মাধববাবুর পিতৃ-পিতামহের বিরাট সম্পত্তি সরস্বতী নদীর ভাঙ্গনে ভেসে যায়। এখন সেখানে গজিয়ে উঠেছে গভীর জঙ্গল, দিনের বেলাতেও কেউ যেতে সাহস পায় না। এই বনবাদাড়ের ভেতরে সেই পুরোনো বাড়িটা ঠিক কোথায়, সেই হদিস পাওয়া আর মোটেও সহজ নয়। ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রিত মাধববাবু প্রায়শই সেই সম্পত্তির কথা ভেবে আফসোস করেন। মানুষ হিসেবে তিনি মন্দ নন, কিন্তু দোষের মধ্যে রগচটা, আর রাগ করলেই দিগ্বিদিক ভুলে যান। এমনই এক সকালে সবার ওপর রাগ করে মাধববাবু বাড়ি ছাড়লেন আর ঘটালেন একটার পর একটা অঘটন।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
মানসিকভাবে বেশ খারাপ একটা সিচুয়েশনের মধ্যে দিয়েই যাচ্ছি। আর এই অবস্থায় আমার জন্যে ব্রিদিং স্পেসের মতন কাজ করছে বইগুলো। যাকে বলে একেবারে ফুলটুস বিনোদন। পুরোটা উপন্যাস জুড়ে আমার মুখে হাসি আঠার মত লেগে ছিল। কয়েকটা দৃশ্য বারবার পড়েছি। ঘটোৎকচ নামের এই বানরটা আমার অন্যতম প্রিয় একটা চরিত্র হয়ে গেল৷ ধন্যবাদ শীর্ষেন্দু মশাই, এরকম দুঃসময়ে হাসির খোরাক জোগানোর জন্যে৷
অনেক অনেক ভাল লাগালাে বইটা পড়ে। মাঝেমাঝে হাসিতে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতাে। মাধববাবু চরিত্রটা দারুন হয়েছে। তাঁর বাপ-দাদার আমলের জমিদারের স্বভাব এখনাে আছে। রাগের চোটে তাঁর দাদা গাছে উঠে বসে থাকতাে। তাঁর বাবার ও ছিল প্রচন্ড রাগ। মাধবরের ঘটোৎকচের লেজ ছেড়ে, বাঘের লেজ ধরে হেতমগড়েরর বনের মধ্যে দিয়ে যাওয়া - দারুন। বাদরের নাম ঘটোৎকচ। যা দেখালাে ফু টবলের মাঠে। নন্দকিশাের ভুতের খেলা। শেষ পর্যন্ত মাধব তাঁর বানে ভেসে যাওয়া পুরােনাে জমিদার বাড়ি খুঁজে পায়। কথা দিচ্ছি এক সেকেন্ডের জন্যেও বোর হবেন না।
মানুষ বেড়াল পোষে,টিয়া পোষে, অনেকে মানুষ ও পোষেন। কিন্তু আমার এসবে কোন নজর কস্মিনকালে ছিল না। আমার ছোট থেকে ইচ্ছে একটা বানর পুষবো। একটা কিউট বানর,নাদুস নাদুস।
"হেতমগড়ের গুপ্তধন" পড়ে, আমার বানর পোষার ইচ্ছে টা আবার চাগার দিলো। আমার যদি একটা বানর থাকতো,ঘটোৎকচের মতো। আহারে...
