• একটা প্রাচীন কথা আছে— "ধনীর যম, গরীবের বন্ধু"। আমি নিশ্চিত যারা এখন এই লেখাটা পড়ছেন, তাদের প্রত্যেকের মাথায় একইসাথে একটা নামই এসেছে। রবিনহুড! রবিনহুড ছিলেন ইংরেজ লোককথার এক দুর্ধর্ষ ডাকাত, অত্যন্ত দক্ষ তীরন্দাজ। অত্যাচারী ধনীদের সম্পদ ডাকাতি করে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন তিনি।
• নামকরণ থেকেই পাঠক আন্দাজ করতে পারবেন গল্পের মূল আকর্ষণ। সাতটা কাঁকাতুয়া। না, ঠিক সাতটা না। ছয়টা হলদেঝুটি কাঁকাতুয়া, একটা ময়না। অদ্ভুত নাম তাদের। অদ্ভুত তাদের আওড়ানো বুলি। লিটল বো-পীপ, বিলি শেকসপীয়ার, ব্ল্যাকবিয়ার্ড, রবিন হুড, শারলক হোমস, ক্যাপ্টেন কিড, স্কারফেস এমনসব অদ্ভুত নাম রাখে কেউ নিজের পোষা পাখির? এদের মধ্যে কেউ আবার জানে মাদার গুজ, কেউ আওড়ায় শেকসপীয়ার, কেউ জলদস্যুর মতো রুক্ষ কন্ঠে নিজেকে ব্ল্যাকবিয়ার্ড দ্য পাইরেট বলে পরিচয় দেয়, কেউ বলে উঠে পুরোনো কোনো স্ল্যাং। আচ্ছা, কাঁকাতুয়াকে তো কতরকম বুলিই শেখানো যায়। তাহলে বেছে বেছে এমন অদ্ভুত সব কথাই কেন শেখানো হলো?
• রহস্যের একদম গোড়ায় খুঁজতে গেলে আমরা একজন উচ্চশিক্ষিত ইংরেজকে পাই; লং জন সিলভার। যার সাহিত্যপ্রেমের নমুনা আমরা ইতোমধ্যেই পেয়ে গিয়েছি। নিজের নাম, নিজের পোষাপাখির নাম কিংবা তাদের শেখানো বুলি সব ক্ষেত্রে তিনি সাহিত্যের আশ্রয় নিয়েছেন। নিজের নাম রেখেছেন বিখ্যাত "ট্রেজার আইল্যান্ড" উপন্যাসের সেই জলদস্যুর নামে। তার কাঁকাতুয়াগুলোর নামও উঠে এসেছে ইংরেজি ক্লাসিক সাহিত্য কিংবা ইতিহাসের পাতা থেকে। ইংল্যান্ড থেকে চোরাপথে ক্যালিফোর্নিয়ায় পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন এক গরিব মেকসিকানের বাড়িতে। সাথে একটা ধাতুর তৈরী চ্যাপ্টা বাক্স। শক্ত তালা লাগানো থাকতো বাক্সটায়। মাথার নিচে রেখে ঘুমাতেন। রোজ রাতে ডালা খুলে বাক্সের ভেতর তাকাতেন তিনি। খুব সুখী মনে হতো তখন তাকে, মুখে হাসি ফুটতো। এর মধ্যে কি আছে জানতে চাইলে বলতেন, "বাক্সে আছে রামধনুর একটা টুকরো, তার তলায় একপাত্র সোনা"।
হারিয়ে যাওয়া কাঁকাতুয়া খোঁজার মতো সাধারণ একটা কেসের তদন্ত করতে গিয়ে এমন এক জটিল রহস্যের মুখোমুখি হয় যে ক্ষুরধার বুদ্ধির কিশোর পাশাকেও স্বীকার করতে হয় "মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো রহস্য" এটা। একটা কাঁকাতুয়া খুঁজতে গিয়ে আরেকটা, তার সূত্র ধরে আরও পাঁচটা! এই সাত কাঁকাতুয়ার পেছনে লেগেছে আবার অদ্ভুত মোটা এক পাহাড়সম লোক; যে কিনা লাইটার দিয়ে গুলি করার ভয় দেখিয়ে পিলে চমকে দেয় মুসার মতো ছেলের। তারও আছে আরেক প্রতিযোগী, একজন ফরাসি; যার ড্রাইভার সামান্য কথা-কাটাকাটিতে পিস্তল বের করতে যায়। এমনই বিচিত্র চরিত্রের মানুষদের মোকাবিলা করে কাঁকাতুয়ার মুখের বুলি থেকে গুপ্তধন খুঁজে বের করার এ যাত্রায় ছিল টানটান উত্তেজনা। একেকটা সূত্রের মানে বের করতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয় তিন গোয়েন্দাকে। শেষপর্যন্ত সমাধান তো হয়েছেই, তিন গোয়েন্দা খুঁজে বের করেছে গুপ্তধন। কিন্তু কী ছিল সেই রামধনুর টুকরার নিচে এক পাত্র সোনা তা আমি অজ্ঞাতই রাখলাম।
