পাঠ-প্রতিক্রিয়াঃ কোড টু জিরো
*********************
রচনাঃ কেন ফলেট (KEN FOLLETT)
অনুবাদঃ মানিক চন্দ্র দাস
প্রচ্ছদঃ মশিউর রহমান (মূল প্রচ্ছদ অবলম্বনে)
প্রকাশনীঃ অন্বে���া
১ম প্রকাশঃ একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৬
কমপ্লিট প্যাকেজ। পরিপূর্ণ তৃপ্ত হবার মতো একটা গল্প। হ্যাঁ জনরার বিচারে “কোড টু জিরো” থৃলার তবে যথাযথ পরিমাণে এতে সব পাবেন। বন্ধুত্ব, প্রেম, বিশ্বাসঘাতকতা, ভালবাসা খুঁজে নেয়া-খুঁজে পাওয়া, সূক্ষ্ন ছোঁয়ায় হিউমর, দ্য রাইট ওয়ান পেয়ে হারানো আর না পেয়ে খোঁজার অভিব্যক্তি, সব আছে এতে এবং সুষম মাত্রায়।
ল্যুক নামের এক লোক, নিজেকে আবিষ্কার করে স্মৃতিভ্রষ্ট অবস্থায় এবং সে যে মদ্যপ, খাম-খেয়ালী মানুষ; সেটা বিশ্বাস করবার মতো সবগুলো কারণ ছিল তার চোখের সামনে। ঠিক সে সময়, মহাশূণ্য যাত্রার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত আমেরিকা। ল্যুক তার স্মৃতি ফিরে পাবার, তার পরিচয়, তার নিজেকে ফিরে পাবার চেষ্টায় একটু একটু করে যখন সফল হচ্ছে; তখন পাঠক আবিষ্কার করে ইউ.এস.এ’র মহাশূণ্য যাত্রার সাথে ল্যুক জড়িয়ে আছে অবিচ্ছেদ্য ভাবে।
থৃলারের বহুল চর্চিত একটা পন্থা হল “কে করেছে”। কেন ফলেট একেবারেই সে প্রশ্ন রাখেননি সেটা বলা যাবেনা কিন্তু “কোড টু জিরো”র প্রথম প্রশ্নটা হল “কি”। এই গল্পে ল্যুকের প্রয়োজনীয়তা (বা অবস্থান) কি। সে প্রশ্নের উত্তর পেতে পেতে পরবর্তী প্রশ্নের স্লাইড চলে আসে, “কেন”। প্রটাগনিস্ট কেন এমন? কেন তার সাথে এমন করা হল? তার পরের অর্থাৎ ৩য় প্রশ্নটা হল “কে করেছে?” এবং ২য় প্রশ্নটাও এখানে রয়ে যায় “কেন করা হল এমন?”।
গল্পটা আলাদা। অন্যরকম। গল্পের ক্রাইসিসগুলো ক্লিশে না। পড়তে পড়তে গপ্পো ফাঁদাটাও আলাদা মনে হবে। গল্পের বর্তমানে আছেন আপনি, পরের অধ্যায়ে আবার চলে গ্যালেন ১৫/২০ বছর পেছনে। না দুটো টাইমলাইনে গল্প বলা একেবারেই নতুন কিছু না। “কোড টু জিরো” স্বতন্ত্র হয় ২ টাইমলাইনের ২ ভিন্ন স্বাদের গল্প দিয়ে। গল্পদুটো মোটা দাগে, একে অন্যকে এগিয়ে দেয়না এতটুকুও। এক ইঞ্চিও না। তারপরও পড়তে খারাপ লাগেনা। গল্প দুটোকে আলাদা করে দুটো বই আকারে প্রকাশ করলেও সেগুলো সুখপাঠ্য হতো বোধকরি। কোড টু জিরো, এ জায়গায় আলাদা হয়েছে অন্যদের থেকে। দুটো গল্পের একেবারে ভিন্ন স্বাদ, জনরাও বলতে পারেন। তার জন্যেই, বইটাতে পরিপূর্ণ তৃপ্তি এসছে, শুরুতে বলে এসছিলাম। দুটো ভিন্ন জনরার গল্প এক মলাটে আটকে নিয়ে, তাতে সব ধরণের অনুভূতি নিয়ে খেলা হল।
দুই টাইমলাইনের গল্প যে এক বিন্দুতে মেলেনি একেবারে, তা নয়। মিলতে হয়েছে কিন্তু সেই “অ্যাটনমেন্ট” এর আগে দুটো বিপরীতমুখী জনরা প্রেমী পাঠক তাদের পছন্দের বইয়ের তালিকায় “কোড টু জিরো” কে স্থান দিয়ে দেবেন হয়তো।
থৃলারের বাইরে আরেকটা যে জনরা, সে জনরার গল্পের শেষ টা; বলতে গেলে বইয়ের শেষটাই (কারণ অ্যাটনমেন্ট হয়ে গেছে ততক্ষণে) জনপ্রিয় একটা সিনেমার সাথে খুব মেলে, তারপরও ভাল লাগে। পড়ার পর মনে হবে, “পরিসমাপ্তি এমন না হলে জমতোনা। ঠিকই আছে।”
“কোড টু জিরো” তে থৃল পাওয়া যায়, ক্লিশে কোন উপায়ে না। দুটো ভিন্ন স্বাদের গল্প আছে, যেগুলোর আকর্ষণও ভিন্ন ভিন্ন রকম। পরিস্থিতি অনুযায়ী চরিত্রগুলোর মনস্তত্ত্ব আপনার-আমার চে অনেক বেশি আলাদা না যে রিলেট করা যায়না, তাদের অনুভূতি অনুভব করতে পারা যায়, তাদের ভাবনার খুব কাছে যাওয়া যায় সহজে এবং এ্যান্টিক্লাইম্যাক্সের পর চরিত্রেরা আপনার ভেতর একটা কমনীয় কোণ (সফট কর্ণার) তৈরি করে নেবে। গল্পের ২য় টাইমলাইনটা এই কাজটুুকু করে দিয়ে গ্যাছে; হাসি মুখে একটা বই শেষ করতে এসবের চে আর বেশি কিছু কি দরকার হয়?
অনুবাদক মানিক চন্দ্র দাস যতটুকু বাহবা পেতে পারতেন, তার চেয়ে বেশি দেয়া যায়। একেবারে সহজিয়া অনুবাদ, ভীষণ মোলায়েম। তার ওপর, চরিত্রের স্ট্যান্ড অনুযায়ী সংলাপের আক্ষরিক তর্জমা না করে বরং ওই পরিস্থিতিতে, ওই স্ট্যান্ডার্ডের একটা বাঙালি চরিত্র যেভাবে কথা বলতে পারে, অনুবাদ টা ঠিক সেভাবেই করা হয়েয়ে সংলাপের। দারুণ ব্যাপার-স্যাপার।
লেখক, অনুবাদক, সর্বোপরি প্রকাশনী তাদের নিজের নিজের নাম মগজে নাম গেঁথে দিল, দারুণ একটা সুখস্মৃতি হয়ে, “কোড টু জিরো”। সময় খুব ভাল গ্যাছে বইটার সাথে।