Sunil Gangopadhyay (Bengali: সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়) was a famous Indian poet and novelist. Born in Faridpur, Bangladesh, Gangopadhyay obtained his Master's degree in Bengali from the University of Calcutta, In 1953 he started a Bengali poetry magazine Krittibas. Later he wrote for many different publications.
Ganguly created the Bengali fictional character Kakababu and wrote a series of novels on this character which became significant in Indian children's literature. He received Sahitya Academy award in 1985 for his novel Those Days (সেই সময়). Gangopadhyay used the pen names Nil Lohit, Sanatan Pathak, and Nil Upadhyay.
Works: Author of well over 200 books, Sunil was a prolific writer who has excelled in different genres but declares poetry to be his "first love". His Nikhilesh and Neera series of poems (some of which have been translated as For You, Neera and Murmur in the Woods) have been extremely popular.
As in poetry, Sunil was known for his unique style in prose. His first novel was Atmaprakash (আত্মপ্রকাশ) and it was also the first writing from a new comer in literature published in the prestigious magazine- Desh (1965).The novel had inspiration from ' On the road' by Jack Kerouac. His historical fiction Sei Somoy (translated into English by Aruna Chakravorty as Those Days) received the Indian Sahitya Academy award in 1985. Shei Somoy continues to be a best seller more than two decade after its first publication. The same is true for Prothom Alo (প্রথম আলো, also translated recently by Aruna Chakravorty as First Light), another best selling historical fiction and Purbo-Paschim (পূর্ব-পশ্চিম, translated as East-West) a raw depiction of the partition and its aftermath seen through the eyes of three generations of Bengalis in West Bengal, Bangladesh and elsewhere. He is also the winner of the Bankim Puraskar (1982), and the Ananda Puraskar (twice, in 1972 and 1989).
Sunil wrote in many other genres including travelogues, children's fiction, short stories, features, and essays. Though he wrote all types of children's fiction, one character created by him that stands out above the rest, was Kakababu, the crippled adventurer, accompanied by his Teenager nephew Santu, and his friend Jojo. Since 1974, Sunil Gangopadhyay wrote over 35 novels of this wildly popular series.
Death: Sunil Gangopadhyay died at 2:05 AM on 23 October 2012 at his South Kolkata residence, following a heart attack. He was suffering from prostate cancer for some time and went to Mumbai for treatment. Gangopadhyay's body was cremated on 25 October at Keoratola crematorium, Kolkata.
Awards & Honours: He was honored with Ananda Award (1972, 1979) and Sahitya Academy Award (1984).
সুনীলের লেখায় আমি যেন সম্পূর্নরূপে হারিয়ে যাই;৬২৬ পৃষ্ঠার বৃহৎ কলেবরের এই উপন্যাস আমি গপগপিয়ে গিলেছি।টাইম ট্রিলজি পড়ার পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে একা এবং কয়েকজন টাই আগে পড়লাম।একা এবং কয়েকজন মূলত ইতিহাসের আশ্রয়ে লিখিত এমন এক উপন্যাস যেখানে সুনীল দেখাতে চেয়েছেন জন্ম থেকে মৃত্যুর মাঝপথের যাত্রাকে খুব গভীর ও সুনিপুনভাবে। উপন্যাসটা গড়ে উঠেছে এমন এক সময়কে কেন্দ্র করে যখন সমগ্র বিশ্ব একটি অস্থিতিশীল সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কাহিনীর সূত্রপাত, গল্প এগিয়ে চলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অধ্যায়, দেশভাগ, ইংরেজ পতনের বিপ্লব ও স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ের সাময়িক হালচাল নিয়েই। গল্পের দুটি কেন্দ্রীয় চরিত্র সূর্যকুমার ও বাদল, অস্থিতিশীল সময়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা দুই চরিত্র। বিপ্লবী ও স্বাধীনতাকামী সূর্যের জীবনের একেরপর এক ছন্দপতন ও নানা গতিময়তা। জীবনকে অতি তাচ্ছিল্যের সাথে কাটিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নির্ভীকভাবে অংশগ্রহণ, উগ্র জীবনের সাথে তাল মেলাতে না পারায় শেষ অবধি ঘটে যাওয়া আকস্মিক ঘটনা নিয়ে বেশ অন্যরকম একটা চরিত্র সৃষ্টি করেছেন লেখক। অন্যদিকে বাদলের জীবনটা আদতে বেশ সহজ সাধারণ হলেও গল্পের মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বাদলের শিশু থেকে বেড়ে ওঠা, বেড়ে ওঠার আবহ টা সূর্য থেকে একদম ভিন্ন। কেন যেন মনে হয়েছে লেখক বাদল চরিত্রটি ঠিক হয়তো নিজেকে ভেবেই তৈরি করেছেন , গল্প লিখেছেন বাদলের জবানীতেই। বৃহৎ কলেবরের এই উপন্যাসে অসংখ্য চরিত্রের দেখা মেলে, সেই সাথে উপন্যাসের পাতায় পাতায় মানুষের সমাজজীবন, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা, গভীর প্রেম ও বিচ্ছেদের দহন, মৃত্যুর মিছিল সবকিছু মিলেই বেশ সুন্দর এক সৃষ্টি। বইটি ঐতিহাসিক পটভূমি আদলে সৃষ্টি হলেও ইতিহাসের বিবরণ বেশ কমই আছে বলতে হবে। মূলত দেশের অস্থিতিশিল সময়ে চরিত্রগুলোর জন্ম মৃত্যু ,চিন্তা চেতনা, ভাবাবেগ, দেশপ্রেম ও দেশপ্রেমের আদলে ঘটতে থাকা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সমাচার। ব্যক্তিগতভাবে সুনীলের লেখা আমার কাছে জাদুর মত মনে হয়। চোখের পলকে পাতার পর পাতা পড়া হয়ে যায়। এতটাই সাবলীল সেই সাথে গভীর। বইয়ে যুদ্ধ হাঙ্গামা, হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা, স্বাধীনতা অর্জন, দেশভাগ, ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ সবকিছুকে ছাপিয়ে বেশ কিছু কঠিন বাস্তবতা উঠে এসেছে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে কিছু স্বার্থ কেন্দ্রিক মানুষের আখের গোছানো ও আধিপত্য বিস্তার, ঘুষের প্রচলন, সাধারণ মানুষকে দেয়া নৈরাশ্যে নিয়ে লেখক কলম তুলেছেন কাল্পনিক ঘটনার মাধ্যমে। বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে মানুষে মানুষে কতটা পার্থক্য হতে পারে বইটি পড়লে বোঝা যায়। অসময় চিনিয়ে দেয় সময়কে । প্রত্যেকটি চরিত্র যেন নির্ধারিত ছিল মানুষ চেনাবার উদ্দেশ্যেই।