জন্ম সিলেটে। ১৯৬০-এর এক শীতের ভোরে। বাবা, মোঃ আবদুন নূর। মা, সাঈফা খাতুন। দুই কন্যার জনক, বিদৌরা ও বিয়াস। স্ত্রী, আবেদা হক। পেশা, চিকিৎসক। কিশোরগঞ্জ-এর সরকারি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান।
এক নিঃসঙ্গ চা-বাগানের সবুজ নিসর্গে তার বেড়ে ওঠা। সেখানে সারাদিন পাতাঝরার বনে বাতাসের জিফিল সুরের মুর্ছনা তুলতো। বাসার পেছনেই ছিলো সবুজ চায়ের বন। সাদা বালুঢাকা পথ সেই বনের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে কোথায় যে হারিয়ে গেছে। সে পথে সোনালী রোদের ভোরে, নরোম পালকের দুপুরে সাওতালি নারীপুরুষ কুর্মি মুন্ডা রৌতিয়া আহির বিরহোররা সার বেঁধে কাজে বেরোতো। বনের ভেতরে আরো দূরে চা-বাগানের নিঝুম স্টাফ-কোয়ার্টার। উদাস দুপুরে দূরের সাঁওতালপাড়া থেকে মাদলের সাথে ভেসে আসতো দেহাতি গানের সুর।
বাবার চাকরির সুবাদে যে চা-বাগানে বেড়ে ওঠা সেই মালনীছড়ায় এখন আর যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। পেশাগত ব্যস্ততায়।
চায়ের বনের মানুষ তিনি, স্বপ্ন দেখেন আবার একদিন চা-বাগানে ফিরে গেছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন শিরীষ-চাপালিশের ছায়ায় ছায়ায় বন-জ্যোৎস্না গায়ে মেখে পাহাড়ের ঢালে বসে থাকা বুনো বেড়ালের খোঁজে বেড়াচ্ছেন রাতের জঙ্গলে।
প্রিয় একটা বই আবারো পড়লাম। সেদিন বাংলাবাজার থেকে ফেরার পথে নাবিল আর শরীফ ভাইয়ের সাথে আলাপ হচ্ছিল ডঃ আবদুল হাই মিনারের বইটা নিয়ে। খুবই হতাশাজনক হলেও সত্য যে এরকম একটা বই 'আউট অফ প্রিন্ট'। অতিপ্রাকৃত জঁরের বই বিবেচনায় খুব সহজেই ক্লাসিক স্বীকৃতি পাবে 'জামশেদ মুস্তফির হাড়'। সেবার এই উন্নাসিক মনোভাবের কারণে দারুণ অনেক লেখা হারিয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ভাবি, বাংলায় থ্রিলার কিংবা রহস্য সাহিত্যের আতুড়ঘর হিসেবে সেবা প্রকাশনী যদি তাদের মৌলিক লেখকদের পরিচর্যা করতো, তবে এখনকার দৃশ্য কি হতো? সেবার অনুবাদ অবশ্যই মানসম্পন্ন, সুতরাং মৌলিক লেখাও তারা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের বিবেচনাতেই বের করতো নিশ্চিত। যে কথাটা অনেককেই বলতে শুনি, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রকাশিত থ্রিলারগুলোকে 'মৌলিক থ্রিলার' বলে আলাদাভাবে আখ্যায়িত করার প্রয়োজনীয়তা কি? আসলেও তো, ইংরেজি বা অন্য ভাষায় লেখকেরা যখন থ্রিলার লেখেন, তখনও তো তাদের গুলো মৌলিক রচনাই থাকে, নাকি? এর একটা জবাবও খুঁজে পেয়েছি। মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কিশোর হরর, ওয়েস্টার্ন- সেবার বিখ্যাত সব সিরিজই অনুবাদ কিংবা রূপান্তর। এবং থ্রিলার সাহিত্যে সেবা প্রকাশনীর একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে, একসময় "থ্রিলার=বিদেশি কাহিনী অবলম্বনে" ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে যায়। ২০১০ এর পর থেকে এজন্যেই 'মৌলিক থ্রিলার' ট্যাগটির দরকার পড়ে। এর আগেও কিন্তু অনেক থ্রিলার লেখেছেন আমাদের নিজস্ব লেখকেরা। আক্ষেপ থেকেই কথাগুলো বলা।
এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প এই সংকলনের। একদম ছোট্ট একটা ক্যানভাসে, শুধু কথার ছন্দে কি সুন্দর একটা গল্প ফেঁদেছেন মিনার সাহেব। কুটি কবিরাজের গল্পগুলোও দারুণ, স্বতন্ত্র একটি সিরিজই হতে পারতো গল্পগুলো নিয়ে। রূকারী দ্বীপের রহস্য দুর্দান্ত একটা সায়েন্স ফিকশন, হাল আমলের ডঃ কিজিলের কথা মনে পড়ে গেল পাগলাটে সার্জনের বর্ণনা পড়ে। ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন আর হাস্যরস গল্পগুলোকে আরো উপভোগ্য করে তুলেছে। ধন্যবাদ আবদুল হাই মিনার, শৈশবকে কিছুটা হলেও রঙিন করার জন্যে।
কুটি কবিরাজ কবিরাজি করে ভালোই নাম-ডাক কামিয়েছে। সেই কুটি কবিরাজ যখন জামশেদ মুস্তফি'র দেখা পেল তখন সবকিছু ছেড়ে-ছুড়ে কেন তার পিছু নিল? কীসের নেশায় নিজের পেশা, জীবন-যৌবন সব চুলায় দিয়ে জামশেদ মুস্তফি'র পিছু পিছু ল্যাজ নেড়ে নেড়ে পাহারাদার কুকুরের মতো ঘুর ঘুর করতে লাগল? নিশ্চয়ই কোন স্বার্থ আছে, কী সেই স্বার্থ? জামশেদ মুস্তফির হাড় বইয়ের নাম গল্পটি এমনই চমক জাগানিয়া। বাকি গল্পগুলোও দারুণ। বিশেষ করে কুটি কবিরাজকে নিয়ে লেখা পাঁচটি গল্পই বেশ জমজমাট।
রূকারী দ্বীপের রহস্য তো দারুণ একটা সাই-ফাই। জনমানবহীন এক নির্জন দ্বীপে আটকে পড়া দুই প্রফেসর ভূতুড়ে গলার গান শুনতে পেয়ে সারা দ্বীপ চষে ফেলেও কোন মানুষের সন্ধান পান না। শেষমেশ তাদের সুলুক-সন্ধানে যা বেরিয়ে আসে সেটা রীতিমত চমকপ্রদ।
বালক রহস্য, বাদুর, পতংগ-রহস্য গল্পগুলোও যথেষ্ট তৃপ্তিদায়ক। ভালো ভালো গল্পগুলোর মাঝে ভুতুড়ে ইস্টিশন আর এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন গল্প দুটোই যা একটু ডাউন খেয়ে গেছে।
আবদুল হাই মিনার-এর ভাষাশৈলী, শব্দচয়ন দারুণ। পড়তে ধরলে ডুবে যেতে সময় লাগে না মোটেও। এই সংকলনগুলোই সেবার স্ট্যান্ডার্ডের ট্রেডমার্ক। দুঃখের বিষয় এমন সংকলন এখন আর নিয়মিত বেরোয় না।
ভয় পাওয়ার কোটা আমার এতটাই কম থাকে যে কর না গুনে কিছু না বলেই আমার মুখ দেখেই কেউ ক অক্ষর গোমাংস হলেও ঠিক বুঝতে পারবে আমি ভীতু.😑
সুতরাং ভয়ের প্রয়োজনে বেশ আয়োজন করেই আমি প্রস্তুতি নেই ভৌতিক আধিভৌতিক কিংবা ব্যাখ্যাতীত ঘটনা যেন আমার রাতের ঘুমের মধ্যে দুর্ঘটনা না ঘটায়। কুটি কবিরাজের বেলায় ও কার্পন্য ছিলো না একটুও;
একে তো ক্লাসিক দুষ্প্রাপ্য বই তারউপর বিষয়বৈচিত্র্য এই দুয়ের মিশেলে পাঁচ মিশালী উপাদেয় সুখাদ্য গলাধঃকরণের কিঞ্চিত ও কষ্টবোধ হয়নি.
