গত বছরের এক দুপুর বেলা ডাকযোগে একটা বই পেলাম। ওজনদার প্যাকেটটা খুলতেই বেরিয়ে এলো অন্যরকম সাজসজ্জা আর খুব আদুরে নামের একটা বই। প্যাকেটের গায়ে প্রেরকের নাম হিসেবে বুকশপের ঠিকানা ছাড়া আর কিছু নেই। কে পাঠাতে পারে! ভাবনাটা সেই মুহূর্তের জন্য স্ট্যাচু করে বইয়ের পাতা উলটাতেই মন ভরে গেল। খুশিতে আমি বাগবাগ। সাদা প্রচ্ছদের ওপর লাল-নীল ফুল-লতাপাতা, মরিচ, মাছের নকশি স্টিচের ঘেরাটোপ পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই প্লেটভরতি সুখাদ্যের রঙিন ছবিতে চোখ আটকালো। ‘ইহা হয় একটি রেসিপি বুক’ চটজলদি সে কনক্লুশনে না গিয়ে পরের পাতা উলটে দেখি সাদাকালো একটা ছবি। দুজন নারী সেখানে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। একজনের পরনে বধূর বেশ, পাশে দাঁড়ানো নারীটিও সুসজ্জিত। অপরিচিত নারী দুজনের সাজসজ্জায় ঘটা থাকলেও ছবিতে একধরনের সারল্য লেপটে আছে। সাদাকালো ছবি বলেই কি না কে জানে! ডেডিকেশন পাতায় চোখ আটকে গেল। ভারি চমৎকার লেখার বুনন। যে সম্পর্ক নিয়ে লেখা সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরতম সম্পর্কের একটি।
“I heard Ammu’s heartbeat even before I saw her face. I knew her voice and recognized her laughter even before she held me in her arms. Our deep bond began unseen by others, in the womb, and is the anchor of my life. This book celebrates the relationship between mother and daughter. It is a homage to my mother, who I call Ammu.”
মায়াবি শব্দেরা ভাঁজ খুলে জানিয়ে দেয় সাদাকালো ছবির ওই দুজন নারীর পরিচয়। ওঁরা মা-মেয়ে। বধূবেশে আসমা খান বইটির লেখক, পাশে ওঁর মা। সারপ্রাইজ গিফ্ট হিসেবে পাওয়া বইয়ের নাম, Ammu, লেখক Asma Khan. এর আগে কখনও এই লেখকের নামও শুনিনি, বই পড়া তো দূরের কথা।
আম্মু জানালো, আসমা খান কলকাতার আলো হাওয়া মেখে বেড়ে উঠেছেন। তাঁর মা পশ্চিম বঙ্গের মেয়ে এবং বাবা উত্তর প্রদেশের রাজপুত পরিবারের সন্তান। আসমা’র মা ৭০-৮০ দশকে কলকাতায় রেস্তোরাঁ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রান্না যে শুধু মাত্র পেটপূর্তির অনুষঙ্গ নয়, এটা একধরনের শিল্প বা কলা; যার মাধ্যমে একটা সমাজ বা গোষ্ঠীর কৃষ্টিকে উপস্থাপন, উদযাপন করা সম্ভব। রান্নার অন্যান্য উপাচারের সঙ্গে সঙ্গে রাঁধুনির ভালোবাসা আর আন্তরিকতাও জড়িয়ে থাকে। এই ব্যাপারটা আসমা শৈশবেই টের পেয়েছেন।
