গোয়েন্দা নেই এ গল্পে, তবে রহস্য আছে। খুন আছে, তবে খুনি অজানা। আছে অনেকগুলো চরিত্র, কিন্তু তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন কে?
বইমেলার বাইরে ঘটে গেলো নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড। জনপ্রিয় লেখকের মৃত্যুতে কেঁপে উঠলো সারাদেশ। নানাজন দিতে শুরু করলো নানা মত, কিন্তু আসল মোটিভ কেউ বুঝতে পারছে না। নিজের অজান্তেই এই রহস্যে জড়িয়ে যায় আরেক তরুণ লেখক। লেখকচক্রের জটিল জগতের পুরনো বাসিন্দা সে, কিন্তু হারিয়ে যাচ্ছে বিপজ্জনক সব নতুন অনুসন্ধানে। ধীরে ধীরে তার সামনে স্পষ্ট হচ্ছে নিষ্ঠুরতার অবয়ব।
তানজীম রহমান-এর চতুর্থ উপন্যাস আপনাকে নিয়ে যাবে আধুনিক থৃলার সাহিত্যিকদের অদেখা পৃথিবীতে। লেখক রাহাতের সাথে এই যাত্রায় উন্মোচিত হবে গোপন সব তথ্য, খুলে পড়বে মুখোশ, বদলে যাবে অনেক ধারণা।
আর অবয়ব-এর পাতায় আপনি খুঁজে পাবেন অন্যরকম এক রহস্যোপন্যাস।
প্রথম উপন্যাস আর্কন (কমবেশি দুর্দান্ত) পড়ার দীর্ঘ পাঁচ বছর পর তানজীম রহমানের আরেকটা উপন্যাস পড়লাম। এটাও বেশ ভাল লেগেছে। তানজীম রহমানের লেখা দারুণ সাবলীল, প্রাঞ্জল ঝরঝরে বর্ণনাভঙ্গি। প্রথম ১২৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত তেমন কিছুই ঘটে না কেবল কেন্দ্রীয় চরিত্র রাহাতের ব্যক্তিগত লেখালেখি নিয়ে চিন্তাভাবনা, আর তার লেখক-সার্কেলের মধ্যকার কাজকারবার, তবু তরতর করে পড়া গেছে। কেন্দ্রীয় লেখক চরিত্রটি বলা যায় অনেক দিক থেকে লেখকেরই আংশিক প্রতিবিম্ব, কিছুটা তার লেখালেখি-সংক্রান্ত আশেপাশের চরিত্রগুলিও, তাই মিল-অমিল সহজেই খুঁঁজে পাওয়া যায়, মজা লেগেছে কোন চরিত্রটি বাস্তবের কোন চরিত্রের ওপর ভিত্তি করে বানানো তা আন্দাজ করতেও। তবে উল্লিখিত ১২৪ পৃষ্ঠার পর অকস্মাৎ জনরা পাল্টে যাওয়াটা হজম করতে কিঞ্চিত কষ্ট হয়েছে।
উপন্যাসটা পড়তে শুরু করেছিলাম মার্ডার মিস্ট্রি হিসেবে, বইটির ব্যাককভার সংক্ষেপও এটাই বুঝিয়েছে যে উপন্যাসটি: "অন্যরকম এক রহস্যোপন্যাস", "খুন আছে তবে খুনি অজানা। আছে অনেকগুলো চরিত্র, কিন্তু তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন কে?", "লেখক রাহাতের সাথে এই যাত্রায় উন্মোচিত হবে গোপন সব তথ্য, খুলে পড়বে মুখোশ, বদলে যাবে ধারণা"। এসবে অমনটাই উপণীত হওয়া যায় যে বইটি নিখাঁদ রহস্যোপন্যাস, একজন লেখকের খুন আর খুনিকে অনুসন্ধান নিয়ে আধুনিক থ্রিলার লেখকদের সার্কেলের ভেতরকার কাহিনী, যাতে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে, ধারণা বদলে যাবে আর গোপন তথ্য উন্মোচিত হবে... আচমকা সেই গল্প উদ্ভট-ভৌতিক সব ঘটনাক্রমময় সুপারন্যাচারাল থ্রিলার হয়ে গেল। লেখক-সার্কেলের সঙ্গে আর কোন সম্পর্কই নেই। যেকোন জনরাভিত্তিক বই পড়ার সময় পাঠকের একধরনের প্রিএক্সিস্টিং মানসিকতা থাকে কোন ঘরানার বই পড়া হচ্ছে, সেখানে বড়রকম ধাক্কা লেগেছে। আমি ভৌতিক/হররের তেমন ভক্ত না, তাই রহস্যোপন্যাসে অতিপ্রাকৃত ঘটনাপ্রবাহ শুরু হতে কিছুটা বিরক্তও লেগেছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে লেখক সম্ভবত ইচ্ছা করেই বিনানোটিশে এমনভাবে পরিস্থিতি বদলে দিয়েছেন, বাস্তবতার সাথে প্যারালাল তৈরি করতে, বাস্তব জীবন তো কখনো নির্দিষ্ট এক জনরা ফলো করে না। গল্পের লেখক চরিত্রটিও তখন নিজের চিন্তাভাবনায় বুঝতে পারছিল না তার জীবনে ঘটতে থাকা ঘটনাখাত আদতে কোন ঘরানার!
যাইহোক, আসল কথা হচ্ছে বইটি সুলিখিত, ও সুখপাঠ্য। এবং অতিপ্রাকৃত রোমাঞ্চোপন্যাস হিসেবেও গল্পের মূল প্লট ও সেটার এক্সিকিউশনে নতুনত্ব আছে। বর্তমানের হাজারো যত্রতত্র হরর আর সুপারন্যাচারাল বইয়ের ভীড়ে এমন বলতে পারা সমীহের দাবী রাখে। শুধু একারণেই ভৌতিকতার ঘনঘটার পরেও তাতে ভিন্নতা থাকায় শেষপর্যন্ত পড়ে বেশ তৃপ্তি পেয়েছি। সমাপ্তি, আমার দৃষ্টিতে অন্তত, যথেষ্ট জোরালো। পাশাপাশি লেখক পরিসমাপ্তিতে কী বলতে চেয়েছেন তাও সম্ভবত ধরতে পেরেছি, আর সেই বক্তব্যটাও আমার পছন্দ হয়েছে। নিজের ইচ্ছে মতো লেখার সাথে কোন আপস নেই, সে মৃত্যু অবধারিত জানলেও! ওয়েল ডান।
সবমিলিয়ে উপন্যাসটি যেমন ভেবেছিলাম (বা চেয়েছিলাম) তেমনটি না হলেও মনোযোগ আটকে রেখে উপভোগ্য, লেখকের লেখনি ধারালো, তার আইডিয়া ও মূলভাষ্য চমকপ্রদ ইউনিক। দিন শেষে এটাই তো আশা করা উচিত কারো লেখা থেকে। কমতি বলতে এতগুলি ইন্টারেস্টিং লেখক-চরিত্র আর চরিত্রদের বিস্তারণ প্রথমার্ধ জুড়ে - কে কেমন কার সাথে কার কিরকম সম্পর্ক: উপর দিয়ে আর ভেতর দিয়ে, প্রধান চরিত্রের তাদের প্রতি মনোভাব - অথচ সেসবের কোন প্রয়োজনই আর থাকেনি দ্বিতীয়ার্ধে। বলতে কি প্রয়োজন তো দূর পরবর্তিতে এদের আর পুনরাগমনই ঘটে না বলতে গেলে! অতিপ্রাকৃতের দিকে না গিয়েও এহেন কৌতূহলোদ্দীপক আধুনিক থ্রিলার লেখক-কালচারের পটভূমিতে ও আকর্ষনীয় লেখক-চরিত্রদের নিয়ে হয়তো আরেকটি অন্যধরনের নিরেট বাস্তবধর্মী খুনের রহস্যোপন্যাস লেখা যেতো। অথবা ইহা হয়তো চিরন্তন রহস্যপ্রিয় আমার ব্যক্তিগত পাঠকসত্ত্বারই প্রতিফলন। (অবশ্য কাহিনী সংক্ষেপে অতিপ্রাকৃতের একটুখানি আভাস দিলেও কি চলত না?)
শেষকথায় এটুকুই বলতে পারি, যারা অতিপ্রাকৃতের আবহে জড়ানো রহস্য পড়তে আগ্রহী বা মুক্তমনে নির্দিষ্ট জনরায় না ফেলে বইটি পড়তে আপত্তি নেই তাদের জন্য রেকমেন্ডেড, যারা কেবল রহস্য থ্রিলার ভেবে পড়তে ইচ্ছুক তাদের জন্য নট।
'অবয়ব' লেখক: তানজীম রহমান জনরা: অতিপ্রাকৃত রহস্য থ্রিলার প্রকাশনী: বাতিঘর প্রকাশনী প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি, ২০২০ পৃষ্ঠাসংখ্যা: ২২৪ আমার রেটিং: ৪/৫
বিঃদ্রঃ বাতিঘরের সাধারণ নিয়মানুসারেই বহু মুদ্রণ বিভ্রাট ছিল। কমবেশি অনেক ক'টি উপেক্ষা করা গেলেও বারবার 'উচ্ছাস' (উচ্ছ্বাস) আর 'নিশ্বাস' (নিঃশ্বাস) মেজাজ খারাপ করেছে। পুরো লেখাতে কিছু পর পরই 'যে' শব্দের মাত্রাতিরিক্ত প্রয়োগ সুখপাঠ্যতাকে একটু হলেও ব্যাহত করছে, সাবলীল লেখনির মাঝে ছোট ছোট স্পিডবাম্পের মতো ঝাঁকি দিয়েছে, অন্তত আমার কাছে। প্রচ্ছদ চলনসই। বাতিঘরের ২০২০ বইমেলার অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইটিরও পেজ কোয়ালিটি ও বাঁধাই পূর্বের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে।
রাহাত ফারায়েজি। সায়েন্স ফিকশন লেখক। নির্দিষ্ট প্রকাশনীর হয়ে লেখেন। খুব সুন্দর হেসেখেলে, লেখালেখি করে কাটছিল তার দিন। হুট করেই বইমেলাতে খুন হয়ে গেল একই প্রকাশনীর হরর লেখক শীর্ষ আবেদীন। কে খুন করল তাকে? খোঁজ করে জানা গেল একইরকম বীভৎস উপায়ে খুন হয়েছিল শীর্ষ আবেদীনের সহলেখক রবিউলও। শহরে কি আবারও কোনো সিরিয়াল কিলার হানা দিয়েছে নাকি জঙ্গিবাদ না অতিপ্রাকৃত কিছুর অস্তিত্ব? সকল প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে তানজীম রহমানের নতুন মৌলিক উপন্যাস অবয়বের মধ্যে।
এক বছর অপেক্ষার পর সুলেখক তানজীম রহমানের উপন্যাস অবয়ব প্রকাশ পেয়েছে এবারের বইমেলায়। দীর্ঘ অপেক্ষার পর এককথায় দারুণ একটা কাজ উপহার দিলেন বাংলাদেশের এযাবৎকালের অন্যতম সেরা হরর লেখক তানজীম রহমান। বাতিঘরের পাঠকদের জন্য এবারের কাজটা আরও স্পেশাল। অনেক পরিচিত, বিখ্যাত লেখকের রূপ বিভিন্ন আকারে ধরা দিয়েছে এই বইয়ে। কখনো রসবোধ, কখনো গম্ভীর আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে। লেখালেখি সম্পর্কে পাঠক বেশকিছু টিপস পাবেন বইয়ে। এবার আসি গল্পের প্রসঙ্গে। দারুণ রহস্য তৈরি করেছেন লেখক। ধীরে ধীরে রহস্যের জাল গুটিয়ে এনেছেন। তেমন কোনো টুইস্ট নেই। লেখনী স্ট্রং, উপভোগ্য। একঘেয়েমি লাগবে না। বইয়ে যথেষ্ট হরর এলিমেন্টস ছিল। লেখক কিছু স্বপ্নের বর্ণনা দিয়েছেন, কিছু ভয়ানক অস্তিত্বের কথা লিখেছেন যেগুলো গা শিউরে ওঠার মত। দুই একটা পরিস্থিতির বর্ণনা মাঝরাতে পড়তে গেলে অস্বস্তিবোধ হবে। শেষে সবকিছুর ব্যাখ্যা দিয়ে দারুণ সমাপ্তি টেনেছেন। পরিশিষ্ট দিকটাতেও পরবাস্তবতার ছাপ লক্ষ করা গেছে। প্রচ্ছদ দুর্দান্ত। তবে দুই এক জায়গায় প্রিন্টিং মিসটেক রয়েছে। হরর ও থ্রিলার প্রেমীরা নিঃসন্দেহে পড়তে পারেন উপভোগ্য এই বইটি।