এই বইটি স্রেফ একটি ভূতুড়ে উপাখ্যান নয়, এটি আসলে এক আত্মবিকাশের রম্য আত্মপ্রকাশ, যেখানে এক ব্যর্থ জমিদার-উত্তরাধিকারীর ‘অ্যাটেনশন-সিকিং’ মানসিকতা ধীরে ধীরে বিবর্তিত হয় মানবিক বোধে। এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় আশ্চর্য এর আখ্যানরীতি—যা একযোগে মনস্তাত্ত্বিক, কৌতুকপূর্ণ, অতিপ্রাকৃত ও দার্শনিক।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র মাধব চৌধুরী—এক বত্রিশ বছরের অস্থির, আত্মসচেতন অথচ অন্তঃসারশূন্য অপদার্থ মানুষ। বন্যায় জমিদারি ভেসে গেছে, জীবনের অর্থও তেমনই তথৈবচ। পরজীবী এক অস্তিত্বে ভগ্নীপতির বাড়িতে কাটানো তার দিনগুলি এক প্রকার মানসিক স্থবিরতা। এই ভগ্নিপতির আশ্রিত জীবন যেন গার্সিয়া মার্কেসের *No One Writes to the Colonel*-এর নিঃস্ব বৃদ্ধ কর্নেলের মতো—যার গর্ব বেঁচে থাকে স্মৃতির মতোই অচল ও বেদনাবহ বিতংসে।
তারপর আসে ভাগ্যের মোচড়—দাঁত হারানো, বাঁদরের ওপর অকারণ রাগ, জেলে যাওয়া, আর সেখান থেকে পলায়ন। আর এখানেই শীর্ষেন্দুর অতিপ্রাকৃততা প্রবেশ করে—যে ভূত, নন্দকিশোর মুনসি, কেবল গল্পের নাটকীয় উপাদান নয়, বরং এক মনোবিশ্লেষক আত্মা। যেমন দস্তয়েভস্কির *The Double*-এ গলিয়াদকিনের নিজের ছায়া তার মানসিক বিভ্রমের প্রতীক, তেমনি নন্দকিশোরও মাধববাবুর মানসিক অন্তরায়গুলির এক মূর্ত রূপ। ভূত এখানে “অদ্ভুতুড়ে” হলেও তার ভূমিকা almost ফ্রয়েডীয়: সে মাধবের রাগ, হীনমন্যতা, এবং আত্মগ্লানির গোপন ভাঁজ খুলে দেয়।
শীর্ষেন্দু তাঁর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এই তৃতীয় খণ্ডে ভূতের চেনা ধারণাকে ওলটপালট করে দিয়েছেন। শীর্ষেন্দুর নন্দকিশোর রামনামে ভয় পায় না, বরং হাসে—“রামের মতো ভালমানুষকে আমরা ভয় পাব কেন?”—এই সংলাপে বাংলা ভূতের ঐতিহ্য (যেখানে রামনাম ভূত তাড়ায়) একেবারে ৩৬০ ডিগ্রি উল্টে যায়। এখানে ভূত হল এক ধরণের আত্মদর্শনের হাতিয়ার, এক হিউম্যানিস্ট স্পিরিট। একে একে সে মাধবকে শেখায় রাগ নিয়ন্ত্রণ, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ, দুঃখ স্বীকার—মানুষ হওয়ার ক্রমশিক্ষা। যেন গোঁফওয়ালা কোনো Freud বা Jung বাংলার বৃষ্টিভেজা প্রান্তরে আত্মার ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
এই রূপান্তর কেবল ব্যক্তিগত নয়, সামাজিকও। শীর্ষেন্দু অদ্ভুতুড়ে ধারায় লোককথা, সমাজমনোবিজ্ঞান ও গ্রামীণ কৌতুককে এমনভাবে জুড়ে দেন যে গল্পের হাস্যরস হয়ে ওঠে নিরাময়ের উপায়। এক অর্থে *হেতমগড়ের গুপ্তধন* হল এক postcolonial “comic catharsis”—যেখানে ভূত মানে আতঙ্ক নয়, বরং আত্মশুদ্ধির সঙ্গী।
মাধববাবুর রাগের বংশগত ব্যাধি—ঠাকুরদা নিজের চুল ছিঁড়তেন, বাবা নারকোল গাছে উঠে বসতেন—এই পারিবারিক ইতিহাসকে লেখক যে হাসির মোড়কে মুড়ে দেন, তা রীতিমতো আঞ্চলিক কৌতুকের মনস্তাত্ত্বিক সংস্করণ। ঠিক যেমন নিকোলাই গোগোলের *The Government Inspector*–এ রাশিয়ার প্রশাসনিক উন্মাদনা হাসির ভিতর দিয়ে প্রকাশিত হয়, তেমনি শীর্ষেন্দুর গল্পেও মানসিক বিকৃতি এক সামাজিক ব্যাধি হয়ে ওঠে। তবে শীর্ষেন্দুর আখ্যানে আছে মধুর ব্যঙ্গ ও আত্মসমালোচনা।
