্রতীক জুডাস কয়েন। কাহিনি শুরু হয় একজন তরুণ ইতিহাসের গবেষকের হাত ধরে, যে ব্রিটিশ আমলের নীল কুঠি এবং নীলকরদের নিয়ে গবেষণা করছে। কাহিনির পথচলায় তার হাতে আসে এক পাকিস্তানি মেজরের ডায়েরি। সেই ডায়েরির পাতায় পাতায় খুলতে থাকে ইতিহাসের এক গোপন দরজা। ব্রিটিশ আমলের হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর এক প্রত্নতাত্ত্বিক ও তার এক বালুচ সঙ্গীর সাথে আমরাও যেন ঘুরে আসি প্রাচীন বালুচ সভ্যতার মেহেরগড়, গ্রিক-মিশরীয় জগৎ, রোমান সাম্রাজ্য,উপমহাদেশের কুশাণ সাম্রাজ্য হয়ে মক্কার ইসলামি যুগ। এই “গল্পের ভেতরে গল্প” কাঠামোই লেখকের স্বাক্ষরশৈলী, যা এই কাহিনিতেও স্পষ্ট।
খ্রিষ্টীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, জুডাস ইসকারিয়াত মাত্র ত্রিশটি রূপার মুদ্রার বিনিময়ে যিশু খ্রিস্টকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়েছিল। এই মুদ্রাগুলোকে সাধারণভাবে টাইর নগরীতে নির্মিত রোমান শেকেল হিসেবে ধরা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই মুদ্রা গুলো আগেই অনেক অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ছিলো। যিশুর রক্ত স্পর্শ করার পর এই কয়েনগুলো অভিশপ্ত হয়ে ওঠে, যা পরিচিত হয় ব্লাড কয়েন বা জুডাস কয়েন নামে। ধর্মীয় গ্রন্থ ও লোককথায় বলা হয়, এই মুদ্রাগুলো যার হাতেই গেছে, তাকে দিয়েছে সীমাহীন ক্ষমতা, প্রাচুর্য আর তার বিনিময়ে এনেছে মৃত্যু, নিষ্ঠুরতা ও ধ্বংস। উপন্যাসে এই ঐতিহাসিক-ধর্মীয় বিশ্বাসকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছে অতিপ্রাকৃত রহস্যের বিস্তৃত জাল।
এই বইয়ের যেই ব্যাপারটা সব থেকে বেশি ভালো লেগেছে, তা হলো : এর বিষয়বস্তু ও গবেষণালব্ধ পটভূমি। বিভিন্ন কিংবদন্তি, পৌরাণিক কাহিনি, কুরআনে বর্ণিত আদ-সামুদ জাতি, আল-উজ্জা দেবীর উপাসনা, প্রাক-ইসলামি আরবের ধর্মবিশ্বাস, বাইবেল ও কুরআনের রেফারেন্স সবকিছু মিলিয়ে লেখক এক বিস্ময়কর ইতিহাসের সাফারি করিয়েছেন পাঠককে। আমার মতো ইতিহাসপ্রেমী পাঠকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ পাঠ অভিজ্ঞতা।
তবে এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, তা হলো কাহিনির বর্ণনার আধিক্য আর বাক্যের ভেতর ব্যবহৃত কিছু অপ্রয়োজনীয় উপমা, যেগুলো না দিলেও চলতো। অনেক জায়গায় মনে হয়, গল্পের চেয়ে ইতিহাসই বেশি এগিয়ে যাচ্ছে। চরিত্রদের পারস্পরিক সংলাপ, আবেগ বা দৃশ্যায়ন তুলনামূলকভাবে কম। ফলে চরিত্রগুলো পুরোপুরি প্রাণ পায় নি সাথে কাহিনির গতিও কিছুটা যান্ত্রিক হয়ে পড়ে। বিশেষ করে উপন্যাসের শেষে এসে দ্রুত কাহিনির যবনিকা পতন হয়। এই দ্রুত নেমে আসাটা, খানিকটা অপূর্ণতার অনুভূতি রেখে গেছে। কী হলো জুডাস কয়েন গুলোর? আজিজ মাস্টারই বা কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যায়নি। এই কাহিনির একটি স্যিকুয়েল আনলে ভালো হয়।
এমন ঐতিহাসিক-ধর্মীয় মিথ এবং এমন সাহসী কল্পনা বাংলা সাহিত্যে খুব কমই দেখা যায়। যারা ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মীয় রহস্য ও অতিপ্রাকৃত গল্প ভালোবাসেন তাদের জন্য এই বই এক অনন্য পাঠযাত্রা হবে বলেই আমার বিশ্বাস। তবে যারা দ্রুতগতির, চরিত্রনির্ভর গল্প খোঁজেন, তাদের কাছে বইটি কিছুটা ভারী লাগতে পারে।