- অবয়ব - রাহাত ফারাজী, বাংলাদেশের অহর্নিশ নামক এক প্রকাশনীর এক সাই ফাই লেখক। বইমেলার সময় অহৰ্নিশের কয়েকজন সহ রাইটারদের সাথে মেতে ছিলেন আড্ডায়। কিন্তু সেখানে ঘটে যায় এক অনাকাঙ্খিত ঘটনা। - পরের দিন খবরের কাগজে আসে সে অনাকাঙ্খিত ঘটনায় উপস্থিত থাকা একজন, হরর লেখক শীর্ষ আবেদীন নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। একটু ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে রাহাত ফারাজী আবিষ্কার করেন এ ধরণের খুন আরো বেশ কয়েকটি হয়েছে এবং তাদের সবাই লেখক। - এখন লেখকদের টার্গেট করে এ খুনগুলোকে খুন করেছে? শহরে কি নতুন সিরিয়াল কিলারের আগমন ঘটেছে? এটি কি কোন টেররিস্ট গ্রুপের কাজ ? নাকি লেখকদের পুর্ব পরিচিত কেউ এই কাজটি করছে ? অথবা এতে কি রয়েছে কোন অতিপ্রাকৃত শক্তির হাত ? নাকি এটি রাহাতের একটি ভ্রম ? তা জানতে হলে পড়তে হবে লেখক তানজীম রহমানের রহস্যপোন্যাস " অবয়ব "। - "অবয়ব" উপন্যাসটির শুরু বর্তমান সময়ের থ্রিলার লেখক সমাজ এবং এ প্রসঙ্গে রাহাত ফারাজী এর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। এর পরে কাহিনী নানাদিকে মোড় দিতে থাকে। বইটির কাহিনী প্রথম থেকে প্রায় শেষ পর্যন্ত বলা যায় খুবই টানটান এবং দুর্দান্ত। লেখক রিয়েল লাইফ ঘটনা এবং ফিকশন মিশিয়ে যে গল্পটি তৈরী করেছেন এক কথায় দারুন। তবে উপন্যাসটির ফিনিশিং খুব একটা মনোঃপুত হয়নি, বরঞ্চ কিছুটা ধোঁয়াশা লেগেছে। - চরিত্রায়নের দিক থেকে বইয়ের স্ট্যান্ড আউট চরিত্র রাহাত ফারাজী। নানা ধরনের ঘটনায় তার সাথে কানেক্ট হতে পেরেছি, বিশেষ করে গল্পের শুরুতেই বইমেলার ঘটনাটিতে। এছাড়াও প্রচুর সাইড ক্যারেকটার রয়েছে বইটিতে, যাদের অনেকের সাথে হয়তো বাস্তব কোন চরিত্রের মিল খুঁজে পেতে পারে পাঠক ! বইয়ের মাঝ থেকে শুরু হওয়া হরর এলিমেন্টগুলির ব্যবহারও সুচারুভাবে করা হয়েছে। আর লেখক তানজীম রহমানের নিয়মিত পাঠকরা এতে লেখকের সিগনেচার স্টাইলের লেখনী, ডার্ক হিউমার এবং নানা ধরনের ঘটনার ডিপ এস্টার এগ পাবেন, যার বেশ কয়েকটি অতি চমৎকার লেগেছে। - "অবয়ব" বইটির প্রচ্ছদ করেছেন দেওয়ান নজরুল বাপ্পি। চমৎকার এ প্রচ্ছদটি বইয়ের থিমের সাথে ভালোই মিলিয়েছে। বইয়ের বাধাই এবং কাগজের মান এবারে এ পর্যন্ত পড়া বইগুলোর মতোই চলনসই। - এক কথায় , লেখক তানজীম রহমান এবারে বেশ অন্যধরণের এক হরর থ্রিলার নিয়ে এসেছেন "অবয়ব" এর মাধ্যমে। যাদের একটু অন্যধরণের হরর/থ্রিলার পড়তে পছন্দ তাদের এ বইটি মিস করা উচিত হবেনা।
প্রথমে যখন পড়তে শুরু করেছিলাম তখন তেমন একটা আগ্রহ পাচ্ছিলাম না কিন্তু মাঝখান থেকে কাহিনী চরম ইন্টারেস্টিং হয়ে উঠে৷ পড়তে শুরু করেছিলাম নরমাল মার্ডার মিট্রি হিসেবে, পড়তে পড়তে সেটা সুপারন্যাচারাল হরর থ্রিলারে রূপ নেয়। প্লট ভালো। নতুনত্ব আছে। লেখার ধরনও বেশ ভালো। গল্পের শেষটা বেশ ধোয়াশা মনে হয়েছে। যাই হোক, সব মিলিয়ে নরমাল হরর থেকে আলাদা নতুন রূপে কিছু পড়ে মজা পেলাম। 🙂
মার্ডার মিস্ট্রি নামে পরিচিতি পাওয়া কোন বই এর ফ্ল্যাপে যদি লেখা থাকে "গোয়েন্দা নেই এই গল্পে, কিন্তু রহস্য ঠিকই আছে", তবে সেই একলাইনই যথেস্ট আগ্রহ জাগাবার জন্যে। আর যেহেতু তানজীম রহমানের বই নিয়ে আগে ভালো এক্সপেরিয়েন্স আছে, তাই কেনার আগে দ্বিতীয়বার ভাবার কোন প্রয়োজন হয় নাই।
রাহাত ফারাজী আমাদের এই বইয়ের নায়ক। সে লেখক। আধুনিক থ্রিলার রাইটার। এই থ্রিলার লেখা আর কয়েকটা পাবলিকেশন হাউজ, তাদের প্রকাশক, আর তাদের লেখকদের নিজেদের ভিতরের গল্প আর কলহ নিয়েই গল্প শুরু। অনেস্টলি, প্রথম ২৫ পাতায় কোনই টান পাচ্ছিলাম না। আমার মনে হয় যারা বইটা হাতে নিচ্ছে আর গত কয়েক বছরের বাংলা পাবলিকেশন আর বইমেলা নিয়ে বেসিক আগ্রহ আছে, তারা সবাই শুরুর দিকের ড্রামা পড়ে বইয়ের কোন ক্যারেক্টার আসলে রিয়েল লাইফে কে সেটা বের করার চেস্টা করবে। আমিও করসি।
এরপর একটা মৃত্যু, আর সেটা দিয়েই গল্পের শুরু। কে করলো, কেন করলো, সেটা বের করতে যেয়ে শেষ পর্যন্ত তেমন কোন টুইস্ট নেই। গল্প গল্পের গতিতে যাচ্ছে, আর তার সাথে আমাদের পাঠকদের আগ্রহ ও বেড়েই যাচ্ছে।
তানজীম সাহেব ভালো হরর লেখেন। আগের দুইটা বই পড়া আমার, আর্কন আর অক্টারিন, দুইটাই বেশ ভালো লেগেছে। এই বই এ তাই প্লেইন হরর ইলিমেন্ট কম থাকলেও খারাপ লাগে নাই। কোন জনরায় যে ফেলবো এই বই, সেটাই প্রশ্ন এখন। মিস্ট্রি আছে, কিন্তু সেটা উদ্ধার করার জন্যে গোয়েন্দা নাই। হরর আছে, অতিপ্রাকৃত ব্যাপার স্যাপার আছে, কিন্তু সেটার সল্যুশন করার জন্যে তেমন কেও নাই। এই গল্পের নায়ক-নায়িকারা জীবনে সেসব জিনিসের অস্তিত্ব মেনে নিয়েই চলছে, যা অবশ্যম্ভাবী তাকে এড়ানোর চেস্টা করেই যাচ্ছে। তবে শেষদিকে এসে সব জিনিস জেনেও লেখক রাহাতের ঘাড়ত্যাড়ামিটা ভালো লেগেছে, যা হয় হবে আমি আমার পথ ছাড়বো না - জিনিসটা এখন বেশ রেয়ার।
আফসোস রয়ে গেসে যে ভিলেনের (যদি ভিলেন আদৌ বলা যায় আরকি) ব্যাকগ্রাউন্ড বা মোটিভেশন বা সে কোন জাতেরই বা জিনিস সেটা নিয়ে ডিটেইলসে না যাওয়ায়, কিন্তু বইয়ের কাহিনীর সাথে মিল রেখেই জিনিসটা করা হয় নাই। বেশি কাহিনী বলে দিলে আবার সমস্যা কি না!
কাহিনীটা আমার কাছে অন্যরকম লাগার আরেকটা উইয়ার্ড রিজন আছে। এই কাহিনী কোথায় কি হচ্ছে প্রায় প্রতিটা জায়গা আমি চিনি, আমার বাসার কাছে, এই জায়গাগুলোতে আমার একাধিক বার যাওয়া হয়েছে। তাই নিজের বাসার সামনে অতিপ্রাকৃত জিনিসের আনাগোনার গল্প পড়তে বেশ অস্বস্তি লাগাটাই স্বাভাবিক। এটা সবার সাথে হবে না, কিন্তু ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের কিছু জায়গা আর বইমেলার উল্লেখ থাকায় অনেকেই রিলেট করতে পারবেন।
মোট কথা হলো আমার বইটা পড়ে ভালো লেগেছে, আমি সন্তুষ্ট। ইজিলি ৫ এ ৪ দিবো।
তানজীম ভাইয়ের বই নিয়ে বরাবর একটা আশা থাকে। এবারে আর আশাপূরণ হলো না। বইয়ের শেষদিকে এক তৃতীয়াংশ ভাল লেগেছে। তবে সমাপ্তির অংশটুকু বাদ দিয়ে। বাকিটুকু পড়তে হয়েছে পড়ার জন্য। শুরুর দিকে বর্ণনা আরও অনেকটাই কমিয়ে ফেলার সুযোগ ছিল। অধ্যায়গুলো অপেক্ষাকৃত সংক্ষিপ্ত করা গেলে ভাল লাগত। টুকিটাকি হালের স্ল্যাং, না লিখলেও তেমন কোনও ক্ষতি ছিল না বোধহয়।
গল্পে ভালর মধ্যে ছিল- তিথির সঙ্গে রাহাতের সম্পর্কের প্রগতি, রাহাতের অস্থিরতার খুঁটিনাটি দিকগুলো। লেখক হিসাবে বই সংক্রান্ত ভাবনাগুলোও যথেষ্ট বাস্তব ছিল। এছাড়া আধিভৌতিক বর্ণনা যথেষ্ট রোমহর্ষক হয়েছে।
সবশেষে বলব, উপরের কথাগুলো একান্তই ব্যক্তিগত অভিমত। প্রতিটি লেখকের কাছে প্রতিটি পাঠকের প্রত্যাশার যায়গাটা থাকে ভিন্ন। সুতরাং, মতামতে পার্থক্য হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই যারা পড়বেন ঠিক করেছেন তারা অবশ্যই বিচার করবেন নিজের আশার জায়গাটুকু থেকে। এই পাঠ প্রতিক্রিয়া থেকে কোনও বিশেষ অনুসিদ্ধান্ত না টানলেই উপকৃত হবেন।
প্রথমেই বলতে হয় একেবারেই ভিন্ন ঘরানার হরর উপন্যাস। হরর আমার বেশ প্রিয় জনরা, সেই সুবাদে অসংখ্য ভৌতিক, দেশী বিদেশী লেখকদের পড়া হয়েছে। এই লেখাটি অনেকখানিই ভিন্ন এবং অনেক চমৎকার!
মানুষ আসলে ভয় পায় কি? ট্র্যাডিশনাল বা ভৌতিক গল্প হোক, প্রচলিত মিথ কিংবা কিংবদন্তি হোক, সবগুলোর ভিন্ন কাহিনি আছে, ভৌতিক কারবারের পেছনে লজিক আছে। তার সাথে সাথে আছে সেটির বর্ণনা।
প্রত্যেকটি ভৌতিক চরিত্রকে আমরা রূপ দিয়ে পারি, দেখি কিংবা না দেখি। ভ্যাম্পায়ার থেকে শুরু করে ব্রক্ষ্যদৈত্য, শাকচুন্নি থেকে শুরু করে হেডলেস হর্সম্যান। নাম বলা মাত্র মাথায় তার চিত্র চলে আসে।
কিন্তু সত্তাটি যদি হয় অবয়বহীন? নিরাকার ভয় কি তবে আরো ভয়ংকর?