যেহেতু পাঠপ্রতিক্রিয়া জানাতে এসেছি তাই গল্প নিয়ে আর কথা না বাড়াই। গল্প তো লেখক লিখেই গেছেন, পড়ার জন্য পাঠকরাও আছেন। আমি বরং গল্পটা আমার কেমন লেগেছে তা বলি।
আমি বরাবরই গোয়েন্দা গল্প পড়ার সময় গোয়েন্দার সাথে নিজেও রহস্য সমাধান করার চেষ্টা করি। বলা বাহুল্য, অধিকাংশ সময়ই ব্যর্থ হই। তবে সফল হওয়ার গল্পও কম না। এই কেসটাও আমার একটা ব্যর্থ কেস। তবে আগাচ্ছিলাম ঠিকপথেই, সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো ক্যালিফোর্নিয়ায় আমার সশরীরে উপস্থিত না থাকা। প্রথমবার যখন পড়েছিলাম, তখন শুধুমাত্র কাঁকাতুয়াগুলোর বুলির মানে বুঝার জন্য ট্রেজার আইল্যান্ড আবার পড়েছিলাম। শেকসপীয়ার আর শার্লক হোমস নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছিলাম। ক্যালিফোর্নিয়ার আশেপাশের দ্বীপ নিয়ে ঘাটাঘাটি করা, ভূতূড়ে শহর খুঁজে বের করা, জলদস্যুদের নিয়ে গুগল তন্নতন্ন করা কিছু বাকি রাখিনি। বেশ কয়েকটা সূত্র নিজেই বের করেছিলাম, কিশোরের আগেই। এই বইটা আমার পছন্দের হওয়ার অন্যতম একটা কারণ এটা। এই বইটা আমার মস্তিষ্কের ব্যায়াম করিয়েছে অনেকটা।
বইটাতে আমার সবচেয়ে পছন্দের চরিত্র শোঁপা। গল্পের খলনায়ক এনথনি শোঁপা, ইউরোপের বিখ্যাত আর্ট থিফ। থিফ শব্দটার আভিধানিক অর্থ চোর। চোর অবশ্যই একটি নেতিবাচক শব্দ। কিন্তু আসলেই কি তাই? তাহলে রবিনহুড কেন হিরো? শোঁপা কি তার চেয়ে ভিন্ন কেউ ছিলেন? এনথনি শোঁপা সম্পর্কে গল্পের একদম শেষদিকে চিত্রপরিচালক ডেভিস ক্রিস্টোফার বলেন "মহাপুরুষ হওয়ার মতো অনেক গুণ আছে তার"। অথচ আমরা ���দি আরেকটু পেছনে ফিরে তাকাই তাহলে দেখতে পাই শোঁপা কিশোরকে বলছেন "মানুষের কল্যাণে লাগিয়ো তোমাদের মেধা, মানুষের উপকার কোরো, আমার মত চোর হয়ো না"। চোর এবং মহাপুরুষ, দুইটা সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী পরস্পর সাংঘর্ষিক শব্দ যখন একজন মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় তখন সে মানুষটাকে বাকি আর দশটা মানুষের চেয়ে আলাদা ভাবা দোষের কিছু না। শোঁপার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায় যখন তিনি কিশোরকে বাংলাদেশের কথা বলেন। যখন তিনি কিশোরকে জানান তার দেশের মানুষের কত দুঃখ, ওরা কত অসহায়। যখন তিনি কিশোরকে বলেন, বড় হয়ে নিজের দেশের মানুষের জন্য কিছু করতে। আমার তখন আর তাকে চোর বলতে ইচ্ছে হয় না, তিনি হঠাৎ করেই আমার কাছে চোর থেকে মহাপুরুষ হয়ে যান।
বইটাকে পাঁচ তারকা না দিলে আমার নিজরই খারাপ লাগবে। আমার অত্যন্ত পছন্দের তিন গোয়েন্দার গল্পগুলোর মধ্যে কাঁকাতুয়া রহস্য অন্যতম।
রেটিং: ৫/৫