উক্তিঃ আমরা মনে যা ভাবি, মুখে তার এক কণাও প্রকাশ করি না। করলে এই দুনিয়া খতম হয়ে যাবে একদিনেই। হিপোক্রেসি ছাড়া পৃথিবী অচল।
মূলত গল্পটা হলো এইরকম—শরৎ সান্যাল নীলকর সাহেবদের উত্থান এর উপরে থিসিস লেখার জন্যে মেহেরপুর জেলার গাংনী থানার হাড়াভাঙ্গা গ্রামে হেডমাস্টারের বাড়িতে আসেন। হেডমাস্টারের বাড়িতে শরৎ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এই গ্রামে পোস্টিং হওয়া ১৯ বানুচ রেজিমেন্টের মেজর হুমাইদ আল-বালুশি-এর ডায়েরি খুঁজে পান। ডায়েড়ি পড়ে জানতে পারেন মেজর হুমাইদের হাড়াভাঙ্গা গ্রামে আসার পেছনে অন্য একটা উদ্দেশ্যও ছিল—জুডাস কয়েন।
যেই তিরিশটি রুপোর কয়েনের বিনিময়ে জুডাস ইসকারিয়াত যিশু খ্রিস্টকে রোমানদের হাতে তুলে দিয়েছিল, সেইগুলোকেই জুডাস কয়েন বলা হয়। জুডাসকে এই মুদ্রাগুলো দিয়েছিল ইহুদিদের ধর্মগুরু কায়াফাস। যিশু খ্রিস্টকে ধরিয়ে দেবার পরে সেই রুপোর কয়েনগুলো লাল রঙ ধারণ করে, এবং নাম হয়ে যায় ব্লাড কয়েন। ধারনা করা হয়ে থাকে এই মুদ্রাগুলো অভিশপ্ত ও বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী।
এখন আসা যাক উপন্যাসিকাটা পড়ে কেমন লাগল সেই কথায়। অসাধারণ ও আকর্ষনীয় প্লট ও লেখকের ঝরঝরে লেখনশৈলী সাথে যুক্ত হয়েছে জঘন্য এন্ডিং। লেখক যেভাবে শেষ করেছেন তাতে আমার কাছে মনে হয়েছে এত সুন্দর ও সম্ভাবনাময় প্লটার প্রতি চরম অন্যায় করা হয়েছে।
‘প্রাচীন মুদ্রা’ আমার পড়া মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের দ্বিতীয় উপন্যাসিকা। প্রথমটা ছিল ‘কালো জাদু’। দুটো উপন্যাসিকা পড়ে যা বুঝতে পারলাম তা হলো, ইতিহাস, মিথ ও অতিপ্রাকৃতিক বিষয়গুলোকে লেখক দারুণভাবে ব্লেড করতে সক্ষম। কিন্তু সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এইসব বিষয়গুলোকে নিয়ে উপন্যাসিকা লেখা। লেখকের উচিত উপন্যাসিকা না লিখে ৫০০/৭০০ পৃষ্ঠার উপন্যাস লেখা। যেখানে সময় নিয়ে প্রতিটা চরিত্রকে ভালো করে ফুটিয়ে তোলা হবে। আর এন্ডিংটাও এতটা আচমকা না করে, ধীরে-সুস্তে করা হবে। এই উপন্যাসিকাগুলো লেখার জন্যে লেখক যে ভালো রকমের রিসার্চ করেছেন তা পড়লেই বোঝা যায়। শুধুমাত্র তাড়াহুড়ো করে শেষ করার কারণে বাংলা ভাষায় জেমস রলিন্সের সিগমা সিরিজ কিংবা ড্যান ব্রাউনের লবার্ট ল্যাংডন সিরিজগুলোর মত দুর্দান্ত উপন্যাসের স্বাদ থেকে পাঠকরা বঞ্চিত হয়েছে। যেটা সত্যি দুঃখজনক।
প্রাচীন মুদ্রা গল্পের নাম শুনে মনে হচ্ছিল কি গল্প ভালো হবে না নিশ্চয়ই। তারপর পড়তে শুরু করার পর প্রথম দিকটা ভালোই লাগতে শুরু করলো।আবার মাঝখানটা কেমন বিরক্তিকর লাগছিলো।আমি লেখকের অন্য লেখাও পড়েছি, সেই তুলনায় এটা তেমন ভালো লাগলো না। মূল চরিত্রের মুখে দুএকটি গান বা কবিতার লাইন দেওয়া হয়েছে,যেটা না দিলেও ক্ষতি হত না। ভেবে চিন্তে ২ স্টার দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। যদিও শেষটা একটু অন্যরকম ও ইন্টারেস্টিং আশা করেছিলাম।