এই বইয়ের রিভিউ লেখার মতো ভাষা আমার কাছে নেই। বইয়ের কাহিনী সংক্ষেপ ফ্ল্যাপ থেকেই পাওয়া যাবে তাই নতুন করে কাহিনী সংক্ষেপ না লিখি। তার চেয়ে বরং কেন বইটা এইবারের বইমেলায় আমার পড়া সেরা বই তা নিয়ে বলি। বইয়ের কাহিনী শুরু বইমেলায়। আর এখান থেকেই মুগ্ধতার শুরু। খুব অল্প কিছু বাক্য, টুকরো টুকরো আশেপাশে কি হচ্ছে একটু করে জানতে জানতে হুট করে পুরো দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অল্প বাক্যে এত বাস্তব একটা পৃথিবী তৈরীর ক্ষমতা আমাকে মুহূর্তের মধ্যে একদম বশ করে ফেলে পুরোটা পড়ে ফেলতে। শুধু এই বইমেলার দৃশ্য না, প্রত্যেকটা লাইন যেন চোখের সামনে ঘটতে দেখছিলাম। এত বাস্তব লিখা। আরেকটা জিনিস খুব চোখে লাগল, গল্পের চরিত্রগুলো একজনের একটা বাক্য শেষ হওয়ার আগেই আরেকজন কথা বলা শুরু করছে। পড়েই মনে হলো, আরে তাই তো, বাস্তবে আমরা তো বেশির ভাগ সময়ই কথা শেষ করার আগেই কেউ একজন কথা বলে, এটা আগে অন্য কোনো লেখকের লেখায় কেন পড়লাম না! এই বিষয়টা মুগ্ধতা আরো দ্বিগুণ বাড়িয়েছে। লেখকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, লিখার সময় সেটার প্রয়োগ লেখকের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ বাড়িয়েছে। সবাই পড়ে ফেলুন সবাই পড়ে ফেলুন। 🙈
...বইটা শেষ করার পর আমি আসলেই অনেক বেশী কনফিউজড! উল্টেপাল্টে দেখলাম, কোনো পেজ মিসিং নেই তো! পরে টের পেলাম, এটাই সমাপ্তি.... তানজীম রহমানের প্রথম দুই বই আর্কন, অক্টারিন পড়ে লেখকের লেখার উপর অগাধ আস্থা তৈরি হয়েছিল। তাই বইটা কেমন, কারো কাছে না শুনেই চোখ বন্ধ করে কিনে ফেলি! বইটা পড়ার পর কেমন লেগেছে, সেটা আসলে এক কথায় বলা মুশকিল! বইটার কাহিনী আসলে দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম অর্ধেক অংশ পড়ে মনে হবে, এটা কোনো মার্ডার মিস্ট্রি। ফ্ল্যাপের লেখা পড়েও তাই মনে হয়। বইটার শুরুটা বেশ ভালো, বর্ণনাভঙ্গি থেকে সবকিছু একটু আলাদা ধাঁচের। বোঝাই যাচ্ছিল তানজীম রহমান নিজের লেখার স্টাইল অনেকটাই পাল্টেছেন। আর মূল কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি যেসব পার্শ্ব ঘটনাবলির অবতারণা করেছেন, সেগুলোর প্রশংসা না করলেই নয়! এই সাইড-কাহিনীগুলোই আমার কাছে অনেক বেশী ভালো লেগেছে! একদম ১০০ তে ২০০ পাওয়ার মত! শুরুর দিকে বইয়ের রিভিউ লেখা নিয়ে লেখক নিজের একটা perspective দেয়ার চেষ্টা করেছেন, যেটা বেশ ভালো ছিল। আর ঘটনাগুলো অনেক বেশী বাস্তব ছিল! সাধারণ লেখকরা কল্পনার একটা লেয়ার তৈরি করেন, অন্য একটা জগৎ তৈরি করেন। কিন্তু এখানে তেমনটা করা হয়নি। একদম বর্তমানের কথা বলা হয়েছে। গল্প লেখার জন্য লেখকদের এপ্রোচ থেকে শুরু করে শাহবাগের মেট্রোরেল বা পুরান ঢাকার গোলকধাঁধা- সবই একদম চোখের সামনে দেখা গল্প! বইয়ের প্রকাশনীর লোকজনের আলাপ কেমন হয়, সে বিষয়েও একটা perspective পেয়েছি। মানে বইটাকে থ্রিলার বানাতে লেখক শুধু থ্রিলে সীমাবদ্ধ থাকেন নি! সব এলিমেন্টই যোগ করেছেন! আর গল্পের প্রধান চরিত্রকে একদম God's righteous man বানান নি! দোষ গুণের মিল-মিশেই তৈরি করেছেন। কাহিনীর শুরুর দিকে লেখক অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা করিয়েছেন, যাদের কারোরই ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট খুব একটা হয়নি, কিন্তু প্রধান চরিত্র রাহাত ফরায়েজি আর তিথির চরিত্রের চরিত্রায়ন ভালোই ছিল বলা চলে। এতটুকু ছিল প্রথম অর্ধেকের কথা। I'm a big fan of that part. সবকিছু ভালোই চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই যেন বইটার জনরা চেঞ্জ হয়ে গেল। যেকোনো বই পড়লে শুরু থেকেই পাঠকের নিজস্ব একটা পারসেপশন থাকে। লেখক সেটাকে চুরমার করে দিয়ে নিজের মত করে এগিয়ে গেলেন, বইটা হয়ে গেল হরর! এখন এরকম rapid change যে খারাপ কিছু, তা আমি বলছি না, কিন্তু এই চেঞ্জটার কারণে বইয়ের শুরুর অর্ধেকে যেসব ঘটনা ছিল, সবই প্রায় অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এই ২য় পার্টটাতে আমরা পুরনো তানজীম রহমানকেই দেখতে পাই, হরর অংশটুকুতে ‘ভয়’ উপাদানটার যথেষ্ট প্রয়োগ হয়েছে, perfectly হয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই! কিন্তু, শুরুর অর্ধেক আর শেষ অর্ধেকের সামঞ্জস্য আমি করতে পারছি না। বইয়ের শেষটাও যেন হঠাৎ করেই হয়েছে। এমন অসমাপ্ত সমাপ্তিতে আমার কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু ঘটনাটা কি ঘটেছে, সেটাই আমি পরিষ্কার না। উল্টেপাল্টে দেখছিলাম, কোনো পৃষ্ঠা মিসিং কি না। ঠিকই ছিল। এবং এখন তবুও মোটামুটি ঘটনাপ্রবাহটা ধরতে পেরেছি। কিন্তু, এই এন্ডিঙের পেছনে রাহাতের মোটিফটা আসলে কি, সেটা এখনো পরিষ্কার না আমার আছে! বইয়ে ‘বিরুপকথা’ নামক একটা বইয়ের বেশ বড় রোল আছে। আবার উনি নিজেও অবয়বের পর ‘বিরুপকথা’ নামে একটা বই লিখেছেন। এটা সেই বইয়েই রেফারেন্স ছিল কি না জানি না। বইটা পড়ে দেখতে হবে। বইটা নিয়ে যে বিপুল পরিমাণ এক্সপেরিমেন্ট করেছেন তানজীম রহমান, তা বোঝাই যায়! তো, এই ছিল বইটা সম্পর্কে আমার মতামত। ফার্স্ট হাফ দারুণ লেগেছে, সেকেন্ড হাফ, নট সো শিওর। Personal Rating: 3.5/5 Thank you.
গল্পে ক্লাইমেক্সটা আসে একদম আধা লাইনে, ধুপ করে! একদম চমকে ওঠার মতো ব্যাপারটা। অনেক ক্ষণ লোডশেডিং এর পর হঠাৎ সামান্য আলোও যেমন বিরাট কিছুর জানান দেয় একদম সেরকম। আমি আর সবার মতো মার্ডার মিস্ট্রি ভেবেই বইটার সাথে আগাচ্ছিলাম। কিন্তু আদতে বইটা একেবারেই তা নয়। বইটি মূলতঃ একটা হরর জনরার বই। তবে পরিচিত কোনো ভয়ের গল্পের মতো নয় একেবারেই। আলাদা, অদ্ভুত ধাঁচের। এবস্ট্রাক্ট একটা লেখা। আমি লেখক তানজীম রহমানের লেখার ভক্ত হয়েছি বেশ আগেই। লেখকের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, গুছিয়ে গল্প বলা কিংবা ডিটেইলিং নিয়ে এর আগেও বলেছি। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বলা উচিত বোধহয় কল্পনাপ্রবণতার শক্তিটা নিয়ে। অসাধারণ!
বইয়ের শুরু থেকে শেষ প্রায় পুরোটাই ছিলো সংলাপমুখর। শুধু সংলাপের মধ্য দিয়ে গল্প বলানোয় অনেকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে পারে। তবে সংলাপের ভেতর দিয়েই লেখক বইপাড়া, একজন লেখক/প্রকাশকের ছোটছোট স্ট্রাগল, ব্যক্তি ও ব্যক্তিজীবন, লেখক কিভাবে চিন্তা করেন, বইপাড়ার কালচার ইত্যাদি খুঁটিনাটি ব্যাপার খুব সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন। মাঝেমাঝে কেমন যেনো পরিচিত পরিচিত গন্ধও ঠেঁকে নাকে এসে। এমনকি এখানে লেখক রিভিউয়ারদেরও একহাত দেখে নিয়েছেন!! সব খোলাসা করে আলাপ করাতে বেশ কিছু চিন্তায় পরিবর্তনও এলো আমার। দরকার ছিলো হয়তো একটা ভেতরকার দৃশ্য তুলে ধরা। মাঝে কাফকা, স্টিফেন কিং, মার্কেজ, আজিমভ ইত্যাদি বিখ্যাত লেখক থেকে শুরু করে দেশীয় আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শাহাদুজ্জামান, শহীদুল জহির প্রমুখ লেখকদের সাহিত্য নিয়ে আলোচনাও বেশ উপভোগ্য ছিলো। এসব সব কথা, সব আলোচনা, সব কিছুর মধ্য দিয়েই তিনি হঠাৎ গল্পটা শুরু করে দিলেন!
একজন লেখকের খুন হয়ে যাওয়া থেকে গল্পের শুরুটা হয়। এরপর তদন্তের বদলে অতিপ্রাকৃতিকতা নিয়ে এসে আরেক দফা চমক দেন লেখক। বইটায় লেখক গল্পের মাঝে একটা গল্প তৈরি করেন সবার অগোচরেই। এখানে 'বিরূপকথা' নামের একটি বইয়ের কথা বলা হয়। এই নামের বই লেখক সত্যি সত্যিই গতবছর বের করেন। যেটি অবয়বের পরে প্রকাশিত হয়। আর অবয়বের আগে আমার বিরূপকথা পড়া হয়েছিলো। সেজন্য ব্যাপারটা ইস্টারএগের চেয়ে কম কিছু লাগলোনা!!