এত বড় পরিসরের বই নিয়ে বলে শেষ করা সম্ভব নয়। প্রচুর দারুণ কিছু ডায়লগ ডেলিভারি আছে বইতে , একদম মন ছুঁয়ে যায়। ঐতিহাসিক এসপেক্ট ছাড়া সামাজিক জীবন, রোম্যান্টিক এস্পেক্ট থেকে ভাবলেও বইটি এতটাই চমৎকার যে শুধুমাত্র লিখে বোঝানো অসম্ভব। আগে একটা সময় চিন্তা করতাম সুনীলের এই রকম ভারী ভারী উপন্যাস কীভাবে পড়া সম্ভব! আর এখন সুনীলের লেখার মায়ায় পড়েছি । সবকিছু মিলিয়ে বইটা আমার কাছে বেশ ভালো লেগেছে।
৩.৫/৫ টাইম ট্রিলজি আগেই পড়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ জানতে পারলাম এই বইয়ের কথা। 'সেই সময়' পড়ার পর থেকে ওনার লেখা ঐতিহাসিক উপন্যাস এর পাঁড় ভক্ত বনে গেছি অনেক আগেই। তাই যখন শুনলাম 'একা এবং কয়েকজন' বইটাও একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস বিশেষত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বাপর সময়কালীন বাংলার প্রেক্ষাপটে লেখা, তখন খুঁজে পেতে পড়েই ফেললাম। টাইম ট্রিলজির মত অত্যন্ত অসাধারণ বই মনে না হলেও পড়তে মোটেও খারাপ লাগেনি। তবে আমার মতে, সুনীলের ঐতিহাসিক উপন্যাসগুলো নিচের ধারাবাহিকতায় পড়া উচিত; তাহলে সাহিত্যপাঠের আনন্দ লাভের সাথে সাথে গত দুশো বছরের বাংলার সমাজ, রাজনীতি ও ইতিহাস সম্পর্কে একটা মোটামুটি স্বচ্ছ ধারণাও লাভ করা যাবেঃ
সেই সময়> প্রথম আলো> একা এবং কয়েকজন> পূর্ব-পশ্চিম।
সময়ের সাথে সাথে ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা গল্পের ছলে বর্ণনার ফাঁকে তিনি যেরকম সহজাত দার্শনিকসুলভ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন, তাতে তাঁর লেখাগুলো পড়তে গিয়ে সবসময়ই চমৎকৃত হই। 'একা এবং কয়েকজন' বইটাও এর ব্যাতিক্রম না। সত্যিই ঐতিহাসিক উপন্যাস রচনার ক্ষেত্রে সুনীলের তুলনা শুধুমাত্র সুনীলই।
বইটার শুরু হয়েছিল দারুণভাবে, সেভাবেই স্বচ্ছন্দ গতিতে এগিয়ে চলছিল... কিন্তু ক্রমশ সূর্যের নৈতিক নিম্নগামিতার কথা পড়তে পড়তে বিরক্তবোধ করা শুরু করেছিলাম। তার বেপরোয়া আচরণগুলো ক্রমশ লাম্পট্যে পরিণত হতে দেখেই এই বিরক্তিবোধ। তবে একদিক থেকে এটা ভেবেও ভালো লেগেছে যে, protagonist হিসেবে সূর্যের চরিত্রে মহিমান্বয়ন না করে বরং তাকে বাস্তবমুখী করে চরিত্রায়ণ করতে পেরেছেন সুনীলবাবু। সত্যিই তো, ভালোবাসায় অন্ধ হলে মানুষ কতটাই না নির্বোধের মত আচরণ করতে পারে! সূর্যর অদ্ভুত ও নাটকীয় উত্থান-পতনে ভরা জীবনকাহিনী পড়তে গিয়ে কখনো কখনো বেশ খারাপই লেগেছে। এরকম ব্যতিক্রমী protagonist এর জন্য হলেও এই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যের মাঝে অনন্য হয়ে থাকবে।
বর্ণনাভঙ্গির দিক থেকে এই উপন্যাসটিকে unique বলাই যায়; সূর্যের মামাতো ভাই বাদলের স্মৃতিচারণ বর্ণনার মাধ্যমে গল্প এগিয়েছে। এক্ষেত্রে কখনো উত্তম পুরুষে, আবার কখনো তৃতীয় পুরুষে ঘটনা বর্ণনার ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। আবার কাহিনীর মাঝখানে মাঝখানে ভবিষ্যতের কোনো ঘটনার ব্যাপারে পাঠককে হালকা আভাসও দিয়েছে বর্ণনাকারী, যা বইটা পড়ার সময় পাঠককে অন্যরকম এক রোমাঞ্চ উপহার দিতে সক্ষম। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের বিখ্যাত বই 'One Hundred Years of Solitude' বইটাতেও কাহিনীবর্ণনার ক্ষেত্রে এরকম অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যতের দারুণ সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়।
বাদল চরিত্রের সিংহভাগ অংশই সুনীল নিজের ব্যক্তিগত জীবনের আদলে ফুটিয়ে তুলেছেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক বই 'অর্ধেক জীবন' আগে পড়া থাকলে এই ব্যাপারটা যে কেউই বেশ ভালোভাবে রিলেট করতে পারবে। ধর্মের ভিত্তিতে মানুষে মানুষে বিভেদ বিশেষত ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার মর্মবেদনা সুনীল কখনোই ভুলতে পারেন নি। এই উপন্যাসেও তাঁর সেই আক্ষেপ অনেকবার ফুটে উঠেছে।
সুনীলের এই লেখাটি যে এমন এক সময়ে হাতে নিবো ভাবিনি কখনো। দেশভাগের পূর্বের ব্রিটিশদের বিরুদ্ধের আন্দোলন নিয়ে পড়তে পড়তে আমি ভাবতে থাকি দেশে এখন চলমান অবস্থা নিয়ে। চল্লিশের দশকে যারা সশস্ত্র বিপ্লব করে ইংরেজ তাড়াতে চেয়েছিলেন তারা সম্পূর্ণ সফল হননি। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের দেশেও যদি এমন কিছু শুরু হয়ে যায় তবে শেষমেশ সবকিছু কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।
সুনীলের অনেক উপন্যাসেই চরিত্রগুলোর উপর তার নিজের প্রভাব থাকে। এই বইয়ের বাদলের উপরেও দেখা যায়।
ভাল লেগেছে। শুরুটা খুব সুন্দর। শেষটাও। ইতিহাস, কল্পনা, দ্রোহ, ভালোবাসা আর বিষন্নতার মিশ্রণ বড়ই ভাল লাগলো।
