আলী, মোহাম্মদ নাসির (১৯১০-১৯৭৫) শিশুসাহিত্যিক ও গ্রন্থপ্রকাশক। ১৯১০ সালের ১০ জানুয়ারি ঢাকা জেলার বিক্রমপুরের ধাইদা গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা হায়দার আলী ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। নাসির আলী তেলিরবাগ কালীমোহন-দুর্গামোহন ইনস্টিটিউশন থেকে এন্ট্রান্স (১৯২৬) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিকম (১৯৩১) পাস করেন। তারপর চাকরির সন্ধানে তিনি কলকাতায় যান। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টে অনুবাদক হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীকালে তিনি দৈনিক ইত্তেহাদ পত্রিকার শিশুবিভাগের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন (১৯৪৬-৪৮)।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকায় এসে নাসির আলী হাইকোর্টের চাকরিতে যোগদান করে ১৯৬৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন। তার আগেই ১৯৪৯ সালে তিনি ‘নওরোজ কিতাবিস্তান’ নামে একটি প্রকাশনা সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন, যা এখনও পুস্তক প্রকাশনার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। ১৯৫২ সালে তিনি দৈনিক আজাদের শিশু-কিশোর বিভাগে ‘মুকুলের মহফিল’ পরিচালনা করেন এবং ‘বাগবান’ ছদ্মনামে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ওই দায়িত্ব পালন করেন।
শিশুতোষ গ্রন্থপ্রণেতা হিসেবেই নাসির আলীর মুখ্য পরিচয়; তবে তিনি শিক্ষামূলক গল্প, প্রবন্ধ ও জীবনীও রচনা করেছেন। নির্মল হাস্যরস সৃষ্টিতে তিনি দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনাবলি হলো: আমাদের কায়েদে আজম (১৯৪৮), মণিকণিকা (১৯৪৯), শাহী দিনের কাহিনী (১৯৪৯), ছোটদের ওমর ফারুক (১৯৫১), আকাশ যারা করলো জয় (১৯৫৭), আলী বাবা (১৯৫৮), টলস্টয়ের সেরাগল্প (১৯৬৩, ২য় সংস্করণ), ইতালীর জনক গ্যারিবল্ডি (১৯৬৩), বীরবলের খোশ গল্প (১৯৬৪), সাত পাঁচ গল্প (১৯৬৫), বোকা বকাই (১৯৬৬), যোগাযোগ (১৯৬৮), লেবু মামার সপ্তকান্ড (১৯৬৮), আলবার্ট আইনস্টাইন (১৯৭৬), মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা (১৯৭৬) ইত্যাদি। সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৬৭), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৮) ও ইউনাইটেড ব্যাংক অব পাকিস্তান পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সম্ভবত আমার জীবনে সর্বপ্রথম একুশে বইমেলা থেকে কেনা বই। সেই ১৯৯২ সালে! কিন্তু এই বইটা কেনার কোন কথাই ছিল না। তখন ক্লাস থ্রিতে পড়ি, আর খালি ভূতের গল্প পড়তে মজা লাগত। কলকাতার নির্মল বুক এজেন্সীর (খুব সম্ভবত, নিশ্চিত না এখন একেবারেই) রংচঙ্গে সুন্দর সুন্দর ইলাস্ট্রেশন সহ লার্জ সাইজ ভূতপেত্নি আর রাজারানীর রূপকথার বই পাওয়া যেত ছোটদের জন্য, সেগুলো সমানে পড়তাম। আমার জীবনে পড়া ও কেনা প্রথম বই ছিল নির্মল বুক এজেন্সী'র প্রকাশিত উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর এক রাজার সাত রাণী। আরেকটা ভূতের বইয়ের নাম এখনো মনে আছেঃ ভূত পেত্নি রাক্ষস খোক্কস! আব্বা-আম্মা আমাকে জীবনে প্রথমবার একুশে বইমেলায় নিয়ে গেছেন, আমার ভিড়ের মধ্যে হাঁটতে খুবই বিরক্ত লাগছে কারণ আমার পছন্দের বইগুলো এখানে নেই, সব "বোরিং" বই। আমাকে ভূতের বই কিনে দিবেন এই বলে আব্বা-আম্মা ভুলিয়ে রাখছেন... অথচ যখন সময় হলো তখন চরম বিস্ময় ও ভগ্নহৃদয়ে আবিষ্কার করলাম আম্মা আমাকে একটা নিতান্ত সাদামাটা প্রচ্ছদের সাধারণ সাইজের বোরিং