এই গল্পে ‘গুপ্তধন’ কেবল স্বর্ণমুদ্রা নয়—এ হল মানবতার হারানো পুঁজির প্রতীক। ভূতের সহায়তায় মাধব পুনরুদ্ধার করে নিজের আস্থা, প্রেম, ও দায়বদ্ধতা। সেই অর্থে এটি এক বাংলা 'A Christmas Carol' বলা চলে, যেখানে নন্দকিশোর মুনসি হলেন এক প্রেতাত্মা-থেরাপিস্ট। শীর্ষেন্দুর কলম বাঙালি স্ক্রুজকে মানুষ বানিয়ে তোলেন। চার্লস ডিকেন্সের সেই ‘moral rebirth’-এর ঐতিহ্যই শীর্ষেন্দুর হাতে পায় গ্রামীণ রসিকতার রূপ।
শীর্ষেন্দুর ভাষা নিপুণ, সংলাপ সজীব ও প্রাকৃতিক। তিনি জানেন, কৌতুক কেবল হাস্যরসের উদ্রেক করেন, তা চিকিৎসাও করে। “স্যরি” ও “থ্যাংক ইউ”—এই দুই সহজ শব্দ শেখানোই যেন তাঁর আত্মসংশোধনের নাটকের চূড়ান্ত দৃশ্য। এই উপলব্ধিতে উপন্যাসটি প্রায় উপকথার মতোই মিষ্টি, কিন্তু এর ভেতরে লুকিয়ে আছে একটি সম্পূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক আঙ্গিক —আত্ম-অস্বীকারের অন্ধকারে থেকেও মানুষ নিজের আলো খুঁজে নিতে পারে।
বিশ্বসাহিত্যে এর তুলনীয় উদাহরণ পাওয়া যায় নানা রূপে—ইতালীয় ঔপন্যাসিক আলেসান্দ্রো মানজোনির 'The Betrothed'-এর নৈতিক পুনর্জন্ম, কাফকার 'The Metamorphosis'-এর অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধি, কিংবা জাপানি লেখক আবে কোবোর 'The Box Man'-এর আত্মপরিচয় অনুসন্ধান। কিন্তু 'হেতমগড়ের গুপ্তধন' এগুলির চাইতে কিছুটা হলেও স্বতন্ত্র, এই কারণে যে, এই প্লটে পরিত্রাণ আসে ভয় বা ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে নয়, আসে হাসির মধ্যে দিয়ে—যেমন সত্যজিৎ রায়ের 'গুপী গাইন বাঘা বাইন' কিংবা ঋত্বিক ঘটকের 'অযান্ত্রিক'–এ মানবতার শেষ আলো ফুটে ওঠে এক অন্তর্লোকের উষ্ণতায়।
শীর্ষেন্দু এখানে সাহিত্যের মনোরঞ্জনমূলক ভূতকে ব্যবহার করেছেন আত্মজিজ্ঞাসার আয়নায়। ভূত কেবল ‘অদ্ভুত’ নয়, সে 'অদ্ভুতভাবে মানবিক'। সেই মানবিকতার হাত ধরেই মাধব চৌধুরীর নতুন জন্ম, আর হেতমগড়ের নতুন নির্মাণ।
এই গল্পে শেষের পুনর্গঠন—বউকে ফিরিয়ে আনা, স্কুল খোলা, সমাজসেবা—সবই এক প্রতীকী পুনরুত্থান। যেন ভগ্ন এক প্রাচীন বাংলার পুনরুদ্ধার, যেখানে আত্মসমালোচনার মধ্যে দিয়েই জাতি আবার দাঁড়ায়।
সমগ্রে, 'হেতমগড়ের গুপ্তধন' এমন এক গল্প, যা পড়লে মনে হয় বাঙালি কৌতুক আসলে এক মনোচিকিৎসার ভাষা। হাসির ছদ্মবেশে যে আত্মার পরিশুদ্ধি ঘটে, তা এই উপন্যাসে যেমন সুকৌশলে ধরা পড়েছে, বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এহেন দক্ষ প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়।