সেই কল্পকাহিনী থেকে মহাকাশের গল্পের প্রতিটা পাতায় কুটি কবিরাজের কারিশমায় কুপোকাত আমার বাছবিচারের বালাইয়ের জন্য একটুও আফসোস না হয়ে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে গল্পের নটে গাছটি মুড়াতে মন্দ লাগেনি।
আমি ভীতু মানুষ। তাইতো পারতপক্ষে ভৌতিক মুভি দেখি না বা বই পড়ি না। কিন্তু এই ভৌতিক বইটার কথা এত বেশি শুনেছি যে না পড়ে আর থাকা গেল না! বইটা মূলত লেখকের সৃষ্ট আইকনিক চরিত্র ‘ কুটি কবিরাজ' কে নিয়ে লেখা ছয়টি এবং অন্যান্য তিনটিসহ মোট নয়টি গল্পের একটা সংকলন।
কুটি কবিরাজ ষাটোর্ধ্ব এক বৃদ্ধ। বাপ-দাদা থেকে প্রাপ্ত কবিরাজি করেই তার কালাতিপাত হয়।তার সব অদ্ভুত, আধিভৌতিক, অপ্রাকৃত কাজের সঙ্গী হয় তার একসময়ের সহপাঠী ও বন্ধু অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল গোলাম আহমদ মুনতাসীর হায়দার ওরফে তুলু। দুজন একত্রে কখনও কবরস্থানে, কখনও তান্ত্রিকের সামনে, কখনও প্রাণীরূপী অশুভ আত্মার সাথে আবার কখনওবা হাজির হয় পূর্বপুরুষের ভুল সংশোধনের কাজে। আর এসব কাজ করতে গিয়ে তাদের দুজনকে বারবার পড়তে হয় শত্রুর থাবার সম্মুখে কিন্তু বন্ধুত্বের দাবি নিয়ে দুজন মিলে প্রতিটা সমস্যার সমাধান তারা করে অতি দক্ষতার সাথে।
এক বাক্যে পাঠ প্রতিক্রিয়া বললে বইটা পড়ে আমি মোটামুটি সন্তুষ্ট। বইটার যেরূপ নাম শুনেছিলেন, ‘ বাংলা সাহিত্যের একমাত্র ভৌতিক ক্লাসিক ‘ বা এজাতীয় প্রশংসা শুনে যেই প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল বইটা ততটা মেটাতে না পারলেও বেশ ভালো একটা সময় কাটিয়েছি বইটা নিয়ে । তারমানে আমি এটা বলছি না যে বইটা একদম অখাদ্য ; তবে যেভাবে মাস্টারপিস বলা হয় সেটাও না আরকি!
