পশ্চিমবঙ্গের একটি গঞ্জ শহর নবগ্রামে খুন হয়ে যায় মৌপিয়া হালদার। স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা মণিরঞ্জন হালদারের কনিষ্ঠ কন্যা মৌপিয়ার খুন একটি বিশেষ কারণে ভ্রু কুঁচকে দেয় প্রশাসনের। মৌপিয়াকে খুনের পরে তার গুপ্তাঙ্গে তীক্ষ্ণ কোনো দণ্ড ঢুকিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এ যেন ভয়ঙ্কর কোনো সাইকোপ্যাথ! তদন্তে নামেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনস্পেক্টর দর্শনা বোস। তদন্তে ওঠে আসে অতীতের কিছু রুঢ় সত্য, যার উন্মোচনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় গোয়েন্দার ব্যক্তিগত জীবনও। কার্যক্ষেত্রের বিভিন্ন লাল ফিতার ফাঁস অতিক্রম করে, নানা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নিজের তদন্ত পদ্ধতিকে মুক্ত রেখে দর্শনা কি পারবে আসল খুনি অবধি পৌঁছাতে? বৃশ্চিক উপন্যাসে রয়েছে তারই উত্তর।
বৃশ্চিক নামের ছোট্ট কলেবরের এই উপন্যাসটা পড়া হয়েছিল ২০২০ সালের এক অনলাইন পূজাবার্ষিকীতে। শুরুতে টিপিকাল ফর্মুলা বেজড মনে হলেও, কয়েক পৃষ্ঠা এগোনোর পর অবাক হই। নিখুঁত ফরেনসিক/মেডিকেল ডিটেইল; ধাপে ধাপে ইনভেস্টিগেশন প্রসিডিওর দেখিয়ে গল্প এগিয়ে যাচ্ছে তরতর করে!
বৃশ্চিকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে স্টোরিটেলিং। টানটান উত্তেজনা বজায় রেখে এগিয়েছে নির্মেদ, নিরেট কাহিনী। রহস্যের পাশাপাশি নিখুঁতভাবে অপরাধীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ। টুইস্ট থাকা সত্ত্বেও টুইস্ট বেজড নয়, বরং প্রসিডিওর বেজড স্টোরি হওয়াটাই স্ট্রং পয়েন্ট হিসেবে বিবেচ্য। জোড়াতালি, কিংবা জোর করে কাকতালীয় বিষয় ঢোকেনি কোথাও। এমনকি শেষ পর্যায়ে এসেও সূক্ষ্ম ফিজিক্সের ডিটেইল মেনে অপরাধীকে দোষী সাব্যস্ত করার বিষয়টা মুগ্ধ করে। প্রটাগনিস্ট সাব ইন্সপেক্টর দর্শনা বোস (অথবা লেখক পিয়া সরকার) এর বিচক্ষণতা-বিশ্লেষণ শক্তি দুর্দান্ত।
গল্প নিয়ে অভিযোগ না থাকলেও ক্যারেক্টার ডিটেইলিং নিয়ে কিছুটা অভিযোগ থেকে যায়। দর্শনা বোসের ব্যক্তিগত জীবন কিংবা তার অতীতের গল্প ছায়া-ছায়াভাবে আবির্ভূত হলেও শেষপর্যন্ত অস্পষ্ট থেকে গিয়েছে। যদিও পরবর্তী সিকুয়েলগুলোতে সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা আসবে বলে ধারণা করা যায়।
ক্রাইম থ্রিলার পড়ে যারা আনন্দ পান, এই বইটা তাদের পছন্দের তালিকায় যুক্ত হবে আশা করি।
অসম্ভব সুন্দর একটা মার্ডার মিস্ট্রি 'বৃশ্চিক' । গতবছরের বেশ কিছু বই অবহেলায় জর্জরিত হয়ে টেবিলের এক কোনায় ঝিম মেরে পড়ে ছিল। তারপর কি বুঝে বইটা হাতে নিলাম জানিনা। সম্ভবত বইটার আয়তন ছোট এইজন্য। তারপর শুরু করতেই নিশ্চুপ ডুবে গেলাম বইয়ের গভীরে। শেষ পর্যন্ত পড়ে যখন উঠলাম তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, 'এত কম শব্দর ভিতরেও এ ধরনের মার্ডার মিস্ট্রি লেখা যায়? ' লেখিকাতে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। তয় উনার আর কোন বই সংগ্রহে নেই । খুব শীঘ্রই সংগ্রহ হবে।
তবে একটা ব্যাপারে পাঠককে খেয়াল রাখা উচিত, এতো কম পৃষ্ঠার মার্ডার মিস্ট্রি হলেও চরিত্রের কোন কমতি নেই। তাই কোন চরিত্রের সাথে অন্য কোন চরিত্রের কি সম্পর্ক সেটা মাথায় ঠিকমতো ঢুকিয়ে নিতে হবে। আমি তো প্রথম দিকে সুমন্ত আর সামন্ত'র মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিলাম প্রায়। তারপর যেমন মিসেস হালদার ও মঞ্জু হালদার ( একই) । মঞ্জু নামটা পুরুষ বাচক ভেবে অন্য চরিত্রের সাথে গুলিয়ে ফেলছিলাম। একটু সতর্ক হলেই সব ঠিকঠাক এগোবে। আর তাতেই পেয়ে যাবেন দুর্দান্ত এক থ্রিলার মিস্ট্রি। সবার জন্য শুভকামনা। যারা গত বছরে বইটিকে অবহেলা করেছেন, এ বছরে একই কাজ করে ভুলের পুনরাবৃত্তি করার দরকার নেই।সংগ্রহে থাকলে চটজলদি শুরু করে দিন।
শুরুর দিক তাল মেলাতে পারছিলামনা তবে আস্তে আস্তে যখন সবকিছু খোলাসা হলো আর শেষ করলাম বলতে বাধ্য হচ্ছি দুর্দান্ত ছিল এটা। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিলো হিগাশিনোর কোন বই পড়ছি। টুইস্টটাও দারুন ছিলো। সবমিলিয়ে পারফেক্ট।
সুন্দর একটা মার্ডার মিস্ট্রি/পুলিশ প্রসিডিওরাল। বর্ধমানের এক গ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তির ছোট মেয়ের স্যাডিস্টিক খুনের রহস্য নিয়েই বইটা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দারুণ সুচারুভাবে তদন্ত প্রক্রিয়া দেখিয়েছেন লেখিকা। খুবই ভালোভাবে ডেভেলপ করেছেন ক্যারেক্টারগুলো। বিশেষ করে প্ৰটাগোনিস্ট ডিসিপি দর্শনার ক্যারেক্টার। নারী চরিত্রকে অনেকসময় বোল্ড/ পাওয়ারহাউজ হিসেবে দেখানোর প্রবণতা থাকে। কিন্তু এখানে তেমন ছিল না। সাধারণের মধ্যেই অসাধারণ ভাবে দেখানো হয়েছে চরিত্রটাকে। আগেই বলেছি তদন্তের প্রতিটা ধাপ খুবই সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন লেখিকা, সেইসাথে ফরেনসিক ও ময়নাতদন্তের ডিটেইলও ভালোভাবে দিয়েছে। বইটাই শেষের দিকে ভালোই টুইস্ট দিয়েছেন। যদিও টুইস্ট আগেই ধরে ফেলেছি, তবে বইটা টুইস্ট বেইজড নয়, প্রসিডিওরই এর মূল চালিকাশক্তি। মার্ডার মিস্ট্রি/পুলিশ প্রসিডিওরাল জনরার ভক্ত হিসেবে বেশ উপভোগ করেছি বইটা। বুকস্ট্রিটের রিসেন্ট বের হওয়া বইগুলোর মধ্যে এটাই বেশি ভালো লাগল। যেকোনো রহস্য উপন্যাস প্রেমীর-ই ভালো লাগবে। রিকমেন্ডেড।