নন্দকিশোর মুনসি হয়তো এক কাল্পনিক ভূত, কিন্তু তাঁর সংলাপগুলো আজও পাঠকের অন্তরশ��রায় বাজে— “রাগের ঝালগুঁড়োগুলো ঝেঁটিয়ে বিদেয় করো... মানুষ হও।” এই এক বাক্যেই ‘হেতমগড়ের গুপ্তধন’ হয়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের এক আধুনিক নীতিকাব্য—যেখানে ভূত আর অতিপ্রাকৃততা কেবল ভয় নয়, বরং মানবতার নিঃশব্দ থেরাপিস্ট, বিবেকের আয়না, আর জীবনের লুকোনো করুণ সুরের অনুবাদক।
আমার বই পড়া তেমন না হওয়ার মতো এই সময়ে আমি চাচ্ছিলাম একটু হালকা ধাঁচের কোনো বই পড়তে। তো হাতে নিলাম শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজের এই বইটি। তারপর আর কি, এই সিরিজের বই পড়লে যেমনটা হয়েছে আগে তেমনই হলো — বেশ হাসলাম পড়তে পড়তে এবং উপভোগ করলাম।
এক জমিদার ধরণের মানুষের রাগের ছুটে ঘর থেকে চলে যাওয়া, উনার বন্ধুক নিয়ে খেলার মাঠে ডুকে পড়ার কারণে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়া, তারপর জেল-এ গিয়ে পরিচিত এক চুরের সাথে দেখা হওয়া(এই চুর আগে তাদের ঘরে মালী ছিলো, কিন্তু তার স্বভাব ছিলো চুরির। চুরি না করলে তার অসুখ হতো, খাবার হজম হতো না, পাগল পাগল হয়ে যেতো), জঙ্গলে একটা adventure হওয়া, একটা ভালো-মানুষী টাইপ ভূতের সাথে পরিচয়, ইত্যাদি সব অদ্ভুতুড়ে কর্মকাণ্ড নিয়ে ভরা ছিল বইট। তাছাড়া এমন সব কথাবার্তা, আর চরিত্রগুলোর অদ্ভুত সব চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য আপনাকে হাসতে বাধ্য করবেই (হা-হা করে না হাসলেও মনের ভেতর ঠিকই হাসবেন আপনি 👀)
শীর্ষেন্দুর এই সিরিজে আগে যেমন রসবোধের পরিচয় পেয়েছি, এই বইয়েও সেটার কমতি ছিল না। তবে বইটার শেষাংশ আমার ভালো লাগে নি, অর্থাৎ কেমন জানি হুটহাট শেষ হয়ে গেলো, যেমনকি ঝড়ের গতিতে শেষ করে দিলো। তবে শেষটা আরো সুন্দর করে টানতে পারতেন এতো তাড়াহুড়ো না করে। এবং আমার কাছে এই শেষাংশের কারণে রেটিং কমবে
দারুণ ইনজয়েবল গল্প। সাথে হাঁসির কড়া ডোজ। হনুমান, বাঘ, চোর, চোরের গুরু, পুলিশ, ভূত আর সাথে একবোকা, মাথাগরম, ফোকলা, জমিদারি লাটে ওঠা এক জমিদার! সব মিলিয়ে অতি চমৎকার! গল্প হিট হতে যা লাগে তা সবই আছে। নাম শুনে ট্রেজার হান্ট অ্যাডভেঞ্চারের বই মনে হলেও সেটা মূল বিষয় নয়। এক বানে হেতমগড় ভেসে জাওয়ায় মাধবদের জমিদারি আর নেই। মাধব এমনিতে বুদ্ধুগোছের তবে বংশের ধারায় বদরাগী। বয়স বত্রিশ -টত্রিশ হবে তবে ফোকলা। বিয়ের সময় শালীর সুপুর ভেতরে রেখে নারকেল নাড়ু এনেছিল। নতুন জামায় মাধব বুঝলেও হেরে গেলে তো হবে না তাই কড়মড় করে খেল। সেই খেয়েই তার দাঁত গেল কিছু ভাঙল আর কিছু নড়ে গেল। সেই থেকে শ্বশুরবাড়ি রেখে শালার বাড়িতে গ্যাঁট হলো। একদিন পোষা হনুমান ঘটোৎকচ তার বাঁধানো দাঁত নিয়ে পালানোয় রাগে গৃহত্যাগ করল। এরপর থেকে মূল কাহিনী। প্রচুর আনন্দ পেয়েছি মাধব, ঘটোৎকচ আর সাথে ভূত নন্দকিশোরের কাণ্ডকারখানা খুব ভজা পেয়েছি।
