রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নষ্টনীড় (১৯০১) কেবল একটি ছোটগল্প নয়, এটি বাংলা সাহিত্যে প্রেম, একাকীত্ব এবং সামাজিক সীমারেখা অতিক্রম করার এক নিঃশব্দ আন্দোলন। এখানে প্রেম কোনও প্রচলিত নৈতিকতার ধারায় আবদ্ধ নয়; বরং তা আত্মার অনাহার থেকে উৎসারিত। চারুলতা, এক নিঃসন্তান, নিঃসঙ্গ, তবু বুদ্ধিমতী নারী, স্বামীর উদাসীনতার মধ্যে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে জন্ম দিতে থাকে এক অচেনা আকাঙ্ক্ষা। ভূপতি, তার স্বামী, রাজনীতি ও সংবাদপত্রের জগতে নিমগ্ন, সংসারের প্রতি দায়বদ্ধ হলেও স্ত্রীর মনের গভীরে প্রবেশ করতে পারেন না। এই মানসিক দূরত্বের ভেতরেই অমল নামে তরুণ এক আত্মীয়ের আবির্ভাব—রসিক, সংবেদনশীল, সাহিত্যপ্রেমী—যে চারুলতার জীবনে আলো আনে, কিন্তু সেই আলোই তার জীবনকে জ্বালিয়ে দেয়।
চারুলতার এই প্রেম সমাজের চোখে নিষিদ্ধ। দেবর-ভাবি সম্পর্ক ভারতীয় সমাজে স্নেহপূর্ণ কিন্তু সংযত; সেখানে প্রেমের সম্ভাবনা এক অস্বাভাবিকতা। আইনত নিষিদ্ধ না হলেও সামাজিক নীতিতে এটি ট্যাবু—অর্থাৎ এমন এক প্রেম, যা অনুমোদিত নয়, কারণ তা সম্পর্কের পবিত্রতা ভঙ্গ করে।
তবে রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনো নৈতিক রায় দেন না। তিনি চারুলতার অমলের প্রতি আকর্ষণকে শরীরী প্রণয় হিসেবে দেখেন না, বরং এক গভীর মানবিক প্রয়োজন হিসেবে—এক নারী, যিনি স্নেহ, মনোযোগ, এবং সৃজনশীল সঙ্গের অভাবে নিজের ভিতরে আবেগের অভ্যুদয় অনুভব করেন। গল্পের শুরুতেই লেখক বলেন, “ফলপরিণামহীন ফুলের মতো পরিপূর্ণ অনাবশ্যকতার মধ্যে পরিস্ফুট হইয়া উঠাই তাহার চেষ্টাশূন্য দীর্ঘ দিনরাত্রির একমাত্র কাজ ছিল।” এই বাক্যের মধ্যেই নিহিত আছে সেই অনাবশ্যক অস্তিত্বের বেদনা, যা চারুলতাকে নিষিদ্ধ প্রেমের দিকে ঠেলে দেয়।
এই প্রেম আসলে এক নিঃশব্দ আত্মপ্রকাশ, যেখানে নারী প্রথমবার নিজের চাওয়া বুঝতে শেখে। চারুলতার কাছে অমল কেবল দেবর নয়—সে এমন এক মানুষ, যিনি তাকে শুনতে জানেন, তাকে পাঠ করান, তার ভাবনার সঙ্গী হন। অমলের কাছে চারু আকর্ষণীয়, কিন্তু অমলও জানে, এই সম্পর্কের সীমা আছে। সেই সীমা অতিক্রম না করেও রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন প্রেমের ভেতরে জন্ম নেওয়া অস্থিরতা, ঈর্ষা ও অধিকারবোধ। যখন অমলের লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, চারু ঈর্ষায় জ্বলে ওঠে—কারণ তার প্রিয় মানুষটিকে এখন সে আর একান্ত নিজের রাখতে পারবে না, তাকে ভাগ করে নিতে হবে পাঠকদের সঙ্গে। ঈর্ষা এখানে প্রেমেরই ছায়া, আত্মার দাবির প্রকাশ।
রবীন্দ্রনাথের সময়ে এই ধরনের সম্পর্কের কথা ভাবাও ছিল এক সামাজিক বিদ্রোহ। তবু তিনি এটিকে নৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখেননি; বরং মানবমনস্তত্ত্বের স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে। নষ্টনীড় তাই কোনও প্রেমকাহিনি নয়, বরং সমাজবদ্ধ নারীসত্তার অন্তর্জাগরণের ইতিহাস। চারুলতার এই জাগরণ সেইসব নিষিদ্ধ প্রেমের ধারার অংশ, যা বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে ভিন্ন রূপে প্রতিফলিত হয়েছে।