কলকাতার থ্রিলার মানেই আমার কাছে ছিলো তন্ত্র-মন্ত্র সংক্রান্ত। তন্ত্র-মন্ত্র যে ভালো লাগে না তা নয়, তবে এই সাব-জনরাটা আমার কাছে খুব সেনসিটিভ মনে হয়। তাই একটু এদিক ওদিক হলেই গুবলেট পাকিয়ে যাওয়া রিস্ক নিয়ে কেন যে কলকাতার লেখকরা এই জনরা এত অবসেসড তা আমি বুঝতাম না।
তবে এই তন্ত্র-মন্ত্রের বাইরেও যে কলকাতার লেখকরা থ্রিলার লিখতে পারেন এবং 'ভালোভাবেই' পারেন তা প্রমাণ করে দিলো পিয়া সরকারের 'বৃশ্চিক' বইটি। মাত্র ১৩৬ পৃষ্ঠার ছোট্ট কলেবরের এই মার্ডার মিস্ট্রি, পুলিশ প্রসিডিউরাল উপন্যাসটা শুধু কলকাতার না, বাংলাদেশকে হিসেব করলেও বাংলা থ্রিলার সাহিত্যের এক অনবদ্য সংযোজন।
পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্বল শহর নবগ্রামে মৌপিয়া হালদারের খুন দিয়ে এই বইয়ের গল্প শুরু হয়। ভিক্টিম প্রভাবশালী এক নেতার কনিষ্ঠ কন্যা। মফস্বলের জন্য এটা বেশ সাড়াজাগানো ঘটনা হলেও প্রশাসন আরো নড়েচড়ে বসে কারণ মৃত্যুর পর মেয়েটির যৌনাঙ্গে তীক্ষ্ণ কোনো দণ্ড ঢুকিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়। খুনের পেছনে ভয়ঙ্কর কোনো সাইকোপ্যাথের থাকার সম্ভাবনা সবার মনে দানা বাঁধে! তদন্তে নামেন পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনস্পেক্টর দর্শনা বোস। তদন্তে উঠে আসে অতীতের কিছু রুঢ় সত্য, যার উন্মোচনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় গোয়েন্দার ব্যক্তিগত জীবনও। কার্যক্ষেত্রের বিভিন্ন লাল ফিতার ফাঁস অতিক্রম করে, নানা রাজনৈতিক প্রভাব থেকে নিজের তদন্ত পদ্ধতিকে মুক্ত রেখে দর্শনা কি পারবে আসল খুনি অবধি পৌঁছাতে? বৃশ্চিক উপন্যাসে রয়েছে তারই উত্তর।
বৃশ্চিকে যে জিনিসটা আমি সবচাইতে বেশি উপভোগ করেছি তা হলো, লেখকের গল্প বলার ঢং। কোন তুলনা নয়, তবে আমি মনে করি, বাংলা থ্রিলার সাহিত্যে প্লট নিয়ে কথা বললে আমরা কলকাতার চাইতে ঢের এগিয়ে আছি। কিন্তু তা সত্ত্বেও গল্পে সাহিত্যের যে স্বাদ, বাক্যগঠনে পাঠককে বি���োহিত রাখার যে গুণটা; এটাতে আমরা কলকাতার চাইতে পিছিয়ে আছি। পিয়া সরকার যে দারুণ ঠাসবুনোটে গল্পটা বলে গেছেন, আর সব বাদ দিয়ে আমি ওখানেই মুগ্ধ হয়ে গেছি। উপন্যাসে শুধু রসকষহীন ভাবে মার্ডার মিস্ট্রির কথাই উঠে আসেনি। উঠে এসেছে গল্পের প্রধান চরিত্র দর্শনা বোসের ব্যক্তিগত জীবনের কথা, সুমন্ত ও বিধানের জেঠুর (নাম ভুলে গেছি ওনার) সাথে তার যে সম্পর্ক, তার বর্ণনা আমাকে মুগ্ধ করেছে। অনেকে বলে থাকেন, পুলিশ প্রসিডিউরালে পুলিশ নাকি একটু অতিমানবীয় দেখানো হয়ে থাকে এবং এটা একটা ন্যাচারাল জিনিস। এই বইতে এই অতিমানবীয় কোন ব্যাপারই নেই। দেশীয় মৌলিক থ্রিলারে নারী ডিটেকটিভ/পুলিশকে কেন্দ্র করে কোন সিরিজ আমার পড়া ছিলো না (আদৌ এই জিনিস আছে নাকি কে জানে), সেদিক থেকে আমি যারপরনাই খুশি হয়েছিলাম 'বৃশ্চিক' এ মূল প্রোটাগোনিস্ট নারী হওয়ায়র। তবে এক্ষেত্রে একটা ভয়ও থেকে যায়। নারীকে চরিত্রকে বিশাল বোল্ডভাবে দেখানো হবে, ফলাফল পুরো জিনিসটা আর বাস্তবের সাথে রিলেট করা যাবেনা। কিন্তু আমার ধারণাকে ভুল করে পিয়া সরকার দেখালেন, আসলে খুব সহজ করে সাধারণভাবেও নারী কেন্দ্রিক চরিত্রে ডিটেকটিভ থ্রিলার লেখা যায়। এখানে এসে আমি লেখকের ফ্যান বনে যাই।
এ তো গেলো লিখনশৈলীর স্তুতি, দারুণ প্লটের কথা এড়িয়ে যাই কিভাবে?
প্লটের দিক থেকে বলতে গেলে, শুরুটা বেশ সাধারণ একটা খুনের মধ্য দিয়েই হয়। কিন্তু যতই গল্প এগোতে থাকে, থলের বেড়াল ততই বের হয়ে আসতে থাকে। কখনো মনে হচ্ছে এ খুনী, কখনো মনে হচ্ছে ও খুনী। পারফেক্ট পুলিশি তদন্তের মধ্য দিয়ে গল্প যতই এগোতে থাকে ততই রহস্য ঘনীভূত হতে থাকে। তবে একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে খুনীর কথা উপন্যাসে আসার আগেই পাঠক বুঝে ফেলতে পারে। আমিও পেরেছি। একটু পরে যখন দেখলাম যাকে ভেবেছি আসলে সেই খুনী, তখন আটকে রাখা শ্বাসটা ছেড়ে দিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়েছি। আর তখন ধাপাধাপ লিটল বয় আর ফ্যাটলেডী পড়লো আমার মাথায়। খুনী তো ধরা পড়লো, কিন্তু তারপর এটা কি হলো! গল্প যে এদিকেও যেতে পারে এমন তো ভাবিনি, এমন তো কখনো এক্সপেরিয়েন্স করিনি। একেবারে থ হওয়া অবস্থায় বইয়ের দু'মলাট শব্দে বন্ধ করে আবিষ্কার করলাম, আমি লেখকের দারুণ এই সিরিজের প্রেমে পড়েছি। ‘বৃশ্চিকচক্র’ও হাতে আছে কিন্তু পড়লেই শেষ হয়ে যাবার ভয়ে ধরছি না।
যারা এই বইটি কিনবেন নাকি কিনবেন না ভাবছেন, তাদের বলবো, দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে চটলজলদি বইটা হাতে নিয়ে নিন। গ্যারান্টি দিচ্ছি, এটা আপনার পড়া সেরা থ্রিলারের একটা হতে যাচ্ছে। বইটার মুদ্রিত মূল্য ৩০০ টাকা।
রেকমেন্ডেশন : শুধু দুধরণের মানুষকে এই বই রেকমেন্ড করছি। যারা বই পড়েন আর যারা বই পড়েন না
ওহ, কোন নেগেটিভ পয়েন্ট আছে কিনা তা বললাম না? নেগেটিভ পয়েন্ট আছে দুটো। একটা একদমই মাইনর। তবে মাইনর-মেজর যাই হোক, আমি খানিকটা বায়াসড হয়েই আজকে এই বইয়ের কোন নেগেটিভ পয়েন্ট বলবো না। কারণ নেগেটিভিটি প্রকাশ করা খুব সহজ, কিন্তু আমি যতটা মুগ্ধ হয়েছি ততটা প্রকাশ কি এত সহজে করতে পেরেছি?