বইটার কয়েকটি ভালো দিকের কথা বললে প্রথমেই বলতে হবে কুটি কবিরাজ চরিত্রটার কথা। লেখক দারুণভাবে একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন যা পাঠকের অনেক দিন মনে থাকতে বাধ্য��� সাথে কবিরাজের অভিযানগুলো বর্ণনা করার জন্য লেখক যে চরিত্রটার আশ্রয় নিয়েছেন তথা তুলু চরিত্রটা সেটাও বেশ মজাদার। এভাবে প্রতিটা গল্পে দুজনের বেশ চমৎকার একটা বন্ধুত্ব ফুটে উঠেছে বইজুড়ে। দ্বিতীয় যে বিষয়টা বলা যায় তা হলো বিষয়বস্তুর ব্যাপ্তি। কল্পনালোকের আশ্চর্য ঘটনা থেকে আধিভৌতিক কাজকর্ম, সাইন্স ফিকশন হয়ে মহাজাগতিক ব্যাপার-স্যাপার – বইটার বিষয়বস্তুর বিস্তৃতি ব্যাপক। তৃতীয়ত গল্পগুলোর গল্প হয়ে ওঠার যাত্রা তথা কাহিনী বিন্যাসও বেশ চমৎকার। ধীরে ধীরে সাধারণ ঘটনার মাধ্যমে শুরু হয়ে প্রতিটা গল্পই শেষদিকে পাঠককে একটা ধাক্কা দিয়েছে। চতুর্থত বলা যায় লেখকের বর্ণনাভঙ্গির কথা। সহজ-সরল ভাষায় লেখক তৈরি করেছেন গল্পগুলোর কাঠামো।
যদি নেগেটিভ দিক বলতে হয় তাহলে বলব গল্পগুলো মোটামুটি একই গঠন অনুসরণ করে এগিয়েছে। ধীরে ধীরে কাহিনী গড়ে তোলা, একটা চরম মুহূর্ত আর শেষদিকে টুইস্ট – প্রতিটা গল্প এই ছকে বাঁধা। ফলে গল্পগুলো পড়তে গিয়ে ভালোই লেগেছে কিন্তু না পড়লে যে অনেককিছু মিস হয়ে যেত বা গল্পগুলো অনেকদিন মনে থাকবে সেরকম কিছু না। নয়টা গল্পের মধ্যে এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন আর রুকারী দ্বীপের রহস্য গল্প দুটো বেশি নজর কেড়েছে। মোটের উপর, আমার পক্ষ থেকে ৩.৫/৫।
কুটি কবিরাজ। নাম ভুমিকায় যার নাম সে পেশায় কবিরাজ, কবিরাজি করে ভালই যশ খ্যাতি কামিয়েছে। কিন্তু অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রতি তার টান অপরিসীম। তাই যখন জামশেদ মুস্তাফির দেখে পেল সব কিছু বাদ দিয়ে তার পিছনেই লেগে থাকল অনেক বছর ধরে। কুটি কবিরাজের কিছু কাহিনী আর আর কিছু অতিপ্রাকৃত কাহিনী নিয়েই সাজানো এই বই।
পাঠপ্রতিক্রিয়াঃ ছোট হরর গল্পের প্রতি কেন যেন আগে থেকেই টান ছিল আমার। আর সেবার এই ক্লাসিক দেখে কেন যেন এক টানে পড়ে ফেললাম। পাঠককে বইএ ধরে রাখার ক্ষমতা আছে আবদুল হাই মিনারের। একটুকু বিরক্তিরও উদ্রেক হয়নি। পড়তে যেয়ে তারানাথ তান্ত্রিকের ফিল পাছিলাম
অনেক দিন পরে একটা বইকে পাঁচ তারা দিলাম। কোন রকমের খেদ না রেখেই দিলাম। এই বইয়ের গল্পগুলো যদি বিদেশী গল্পের ছায়া অবলম্বনেও হয় তাতেও অসুবিধা নেই।
আবদুল হাই মিনারের লেখার সাথে আমার পরিচয় যখন আমি ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। বোধকরি উনি নিজেও তখন মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র। ঐ সময়ে কোন এক দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায় দুই কি তিন পর্বে প্রকাশিত তাঁর 'ইউটোপিয়া রহস্য' পড়তে পাই। চমৎকার গল্প! সেই গল্পের খুঁটিনাটি কিছু কিছু এখনো মনে আছে। তার পরে পড়তে পাই 'ভূতুড়ে ইস্টিশন' - সেটাও দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায়। গল্পটা আমার মাথায় স্থায়ীভাবে বসে যায়। এই লেখকের বই পড়তে না পাওয়া পাঠক হিসাবে আমার বড় লোকসান।