রন্ধনকে সেরকম ভাবতে জানা একটি পারিবারিক বাতাবরণের ভেতর বেড়ে ওঠায় আসমা নিজেও একসময় রন্ধনকলার প্রতি আগ্রহী হন। যেকারণে বিয়ের পর লন্ডন কিংস কলেজ থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা এবং ব্রিটিশ কন্সটিটিউশনের ওপর পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েও তিনি স্বামীর মতো শিক্ষাকতা পেশায় না গিয়ে আশৈশব ঘিরে থাকা পছন্দকেই প্রাধান্য দেন। বেছে নেন রন্ধনশিল্পকে। আসমা খান একজন খ্যাতিমান রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী। তাঁর ‘দার্জিলিং কিচেন’ রাজকীয় মুঘল ঘরোনার রান্না থেকে শুরু করে ভারতীয় নানা খাদ্যের সুগন্ধে লন্ডন শহরের বাতাস ভরিয়ে রাখে।
‘আম্মু’ আসমা খানের অতি সুখপাঠ্য বর্ণনার পাশাপাশি প্রচুর ছবিতে ভরপুর। বর্ণনার পাশাপাশি সাদাকালো কিংবা রঙিন ছবিগুলো পাঠককে অতীত ভ্রমণে সাওয়ার করে নেয় দিব্যি। যে ভ্রমণ বাঙালি অনেক পাঠককেই হয়তো নস্টালজিক করে তুলবে। বিশেষ করে যাঁরা ৭০-৮০ দশকের পশ্চিম বঙ্গের খাদ্যবিলাসি জীবনের সঙ্গে জড়িত। সেরকম পাঠক অতীত খুঁড়ে ইতিহাস আর সময়কে জীবন্ত অনুভবের সুযোগ পাবেন। অবশ্য সে সময় বা স্থানের প্রতিনিধি না হলেও সমস্যা নেই। বইয়ের জাদুকরী ভাষা আর পাতা জুড়ে থাকা ছবিগুলো যে কোনো পাঠককে ‘আম্মুর ইনার টোন স্পর্শের আনন্দ দেবে বলেই বিশ্বাস।
আম্মুর ছবিগুলো স্মৃতির অর্গল খুলে কেবলমাত্র অতীতের গল্পই শোনায় না; একটা পারিবারিক আচার-আচরণের সঙ্গেও পরিচয় করায়। একই সঙ্গে আসমা যে সমাজ-সময়ে বেড়ে উঠেছেন সেটাকেও সামনে এনে দাঁড় করায়। আম্মুকে তাই কোনোভাবেই রেসিপি বুক বলার উপায় নেই। পাঠক এই বইয়ের হাত ধরে চলে যাবেন আসমার মা নানির জামানায়। আবার আসমার সময়কালের চৌখুপিতে চোখ রেখে দেখবেন তাঁর বেড়ে ওঠার সময়কাল, সমাজটাকে। অতীতের নানা সংস্কৃতি সম্পর্কেও জানতে পারবেন। আর এসবের সঙ্গে সঙ্গত করে যাবে নানা স্বাদ এবং নানা পদের ভারতীয় খাবার-দাবারের সচিত্র বয়ান। আম্মু তাই স্রেফ রেসিপি বই নয়–তারও বেশিকিছু–যেখানে কাহিনির সঙ্গে মুড-পরিস্থিতি অনুসারে এসেছে রান্না প্রসঙ্গ-রেসিপি।
দক্ষ গল্প বলিয়ের মতো আসমা তাঁর আনন্দমাখা শৈশব-কৈশোর, তারুণ্য- বিবাহিত জীবন, নিজের মা হওয়া ইত্যাদি অধ্যায়গুলোকে নানা নামে সাজিয়েছেন। ২৮৭ পৃষ্ঠার সুবিশাল বইকে তিনি মোট পাঁচটা পর্ব দিয়ে সাজিয়েছেন। যেমন- চাইল্ডহুড, কুকিংলেসন,নস্টালজিয়া,সেলিব্রেশন, বিয়িং আম্মু। বইটা দেখতে অনেকটা রাশিয়ান প্রকাশনী রাদুগা, প্রগতির করা বইগুলোর মতো। শক্তপোক্ত কভারে মোড়া।
এধরনের বইকে আমার টাইম মেশিন হিসেবে ভাবতে ভালো লাগে। লেখার সেরকম শক্তি থাকলে লেখক সেই টাইম মেশিনে পাঠককে অতীত ভ্রমণে সক্ষম হন। আসমা খানের ‘Ammu’ সেরকমই একটি টাইম মেশিন।