ছোট পরিসরে ছিমছাপ পরিপাটি একটি থ্রিলার উপন্যাস ছিল পিয়া সরকারের লেখা 'বৃশ্চিক'। নবগ্রাম নামের একটি গঞ্জ শহরে ভায়োলেন্ট একটি হত্যাকান্ডের সুরাহা করা নিয়ে চিত্রিত হয়েছে গল্পটি। উপন্যাসের মূল চরিত্র পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিটেক্টিভ ডিপার্টমেন্টের সাব-ইনস্পেক্টর দর্শনা বোস কে গোয়েন্দা হিসেবে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। চরিত্রটির সাথে পথ চলায় কাহিনী জটিল না হয়ে খুব সুন্দর ভাবে ক্রিমিনাল সাইকোলজিটা দেখা গিয়েছে যেটি আমাকে মূলত আকৃষ্ট করেছে। সাধারণত রহস্য উপন্যাসে রহস্য ঘনীভূত কিংবা জটিল করতে বাইরে থেকে থার্ড পার্সন চরিত্রের উপস্থিতি ঘটতে দেখা যায় প্রচুর। এখানে সেরকম কিছু যে ছিলোনা তা বলবোনা। এখানে বরং একইরকম অতীত বর্তমানের মিশেলে কাহিনী তরঙ্গের ওঠানামা ছিলো বেশ কিন্তু চরিত্রগুলো খুব সুন্দর খাপে খাপে বসে যাচ্ছিলো এবং ট্রানজিশন গুলো ছিল স্মুথ।
দর্শনা বোসের তদন্ত প্রকৃতি ধীরগতির কিন্তু সুচারু। পুলিশ প্রসিডিউয়াল কিংবা তদন্তে গিয়ে করা জবাবদিহিতা গুলো আপনা আপনিই জট খুলে দিচ্ছিলো। ধাপে ধাপে করা ইনভেস্টিগেশন ডিটেইল আলাদা করে ব্যাখ্যা করবার প্রয়োজন ছিলোনা। দর্শনা বোসের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ডও বেশ ইন্টারেস্ট জাগিয়ে তুলেছে, যদিও সেটার সুরাহা হয়নি। পাশাপাশি শেষাংশে এসে মূল কালপ্রিটকে পাবার পর যে তৃপ্তিটা হচ্ছিলো, এবং সহজ সুন্দর একটা ব্যাখ্যা দিয়ে গল্পটা মীমাংসা যেভাবে করা হলো, সেটা অনেকদিন মিস করেছি। সুন্দর এই ক্রাইম থ্রিলারটি আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। পরের পর্ব বৃশ্চিকচক্র পড়বার জন্য মুখিয়ে আছি।
মার্ডার মিস্ট্রি ভালো লাগে, এই বইটা নিয়ে আগেই আলোচনা দেখে পড়ার ইচ্ছা ছিল। সুযোগ পেয়ে পড়ে ফেললাম। আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। লেখকের আরো বই সামনে পড়ার ইচ্ছা রইলো ইন শা আল্লাহ। যারা অল্প পেইজের মার্ডার মিস্ট্রি পড়তে পছন্দ করেন এই বইটা পড়তে পারেন।
অসাধারণ। তদন্ত প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে রহস্যের জট খোলা, টুইস্টি এন্ডিং এরপর ক্লিফ হ্যাঙ্গারটাও তো কম যায় না। পরিতৃপ্তির রেশ যেন কাটছে না। আফসোসের জায়গা বলতে দর্শনা বোসের সাথে আরেকটু কানেক্টেড হতে পারলে ভালো লাগতো। পুলিশ প্রসিডিওরাল হিসেবে খুবই সফল আমার মতে। দর্শনা বোসের তদন্ত পদ্ধতি মনে থাকবে বহুদিন।
২০২০-র পুজো! লকডাউন তখন আমাদের নিরানন্দ করে রেখেছিল। তারই মধ্যে হঠাৎ একপশলা আনন্দ নিয়ে এসেছিল 'একচালা' পূজাবার্ষিকী। তাতেই এই রুদ্ধশ্বাস রহস্য উপন্যাসটি প্রথম পড়ার সুযোগ হয়। পাঠকমহলে রীতিমতো ঝড় তুলেছিল বৃশ্চিক। আমার মতে তার কারণ ত্রিবিধ। সেগুলো হল~ ১. এত ভালো পোলিস প্রোসিডিওরাল বাংলায় রাজর্ষি দাস ভৌমিক ছাড়া কেউ লেখেননি। ২. রহস্যভেদী বিশ্বাসযোগ্য না হলে রহস্য উপন্যাস অর্থহীন হয়ে পড়ে। গোয়েন্দা কানাইচরণের মতোই বিশ্বাসযোগ্য হলেন ইন্সপেক্টর দর্শনা বোস। কিন্তু দর্শনা'র অতীতে এমন কিছু আছে যা পাঠককে বাধ্য ��রে তদন্তের প্রতিটি পর্যায়ে তার সহযাত্রী হতে। এইরকম একটা চরিত্র যেকোনো লেখার সম্পদ। ৩. এই কাহিনির কেন্দ্রে যে রহস্যটি আছে, তার মতো জটিল এবং গভীর রহস্য যেকোনো পাঠকের মগজে পুষ্টি জোগায়। মনস্তত্ত্ব আর তথ্যপ্রমাণ— দু'টিকেই কাজে লাগিয়ে লেখা এমন ঠাসবুনোট লেখা পড়তে পাওয়া ভাগ্যের কথা। পুলিশি রহস্যের সমাধান করলেও দর্শনা'র জীবনরহস্যের সমাধান হয়নি এতে। বরং তার আকাশে জমে উঠেছে কালো মেঘ; বাতাসে মিশেছে বিষ। সে কীভাবে ফিরে আসে— সেটাই দেখার অপেক্ষায় রইলাম। ইতিমধ্যে এ-বইটা পড়ার সুযোগ হারাবেন না।
বই: বৃশ্চিক লেখক: পিয়া সরকার জনরা: সাইকোলজিক্যাল মিস্ট্রি থ্রিলার প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ প্রকাশনী: বুকস্ট্রিট প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০২২ পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৩৬ মুদ্রিত মূল্য: ৩০০/-
কোনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি কী বলুন তো... ভালোবাসা? না হয়নি। উত্তরটা হবে ❝বিশ্বাস❞। বিশ্বাস যে সম্পর্কে থাকে না তা বেশিদিন টিকেও না আবার কোনোরকমে চললেও ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়। কিন্তু এই কোনোরকমে বা জোর করে সম্পর্ক টেকানোর ফলাফল অনেকসময় এতোটাই বিভৎস হয়ে যায় যে শেষে নিজেকেই দোষ দেওয়া লাগে কেন এমনটা করতে গেলাম! কিন্তু নিজের দোষে যখন অন্যরা ভুক্তভোগী হয় তখন?
নবগ্রামের রুলিং পার্টির মেম্বার মণিরঞ্জন হালদার এলাকার একজন নামি-দামি মানুষ। এককালে রেল স্টেশনের ম্যানেজারও ছিলেন। সম্প্রতি তিনি আবারও আলোচনায় এসেছেন ছোট মেয়ের নির্মম হত্যা রহস্যের কারণে। এলাকায় সেরা মেধাবী ছিল মৌপিয়া হালদার। শুধু একাডেমিক না বরং বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাকটিভিটিসেও ছিল দারুণ দক্ষ। এমন একটা মেয়ের মৃত্যুর ফরেনসিক রিপোর্ট দেখে কেঁপে ওঠে গোয়েন্দা পুলিশ অফিসার দর্শনা। খুনের পর ধর্ষণ! তবে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো ইনস্ট্রুমেন্ট দিয়ে রেপ! অন্যদিকে দর্শনা যাকে গুরু হিসেবে শ্রদ্ধা করে গণেশদা, তার ভাইয়ের ছেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মৌপিয়ার কেসে। হালদার পরিবারের প্রতিটি সদস্য কোনো না কোনো রহস্য লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। জানা যায় বেশ কিছু সময় ধরে কেউ মৌপিয়াকে স্লো পয়জনিংয়ের মাধ্যমে মারার চেষ্টা করছিল! বিষ দেওয়া ব্যক্তি আর খুন করা ব্যক্তি কি একজনই নাকি ভিন্ন?
মৌপিয়ার কেসে কাজ করতে যেয়ে আরও দুটো কেসের সন্ধান পায় দর্শনা। বহুবছর আগে রেল এক্সিডেন্টে মারা গেছে মৌপিয়ার ছোট মামা। এক্সিডেন্ট যেন মনে হয় এমনভাবেই খুন করা হয়েছে বিধানের বাবাকে। আশ্চর্যের বিষয় হলো এই দুটি কেসেই মণিরঞ্জন হালদারকে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছিল কিন্তু প্রমাণ হয়নি কিছুই। তাহলে কি কেউ প্রতিশোধ নিয়েছে মৌপিয়াকে খুন করে?