ইতিহাস ভিত্তিক গল্প। গল্পের মূল চরিত্রে আছে শরৎ সান্যাল নামক এক ব্যক্তি, যিনি ইতিহাসে এম.ফিল করছেন।থিসিস লেখার সূত্রে তাকে হাড়াভাঙা নামক স্থানে যেতে হয়। সেখানে যাওয়ার পর ঘটনাচক্রে তার হাতে আসে Major Humaid Al Balushi এর ডায়েরি। এর মাধ্যমে তার কাছে অনেক তথ্যর খোলাসা হয় এবং খুঁজে বার করেন "জুডাস কয়েন"।এর আর এক নাম ব্লাড কয়েন।ধরে নেওয়া হয় যীশু খ্রিস্টের রক্ত লেগে আছে এতে। এর কিছু বিশেষ ক্ষমতাও ছিল, এবং তা অভিশপ্তও বটে।
অসাধারণ! অতিপ্রাকৃত উপন্যাসিকা প্রাচীন মুদ্রার কাহিনীটা ইউনিক ও বেশ আকর্ষণীয় লেগেছে আমার কাছে। ইতিহাস , মিথ , অতিপ্রাকৃতিক আবহ সব কিছু কত দারুনভাবে ব্লেন্ড করেছেন লেখক। এই সল্প পরিসরের লেখা লিখতেও লেখক বেশ ভালো রিসার্চ করেছেন তা উপন্যাসিকাটি পড়লেই বোঝা যায়। প্রাচীন মুদ্রা দিয়েই মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের লেখার সাথে পরিচিত হলাম। লেখনী এক কথায় দুর্দান্ত লেগেছে। আকর্ষণীয় প্লটটিকে উনার লেখনী দ্বিগুণ আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করে তুলেছে। কিন্তু এন্ডিংটা সত্যি বলতে খুব একটা ভালো লাগলো না। রহস্য পত্রিকাতে যে বেশ কাটছাঁট করে ছাপানো হয়েছে লেখাটা তা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ হওয়া সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায়। পরিবর্ধিত লেখাটা না পড়ে সেটা পড়লে আরও বেশি উপভোগ্য হতো এবং এন্ডিংটাও ভালো লাগতো বলেই ধারণা করছি। তবে এই উপন্যাসিকাটি পড়ে যা বুঝলাম তা হলো খুব শীঘ্রই মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের অতিপ্রাকৃতিক গল্প সংকলন কুহক কথন পড়ে ফেলতে হবে।
এই লেখকের প্রথম পড়া বই। সাবলীল লেখা। খুব ভাল লাগল। বিষয়টা ব্যাপক ইন্টারেস্টিং। শুরুতেই লেখার সাবলীলতা বইটির শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেল। গল্পের নায়কের নাম শরৎ স্যানাল। খুবই রেয়ার একটা হিন্দু টাইটেল বাংলাদেশের জন্য। গল্পের নায়ক নীলকুঠীর ব্যাপারে থিসিস পেপারের জন্য কুষ্টিয়ার এক গ্রামে যায়। সেইখানে এক পুরানো ট্রাংকের মধ্যে খোজ পায় এক পাকিস্তানি মিলিটারির ডায়রি। সেই ডাইরিতে লেখা জুডাস কয়েনের ব্যাপারে বিস্তারিত জানতে পারে শরৎ। জুডাস কয়েন যীশুকে ধরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে পাওয়া কয়েন যেটি অভিশপ্ত। বাকিটা বইয়ের পাতায় জেনে নেবেন। আগেই বলেছি লেখকের লেখা খুব ভাল এবং সাবলীল। কিন্তু কাহিনী এত সুন্দর করে জমিয়ে সেটা এভাবে শেষ করাটা মোটেও ঠিক হয়নি।
মুহম্মদ আলমগীর তৈমূরের লেখা এই প্রথম পড়লাম। লেখার হাত দারুন, কনসেপ্টটাও চমৎকার। কিন্তু খুব বেশি তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে। ঘটনার ক্রমও লেখার হাত বা কনসেপ্টের মানের ধারে কাছে নয়। লেখক যে প্রচুর রিসার্চও করেছেন তাতে সন্দেহ নেই। তিনি যে রিসার্চ করেছেন তাতে এই কনসেপ্ট নিয়ে বিশাল আকারের বই লেখা সম্ভব ছিল। কিন্তু উপন্যাসিকার ছোট পরিসরে আটকে রাখতে গিয়ে অনবদ্য, দুর্দান্ত কিছু হওয়ার সম্ভাবনার অপমৃত্যু হয়েছে। তবে লেখকের অনান্য বইও পড়ার আগ্রহ হচ্ছে, পড়তে হবে।