⚈ স্পয়লার-ফ্রি রিভিউ— ❛দ্য মায়ান কনস্পিরেসি❜
❝ধ্বংসলীলার দেবতা তাদের উপড়ে নিল আঁখি
আরেকজন করল সাবাড়, ছিল যেটুক বাকি!❞
মায়ান সভ্যতা, আজ থেকে আনুমানিক চার হাজার বছর পূর্বে মেসো-আমেরিকান অর্থাৎ বর্তমান মধ্য আমেরিকার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল যেমন—গুয়াতেমালা, বেলিজ, হন্ডুরাস, এল সালভাদর (উত্তরাংশ), মধ্য মেক্সিকো-সহ প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে রহস্যময় মায়ান সভ্যতা গড়ে ওঠে। যুগে যুগে ভাগ হয়ে মায়ান সভ্যতার রথের চাকা থামে ১৬৯৭ খ্রিষ্টাব্দে। পুরোপুরি বিলুপ্তিহীন জাতি হিসেবে আজও অনেক মায়ান জাতি বসবাস করে যাচ্ছে এই পৃথিবীর বুকে। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের বহু শত বছর আগেই মায়ান সভ্যতার লোকেরা নব্য-প্রস্তর যুগের সূচনা করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে অর্থাৎ আজ থেকে তিন হাজার বছর আগেই মায়ানরা কৃষিকাজ, মাটির পাত্র নির্মাণ প্রভৃতি আয়ত্ত করে ফেলেছিল! শুনতে বিস্মিত হলেও, এই মায়ান জাতি যে আরও কী কী রচয়িতা করেছে সেইদিকে না যাওয়াটা ভালো। রিভিউকে আপাতত আর্টিকেল বানাতে ইচ্ছুক না।
❛দ্য মায়ান কনস্পিরেসি❜ উপন্যাস নিয়ে বিশেষ কিছু বলার থাকলেও সেইভাবে বলতে চাচ্ছি না। বইয়ের মতো কন্সপিরেসি তৈরি করতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু সেটাও সম্ভব না। কারণ পুরো উপন্যাস জুড়ে অদ্ভুত এক মুগ্ধতা কাজ করলেও, হোঁচট খেতে হয়েছে অনেক জায়গায়। বিশেষ করে যে অভিযানে লেখক আমাদের সঙ্গী করে নিতে চেয়েছেন সেই সবুজে ঘেরা অরণ্য; যে অরণ্যে কল্পনায় ও বইয়ের পাতায় ঘুরেছি আরও বহুবার। তবে পার্থক্য এই বইতে বেশ ভালোই রয়েছে।
❛দ্য মায়ান কনস্পিরেসি❜ উপন্যাসে মায়ান সভ্যতা ও বিশেষ এক ফিউশনের কথা ফোকাসে রাখলেও; এর ভেতরে রয়েছে একেবারে অন্যরকম কিছু। সেই কিছুটা বেশ ভয়ানক ও রোমহষর্ক। ছোটোবেলায় পাওয়া ভূতের ভয়ের কিয়দংশ খুঁজে না পেলেও, শিহরিত হওয়ার একটা আভাস থেকেই যায়। পুরো উপন্যাস এক টানা পড়া যায় শুধুমাত্র লেখক গ্রাহাম ব্রাউনের লেখনশৈলীর জোরে। মায়ান সভ্যতার বিভিন্ন বিষয়বস্তু নিয়ে যে আলোচনা উনি করেছেন, তা বেশ গুছানো আর আকর্ষণীয় লেগেছে।
❛পপুল ভাহ❜ কী বা মায়ান লোকদের কী কাজে লাগে, সেই সম্পর্কে লেখক বেশ সুন্দর করে বুঝিয়েছেন। গল্পের শেষে এই নিয়ে সারাংশও লেখা আছে। যা থেকে মায়ান সভ্যতার উত্থান নিয়ে সাম্যক ধারণা লাভ করা যায়। তবে যেহেতু এই উপন্যাস ফিকশন, কাহিনির প্রয়োজনে অনেককিছু লেখকের মনগড়া হতে পারে। শুধুমাত্র ❛পপুল ভাহ❜-এর কিছু শুদ্ধ অংশ লেখক উপন্যাসের সাথে মিশিয়ে গল্পে রূপ দিয়েছেন। আর এই পুরো রূপ ঘিরে রয়েছে—কাঠমানবদের রহস্য ও তুলুন জুযুয়া নিয়ে! কারা বা কে এই কাঠমানব এবং তুলুন জুযুয়া বা কী; তা জানতে হলে এই বই পড়া আবশ্যক।
➲ আখ্যান—
আমাজনের গহীনে মানব জাতির সবচেয়ে মারাত্মক গোপন রহস্য উদ্ধারের অভিযান
হকারের প্রাক্তন CIA সহকর্মীরা চায় ওকে খুন করতে, ইন্টারপোল চায় তাকে জীবিত গ্রেফতার করতে। কিন্তু তার লক্ষ্য আপাতত কোনটাই না হতে দেওয়া। এই উপন্যাসের প্রধান নারী চরিত্র ডেনিয়েলিই হতে পারে তার মুক্তির একমাত্র পথ। তাই সে সিদ্ধান্ত নিল পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া মায়ান শহর তুলান জুযুয়া খোঁজার গোপন অভিযানে ডেনিয়েলিকে সাহায্য করবে, বিনিময়ে ডেনিয়েলি তার দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দেবে।
কিন্তু আমাজনের গহীন জঙ্গলে অভিযাত্রীরা মুখোমুখি হলো এক অচেনা শত্রুর। বন্ধুদের লাশের পাশে বসে ওরা আবিষ্কার করল তুলান জুযুয়ার খোঁজে ওরা একা আসেনি। হঠাৎ আগ্রাসী হয়ে ফিরে এলো পৌরাণিক দানব। এদিকে যুদ্ধ করতে করতে বারুদও প্রায় শেষ...