বই কিনে দিলেন। আমার এখনো মনে পড়ে মেলার মধ্যে সবার সামনে চিল্লান দিয়ে কী কান্নাকাটিটাই না করেছিলাম! আক্ষরিক অর্থেই নাকের জল চোখের জল এক হয়ে গিয়েছিল না পাওয়া ভূতের বইয়ের বিরহে। যাইহোক, মুখ গোমড়া করে বাড়ি ফিরে আসলাম, আমার ওই বাজে বই ধরে দেখারও ইচ্ছা নাই। কিন্তু কয়দিন? তখন তো আর এখনকার মত ঘরে গাঁট্টি গাঁট্টি না-পড়া বই ছিল না, অতি অল্প কয়েকটা বই ছিল নিজের সংগ্রহে সেগুলোই বার বার পড়তাম, না-পড়া আনকোরা বইটা তাই বাধ্য হয়েই একদিন হাতে তুলে নিতে হলো।
এত বছর পর আর বিস্তারিত মনে নেই আমার কোন গল্প ঠিক কি কাহিনি নিয়ে ছিল, শুধু মনে আছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক নিঃশ্বাসে বইটা পড়ে শেষ করার কথা, আর পড়ার পুরোটা সময় এক অনাবিল ভাল লাগা ও গভীর আনন্দে ডুবে থাকা... বইটা শেষ করার পরেও যে রেশ কাটেনি। বলাই বাহুল্য কতটা ছাপ ফেলেছিল তখনকার শিশুমনে, কারণ দীর্ঘ ২৭ (!) বছর পরেও এখনো আমার সেই অনুভূতিটা স্মৃতিতে স্পষ্ট জ্বাজ্বল্যমান, এখনো বইটার প্রতি ছোটবেলার সেই মায়া সেই আবেগ অনুভব করি। মোহাম্মদ নাসির আলী'র অমর কিশোর গল্প সংকলন লেবুমামার সপ্তকাণ্ড, শুধু সর্বপ্রথম একুশে বইমেলা থেকে কেনা বইই না, আমার জীবনে পড়া সর্বপ্রথম 'সাধারণ মাপের ইলাস্ট্রেশন-বিহীন লেখাসর্বস্ব' বইও। সেই থেকে শুরু, এরপরে বোধ হয় আর কখনো শুধু ছবিওয়ালা ভূতের বা রাজারানীর বই কিনে দিতে বায়না ধরিনি, বরং গোগ্রাসে সুকুমারের পাগলা দাশু থেকে শুরু করে সত্যজিৎ-এর দার্জিলিং জমজমাট, হুমায়ুনের বোতল ভূত-একী কান্ড থেকে শুরু করে জাফর ইকবালের হাত কাটা রবিন-দীপু নাম্বার টু, শাহরিয়ার কবিরের নুলিয়াছড়ির সোনার পাহাড়-অন্যরকম আটদিন থেকে শুরু করে শীর্ষেন্দু'র মনোজদের অদ্ভূত বাড়ি-হেতমগড়ের গুপ্তধন ইত্যাদি ইত্যাদি পড়ে শেষ করেছি, ক্লাস ফাইভ-সিক্স শেষ করার আগেই। আর এসব "বোরিং বই" পড়ার সূচনা হয়েছিল এই অসামান্য অপূর্ব গল্প সংকলনটা থেকে। আমার পাঠকজীবনে তাই বইটির মূল্য অপরিমেয়।
সংগ্রহের বইটা অনেক অনেক বছর আগে সেই ছোটকালেই হারিয়ে গেছিল। বছর কয়েক আগে একদিন হুট করে অতীতে পাওয়া আরো অসংখ্য রত্নের মতই নীলক্ষেতের ফুটপাতে পেয়ে গেলাম, মাত্র ২০টা টাকার বিনিময়ে শৈশবের অমূল্য একটুকরো অংশকে বাগিয়ে নিতে বিন্দুমাত্র সময়ক্ষেপণ হলো না। এই বুড়ো বয়সে আবার পড়তে যেমনই লাগুক, কিছু কিছু জিনিসকে স্মৃতিকাতরতার বাইরে কখনো আনা যায় না, তার কোন প্রয়োজনও নেই। All that matters is what I felt, when I read it for the first time, when I thought I was absolutely NOT going to like it, and how it changed my preferences and choices, paved the road in front of me to be whatever kind of reader I'm today. And for that, I'm eternally grateful.
এসব বই হল গিয়ে মন ভাল করার ওষুধ বুঝলেন দাদা? মন খারাপের সাত দিনে এই ৭টা ওষুধ খাবেন আর আরাম পাবেন..... আর, সুলেখনীর সাথে এমন আমুদে লেখা যে বেশ মজা নিয়েই ওষুধগুলো খাবেন
বইটি পড়ে "লেবুমামা" কে মনে ধরে যাবে দাদা!!! গল্পগুলো পড়তে পড়তে হাসি পাবে না, তবে শেষের দিকে এমন হাসি যে পাবে...!! এখনও আমার হাসি পাই কিছু গল্প চিন্তা করলে 🤣 অতএব লেখক যে একজন মজাদার গল্প-বলিয়ে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না
যখন আপনার মন খারাপ থাকবে দাদা, তখন বইটি হাতে তুলে নিবেন, পড়ে আনন্দ পাবেন 🌻