যাহোক কথা আর বাড়াচ্ছিনা। আমার কাছে বেশ অন্যরকম একটা হরর লেগেছে আসলে। এখানে হরর সিনগুলো থেকে গল্পের ধরণ কোনোটাই সাধারণত আমরা যে ধরণের ভৌতিক বই পড়ে থাকি সেরকম নয়। এমনকি পরিশিষ্টটাও নির্ভর করছিলো পাঠক কল্পনার উপরই। ভয়ঙ্কর সময়ের অদ্ভুত বিবরণি পড়েও কল্পনা করতে পারছিলাম সহজেই। এই লেখা পড়ে সহজ কল্পনা করতে পারাটা প্রমাণ করে সুখপাঠ্য লেখনির কথা। পুরো কাহিনী জুড়ে একটা সাররিয়েলিস্টিক ব্যাপার ছিলো, যেটা আগে বাংলায় পড়িনি আমি। সব মিলিয়ে তাই দারুণ লেগেছে। পড়তে পারেন। আমি এই ধরণের বইয়ের সন্ধান পেলে আরও পড়তে চাই।
যেকোনো বইয়ের সবচেয়ে বড় সার্থকতা হচ্ছে বইটা ভাবাবে। পড়ার সময় ভাবাবে, পড়ার পরেও ভাবাবে। আর অতিপ্রাকৃতিক রহস্যের বই যদি এরকম ভাবায় তাহলে বলতেই হবে বইটা দুর্দান্ত। "আর্কন", "অক্টারিন" এর তানজীম রহমান "অবয়বে" পুরো নতুনভাবে আরো দুর্ধর্ষ রূপে ফিরেছেন। নীলক্ষেতের মত এরকম অতিপরিচিত বইয়ের গলির এরকম অন্ধকার বৃষ্টিভেজা অতিলৌকিক সেট আপ আর হাজার বার পাড়ি দেওয়া এয়ারপোর্টে রোডে রাতে অন্ধকার শক্তির উপস্থিতি তাক লাগিয়ে দেয়। বইয়ের বিল্ড আপ চমৎকার, মাঝে কাহিনির পালাবদল অসাধারণ আর শেষটা মুগ্ধতা ছড়ায়। একটাই সমস্যা, কেন্দ্রীয় চরিত্র রাহাত ছাড়া অন্য চরিত্রগুলো পূর্ণতা পায়নি। এরকম একটা বই শেষ করার পরে মনে হয় এটা নিয়ে একটা জম্পেশ আড্ডা দিতে পারলে কি ভালোই না হত।
বইমেলার উৎসবমুখর পরিবেশে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে একজন লেখকের নৃশংস খুনের মধ্য দিয়ে। এ উপন্যাসে বইমেলার চিত্র, বইপাড়ার নিত্যনৈমিত্তিক রাজনীতি, ক্যাচাল, এবং একজন লেখকের মাথায় বই রিভিউ নিয়ে কী ধরণের চিন্তা-ভাবনা কাজ করতে পারে, তা জীবন্তভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
গল্পের শুরুতেই সৃষ্টি হওয়া রহস্য পাঠকের মনে বিভিন্ন চিন্তার তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। এটি ঠিক গতানুগতিক সিরিয়াল কিলিং মিস্ট্রি হিসেবে পড়া শুরু হলেও ঘটনা-পরম্পরা চলে যায় পরাবাস্তবতার এক খণ্ডিত জগতে।
প্রথমে মনে করা হয়েছিলো এসব মার্ডার উগ্রপন্থী কোনো গোষ্ঠীর কাজ। পরে, প্রধান চরিত্র রাহাত ফারাজীকেও সন্দেহ করা হয়। রাহাত লেখালেখির মাধ্যমে অমর হতে চায়, মানুষের স্মৃতিতে থেকে যেতে চায় বহু প্রজন্ম। এজন্য তার লেখনিতে দরকার এক ধরণের ব্যালেন্স।
বইটির অন্যতম ভালো দিক হলো লেখালেখি নিয়ে রাহাতের সাথে অন্যান্য লেখকদের কথোপকথন। তানজীম রহমানের লেখায় প্রায় সব সময় দর্শনশাস্ত্রের কথাবার্তা, ইঙ্গিত থাকে। এ সকল দর্শন একদম নতুন কিছু নয়। তবে অল্পে, কার্যকরী পন্থায় লেখার ব্যাপারে তানজীমের দক্ষতার প্রশংসা করতেই হয়।
কিছু চরিত্রকে ঢাকার বইপাড়ার পরিচিত মানুষজনের মতো মনে হতে পারে। উপন্যাসটির একটি মজার দিক হলো কাহিনীর বিষয়বস্তু ধীর, কিন্তু পড়তে গেলে লেখকের বর্ণনা কৌশলের কারণে গল্পকথন বেশ গতিশীল।
চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে লেখক কয়েকটি মূল চরিত্রের ওপর বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। প্রথমার্ধে বিভিন্ন চরিত্র এবং ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দেওয়া হলেও দ্বিতীয়ার্ধে এসে অনেক কিছুই হয় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে বা প্রায় গায়েব হয়ে গেছে। এই দিকটায় লেখক আরও কাজ করতে পারতেন।
অবয়ব এ একটা টেনশন, মৃদু অস্বস্তি, এবং ভালো জ্যামিতিক কল্পনাশক্তির ব্যবহার (যা আরও ভালো হতে পারতো) সব মিলিয়ে এক ধরণের মানসিক ধাক্কা দেয়ার মতো মুহূর্ত তৈরি হয়েছে।
অবয়ব এর পুরো স্টোরিটেলিং আসলে দুই স্তরের। হরর-থ্রিলার হিসেবে পড়লে কেউ কেউ হতাশ হতে পারেন, কারণ লেখক সবকিছু রিডারকে চামচে করে মুখে তুলে দেননি। পাঠকের জন্য চিন্তা করার কিছু জায়গা ছেড়ে গেছেন তিনি।
রাহাত ফারাজী, উঠতি সাই ফাই লেখক যে কিনা ইতোমধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বইমেলাতে তার কোন বই না আসলেও বইমেলা ঘুরে ঘুরে, পরিচিত সার্কেলের সাথে আড্ডা দিয়ে বেশ কেটে যাচ্ছিলো তার সময়। কিন্তু হুট করেই বইমেলায় সহ-লেখিকার প্রাক্তন স্বামীকে নিয়ে একটা অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম হলো তাদের এই লেখক সার্কেলকে ঘিরে। আর এরপরেই খুন হলো হরর লিখে ভালো অবস্থান তৈরী করে ফেলা লেখক শীর্ষ আবেদীন। তাও আবার সাধারণ খুন নয়। বইমেলার বাইরে পাওয়া শীর্ষের মরদেহটি ছিলো ভেজা আর এক হাতের আঙ্গুল ছিলো ছেঁড়া/কাঁটা। কে আছে এই বীভৎস খুনের পেছনে? একটু খুঁজতেই জানা গেলো, কয়েক মাস আগে একই রকম আরেকটা লাশ পাওয়া গিয়েছিলো খুলনায়। ওটা রবিউলের, যার কিনা শীর্ষের সাথে একটা বইয়ের সহ-লেখক হবার কথা ছিলো। না চাইতেও এইসব খুনের ব্যাপারে কৌতুহল বোধ করে রাহাত। তবে সব কৌতুহল অজানা ভয়ে পরিণত হয় যেদিন বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় নীলক্ষেতের নির্জন ম্যাগাজিনের গলিতে তার সামনে খুন হয় আরেক লেখক। সেদিন রাহাত বুঝতে পারে, এগুলো কোন সাধারণ খুন নয়, এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোন অতিপ্রাকৃত সত্ত্বা। আর সেদিনই উল্টে যায় রাহাতের জীবনের গতিপথ। গার্লফ্রেন্ডের সাথে ব্রেক আপ, দৈনন্দিন রুটিনের ব্যাঘাত, রাত বিরাতে ভয় পেয়ে ওঠা রাহাত দাঁতে দাঁত চেপে সিদ্ধান্ত নেয়, এই রহস্যের শেষ তাকে দেখতে হবে। জানতে হবে কি আছে এই খুনগুলোর পেছনে।
এই ছিলো তানজীম রহমানের বই 'অবয়ব' এর অবয়ব। ওপরে যেগুলো লিখেছি তাতে আপাতদৃষ্টিতে স্পয়লার বলে মনে হলেও আমার ধারণা আমি স্পয়লার দিইনি। ইভেন এই বইটার পুরো কাহিনী বলে দিলেও সম্ভবত স্পয়লার হবে না। কারণ এই বইটা একেক পাঠকের কাছে একেক রকম ভাবে ধরা দেবে। অনেকের কাছে মনে হবে বইটা নিছক একটা হরর-থ্রিলার। তবে পাঠক হিসেবে আমার ধারণা, এই বইটাকে আপনি স্রেফ হরর থ্রিলার ভাবলে ভুল করবেন। এই বইটায় দুইটা লেয়ার আছে এবং হরর থ্রিলার লেয়ারটা বাদ দিলে যা পাবেন তা হচ্ছে নিখাঁদ দর্শন। এই দর্শনকে চাইলে অবজারভেশনও বলা যেতে পারে তবে তানজীম রহমান স্যারের 'আর্কন' পড়ে আর্কনের পেছনে যে দর্শন আমি দেখতে পেয়েছি তাতে করে 'অবয়ব' এর সেকেন্ড লেয়ারকে আমি দর্শনই বলবো। তবে এই দর্শনে আমি কি বুঝলাম তা বলার আগে বইটি নিয়ে কয়েক লাইন পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানিয়ে যাই।
পাঠ-প্রতিক্রিয়া : বইয়ের প্লট নিয়ে বলতে হলে বলবো, প্লটটি একদমই ইউনিক এবং এরকম প্লট নিয়ে বাইরে কাজ হয়েছে কিনা জানা নেই তবে দেশীয় লেখকদের মধ্যে এরকম আনকোরা প্লট আমার চোখে আর পড়েনি৷ আর তানজীম রহমানের লিখনশৈলী তার পাঠকদের তো নতুন করে বলার কিছু নেই তবে আমার ধারণা এ বই তার আগের বইগুলোর লিখনশৈলীকেও ছাড়িয়ে গিয়েছে। বর্ণনা এতটাই ভালো হয়েছে যে পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে আমি সবকিছু চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম। বিশেষ করে মেসের মধ্যে রাহাত আর নিজামের মধ্যকার কথোপকথনে একজন যে আরেকজনের কথা শেষ হবার আগেই কথা বলছে এই ব্যাপারটা আমার কাছে অত্যন্ত বাস্তব মনে হয়েছে। এক জনের কথার মাঝে আমরা কথা বলে ফেলি কখন? যখন আমরা অনেক বেশি উত্তেজিত থাকি। আলোচ্য দৃশ্যে রাহাত আর নিজাম যে উত্তেজিত তা আলাদা করে বর্ণনা দিয়ে বলতে হয়নি, তাদের কথার প্যাটার্নেই বোঝা গেছে। আর তাছাড়া চা খেয়ে রাহাত যেভাবে চায়ের কাপ রাখার জন্য জায়গা খুঁজছিলো এবং নূন্যতম জায়গা না থাকার বর্ণনাটা যেভাবে লেখা হয়েছে তাতে আমার মনে হচ্ছিলো রাহাতের সাথে সাথে চায়ের কাপটা রাখার জন্য আমিও অস্থির হয়ে উঠেছি৷ এখানেই লেখকের স্বার্থকতা। লেখার মধ্যে দিয়ে পাঠককে সব কিছু দেখানো এবং চরিত্রের অনুভূতি পাঠককে করানো চাট্টিখানি কথা না। আর এ কঠিন কাজটাই সুলেখক তানজীম রহমান করেছেন বেশ দক্ষভাবে৷ এ রকম ছোট ছোট ঘটনা বইতে আরো অনেক আছে তবে সেগুলো লিখলে রিভিউ বিশাল বড় হয়ে যাবে যা আমি চাই না।তা বাদ দিয়ে লেখকের লিখনশৈলীর আরেকটি গুণ লিখি। সে আরেকটা গুণ হচ্ছে ভয়ের আবহ সৃষ্টি।
যারা ভয় পেতে ভালো���াসেন না এবং বইয়ে লেখা ভয় যাদের মাঝে অনেকদিন রয়ে যায় তারা অবশ্যই তানজীম রহমানের বইতে থাকা ভয়ের সিকোয়েন্স গুলো তাড়াতাড়ি করে স্রেফ রিডিং পড়ে যাবেন৷ কারণ আমার ধারণা তার লেখা ভয়ের বর্ণনাগুলো একবার পড়ে বইটা বন্ধ করে, চোখ বুজে ভাবলে যে অনুভূতিটা হয় সেটা যথেষ্ট ভীতির সৃষ্টি করে। এ বইতেও সেরকম কিছু ভয়ের বর্ণনা আছে। তবে আমার কাছে বেশি ভয় লেগেছে ফাঁকা রাস্তার মাঝে গাড়ি নষ্ট হয়ে যাবার সিকোয়েন্স, টিকটিকির সিকোয়েন্স আর বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় নীলক্ষেতের নির্জন গলিতে অতিপ্রাকৃত ঘটনার সিকোয়েন্সটা৷ এক জায়গাগুলোতে রীতিমতো বই বন্ধ করে ইউটিউব চালিয়ে গান টান শুনে আবার বই হাতে নিয়েছি। এরকম ভয়ের আবহ সৃষ্টি করতে পারা লেখককে স্বার্থক বলবো না তো কাকে বলবো?
