অনেকসময়-ই মস্তিষ্কের মধ্যে বসে থাকে ফেলুদা ও তার দল। তাদের চলাচল, ভাবভঙ্গি যেন মুখস্ত হয়ে যায়। গল্পের লাইন মাথায় গেঁথে যায়। সাথে যাত্রা হয় বুদ্ধিদীপ্ত রহস্য সমাধানের এক অসাধারণ গোলকধাঁধায়। ফেলুদার এবারের যাত্রা রাঁচিতে।
▪️কাহিনি সংক্ষেপ :
একটি তদন্ত শেষ করে ফেলুদার ফিরে এলেন। মক্কেল খুশি হয়ে দিন দশকের জন্য তার হাজারিবাগের বাড়ি প্রস্তাব দিলে ফেলুদা সানন্দে তা গ্রহণ করেন। ঘোরাও হবে, ছুটি কাটানোও হবে। কিন্তু ফেলুদা যেখানে যায়, ছুটির চেয়ে রহস্য দ্রুত ছুটে আসে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আর এর রহস্য সমাধান করতে আবারও মগজাস্ত্রের খেল দেখাতে শুরু করলেন।
দ্য গ্রেট ম্যাজিস্টিক সার্কাসের পোস্টারে ছেয়ে আছে চারিপাশ। জমকালো এ আয়োজনে হুট করেই নেমে এসেছে ভীতির কালো ছায়া। সার্কাসের বাঘ পালিয়েছে। এমন খবরে তটস্থ জনসাধারণ। কৌতূহলবশত ফেলুদা খোঁজখবর করছেন। দেখা হলো রিং মাস্টার বা বাঘ ট্রেনার কারাণ্ডিকারের সাথে। বাঘ ধরার তোরজোড় শুরু হয়েছে চারিদিক। ধরতে না পারলে মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না বন বিভাগের লোকজন। কারাণ্ডিকার তা মেনে নিতে পারেন না। নিজের হাতে প্রশিক্ষণ দেওয়া বাঘকে বাঁচাতে হবে। যে করেই হোক।
হাজারিবাগ যাওয়ার পথে ফেলুদার পরিচয় হয় প্রীতীন্দ্রবাবুর সাথে। তার সূত্র ধরে পরিচয় মহেশ চৌধুরীর সাথে। তারা ফেলুদার প্রস্তাব দেন ওদের সাথে পিকনিকে যাওয়ার। সানন্দে রাজি হয়ে তোপসে আর জটায়ুকে নিয়ে যুক্ত হন সবার সাথে। সেখানেই ঘটে বিপত্তি। ছিন্নমস্তার মন্দিরের কাছাকাছি জায়গায় হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে পড়েন মহেশবাবু। পাথরের আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হয়ে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ফেলুদাকে কয়েকটি দায়িত্ব দিয়ে যান। এই দায়িত্ব অক্ষরে অক্ষরে পালন করার শপথ নেন ফেলুদা। যত বাঁধা-ই আসুক, পেছনে ফেরা চলবে না।
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
ফেলুদা সিরিজের আমার অন্যতম প্রিয় বই "ছিন্নমস্তার অভিশাপ"। কেননা বইটিতে মস্তিষ্ক কাজে লাগানোর অনেক উপকরণ আছে। হেঁয়ালির ছলে রহস্যের সমাধানে আমার বেশ পুরোনো আকর্ষণ আছে। আর তা যদি হয় সত্যজিৎ রায়ের মাথা থেকে বের হওয়া, তাহলে তো আকর্ষণ বহুগুণ বেড়ে যায়। শব্দ দিয়ে কতভাবে খেলা যায়, তা সত্যজিৎ রায় "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" বইয়ে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে দেখিয়েছেন। এসবে মুগ্ধ হবে না, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
সত্যজিৎ রায়ের লেখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে শক্তিশালী বর্ণনা। তিনি যেভাবে বর্ণনা দেন, মনে হয় পুরো প্রকৃতি যেন চোখের সামনে ফুটে উঠছে। চারদেয়ালের এই বদ্ধ ঘরে থেকেও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের স্বাদ নেওয়া যায়। মনে হয়, আমাকেই ঘিরে আছে সবুজে ঘেরা বনাঞ্চল। দূরের সুউচ্চ পাহাড় চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়। কিংবা নদীর স্রোতের কলকল শব্দ কানে শ্রুতিমধুর হয়ে বাজে। এমন বর্ণনায় মুগ্ধতা ছড়িয়ে যায়। দূরদেশে না গিয়েও তার ওপর সৌন্দর্য্য অবলোকন করা যায়।