সুনীলের উপন্যাস পড়ে কখনোই হতাশ হইনি আমি। কোন বই একবার শুরু করে শেষ না করে উঠতে পারিনি এখন পর্যন্ত। ছাপার অক্ষরেরও যে চুম্বকের মত আকর্ষনী ক্ষমতা আছে তা সুনীলের বই পড়েই প্রথম বুঝতে পারলাম। ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস সুনীলের মত করে এত ভালো আর কেউ লিখতে পেরেছে বলে আমার মনে হয় না।একা এবং কয়েকজন সরাসরি ইতিহাসনির্ভর না হলেও এতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি ও সেই যুদ্ধ এই উপমহাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনে কি প্রভাব ফেলেছে তার চিত্র খানিকটা উঠে এসেছে।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইংরেজদের যখন খানিকটা নড়বড়ে আর পর্যুদস্ত অবস্থা, তখনই কিছু যুবক স্বপ্ন দেখে এই সুযোগে ইংরেজদের হটিয়ে ভারত স্বাধীন করে নেয়ার।সূর্যকুমার সেই যুবকদেরই একজন।মাত্র ১৬ বছর বয়সে ব্যক্তিগত জীবনের আশা, হতাশা, প্রেম কে দূরে ঠেলে দিয়ে স্বদেশীদের সাথে নেমে পড়ে আন্দোলনে।কিন্তু সূর্য চরিত্রটা যেন কেমন! খোলসে ঢাকা শামুকের মত। পুরো পৃথিবীর উপর তার কি এক অভিমান, নিজেকে শেষ করে দেয়ার এক হিংস্র ইচ্ছা। প্রতি পদে পদে নিজেকে বিপদে জড়িয়ে কেমন যেন এক শান্তি পায় সূর্য। শুধু সূর্যই নয়, এই উপন্যাসের প্রতিটা চরিত্রই যেন এমন, বাদল, শ্রীলেখা, রেণু, বড়বাবু, চিররঞ্জন সবাই। সুখ দুঃখ, হিংসা, বিদ্বেষ, অহংকার, আশা, হতাশা এসব ঐহিক চিন্তা ভাবনায় সবাই আলাদা আলাদা ব্যক্তিত্বের পরিচয় দিলেও, দিনশেষে সবার মধ্যেই দারুণ এক মিল পাওয়া যায়। দিনশেষে ওরা আমরা সবাই একা। আবার মাঝে মাঝে এই একাকীত্বই এক পরম সুহৃদের মত বিনি সুতোর মালায় গেঁথে রাখে সবাইকে। ভারত স্বাধীনতার সময়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা এই উপন্যাসে যুদ্ধ , প্রেম, বিচ্ছেদ, পারিবারিক সম্পর্ক, মৃত্যু প্রতিটা ব্যাপারকে তাঁর কলমের জাদুর ছোঁয়ায় মহিমান্বিত করে তুলেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। অপরিণত বয়সে সূর্যর সাথে শ্রীলেখার প্রেম, তাদের অন্তরঙ্গ মুহুর্ত, বিচ্ছেদ, পরবর্তীতে পরিনত বয়সে আবার দিপ্তীর সাথে সূর্যর সম্পর্ক, বহুদিন দুজনের একসাথে থাকা কোনটাই সেই সময়ের প্রেক্ষিতে খাপছাড়া বা অসঙ্গত মনে হয়নি। সব কিছু মানিয়ে গেছে ঠিকঠাক। বাদলের জীবনের ছেলেবেলা থেকে বড়বেলা পুরোটাই উঠে এসেছে এই উপন্যাসে। ভারত স্বাধীনতার মত এক অস্থির সময়ে এক কিশোরের বেড়ে উঠা, তার মনের ছোট ছোট চাওয়া পাওয়া, রেনুর সাথে তার প্রেম, সমস্ত প্রতিকূলতা শেষে শেষের দিকে এসে দুজনের মিল, এই সব কিছুই সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক। তবে চিররঞ্জনের চরিত্রটা ঠিক ফুটে উঠেনি মনে হল। এই চরিত্রটিকে আরো সুযোগ দেয়া গেলে উপন্যাসটা ভিন্ন মাত্রা পেত তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। সব মিলিয়ে অসাধারণ একটা উপন্যাস।
পূর্ব-পশ্চিমের মত কিছু আশা করেছিলাম, সেই রকম ভাবেই গল্প আগাচ্ছিল- ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, তেতাল্লিশ সালের দুর্ভিক্ষ, কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগ, কংগ্রেসের রাজনীতি; এসব নিয়ে টাইম ট্রাভেল করতে ভালোই লাগছিল। এর সাথে স্পাইস হিসেবে বাদল-রেণুর টিনএজ প্রেম, যদিও বাদল ছেলেটা একটু ড্রামা কুইন টাইপের; তারপরও তাকে সহ্য করা যায়- সদ্য ১৮+ তরুণরা একটু মেলোড্রামা করতে ভালোবাসে, যার ভোগান্তি পোহাতে হয় মা-বাবাদের, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু শেষ দেড়শ পৃষ্ঠা পড়ে খুব আশাহত হয়েছি। শুধু সুনীলের লেখা পড়তে ভালোবাসি বলে আমি শেষপর্যন্ত পড়া চালিয়ে গেছি, আশা করেছিলাম শেষটা খারাপ হবে না। কিন্তু একটা সাইকোপ্যাথের চরিত্র এমন দীর্ঘ উপন্যাসে এতো গুরুত্ব দিয়ে লিখলেন সুনীল! মুখটা তেতো হয়ে গেছে। কার ভালো লাগে এমন জঘণ্য ধর্ষক টাইপের চরিত্রকে নিয়ে শত পৃষ্ঠার ওপর পড়তে! আমার লাগে না। পাঁচে পাঁচ - সাইকোপ্যাথটার জন্য মাইনাস আড়াই= টেনেটুনে তিন তারা।
কংগ্রেস কোনদিনই এ দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে চায়নি, ইংরেজদের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেতে চেয়েছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজ মুক্তির সনদ এনে দিলে আর দেশ পেয়ে ভাইকে হারাতে হতনা হয়ত। গান্ধী নেহেরুরা কি তাদের ঐতিহাসিক দায় এড়াতে পারেন কোনভাবে? জিন্নাহ নিজে ধর্মে উদাসীন, বিয়ে করলেন অমুসলিম মহিলাকে আর তার পেছলে গিয়ে দাঁড়ালো গোটা ভারতবর্ষের ৫ কোটি মুসলিম!মুস্লিমরা ঐতিহাসিকভাবেই এরকম মূর্খতার পরিচয় দিয়ে চলেছে যুগে যুগে। মাওলানা আবুল কালাম আজাদের মত বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদও ব্যার্থ হলেন মুস্লিমদের কাছে কংগ্রেসের ক্রেডিবিলিটি এস্টাব্লিস করতে।মুসলিম লীগের ডাকা ১৬ আগস্টের হরতাল পরবর্তী দাঙ্গায় দাঁড়ি থাকার অপরাধে যে বৃদ্ধ মুসলমান মানুষটি মারা গেলেন বাজার করতে গিয়ে পাকিস্তান না হলে তার কি খুব বেশি ক্ষতি হত? তাতীবাজারের যে গরীব দোকানি হিন্দু হবার অপরাধে নির্মমভাবে খুন হলেন, ভারতের ভাঙ্গা-গড়া নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথাই ছিল না; তার সমস্ত চিন্তা চেতনা জুড়ে ছিল হয়ত দু বেলা পেট পুরে খাবার স্বপ্ন।রক্তের গঙ্গা বয়ে গিয়েছিল কোলকাতা, নোয়াখালি, বিহার, আহমেদাবাদ, বোম্বাই ও আরও পরে পাঞ্জাবে। মৃত্যুর মিছিলে নাম লিখিয়েছিল বহু নিরপরাধ সাধারন মানুষ। শেরেবাংলা আর সোহরাওয়ার্দীর সাতচল্লিশপূর্ব ভূমিকা প্রশংশনীয়।