এই সংকলনের যে কপি আমি পেয়েছি সেটা অসম্পূর্ণ বলে মনে হচ্ছে, কারণ শেষের দিকে নেই। এখানে 'ভূতুড়ে ইস্টিশন', 'জামশেদ মুস্তফির হাড়', 'এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন', 'ফতেহ্গড়ের তান্ত্রিক', 'বাদুর', 'রূকারী দ্বীপের রহস্য', 'বালক-রহস্য', 'শকুন', ও 'পতঙ্গ-রহস্য' এই নয়টি গল্প পেয়েছি।
গল্পগুলো সম্পর্কে কোন কিছুই বলবো না। কারণ, আমি চাই পাঠক কোন প্রকার পূর্ব ধারণা ছাড়া গল্পগুলো পড়ুন।
বাংলা ভাষায় লেখা অতিপ্রাকৃত গল্প সংকলনের মধ্যে 'জামশেদ মুস্তফির হাড়' একটি গুরুত্বপূর্ণ বই।
পুনশ্চঃ রকমারীতে দেখলাম 'ফতেহ্গড়ের তান্ত্রিক' ১১২ পৃষ্ঠার এবং 'রূকারী দ্বীপের রহস্য' ৮০ পৃষ্ঠার বই। এছাড়া 'কুটি-কবিরাজের বিচিত্র কাণ্ড' নামেও একটা বই আছে। তাহলে গল্পগুলো কি উপন্যাসে রূপ নিলো, নাকি উপন্যাসগুলো এখানে গল্প হয়ে গেলো!
দারুন বই!! সেবার অফিস থেকে বাগাতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে হচ্ছে! ... কুটি কবিরাজের গল্পগুলো দারুন, রূকারী দীপের রহস্য গল্পটাও দারুন ছিল :)
বই এর মোটামুটি সবগুলো গল্পই দারুন, ভাষার প্রয়োগে লেখকের নিজস্বতা রয়েছে, যদিও কিছু গল্পে ভাষা একটু সাবলীল হলে আরো ভালো লাগতো, তবে এটা একান্তই ব্যক্তিগত মতামত :)
যাই হোক,সুপারন্যাচারাল গল্প প্রেমীদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য ^_^
কি অসাধারণ সব গল্প।কি অসাধারণ সব প্লট।রুকাই দ্বীপের রহস্য সবচেয়ে প্রিয় গল্প এই বইয়ের।ওয়ান অফ দি বেস্ট সাইফাই গল্প আমার পড়া।আফসোস যে ভদ্রলোক কেন এখন লিখেন না!
সময় আর মাত্র বারো ঘন্টা! সঙ্গীকে ছেড়ে দাও, নয়তো খুন করা হবে কুটি কবিরাজকে।
আজ সকালে এমন একটি বেনামি চিঠি পেয়েছে কর্নেল (অবঃ) গোলাম আহমদ মুনতাসির হায়দার। কে বা কারা জানাচ্ছে, ওদের একজনকে আটকে রেখেছে কুটি কবিরাজ। তাই চরম প্রতিশোধ নেবে তারা।
কুটি কবিরাজ, কর্নেলের বাল্যবন্ধু। পড়ালেখায় বিশেষ এগোতে পারেনি, কিন্তু কবিরাজির মাথাটা পাকা। জগতের উদ্ভট সব রহস্যের প্রতি তার ঝোঁক। বিয়ে শাদি করেনি৷ এই বুড়ো বয়সেও বনেবাদাড়ে পাহাড়ে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায় রহস্যের খোঁজে। সিলেটের জাফলংয়ে টিলার উপরের বাংলোতে তার আস্তানা। সঙ্গী কুটির চাকর আরমান আলী।
তা কুটি কবিরাজের পক্ষে ঝামেলায় জড়িয়ে পড়া বিচিত্র নয়। তাই বলে জলজ্যান্ত একটা মানুষকে আটকে রাখবে? কর্নেল ছুটলো জাফলং।
পৌঁছেই চমক! তিনমাস আগে যে আরমান আলীকে হাড় জিরজিরে দেখেছিল কর্নেল, সে দিব্যি তেল চুকচুকে নধর হয়ে ওঠেছে! সবই কবরেজ চাচার হেকমতি - দাঁত দেখিয়ে জানালো আরমান।
চিঠির কথা শুনে কুটি কবিরাজ তো আকাশ থেকেই পড়লো, কাকে আবার আটকে রাখলাম! কিন্তু সে রাতে, কুটি ঘুম থেকে ডেকে তুললো কর্নেলকে। চিঠিটা আবার দেখতে চাইলো। আশ্চর্য! চিঠির সবগুলো অক্ষর মুছে গিয়ে, এক কোণে রয়েছে কেবল একটা রক্তবিন্দু!