‘ঘাবড়াও মাৎ! কুছ্ পরোটা নেই’ বাণীতে- লেবুমামা 💚 নানুবাড়ির প্রায় সকলে কম বেশি বইপড়ুয়া।তার সুবাদে এ বইখানার প্রশংসা সবার মুখে মুখে শুনে, খুব ছোট বয়সে নানুবাড়িতেই প্রথম ‘লেবুমামার সপ্তকাণ্ড’ পড়েছিলাম। বয়স তখন এতই কম ছিল যে, লেবুমামার হাস্যরস সে ছোট্ট হৃদয়কে স্পর্শ করতে পারেনি।মনে মনে বেশ হতাশ হয়েছিলাম বইটা তেমন উপভোগ্য অনুভব করতে না পারায়। অন্যদিকে মামা-খালাদের মতো বড় মানুষগুলোর কাছেও চক্ষু লজ্জার খাতিরে বলতেও পারিনি, “নাহ, বইটা তো তেমন ভালো লাগলো না”। কিংবা প্রশ্নও করতে পারিনি, “আচ্ছা, তোমাদের বইটা ‘কেন’ ভালো লেগেছে?” বরং, নিজের বোধগম্যের সীমাবদ্ধতা কে আড়াল করে হাসিমুখে বলেছিলাম, “হু, মজার বই”।
কোন এক অজানা কারণে বইখানা আজকের আগ অব্দি কখনো দ্বিতীয়বারের মতো পড়ার ইচ্ছেটা জাগেনি। এতগুলো বছর পর সাতখানা খুদে গল্প সমৃদ্ধ ৭২ পৃষ্ঠার এ হাড্ডিসার বইখানা পড়া শুরু করলাম। খুব বেশি হলে দু’পাতা পড়তে হয়েছে সেই কচিকালের ‘কেন’-র উত্তর জানতে।সাদামাটা লেখনী দিয়ে ছোট গল্পগুলোকে এতটা অসাধারণ করে তুলে ধরা সম্ভব বইটি এবারেও না পড়লে হয়তো কখনো আর জানতেও পারতাম না।
আমার জীবনে পড়া বই এর সংখ্যা নেহাত মন্দ নয়।ওই শত শত বই এর তালিকায় এটা নিঃসন্দেহে আমার পড়া ‘শ্রেষ্ঠ’ বইগুলোর একটি।কখনো ভাবিনি কচিকালে নিরস ভাবা বইখানা এ বয়সে এসে এইভাবে হাসাবে, এইভাবে ভালো লাগাবে।আজ এ অভিজ্ঞতার পর মনে হচ্ছে, কিছু কিছু মানুষের মতো কিছু কিছু বই-কেও দ্বিতীয়বার সুযোগ দিতে হয়। :”)
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে এক বন্ধু কল দিয়ে ডাকল। গিয়ে শেলফ এর বই গুলো দেখতে দেখতে বইটা চোখে পড়ল। একটানা বসে ৭ টি গল্প পড়ে ফেললাম। বেশ উপভোগ্য। দীক্ষা গল্পটি খুব বেশি ভালো লেগেছে।
লেবুমামার ছোটবেলা ও কলেজজীবনের সাতটা গল্পের কালেকশন লেবুমামার সপ্তকাণ্ড। প্রথম ও শেষ গল্পটা দুর্দান্ত। লেবুমামা ছোট থেকে বেশ বুদ্ধিমান কিন্তু বেশি দুষ্টু। ছোটদের সঙ্গে তার ভাব হয় সহজে। ছোটা আন্ডাবাচ্চা ভাগ্নেদের বিষম বিপদে লেবুমামাই ভরসা। তার অমোঘ সান্ত্বনাবাণী: কুচ্ পরোটা নেই!! রেটিং: ৩.৫★
ক্ল্যাসিক শিশুসাহিত্য ছোটো-বড়োর গন্ডির বাইরে যেকোনো বয়সেই সমান আনন্দ দিতে পারে তার উদাহরণ অনেক। কিন্তু এটা আমার কাছে সে কাতারে আসার মতো মনে হয়নি!
আমার বড় বোন যখন ক্লাস সিক্সে কাছের সরকারী বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন আমার স্কুলে যেতে তখনও আরও এক বছর বাকি। সরকারী বিদ্যালয়গুলোর এখনকার অবস্থা কী রকম জানি না, তবে তখন সেখানে কিছু খুব ভালো জিনিস ছিল। তার মধ্যে একটা হচ্ছে সমৃদ্ধ একটা লাইব্রেরি, আরেকটা ভালো মানের একটা ল্যাব (স্কুল পর্যায়ের পদার্থ, রসায়ন আর জীববিজ্ঞানের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য)। অমন একটা লাইব্রেরিতে আপা অ্যাকসেস পাওয়ায় সপ্তাহে কমপক্ষে একটা করে নতুন বই পড়তে পাবার (আমার ক্ষেত্রে শুনবার) সুযোগ হওয়ায় আমরা ভাইবোনেরা বেশ খুশি। কখনো কখনো আপা আবার ক্লাসের অন্য মেয়েদের সাথে বই বিনিময় করতে পারলে সপ্তাহে নতুন বইয়ের সংখ্যা বাড়তো। বিগত দিনের যে কয়টা দৃশ্য আমৃত্যু মনে থাকবে তার একটা হচ্ছে বিকেলে বারান্দার মেঝেতে আপা পা লম্বা করে দিয়ে গল্পের বই পড়ছেন আর আমরা বাকি ভাইবোনেরা তাঁকে ঘিরে বসে হাঁ করে তা শুনছি।