‘’হিরোশিমায় যেদিন বোমার আঘাতে লাখখানেক মানুষ হতাহত হল, সেদিনও পৃথিবীতে পয়ত্রিশ চল্লিশ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছিল, প্রায় এক লক্ষ নারী পুরুষ নতুন স্বপন নিয়ে ঘর বেধেছিল, অন্তত এক কোটিখানেক মানুষ নিছক আহার্্যী সন্ধান ছাড়া আর কোন কিছুই চিন্তাই করেনি। অন্যান্য দিনের মতন সেদিনও যথারীতি সারা পৃথিবী জুড়ে বেশ কিছু নারী পুরুষ আত্মহত্যা করেছে। সেই দিন সেই সময়ে ভাটপাড়ায় এক ভদ্রলোক সনাতন হিন্দু ধর্মকে বাঁচাবার জন্যে দারুন উত্তেজিত, নারায়ণগঞ্জে তখন ইসলাম বিপন্ন বলে ছোট একটি সভা হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ই আসামের হাফ্লং এ প্রত্যন্ত পাহাড় থেকে আসা এক কাছাড়ী আদিবাসী সদ্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহন করে জীবনে প্রথম এক টুকরো পাউরুটি খেতে পেল এবং ভ্যাবাচ্যাকা হয়ে কেঁদে ফেললো। সেই দিনই দুপুরে আমেরিকার আল্বামা রাজ্যে এক তুলো ক্ষেতে দু দল খ্রিষ্টান নিছক দু রকম গায়ের রঙের জন্য দাঙ্গা করেছিল। পৃথিবীতে মানুষের কোন চরিত্র নেই। প্রত্যেক জন্তু জানোয়ারের চরিত্র থাকে, মানুষ জাতিই শুধু চরিত্রহীন। স্পেনে গত তিনশো বছর ধরে যে ষাঁড়ের সঙ্গে লড়াই খেলা হচ্ছে, তাতে এত দিনের মধ্যে একটি ষাঁড়ও সোজা ছুটে আস্তে আস্তে হঠাত ডান দিকে বা বামদিকে বাকেনি। মানুষ এরকম নয়। মানুষ কখন কোন্দিকে বেকে বসবে তা সে নিজেও জানেনা। সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে একদল মানুষ বাঘের পেটে প্রাণ দেয়। আবার একদল লোক সারা পৃথিবীর ব্যাঘ্র সম্পদ বাঁচিয়ে রাখার জন্য সমিতি গড়ে। সন্যাসীর হঠাত পদস্থলন হয়, একজন ডাকাত হঠাত কবি হয়ে ওঠে।‘’ সুনীল অনেক সহজে কঠিন দাশনিক কথা বলে দেন। একারনে তার লেখা ভাল লাগে।
মানুষের অনুভূতি কত বিচিত্র! তার কার্যকলাপের কোন মাথামুণ্ডু অনেক সময়ই বোধগম্য হয় না। কেন মানুষ মরিচীকার দিকে দৌড়ায় সেটা মরিচীকা জেনেও? কে বলবে তার গূঢ় অর্থ কোথায় আছে। একেকজন মানুষ থাকে যাদের দেখলেই প্রবল আকর্ষণ অনুভূত হয়। মনে হয় যেন একে পেলে, এর বন্ধুত্ব-ভালোবাসা পেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু এই মানুষগুলো তা কিছুতেই বোঝে না। তাদের স্বভাব থাকে তীব্র, তারা কেন কী করে কিছুই সাধারণ ছকে ফেলা যায় না। তাদের রাগ-দুঃখ-চাওয়া সবই থাকে প্রবল, এমনকি ভালোবাসাও। একা এ���ং কয়েকজন উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্রের একটি সূর্যকুমার ভাদুড়ি ঠিক তেমনই একটি চরিত্র। অমিত সম্ভাবনা এবং তেজ নিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া এক মানবসন্তান। যে জগতে এসেছিল অকিঞ্চিৎকর ভাবে, বিরাট কিছু করার সম্ভাবনা জেগে উঠেছিল তাকে ঘিরে, কিন্তু সে হারিয়েও গেল ঠিক সেই ভাবেই। গোয়ালিয়র এর এক রূপসী বাইজী কিংবা সূর্যের বাবা অমরকুমার ভাদুড়ির মতে এক সত্যিকারের শিল্পী নাসিম আরা বানু ওরফে বুলবুলের সন্তান সে। যদিও তাকে বড় করেন তার সৎ মা পূর্ণিমা দেবী, কারণ সূর্যের জন্মের পরেই আত্মহত্যা করেন বুলবুল। সেই সূর্য ঠিক সূর্যের মতোই প্রখরতা নিয়ে বড় হতে থাকে, দেশ কী, স্বাধীনতা কী ঠিকভাবে বোঝার আগেই জড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে। সদা গম্ভীর সূর্যের চাহিদা সে তার জেদ দিয়েই পূরণ করে নিতে চাইত। জীবনে গভীরভাবে চেয়েছে সে তিনটি নারীকে, শ্রীলেখা যে সূর্যের সম্পর্কে বোন হয়, তার সৎ মায়ের ভাইয়ের মেয়ে হচ্ছে শ্রীলেখা। তাই তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এই সম্পর্ক ছিল অসম্ভব। আর শ্রীলেখার ভালোবাসার জোর থাকলেও মনের জোর স্বভাবতই তত ছিল না। কাজেই প্রত্যাখ্যাত হয় সূর্য। পরবর্তীতে তার আন্দোলনেরই এক সহকর্মী দীপ্তি দি, যিনি সূর্যের চাইতে বয়েসে আট বছরের বড়। তীব্রভাবে চেয়েছে সূর্য দীপ্তিকে, কিন্তু দীপ্তির চরিত্রে সবসময়ই এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল। তবুও কাছে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি সূর্যের। আর সেই কাছে আসাটাই এক রকমভাবে কাল হয়ে দাঁড়াল সূর্যের জীবনে। আর এক বাইজী বুলবুলকে আশ্রয় করতে চেয়েছিল সূর্য, কিন্তু সেও মারা যায় টিবি রোগে। সূর্য আপাদমস্তক এক অস্থির চরিত্র। দেশপ্রেম, মানবিকতা তার চরিত্রে খুব প্রকটভাবে ছিল না কখনোই। সবসময়ই সে তার ইচ্ছে-রাগ-জেদের বশে চলেছে। তার বাবার জন্যও খুব বেশি টান ছিল না তার। ভালোবাসা মানেই তার কাছে যেন ছিল এক অধিকারবোধ। পাওয়ার এক তীব্র আক্রোশ নিয়েই অকালে কোন বিশেষ কাজ ছাড়াই, কোন মহৎ অবদান ছাড়াই, এমনকি এককালে স্বদেশী আন্দোলনের জন্য জেল খাটা বিখ্যাত সূর্যকে তাই চলে যেতে হয় অস্তাচলে, নিভৃতে। আর এক প্রধান চরিত্র বাদলরঞ্জন। ছোটবেলা থেকেই যে সূর্যকে আদর্শ মেনে বড় হয়েছে, চেয়েছে দুজন মিলে একসাথে বড় কিছু করতে। কিন্তু সূর্য আর বাদল কি কখনো একসাথে থাকতে পারে? বাদল বড় হয়ে ওঠে তার মতো। সমস্ত দারিদ্র্য, না পাওয়া সত্বেও তার জীবনে আসে কবিতা। আপাদমস্তক রোমান্টিক চরিত্র হলেও সেও রাজনীতিতে নাম লেখায়। কিন্তু কেউ কেউ আছে কোন চাওয়াই তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারেনা। তাদের যেন কোন এক দোলাচল রয়ে যায়, মা-বাবা-প্রেমিকার পিছুটানকে সে সূর্যের মতো করে অগ্রাহ্য করতে পারেনা। বাদলের জীবনের এক ধ্রুব সত্য রেণু। তার আবাল্য প্রেম, নানান ঝক্কি পেরিয়েও উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে দুজন দুজনের হাতে হাত রাখে এবং স্বভাবতই পাঠকেরাও স্বস্তি পান! বাদল চরিত্রটি বাঙাল, লেখকের নিজ জীবনের অনেকখানিই যেন এই বাদল চরিত্রটির মধ্যে পুরে দেওয়া আছে। গোটা উপন্যাস জুড়ে অঙ্কিত হয়েছে উপমহাদেশের এক অস্থির সময়। স্বদেশী আন্দোলন, দেশ ভাগ, মিথ্যে স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, কংগ্রেসের উত্থান, নেতাদের ভোল বদল ইত্যাদি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে প্রতিটি চরিত্র। কেউ কেউ সরাসরি প্রভাবিত, কেউ কেউ আবার দূর থেকে অবলোকন করে গেছেন। যেমন, বাদলের বাবা চিররঞ্জন, যিনি শত পালাবদলের মধ্যেও রয়ে গেলেন আত্মবিশ্বাসহীন এক বেকার বাবা। রেণু চরিত্রটি মোটামুটি তখনকার সময়ের এক প্রগতিশীল তরুণীর কথা বলে। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ আগ্রহ থেকে যারা একটু একটু করে পুরনো খোলস ভেঙে প্রগতিশীলতার দিকে এগুচ্ছে। আপাদমস্তক সংশয়ী চরিত্র দীপ্তিদি। একজন বিপ্লবী হওয়া সত্বেও তাঁর চরিত্রের দ্বিধা রীতিমতো পীড়াদায়ক এবং পরিণতিও সুখের নয়। সূর্যের বাবা অমরকুমার আর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বইটির, যৌবনে অনেকটা সূর্যের মতোই একরোখা থাকলেও পরবর্তীতে তাঁর সন্তানবাৎসল্য চোখে পড়ার মতোই। যদিও বারবার তিনি অপমানিত হয়েছেন সন্তানের কাছে। সুনীলের সেই সময়, প্রথম আলোর কাতারে না গেলেও একা এবং কয়েকজন একটি সুখপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস যেটি পাঠে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দিকে ফিরে দেখার সাথে সাথে কয়েকজন মানুষ কিংবা অধিকাংশ মানুষের বেড়ে ওঠা, ভাবনা, অনুভূতি অবলোকন করা যায়। ভাবনায় ডুবিয়ে দেয়ার মতো বেশ কিছু লাইন আছে বইটিতে, আছে বেশ কিছু দর্শনের সহজ বয়ান যা সুনীলের সহজাত।
