ফ্ল্যাপ: স্বাধীনতোত্তর আমাদের সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অভ্যুত্থান-পাল্টা অভ্যুত্থান ইত্যাদি নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সেনা-কর্মকর্তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ লিখেছেন। কিন্তু সে-সব গ্রন্থের সঙ্গে মেজর জেনারেল (অবঃ) মইনুল হোসেন চৌধুরীর এ- বইটির তফাত হলো পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলোর যাঁরা লেখক তাঁদের প্রায় সকলেই ঘটনাপ্রবাহের হয় ভিকটিম নয় বেনিফিসিয়ারি। তাঁদের সে অবস্থানগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের রচনায়, কমবেশি, ঘটেছে। অন্যপক্ষে একজন দায়িত্বশীল, কর্তব্যনিষ্ঠ, আইনানুগ ও শৃঙ্খলাপরায়ণ সেনা-কর্মকর্তা হিসেবে লেখক শেষদিন পর্যন্ত পক্ষপাতহীনভাবে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট থেকেছেন। আর এই দায়িত্ব পালনের সূত্রেই খুব কাছ থেকে সবকিছুকে দেখার, উপলব্ধি করবার সুযোগ তাঁর হয়েছে। সময়ের উচিত দূরত্বে দাঁড়িয়ে নির্মোহ ও বস্তুনিষ্ঠভাবে সে দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন লেখক তাঁর এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য : স্বাধীনতার প্রথম দশক প্রন্থটিতে। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতীয় স্বার্থ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েও লেখক ঘটনার মূল্যায়নে তাঁর দৃষ্টিকে দেখেছেন অনাচ্ছন্ন, দায়বদ্ধ থেকেছেন ইতিহাসের প্রতি। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে জাতীয় স্বার্থ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েও লেখক ঘটনার মূল্যায়নে তাঁর দৃষ্টিকে দেখেছেন অনাচ্ছন্ন, দায়বদ্ধ থেকেছেন ইতিহাসের প্রতি। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণেই রচনাটি যখন ধারাবাহিকভাবে একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছিল তখনই তা সবার আগ্রহ ও মনোযোগ আকর্ষণ করে। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক চালচিত্র বুঝতেও বইটি পাঠকদের সহায়তা করবে বলে আমাদের ধারণা।
Moinul Hossain Chowdhury (Bir Bikrom) [মে. জে. মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.)] was a distinguished Bangladesh Army officer and diplomat who played a significant role in the country's history. Born in Sylhet in 1943, he joined the Pakistan Army in 1962 and was commissioned in 1964. During the Liberation War of Bangladesh in 1971, Chowdhury revolted against the Pakistan Army and fought valiantly, commanding various units including the 1st and 2nd East Bengal Regiments. For his contributions, he was awarded the Bir Bikrom, one of Bangladesh's highest military honors.
In his military career post-independence, Chowdhury rose through the ranks, eventually becoming a Major General and serving as the Adjutant General of the Bangladesh Army. He held several key positions, including Military Secretary to the President and Brigade Commander. His military service was marked by significant events, including his involvement in the aftermath of President Ziaur Rahman's assassination, though he was sidelined during the investigation by then-army chief Hussain Muhammad Ershad.
After retiring from the military in 1998, Chowdhury embarked on a diplomatic career, serving as Bangladesh's ambassador to multiple countries including the Philippines, Indonesia, Singapore, and Australia. He also represented Bangladesh as the Permanent Representative to ESCAP from 1989 to 1993. In his later years, he served as an advisor in the caretaker government of former chief justice Latifur Rahman, overseeing the ministries of Industry, Commerce, Post, and Telecommunication.
Chowdhury authored "Silent Witness of a General," a book about his experiences in the Bangladesh Army, and contributed numerous articles to newspapers in both English and Bangla. Major General Chowdhury (Retd.) passed away on October 10, 2010, at Square Hospital in Dhaka after a six-month battle with cancer. His death marked the loss of one of Bangladesh's bravest and most patriotic sons, leaving behind a legacy of military service, diplomacy, and writing.