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
লেখক গ্রাহাম ব্রাউনের গল্প বলার ফাঁদে একবার আটকে গেলে; শেষ না করে উদ্ধার হওয়ার উপায় নেই। ❛দ্য মায়ান কনস্পিরেসি❜ উপন্যাস সব মিলিয়ে দুর্দান্ত এক জার্নি। আমাদের চিরাচরিত আমাজন জঙ্গলকে লেখক সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনা করেছেন। উত্তেজনার কমতি নেই, তবে কোনো হিংস্র জানোয়ার দ্বারা এই উত্তেজনা সৃষ্টি হয়নি। হয়েছে এক পৌরাণিক দানবের মাধ্যমে। বেশ অদ্ভুত সেই দানবের সাক্ষাৎ পেতে চাইলে এই বই আপনার জন্য উৎকৃষ্ট। ভাগ্য ও বিশ্বাস এই দুই পুরো উপন্যাসের উপজীব্য বিষয়। কন্সপিরেসি ততটা না থাকলেও; অ্যাকশনের কোনো কমতি লেখক রাখেনি। আর থ্রিল বা টুইস্টের কমতি নেই-ই বললে চলে।
● সূত্রপাত—
ঘটনার সূত্রপাত মানাউস, ব্রাজিল থেকে। ড্যানিয়েলি (ডেনিয়েলি) লেইডল ও আরনল্ড মুরের কথোপকথন দিয়ে শুরু। পরিকল্পনা অনুযায়ী NRI-এর এক গোপনীয় কাজে ড্যানিয়েলিকে যেতে হবে আমাজনের গহীনে, সাথে থাকবে না অভিজ্ঞ পার্টনার আরনল্ড মুর। অথচ পূর্বে এই একই অভিযানে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে তাদেরই কয়েকজন সহযোগী। কী খুঁজতে গিয়ে তারা প্রাণ হারিয়েছে আর কীভাবে; সেই রহস্যের পাশাপাশি খো���জ করতে হবে দুনিয়া রক্ষাকারী এক ফিউশনের। যে ফিউশনের আশীর্বাদে বদলে দিবে পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ! ড্যানিয়েলির দরকার এখন হকারকে। কে এই হকার?
গল্পের সূচনা দারুণ আগ্রহ জাগানিয়া। একবার পড়া শুরু করলে কয়েক অধ্যায় কোন দিক দিয়ে উবে যাবে বোঝার উপায় নেই।
● গল্প বুনট—
গল্প বলার সৌন্দর্যে পুরো উপন্যাস বেশ মজার লেগেছে। লেখক পুরো প্লটের সিকোয়েন্স সাজিয়েছেন অনেক যত্ন সহকারে। একেবারে কাঠ কুঁদে বানানো মসৃণ কোনো কারুকাজের মতোই। তবে পুরো প্লটে অভিযোগের একটা তীর আমার হাতে এখনও ধরা রয়েছে। সেটাকে ছেড়ে দিলে, সোজা গিয়ে বিঁধবে ‘খাবার বা খাদ্য’-এর ওপরে। উইয়ার্ড তাই না? কেন সেটা বলি, লেখক পুরো আমাজন জঙ্গল ঘুরিয়ে খাবারের প্রয়োজনীয়তা দেখাল কি-না একেবারে শেষে এসে! অথচ আমাজনে বিশুদ্ধ পানি ও খাবার জোগাড় করার মতো কষ্টসাধ্য কাজ দ্বিতীয়ত কিছু আছে বলে জানা নেই। এই পুরো খাদ্য চক্রের বিষয়টা আমাজন অভিযাত্রীদের মাথা ঘামানোর কারণ না দেখে হতাশ হতে হলো। গল্পে লেখক এতটাই মজে ছিলেন যে, কে কী খেল তার কোনো খোঁজ রাখেননি ও লিখেননি। এ-ছাড়া প্লটে কিছু ছোটোখাটো গড়মিল দেখা গিয়েছে। এতে মূল লেখকের কমতি না সম্পাদনার ঘাটতি রয়েছে তা জানা নেই। অনুবাদকের দোষ এতে আমি দিব না। যেখানে উনি খাবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিস পুরো উপন্যাসে একবার দেখিয়েছেন তাও আমাজনের মতো জঙ্গল অভিযানে, তা বড়োই আশ্চর্য করেছে আমাকে।
● লেখনশৈলী—
লেখনশৈলী দারুণ। এই নিয়ে বেশি উপমা ঝাড়ার দরকার নেই।