বইটা নিয়ে অনেক কিছুই বলার ছিল। কিন্তু, বলে কী হবে? বিরাট এক রচনা লিখলে তা পড়বেই বা কে? পড়ে তার লাভই বা হবে কী? তাই কিছুই বলছি না। যার পড়ার ইচ্ছা হবে পড়বে। ইচ্ছা না হলে পড়বে না। মানুষ আপন মর্জির মালিক, সুতরাং পাঠক হিসাবে নিজস্ব সিদ্ধান্তই শ্রেয়।
বইটা ভালো, ভালো না তা না, সূর্য ভালো না বুঝি, কিন্তু বোঝা যায় ওর ব্যাপারগুলা, বাদলের বড় হয়ে ওঠার সাথে আমরা স্টিফেন দেদালুসের প্যারালালও টানতে পারি, এখন কেউ যদি সূর্যরে ম্যাইল-শভেনিস্ট বলে তাইলে আরেক বিপদ...। কিছু চরিত্র অবশ্য মনে হইছে গড়ে উঠে নাই ঠিকমতন, যেমন চিররঞ্জন। তবে বইটা ভালো।
একা এবং কয়েকজন'এর গল্পটা বাদল এবং সূর্যকে ঘিরে। একজন বৃষ্টি, অন্যজন রোদ্দুর। এই দুইজনের বাল্যকাল থেকে শুরু হয়ে গল্পে উঠে আসে ব্রিটিশ শাসনের শেষ সময়কাল, স্বাধীনতা এবং স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের কথা৷ পুরোপুরি ইতিহাস নির্ভর বই না হলেও লেখক ইতিহাসের বেশকিছু খুটিনাটি বিষয় বর্ণনা করেছেন। গল্পের চরিত্রগুলোকে সাথে নিয়েই লেখক লিখেছেন স্বদেশীদের কথা। ১৯৪২ এর আগস্ট আন্দোলন থেকে শুরু করে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের সৃষ্টি, দেশে হিন্দু-মুসলিমদের মাঝে নিষ্ঠুরতম দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দেশভাগ, স্বাধীনতা পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক অবস্থা সবটাই দেখিয়েছেন লেখক। এই সবকিছুর সাথেই আগায় বাদল এবং সূর্যের জীবন। এই এক বাদল, এক সূর্য এবং আরো কয়েকজনকে নিয়েই উপন্যাস।
বইয়ের কিছু কথা একদম মাথায় গিয়ে আঘাত করে। বুঝতে সময় লাগে কত পৃষ্ঠা, বারবার করে পড়েছি সেসব। মানুষ হিসেবে জন্মেছি সত্যি কিন্তু কতখানি মানুষ হতে পেরেছি, জীবনে কি আছে, এর উদ্দেশ্য কি এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভেবেছি ঘন্টার পর ঘন্টা। উত্তর মেলে না!
সুনীলের বই পড়া শুরু পুর্ব পশ্চিম দিয়ে। তারপর গোগ্রাসে গিলেছি প্রথম আলো, সেই সময় এই দুইটি উপন্যাস। তিনটিই সমান তালে ভাল লেগেছে। একা এবং কয়েকজন ভাল লেগেছে কিন্তু বাকি তিনটার মত অতটা না। শুরুর দিক্টা অসাধারণ লাগলেও চারভাগের তিনভাগ পড়ার পর থেকে উপন্যাসের কাহিনী, চরিত্রগুলোর মোড় নেওয়া বিরক্তিকর হতে থাকে। বিশেষ করে সূর্য চরিত্রটি শুরুতে যতটা আশা জাগানিয়া ছিল, শেষের দিকে তার করুণ পরিণতি এবং সেই পরিবর্তন টা এতই নিম্নগামী আর অযৌক্তিক যে সেটা গ্রহণ করা সত্যিই কষ্টকর ছিল। হয়ত এরকম মানব চরিত্র, বৈশিষ্ট্য আমার কাছে অত্যন্ত অপরিচিত তাই আমার কাছে এর চিত্রায়ণ খুব ই অবাস্তব লেগেছে। সেজন্যেই তার কাজকর্ম, ভূমিকা গুলো বিরক্তিকর মনে হয়েছে। অন্ততপক্ষে আমি সেই গল্পগুলোতে তুলনামূলক বেশি মজা পাই, যেখানে আমার পরিচিত কোন চরিত্র রূপায়ন করা হয়। শেষের দিকে বাদলের কথা বার্তা আচার আচরণ ও অসংলগ্ন মনে হয়েছে। অন্যদিকে এই উপন্যাসের শুরুর কথাগুলো অসম্ভব ভালো লেগেছে। বাদল, সূর্যের ছোটবেলা, বাদলের কৈশোর, কলেজ রাজনীতি সবগুলো গল্পের ছক অত্যন্ত আনন্দ দিয়েছে। গল্পকার যখন গল্পের বিভিন্ন দৃশ্যের ফাঁকেফাঁকে বাস্তব জীবন দর্শনমূলক কথা বর্ণণা করেন সেটা পড়তে আমার খুব ভাল লাগে। এজন্য এ উপন্যাসের প্রথম অর্ধেক আমি অনেক উপভোগ করেছি। শেষের দিকেও এরকম বর্ণণা আছে, কিন্তু আমার কাছে সেগুলো বড্ড অগোছালো, ছাড়া ছাড়া, আর অপ্রাসংগিক মনে হয়েছে। সব মিলিয়ে বইটা যতক্ষণ পড়েছি, পুরোটা সময় অনেক রকম অনুভূতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছি। এই আনন্দ, দু:খ, বিরক্তি, রাগ এই অনুভূতি গুলো অনুভব করার জন্যেই মুলত বই নিয়ে বসি। এগুলোর খোরাক জাগানোর জন্যে লেখক কে অসংখ্য ধন্যবাদ।
শিরোনামহীন ব্যান্ডের চমৎকার একটা গান আছে। "সূর্যটাকে রাখিস খেয়াল!'' "একা এবং কয়েকজন" পুরো উপন্যাস জুড়ে এই "সূর্য" চরিত্রটাই আমাকে টেনেছে চুম্বকের মত। উপন্যাসে আমি সূর্যকে খুব খেয়ালে রেখেছি। অনেকেই সূর্যের চারিত্রিক অধঃপতন বা হেরে যাওয়া, বিপথে যাওয়া এই সব নিয়ে বলেছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এটাই যেন হওয়ার কথা ছিল। পরিণতিকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলমের জোরে আটকে দেননি। সূর্যকে সূর্যের মত থাকতে দিয়েছেন, সূর্য নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নিতে পারেনি।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত অধ্যায়, বিয়াল্লিশের অগাস্ট আন্দোলন, অসম পূর্ববঙ্গ ছেড়ে ইংরেজ সরকারের পশ্চাদপসারণের সেই উত্তাল পটভূমিকায় লেখা উপন্যাস। যদিও ঐতিহাসিক পটভূমি ছাপিয়ে গল্প, চরিত্রদের গড়ে তোলা, সম্পর্ক নিয়ে আলো আঁধারির লুকোচুরি এইসবে সুনীল তো ওস্তাদ লোক। সেই সব মিলিয়ে বাদল, শ্রীলেখা, রেণু, বড়বাবু, চিররঞ্জন সবাইকে এঁকেছেন নিপুণ হাতে।
বিশাল উপন্যাস পড়ার কোথাও মনে হয়নি, ধুর ভাল্লাগে না। এটাই তো লেখকের সার্থকতা।
উপন্যাসের কোথাও এক খানে শ্রীলেখা সূর্যকে বলে, "তুমি যেখানেই যাও আমি তোমার সাথে আছি বা থাকবো" এই টাইপ কিছু। অনেকদিন পরে এসে দীপ্তির মুখেও সেই একই কথা শোনে সূর্য।
কত শ্রীলেখা, কত দীপ্তি এই কথা কত সূর্যকে সেই উত্তাল সময়ে বলেছে সেটাই বা কে জানে। সুনীলের তো এক বিখ্যাত কবিতার লাইনই আছে এই নিয়ে। মনে পড়ছে না?