কুটি জানালো, চিঠির অভিযোগ সত্যি। দাওয়াং এর জঙ্গল থেকে সে আর আরমান আলী ধরে এনেছে কাউকে, দশ দিন আগে। কিন্তু তাকে ছেড়ে দেওয়ার আর উপায় নেই। খুন করে ফেলেছে তাকে! শিউরে উঠলো কর্নেল, যখন দেখলো জানালার বাইরে বাদাম গাছের ডালে ডালে ঝুলে আছে বাদুড়। নিষ্পলক হিংস্র চোখে চেয়ে আছে বাংলোর দিকে।
কাকে ধরে আনলো কুটি কবিরাজ? পালানোরও উপায় নেই। পঙ্গপালের মত আসছে বাদুড়ের দল। রক্ত-হিম করা চিৎকার দিয়ে উঠলো আরমান! খেয়ে ফেলছে ওকে!
'কুটি কবিরাজ' লেখকের সৃষ্ট এক রহস্যময় চরিত্র। কিছুটা হাস্যকর ভাবে উপস্থাপন করা বুড়ো এই কবিরাজের গল্পগুলো শুরুতে থাকে মজার, যত এগোয় গা শিউরানো অতিপ্রাকৃত ঘটনার মধ্যে টেনে নিয়ে যায় পাঠককে। পুরোনো সিলেটের পটভুমিতে সাজানো গল্পগুলোতে কুটি কবিরাজের বিচিত্র কর্মকান্ড উত্তম পুরুষে বর্ণনা করেছে তার বাল্যবন্ধু প্রাক্তন এক কর্নেল। দুজনে মিলে দুর্গম অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায়, অতিপ্রাকৃত সব রহস্যের সন্ধানে।
কথাসাহিত্যিক ডা.আবদুল হাই মিনারের লেখালেখির শুরু আশির দশকে। দৈনিক পত্রিকায় ছোটদের পাতায় লিখেছিলেন 'ইউটোপিয়ার রহস্য', 'ভুতুড়ে ইস্টিশন' সহ কিছু ছোটগল্প। খ্যাতি এনে দেয় সেবা প্রকাশনী থেকে প্রকাশ পাওয়া কুটি কবিরাজের গল্পগুলো নিয়ে মৌলিক সংকলন 'জামশেদ মুস্তফির হাড়' বইটি। পরবর্তীতে আরো লিখেছেন 'রূকারী দ্বীপের রহস্য', 'ফতেহগড়ের তান্ত্রিক', 'কুটি-কবিরাজের বিচিত্র কান্ড', 'নীল দরজার রহস্য' সহ আরো অনেক বই।
লেখকের ভাষাশৈলী আর শব্দচয়নের পাশাপাশি হাস্যরস আর থ্রিল ফুটিয়ে তোলার দক্ষতাও তার গল্পগুলোকে সুখপাঠ্য করেছে। ছোট এবং গোছানো প্লটের গল্পগুলো মজার চালে শুরু করে মাথা ঘোরানো টুইস্ট দিয়ে শেষ করাই লেখকের গল্পের বড় শক্তি।
দুঃখজনক যে লেখকের এই চমৎকার গল্পগুলো রিপ্রিন্ট হয় না।
লেখক আবদুল হাই মিনার এর "জামশেদ মুস্তফির হাড়" বইটা মূলত, তাঁর লেখা বিখ্যাত চরিত্র কুটি কবিরাজকে নিয়ে লেখা গল্প প্রাধান্য পেয়েছে বেশি। কুটি কবিরাজ ষাটোর্ধ এক কবিরাজ, যিনি তার বন্ধু তুলুকে নিয়ে বিভিন্ন ভৌতিক, ফ্যান্টাসি ঘরনার ঘটনার সাথে বার বার জড়িয়ে পড়েন। এবং তা সমাধানের পথ খুঁজেন। লেখকের লেখনীতে এসব অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা গুলোই গল্পের আকারে উঠে এসেছে।