অমন কালে একদিন এই বইটা আমাদের কাছে এলো। গোটা বইটা এক বসাতেই শুনেছিলাম। বইটা খুব ভালো লেগেছিল এমনটা নয়, তবে অল্প কিছু মজার ব্যাপার ভালো লেগেছিল; এবং তার চাইতে বেশি কিছু বিষয় আমাকে স্পর্শ করেছিল যদিও সেগুলো ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারিনি। তার ছয়/সাত বছর পর বইটা নিজে নিজে পড়ার সুযোগ হয়, তখন ঐ স্পর্শ করার বিষয়গুলো অনেকটা স্পষ্ট হয়। আর আজ প্রথম দফা পাঠের (শ্রবণের) প্রায় চার দশক পরে বইটা আবার পড়ে ওই বিষয়গুলোকে পুনরাবিষ্কার করলাম। বইটা এই কারণে হলেও কিছু পাঠকের কাছে টিকে থাকবে।
সময়ের সাথে সাথে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ভূগোলে পরিবর্তন, রীতি ও মূল্যবোধে পরিবর্তন অনেক ফিকশনকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেয়, অথবা পাঠকের বোধের অগম্য করে দেয়। প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে প্রকাশিত এই বইটা অমন সীমাবদ্ধতায় ভুগবে সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু লেখকের বর্ণনাগুণে অনেক জায়গায়ই পাঠক নিজে টাইম মেশিনে করে ঐ সময়ে পৌঁছে যেতে পেরেছে। লেখকের প্রথম সার্থকতাটা সেখানে। দ্বিতীয় সার্থকতাটা হচ্ছে ঐ স্পর্শ করার ব্যাপারটা। শিশু-কিশোরদের মন অনেকটাই অপাপবিদ্ধ এবং পরার্থপর। সেখানে অন্যের জন্য গভীর মমতা বাস করে। এই বইয়ের কিছু ঘটনায় শিশু-কিশোর পাঠক কিছু চরিত্রের মহত্ত্বে বা দুর্দশায় সহমর্মী হয়ে উঠবে, এমনকি এই কালেও।
মোহাম্মদ নাসির আলীকে লোকে চেনে মূলত 'ভীনদেশী এক বীরবল' বইটার জন্য। তবে তার সৃষ্ট 'লেবু মামা'ও পাঠকের কাছে খুব অপরিচিত নয়। লেবু মামা নিয়ামত হোসেনের 'ফেলু মামা' বা কাইজার চৌধুরীর 'বিল্টু মামা'র মতো মজার বা ক্লামজি নয়; বরং লেবু মামা অনেক বেশি মানবিক, বুদ্ধিমান, হৃদয়বান।
শিশুসাহিত্যিক মোহাম্মদ নাসির আলীর রম্য গল্পের সংকলন 'লেবুমামার সপ্তকাণ্ড'। ৭ টি রম্য গল্পের মাধ্যমে নির্মল আনন্দের উৎস সৃষ্টি করেছেন লেখক। গল্পগুলোর প্রধান চরিত্র গল্প কথক তথা বাচ্চুর মেজো মামার বন্ধু লেবু।
প্রথম গল্পের নাম 'বাজিমাৎ'। বাচ্চুর বড় মামার বিয়ে। তাই ঢাকা থেকে মেজো মামার বন্ধু লেবু আসবে। সবাই ভেবে বসেছিল লেবু বলতে খাবার লেবুর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু যখন দেখলো লেবু একজন মানুষের নাম, সবাই ত হেসে খুন! বাচ্চুর নানা বাড়ি ঢাকা জেলায় আর মামা বিয়ে করছে ফরিদপুরে। তখন ত আর বর্তমান সময়ের মতো গাড়ি ছিল না; প্রধান যাতায়াত ব্যবস্থা ছিল নদী পথে। বিয়ের দিন বরযাত্রী লঞ্চে চড়ে যাচ্ছিল। নদীর পাড় ঘেঁষে লঞ্চ যেতে যেতে চড়ায় আটকে যায়। এখন উপায়! অনেক কষ্টে দুইটি নৌকা যোগাড় করে তবেই পুনরায় যাত্রা শুরু করে সবাই। কিন্তু একটি নৌকার তলায় ছিদ্র থাকায় পানি উঠে সকল আতশবাজি নষ্ট হয়ে যায়। সকলের ত মাথায় হাত! বাজি ছাড়া বরযাত্রী ত উঠতেই দেবে না। ভাবনা কী! লেবুমামা ত আছেই। এই যাত্রায় উদ্ধার হতে বুদ্ধি অবশ্যই একটা বের হবে।
লেবুমামা ছেলেবেলায় কিছুদিন ঢাকায় থেকেছে। লেবুমামার ছোট চাচা ছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। সমিতির চাঁদা উঠানোর দায়িত্বও ছিল তাঁর কাছে। একদিন সাজ্জাদ চাচা লেবুকে বলেন যে একদিন তাঁর হয়ে চাঁদা উঠাতে। লেবুমামা সানন্দে রাজি হয়ে যায়। বাড়ি বাড়ি চাঁদা উঠিয়ে পার্কে বসে যখন টাকার হিসাব করছিল তখন এক লোক আসে তার কাছে। সাথে ছিল এক কুকুরের ছানা। আফ্রিকান বুলডগের বাচ্চা বলে কুকুরটি লেবুর কাছে সাত টাকায় বিক্রি করে লোকটি এবং বলে দেয় ভজহরি পাল নামের এক লোকের কাছে গেলে এই কুকুরটি পঁচিশ টাকায় বিক্রি করতে পারবে। কিন্তু কুকুর নিয়ে ভজহরি পালের কাছে গেলে দুরদুর করে তাড়িয়ে দেন লেবুমামাকে। সমিতির টাকায় কেনা কুকুরের বাচ্চা নিয়ে লেবুমামা ত বিরাট ফাপরে পড়লেন। এখন উপায়?