"তোমাকে যখন দেখি, তার চেয়েও বেশি দেখি যখন দেখি না।''
<> মাঝে মাঝে মনে হয়, এই যে মানুষ হয়ে জন্মেছি, এর চেয়ে বিস্ময়কর আর কিছু নেই। না জন্মাতেও পারতাম এবং তাতে আর কারোর কোন ক্ষতি হতো না।
<> আমি না জন্মালে এই ক্ষুদ্র জগৎটিতে আমার অনুপস্থিতি কেউ অনুভব করতো না, কেউ অপেক্ষা করতো না আমার জন্য।
<> যা নেই তার জন্য আবার অপেক্ষা কি!
<> যৌবন পেরিয়ে গেলে কোন এক বাদামী সন্ধ্যাবেলা মানুষের মনে হয়, এই জীবন অন্যরকম হবার কথা ছিলো।
আহ জীবনবোধ! এর চেয়ে সুন্দর করেও কি জীবন কে ভেবে দেখা যায়? বিশ্লেষণ করা যায় এতো নিখুঁত ভাবে? সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তার 'একা এবং কয়েকজন' বইয়ে যে জীবন দর্শন তুলে ধরেছেন, তা যে কাউকে জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখাবেন। এ জীবন কেন পেলাম? না পেলে কি হতো? পেয়ে কি করতে পারছি! কতোটা কাজে লাগাতে পারছি এ জীবনকে? এর কি কোন উত্তর আপনি জানেন? কখনো ভেবেছেন এতো চড়াই-উৎরাই পার করে বেঁচে থাকছি কেনো?
'একা এবং কয়েকজন' উপন্যাসটিতে মূলত দুইটি প্রজন্মের কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। প্রথম ভাগে অমরনাথ ভাদুড়ি নামের চরিত্রকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে গেছে গল্প। একজন বোহেমিয়ান মানুষের জীবনের উথান পতন, তার জীবনদর্শন ফুটিয়ে তোলা হয়েছে নিখুঁত ভাবে। অমরনাথ ভাদুড়ি নামের এই ভদ্রলোকের এলোমেলো জীবনের মধ্যেও মনে হয় এক ধরনের গোছানো ভাব আছে। মনে হয় এমন জীবনই হয়তো মানুষ তার অজান্তে চায়। তিনি তার জীবদ্দশায় শুধু নিজের মনকেই সায় দিয়েছেন। একসময় সামাজিক প্রথা ভেঙে বিয়ে করে নিয়েছে এক বিধবা নারীকে। আবার নাচের আসরে গিয়ে বিয়ে করে নিয়েছে বুলবুল নামের এক মুসলিম নর্তকীকে। জীবনের একটা অংশ কাটিয়ে দিয়েছেন মানুষের ভীড়ে আমোদ প্রমোদে। আবার একটা অংশে তার ছিলো না কোথাও কেউ। মারাত্মক রকমের নিঃসঙ্গতার মাধ্যমে তার জীবনের ইতি ঘটে গেছে। অমরনাথ ভাদুড়ির চরিত্রে নানান রকমের নেতিবাচকতা থাকলেও কিসের কারনে যেনো এই চরিত্রটি আপনার হৃদয়ে একটা স্থান পেয়ে যাবে।
গল্পের দ্বিতীয় প্রজন্মের চরিত্র গুলোও তাদের নিজস্বতায় ব্যাক্তিত্বে অনন্য। মূলত এই উপন্যাসের প্রাণ বলা যায় অমরনাথ ভাদুড়ির একমাত্র ছেলে সূর্যকে। মা বাবার স্নেহবঞ্চিত একরোখা স্বভাবের এই বালক উপন্যাসের শ্রেষ্ঠ চরিত্র। সূর্যের মতোই সে প্রখর। ইংরেজদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা এক সৈনিক এই সূর্য। যাকে দমানো যায় না কোনভাবেই। ইংরেজ সরকারের জেল জুলুম যে সূর্যকে কখনো দমাতে পারেনি, জীবনের বিভিন্ন স্তরে তাকে দমিয়ে রেখেছিলো বিভিন্ন নারী। কখনো নিজের মাসতুতো বোন শ্রী-লেখা,কখনো সামান্য এক নর্তকী বুলবুল ( তার মায়ের নামে নাম), আবার কখনো দীপ্তি নামের এক প্রগতিশীল নারী। নারীর প্রতি দুর্বলতা আর তার একরোখা স্বভাব শেষ পর্যন্ত সূর্যের মতো প্রখর একটা চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়। ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সূর্য নামের এই প্রখর চরিত্রের আকুতি মিনতি আর একরোখা ভাব যে কাউকে স্তব্ধ করে দেয়।
উপন্যাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র অথবা নায়ক নায়িকা বলা চলে বাদল আর রেনুকে। বাদলের জবানে পুরো উপন্যাস তুলে ধরা হয়। এক স্বপ্নবাজ যুবক বাদল আর তার ভালোবাসায় মুগ্ধ রেনু। এই দুটি চরিত্র তাদের প্রেম ভালোবাসা আর একসাথে বেড়ে উঠা দিয়ে গল্পটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। পুরো উপন্যাসের হাহাকারের মধ্যে বাদল আর রেনু যেনো স্নিগ্ধতা।
তাছাড়াও এই উপন্যাসে রয়েছে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ইতিহাস। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ইংরেজদের বিতারিত করা, ছেচল্লিশের দুর্ভিক্ষের আসল ��ূপ এবং দেশ ভাগের সত্যিকারের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে উপন্যাসটিতে।
'একা এবং কয়েকজন' এই বইটি আমার পড়া শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বইটিকে এক নাগাড়ে দর্শন শাস্ত্র,ইতিহাসের বই, সামাজিক বই আবার রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাসও বলা চলে। এই প্রথম কোন উপন্যাসে একই সাথে ইতিহাস,দর্শন, রাজনীতি, সামাজ,পারিবার,প্রেম, আক্ষেপ, পূর্ণতা সব একসাথে পেলাম। উপন্যাসের মধ্যেও অনেক কিছু জানা আর শিখতে পারার মতো একটি বই।
আমার ধারণা এই বইটি অনেকেই পড়েননি। যারা এখনো পড়েননি তারা বাংলা সাহিত্যের খুব দারুণ কিছু মিস করে আছেন। আমি বলবো অবশ্যই পড়ুন।
বইয়ের নামঃ একা এবং কয়েকজন লেখকঃ সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বি দ্রঃ আমি জানি এই বইয়ের প্রথম দুই পৃষ্ঠা এই জীবনে আমি আরও অনেকবার পড়বো।