প্রথমদিকে তেমন ভালো না লাগলেও শেষে ঠিকই মজা পেলাম😂 যদিও ঘটোৎকচ প্রথমে যেমন মূল ভূমিকায় ছিল,শেষে কেমন যেন প্রচ্ছন্ন হয়ে গেল। নন্দকিশোর আর মাধবের কথোপকথনগুলো আমার বেশ ভালো লেগেছিল। হাসলাম অনেক,ভালোই ছিল গল্পটা আর খুবই অদ্ভুতুড়ে 😅
অদ্ভুতুড়ে সিরিজ পড়তে পড়তে একটা উপলব্ধি হলো - ফেলুদা ঋজুদার যেমন প্রথমগুলো ভালো, তারপর বাকিগুলো প্রোগ্রেসিভলি খারাপ, অদ্ভুতুড়ে কিন্তু ঠিক সেরকম নয়। একদম প্রথমগুলো: ধরে নিন মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি, বা এই বইটা, হেতমগড়ের গুপ��তধন - এগুলো ভালো, কিন্তু সাংঘাতিক অসাধারণ কিছু নয়। রতনতটন তো নয়-ই , গোলমেলে লোক বা মোহন রায়ের বাঁশি'র লেভেল'ও নয় (তবে সেগুলো'ও অতি উমদা জিনিস)। আসলে অদ্ভুতুড়ে সিরিজের সবগুলোই ফরমায়েশী লেখা তো - ছকটাকে ক্রমশঃ উন্নত করে গেছেন লেখক - আর তারপরে সেই ছকের মধ্যে যে প্লট যেরকম পড়ে আর কী ।
হেতমগড়ের গুপ্তধন গল্পটা পুরোটাই ভুলে গেছিলাম - রগচটা মাধব চৌধুরীর জেলগমন, জেলপলায়ন , ঘটোৎকচ-নামক হনুমানের সঙ্গে জঙ্গল ভ্রমণ। চিতাবাঘের ল্যাজ, আর নন্দকিশোর মুন্সীর ভূতের সঙ্গে আলাপ। আর গুপ্তধন।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বই মানেই এক অন্য রকম আনন্দ। চেনা জগৎ এর বাইরে এক মজার পৃথিবীতে যেন ভ্রমণ করিয়ে আনে এই কাহিনিগুলো। বইগুলো পড়ার সময় এর অদ্ভুত সব চরিত্র আর তাদের কিম্ভূত সব কাণ্ডকারখানা যেন সারাক্ষণ এক প্রফুল্লের জোয়ারে মাতোয়ারা করে রাখে পাঠকদের।
হেতমগড়ের গুপ্তধন পড়েছিলাম অনেক দিন আগে কলেজে থাকতে। তখন পড়ার পর এর কোন পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখা হইনি। তারপর অনেক দিন পর সেদিন সানডে সাসপেন্সে এই গল্পটি আবার শুনলাম, বেশ একটা রিভিশন মত হয়ে গেলো,তাই চিন্তা করলাম এখন তাহলে একটা ছোট রিভিউ লিখে ফেলি। বইটি প্রথমবার পড়ার সময় যেই আনন্দ পেয়েছিলাম, দ্বিতীয় বার শ্রোতা হিসাবে শুনে আনন্দ একটুও কমেনি, বরং রেডিও এডাপটেশনের আবহ সংগীত আনন্দের মাত্রা আরো কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছিল।
মাধববাবুরা ছিলো হেতমগড়ের জমিদার। কিন্তু সরস্বতী নদীর ভাঙ্গনের ফলে তার পিতৃ-পিতামহের আমলের সেই জমিদারি সব ভেসে যায়। বর্তমানে তাদের অবশিষ্ট সম্পত্তির একটা অংশে গজিয়ে উঠেছে গভীর জঙ্গল, দিনের বেলাতেও কেউ যেতে সাহস পায় না ঐ গহিন জঙ্গলে। এই বনবাদাড়ের ভেতরে সেই পুরোনো বাড়িটা ঠিক কোথায়, সেই হদিস পাওয়া আর মোটেও সহজ নয়। ভগ্নিপতির বাড়িতে আশ্রিত মাধববাবু প্রায়শই সেই সম্পত্তির কথা ভেবে আফসোস করেন। মানুষ হিসেবে তিনি মন্দ নন, কিন্তু দোষের মধ্যে রগচটা, আর রাগ করলেই দিগ্বিদিক ভুলে যান। বিয়ের দিন তার শালিরা মজা করে তাকে সুপড়ি খাইয়েছিল বলে তার দাঁত ভেঙে যায়, তারপর থেকে তার কথাও একটু অস্পষ্ট, কৃত্রিম দাঁত পড়ে থাকেন। একদিন সকালে সবার ওপর রাগ করে মাধববাবু বাড়ি ছাড়লেন আর এখান থেকেই এই বইয়ের কাহিনি শুরু। তারপর তিনি ঘটালেন একটার পর একটা অঘটন। বাঁদরের বাঁদরামি,চোরেদের নানান কৌশল, ভূতুড়ে কাণ্ড, হিংস্র চিতা বাঘের বশ্যতা, জঙ্গলে অভিযান আর সবশেষে গুপ্তধন। গ্রাম্য আবহে এ এক দারুণ এডেভেঞ্চার কাহিনি।