হালকা ধরনের ভৌতিক গল্প পড়তে যাদের পছন্দ তারা এই বইটা ট্রাই করতে পারেন। বেশ কিছু গল্প আছে, যার সবগুলোকে ভৌতিক বলে চালানো যাবেনা হয়তো। কয়েকটা ফ্যান্টাসি, কয়েকটা ভৌতিক। আদতে ভৌতিক গল্প বলতে হাড়হিম করা গল্প যারা বুঝেন তাদেরকে এই বইটা হতাশ করতে পারে। এক বসায় পড়ে শেষ করার মতো বই। গল্পগুলোর আকাড় খুব ছোট ছোট হওয়ার কারনে গল্পের কাহিনী নিয়ে আলোচনা করা গেল না। ব্যক্তিগতভাবে আমার পছন্দ "জামশেদ মুস্তফির হাড়"। এই গল্পের নামেই বইটার নামকরণ। ফ্যান্টাসি, ভৌতিক গল্প পছন্দ করেন যারা, তারা এই বইটা পড়ে দেখতে পারেন। খুব বেশি ভালো লাগবে এমনটা বলছিনা। তবে গল্পগুলোর সাথে আপনার সময় ভালো কাটবে।
ভদ্রলোকের লেখার হাত দারুণ, কোনো সন্দেহ নেই। আজ থেকে প্রায় ৫০ বছর আগে প্রকাশ পাওয়া হিসেব করলে বইটার গল্পগুলোকে এক্সক্লুসিভও হয়তো বলা যাইতে পারে, তবে ২০২৫ এ এসে বইটাকে আমার কাছে খানিকটা ওভাররেটেডই মনে হলো।
বেশ কিছুদিন ধরেই ভালো একটি ছোটগল্প সংকলনের খোঁজে ছিলাম। বড় কোনো উপন্যাসের সাথে পড়ার জন্য। বাদাম খাবার সময় বিট লবণ যেমন বাদামের স্বাদ বৃদ্ধি করে তেমনি বড় কোনো উপন্যাসের সাথে ছোট গল্পের মিশ্রণ বেশ উপাদেয় মনে হয় আমার কাছে। কারণ এভাবে সমান্তরালে দুটো বই পড়লে পড়াটাও তাড়াতাড়ি এগোয় আবার বড় বইয়ে বিরক্তি বোধটাও ততোটা আসে না। সেবা প্রকাশনীর ছোট গল্প সংকলন জামশেদ মুস্তফির হাড় ভেবেছিলাম একটা-দুটা করে আস্তে-ধীরে শেষ করব। কিন্তু শুরুর গল্পতেই যেরকম মুগ্ধ হলাম এরপর কখন যে একটানেই বইটি শেষ করে ফেলেছি টেরই পাইনি৷ আবদুল হাই মিনার এর এ বইটিতে সর্বমোট ৯টি গল্প ছিল। কোনো গল্প ছিল হালকা ভয় জাগানিয়া , কোনোটি সাই-ফাই ঘরানার, কোনোটি ছিল নিখাঁদ রোমাঞ্চকর। বেশ কিছু গল্পে ছিল তুলু আর কুটি কবিরাজ নামে দুই বন্ধুর এডভেঞ্চারাস নানা ঝামেলায় ফেসে যাওয়ার রোমাঞ্চকর কিছু কাহিনী । জামশেদ মুস্তফির হাড় গল্পে প্রথম তাদের দেখা পাওয়া যায়, যে গল্পটির নামে বইয়ের নাম। এরপরে আরো বেশ কিছু গল্পে দু'জন একসাথে এসেছেন। গল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভালো লেগেছে জামশেদ মুস্তফির হাড় আর রূকারী দ্বীপের রহস্য গল্পদুটি। ভারী কোনো বই শেষ করে হালকা ধাঁচের কোনো বই পড়তে চাইলে এটি পারফেক্ট। তাহলে আর দেরি কীসের? কুটি কবিরাজের সাথে জামশেদ মুস্তফির হাড়ের পিছনে ঘুরে বেড়াতে আপনাদের আমন্ত্রণ রইলো।