বাচ্চুদের বার্ষিক পাঠচক্রের বিচিত্রানুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। অনুষ্ঠানের বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পুরস্কার দেওয়া হয় এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানান তিনি কিছু ছেলেপিলেদের স্টিমারে করে ঘোরাবেন। বেশি চাঁদা দেওয়া সোহরাব আশা করছিল সবকিছুতেই তার অগ্রাধিকার থাকবে। কিন্তু দেখা গেল তার নাম অনেকটা তলানিতে। এমনকি নৌবিহারে তার নামই নেই। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এর অনুরোধে সমিতির পক্ষ হতে কিছু রিফিউজি বাচ্চাদের খাওয়ানোর দিন ঠিক করা হয়। অন্যদিকে অসন্তুষ্ট হয়ে সোহরাব ও তার অনুসারীরা একইদিনে অন্য একটি পার্টির আয়োজন করে। কিন্তু অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানালেন অনুষ্ঠানে তিনি থাকতে পারবেন না; তারিখ যেন পেছানো হয়। এই খবর রিফিউজি ক্যাম্পের ছেলেদের জানানোর দায়িত্ব ছিল বাচ্চুর উপর। অথচ সে লেবুমামার ঢাকা থেকে আগমনের আনন্দে ভুলেই গিয়েছিল। নির্দিষ্ট দিনে রিফিউজি ক্যাম্পের ছেলেমেয়েরা হাজির আর এদিকে ত সমিতির সবার চক্ষু চড়কগাছ! এখন এদের কীভাবে আপ্যায়ন করা যাবে! লেবুমামাই কি সেই দায়িত্ব নেবে?
টিকলুদের গ্রামের ক্লাবের রজত জয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নাটক মঞ্চায়িত করতে চায় সকলে। রজত জয়ন্তী শুনে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। তাদের ক্লাবের বয়স মাত্র এক বছর। কিন্তু নাটক পাবে কোথায়? সমাধান পাওয়া গেল লেবুমামার কাছে। লেবুমামা দায়িত্ব নেয় নাটক লিখে তা মঞ্চায়িত করার। কিন্তু নাটক লিখে এসে লেবুমামা দেখে যে মঞ্চের ঘর দখল করেছেন টিকলুর মায়ের মামা খান বাহাদুর সাহেব। তিনি কিছুদিন থাকবেন বলে ঠিক করেছেন। বয়স্ক মানুষ তাই অন্য ঘরে থাকতেও পছন্দ করেন না এবং এই ঘর থেকে যেতে বলাটাও কেমন যেন দেখায়! সকলেই যখন হতোদ্যম হয়ে নাটকের আশা বাদ দিয়ে দিচ্ছিল তখনই স্রোতের মাঝে খড়কুটো হয়ে লেবুমামার কারসাজি সবাইকে উদ্ধার করে। যার প্রভাব গিয়ে পড়ে বেতার কেন্দ্রের উপর। কী করেছিল লেবুমামা?
রম্য গল্পের মাধ্যমে পাঠককে সুস্থ বিনোদন দেওয়ার জন্য লেখকের মুন্সিয়ানা প্রয়োজন। সেদিক দিয়ে মোহাম্মদ নাসির আলী সর্বেসর্বা। গল্পগুলো ছেলে-বুড়ো সকলেই উপভোগ করতে পারবে। 'দীক্ষা' গল্পটি গতবছরও পাঠ্যবইতে ছিল। লেবুমামার মজাদার কর্মকাণ্ড পাঠককে হাসিয়ে ছাড়বে। আপনার বয়স যাইই হোক না কেন, বইটি পড়তে পারেন। হ্যাপি রিডিং।
অব্যশই পারে, অন্যতম শিশুসাহিত্য লেখক মোহাম্মদ নাসির আলীর বহুল প্রশংসিত সৃষ্ঠির নাম লেবু।
লেবুমামা দেখতে হালকা পাতলা আর শারীরিক ভাবে কমজোর হলে ও মুখের জোর অনেক বেশি। আর এই অতিরিক্ত মুখের জোরের কারনে পাড়েন অদ্ভুত সব বিপদে। আর সেই বিপদ থেকে মাঝে মাঝে উদ্ধার ও পান চাপার জোর দিয়ে।
লেবু মামা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম হাস্যরসারত্নক সৃষ্টি। দেশিও পটভূমিতে এমন রসাত্নক বই খুব কম ই দেখা যায়।
গুডরিডস থেকেই বইটা সম্পর্কে জানা৷ অনেক আগে শেষ করলেও আপডেট দেয়া হয়নি।
বইটা সুন্দর ছিল। কিশোর সাহিত্য হিসেবে সুখপাঠ্য। স্কুল পড়ুয়া কাউকে কি বই উপহার দেয়া যায়- এই চিন্তায় প্রায়ই পড়তে হয়। এই বইটা সে তালিকায় রাখার মতো।