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের জাদুকরী লেখনীর একটা সেরা উদাহরণ এই বইটি। অদ্ভুতুড়ে সিরিজের বই গুলোর মধ্যে এই বইটি আমার অন্যতম প্রিয়। শেষ দিকের গুপ্তধন উদ্ধারের যে বর্ণনা আছে, তার সাথে মিল রেখেই এই বইয়ের প্রচ্ছদ আঁকা হয়েছে। এই প্রচ্ছদটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। মূলত এই কভার ডিজাইনটি দেখেই এই বইটির প্রতি আমার প্রথম আগ্রহ জন্মে। কিশোর পাঠ্য বই হলেও সাহিত্যপ্রেমী যে কারোরই এই বইটি ভালো লাগবে।
ঘুম থেকে উঠে নিজের বাঁধানো দাত, চটি জোড়া আর গামছা খুঁজে না পেয়ে মাধব চৌধুরী খুব রেগে গেলেন। এক কথায় দুকথায় রাগ বেরে গেলে তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তিনি তার ভগ্নিপতির বাড়িতে থাকেন। নিজেরদের একসময় জমিদারি ছিল। ১৫০ বিঘা জমিতে তাদের প্রকান্ড বাড়ি ছিল। কিন্তু নদী ভাঙ্গনে আজ সব গেছে। ছোটবেলায় শুনেছিলেন তাদের বাড়িতে গুপ্তধন লুকানো আছে। রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি তাদের পুরনো ভাঙ্গা বাড়ির খোঁজ করেন।
বিয়ের রাতে তার শালিরা তাকে সুপাড়ি ভর্তি নারু খেতে দিয়েছিল। তাই খেতে গিয়ে দাতগুলা ভাঙ্গেন। তারপরদিন সেই যে শশুড়বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন, আর ওমুখো হননি। রাগের মাথায় বোনের বাড়ি থেকে বেরিয়ে হেতমগর চলে গেলেন নিজেরদের ভাঙ্গা বাড়ি খুঁজতে। বিশেষ এক ঘটনায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে গেল। থানায় তাদের পুরনো চাকর বনমালীর সাথে দেখা হল। বনমালী তার তিন স্যাঙাত সহ হাজতে বন্দি ছিল।
ঘটনাক্রমে বাড়ির পোষা বানর ঘটোৎকচ বুদ্ধি করে তাদের সবাইকে ছাড়িয়ে দেয়। সেখান থেকে পালিয়ে তারা ঢুকে হেতমগড়ের জঙ্গলে। ঘটোৎকচ, একটা চিতাবাঘ এবং নন্দিকিশোরের ভূতের সাহায্যে মাধব চৌধুরী নিজেদের ভাঙ্গা বাড়ি খুঁজে পান।
কিভাবে খুঁজে পেলেন সেটা নাহয় বইটি পড়েই জানবেন। কথা দিচ্ছি এক সেকেন্ডের জন্যেও বোর হবেন না। পুরো বইটা এক নিশ্বাসে পড়ে শেষ করেছি। বানর ঘটোৎকচ আর নন্দিকিশোরের ভূতের কাণ্ডকারখানা খুব মজার। সবমিলিয়ে চমৎকার একটা বই। আসলে প্রথম দিকের অদ্ভুতুড়ে গুলা দারুণ মজার।
জমিদারী এখন আর না থাকলেও স্বভাবটা ষোল আনা আছে মাধববাবুর। রাগ তাদের বংশগত রোগ। তার পিতামহ রাগলে গাছে উঠে বসে থাকতেন, প্রপিতামহ নিজের নিজের চুল নিজে ছিড়তেন, বাবাও ছিলেন ভীষণ রাগি। মাধববাবুও ব্যতিক্রম নন। বিয়ের দিন নাড়ুর মধ্যে দেওয়া সুপরি খেতে গিয়ে দাঁত ভেঙ্গে যাওয়ায় জীবনে আর শ্বশুরবাড়িমুখো হন নি। মাধববাবুর বাবার আমলেই হেমতগড় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় নদীর গ্রাসে, নতুন করে আবার হেমতগড়ের পত্তন হলেও জমিদার বাড়ির আর কোন চিহ্ন নেই। শোনা যায় জমিদার বাড়িতে গুপ্তধন ছিল, বাড়ির সাথে সাথে তাও লাপাত্তা। । তবে শীর্ষেন্দুর ভূতের সাথে সত্যিকার(!) ভূতের সাথে মোটেও তুলনা করবেন না।