২০২২ সালের নভেম্বর মাসে বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। কিন্তু আর শেষ করা হয়নি ব্যস্ততার কারণে। প্রায় ভুলেই বসেছিলাম। কিন্তু গুডরিডসে রেকর্ড চেক করতে যেয়ে হঠাৎ দেখি বইটার একটুখানি পড়ে রেখে দিয়েছি। নতুন করে শুরু করে দেখি আগের পড়া কিছু মনে নেই। কয়েক ঘন্টায় বইটা শেষ করে ফেললাম। কিন্তু আফসোস হচ্ছে ভেবে যে এমন দারুণ বইটা এতো দীর্ঘ সময় না পড়ে রেখে দিয়েছিলাম।
শুরুতে সাধারণ একটা মার্ডার মিস্ট্রি মনে হয়েছিল। কিন্তু "বিশ্বাস" নিয়ে যে খেলা দেখানো হয়েছে... অসাধারণ। বইয়ের টুইস্ট তেমন একটা নেই বলতে গেলে। পুলিশি প্রসিডিওর ও ফরেনসিক তদন্তের দারুণ বর্ণনা করা হয়েছে। খুনি কে হতে পারে এটা অনেকটা আগেই বলে দেওয়া হলেও মাস্টারমাইন্ডকে দর্শনা কীভাবে ধরবে এটা দেখার বিষয়। ধাপে ধাপে প্রতিটা অংশ বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো অপ্রয়োজনীয় আলোচনা করা হয়নি। প্রায়ই দেখা যায় প্রোটাগনিস্টকে "অসাধারণ" দেখাতে যেয়ে অবাস্তব ক্ষমতাসম্পন্ন দেখানো হয়। কিন্তু বইয়ে দর্শনা বাস্তব চরিত্র হিসেবেই ফুটে উঠেছে। প্রোটাগনিস্ট ও এন্টাগোনিস্ট দু'জনের সাইকোলজিক্যাল খেলা দারুণ জমেছে।
লেখনশৈলী একদম ঝরঝরে সুন্দর সাবলীল। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করেছি। পড়ার সময় শুধু একটা সমস্যা হয়েছিল আর সেটা হলো নামে। নবগ্রাম থানার ওসি "সামন্ত" ও গণেশদার সহযোগী "সুমন্ত" প্রায় কাছাকাছি নাম হওয়ার জন্য প্রথমে কনফিউজড হয়ে গেছিলাম একই মানুষ মনে করে। শতদলের মৃত্যু নিয়ে আরও স্পষ্টতা থাকলে ভালো হতো। পরবর্তী বইয়ের হিন্টও এই বইয়ের শেষে রয়েছে। আর এই অংশটাই বেশি চমকে দিয়েছে। দর্শনার একটা অতীত আছে যেটা এই বইয়ে অনেকটা ধোঁয়াশার মধ্যেই রাখা হয়েছে। সমাপ্তি অংশ পড়ে মনে হয়েছে রহস্যের খোলাসা পরের বইয়েই পাওয়া যাবে।
কে বলে বাংলায় ভালো থ্রিলার লেখা হয়না! তন্ত্র মন্ত্রের বাহুল্যে এত উচ্চমানের police procudural thriller চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল কী করে কেজানে। বাংলায় এরকম পুলিশি অভিজ্ঞতা নিয়ে থ্রিলার লিখেছেন লালবাজার সিরিজের সুপ্রতীম সরকার। কিন্তু তিনি ছিলেন পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্তা। তার ওপরে লালবাজার সিরিজ সত্য ঘটনা নির্ভর। সেখানে পিয়া সরকার পুলিশের অন্দরের লোক না হয়েও যেরকম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনার ডিটেল বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে বিরাট প্রশংসার দাবী রাখেন। মৌপিয়া নামক এক মেধাবী ছাত্রীর নৃশংস খুনের তদন্তে নামেন সাব ইন্সপেক্টর দর্শনা বোস। বর্ধমানের নবগ্রামে এই ঘটনার পরে একটার পর একটা গল্পের মোড় উন্মোচিত হতে থাকে। মৌপিয়ার বাবার বিশাল দাপট, প্রেমিক বিধানের বিরোধী দলের সংসর্গ নাকি পারিবারিক কেচ্ছা কোনটা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী তার রহস্য সন্ধানে পুলিশের প্রায় নাকানিচোবানি খাওয়ার মতো অবস্থা। দর্শনা এখানে মোটেই কোনো সুপার ডিটেকটিভ নয়। সাধারণ পুলিশের মতোই তার এগোনোর procedure। সঙ্গে রেখেছেন গ্রাম্য ভাষার প্রভাব, রাজনীতির কূটনীতি, পুলিশের অসহায়তা -সবটাই একটা সলিড কাঠামোর মধ্যে সাজানো। এটাই এই গল্পের usp। যেটা আমরা ইংরাজি police thriller গুলোয় দেখে অভ্যস্ত ঠিক সেভাবেই বাংলায় পার্ট বাই পার্ট এভাবে গল্প লিখতে দেখিনি কাউকে। তার খেদ মিটিয়ে দিলেন পিয়া সরকার। সেইসঙ্গে তৈরি করলেন একজন প্রকৃত প্রোটাগনিস্টকে যার অতীত, বর্তমান ঘটনার থেকেও যেন বেশি চমকপ্রদ এবং ডার্ক।
প্লটের চমক আসতে আসতে রাত তখন দুটো বেজে গেছিল। মনে হচ্ছিল পরের দিনই কলেজ স্ট্রিট ছুটতে হবে। পরবর্তী পার্ট বৃশ্চিকচক্র না পড়ে শান্তি নেই ❤
“দিল্লীর মসনদে তখন আলাউদ্দীন খলজী। তার রাজত্বে প্রথমবারের মত ভারতবর্ষের বাজারে পুলিশ নিয়োগ করলেন। পুলিশ কর্তার নাম দিলেন শাহান-ই-মণ্ডি। সেই মণ্ডির নিয়মকানুন ছিল ভয়ংকর। কেউ মাপেটাপে কম দিলে শাহান-ই-মণ্ডি তার শরীর থেকে সমপরিমাণ মাংস কেটে নিতেন। একবার শাহান-ই-মণ্ডির ছেলের নামে অভিযোগ এল যে সে বাপের ক্ষমতার প্রভাবে মাপে ফাঁকি দিয়েছে। সকলে ছেলেকে বেঁধ�� নিয়ে এলো শাহান-ই-মণ্ডির কাছে। নিজের নামের অপব্যবহার করার জন্য ছেলের উপরে রেগে তাকে মেরেই ফেললেন সেই পুলিশ কর্তা। খবরটা সুলতান অবধি গড়ালো। সুলতান তদন্ত করে জানতে পারলেন শাহান-ই-মণ্ডির ছেলের আসলে কোনও দোষই ছিল না। কোনও এক ধুরন্ধর ব্যবসায়ী নিজের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্যে ছেলেটাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে। শাহান-ই-মণ্ডি কান্নায় ভেঙে পড়লেন শুনে। কিন্তু আলাউদ্দিন এবার একটা ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি জনসমক্ষে শাহান-ই-মণ্ডিকে শুলে চড়ালেন৷
সুলতান কেন এমন করলেন? -লোকটার আবেগের কাছে তার যুক্তি হার মেনেছিল। সে তদন্ত করে সত্য মিথ্যা বিচার করার চেষ্টা করেনি। সেটাই ছিল সুলতানের কাছে কর্তব্যের বিরাট অবহেলা। লোকটার আর বেঁচে থাকার কোন অধিকার ছিল না সুলতানের কাছে।“
উপরোক্ত প্যারার মাজেজা কি? এইটা কি ঐতিহাসিক থ্রিলার নাকি ইতিহাসের উপরে তথ্যবহুল সত্য ঘটনা নিয়ে লেখা বই? জ্বি আজ্ঞে এমন কিছুই নয়। এটা ১০০ খাঁটি গরুর দুধ অথবা গরুর খাঁটি ১০০% দুধের মতই ১০০ খাঁটি থ্রিলার বই। উপরোক্ত প্যারা কেন উল্লেখ করলাম সেটা পরবর্তীতে আলাপ করবো। অন্যসব আলাপের পূর্বে প্রথমে গল্প নিয়ে একটু ধারণা দেয়া যাক।