সোজাসাপ্টা লেখা, সব বিষয়ের বর্ণনাই সংক্ষিপ্ত। লেখক মূলত মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পালাবদলের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। কেউ সৎ ও নির্ভেজাল হলে লেখার মধ্যে সেটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ফুটে উঠবেই, নিজেকে আলাদাভাবে সৎ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন লেখক যা সন্দেহজনক।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিউমার্কেট ও অন্যান্য এলাকায় লুটপাট হওয়ার ঘটনায় বোঝা যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনুপস্থিতিতে এ ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও অস্বাভাবিক নয়। শেখ মুজিবের বিতর্কিত ভূমিকা দায়সারাভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক। তিনি নিজেকে নির্বিরোধী দাবি করেছেন। একথা সম্ভবত সত্য। ক্ষমতায় যে-ই এসেছেন উনি নীরবে নিজের কাজ করে গেছেন। বিভিন্ন সেনা অভ্যুত্থান ও অপমৃত্যুর ঘটনায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করলেও কর্নেল তাহেরের মৃত্যুর ব্যাপারে লেখক একেবারেই চুপ (অপরাধবোধ?)। জিয়া ও এরশাদের মনস্তত্ত্ব ও তাদের শাসনামল নিয়ে তার বক্তব্য নিরপেক্ষ মনে হয়েছে। কিন্তু তিনি ঢালাওভাবে পাকিস্তান ফেরত অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের ওপর যেভাবে সব দুর্ঘটনার দায় দিয়ে খালাস হলেন তা অত্যন্ত দৃষ্টিকটু। উনার ধারণা, অমুক্তিযোদ্ধা সেনা কর্মকর্তা সবাই রাজাকার শ্রেণির আর যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা যুদ্ধের পর কোনো অপকর্ম করেনি; তারা শুধুই ষড়যন্ত্রের শিকার (কী ছেলেমানুষি একটা ধারণা।) এ ধরনের বই পড়লে একটা ব্যাপার আমাকে পীড়িত করে।তা হচ্ছে, ক্ষমতাসীনদের স্বার্থপরতা ও উদাসীনতা। লেখক যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে সেনাদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও অনিয়ম নিয়ে যে অভিযোগ করেছেন তাতে বোঝা যায়, সবাই নিজের আখের গোছাতে ব্যস্ত ছিলো। চোখের সামনের প্রবল প্রমাণকেও কেউ গুরুত্ব দেয়নি।তাই দেশের এই অবস্থা। ভাবা যায়!
স্বাধীনতার প্রথম দশক তথা শিশু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। একেক শিরোনামে ছোট ছোট খন্ডে লেখক লিখেছেন নীরবে প্রত্যক্ষ করা ইতিহাস। মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম স্বাধীনতার পরে, পঁচাত্তরে ঢাকা সেনানিবাসে হওয়া তিনটি বিদ্রোহের কোনোটিতেই সক্রিয় অংশ নেননি৷ কারো পক্ষ নেননি। নিজেকে সরিয়ে রেখেছিলেন "গেম অব থ্রোনস" থেকে। ক্ষমতার লড়াইয়ে অংশ নেননি বলে তিনটি বিদ্রোহের কোনোটিতেই তার পুরষ্কার লাভ, শাস্তির আদেশ কিংবা নিদেনপক্ষে সাক্ষীর জন্যও ডাকা হয়নি তাকে। সেই কারণে বইটা হওয়া উচিত "ছিল" দুর্লভ নিরপেক্ষ একটা বই। ছিল বলার কারণ দ্বিতীয় পয়েন্টে ব্যাখ্যা করবো।
বইটার সংক্ষিপ্ত রিভিউ 'ভালো দিক' এবং 'খারাপ দিক' শিরোনামে দুটো মাত্র অনুচ্ছেদে শেষ করতে চাই।
° ভালো দিক:
খুব সংক্ষিপ্ত ভাবে শিশু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন লেখক। কোনো সাক্ষাৎকার বা বিচার বিশ্লেষণ নেই। স্রেফ ঘটনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে নিজের চোখে যা দেখেছেন তাই লিখেছেন। এক বা দুই বসায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রথম দশক সম্পর্কে প্রিমর্ডিয়াল কনসেপ্ট পেতে চাইলে বইটা বেশ উপকারী। উচ্চভিলাষী সেনা অফিসারদের মসনদের লড়াই বেশ ভালো ভাবেই ধরা পড়েছে বইটায়।
শেখমুজিবের বিতর্কিত শাসনামলের কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় লেখায়, যদিও তা যৎসামান্য।
রক্ষী বাহিনীর সমালোচনা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতার পদক নিয়ে সমালোচনা করেছেন নির্মোহভাবে।
বইটায় বেশ কিছু প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়। তার মধ্যে জহির রায়হানের অন্তর্ধানের বিষয়টা পরিষ্কার হয়েছে।
স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালীন ভারবতীয় সেনা অফিসারদের সুপ্রীমেসি, স্বাধীনতার পরে ভারতীয় সেনাদের লুটপাট ইত্যাদি সাহসিকতার সাথে পরিষ্কার করেই লিখেছেন তিনি।
যেহেতু তিনি নিজে একজন সেনা অফিসার, এবং শিশু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তিনটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছে সেনাদের হাতে, এবং দীর্ঘ একটা সময়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার লড়াই স্রেফ সেনাবাহিনীর মধ্যেই বিদ্যমান ছিল; কাজেই ঢাকা সেনা নিবাসের একজন উচ্চপদস্থ সেনা অফিসার হিসেবে তিনি যা কিছু প্রত্যক্ষ করে লিপিবদ্ধ করেছেন, সেগুলোর ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে।
° খারাপ দিক:
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস নিয়ে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে কিছু বিষয় দৃষ্টিকটু লেগেছে।
১. মানুষ বেশি বিনয়ী হলে বা সহজ সরল হলে এটা একসময়ে তার অহংকারে পরিণত হয়। "আমি খুব সাদাসিধা মানুষ। আই এম ভেরি সিম্পল" লিখে ফেসবুকে ফ্লেক্স নেয়া লোকজনের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম স্বয়ং এই দোষ হতে মুক্ত নন৷ তার বই যে নিরপেক্ষ সেটা বইটা পড়েই বোঝা গেছে। বার বার "আমি নিরপেক্ষ ছিলাম", " কোনো পক্ষ নেইনি" এসব লেখাটা দৃষ্টিকটু লেগেছে।
তবে এইটুকু বাদ দিলে তার ভাষ্য নিরপেক্ষই মনে হয়েছে৷
২. সাব-কনশাস মাইন্ডে মানুষ কখনো কখনো পক্ষপাতিত্ব করেই ফেলে। বাবা মায়ের ঝগড়ায় শিশু হয়তো অবচেতন মনেই মায়ের পক্ষ নেয়, তার মানে এই না যে পিতাকে সে ঘৃণা করে।
ফ্রিডম ফাইটার আর্মি অফিসার মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রমকে মানুষ বলেই ঠাহর হলো। পক্ষপাত তিনি অবচেতন মনেই করেছেন বলে ধরে নিলাম।
স্বাধীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য পাকিস্তান ফেরত ছিলেন, অর্থ্যাৎ যারা কি না যুদ্ধে অংশ নেননি, তাদেরকে অপমানসূচক 'রিপ্যাট্রিয়ট অফিসার' নামে ডাকা হতো। স্বাধীনতার প্রথম দশক জুড়েই ফ্রিডম ফাইটার অফিসার ও রিপ্যাট্রিয়ট অফিসারদের দ্বন্দ লেগেই ছিলো৷ এ নিয়ে লিখলে বিস্তারিত লিখতে হবে। শুধু বলতে চাই, ফ্রিডম ফাইটার অফিসার মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী, বীর বিক্রম অবচেতন মনে অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদেরকে ছোট করেছেন। ক্ষমতার লড়াইয়ের যাবতীয় দোষ তাদের উপরে চাপিয়েছেন, একেক অনুচ্ছেদে এক দুই লাইনে৷ ইহা বড়ই দৃষ্টিকটু বলিয়া প্রতীয়মান হইয়াছে আমার চক্ষে।