পাঠ প্রতিক্রিয়ার পরিশেষে এইটুকু বলতে চাই যে, লেখক যে ফিনিশিং টা দিয়েছেন তা প্রেডিক্টেবল হলেও একদমই হতাশ হইনি। বরং যেভাবে আশা করেছিলাম সেভাবে হয়েছে বলে আমি খানিকটা খুশিই হয়েছি বলা চলে। তবে রিভিউ এ পর্যন্ত পড়ে এসে যারা ঠিক করেছেন, Lets try this novel, তাদের বলবো, বইটা শুরু করার আগে এটাকে পেজ টার্নার সাসপেন্স কিংবা কলজে কাঁপানো হরর বই ভেবে শুরু করবেন না প্লিজ। তাহলে নিঃসন্দেহে আশাহত হবেন৷ আর কেউ যদি তানজীম রহমানের লেখার সাথে পরিচিত না থাকেন তাহলে অবশ্যই এই বই দিয়ে শুরু করবেন না৷ যদিও 'অবয়ব' কোন সিরিজের অংশ না, তবুও আমার ধারণা এর পরিপূর্ণ স্বাদ নেয়ার জন্য আগে লেখকের লিখনশৈলীর সাথে পরিচিত হয়ে নিলে ভালো। আর যারা এই পোস্ট পড়ছেন, তারা ইতোমধ্যে এই বই পড়ে না থাকলে, আপনাকে অনুরোধ, আপনি আর এই পোস্ট স্ক্রল করবেন না। আপনার সাথে আজকে এ পর্যন্তই। তবে স্রেফ এটুকু জেনে রাখুন, 'অবয়ব' পুরো বইটাই প্রতীকি একটা বই এবং এখানে খালি চোখে যা দেখা গিয়েছে 'অবয়ব' তার চাইতে অনেক বেশি কিছু এবং আপনি নিজে নিজে বইটি পড়ে এই পয়েন্টগুলো ধরতে পারলে স্রেফ মুগ্ধ হয়ে যাবেন আমার ধারণা। তো আর দেরী না করে বইটি নিয়ে বসে পড়ুন আর শেষ করে আলোচনার জন্য চাইলে আমাকে নক করতে পারেন।
স্পয়লার অ্যালার্ট : যা বলছিলাম, 'অবয়ব' পুরো বইটাকেই আমার কাছে প্রতীকি মনে হয়েছে। যেমন : মূল চরিত্র রাহাত ফারাজীই মিলে যায় লেখকের সাথে। বইপাড়ার টুকটাক খোঁজ খবর রাখার দরুণ আমার মনে হয় অহর্নিশ হচ্ছে বাতিঘর, এর ফাউন্ডার আকবর ভাই আসলে মোহাম্মদ নাজিমউদ্দীন, খাদেম সোবাহান হচ্ছে লুৎফুল কায়সার ভাই। এর বাইরেও আরো বেশ কিছু ক্যারেক্টার আছে যাদেরকে আমি অনেকজন লেখকের সাথে মেলাতে পেরেছি এবং অনেককে পারিনি। তবে এই মেলাতে পারা না পারা প্রতীকি ব্যাপারটা আমাকে মুগ্ধ করেছে, ঘটনা মোটেও এমন না। ঘটনা হচ্ছে, বইয়ের মূল প্লট আমার কাছে যেভাবে ধরা দিয়েছে সেটা ভেবে আমি যারপরনাই বিস্মিত।
গল্পের মূল প্লটে দেখতে পাই লেখকরা খুন হচ্ছে। 'লেখক'রা কখন খুন হয়? যখন তাদের লেখক সত্ত্বা নষ্ট হয়ে যায়। আর লেখক সত্ত্বা কখন নষ্ট হয়ে যায়? যখন লেখকের আর নতুন কিছু দেবার থাকে না। এই প্রসঙ্গর সমাপ্তি টানার আগে আরেকটা জিনিস না আনলেই নয়৷ আর সেটা হচ্ছে সবুক্তগীন। 'অবয়ব' এর একটা রহস্যময় চরিত্র। এই চরিত্রটাও লেখক এবং একটা বই লিখেই সে হারিয়ে যায়। আর এ বইটাতে উল্লেখিত দানবের বর্ণনা দিয়েই একটা বই লিখে শীর্ষ আবেদিন। তারপরই খুন হয় সে। ঠিক একই রকম দানবের কথা লিখে খুন হয় রবিউল। কি পাঠক, সবুক্তগীনের দানবের সাথে শীর্ষ, রবিউলের মৃত্যুর সংযোগ পাচ্ছেন? জি ওটাই, তানজীম রহমান এখানে বুঝিয়েছেন, কোন লেখক যদি অন্য কোন লেখকের লেখার প্যাটার্ন নকল করে তাহলে তার লেখকসত্ত্বার মৃত্যু ঘটবে। আর যেহেতু জিনিসটা লেখালিখি সম্পর্কিত সেহেতু আমরা দেখছি খুন হওয়া ব্যাক্তির হাতের আঙুল অর্থাৎ সে যা দিয়ে লেখে তা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। শীর্ষের মৃত্যুর পরে রাহাত ফারাজী নিজেও সাই ফাই থেকে হরর লেখার সিদ্ধান্ত নেয় আর সম্ভবত এ কারণেই এয়ারপোর্ট রোডের ফাঁকা রাস্তায় একটা দানব দেখে সে যেটা আসলে তারই বিকৃত রুপ। এখানে আসলে রাহাতের লেখক সত্ত্বার বিকৃতির দিকে নির্দেশ করা হয়েছে বলে আমার ধারণা। তবে রাহাতের সংকল্প থাকে সে এই দানবকে হারাবে। ফাইনালি সে সেটা পারে কিনা সেটা নিয়ে একটা আলোচনা হয়ে যেতেই পারে, তবে বাকিদের মত বই বের হবার সাথ সাথেই তার ওপর (মূলত তার লেখক সত্ত্বার ওপর) আক্রমণ হয় না। কারণ সে আসলে ঐ বইটা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছে মাত্র, কপি করেনি। যে কারণে হয়তো শেষে সে যে দানব দেখে তা আর আগের মত থাকে না।
এরকম আরো কিছু মেটাফোর/প্রতীকি দিয়ে তৈরী হয়েছে 'অবয়ব' এর সেকেন্ড লেয়ার। এই যে দুইটা লেয়ার তৈরীর এই প্ল্যান এবং এক্সিকিউশনটা, এটাই আমার কাছে 'অবয়ব'কে করে তুলেছে অনন্য। আর তাছাড়া পাঠক যদি দুটো লেয়ারই বোঝেন তাহলে বেশ উপভোগ করবেন বইটা, ওদিকে একটা লেয়ার বুঝলেও ভালো একটা হরর থ্রিলারই মনে হবে৷ এই যে ব্যালান্সটা, এইটা দারুণ ভাবে করেছেন লেখক। তবে বইটা বেশ ভালো লাগলেও আমি একে ৫ স্টার দেবোনা কারণ ক্ষেত্র বিশেষে কিছু জায়গা অনেক বেশি জটিল হয়ে গিয়েছে। কয়েকটা জায়গা আমি বুঝতে পারিনি। এ দায় আমি পাঠক হিসেবে আমার কাঁধেই নিলাম।
তো এই ছিলো 'অবয়ব' নিয়ে আমার যত কথা? আপনার কেমন লেগেছে অবয়ব? জানাতে পারেন কমেন্টে এবং কমেন্টে কোন স্পয়লার থাকলে অবশ্যই আগে 'স্পয়লার অ্যালার্ট' দিয়ে নেবেন। সবাই ভালো থাকুন, ঈদের ছুটির দিনগুলোতে আরো বই পড়ুন এই কামনা রইলো।
বইমেলার উৎসবমুখর পরিবেশে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা কী হতে পারে? একজন লেখকের নৃশংস খু ন।
এ উপন্যাসে বইমেলার চিত্র, বইপাড়ার নিত্যনৈমত্তিক রাজনীতি, ক্যাচাল, বই রিভিউ নিয়ে একজন লেখকের মাথায় সম্ভাব্য কী ধরণের চিন্তা-ভাবনা কাজ করতে পারে এসব প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে এসেছে।
গল্পের শুরুতেই সৃষ্টি হওয়া রহস্য পাঠকের মনে বিভিন্ন চিন্তার তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। এটি ঠিক গতানুগতিক সিরিয়াল কিলিং মিস্ট্রি হিসেবে পড়া শুরু হলেও ঘটনা-পরম্পরা চলে যায় পরাবাস্তবতার এক খন্ডিত জগতে।
প্রথমে মনে করা হয়েছিলো এসব মার্ডার উগ্রপন্থী কোন গোষ্ঠীর। এরপর গল্পের মূল চরিত্র রাহাত ফারাজী পর্যন্ত সন্দেহের তীর ছুড়ে দেয়া হয়। রাহাত অমর হতে চায়, লেখালেখির মাধ্যমে। মানুষের স্মৃতিতে থেকে যেতে চায় রাহাত বহু প্রজন্ম। এজন্য তার লেখনিতে দরকার এক ধরণের ব্যালেন্সের।
বইটির আরেকটি ভালো লাগা বিষয় লেগেছে লেখালেখি নিয়ে সুপাঠ্য ভাষায় রাহাতের সাথে অন্যান্য লেখকদের কথোপকথন। তানজীম রহমানের লেখায় প্রায় সব সময় ফিলসফিক্যাল কথাবার্তা, ইঙ্গিত এসব থাকে। এ সকল ফিলসফি একদম নতুন কিছু নয়। তবে অল্পে, কার্যকরী পন্থায় লেখার ব্যাপারে তানজীমের দক্ষতার প্রশংসা করতে হয়।
তাছাড়া কিছু চরিত্রকে ঢাকার বইপাড়ার পরিচিত মানুষজনের মতোই মনে হতে পারে। উপন্যাসটির অন্যতম মজার দিক হলো কাহিনীর বিষয়বস্তু ধীর, কিন্তু পড়তে গেলে রাইটারের বর্ণনা কৌশলের কারণে গল্পকথন বেশ গতিশীল।
চরিত্রায়নের ক্ষেত্রে অনেকে আসলেও লেখক দু'একজনের উপর বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। প্রথমার্ধে যেরূপ বিভিন্ন চরিত্র এবং ঘটনাপ্রবাহের বর্ণনা দিয়েছেন তানজীম, দ্বিতীয়ার্ধে এসে অনেক কিছুই হয় অপ্রাসঙ্গিক অথবা প্রায় গায়েব হয়ে গেছে। এদিকটায় লেখক আরেকটু কাজ করতে পারতেন, মনে হয়।
ভয় সৃষ্টির ক্ষেত্রে তানজীম রহমানের মুন্সিয়া�����র সাথে 'আর্কন' থেকেই আমার পরিচয় হয়েছে। একটা টেনশন, মৃদু একটা অস্বস্তি, ভালো জ্যামিতিক কল্পনাশক্তির ব্যবহার ( যা হয়তো আরো ভালো হতে পারতো ) সব মিলিয়ে এক ধরণের অদ্ভুত ক্ষণিকের কিন্তু বেশ মানসিক ধাক্কা দেয়ার মতো কিছু মুহূর্ত এ বইতে পাঠক পেতে পারেন।
'অবয়ব' এর পুরো স্টোরিটেলিং আসলে দুই স্তরের বা লেয়ারের। হরর-থ্রিলার হিসেবে পড়ে গেলে হয়তো কেউ কেউ হতাশ হতে পারেন। কারণ লেখক সবকিছু রিডারকে স্পুন ফেড করান নি বা চামচে করে মুখে তুলে দেন নি। পাঠকের জন্য চিন্তা করার কিছু জায়গা ছেড়ে গেছেন তিনি।
দ্বিতীয় লেয়ারের মূল ম্যাসেজটা খুব কঠিন নয়। পাঠক ধরতে পারলে ভালোই একটা বার্তা পাবেন।
একেবারে সবকিছু লেখক কেন বলে দিবেন পাঠককে? সাবটেক্সট বুঝে পড়তে যারা ভালোবাসেন তাদের জন্য এ বই হতে পারে একটি ট্রিট।
কথার ফাঁকের কথা যারা মোটামুটি ধরে ফেলতে পারেন এ নভেল তাদের জন্য হয়তো প্রায় পূর্ণ অবয়বেই ধরা দিবে।
বই রিভিউ
নাম : অবয়ব লেখক : তানজীম রহমান প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০ প্রচ্ছদ : দেওয়ান নজরুল বাপ্পি প্রকাশনায় : বাতিঘর প্রকাশনী জনরা : হরর / থ্রিলার / সিম্বলিক ফিকশন রিভিউয়ার : ওয়াসিম হাসান মাহমুদ
Full of easter eggs and metaphors. Could relate a lot from "Bangladeshi Publication World." Though expectation from the writer was much more than this. But I loved it.