গল্পের একদম শুরুই হবে মৃত্যু দিয়ে। সেটা দুর্ঘটনা, অনিচ্ছাকৃত ভুল নাকি হত্যাকাণ্ড , সেটা নিয়ে ধারণা পাওয়া যাবে না। তবে যেহেতু থ্রিলার বই, ধরেই নিতে হবে খুন। সে দুর্ঘটনা বা হত্যাকাণ্ড এক সাউডে চাপিয়ে রাখা যাক আপাতত। কারণ পরবর্তী খুন নিয়েই বইয়ের আসল ঘটনা প্রবাহের শুরু৷ মৌপিয়া হালদার, অত্যন্ত ট্যালেণ্টেড ছাত্রী, নবগ্রাম জুড়ে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তার বাবা আবার কেউকেটা গোত্রের লোক, নাম মণিরঞ্জন হালদার। তার আদেশে বাঘে মহিষে এক ঘাটে পানি না খেলেও অনেক লোকজন যে খায় সে ব্যাপারে কোন সন্দেহই নেই। এহেন লোকের কন্যাসন্তান যখন রাতের বেলা স্থানীয় পাম্পহাউজে নৃশংসভাবে খুন হয়, খুনের পর তার গোপনাঙ্গে কেউ শক্ত কিছু প্রবেশ করিয়ে ধর্ষণ করে ফেলে রেখে যায়, সেই সঙ্গে যখন জানা যায় মৌপিয়ার বাবার লাখের অধিক টাকাও গায়েব, পরিস্থিতি তখন উত্তপ্ত হয়ে ওঠে সেটা বলাইবাহুল্য। কে খুন করলো মৌপিয়া কে? টাকাই বা গেল কোথায়? সন্দেহভাজন হিসেবে যাকে ধরা হয়েছে সেই কি খুনী? খুনের পেছনে মোটিভ কি? প্রেম ঘটিত, নাকি হারিয়ে যাওয়া টাকার কোন ব্যাপার আছে? নাকি এসবের বাইরেও অন্য কোনো জটিল রহস্য রয়েছে? জানতে হলে নেমে পড়তে তবে তদন্ত কর্মকর্তা দর্শনার হাত ধরে।
বৃশ্চিক কাকে বলে জানেন? বৃশ্চিক মানে বিছা, রাশিচক্রের অষ্টম রাশি। কিন্তু বৃশ্চিকের আরেকটা অর্থও রয়েছে। দংশন! বিষম বিদ্বেষপূর্ণ ব্যক্তির দংশন দুনিয়ার যে কোন শক্তিশালী বিষের চেয়েও ভয়ংকর প্রাণঘাতী।
আমরা বর্তমান সময়ে প্রচুর পুলিশ প্রসিডিউরাল নামের থ্রিলার বই পড়ি। খুন, জখম, রহস্য নিয়ে নানাপ্রকার পুলিশি বা গোয়েন্দাদের ক্যারিক্যাচার পড়তে বসলে অনেকসময়েই রাত ভোর হয়ে যায়। কিন্তু বই শেষ হওয়ার পর অধিকাংশক্ষেত্রে মনের মধ্যে একটু অতৃপ্তি নিয়ে ঘুমাতে হয়। “ওই তথ্যটা এত কাকতালীয়ভাবে সামনে না আসলেও চলতো। ওই তথ্যটা এত খেলো ভাবে সামনে না আসলেও হত। এত সহজ উপায়ে রহস্যের সমাধান না হলেও হত। আকাশ থেকে টুপুস করে টুইস্টের সমাধান না আসলেই ভাল্লাগতো। বালিশের তলা দিয়ে রহস্যের সমাধান না বের হলেও পারতো। পুলিশ এত ছুটাছুটি করলো, কিন্তু তদন্তের সমাধান করে দিল ছয় বছরের বাচ্চা দেখুন ভিডিওসহ“ ইত্যাদি ইত্যাদি নানাবিধ দুঃখ নিয়ে অতৃপ্তির সাথে পরবর্তী বইয়ে মুভ অন করতে হয় দুদন্ড শান্তির আশায়। যদিও কথায়ই আছে আশা সে তো মরিচীকা। তবে এই আশা যে কতবার নিরাশায় পরিণত হয়েছে সে তথ্য যদি কোথাও টুকে রাখা হত নির্ঘাত রবার্ট ব্রুসের আত্মাও লজ্জা পেয়ে যেত।
এত হতাশার ভীড়ে আলোর দিশারি হয়ে দেখা দিল বৃশ্চিক। নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়ার উৎকৃষ্ট উদাহরণ এই চমৎকার ছোটখাটো বই। নিখুঁত তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে যে আক্ষেপ থাকে অনেক বইয়ে, সেটার অভাব ঘুচিয়ে দিয়েছে বৃশ্চিক। এখন শাহান-ই-মণ্ডির মত অনেকেই আবেগ দিয়ে রহস্যের সমাধান করিয়ে দেন, কিন্তু সুলতানের মত নিখুঁত তদন্ত করে ফলাফল আবলে বইটা যে বেশি উপভোগ্য হয় সেটা তারা ভুলে যান। আমরা উপমহাদেশীয়রা অবশ্য আবেগপ্রবণ, সে জন্য বোধহয় পুলিশি তদন্তের চেয়ে আবেগী তদন্তের ভাত একটু বেশি সুস্বাদু মনে হয়। যাক গে, এই বইয়ের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছে এর তদন্ত প্রক্রিয়া। ছোট খাটো কোন তথ্যেই ওহী নাজিলের মত নাজিল হয় না বা স্টার জলসার বিদ্যুৎ চমকানোর মাধ্যমে সমাধান মনের গভীরে ধরা দেয় না। এজগানে তদন্ত করার সময় খেটেপিটে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে, যুক্তি দিয়ে ভাবতে হয়েছে৷ গল্প শেষ হওয়ার অনেক আগেই মনে হবে যা সব তো জেনেই গেলাম কিন্তু না, লেখিকা মাথায় বাড়ি দেয়ার জন্য ক্লিফহ্যাংগার রেডি করে রেখেছিলেন। দারুণ লেখনী, এক বসায় শেষ না করে পারিনি। খুবই এনগেজিং গল্প, শক্তিশালী চরিত্রগঠন, নিখুঁত তদন্তপ্রক্রিয়া, ছোটবড়ো টুইস্ট বইটাকে অন্যমাত্রা দিয়েছে। লেখিকার প্রতি টুপি খোলা অভিনন্দন রইলো। কমতি হিসেবে মনে হয়েছে বইটার ডিটেইলিং হয়ত আরেকটু বেশি করা যেত। কিছু কিছু স্থানে একটু সংক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। তবে সেটাও যে দৃষ্টিকটু লাগার মত, এমনও না।
পারফেক্ট থ্রিলারের আদর্শ উদাহরণ বৃশ্চিক। কাল রাত জেগে বৃশ্চিক পড়েছি, বৃশ্চিক এমন স্থানে শেষ করেছে বৃশ্চিকচক্র না পড়লে আজকে রাতে ঘুমই আসবে না। সুতরাং ওটাও আজকে শুরু করে ফেলবো। যারা এখনো পড়েননি, তাদের জন্য মাথার পিছনে কল্পিত পিস্তল ঠে কিয়ে পড়তে বলে গেলাম কিন্তু।
বলব না এটা কোনো জনরার সবচেয়ে পছন্দের বই এইটি। কিন্তু বাংলার মৌলিকের ভেতর আমার পড়া সবচেয়ে কমপ্লেক্স প্লট আর পার্ফেক্ট এক্সিকিউশ নিয়ে কথা উঠলে আমার মুখ থেকে বৃশ্চিক এর নাম আসবেই।
থ্রিলারে পুলিশ প্রসিডিউরাল জনরাটা বেশ জনপ্রিয়। খুন হবে, গোয়েন্দা/ পুলিশ তদন্তে নামবে, সূত্র খুঁজে পাবে, গ্রেফতার করবে, ইন্টারোগেট করবে, শেষে এসে অনেকগুলো সুতো জোড়া লাগিয়ে রহস্যের সমাধান বের হবে। যতোই পড়ি না কেনো, এই ধারাটার আবেদন কমে যায় না কখনোই। আমাদের দেশীয় মৌলিকে "পিউর" পুলিশ প্রসিডিউরাল বই এর আগে আমার পড়া হয়নি। পুলিশ প্রসিডিউরাল ব্যাপারটা থাকলেও, দেখা যেতো গল্পে আরো বেশকিছু জনরার ব্লেন্ড করা হয়েছে। নিখাঁদ পুলিশ প্রসিডিউরাল পড়েছিলাম অনুবাদ বইয়ে৷ তা সেটা যতো নিখাঁদই হোক না কেনো, দেশীয় ফ্লেভারটা মিসিং ছিলো।