ফেলুদার গল্পগুলোতে গল্পের ছলে ছোটোখাটো শিক্ষণীয় বিষয় উঠে আসে। শুধু রহস্য না, এর সাথে সংশ্লিষ্ট ছোটো ছোটো শিক্ষার উপকরণ ছড়িয়ে থাকে। "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" বইয়ে ষড়রিপু সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি। তার কিছু বর্ণনা আমি আমার অন্যান্য রিভিউতে দিয়েছি। এছাড়া বাঘ কখন গর্জন করে, কখন তা গোঙানিতে পরিণত হয়, তার ইংরেজি নাম কী; এমন সূক্ষ্ম জিনিস জানা যায়। এছাড়া শব্দ নিয়ে খেলা সব পাঠককেই মুগ্ধ করবে।
সত্যজিৎ রায়ের আরও একটি গুণ বাহুল্য বর্জনতা। খুব অল্প কথায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দেওয়ার দক্ষতা সবার থাকে না। আমার কাছে ফেলুদা জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে এটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। রহস্যের সামান্য আবহ তৈরি করে খুব দ্রুত ও সাবলীলভাবে রহস্যে শেষ সীমানায় পৌঁছে যাওয়া আমার খুব ভালো লাগে। "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" গল্পে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল টুইস্ট। শেষে সাদামাটাভাবে রহস্য উন্মোচন হলেও, দোষী কে হবে আগে থেকে আন্দাজ করা যায়নি। এই দিক থেকে লেখক যেভাবে ধাক্কা দিতে সক্ষম হয়েছেন, প্রশংসা করার মতো।
▪️ চরিত্রায়ন ;
ফেলুদা গল্পে প্রধান তিন চরিত্র ফেলুদা, তোপসে ও জটায়ু। তাদের নিয়ে বিশেষ কিছু বলার নেই। ভারতীয় লেখকদের ক্ষেত্রে, তাদের প্রধান চরিত্রকে অতিমানবীয় করার ক্ষমতা হরহামেশাই দেখি। সব কিছুতে দক্ষ হওয়ার সুপার পাওয়ার তাদের থাকে। ফেলুদাও তার ব্যতিক্রম নয়। ফেলুদা মারামারি পারে, পিস্তল চালাতে পারে, শত্রুর সামনে দাঁড়িয়ে ভয়ডরহীন নির্ভার থাকতে, বুদ্ধিতে সবাইকে কাবু করতে পারে। আবার হেঁয়ালি পেলে তা দ্রুত সবার আগে সমাধান করতে পারে। এমন চরিত্র অন্য জায়গায় দেখলে বিরক্তির উদ্রেক হলেও, ফেলুদার ক্ষেত্রে তা মোটেও হয় না। মনে হয়, এমন চরিত্র যেন ফেলুদার জন্মগত। আর এখানেই লেখকের মুন্সিয়ানা। লেখক সুপার হিউম্যান হিসেবই ফেলুদাকে তৈরি করলেও, তা নজরে আসবে খুব সামান্যই।
"ছিন্নমস্তার অভিশাপ" গল্পটাও তোপসের জবানীতে পাওয়া যায়। ফেলুদার সাগরেদ হিসেবে একটু একটু করে পরিণত হচ্ছে। ছোটোখাটো হেঁয়ালি সমাধান করা তার কাছে কঠিন কিছু নয়। জটায়ু যথারীতি হাস্যরস তৈরি করতে মশগুল। বাঘকে নিয়ে তার ভয়, তার অঙ্গভঙ্গি, কথাবার্তা সবই যেন চোখের সামনে দেখতে পারছিলাম। আর ঠোঁটের কোণা প্রসারিত হয়ে হাসি আটকানো দুঃসাধ্য ব্যাপার।
এই গল্পের আকর্ষণীয় চরিত্র মহেশ চৌধুরী। শব্দ নিয়ে খেলা করায় আর জুড়ি নেই। আর সেটা জানান দেয় তার বুদ্ধিমত্তার। নিজের প্রিয় নাতনী জোড়া মৌমাছির সাথেও এমন খেলায় মেতে উঠেন। গল্পে খুব সামান্য পরিমাণ থাকলেও যেন পুরোটা সময় ছিল তার বিচরণ। এছাড়া প্রীতীন্দ্রবাবু ছিলেন নিজের সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা লোক। অন্যদিকে অরুণবাবু লোভে পড়ে সর্বস্ব প্রায় খুইয়ে ফেলেছেন। নীলিমা দেবী শক্তসমর্থ মহিলা ফেলুদাকে সর্বশেষ সাহায্য করেন। রিং মাস্টার কারাণ্ডিকারকেও ফেলে দেওয়া উচিত হবে না। তার পেছনের অতীত তাকে ফিরিয়ে এনেছে পুরোনো ঠিকানায়।
মোদ্দাকথা, "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" গল্পে সকল চরিত্র সমান গুরুত্ব পেয়েছে। কেউ বেশি বা কম নয়।
▪️পরিশেষে, "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" বইটি মস্তিষ্ক শান দেওয়ার জন্য অসাধারণ। ফেলুদা সিরিজে আমার প্রিয় পাঁচ গল্পের একটি। যতবার পড়ি, মনে হয় এবারই প্রথম। একইভাবে আকৃষ্ট হই, একইভাবে মুগ্ধ হই।
▪️বই : ছিন্নমস্তার অভিশাপ
▪️লেখক : সত্যজিৎ রায়
▪️প্রকাশনী : আনন্দ পাবলিশার্স
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