কাহিনি সংক্ষেপঃ বইমেলা চলছে। অহর্নিশ প্রকাশনীর লেখক রাহাত ফারাজীর কোন বই এবার বের হচ্ছে না। তারপরও সে মেলায় উপস্থিত আছে৷ অহর্নিশের আরেক জনপ্রিয় লেখক শীর্ষ আবেদিন। মেলার বাইরে পাওয়া গেলো তার লাশ। বীভৎস অবস্থা; লাশের এক হাতের আঙুল গুলো ছেঁড়া আর পুরোপুরি ভেজা মরদেহের পুরো শরীর। কে মারলো তাকে এভাবে? কোন উগ্রপন্থী সংগঠন?
বেশ কয়েক মাস আগে খুলনায় আরেক নবীন লেখক রবিউলের লাশও পাওয়া গেছিলো একই ভাবে। সিরিয়াল কিলিং? সেটাই বা কেন? লেখকচক্রের সদস্য রাহাত নিজের অজান্তেই জড়িয়ে পড়লো এই খুন গুলোর রহস্যের সাথে। ঠিক তখন, যখন সে নিজে সায়েন্স ফিকশন ছেড়ে হরর ঘরানা নিয়ে লেখালেখির প্ল্যান করছে তখনই। ব্যাপারটা অদ্ভুত, বলতেই হবে।
কেমন হয়, যখন কেউ তার চিরচেনা পরিবেশকে হঠাৎ পাল্টে যেতে দেখে? সবকিছু কেমন অতিপ্রাকৃত একটা জগতে রূপান্তরিত হয়। এমনটাও হলো। অন্য কোন পৃথিবীর বাসিন্দা যখন হানা দিয়ে বসে চিরচেনা জগতে, তখন ভয় না পেয়ে বা দুশ্চিন্তা না করে কোন উপায় থাকে বলেও মনে হয় না।
একজন লেখক ছিলেন। মাত্র একটা বই প্রকাশ করেছিলেন তিনি। আর সেই বইয়ের গল্প গুলোই যেন সমস্ত নষ্টের মূলে। এয়ারপোর্ট রোডে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন কেনই বা হতে হবে একজন লেখককে! নিজের লেখালেখিতে কেনই বা টানতে হবে তাকে অযাচিত লক্ষণরেখা!
এক সময়ের উঠতি কবি নিজাম আসলে কি বলতে চায় রাহাতকে, সেটাও পরিস্কার না। পরিস্কার শুধু একটা জিনিসই। আর তা হলো ভয়। যে ভয়ের জন্ম এই পৃথিবীতে না, অন্য কোথাও। কিন্তু ভয়টা ইদানীং জেঁকে বসেছে আপনার-আমার আর রাহাতের চিরচেনা জগতে। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এর কারণ অজানা।
ভয় কতো প্রকার ও কি কি, সেটা রাহাত ফারাজী তো বুঝতেই পারলো। তবুও কি সে থামলো? ব্যাপারটা বোধহয় এতোটাও সোজাসাপ্টা না।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 'আর্কন' ও 'অক্টারিন' খ্যাত তরুণ লেখক তানজীম রহমানের আরেক হরর থ্রিলার 'অবয়ব'। বইটার কাহিনি শুরু হয়েছে বাংলাদেশের লেখক ও প্রকাশক সমাজের মধ্যকার চলমান তথাকথিত রাজনীতি দিয়ে। লেখক তাঁর এই কাল্পনিক জগতের অনেকটাই রাঙিয়েছেন সত্য দিয়ে, এটা যে কেউ 'অবয়ব' পড়লেই বুঝতে পারবেন। তাত্ত্বিক কথাবার্তা দিয়েও বইটা ভরপুর ছিলো। যেমন কাফকা, মার্কেজ সহ অন্যান্য অনেক বিখ্যাত কবি ও লেখকদের সাহিত্যকর্মের ওপরেও তানজীম রহমান বেশ দারুণ ভাবে আলোকপাত করেছেন। ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। বেশ ভালো লেগেছে।
এবার আসি অতিপ্রাকৃত বিষয়াদিতে। 'অবয়ব' মূলত একটা সুপারন্যাচারাল ও হরর থ্রিলার। এই ধরণের উপন্যাস গুলোতে ভয়ের আবহ সৃষ্টির যে ব্যাপারটা, সেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। তানজীম রহমান এই কাজটা বেশ মুনশিয়ানার সাথে করতে পেরেছেন বলেই আমার ধারণা। নীলক্ষেত ও এয়ারপোর্ট রোডে ঘটে যাওয়া ভৌতিক ঘটনার যে বিবরণ তিনি দিয়েছেন, তা রীতিমতো আতঙ্ক জাগানিয়া। এই জায়গা গুলোতে কেন যেন আমার বিখ্যাত হরর মুভি 'সাইলেন্ট হিল'-এর কথা মনে পড়ে যাচ্ছিলো। বেশ ভীতিকর ছিলো পুরো ব্যাপারটা। মানে, আমি বোঝাতে চাচ্ছি আমাদের চিরচেনা ভয়ের পরিবেশ থেকে তানজীম রহমানের সৃষ্টি করা ভয়ের পরিবেশটা অবশ্যই ভিন্ন লেগেছে আমার কাছে।
'অবয়ব'-এর শেষটা নিয়েও আমি সামান্য কনফিউজড ছিলাম। এখনও যে সেই কনফিউশন কেটেছে, তা না। তবে এমন একটা উপন্যাসের শেষটা বোধহয় এরকমই হওয়া উচিৎ ছিলো। ২২২ পেজের এই বইটা আপনি ধরতে পারেন। আর ইন্টারেস্ট পেয়ে গেলে সেটা শেষ হতেও খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। আমার খুব বেশি সময় লাগেনি।
রাহাত ফারাজী চরিত্রটাকে অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। তবে তার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখানো বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতের অনেকটাই কেন যেন বেশ সত্য বলে মনে হয়েছে। মনে রাখার মতো একটা চরিত্র ছিলো এই রাহাত ফারাজী।
সুলেখক তানজীম রহমান এবার সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী একটা প্লট নিয়ে কাজ করেছেন। এটা যদি তাঁর এক্সপেরিমেন্টাল ওয়ার্ক হয়ে থাকে, তাহলে আমি বলবো এমন কাজ অদূর ভবিষ্যতে তাঁর আরও করা উচিৎ।
দেওয়ান নজরুল বাপ্পির সিম্পল অথচ ব্যতিক্রমী প্রচ্ছদটা আমার কাছে ভালোই লেগেছে।
বইমেলার মাঝে একজন লেখিকার ব্যক্তিগত সমস্যা আর সেটার মধ্যে একজন লেখকের ঢুকে যাওয়া, পরে সেই লেখকের খুন হওয়া দিয়ে গল্পের শুরু। সেই খুন থেকে আস্তেআস্তে ঘটতে থাকে বিচিত্র সব ঘটনা। আর সব ঘটনার গোড়া চলে যায় একজন লেখকের ভিন্নরকম কিছু একটা লেখার ইচ্ছার মধ্যে। স্পয়লার ব্যতীত মোটামুটি এটুকুই তানজীম রহমানের সর্বশেষ উপন্যাস অবয়ব এর পটভূমি।
উপন্যাসটির মূল গল্প বাংলাদেশী সাহিত্যাঙ্গনের বিভিন্নদিক এবং সেগুলোর সাথে একজন লেখকের সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক নিয়ে৷ কিন্তু এসবের মাঝে এই গল্পটির মূল বিষয় স্বার্থপরতা ঘিরে৷ গল্পের সবকটি চরিত্রই কোন না কোনভাবে স্বার্থপরতার প্রদর্শন দেখিয়েছে, যা থেকে প্রায় সবাই কোন না কোন ফলাফলও পেয়েছে। হয়তো লেখক নিজেকে বলি দিয়ে পাঠকদের স্বার্থপরতা নিয়ে সাবধান করে দিলেন।
একজন লেখকের গোটা পরিচয় গড়ে ওঠে তার কলমের আচড়ে বা কিবোর্ডের খটখটের মাঝে গড়ে ওঠা সৃষ্টি দিয়ে। সেই সৃষ্টির ভেতর থেকেই লেখকের নিজের প্রতিফলন বেশ খানিকটা অনুভব করা যায়। এই প্রতিফলনে বস্তুত নিজেকে নিয়ে নিজের সাটল অ্যাডিমিরেশনই প্রায় সবসময় দেখে আসছি আমরা৷ কিন্তু সম্ভবত নিজেকে খলচরিত্র আকারে দেখানোর চেষ্টা এই প্রথম দেখলাম কারও নিজ লেখায়।
ব্যাপারটা এমন নয় যে লেখক নিজের আসল চেহারা নিজেই সবার সামনে মেলে ধরেছেন। বরং তিনি নিজেকে নিজের বাইরে যেয়ে কল্পনা করেছেন। হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, নিজেকে খলচরিত্র হিসেবে কেমন দেখেন, অথবা কেমন দেখবার ইচ্ছা৷ শুধুমাত্র একটা চরিত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাপারটা আমার মনে হয়নি৷ বরং পুরো গল্পের প্রতিটি চরিত্রের ভেতর দিয়েই আমার এমনটা উপলব্ধি হয়েছে। হ্যাঁ, নিজেকে লেখক গল্পের মূল চরিত্রের মাঝে প্রতিষ্টা করেছেন৷ গল্পের অন্যান্য প্রতিটি চরিত্রকেই লেখকের মতো সাহিত্যজগতের খুব পরিচিত কিছু মুখ বলে মনে হবে। কিন্তু লেখক এদের সবার চরিত্রায়ণের মাঝেই নিজের থেকে হাল্কা টুইক করেছেন। এতে করে বইটি পড়ার সময় মনে হয়, গল্পের মূল চরিত্র কোনভাবে পুরো গল্পটিই নিয়ন্ত্রণ করছে।
উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট এবং ওভারঅল গল্প এইদিক থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মাত্রায় পৌঁছে গিয়েছে। অবয়ব একটা সেল্ফ অ্যাওয়্যার্ড উপন্যাস। বলা চলে বেশ সাটলি এটি একটি মেটাফিকশন। পুরো আগাগোড়া জুড়ে এটি বোঝা যায় না, তবে শেষদিকে এসে ব্যাপারটা আচ করা যায়৷ আর ভালোভাবে বুঝা যায় গল্পটা শেষ হয়ে যাওয়ার পর। এই মেটা ব্যাপারটা লেখকের লেখার মধ্যে থেকে আসলেও বেশ আলাদা একটা ভাইব প্রতিষ্ঠা করেছে বেশ ভালোভাবেই। নিও লাভক্রাফটিয়ান ধাচে লেখা গল্পের ভেতর জঁরাটির মূল জিনিষগুলোকে আকড়ে ধরে উপন্যাসটি তার নিজস্ব সত্ত্বা তৈরি কিরতে থাকে। এই সত্ত্বার প্রকৃত উপস্থিতি টের পাওয়া যায় বইটি পড়ে শেষ করার পর। মনে হয়, সত্ত্বাটা কোনভাবে আপনার চিন্তায় এক্সটেন্ড করছে নিজেকে। অনেকটা যেন শেষ হয়েও হয়নি শেষ।
তবে শেষটা বেশ অন্যরকম, গোটা উপন্যাসের নিজস্ব অভিনবত্ব থেকেও আলাদা। শেষটা আসলে ঠিক কিভাবে বর্ণনা করা যায়, যেব্যাপারে এখনও আমার যথেষ্ট পরিমাণে বুদ্ধি হয়নি। আমার পড়া সবচেয়ে অদ্ভুত শেষদৃশ্য এই উপন্যাসের। ব্যাপারটা এরকম যে, শেষের দৃশ্যটার থেকে গোটা উপন্যাসটা বিচার করলে মনে লেখক কিছুটা অহংকারও করেছেন তার গুণাবলি নিয়ে৷ পাঠক আর নিজের মাঝে একটা রেখা তৈরি করেছেন যা ক্রমেই গাঢ় হয়েছে গল্পের এগিয়ে যাওয়ায়। লেখক তানজীম রহমানের পূর্বের উপন্যাসগুলোর শেষ নিয়ে বেশ বিতর্ক ছিলো। আমি নিজে লেখকের ভক্ত হলেও তার প্রথম দুটি উপন্যাসের শেষ অংক নিয়ে আমার অসন্তোষ ছিলো। এই উপন্যাসের শেষে এসে কী তিনি পাল্টা আঘাত করে বসলেন?