সেটাও পূরণ হয়ে গেলো পিয়া সরকারের বৃশ্চিক পড়তে গিয়ে। হোক না সেটা ওপার বাংলার ফ্লেভার, কিন্তু ভাষা, সাংস্কৃতিক কিংবা অন্যান্য অনেক ব্যাপারে আমরা বেশ কাছাকাছিই তো। তাই না! এক কথায় দূরন্ত, দূর্দান্ত একটা বই, যার আগাগোড়া পুরোটা মুড়ে আছে "সত্যিকারের" পুলিশ প্রসিডিউরাল দ্বারা। মাত্র ১৩৫ পৃষ্ঠায় এতো রহস্যময়, গ্রীপিং এবং ডিটেইলড বই খুব কম পড়া হয়েছে এর আগে৷ লেখিকা এখানে "ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীত" গাইতে বসে যাননি। বইয়ের শুরু থেকে স্রেফ রহস্যকে টেনে নিয়ে গিয়েছেন। গল্পের প্লট, এক্সিকিউশান, ব্যাকস্টোরি, টুইস্ট এই সবকিছুর পাশাপাশি "প্রায়" দেশীয় একটা ফ্লেভার বইটা পড়ার আনন্দটাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
এতো অল্প পরিসরের গল্পেও উঠে এসেছে রাজনৈতিক, সামাজিক, পারিবারিক বেশ কিছু অংশ। শুরুতে অনেক বছর পূর্বের একটা "দূর্ঘটনা", এরপর একটা খুন, ভিকটিমের পরিবারের অতীত ইতিহাস, তদন্ত, সূত্র, রহস্য, রাজনৈতিক এবং কর্মক্ষেত্রের টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত ইতিহাস, সব মিলিয়ে পাঠক মুগ্ধ হয়ে পড়ে যেতে বাধ্য বইটি। এগুলোর বাইরেও ব্যক্তিগতভাবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে দর্শনা বোসের সন্দেহভাজনদের "জেরা" করার অংশগুলো। শেষে এসে যখন মনে হবে; নাহ, এবার খুনী এবং খুনের রহস্যটা বুঝেই ফেলেছি। তখনই গল্পে চলে আসবে নতুন মোড়, যদিও এটাই শেষ নয়, শেষে অপেক্ষা করছে আরো বড় ধাক্কা! এই বইতে কোনো গোঁজামিল নেই। বইয়ের শুরু থেকে একদম শেষ পর্যন্ত ঘটা প্রতিটা ঘটনার এবং অভিযুক্তকে ধরার প্রতিটা ডিটেইলস পারফেক্টলি এক্সিকিউট করেছেন লেখিকা।
চরিত্রের সংখ্যাও নেহাত কম ছিলো না। অল্প কথায় প্রতিটা চরিত্রকেই পাঠকের মাথায় গেঁথে দিতে সক্ষম হয়েছেন লেখিকা। এমনকি যে মেয়েটা খুন হয়েছে, আক্ষরিক অর্থেই লাশ হওয়া বাদে বইয়ে যার কোনো ভূমিকা ছিলো না; তার জন্যেও পাঠকের মনে মায়ার জন্ম নিবে এই চরিত্রায়নের গুনে। বইয়ের একমাত্র আক্ষেপ হলো গল্পের মূল প্রোটাগনিস্ট দর্শনা বোসের চরিত্রকে বুঝতে পারলেও, তাকে এজ এ পারসন কল্পনা করে নেয়ার মতো করে ফুটিয়ে তুলননি লেখিকা।
#ব্যক্তিগত_রেটিংঃ ০৯/১০ (এই বইয়ের গল্পের রহস্যটা শেষ হলেও, এরচেয়ে বড় চমকের মাধ্যমে আরেকটা রহস্যকে সামনে এনে বইটাকে শেষ করে দেয়া হয়েছে। সেই রহস্যের সমাধান (বৃশ্চিকচক্র) হাতের কাছেই থাকায়, অবশ্য ক্লিফহ্যাঙ্গার রেখে দেয়াটা মন্দ লাগেনি)
#প্রোডাকশনঃ প্রোডাকশনের শুরুতেই বলতে হয় পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদটার কথা। খুব সিম্পল এই প্রচ্ছদটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। বাদবাকী গোটা বইয়ের প্রোডাকশনও টপ নচ। বানান ভুল চোখে পড়েনি।
শুরুর দিকটা তালগোল পাচ্ছিলাম না ধরেই নিয়েছিলাম যেমন চাচ্ছি তেমনই হবে তবে গল্পের জল গড়িয়ে যে থেমে বৃষ্টির আভাসটা একদমই ধরতে পারিনি। এ যেনো সূর্য দেখে হসনে খুশী আড়ালে তার মেঘের ঘনঘটা হাসে!
বইটা বেশ ভালো লাগছে। বাংলা ভাষায় এতো দারুন পুলিশ প্রসিডিওরাল লেখা হচ্ছে এটাও আনন্দের বিষয়। বাংলার বেশিরভাগ পুলিশ প্রসিডিওরাল পড়লে মনেহয় গোয়েন্দা সাহেব হয় ম্যাজিশিয়ান, নয়তো অন্তর্যামী, নয়তো সৃষ্টিকর্তা উঠে পড়ে লেগেছেন কাকতালীয় ঘটনা দিয়ে হোক আর অযৌক্তিক ঘটনা দিয়ে হোক গোয়েন্দাপ্রবরকে জিতিয়ে ছাড়বেন। যাহোক, দাশু তথা দর্শনা ব্যতিক্রম। ঘটনাক্রমে অন্ধকার থেকে অন্ধকারতর দিকে এগিয়েছে আর সূত্র ধরে তার পিছু পিছু এগিয়েছে দর্শনা। আমি জানি এটা নভেলা, যার কারণে ডিটেইলিং কম থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তারপরও, প্রচুর পরিমানে কনেলি পড়ার কারণে এখন অভ্যাস খারাপ হয়ে গেছে, যার কারণে ডিটেইলিং খুঁজি। ফলশ্রুতিতে এই এক তারা কর্তন। লেখকের জন্য শুভকামনা এবং খুব শীঘ্রই সিরিজের পরের বইখানা পড়ব।
" প্রাপ্তবয়স্কের কোনো নস্টালজিয়া নেই; আছে ভবিষ্যত রক্তমাংস-বিনা!! এই তুচ্ছ বেঁচে থাকা_ অপ্রাপ্তবয়স্ক ঠাট্টা_ একে আমি আস্টেপৃষ্টে ঘেন্না করি;"
পশ্চিমবঙ্গের একটি মফস্বল শহর নবগ্রাম।স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চরিত্র মনিরঞ্জন হাওলদারের ছোট মেয়ে মৌপিয়া সরকার খু/ন হলো।সদ্য মেডিকেলে চান্স পাওয়া মৌ এর বডি পোস্টমর্টেম করে রে/পের আলামত ও পাওয়া গেলো। তদন্তের ভার পড়ে পশ্চিমবঙ্গের ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টের সাব ইনস্পেক্টর দর্শনা বোসের কাঁধে।তদন্তে প্রাথমিক সাসপেক্ট হিসেবে বিধান নামের এক ছেলেকে ধরা হলো। বিধান গনেশ হুই এর ভাতিজা যাকে নিজের ছেলের স্নেহে বড় করেছে গনেশ হুই। এদিকে দর্শনা গনেশ হুই কে নিজের গুরু হিসেবে জানতো।
একটি সাধারণ খু/নের তদন্ত করতে গিয়ে বেড়িয়ে আসলো আর্মস পাচারের মত বিশাল কিছু।তবে কি মৌপিয়ার খু/নের পিছনে অন্য কোন রহস্য রয়েছে? এদিকে নিজের অতীতের তিক্ত স্মৃতি স্মরনে আসতে থাকলো দর্শনার।যে স্মৃতিকে আজো নিজের ধাঁধাঁ মনে হয়।সেই ধাঁধা সাথে নিয়ে দর্শনা মৌপিয়ার কেসটার তদন্ত করে যায়।কেসটা তে বিশাল কোন ঘাপলা রয়েছে যেনো।আর সেই সকল ঘাপলা যেনো মৌপিয়ার নিজের বাড়িতেই লুকানো।
মানসিক ভারসাম্যহীন মা মঞ্জু হালদার,,বর্ধমানে চাকরী করা বোন প্রিয়াংকা,একসময় এর রেলমাস্টার মামা কমল মিত্র, দূর্নীতিগ্রস্থ বাবা মনি হালদার সবাই মিলে যেনো কেসটা জটিল করে তুললো।
কেসটা নিয়ে দর্শনা প্রথম থেকেই আগ্রহী হলেও যখন উপরমহল ও আগ্রহ দেখানো শুরু করলো তখন কেস সমাধান করার জন্য দর্শনা উঠে পড়ে লাগলো। নেহায়েত খু!ন ও ধ!র্ষন এর কেস নাকি এর পিছনে আরো জটিল কোন ষড়যন্ত্র রয়েছে?