George Eliot-এর The Mill on the Floss-এ Maggie ও Tom-এর সম্পর্ক সেই আত্মীয়তার আবেগে ভরা, যা সমাজের দৃষ্টিতে অগ্রহণযোগ্য। Eliot এখানে প্রতীকীভাবে ভাই-বোনের সীমা ছাড়িয়ে এক গভীর মানসিক আকর্ষণ প্রকাশ করেছেন। Cormac McCarthy-এর Outer Dark-এ এই নিষিদ্ধ প্রেম আরও ভয়ংকর—ভাই-বোনের অবৈধ সম্পর্ক এবং তার পরিণতিতে অনিবার্য ধ্বংস। এইসব রচনায় ট্যাবু প্রেম সমাজের নীতিকে প্রশ্ন করে, যেমন চারুলতার প্রেম প্রশ্ন তোলে গৃহস্থ সমাজের নির্দিষ্ট সীমানাকে।
অন্যদিকে, Vladimir Nabokov-এর Lolita প্রেম, কামনা ও অপরাধের জটিলতাকে একসঙ্গে ধারণ করে। Humbert Humbert-এর এক কিশোরীর প্রতি আসক্তি সমাজ ও নৈতিকতার সমস্ত নিয়ম লঙ্ঘন করে, কিন্তু Nabokov সেই প্রেমকে কেবল পাপ নয়, বরং এক মানসিক বিকার ও আত্মধ্বংসের কাহিনি হিসেবে দেখিয়েছেন। Lolita–র মতোই নষ্টনীড়–এও প্রেমের ভেতরে এক নিঃশব্দ ধ্বংস নিহিত থাকে, তবে এখানে তার উৎস অপরাধ নয়, একাকীত্ব।
রাজনৈতিক বা সামাজিক ট্যাবুর দিক থেকেও “নষ্টনীড়”-এর প্রেম Cleopatra ও Antony-র সম্পর্কের সঙ্গে তুলনীয়। Antony যখন রোমের সাম্রাজ্যিক ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে Cleopatra-র প্রেমে পড়েন, তখন সেই প্রেম কেবল ব্যক্তিগত নয়, রাজনৈতিক বিদ্রোহ। চারুলতার প্রেমও তেমনি এক নীরব বিপ্লব—সে গৃহিণীর কর্তব্যপালন ছাড়িয়ে এক মানবসত্তার স্বীকৃতি চায়।
পাশ্চাত্য সাহিত্যে দেবর-ভাবি সম্পর্ক বা আত্মীয়ের স্ত্রীর প্রতি আকর্ষণ খুব কমই সাহিত্যিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কিছু জনপ্রিয় রোমান্স উপন্যাসে যেমন Cheryl St. John-এর His Secondhand Wife বা Janice Kay Johnson-এর Her Sister’s Baby–তে এই সম্পর্ক দেখা যায়, কিন্তু সেখানে এটি মূলত আবেগপ্রবণ কাহিনি, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা কম। রবীন্দ্রনাথ এই থিমকে এক দার্শনিক ও নান্দনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, এই প্রেম সমাজবিরোধী হলেও মানবিক সত্যের বিরোধী নয়।
চারুলতা এখানে কেবল প্রেমিকা নয়; তিনি এক সৃষ্টিশীল মন, যিনি অমলের সংস্পর্শে এসে নিজের বৌদ্ধিক ও সাহিত্যিক সত্তাকে আবিষ্কার করেন। অমলের সঙ্গে তার সম্পর্কের মূলে রয়েছে চিন্তা, রুচি ও সৃজনশীলতার সখ্য। চারুর বাগান করা, লেখা, সূক্ষ্ম কাজ করা—সবই তার আত্মপ্রকাশের উপায়, এমন এক পৃথিবীতে যেখানে তার কোনো সক্রিয় ভূমিকা নেই। এই কারণেই “নষ্টনীড়” নারী-চেতনার প্রারম্ভিক রূপগুলির একটি—একজন নারী নিজের নিঃসঙ্গতার মধ্যে নিজের অর্থ খুঁজে নিতে শিখছে।