অথবা ব্যাপারটা হয়তো তার নিজেকে নিয়ে নয়। তার উদ্দেশ্য হয়তো গোটা লেখক সমাজের সাথে গোটা পাঠক সমাজের সম্পর্কটা দেখানো। লেখক-পাঠকের মাঝে একটা নীরব দ্বন্দ্ব দেখা যায় যেটাকে কথা বলার সময় দুই দলই সবসময় এড়িয়ে চলেন। একদিকে থাকে লেখকের নিজের মতো সৃষ্টি করার ইচ্ছা, আরেকদিকে থাকে পাঠকের নিজের পছন্দ মিলে যাওয়ার ইচ্ছা। এই দুটোর পার্থক্য কমবেশী হওয়ার উপরই সাহিত্য টিকে থাকে। হয়তো সেই ব্যাপারটিকেই ফোরশ্যাডো করেই অবয়ব এর শেষ অংকটি লেখা। অথবা একদমই ভিন্নকিছু।
তবে এই শেষ অংকটির একটা ব্যাপার খুবই অবাক করেছে, একইসাথে মজাও পেয়েছি। যেমনটা বলেছিলাম আগে, উপন্যাসটির একটা নিজস্ব সত্ত্বা রয়েছে যা পুরো গল্পটিকে বেশ মেটা করে তোলে। সেই সত্ত্বাটি উপন্যাসের এই শেষ অংকেই পূর্ণ প্রতিষ্ঠা পেয়ে নিজের উপস্থিতির জানান নেয়। সাথে পুরো উপন্যাসের একটা ছোট্ট রিভিউও দিয়ে দেয়।
অবয়ব একটি নিও লাভক্রফটিয়ান হরর, সাথে ম্যাজিক রিয়েলিজমের চর্চাও অনুভব করা যায় বেশ খানিকটা। সবকিছুর বাইরে যেয়ে এটি একটি কন্টেম্পোরারি উপন্যাস৷ তানজিম রহমান আরও একবার তার গতিশীল লেখনীর প্রদর্শন করেছেন। কন্সট্যান্টলি এভাবে পেস ধরে লেখে যাওয়া, প্রতিবার লেখায় নতুনভাবে হররকে সংজ্ঞায়িত করা লেখকের জন্য বাহাতের ব্যাপার হয়ে গিয়েছে। অবয়ব পড়ার পরে আমি সেফলি বলতে পারি, বাংলায় বর্তমানের সেরা হরর লেখক তিনি। ভূত পেত্নির চুলোচুলির বাইরে যেয়ে এরকম আরও লেখা আসুক তার কাছ থেকে, মনেপ্রাণে সেটাই কামনা করছি।
এটা খুবই ভিন্নধর্মী লেখা। ম্যাজিক রিয়েলিজম এর সাথে হরর ব্লেন্ড। প্রথমে গল্পটা ভালো লাগছিলো না সেই গড়পড়তা খুন, পুলিশ। কিন্ত আস্তে আস্তে কাহিনী ঝেকে বসে। বিশেষ করে অবয়ব টা যখনি আগমন করে গল্পের আবহ টা ততই ইন্টারেস্টিং লাগে। বিশেষ করে ওয়ার্ল্ড বিল্ড আপ এত ভালো হয়েছে। পড়তে পড়তে সব জ্যান্ত লাগছিলো। শেষটাও তেমনি ভালো লেগেছে।
হরর লেখকের সার্থকতা সেখানেই যখন কোন ঘটনার বর্ণনা পাঠকের মাঝে তীব্র ভয়ের অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে। লেখক এই বইয়ে কয়েকটি ক্ষেত্রেই সফলভাবে সেটা করতে পেরেছেন। ভয়ের যে আবহ যেভাবে বানাতে পেরেছেন তা আসলেই প্রশংসনীয়।
অবয়ব এর ফ্ল্যাপ থেকে যদি বলে- ‘গোয়েন্দা নেই, তবে আছে রহস্য। খুন আছে, কিন্তু খুনি অজানা। আছে অনেকগুলো চরিত্র, কিন্তু তাদের মধ্যে সন্দেহভাজন কে?’
স্পয়লারবিহীন একটা রিভিউ লিখতে চাচ্ছি। না হলে ক্ষমাপ্রার্থী।
গল্পটা শুরু হয়েছে রাহাত ফারাজী নামের লেখককে দিয়ে। একজন মোটামুটি জনপ্রিয় সাইফাই লেখক। লেখেন একটি নির্দিষ্ট প্রকাশনীর হয়ে। একটা প্রেম আছে তার। মেয়েটার নাম তিথি।
গল্পের শুরুটা ছিল বইমেলায়। প্রকাশনী ‘অহর্নিশ’ (যেখানে রাহাত লেখালেখি করেন) এবং এই প্রকাশনীর প্রকাশক-লেখকদের রাহাতের দৃষ্টিভঙ্গিতে বর্ণনা দিয়ে। লেখক এখানে রাহাতকে দিয়ে লেখকদের যথেষ্ট কাটাছেড়া করেছে��। ওইদিন মেলাতে একটা ছোট্ট সিনক্রিয়েট হয়। এবং পরেরদিন খবর আসে- শীর্ষ খুন হয়েছে বইমেলা প্রাঙ্গনে। এরপর আরও একজন। তারপর আরও একজন। রাহাত জড়িয়ে পড়ে এই খুনের রহস্যে। সে কি ভেদ করতে পারে এই রহস্য?
এইখানে লেখক মাথাটা মোটামুটি খারাপ করিয়ে দিয়েছেন! কারণ খুন হচ্ছে একের পর এক, একটাই প্যাটার্ন আছে শুধু- সেটা নৃশংসতা, বীভৎসতা। খুনি ধরা ছোয়ার বাইরে? তাহলে খুনগুলো করছে কে? খুনি কি সিরিয়াল কিলার? না কি অন্যকিছু? না কি খুনের পেছনে আছে শুধুই কিছু অবয়ব, যাকে সংজ্ঞায়িত করা যায় না! একটা খুন হয়ে যাওয়ার পর লেখক অনেকক্ষণ খেলিয়েছেন পাঠককে। সহজেই বলে ফেলেননি। ঘুড়ি ওড়ানোর মতো সুতো সময় মতো টেনেছেন আবার ঢিল দিয়েছেন। আমি বিরক্ত হয়ে পড়েছিলাম মাঝখানের একটা ঘটনার বর্ণনায়। কিন্তু স্কিপ করিনি। আর ধৈর্যা বৃথা যায়নি। সময় লেগেছে কিন্তু টুইস্ট আর টুইস্টে শুধু মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে।
রাহাত ফারাজী কে দেখানো হয়েছে একজন আধুনিক থৃলার সাহিত্যিকদের রিফ্লেকশন হিসেবে। তার সমস্যা, তার ধ্যানধারণা দিয়ে একটা ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন যেন!
রাহাতের কিছু সমস্যা কি এখনকার লেখকরাও ফেস করেন? তার স্বভাবের কিছু স্বভাব কি এখনকার কোনো লেখকদের মধ্যে আছে? আপনি যদি ফ্ল্যাপ পড়ে বইটা শেষ করেন তাহলে ফ্ল্যাপের সাথে বইয়ের মূল ঘটনা রিলেট করালে খুব সম্ভবত আপনিও আমার মতো দুটো প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়াবেন- রাহাতের মতো বাস্তব লেখক কি আছে? থাকলে কে? সবুক্তগীনের মতো কেউ আছে? থাকলে কে?
বইয়ের শেষ পাতা পর্যন্ত রহস্য আছে এবং একটা কি দুটো রহস্য খোলাসা হয়নি। বইয়ের মাঝখানে কিছু আবহ লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন তার নিজস্ব স্টাইলে, মুন্সিয়ানায়।
গল্পে একটা ডার্ক থিম আছে। আমি অর্ধেক ধরতে পেরেছিলাম, কিংবা অর্ধেকেরও কম। কিন্তু এই ধরতে না পারার ব্যাপারটাই আটকে রেখেছিল শেষ পর্যন্ত। কিছু একটা ধরতে পেরেও ধরা যাচ্ছিল না।
বইয়ে কিছু প্রিন্টিং মিস্টেক আছে, তবে এবার বাতিঘরের পেজের মান নিয়ে সন্তুষ্ট।
আর প্রচ্ছদ নিয়ে কি বলবো! দেওয়ান নজরুল বাপ্পির এই প্রচ্ছদটা অসাধারণ! এই বইয়ের জন্য যেন পার্ফেক্ট!
অবয়বের ফ্ল্যাপের সাথে বইয়ের গল্পের একটা তফাৎ আছে আর এই তফাৎটার জন্যই বইটা ভয়ংকর সুন্দর হয়ে ওঠে, লিটারেলি ভয়ংকর সুন্দর!
প্লট আমার কাছে খুবই আকর্ষনীয় এবং আনকোরা লেগেছে। এমন কিছু আগে পড়িনি! কোনো গ্রুপে এমন কিছু সম্পর্কে কখনও আলোচনাও দেখিনি! অবয়ব একদম একটা আলাদা জগতে নিয়ে গিয়েছিল!
আমি এটাকে ৫ এ ৫ দিতাম কিন্তু, .৫ কেটে রাখলাম কারণ এতো বেশি ধাক্কা দিয়েছে, এতো বেশি জট লেগে গিয়েছিল বা লেগেই আছে যে মাথা থেকে এখনও প্রশ্ন দুটো সরেনি। শেষটা আরেকটু চমকপ্রদ করা যেত হয়তো, কিন্তু নিয়তির মতো যেটা হওয়ার তাই হলো, লেখক যথেষ্ট তিপ্রাকৃত আবহ দেখিয়েছেন, কিন্তু সমাপ্তি অতিপ্রাকৃতভাবে পালটে দেননি। পড়ে মনে হয় যেন সিক্যুয়েল আসবে। কিন্তু সিক্যুয়েল আসবে না। তারমনে, শেষ হইয়াও হইলো না শেষ-এ গিয়ে আটকে রেখেছেন। থৃলার এর ক্ষেত্রে এইটা আমার খুব অপছন্দ। পেটের ভাত হজম হয় না। বাতিঘরের প্রুফ দেখার সিলি মিস্টেকগুলো আরেকটা কারণ। আল্লাহই জানে, বাতিঘরেই কেন এতো ছাপাখানার ভূত? তানজীম রহমান লেখেন বলে?
বই : অবয়ব লেখক : তানজীম রহমান প্রকাশনী : বাতিঘর জনরা : রহস্য, অতিপ্রাকৃত পৃষ্ঠা সংখ্যা : ২২২ মুদ্রিত মূল্য : ৩০০ টাকা রেটিং : ৪.৫/৫
আর রিভিউ পড়ে বইটি পড়তে ইচ্ছে হলে, কিনতে পারেন অবসর থেকে সর্বোচ্চ ৩৫% ছাড়ে!
লেখক, প্রকাশক খু ন হলে বিষয়টা পাবলিক সেন্টিমেন্ট হয়ে ওঠে। গাদা গাদা স্ট্যাটাস, প্রতিবাদে ভরে ওঠে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। তবে কতটা ফলপ্রসূ হয় সেটা সময়ই বলে দেয়। বইমেলার মাঠে খুব হাসি আনন্দ সময়ের মাঝে একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে গিয়েছে। সেই ঘটনার জেরেই কী না কে জানে! খু ন হয়ে গিয়েছে অহর্নিশ প্রকাশনীর নবীন কিন্তু জনপ্রিয় লেখক শীর্ষ। বিভৎস এ খু নের ঠিক ব্যাখ্যা করা কঠিন। কার এমন আক্রোশ থাকতে পারে যে সবকটি আঙ্গুল উপড়ে ফেলে এমনভাবে মা র তে পারে?