পাঠপ্রতিক্রিয়া: "বৃশ্চিক " বইটির ভাজে ভাজে রহস্য ভরা।মাঝারী আকাঁড়ের এই বইটি পড়তে গিয়ে বারেবার বিষম খেয়েছি।প্রতিটি প্লটের একেকটি নামকরণ ভাল লেগেছে আমার।এছাড়া যেহেতু গল্পের মূল ছিলো নারী চরিত্র তাই আরো আগ্রহ পেয়েছি পড়তে।প্রথম দিকে জটিল না মনে না হলেও ধীরে ধীরে যেভাবে রহস্য জটিল করে তুললো পাঠক তাই বইটি ধরলে শুরু করে শেষ অবধি পড়তে বাধ্য। এখানেই ওপার বাংলার লেখিকা পিয়া সরকারের লেখনী কতটা শক্তিশালী তা আন্দাজ করা যায়। এছাড়া দর্শনা চরিত্রটি এমনভাবে রুপ দিয়েছেন লেখিকা বইটি পড়তে গিয়ে মনে হবে সত্যিকার কোন চরিত্র সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন যেনো।তেমন আহামরি কোন বাহ্যিকতা ছাড়া সুন্দরভাবে উপস্থাপন কোন নারী চরিত্র খুব কম বইয়েই পেয়েছি।
এমনকি শেষে যে টুইস্টগুলো ছিলো এগুলো বেশ উপভোগ্য মনে হয়েছে।সমাপ্তি পাঠক কে মুগ্ধ করবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়।আর বইয়ে লেখিকার পরবর্তী বই "বৃশ্চিকচক্র" নিয়ে দারুন তথ্য দেওয়া আছে। ব্যাপক কলেবরের রহস্য "বৃশ্চিক"। পড়ার পর অনেকসময় ঘোর চেপে ছিল মাথায়। পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদ দারুন সুন্দর ছিলো।বইয়ের সাথে যেন হুবহু মিলে যায়! বইতে কোন বানান ভুল পাইনি। পৃষ্ঠা ও বাইন্ডিং চমৎকার।যেকেউ বইটি নিশ্চিন্তে পড়া শুরু করতে পারেন।
বহু, বহুদিন পরে একটা কলকাতার মার্ডার মিস্ট্রি, থ্রিলার জনরার উপন্যাস পড়ে দারুন লাগলো।
বর্ধমানের এক মফস্বল শহর নবগ্রাম। সেই অঞ্চলের নামকরা এক উঠতি রাজনীতিবিদ মণিরঞ্জন হালদারের ছোট মেয়ে দারুন মেধাবী মৌপিয়া হালদার। সেই মৌপিয়া হালদারকে এক রাতে পৈশাচিক অত্যাচার করে মেরে ফেলা হলো, এবং মৃত্যুর পরে তার সাথে এমন একটা কাজ করা হলো, যেটা একজন সাইকোপ্যাথের পক্ষেই সম্ভব। একসময়ের পুলিশের ইনফর্মারের কাজ করা দর্শনা বসু দায়িত্ব নিলো এই কেসের, দর্শনার নিজেরও রয়েছে একটা বাজে অতীত। কেসের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই সে জড়িয়ে গেলো অদ্ভুত হালদার পরিবারের সাথে। চারপাশে অনেক লোক কিন্তু কে সত্য বলছে, কে মিথ্যা বলছে বোঝার উপায় নেই। এমনকি ভরসা করার মতোও কেউ নেই। দর্শনা পড়লো বিশবাঁও জলে।
লেখিকার সবচেয়ে বড় সার্থকতা হলো, ১৩৪ পৃষ্ঠার একটা বইয়ে রহস্য, সাসপেন্স, পুলিশ প্রসিডিউরাল, মানবমনের ডার্ক সাইকোলজি, মিথ্যা, ঘৃণা, প্রতারণা এসব ব্যাপারগুলো খুব ভালোভাবে তুলে ধরেছেন। লেখিকা জানেন তিনি কী বলতে চাচ্ছেন এবং সেটা পারফেক্টলি বলতে তিনি সক্ষম। এ কারনেই বৃশ্চিক এত ভালো লাগলো।
ক'দিন আগেই দেখেছিলাম ওয়েব সিরিজ ছোটলোক, যেখানে এসআই সাবিত্রী মন্ডল চরিত্রে দারুন অভিনয় করেছিলেন দামিনী বেনী বসু। এবার দেখলাম আরেকজন দর্শনা বসুকে। পশ্চিমবঙ্গে নারীশক্তির উত্থান ঘটছে, ভাবতে ভালোই লাগছে।
নবগ্রামের স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা মণিরঞ্জন হালদারের ছোট মেয়ে মৌপিয়া খুন হয়। প্রবল মেধাবী ও গুণী এই মেয়েটির খুনের তদন্তে নামেন পুলিশ গোয়েন্দা দর্শনা বোস। তার সাথে মণিবাবুর ব্যাংক থেকে তুলে আনা টাকা উধাও হাওয়া, বহুবছর আগে মৌপিয়ার মামার রহস্যজনক মৃত্যু, তার মায়ের টালমাটাল মানসিক অবস্থা, বন্ধু বিধানের বাবার খুনের সূত্র ধরে চলতে থাকে তদন্ত।
গল্প বলার ধরণ অসাধারণ। তবে যেহেতু ছোট আকারের উপন্যাস তাই চরিত্রের বিশ্লেষণ কম, তদন্তের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে বেশি। সাইকোলজি, ফরেনসিক, এবং সবশেষে ফিজিক্সের অসাধারণ মিশেলে চলতে থাকা তদন্ত আপনাআপনি পাতার পর পাতা উল্টে দেয়। যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য উপন্যাস পিয়া সরকারের ' বৃশ্চিক '।
বইটার বেশ ভালো রিভিউ দেখলেও দীর্ঘদিন যাবত পড়া হয়নি। কলকাতার থ্রিলার বা হররের গতানুগতিক ধারা দেখেও হয়তো বা অনীহা তৈরি হয়েছিলো। তবে শেষ মৃত পাখি পড়ে আমার ধারণা বেশ অনেকটাই বদলে গেছে কলকাতার থ্রিলারের ব্যাপারে। এরপর হুট করেই পড়া শুরু করলাম এবং এক বসাতেই শেষ করেছি। পরিপাটি, সুন্দর লেখনশৈলীর, কমন একইসাথে আনকমন প্লটের বই।
তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখিকার গল্প বলার ধরন। প্রোটাগনিস্ট অতিমানবীয় কেউ নন, সাধারণ এবং ক্ষতবিক্ষত অতীতের। তার বন্ধু সুমন্তের কথা বলার ধরন রিয়েলিস্টিক। বাস্তবে বন্ধুরা এভাবেই কথা বলে। গল্পের শেষে নতুন টুইস্ট দিয়েছেন গনেশদাকে নিয়ে লেখিকা সেটাও চমকপ্রদ ছিলো। সবমিলিয়ে উপভোগ করেছি জার্নিটা
কাহিনি সংক্ষেপঃ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের কাছাকাছি এক মফস্বল শহর নবগ্রাম। এখানকার স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি মণিরঞ্জন হালদারের ছোট মেয়ে মৌপিয়া হালদার খুন হলো। সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ মেয়েটাকে শুধু খুনই করা হয়নি, ধর্ষণের আলামতও পাওয়া গেলো ক্রাইম সিন থেকে। ইন্সপেক্টর দর্শনা বোসকে দায়িত্ব দেয়া হলো এই কেসটা সলভ করার। একজন সন্দেহভাজনও গ্রেপ্তার হলো। স্থানীয় এক তরুণ বিধান, যে কি-না আবার রাজনীতির সাথে জড়িত। কিন্তু বিধানকে ছাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন গনেশ হুঁই, যাঁকে দর্শনা নিজের মেন্টর হিসেবে মানে।
পুলিশ ফোর্সে একজন নারী ইন্সপেক্টরকে যা যা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়, ইন্সপেক্টর দর্শনা বোসকেও হতে হয়। কিন্তু সেসবকে সে পাত্তা না দিয়ে নিজের কাজ করে যেতে থাকে। সহকর্মী রণদীপ সামন্তের সাথে মিলে সে মৌপিয়া হালদারের ধর্ষক ও খুনীকে খুঁজে বের করার চেষ্টা চালিয়ে যায়। কিন্তু খটকার শুরু যেন ভিকটিমের নিজের বাড়ি থেকেই। বাবা মণিরঞ্জন হালদার, মানসিক ভারসাম্যহীন মা মঞ্জু হালদার, বাইরে চাকরি করা বড় বোন প্রিয়াঙ্কা হালদার, বড় মামা কমল মিত্র সহ সবাই যেন রহস্যটা আরো গাঢ় করে তুললেন। সবারই কোন না কোন অতীত আছে। তবে কি কোন একজনের অতীতই কি মৌপিয়া'র এই করুণ পরিণতির জন্য দায়ী?
আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হওয়া এই রেপ অ্যান্ড মার্ডার কেসটাতে খোদ ওপরমহলও বেশ আগ্রহী দেখা গেলো। ভিকটিমের খুনের সাথে জুড়ে গেলো স্থানীয় রাজনীতির ব্যাকগ্রাউন্ড, যেখানে উঁকি মারলো আরো একটা সমাধান না হওয়া রহস্য। খুব সতর্কভাবে এগোতে লাগলো দর্শনা। এবার তাকে ঝাঁপ দিতে হবে মানবমনের অন্ধকার হ্রদের গভীরে। তবেই পাওয়া যাবে উদ্ভূত সব রহস্য সমাধানের চাবিকাঠি।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ চমৎকার একটা পুলিশ প্রোসিডিউরাল পড়লাম। কলেবরে ছোট হলেও 'বৃশ্চিক'-এর বিষয়বস্তু ও এক্সিকিউশনে 'দম' আছে। ওপার বাংলার লেখিকা পিয়া সরকার এমন এক কাহিনির অবতারণা করেছেন তাঁর এই উপন্যাসে, যেটা শুরুর দিকে খুব সাধারণ কিছু মনে হলেও যতো এগিয়েছি ততোই অবাক হয়েছি। পড়া শেষ করে মনে হয়েছে পারফেক্ট একটা থ্রিলার পড়লাম।
মার্ডার মিস্ট্রি ও পুলিশ প্রোসিডিউরালের মিশেলে লেখা 'বৃশ্চিক'-এর পরতে পরতে ছড়িয়ে ছিলো রহস্য আর থ্রিলের নানা উপকরণ। লেখিকা কাহিনিটা বলার জন্য কোন তাড়াহুড়ার আশ্রয় নেননি, বরং ধীরস্থিরভাবে এগিয়েছেন। যে পরিকল্পনা হাতে নিয়ে তিনি পাঠককে চমকের মুখোমুখি করেছেন, তা পারফেক্ট লেগেছে আমার কাছে। সবচেয়ে বড় কথা, 'বৃশ্চিক'-এর সমাপ্তি আমাকে মুগ্ধ ও আগ্রহী করে তুলেছে। 'আগ্রহী' শব্দটার অবতারণা এই কারণেই যে, এই উপন্যাসের শেষে লেখিকার পরবর্তী উপন্যাস 'বৃশ্চিকচক্র'-এর ইন্টারেস্টিং একটা হিন্ট দেয়া হয়েছে। ওটাও কোন এক সময় পড়ার আশা রাখি।
'বৃশ্চিক' পড়ার সময় নির্দিষ্ট একটা চরিত্রের ওপর সীমাহীন রাগ আর ঘৃণা আসছিলো আমার ভেতরে। মনেই থাকছিলো না সে কোন উপন্যাসের চরিত্র, রক্তমাংসের কোন মানুষ না। এখানেই লেখিকার সার্থকতা। চরিত্রটার নাম এই পাঠ প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখ না করি। স্পয়লার হয়ে যাবে। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, 'বৃশ্চিক' একটা উপভোগ্য বই ছিলো আমার জন্য।
পরাগ ওয়াহিদের করা প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছে। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'বৃশ্চিক'।
বৃশ্চিক পিয়া সরকার জনরা: মার্ডার মিস্ট্রি, থ্রিলার রেটিং: ৪/৫
সংক্ষিপ্ত পাঠ-পতিক্রিয়া: কাহিনির শুরু হয়ে একটা মৃত্যু দিয়ে। মৃত্যু কি ভুলে হয় নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে অর্থাৎ খুন করা হয় সেটা দোটানায় রেখে লেখিকা মূল কাহিনিতে প্রবেশ করেন। এরপর শুরু হয়ে আসল খুন দিয়ে। তদন্ত শুরু থেকেই চরম গতিতে এগিয়েছে। প্রতিটা অধ্যায় টানা টানা পড়ে গেছি। থামার একরত্তি সুযোগ নেই। এ যেন একটা রোলার কোস্টার রাইড। প্রতিটা চ্যাপ্টারের একটা একটা নাম ছিল, নামগুলো জোস জোস নাম। নামের সাথে অবশ্য অধ্যায়ের মিল আমি খুঁজিনি, শুধু পড়ে গেছি একটানে। লেখিকার লেখনশৈলী বেশ ঝরঝরে, পরিপক্ক হাতের লেখা। আরামসে পড়া যায়। তবে বাংলার মাঝে অনেক ইংলিশ ব্যবহার করা হয়েছে। যা আমার কাছে একটু খারাপই লাগে। সংলাপগুলোও বেশ মজাদার। তদন্ত প্রক্রিয়াও বেশ ভালো লাগে। চরিত্রগুলোও ভালো লেগেছে। দর্শনা বোসকে বেশ ভালো লাগে। টুইস্টগুলোও ভালো ছিল। শেষটাও ভালো ছিল, তবে একটু রহস্য রাখা হয়েছে। তবে সবশেষে বলা যায় মৌলিক হিসেবে বেশ ভালো বই। চাইলেই পড়তে পারেন, উপভোগ্য হবে আশা করি।
"একটা ক্রাইম যখন হয়, তখন সেই ক্রাইমের মনস্তত্ত্ব বুঝতে পারাটাই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ক্রিমিনালের নয়, ক্রাইমের মনস্তত্ত্ব। নতুন কথা নয়, যুগে যুগে স্টলওয়ার্টরা বলে গেছেন এ কথা। তবে আমার সবথেকে যেটা প্রাসঙ্গিক লাগে, সেটা নোয়াম চমস্কির বলা, 'ফর দ্য পাওয়ারফুল, ক্রাইমস আর দোজ দ্যাট আদার্স কমিট।' যুগে যুগে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। আমরা যা দেখতে পাই, বুঝতে পারি, তার ভিতরে আরেকটা অবোধগম্য জগত আছে, যেটা ক্রাইমকে পরিচালিত করছে। তোমাকে সেটা অবধি পৌঁছাতে হবে দর্শনা।" A perfect mystery