● বর্ণনাশৈলী—
পুরো উপন্যাসের খুঁটিনাটি বিষয়বস্তু, অ্যাকশন সিকোয়েন্স, অ্যাডভেঞ্চার মোমেন্ট, মায়ান সভ্যতা নিয়ে গসিপ এ-ছাড়া গল্পে আছে এমন জিনিসপাতি পুঁজি করে পারিপার্শ্বিক আবহের সাথে মিশিয়ে দারুণ সিনেম্যাটিক দৃশ্যের রচনা লেখক করতে সফল হয়েছেন। পুরো উপন্যাস যেন জীবন্ত সিনেমা হয়ে ধরা দিয়েছে মানসপটে।
● চরিত্রায়ন—
চরিত্রের শেষ নেই। আছে গুরুত্বপূর্ণ, তুলনামূলক গুরুত্বপূর্ণ এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অর্থাৎ কেউ ফেলনা নয়, যে-ই উপন্যাসের পাতায় এসেছে তাকে লেখক নিজের ইমেজ বজায় রাখার কারিশমা দিয়েছে। সেইজন্য আলাদাভাবে সাবপ্লটও বানানো হয়েছে প্রত্যকটি চরিত্রের জন্য। কেউ সেই ইমেজ ধরে রেখে লড়াই করেছে, কেউ জীবন দিয়েছে আর কেউ-এর কী ঘটেছে তা এখনও রহস্য। মানে খোলসা করেনি লেখক। বেঁচে বর্তে থাকলে তো ভালোই।
● অবসান—
সকল অবসান সুখের নয়, আবার কিছু সুখেরও হয়। এই উপন্যাসের অবসানে দুই-ই অনুভূতি বিদ্যমান। না পাওয়ার পাওনা, লেখক ছেড়ে দেয় না। আর কিছু পেতে হলে ত্যাগ তো করতেই হবে। পাঠকের সেই প্রেক্ষিতে কিছুটা ত্যাগ করা উচিত। শেষটাও অনেক কিছু ত্যাগ করে প্রাপ্তি ঘটার শিহরণের মতো।
● খুচরা আলাপ—
মায়ান সভ্যতার ওপর বেজড্ করে পুরো উপন্যাস লেখা। সাথে রয়েছে আইটি বিভাগের অনেক খুঁটিনাটি বিষয় এবং বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার পরিকল্পনা। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ; এই তিন কাল এই উপন্যাসের আনাচেকানাচে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। থ্রিলের কমতি নেই, আছে মনোমুগ্ধকর সব বিবরণ। সেটা হোক জঙ্গলের বা কোনো শহরের শুভ্র সাদা বরফে ঢাকা রাস্তার। দারুণ!
➣ লেখক ও অনুবাদক নিয়ে কিছু কথা—
কোনো লেখকের লেখার প্রেমে পড়তে—তাঁর হাফ ডজন বই পড়া লাগে না। আবার সব বই যে ভালো লাগবে তা-ও না। গ্রাহাম ব্রাউনের ক্ষেত্রে আমি এই কমন উদাহরণটি দিব। এর গূঢ় অর্থ—আগামীতে ওনার কোনো বই আমি হাতছাড়া করছি না।
অনুবাদক অসীম পিয়াস ভাইয়ের প্রথম অনুবাদ। গুছানো ছিল বেশ। শব্দচয়নে ভ্যারাইটি দেখা না গেলেও প্রচলিত ও ইংরেজি শব্দ মিলিয়ে বাক্য গঠনে তেমন জটিলতা দেখা যায়নি। কিছুক্ষেত্রে সিকোয়েন্স ত্রুটি দেখা দিলেও, সেটা যে মূল লেখকের ত্রুটি তা বলার অপেক্ষা রাখে না৷ তবে পুরো বই ছিল সুখপাঠ্য, মূল লেখকের লেখার ধাঁচ প্রায় অক্ষত রেখে কাজটা সম্পূর্ণ করেছেন অনুবাদক।
● সম্পাদনা ও বানান—
সম্পাদনা ঘাটতি ও বানান বিভ্রাটের কমতি নেই। এই নিয়ে অনেকে অনেক আলোচনা করেছে। তাই স্কিপ করে গেলাম। বই ভালো লেগেছে এইটাই বড়ো কথা।
⊙ বই : দ্য মায়ান কনস্পিরেসি • গ্রাহাম ব্রাউন
⊙ জনরা : মিথলজিক্যাল অ্যাডভেঞ্চার থ্রিলার
⊙ প্রথম প্রকাশ : বইমেলা ১৬
⊙ অনুবাদক : অসীম পিয়াস
⊙ প্রকাশনা : রোদেলা
⊙ মুদ্রিত মূল্য : ৪৫০ টাকা মাত্র
⊙ পৃষ্ঠা : ৩৬৭