পড়তে গিয়ে দেখি বেশিরভাগ গল্পই এখানে-ওখানে পড়েছি অনেক আগে। ছোট্ট বই। একটানে পড়ে ফেলা যায়। গল্পগুলো স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ টলটলে জলের মতো। অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে। এগুলো স্রেফ গল্প নয়, একটা অধুনালুপ্ত সময়ের প্রতিনিধিও বটে, যে সময়টার দিকে তাকাতে হয় ঈর্ষার চোখে। ধর্ম আছে, ধার্মিক মানুষ আছে কিন্তু গোঁড়ামির ছাপ নেই। বিয়েবাড়িকে কেন্দ্র করে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আর আন্তরিক উৎসবের সঙ্গে আজকালকার লোকদেখানো বিয়েগুলোর তুলনা চলে না মোটেও। স্কুলগুলোও অমন নেই আর, সেই রাশভারী হেডমাস্টার নেই, ছেলেদের শখের ক্লাবের নাট্যোৎসব নেই। যেসব নেই-কে দেখিনি, গল্পগুলো পড়ে বড়ো ইচ্ছে করে তাদেরকে ছুঁই। মোহাম্মদ নাসির আলীর গল্পগুলো সরল হাস্যরসের ভেতর দিয়ে সন্তর্পণে বুঝি আমাদের অকৃত্রিমতার অতীতকেই স্পর্শ করে।
যে দুষ্টুমিগুলো কেবল কৈশোর আর শৈশবে মানায় সেই গল্পগুলোর আয়োজন নিয়ে সপ্তকান্ডের সাজ। এই দুষ্টুমিগুলো বয়সে বাধা, একটু আগে হওয়া সম্ভব না আবার পরে হলেও মানায় না। রিভিউ স্পয়লারও হতে পারে অনুভূতিও হতে পারে। আমি কোনটা বলছি, সেটা আর বলছি না। লেবুমামার প্রজন্মের ডানপিটেপনা পাতায় সেঁটে গেছে বোধ করি। এখন তো অনেক জাতের অনেক মামা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের চাহিদা ও কর্মকান্ডের তফাৎ। লেবুমামার পাঠকদের জন্য সরলানন্দের শুভকামনা। দুরন্তপনার হাজার সংজ্ঞা। কালান্তর... আনন্দপাঠ্য।
আমি বই পরা শুরু করি মোহাম্মদ নাসির আলীর 'চীন দেশের রাজকুমারী' বইটি দিয়ে, শিশু কিশোরদের জন্য তার লেখা অতুলনীয় । লেবু মামার সপ্তকাণ্ড বইটি ১৯৬৮ সালে শিশু সাহিত্য হিসেবে ইউনাইটেড পুরষ্কার প্রাপ্ত। চোখ বন্ধ করে বইটি ছোটদের পড়তে দেওয়া যায়।
'লেবুমামার সপ্তকাণ্ড' বইয়ের লেখক মোহাম্মদ নাসির আলী ছিলেন ১৯১০ সালে বিক্রমপুরে জন্ম নেওয়া একজন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক। শিশু সাহিত্যের উপর প্রবর্তিত প্রায় সবগুলো পুরস্কারেই তিনি ভূষিত হয়েছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৪০ টিরও বেশি। তিনি শিশু সাহিত্যের পাশাপাশি শিক্ষামূলক গল্প, প্রবন্ধ ও জীবনীও লিখেছেন। তিনি তাঁর লেখায় হাস্যরস সৃষ্টিতে বেশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। এজন্য মোহাম্মদ নাসির আলীর লেখা মানেই অন্যরকম এক ব্যাপার। তাঁর লেখা 'লেবুমামার সপ্তকাণ্ড' বইটিও এমন একটি কিশোর গল্পগ্রন্থ, যে বইয়ের প্রতিটি গল্পই হাস্যরসের মাধ্যমে উপস্থাপিত হয়েছে। এই বইটি ১৯৬৮ সালে সেরা শিশু সাহিত্য হিসেবে ইউনাইটেড ব্যাংক পুরস্কার লাভ করে।
বইটি পড়ার পূর্বে প্রথমেই যে প্রশ্নটি মাথায় এসেছে, "লেবু" নামটি এই বইয়ে কিভাবে এল? লেবু যেহেতু একটি ফল, তাই এই ফলের সাথে নামটির নিশ্চই কোনো সম্পর্ক থাকতে পারে। কিন্তু গল্পে লেবুমামার সাথে লেবু ফলের কোনো সংযোগ পাওয়া যায়নি। আবার, সংসদ বাংলা অভিধানে লেবু শব্দটির ফলের পাশাপাশি আরও একটি অর্থ উল্লিখিত রয়েছে, তাহলো বোকা বা ক্যাবলা ধরণের লোক। লেখক যদিও বইতে এই নামটির রহস্য ভেদ করেননি, তবুও বইটি সম্পূর্ণ পড়ে আমার যা মনে হয়েছে, লেবুমামা মোটেও বোকা বা ক্যাবলা ধরণের মানুষ নন। তাকে বেশ বুদ্ধিমান ও সুচতুর ছেলে বলেই মনে হয়েছে।
'লেবুমামার সপ্তকাণ্ড' বইটিতে লেবু নামে একটি ছেলেকে কেন্দ্র করে মোট সাতটি গল্প রয়েছে। এই বইয়ের সপ্তকাণ্ড নাম থেকে অবশ্য পূর্বেই অনুমান করা যায় যে, এই বইয়ে মোট সাতটি গল্প থাকবে। এই বইয়ের প্রতিটি গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন লেবুমামা, যিনি হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে আসর উজ্জীবিত করে তুলতে পারেন এবং কঠিন পরিস্থিতি তিনি সহজে সামলে নিতে পারেন। তারই একটি দৃষ্টান্ত আমরা এই বইয়ের বাজিমাৎ ও মামা-ভাগ্নে গল্পে দেখতে পাই। বরযাত্রী হিসেবে বিয়ে বাড়িতে পৌঁছনোর পর মানসম্মান সব ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল কিন্তু লেবুমামা সেটা হতে দেননি। মামা-ভাগ্নে গল্পেও কিশোর পাঠচক্রের বার্ষিক সাধারণ সভা