সম্প্রতি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা উপন্যাস 'একা এবং কয়েকজন' পড়লাম। ওঁর ইতিহাস আশ্রিত লেখা 'সেই সময়' ও 'প্রথম আলো' আগে পড়েছিলাম খুব ভালো লেগেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ভারতের স্বাধীনতা পরবর্তী কিছু বছর এই উপন্যাসের সময়কাল।স্বদেশী আন্দোলন, দুর্ভিক্ষ,কলকাতার দাঙ্গা, স্বাধীনতার আগে ও পরে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা,দেশ ভাগ,দেশের প্রথম সাধারণ নির্বাচনের ইতিহাস ইত্যাদি নানারকম ঘটনার কথা পড়তে ভালোই লাগলো। উপন্যাসের দুই মুখ্য চরিত্র সূর্য ও বাদল। মূলত এই দুই জন ও পারিপার্শ্বিক বেশ কিছু চরিত্রর মধ্যে দিয়ে তাদের পারিবারিক অবস্থা,সেই সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির ধারণা পাওয়া যায়। লেখনী সহজ ও মনোগ্ৰাহী তাই পড়তে অসুবিধা হয়নি। মাঝে মাঝে কিছু জীবনদর্শনের কথাও সরলভাবে উঠে এসেছে সেই সব পড়তেও ভালো লেগেছে। দেশের স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে কিভাবে রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছিল, ঐ সময়ে স্বদেশী আন্দোলন বিশেষ করে যারা সহিংস আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন তাঁদের জীবন কেমন ছিল ,স্বাধীনতার পরে কিভাবে তাঁদের জীবন প্রভাবিত হয়েছিল, রাজনৈতিক সমীকরণ গুলি কিভাবে তৈরী হচ্ছিল দাঙ্গা বিধ্বস্ত কলকাতার ভয়াবহতা ,সেই সময়ে মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের মানুষেরা কিভাবে ব্যক্তিগত দিন যাপন করছিলেন,কি কি ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিলেন এই সমস্ত ঘটনাবলি বিভিন্ন কাল্পনিক চরিত্রদের মাধ্যমে লেখক আমাদের সামনে গল্পের মতো করে উপস্থাপন করেছেন। কাহিনির এই অংশগুলি সুখপাঠ্য, একঘেয়ে মনে হয়নি তবে উপন্যাসের প্রথম ও মধ্যভাগ যতটা গতিময় শেষভাগ কিছুটা মন্থর মনে হয়েছে। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সূর্য কে যেভাবে দেখানো হয়েছে সেটা প্রথম দিকে ঠিকঠাক লাগলেও পরে সেভাবে আমার ভালো লাগেনি। সবসময়ই সূর্যর মনে নানারকম অস্থিরতা কাজ করে। কোনরকম চিন্তা ভাবনা না করেই জীবনে লক্ষ্য ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন সময়ে একাধিক নারীদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যায়।পরে নানা ধরনের সঙ্গদোষে ও নেশার মধ্যে ডুবে থাকে।সূর্যর জীবনে শুরু থেকেই এতো ওঠা নামা থাকা স্বত্বেও মনে সেভাবে দাগ কাটতে পারলো না। চরিত্রটি বড্ড আগোছালো ও অসংলগ্ন মনে হলো।অন্য আরেকটি চরিত্র বাদল তুলনামূলক ভাবে আমার ভালো লেগেছে। বাদল সূর্যর মতো দুঃসাহসী নয়।দরিদ্র পরিবারের ছেলে বাদলের জীবনেও আসে দ্বন্দ ,দোলাচল, প্রেম। বাদল কবিতা লেখে। সামাজিক বন্ধনের মধ্যে থেকেই অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতোই জীবনে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করে চলে। স্পষ্টবাদী সাহসী নারী চরিত্র রেণুকে ভালো লেগেছে।এছাড়া দীপ্তি,যোগানন্দ,তমোনাশ,শংকর,চিররঞ্জন, অমরনাথ, বুলবুল এরকম প্রচুর ছোট বড় চরিত্র সমগ্ৰ উপন্যাস জুড়েই আসা যাওয়া করে।কিন্তু মনে রাখার মতো চরিত্র সেরকম কাউকে পেলাম না।
সেই সময় ও প্রথম আলোর মতো খুব ভালো না লাগলেও ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস একা এবং কয়েকজন ব্যাক্তিগত ভাবে যদি বলি আমার ঠিকঠাক মনে হয়েছে। যারা ইতিহাস আশ্রিত লেখা পড়তে পছন্দ করেন তারা পড়তে পারেন এই বই।
সূর্য - মা মরা এক ছেলে , যে কখনও স্নেহ, ভালোবাসা, আদর স্নেহ, মমতা পায়নি কারো কাছ থেকে। নিজের অনুভূতি কখনও সম্পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না। নারীর একটু ভালোবাসা পাবার জন্য চাতকের মত চেয়ে থাকে। সে ছোটবেলা থেকে যে পরিবেশে বড় হয়েছে, তৎকালীন ভারতে সে বেমানান। তার জন্য পশ্চিমা বিশ্বই উপযুক্ত জায়গা ছিল। অমরবাবু যেমন নিজে কোনদিন পিতামাতার ভালোবাসা পায়নি, তেমনি সূর্যকেও সেটা কীভাবে দিতে হবে সেটা জানতেন না। সূর্য সারা জীবন ভুল দরজায় কড়া নেড়ে গেছে। দীপ্তির সাথে যেটা করেছে সেটা বাড়াবাড়িই। তার move on করার দরকার ছিল।
বাদল-এর জন্য প্রথমেই চু*য়া কথাটি মনে পড়ে। রেণুর দেহ স্পর্শ করার জন্য যার হাত সব সময় নিশপিশ করে আর দুই লাইন বেশি বোঝে। মধ্যবিত্ত যুবক সমাজের প্রতিনিধি। শুধু দিবাস্বপ্ন দেখে আর সিগারেট খেয়ে হতাশ হয়। চরিত্রটি মনে হয়, লেখকের নিজস্ব জীবনের একটি অংশ। আমি প্রথমে ভেবেছিলাম, লেখকের জীবনী কিনা? এতটাই বাস্তবিক মনে হয়েছিল চরিত্রটি।
রেণু - শেষের দিকে এসে রেণুর চরিত্রটি ভালো লেগেছে। কয় জন এরকম প্রেমিকা পাওয়া যাবে, চাকরি ছেড়ে দিয়ে কবিতা লিখতে বলবে! চরিত্রটির পরিণত হতে যে ব্যাপ্তি সেটা আরও দীর্ঘ হলে ভালো হত।
শ্রীলেখা - আমার পছন্দের চরিত্র। সমাজের কাছে সে অসহায় থাকলেও মনকে কি দিয়ে বাঁধবে ? তার চরিত্রকে শেষ হইয়াও হইলনা শেষ বলা যায়। মনের মধ্যে দাগ কেটে রেখে যায়।
দীপ্তি - মধ্যবিত্ত শাশ্বত নারী সমাজের প্রতিনিধি। সে যে নিজে কি চায় নিজেই জানে না।
সময় ট্রিলজির তিন বছর বাদে এটা পড়লাম। ট্রিলজিতে যেমন ঐতিহাসিক চরিত্রগুলোই উপন্যসসের মূল চরিত্র, এখানে তা নয়। সাধারণ চরিত্রের ভিড়ে উঁকি দিয়েছে ইতিহাস। সময়কাল ১৯৩৪/৩৫ এর দিক থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ১৯৫২-৫৪ এর দিকে। মোদ্দা কথায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকে ৪৭ এর দেশ ভাগের পরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যন্ত। তবে এখানের অন্যতম চরিত্র 'বাদল' কিছুটা লেখকের নিজের প্রতিচ্ছবি ধারণ করে তবে সুনীলের কোনো আত্মজীবনী পড়া না থাকায় সেটা খুব ডিটেইলে বুঝতে পারি নি। এই উপন্যাসের বিচার বিশ্লেষণে যাচ্ছি না, তবে এর সবচেয়ে অন্যন্য ব্যাপার হচ্ছে এর শুরু। বেশিরভাগ সময় বইয়ের শুরুটা সাধারণ হয়, এগুতে এগুতে বইয়ের মাঝে ডুব