একই প্রকাশনীর অন্যতম লেখক রাহাত ফারাজী কেন যেন দেখতে পারত না শীর্ষকে। যদিও শীর্ষের মৃ ত্যুতে বড়ো এক ধাক্কা খেয়েছিল সে। রাহাতের বইগুলোর প্রশংসা বেশ উদার হস্তেই করত শীর্ষ। তবুও কেন যেন ছেলেটাকে পছন্দ হতো না রাহাতের। সে কারণেই হয়তো শীর্ষের কোনো বই পড়েনি রাহাত। কিন্তু মৃ ত্যু মানুষের মধ্যে আমূল পরিবর্তন আনে। মৃ ত ব্যক্তির প্রতি এক সূক্ষ টান অনুভব হয়। হয়তো সে কারণেই শীর্ষের বই পড়া শুরু করল রাহাত। যদিও প্রেমিকা তিথির এখানে এক বিশেষ ভূমিকা আছে।
রাহাত নিজেকে ভেঙে নতুন করে গড়তে চায়। লেখালেখি ওর সহজাত প্রতিভা। সেই প্রতিভায় ভর করে অমর হতে চাওয়া দোষের কিছু নয়। তাই সাইফাই দিয়ে নাম কমানো রাহাত এমন কিছু লিখতে চায়, যার জন্য লেখক হিসেবে অমরত্ব পাওয়া সম্ভব। সেই চেষ্টাই সে করছে। তবে এর জন্য প্রস্তুতি দরকার। আর প্রস্তুতির জন্য সে বেছে নিয়েছে হরর জাতীয় লেখাকে। যেই হরর সে লিখেনি, সেই লেখার চেষ্টায় মগ্ন সে। আর এখানে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে যেন মৃ ত শীর্ষ। তার বইয়ের মাধ্যমেই নতুন গল্পের সূচনা পেয়েছে সে। কিন্তু কে জানত! এই লেখা শুরুর পর থেকেই তার জীবন বদলে যাবে। বিভীষিকাময় এক অধ্যায়ের শুরু হবে। যেখান থেকে কীভাবে পরিত্রাণ পাবে সে উপায় ও জানে না। কেউ জানে না।
যে জিনিসটি অবাক করল, আর তা আরও একটি খু ন। রবিউল নামের ছেলেটি শীর্ষের অন্ধ ভক্ত ছিল। একটু পাগলাটেও ছিল। সম্প্রতি লেখালেখি শুরু করেছিল সে। শীর্ষের সাথে যৌথ বই লেখার কথা ছিল। হুট করে একইভাবে সেও যখন মারা যায় তখন নড়েচড়ে বসতে হয়। তাহলে কি দেশে এক সিরিয়াল কি লারের আবির্ভাব হয়েছে? যে বেছে বেছে লেখকদের তার নিশানা বানাচ্ছে। হয়তো এমন কিছু হয়তো রাহাত ভেবে নিত, যদি না নিজ চোখের সামনে ওয়াহাবের এমন মৃত্যু হতো। এমন কিছু সাধারণ কোনো ঘটনা নয়। এর পেছনে অনেক বড়ো রহস্য লুকিয়ে আছে। এক অন্ধকার জগতের গল্প। যার প্রবেশ দ্বার উন্মুক্ত হয়ে গেছে। কীভাবে? অশুভ শক্তির সাথে লড়াই করার ক্ষমতা যে রাহাতের নেই। তাহলে? তারও কি শেষ পরিণতি এমন হবে? আর ভাবতে চায় না রাহাত। নিজেকে অমর দেখার আগে মৃ ত্যুকে দেখার কোনো ইচ্ছে নেই তার। তাহলে কী করবে সে?
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
আমরা যারা বইমেলায় নিয়মিত যাই, তাদের কাছে গল্পের শুরুটা পরিচিত মনে হতে পারে। বহুল পরিচিত চেনা এক প্রকাশনীর গল্প এখানে লেখক বলেছেন। বলেছেন তার লেখকদের কথা। বইমেলা, লেখক বা বই সম্পর্কে যারা নিয়মিত খোঁজ রাখেন, হয়তো অনেকেই পরিচিত কিছু মুখ দেখতে পারবেন। কিংবা ধারণা করতে পারবেন কোনো না কোনো মিল অবশ্যই আছে। গল্পের শুরুটা যেখানে এমন, সেখানে বইয়ের প্রতি আকর্ষণ বহুগুণে বেড়ে যায়।
গল্পের ধারা আসলে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটা বলা শক্ত। শুরুটা যেহেতু খু ন দিয়ে স্বভাবতই খু নের তদন্তের দিকেই গল্প এগোবে ভেবে নেওয়া যায়। কিন্তু এখানেই লেখক এক অন্যরকম খেলা খেলেছেন। গল্পের মাঝপথে এসে বিষয়টা অতিপ্রাকৃত ছায়ায় নিয়ে গিয়েছেন। খুবই ব্যতিক্রম একটি লেখা। বাংলা সাহিত্যে এরকম কাজ এর আগে চোখে পড়েনি। ব্যতিক্রম কোনো কিছু যখন হয়, তখন এর উপস্থাপন বা যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে এক ধরনের উৎকণ্ঠা থাকে। কেমন করেছেন লেখক? আমার কাছে ভালো মতোই উৎরে ��িয়েছেন। তারপরও হয়তো এ জাতীয় বই সবার জন্য নয়। কেন? সে কথা বলছি।
গল্পের সমাপ্তি কেমন যেন ধোঁয়াশায় ঘেরা। আমাদের পাঠকদের মাঝে সোজাসাপ্টা গল্পের শেষাংশ খুবই প্রশংসনীয় হয়। যে গল্পের ভালো ধরনের সমাপ্তি আছে সেই গল্পই ভালো লাগে। অনেক ক্ষেত্রে সমাপ্তি নিয়ে অভিযোগও থাকে। এমন না হয়ে অমন হতে তো পারত! তাহলে কেন হলো না? সে কারণেই হয়তো লেখক সমাপ্তি উন্মুক্ত রেখেছেন। লেখকের কাছে যেই জায়গায় গল্প শেষ হয়েছে, সেই জায়গায় হয়তো নতুন গল্পের সূচনা হবে। পাঠক সেই গল্পের স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে নিক। কোন পথে যাবে, সে বিবেচনা পাঠকের। এখানেই আমার ভাবনা থমকে গিয়েছে। কোন পথে যাওয়া উচিত? কীভাবে গল্পের রাশ টেনে ধরা উচিত? সমাপ্তি নিয়ে এমন ধোঁয়াশার কারণে ঠিক যেন উপভোগ করতে পারলাম না শেষটা।
লেখকের লেখনশৈলী সাবলীল। বর্ণনাশৈলী ভালো লেগেছে। সূক্ষ অনেক কিছুর বর্ণনা লেখক দিয়েছেন, যেগুলো হয়তো অনেক লেখক এড়িয়ে যেত। এই বিষয়টা ভালো লেগেছে। যেমন একটি পরিস্থিতিতে অনেকেই থাকে। অনেকেই অনেকের সাথে আলাপ জমায়। মূল চরিত্রের পাশাপাশি পার্শ্ব চরিত্রও যে গল্পে থাকে সেটা অনেকে ভুলে যায়। ধরা যাক, কোনো এক অবস্থায় আমি কারো সাথে আলাপ করছি। আমার পাশেও কেউ অন্যের সাথে কথা বলছে। সেই কথাগুলো আমার কানে আসবে। এই যে সূক্ষ বিষয়গুলো, সেগুলো লেখক যেভাবে লিখেছেন আমার পছন্দ হয়েছে। বই লেখা নিয়ে খুঁটিনাটি যে বিষয়গুলো আলোচনা করেছেন সেগুলোও উপভোগ্য ছিল। সেই চিত্রও বেশ আনন্দ দিয়েছে।
▪️চরিতত্রায়ন :
আগেই বলেছি, এই উপন্যাসের শুরুতে এমন কিছু চরিত্রের কথা লেখক বলেছেন যাদের কথা পড়তে গিয়ে বারবার পরিচিত লেখক, প্রকাশকদের কথা মাথায় আসছিল।
তবে চরিত্র গঠনের দিক দিয়ে আমার অভিযোগ আছে। লেখক রাহাত ফারাজীকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অন্যান্য চরিত্রকে ঠিক গুরুত্ব দেননি। এই তিথি আর শীর্ষকে আরেকটু ভালো মতো ফুটিয়ে তোলা যেত বলে মনে হয়েছে।
এছাড়া যে অতিপ্রাকৃত শক্তির কথা লেখক বলেছেন, সেই বর্ণনাও আমার কিছু জায়গায় ভালো লাগলেও কিছুক্ষেত্রে ধোঁয়াটে লেগেছে। মনে হয়েছে লেখক বেশ তাড়াহুড়ো করেছেন। আরেকটু সময় হয়তো নেওয়া যেত।
▪️কিছু প্রশ্ন :
বইটি পড়ার পর বেশ কিছু মনের মধ্যে খচখচ করছে। সেগুলো হলো : • শুরুর দিকে যে চরিত্রগুলো নিয়ে লেখক সময়ক্ষেপণ করেছেন, মূল গল্পে সেসব চরিত্রের ভূমিকা একেবারেই ছিল না। হয়তো লেখক এভাবেই লিখেছেন। এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় না। তবুও মনের মধ্যে একটা খচখচানি থেকেই গেল। • খু নের মোটিভ বোঝা গেলেও এমন বিভৎস খু নের কীভাবে করা হয়েছে তার বর্ণনা দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে কেন আঙ্গুল উপড়ে খু ন করা হলো? এর ফলেই কি মৃ ত্যু ঘটেছে? ঠিকঠাক ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। • যে অতিপ্রাকৃত শক্তির কথা বলা হয়েছে, সেই শক্তি কেন পৃথিবীতে আসছে সেটা বলা হলেও কীভাবে আসছে সেই রহস্য উদঘাটন করা হয়নি।
▪️প্রচ্ছদ ও প্রোডাকশন:
যেহেতু আমি বইঘর অ্যাপে বইটি পড়েছি, সেহেতু ইবুক নিয়েই কথা বলি। বানান ভুল বা ছাপার ভুল তেমন না থাকলেও ফন্টের ছোটো বড়ো হয়ে যাওয়া বেশ পীড়া দিয়েছে। মোবাইলের স্ক্রিনে লম্বা সময় বই পড়লে এমনিতে চোখের উপর চাপ পড়ে। সেখানে ফন্টের অসামঞ্জস্যতায় বেশ অসুবিধায় সৃষ্টি হয়। বইঘর টিমকে এই বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখার জন্য অনুরোধ করা হলো।
প্রচ্ছদ দারুণ। আমাদের মুখের অবয়বে অনেক কিছুই হয়তো তৈরি হয়। কিন্তু অনেকেই অনেক অবয়ব নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। সেই অবয়বে সঠিক আকৃতি আমরা চিনতে পারি না।
▪️পরিশেষে, আমাদের পরিবেশের কিছু রহস্য থাকে যা প্রকৃতি রহস্য হিসেবেই আড়াল করতে পছন্দ করে। সেই রহস্য কখনো উন্মুক্ত হলে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। কোথায় কখন কোন বিপদ কাকে জাপটে ধরবে কেউ জানে না। তাই সব রহস্যের সমাধান প্রয়োজন নেই।
▪️বই : অবয়ব ▪️লেখক : তানজিম রহমান ▪️ইবুক : বইঘর ▪️মূল্য : ৬৫ টাকা ▪️ ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৮/৫
•বইয়ের নাম : অবয়ব •লেখক : তানজীম রহমান •ধরণ : রহস্য,ভৌতিক •মূল্য : ৩০০ ৳ •প্রকাশনী : বাতিঘর প্রকাশনী •প্রথম প্রকাশ : বইমেলা,২০২০ •ব্যক্তিগত রেটিং : ৩/৫
•ব্যক্তিগত মতামত : জনপ্রিয় লেখক হলেও উনার লেখার সাথে আমি পরিচিত নই, এটাই প্রথম । ছোট পরিসরে অসাধারণ বর্ণনাভঙ্গি ও চরিত্রায়ন ছিল অসাধারণ প্লটও ছিল বেশ লোভনীয় । গল্পের বেশ কয়েকটা চরিত্র লেখক বাস্তবজগৎ থেকে নিয়েছেন এটা কয়েক পৃষ্ঠা পড়লেই বোঝা যায় । গল্পের শুরুটা ধীরে হলেও মাঝখান থেকে কাহিনী গতিময় হয় । রাতে পড়ার সময় যে ভয় পেয়েছি এটা বলার অপেক্ষা রাখে না 😬। গল্পের সমাপ্তি আমার ব্যক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়নি মাঝে মাঝে মনে হয়েছে অযথা কাহিনী টেনে লম্বা করা হয়েছে আরো কম পৃষ্ঠায় কাহিনী ক্ষতম করা যেতো । এটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত মতামত । ধন্যবাদ
এটা কি লেখকের পরীক্ষামূলক কোন লেখা কিনা জানি না..যদি হয় তবে একদম শতভাগ সফল...বই পড়তে পড়তে মনে যে আরাম সেটা পেয়েছি...এন্ডিংটা ও বেশ ভাল লেগেছে... বিরূপকথা কিনেছি...এই বই পড়ে ওইটা পড়তে ভয় ভয় লাগছে এখন....
টানা পড়ে গেলাম।পছন্দের লেখকের বই পড়ার সময় আলাদা একটা ভালোলাগা কাজ করে। ভালো লেগেছে। তানজীম রহমানের সবচেয়ে ভালো বিষয় যেটা সেটা হলো,উনি আর্কন,অক্টারিনের পর একই ধরণের বই বারবার না লিখে ভিন্ন রকমের লেখা লিখেছেন।