নিয়ে বেশ বিপাকে পড়তে হয়েছিল কিন্তু লেবুমামা ব্যাপারটা বেশ চতুরতার সাথে সামলে নেন। তিনি যে সবসময় এমন তুখোড় বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন তা নয়, দায়িত্বজ্ঞানহীনের পরিচয়ও দিয়েছেন যেটা আমরা এই বইয়ের 'কুকুর ছানার কারবার' গল্পে দেখতে পাই। এই বইয়ের প্রচ্ছদে এই গল্পটির চিত্রই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আমার কাছে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং লেগেছে উশুলের দণ্ড গল্পটি। এই গল্পটি পড়তে পড়তে আমার একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একবার আমার তিন বছরের এক ছোট্ট বাচ্চাকে সামলাতে যেয়ে হিমশিম খেতে হয়েছিল আমার। আমি সেদিন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলাম যে, বাচ্চা দুষ্টু হলে কী পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সেখানে লেবুমামার ছোট খালাম্মা জলি বনভোজনের চাঁদার টাকা উশুল করার জন্য নিয়ে গিয়েছিলেন এরকম একটা দুষ্টু বাচ্চা। ফলাফল যা হবার তাই হয়েছিল। বইয়ে এরকম হাস্যরসাত্মক ঘটনার পাশাপাশি রয়েছে ছাত্র-শিক্ষকের ঘটনা নিয়ে শিক্ষামূলক গল্পও। স্কুল জীবন আজ আমরা অনেকেই পার করে এসেছি। স্কুল জীবনে আমাদের অনেকেরই কোনো না কোনো প্রিয় শিক্ষক থাকেন, যাঁদের নিকট হতে অনেক মহামূল্যবান শিক্ষা গ্রহণ করি, যাঁদের নাম শুনলেই হৃদয় শ্রদ্ধায় ভরে যায়। আমিও এমন অনেক স্যার পেয়েছি স্কুল জীবনে। তাঁদের সাথে ভালো-খারাপ অনেক রকম ঘটনা আছে। থার্ড মাস্টার ও দীক্ষা গল্পদুটি যেন সেইসব পুরোনো স্মৃতি উথলে এনেছে আমার মানসপটে! এই বইয়ের শেষ গল্পটিও হাস্যরসের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে। দূরসম্পর্কের উটকো আত্মীয়কে বিদায় করার জন্য ছেলেপিলেরা অসাধারণ এক বুদ্ধি উদ্ভাবন করে।
ঠিক এরকম ছেলেপিলেদের মজার সব কাহিনী পড়তে পড়তে এক বসাতে শেষ হয়ে গেল বইটি। ষাটের দশকে বইটি রচিত হলেও বইয়ের ভাষা সহজ হওয়ায় বিন্দুমাত্র বিরক্তির উদ্রেক ঘটেনি। তথাপি, বইয়ের একটি চিত্র অবাক করেছে। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের সকলের প্রিয় কবি। তিনি যখন বেঁচে ছিলেন, মানুষ তাঁকে ও তাঁর সৃষ্টিকর্মকে কতটা ভালোবাসতো, তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে বইতে। যা আমাকে যারপরনাই অভিভূত করেছে।
বই : লেবুমামার সপ্তকাণ্ড লেখক : মোহাম্মদ নাসির আলী প্রকাশনী : নওরোজ সাহিত্য সম্ভার মুদ্রিত মূল্য : ৮০ ৳ মোট পৃষ্ঠা : ৭২ প্রকাশ : ১৯৬৮
কোন গুরুগম্ভীর বই পড়তে গিয়ে রিডার্স ব্লকে আক্রান্ত হলেই মাথায় একরাশ ভাবনা ঘুরপাক খায়-- সেটা কাটাতে কোন বইটা ছেড়ে কোন বইটা পড়ব সেই ভেবে। এরকমই এক মনমরা দুপুরে সেই ভাবনায় আচ্ছন্ন ছিলাম কিছুক্ষণ, আর তখনই স্মৃতির পাতা থেকে হঠাৎই কোন প্রাসঙ্গিকতা ছাড়াই ভোজবাজির মত মাথায় চলে এলো "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড" নামটি। একটু খোঁজাখুঁজি করতেই লেখকের নামটিও বেরিয়ে এলো! 😊
মোহাম্মদ নাসির আলীর লেখনশৈলীর সাথে পরিচিত নন এমন পাঠক খুব কমই পাওয়া যাবে। বিশেষ করে শিশু কিশোরদের কাছে তিনি এক অতি পরিচিত এবং প্রিয় নামও বটে! যতদূর মনে পড়ে, স্কুলে থাকতে কোন এক ক্লাসের পাঠ্যতালিকায় অন্তুর্ভুক্ত ছিলো তারই রচিত মজাদার কোন সাহিত্যকর্ম (নামটা মনে আসছে না এই মুহূর্তে)।
যাইহোক, মনমরা মেঘাচ্ছন্ন দুপুরে তারই লেখা এই বইটি নিয়ে বসে পড়লাম। এবং আমি ভাবতেও পারিনি, আমার সময়টা যে এত দারুণভাবে কেটে যাবে! ঘোলাটে সেই দুপুর ক্রমেই রূপান্তরিত হলো ঝলমলে বিকেলে, লেখকের লেখনীর জাদুতে! 😇
পুরো বইটিতে আছে সাত সাতটি হাস্যরসে টইটম্বুর দারুণ কাহিনী, এবং বলাই বাহুল্য, যেগুলোর প্রতিটিতেই মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন লেবু মামা স্বয়ং! গল্পগুলোর নাম--