দেই আমরা। কিন্তু এই বইয়ের প্রথম লাইনই আপনাকে ডুবিয়ে দেবে, এরপর শুধু সময়ের স্রোতে সাঁতার কাটা। অসাধারণ স্টার্টিং দিয়ে বই শুরু হলেও ৬২৪ পেইজের বইটি পুরোটা Worth it লাগে নি। কাহিনী কিছুটা অকারণে বড় মনে হয়েছে। তবে লেখক সুনীল বলেই একঘেয়ে লাগার কোনো সুযোগ কিন্তু নেই। সুনিপুণ ক্যারেক্টার বিল্ডিংয়ে কোনো কিছুই বোরিং লাগে নি। মনে হয়েছে সময়ের চোখে মানুষগুলোর বেড়ে ওঠা আর পরিণতি দেখছি,একটানা পড়ে গেছি। খুব ব্যক্তিগত ভাবে, এই উপন্যাসের কিছু চরিত্র বা কাহিনীতে ব��যক্তিগত মিল পেয়েছি, যা আমার নিতান্তই ব্যক্তিগত অনুভব। তবে খুব পুরোনো ভোঁতা অনুভূতি বহুদিন বাদে উঁকি দিলে চোখে জল আসা স্বাভাবিক বৈকি! তাই এই বই পড়ে কেউ আমার মতো চুপচাপ চোখের জল ফেলবে, তা বলছি না। সাবলীলভাবে একটা সুন্দর, গভীর জীবনবোধের মধ্য দিয়ে যে কেউ বইটা পড়ে স্বস্তি পাবেন, এটুক বলা যায়।
আমার এত মন খারাপ হচ্ছে, বলে বোঝাতে পারবো না। শেষটা কেমন যেন বিষণ্ণতা ছড়িয়ে গেলো। মনে হচ্ছে এক ঘণ্টা বসে সূর্যের জন্য একটু কাঁদতে পারলে ভালো হতো। সেই সুযোগ নেই, ডিউটিতে আছি+দুটো বিরক্তিকর পেশেন্টদের পার্টি শুধু শুধু খুব বিরক্ত করছে। প্রথমে আসি এক তারা কম কেন, সে বিষয়ে। এখানে সুনীল অনেক ক্ষেত্রেই বলেছেন, "পরে যে আরো কত চিঠি লেখা হবে", বা "পরে এটা হবে, সেটা হবে"...ভবিষ্যতের প্রতি এই ইঙ্গিত আমার ভালো লাগে নি। গল্পের মন্ত্রমুগ্ধ আকর্ষণটা এতে খানিকটা কমে গিয়েছিলো। এখন আসি বাকি চার তারার ব্যাপারে। আমার সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র কে, সেটা নিয়ে আমি বেশ দ্বিধাগ্রস্ত এবার। সম্ভবত অমরনাথ ভাদুড়ী। কী বিচিত্র জীবনই না কাটিয়েছেন তিনি! জীবনে তার কত অপ্রাপ্তি, কতবার পেয়ে হারানোর বেদনা! তার জন্য আমার খুব মায়া হয়েছে! দ্বিতীয় পছন্দের চরিত্র সূর্য। কেন জানি এই মা-মরা ছেলেটার প্রতি আমার খুব দুর্বলতা কাজ করেছে। যদিও ওর সব ক্যারেক্টার ট্রেইট আমার পছন্দ হয় নি। কিন্তু শেষটায় আমি একেবারে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছি। সূর্যও হয়তো ওর বাবার মতই। অপ্রাপ্তি ছাড়া আর কিছুই পেলো না। যাকেই আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাইলো, সে-ই ছেড়ে গেলো। ছেলেটাকে কাছে পেলে আদর করে দিতাম অনেক। বাকি সব চরিত্র অ্যাভারেজ লেগেছে। হিমানীকে ন্যাকা মনে হয়েছে। যোগানন্দকে... জানি না কেমন লেগেছে। বিচিত্র। শেষ করে ফেললাম কেন বইটা? একটুও ভালো লাগছে না! টাইম ট্রিলজির পরেও যে পড়ার মত কিছু একটা পেয়েছি সেইম ধাঁচের, সেটাই অনেক, বাবা! ভালো লেগেছে।
This entire review has been hidden because of spoilers.
কিছুটা হতাশ হয়েছি বইটা পড়ে। দেশভাগের সময় থেকে স্বাধীনতার সময়টায় মানুষের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা কিংবা সামাজিক অবস্থার খুব গভীর কোন পর্যবেক্ষণ নেই বইটাতে। তাছাড়া সুনীলের অর্ধেক জীবন বইটা আগে পড়ে ফেলাতে, লেখকের ব্যক্তিগত জীবনের সাথে বইয়ের কিছু অংশ মিলিয়ে ফেলছিলাম বারেবারে। হয়ত পাঠক হিসেবে এটা আমার ব্যর্থতা। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা বাদল কিংবা দৈবক্রমে বিপ্লবের সংস্পর্শে আসা সূর্যকেও তেমন একটা পরিণত চরিত্র মনে হয় নাই। দুইটা চরিত্ররই নারী বিষয়ক যৌন চিন্তাগুলো সম্ভবত পাঠককে আকর্ষণ করার জন্যই লেখা। এটা বিরক্তিকর হতো না যদি বারবার ঘুরে ফিরে এই প্রসঙ্গটাই মুখ্য হয়ে না পড়তো৷ মূলত দেশভাগ কিংবা স্বাধীনতার ওই সময়টার কিছু লেখা বাদ দিলে এই বিশাল কলেবরের লেখাটার মধ্যে ইতিহাসের অংশ সামান্যই।
সূর্যের চরিত্রটা ব্যতিক্রমী ছিল। খুব হিসেবি,খুব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় না দিয়েও অ্যাডভেঞ্চারে জীবন পার করে দিলো।স্বাধীনতা কি না জেনে বুঝেই স্বাধীনতা আন্দোলনের শরীক হয়েছিল।সারাক্ষণই যার মাথাগরম, রক্তগরম কিন্তু সে বেচারা কি চায় তা নিজেই জানে না। ঝোঁকের বশে চলে শুধু!
বাদল যে ঢাকা পড়ে গিয়েছে সূর্যের তীব্রতার কাছে! উত্তম পুরুষে লেখা হলেও খুব একটা টানেনি বাদল। বারবারই মনে হয়েছে সুনীলের অর্ধেক জীবন আর পূর্ব-পশ্চিমের অতীনের সাদৃশ্য মিলিয়ে তৈরী করা হয়েছে চরিত্রটা।
মানুষের এক রুপ আসলে বহু রুপের সামেশান।মানুষ তার অজান্তেই নিজের সেই বহু রুপ গুলোতে হারিয়ে যায়,ভ্রমন করে নিজের অপ্রকাশিত নিজেতে।সেই রুপের আছে বহু রুপবেধ।কোন রুপবেশ কখন ভালো লেগে যায় মানুষ সেটা নিজেই জানেনা।বইটি পড়ার সময় নিজের অপ্রকাশিত রুপ গুলো ধরে পড়ে যাচ্ছিল নিজের অজান্তেই।সুনীল মানেই সুকুমার লিখন।মোটামুটি বড় এ উপন্যাস পড়তে আসলে এক মুহুর্তের জন্যেও বিরক্ত লাগেনি।অনেক আগে পড়ছিলাম,এখনো ভাবলেই মনে হয় আরেকবার পড়ি।
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কলমের ছোঁয়ায় পরিপূর্ণ ছবি আঁকতে পারেন। এই বইটিতে যেভাবে তিনি এঁকেছেন বাদল এবং সূর্যের জীবন। এই বইটি পড়ার সময় একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আমার মনে হয়েছিল- বইটির এক একটি অধ্যায় যেন এক একটি গল্প এবং সমষ্টিগত ভাবে একটি ৬২৬ পাতার উপন্যাস।
ইতিহাস আশ্রিত সুনীলের যতগুলো উপন্যাস আছে তার মধ্যে এটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। প্রিয় হওয়াে অন্যতম কারণ এর গতিময়তা এবং জীবনকে নিয়ে খামখেয়ালের ইচ্ছা মতো খেলতে পারা সুর্যের চরিত্র।