"আমি রাজপুত্তুর নই, তাই আমার ডানা-অলা পক্ষীরাজ নেই। পক্ষীরাজ নেই, কিন্তু আছে ঘুরে বেড়ানোর শখ। ধুলোওড়া পথ, ছায়ামাখা পথ, লোক গিজগিজ পথ, সুনসান পথ- সব রকম পথে ঘুরে বেড়াতে ভালো লাগে আমার। ভালো লাগে পথে যেতে যেতে চেয়ে চেয়ে দেখতে জিনিস, খুঁটিনাটি অনেক কিছু। এই ধরো, গাছ-গাছালি, পাখ-পাখালি, নোড়ানুড়ি, কাঠটুকরো, কত্ত কিছু দেখি চোখ মেলে।"
কিংবা
"শহরের নাম ঢাকা। এ শহরের একটা সরু গলিতে যখন আমি প্রথম চোখ খুলেছিলাম তখন ঢাকা ছিল কেমন ফাঁকা ফাঁকা। এত দর দালান ছিল না, বাস ছিল না, মোটর ছিল না, এমন কি রিক্সাও ছিল না, রাস্তায় ছিল না সারি সারি পিঁপড়ের মত মানুষের ভীড়।"
স্মৃতির শহরের শুরুটা এভাবেই করেছেন তিনি। সেই চল্লিশের দশকের আগের ঢাকা যে আদতে একটি গ্রাম ছিল তার সুনিপুন কাব্যিক বর্ণনায় ঠাসা এই বই। বইটি পড়ার সময় মনে হচ্ছিল, হুমায়ুন আজাদের "ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা" বইটির কথা। কৈশোর মনের দৃষ্টিতে হুমায়ূন আজাদ যেভাবে গ্রামের রঙিন বর্ণনা এঁকেছেন তাঁর বইটিতে, শামসুর রাহমানও যেন ছাপার অক্ষরে ফুটে তুলেছেন অদেখা এক ঢাকা শহরকে।
ব্যাঙ্গমা- ব্যাঙ্গমী থেকে শুরু করে, ঢাকার পুরানো বাড়ি, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, হারিয়ে যাওয়া বিভিন্ন পেশাজীবি মানুষ, শিল্প- সাহিত্য সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে ছোট্ট এই বইটিতে। স্থান পেয়েছে ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ, ভাষা আন্দোলনের মত ঐতিহাসিক ঘটনাও।
শৈশব থেকেই ঢাকার অলিতে গলিতে ঘুরে ঘুরে স্মৃতির মানসপটে আঁকা চিত্রই জীবন্ত হয়ে উঠেছে স্মৃতির শহর বইটিতে। সেই সাথে স্থান পেয়েছে রফিকুন নবীর সাবলীল সব চিত্রকর্ম।
বইয়ের ভূমিকাতেই বলা আছে, শামসুর রাহমানের মন ও মানস গঠিত হয়েছে ঢাকা শহরে, যে শহর দীপ্তি হারিয়েছে বহু আগেই। সেই দীপ্তিকে ধরে রেখেছেন তিনি অনেক কবিতায়, এবং স্মৃতির শহরের অনুপম গদ্যে।
ঢাকা নিয়ে আমার আগ্রহ অনেকদিনের। সেই সুবাদেই অনেকদিন থেকেই কবি শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহর বইটি খুঁজছিলাম। বইটির কোন প্রিন্ট পাইনি সবশেষ সত্ত্বাধিকারী প্রথমার কাছে।
পুরানো বইয়ের দোকান, লাইব্রেরী কোথাও যেন খুঁজে পাচ্ছিলাম না শামসুর রাহমানের স্মৃতির শহরকে। কিন্তু আজ আচমকা যেন অনেকটাই উড়ে এল আমার হাতে। হাতে পেয়েই গপাগপ পড়ে ফেলা। এই ধরণের বই পড়লে আমার টাইম মেশিনে করে খুব খুব খুব বেশি ফিরে যেতে ইচ্ছে করে কত শত বছরের পুরানো সেই স্মৃতির শহরে।