লেবুমামার জীবনে ঘটে যাওয়া এই সাতটি রত্নসম হাস্যরসাত্মক অথচ ভাবনার খোরাক এনে দেয়া কাহিনীর জন্যই বইটির নামকরণ করা হয়েছে "লেবুমামার সপ্তকাণ্ড", যেগুলো বর্ণিত হয়েছে সম্পূর্ণই লেখকের বয়ান্স, উত্তম পুরুষের সাহায্যে।
ল��খকের কিশোর বয়সূ মেঝ মামার বন্ধু লেবুর সাথে লেখকের (বাচ্চু) পরিচয় হয় তার বড়মামার বিয়ের সূত্র ধরে, আর সেই সূত্র ধরেই লেবুর জীবনে ঘটতে থাকা নানান মজার অথচ চিত্তাকর্ষক সব কাহিনী বাচ্চু তুলে ধরেছে আমাদের সামনে। সেসব কাহিনীর মধ্য দিয়ে কখনো পাঠকের চোখে ধরা পড়েছে লেবুর অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা, পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষকদের সাথে করা দস্যিপনা, পরিস্থিতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে হঠাৎ হঠাৎ করে বসা বোকামো, এমনকি দরিদ্র রিফিউজি কিশোরদের প্রতি তার মহানুভবতাও।
পাঠকরা যদি আরো সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করেন, তবে এই কাহিনীগুলো উপস্থাপনের পেছনে লেখকের চমৎকার উদ্দেশ্যটিও তারা অনায়সেই ধরতে পারবেন। লেখক মূলত লেবু চরিত্রটিকে শিশু কিশোরদের জন্য একটি আদর্শ রোল মডেল হিসেবে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন, যার চরিত্রের রয়েছে নানান দিক বা আঙ্গিক। সে হয়ত দস্যিপনায় পটু, হয়ত ক্ষেত্রবিশেষে সে একটু বোকাসোকাও, কিন্তু দিনশেষে তার মাঝে রয়েছে এক সরল সহজ দয়ালু সত্তা, যা তাকে সাবলীল ও স্নিগ্ধ করে রাখতে বাধ্য হাজারো পাঠকের হৃদয়ে!
লেবু মামার নামখানা যেমন অদ্ভুত, তেমনি তার কিছু কিছু কর্মকাণ্ড আশ্চর্যরকম পাগলামোয় ঘেরা, যা তার পারিপার্শ্বিকতায় থাকা বড়দের মনে রাগের উদ্রেক তো করেই না, বরং তারা আরো চমৎকৃত হন লেবুর সারল্যমন্ডিত সেন্স অফ হিউমার দেখে, এবং তাদের সাথে সাথে আমিও তারিফ করতে বাধ্য হয়েছি কাহিনীর প্রতি পরতে পরতে তার উপস্থিত বুদ্ধিমত্তার অসাধারণ পরিচয় পেয়ে। একইসাথে আমার মনে অন্যরকম ভাললাগার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষেত্রবিশেষে তখনকার সামাজিক ব্যবস্থার কিছু কিছু পরিচয় পেয়ে (শিক্ষাব্যবস্থা, আনুষ্ঠানিকতা, নির্মল বিনোদন ব্যবস্থা, ইত্যাদি)।
সবশেষে এটুকুই বলব, লেখকের লেখনশৈলীর সাবলীলতা এবং গতিময়তাকে যদি উপলব্ধি করতে চান, যদি চান ক্ষণিকের জন্য সেই প্রেক্ষাপটের ক্লাসিক সময়টিতে নিজেকে খুঁজে নিতে, এবং সর্বোপরি ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমিতাকে ক্ষণিকের জন্য ভুলে গিয়ে সময়টাকে উপভোগ করতে, তাহলে এই বইটি আপনার জন্য সুখপাঠ্য হতে বাধ্য!
লেবুমামার সপ্তকাণ্ড লেখক: মোহাম্মদ নাসির আলী ধরন: শিশুতোষ গ্রন্থ প্রথম প্রকাশ: ১৯৬৮ প্রকাশনী: নওরোজ সাহিত্যসম্ভার মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা: ৭৮
আহ!সেই সময় গুলি!কত্ত মজার ছিল।কি সুন্দর মজার বইগুলো😍।এগুলি কখনো পুরনো হবার নয়।সেই ছোটবেলা এগুলা পড়তে পড়তে হেসে কুটিকুটি হওয়া কি সোনালী সময় ছিল! বাংলার এরকম সেরা সেরা বইগুলি আজীবন মানুষের আনন্দ এবং বিনোদনের খোরাক জোগাতে সাহায্য করবে সেই সাথে আমাদের শিশু সাহিত্য গুলি সমৃদ্ধ করে রাখবে🤗
গড়পড়তা মানের বই। খুব আহামরি কিছু নয়। তবে বাংলাদেশ জন্ম নেবার আগে থেকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের জীবনাচরণ যে অনেকটা উন্মুক্ত ছিল, স্বাতন্ত্র্যচিহ্নিত ছিল–এ বইটা থেকে তাও বোঝা যায়।
আসলেই দারুন লেখা। বর্তমানে এমন ধরনের বইয়ের খুব অভাব বোধ করি।শিশুমনের বিকাশ ঘটাতে এসব বই যে কি পরিমান সহায়তা করে তা না পড়লে বোঝার উপায় নেই। এসব বই রিকমেন্ড করি সব বয়সের পাঠকের জন্যই ।