শীর্ষেন্দুর অদ্ভুতুড়ে সিরিজ আসলেই অদ্ভুত। তার রসবোধ অনন্য, পুরো বই পড়ার সময় ঠোটের কোনায় হাসি লেগেই ছিল, তার অভৌতিক ভুতেদের আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। তাছাড়া ঘটোৎকচ কোন অংশে কম ছিল না।
কোথাও একটা ভুল হচ্ছে বুঝতে পেরে নবতারণ গর্জন করে বললেন, “দাঁড়ান মশাই, দাঁড়ান! ব্যাপারটা একটু বুঝে নিই। মাধব চৌধুরী হলেন বিজয়পুরের বড়কর্তার জামাই, তার মানে উনি বড় কর্তার মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তাহলে উনি হলেন বড়কর্তার ছেলেদের সম্পর্কে শালা।”
বড়বাবু জিব কেটে বললেন, “আজ্ঞে না, উনি সেক্ষেত্রে হবেন ভগ্নীপতি।”
“বললেই হল?”
নবতারণ আবার কটমট করে তাকান। তারপর একটু ভেবেচিন্তে বললেন, “না হয় তাই হল। কিন্তু শালাটা তাহলে কী করে হচ্ছেন?”
বড়বাবু গলা খাকারি দিয়ে বললেন, “ওঁর এক দিদি আবার আমার স্ত্রী কিনা।”
মাধব বাবু হচ্ছেন একসমযকার হেতেমগড়ের রাজকুমার । হেতেমগড় এক সময়ে বিশাল জমিদারি থাকলেও নদীর তলে হারিয়ে গিয়েছে । মাধব বাবু এখন তার বোনের বাসায় থাকে । খুবই রাগ তার । বিয়ে রাতে তার শালীদের ঠোট্টার কারণে সে সেই যে শশুরবাড়ি ত্যাগ করেছেন আর ফিরে যান নি । এক সকালে সে রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায় । এবং তারপর থেকেই নানান কন্ডকারখানা ঘটতে থাকে একেরপর এক । এক সময়ে মাধব বাবু আবারও গিয়ে হাজির হয় সেই হেতেমগড়ের জঙ্গলে । সেখানে গিয়ে আবারও তাদের সেই জমিদার বাড়ি আবিস্কার করেন । বইটা পড়তে পড়তে কতবার যে আমি হেসেছি সেটা ঠিক নেই । ছোটদের বই হলেও আমার বইখানা খুবই চমৎকার লেগেছে । ছোটদের বই অবশ্য । তবে আপনার ছেলে মেয়েদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোমার জন্য এই রকম মজার বইয়ের কোন বিকল্প নেই ।
খুব মজার একটা উপন্যাস। সকালে সাইকেল চালাতে বের হচ্ছিলাম। এখন গান শুনতে শুনতে সাইকেল চালানোর চাইতে অডিও বুক শুনতে শুনতে সাইকেল চালানো অনেক বেটার। তাই, হুট করে এটাই নামিয়ে ফেলি, তাড়াহুড়োয় খালি দেখি লেখক, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আমি এর আগে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কোন বই পড়ি নাই। মনেমনে ভাবছিলাম, এনার উপন্যাস যদি শরৎচন্দ্রের মতন হয়! কঠিন বাংলা। কিন্তু তেমনটা হয় নাই, খুবই সাবলীল আর সবচেয়ে বেশি লেগেছে সানডে সাসপেন্সের ন্যারেটের কারণে। সাথে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক। পারফেকশন এনে দিল একদম। সানডে সাসপেন্স কখনই নিরাশ করে না। আর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের লেখাও ভাল লেগেছে, দেখি ওনার আরো বই এক এক করে পড়ব ইনশাআল্লাহ।