গতানুগতিক অতিপ্রাকৃত গল্পের তুলনায় অনেকটা ভিন্ন এই ছোটগল্পের সংকলনটা। লেখক একটা স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন প্রতিটি গল্পে। কিন্তু তবুও সবদিক বিবেচনায় গল্পগুলোর বেশিরভাগই মোটামুটি মানের। রেটিং ৩ পাওয়ার যোগ্য। তবে "এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন" নামক গল্পটি আমার পড়া সেরা হরর ছোটগল্পের একটি। এটার জন্যই ৪ দেয়া।
কিশোর বাংলা। সেই আশির দশকে ৩২ পৃষ্ঠার একটা পত্রিকা বের হতো। মাত্র ২/৩ টি সংখ্যা হাতে পেয়েছিলাম। তাতেই পড়েছিলাম অতিপ্রাকৃতিক এক গল্প- এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন। অসামান্য ভাষায় বুনে তোলা নিটোল গল্প। তারপর সেই পত্রিকাটাও হারিয়ে ফেললাম, ভুলেও গেলাম গল্পের কথা।
ঠিক নব্বইয়ে পেলাম সেবা থেকে বেরনো একটা বই- জামশেদ মুস্তফির হাড়। লেখকের নাম শুনিনি আগে। পড়তে পড়তে বুঝলাম এই ভাষা আমার পূর্বপরিচিত। তারপর পৃষ্ঠা উলটে ফিরে পেলাম শিশুকালে হারিয়ে ফেলা সেই গল্পটি। আবদুল হাই মিনার সেইসব বিরল লেখকদের একজন যাঁরা একটি বই লিখেই জয় করে নিয়েছেন পাঠকের মন । ইদানিং অবশ্য এই বই আর পাওয়া যায় না। গল্পগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে আরো কয়েকটা বইয়ে। এমন আলোড়ন তোলা বই সেবা কেন রিপ্রিন্ট করল না জানা নেই।
পাঁচ তারা দাগিয়ে ট্রিবিউট দিয়ে গেলাম হাড়ের মালিককে।
অসাধারণ ! প্রতিটা গল্পের শেষে অবাক হয়ে নিরুদ্দেশ তাকিয়ে থাকতে হয়। কি থেকে কি হয়ে গেল বোঝার চেষ্টা করতে হয়। অবাক এবং আশ্চর্যের মধ্যবর্তী সমঝোতা করার চেষ্টা করতে হয়। সত্যিই অসাধারণ।
নাম দেখে ভেবেছিলাম ক্যানিবালিজম নিয়ে বোধহয়। আসলতে তেমনকিছু না। আধা-ভৌতিক গল্পের সংকলন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে "এইচ বাই বারো গুলু খাঁ লেন" গল্পটা। সময় কাটানোর জন্য পড়া যায়।
অসাধারণ.. অসাধারণ... এবং অসাধারণ। কমপ্লিমেন্টটা সম্পূর্ণ ব্যাক্তিগত; কারন যে জনরাটাকে এতো ভালবাসি, সেটা নিয়ে লেখক এতো সুন্দর করে লিখেছেন---! আফসোস, তাকে ভালবাসা জানানো ছাড়া আমার কিছুই করার নেই।