জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তোলা কিছু ছবির পর থেকে তোলপার লেগে গেছে মানুষের মাঝে। নিজেকে শ্রেষ্ঠ দাবী করা অতি ক্ষুদ্র এই সত্ত্বা আবার সন্দিহান হয়ে পড়েছে তার অস্তিত্ব নিয়ে। ১৯৮৮ সালের পর দ্বিতীয়বই 'দ্যা ইউনিভার্স ইন আ নাটশেল' লিখেছেন বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং ২০০১ সালে। এই সময়ে তিনি হাবল টেলিস্কোপে পাওয়া তত্ত্ব তথ্যের অনেক বিষয় তুলে ধরেছেন এই বইতে। বৈজ্ঞানিক নানা সম্ভাবনা, মানবজাতির ভবিষ্যৎ, আশংকা নিয়ে বিস্তর চিন্তাভাবনা করেছেন তিনি বৈজ্ঞানিক ভাবে। জেমস ওয়েবের এই চিত্রগুলো যখন প্রকাশ পায়, তখন এই বইটির মাঝামাঝি ছিলাম আমি। আমার আফসোস হচ্ছিল স্টিফেন হকিং এর জন্য, ভদ্রলোক যদি দেখে যেতে পারতেন এই চিত্রগুলো, নতুন আবিষ্কারগুলো।
এই বইটি লেখক লিখতে চেয়েছেন সকলের জন্য। সহজ করে। তবে এটি আসলে তখনই 'সহজ' হবে, যখন এই বিষয়গুলো নিয়ে কারও আগে থেকে কিছুটা জ্ঞান থাকবে, আগ্রহ থাকবে। এখানে সাতটি অধ্যায়ে তিনি আলোচনা করেছেন মহাবিশ্বের নানা গুরুগম্ভীর বিষয় নিয়ে। শুরু করেছেন আইন্সটাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস দিয়ে। এরপর একে একে, সময় এর মতো বিশাল জটিল বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। সময়ের ব্যাপারটা এত জটিল, লেখক এত সহজ করে বোঝানোর পরও বেশ কিছু বি���য় সঠিক ধরতে পারিনি। তারপর মহাবিশ্বের ইতিহাস, ভবিষ্যৎ গণণার সাথে ব্ল্যাকহোলের যোগসাজশ, টাইম ট্রাভেল কি সম্ভব কিনা, অতীতে যাওয়া সম্ভব কিনা অথবা অতীত পরিবর্তনশীল কিনা, মানব জাতির ভবিষ্যৎ কেমন হতে পারে, হলোগ্রাফিক স্তরে জীবনের সাদৃশ্য ইত্যাদি ছিল বিষয়।
এগুলো ব্যাখ্যা করতে লেখকের তুলে আনতে হয়েছে টাইম-স্পেস থিওরি, সিংগুলারিটি, বিগ ব্যাং, স্ট্রিং থিওরি, ডপলার ইফেক্ট, রিলেটিভিটি থিওরি, টাইম ট্রাভেল থিওরি... ইত্যাদি হাজারো থিওরি। সেগুলোর মাঝে পার্থক্য, সাদৃশ্য আলোচনায় তিনি তার মতামত ব্যাখ্যা করেছেন। মজার অজানা থিওরিও ছিল অনেক। যেমন গোডেলের অসম্পূর্ণতা থিওরির কথা জানতাম না আমি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন গণিত পুরোপুরিভাবে যুক্তিযুক্ত, স্বয়ংসম্পূর্ণ সিস্টেম নয়। এরও সীমাবদ্ধতা আছে। তাঁর এই থিওরি ছিল বিজ্ঞানের জগতে এক বিশাল ধাক্কা। তারপর আরও গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় যেমন, ২৬০০ সালের মাঝে পৃথিবীর অতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সম্ভাবনা, দুর্যোগ ইত্যাদি উঠে এসেছি। পরিচিত হয়েছি রিচার্ড ফাইনম্যানের মতো কজন বিজ্ঞানীর সাথে, পরিবর্তন হয়েছে অনেক ধারণা।
আপাত দৃষ্টিতে বেশ বোরিং বই মনে হতে পারে বইটিকে। আর কঠিন ভাষার কথা তো থাকেই। কিন্তু স্টিফেন হকিং এর স্টার ট্রেকের মতো কতগুলো পপকালচার রেফারেন্স, ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উদাহরণ, অতি গভীরে গিয়ে সহজ করে বোঝানোর চেষ্টা, আর কথোপকথনের ঢংয়ে লেখাটি আপনার ভয় ভাঙাতে বাধ্য। সাথে বইটির প্রতি পাতায় পাতায় রয়েছে ছবি। যেগুলো বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক ছিল। অনুবাদক আবুল বাসারও এত সুন্দর করে অনুবাদ করেছেন, এরচেয়ে ভালো অনুবাদ আশা করছিনা। এই অতি সুন্দর করে সাজানো বইটিকে তিনি আরও খুব সুন্দর ভাবে গুছিয়েছেন। শেষে গিয়ে শব্দকোষ আর পরিভাষা উদ্ধৃত করে সহজ করে দিয়েছেন। যদিও কিছু শব্দ তিনি ইংরেজি বা পরিভাষা ব্যবহার করলেই পারতেন। জটিলতা আরেকটু কম হতো। আর ছবির ব্যবহার একটু ডিস্ট্রাক্টিং লেগেছে৷ মনে হয়েছে বক্তব্য কি ছিল মাঝে ছবি দেখে ভুলে গিয়েছি।
আমি বিজ্ঞানের বই পড়াতে বেশ আগ্রহী একজন পাঠক। নন-ফিকশন তো অবশ্যই। আমার জন্য বইটি বেশ সন্তুষ্টি দিয়েছে। মহাবিশ্ব মহাকাশ নিয়ে ছোটবেলা থেকে পড়তে ইচ্ছা করে, জানতে ইচ্ছা করে। সেখানে স্টিফেন হকিং এর মতো কালজয়ী একজন ব্যক্তিত্ত্বের লেখা এই বিষয়ের বইটি আমার সেই আগ্রহের জগতে নতুন পালক সংযোজন করলো।