অমল যখন বিলেত চলে যায়, চারুর জীবনের কেন্দ্রটি ভেঙে পড়ে। সে বুঝতে পারে, প্রেম শুধু সঙ্গ নয়, আত্মার দর্পণ। অমলের অনুপস্থিতিতে চারু সেই বেদনাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না; সে ফিরে যায় তার স্বামীর কাছে, কিন্তু সেখানে আর কোনও আলো নেই। ভূপতি তার কাছে ফিরে এলেও চারু জানে, সময় ফুরিয়েছে। “যেমন গুরুতর আঘাতে স্নায়ু অবশ হয়ে যায়, বিচ্ছেদের আরম্ভকালে অমলের অভাব চারু ভালো করে যেন উপলব্ধি করতে পারেনি”—এই বিশ্লেষণ নিখুঁতভাবে বোঝায় যে, প্রেম কখনও কখনও মৃত্যুর মতোই অচেতন অবস্থায় শুরু হয়, এবং যখন চেতনা ফিরে আসে, তখন অনেক দেরি হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ এখানে কোনও নৈতিক উপসংহার টানেননি। গল্পটি শেষ হয় অসমাপ্ত ইঙ্গিতে, যেন লেখক নিজেই জানেন—প্রেমের শেষ বলে কিছু নেই, কেবল তার প্রতিধ্বনি রয়ে যায়। এই অসমাপ্ততার মধ্যেই গল্পের গভীর অর্থ। সমাজের নৈতিক কাঠামো অটুট থাকে, কিন্তু মানবমনের সত্য ভঙ্গুর। চারুলতা শেষপর্যন্ত যা হারায়, তা কেবল প্রেম নয়, নিজেকে।
সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা (১৯৬৪) এই গল্পকে চলচ্চিত্রে অনবদ্যভাবে রূপান্তরিত করেছে। মাধবী মুখার্জির চোখে চারুর নীরব অভিমান, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অমলের স্নিগ্ধ প্রাণচাঞ্চল্য, ভূপতির অজ্ঞান মমতা—সব মিলিয়ে রায় এক নিঃশব্দ প্রেমের দৃশ্যরূপ দিয়েছেন। ঝড়ের বিকেলে চারুর জানালা খুলে যাওয়া, বাতাসে তার চুল উড়ে যাওয়া—এ যেন সেই নিষিদ্ধ প্রেমের প্রতীক, যা এক মুহূর্তে সমস্ত সীমারেখা মুছে দেয়।
এইভাবে নষ্টনীড় বিশ্বসাহিত্যের নিষিদ্ধ প্রেমের দীর্ঘ ধারায় এক বিশেষ স্থান অধিকার করে। George Eliot বা McCarthy যেমন রক্তসম্পর্কের নিষিদ্ধ প্রেমের ভেতর দিয়ে সমাজের সীমা পরীক্ষা করেছেন, রবীন্দ্রনাথ তেমনি গৃহস্থ জীবনের নিরাপদ নীড়ের মধ্যেই সেই সীমারেখাকে প্রশ্ন করেছেন। তার গল্পে প্রেম অপরাধ নয়, বরং অপরিপূর্ণতার আর্তি।
আজও চারুলতা আমাদের চারপাশে আছে। তার নাম হয়তো বদলেছে, জীবনযাপন আধুনিক হয়েছে, কিন্তু তার একাকীত্ব একই রয়ে গেছে। অনেক নারী আজও মানসিক উপেক্ষার বেদনা বয়ে বেড়ান, এবং অনেক অমল আজও কোনও দায়বদ্ধতার বাইরে থেকে তাদের জীবনে এসে আবার হারিয়ে যায়। চারুর মতো তারাও শেষপর্যন্ত এক নষ্টনীড়ে জীবন কাটান—অর্ধেক আলো, অর্ধেক ছায়া, যেখানে প্রেম ও নৈতিকতা মিশে গেছে অনির্ধারিত রেখায়।
রবীন্দ্রনাথের এই গল্প আমাদের শেখায়, প্রেম কখনও কেবল সামাজিক চুক্তি নয়, এটি এক গভীর মানবিক চাহিদা। নৈতিকতা সমাজের প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু মানবিকতার কাছে তা প্রায়ই অপর্যাপ্ত।
নষ্টনীড় এই সত্যেরই নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি—যে প্রেমকে সমাজ নিষিদ্ধ বলে চিহ্নিত করে, সেটিই হয়তো মানুষের সবচেয়ে সত্য ও একাকী অনুভূতি। চারুলতা, অমল ও ভূপতির সম্পর্ক তাই কোনও পাপের ইতিহাস নয়; এটি মানুষের অনিবার্য অসম্পূর্ণতার কাহিনি, যেখানে প্রেম নষ্ট নয়, বরং চিরকাল অসমাপ্ত।
অলমতি বিস্তরেণ।