নিজে একজন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা হওয়ায় ক্ষমতার লড়াইয়ে অংশ নেয়ার বেশ ভালো সুযোগ ছিল জেনারেল মইনুলের৷ অংশ না নিয়ে মান ও প্রাণ দুটোই বাঁচিয়েছেন তিনি।
কোন ব্যাপারে মন্তব্য করার আগে সে ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। ফেসবুকীয় নানা বিকৃত ইতিহাস আর গুজব ছড়ানো মানুষের চাইতে বেশি জানা সত্ত্বেও সংশয় হয় কারণ দৃষ্টিকোণ অনেক দিকে না ফেললে একটা বিষয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ ধারণা গড়ে উঠে না। আর অল্পবিদ্যা সবসময়ই ভয়ংকরী। এই বইটা চমৎকার একটা বস্তুনিষ্ঠ বই। অনেক ধোঁয়াশা কাটাতে সাহায্য করেছে। আসলে বাঁচতে হলে শুধু নয়, মানসিকভাবে শান্তি পেয়ে বাঁচতে হলেও জানার কোন বিকল্প নেই এবং সেই জানাটাকে গ্রহণ করার মতো মনোবলও অবশ্যই থাকতে হবে। মানুষ যা বিশ্বাস করতে চায়, তা-ই বিশ্বাস করে। এই কমফোর্ট জোন থেকে বের না হয়ে আসলে ইতিহাসকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা খুব কঠিন।
একই সাথে বইটার ভালো এবং খারাপ দিক হলো বইটা একজন সেনাকর্মকর্তা দ্বারা লেখা। ভালো একারনে বলছি যে বইটার মাধ্যমে সেই সময়ে দেশে ঘটা অভ্যুত্থানগুলোর প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় কেননা সবগুলো অভ্যুত্থানই তো সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত। আবার খারাপ এ কারণে বলছি যে লেখক শুধু একজন সেনাকর্মকর্তার চোখেই সবকিছু দেখেছেন ; দেশীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতি বা অন্য কোনোকিছুই তাঁর চোখে পড়ে নি। আবার একজন বাধ্য কর্মকর্তা হওয়ায় সবকিছু কেমন যেন নিঃস্পৃহভাবে শুধু দেখেই গিয়েছেন, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়াস পান নি।
আর ঘটনাগুলো নিয়ে যদি বলি তাহলে বলব একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে যেসব ঘটনা দেখা সম্ভব সেসবই তিনি তুলে ধরেছেন। কিন্তু সবই খুব আবছাভাবে, তিনি ১৫ আগস্ট, ৩ ডিসেম্বর বা ৭ ডিসেম্বর কোনোটা নিয়েই বিস্তারিত ব্যাখ্যাই যান নি কেবল একটা হেডিংয়ের সাহায্যে একপাতাতেই শেষ করেছেন প্রতিটা ঘটনা। আর বইটা যতটা না ঐ সময়ের ইতিহাস তার চেয়ে বেশি মনে হয়েছে লেখকের ডায়েরি। ডায়েরি আমরা যেমন ‘আচ্ছা, সেদিন ওখানে গিয়েছিলাম, ওদিন সেটা খেয়েছিলাম' জাতীয় কথাবার্তা লিখি বইটাও অনেকটা তেমনই। শুধু লেখান জন্যই যেন লেখা, কোনো ব্যাখ্যার দিকে যান নি লেখক।
বেশ কয়েকটা বিষয় পরিষ্কারও করেছেন লেখক বইটাতে। যেমন, জহির রায়হানের মৃত্যু, অ্যান্হনি মাসক্যারেনহাসের উদ্দেশ্যমূলক বই লেখার কারণ, ঐ সময়ে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষের কারন, জিয়া হত্যায় এরশাদের ভূমিকা ইত্যাদি। পড়ে দেখতে পারেন ।
সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ যেসব তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ লেখক বর্ণনা করেছেন তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। জেনারেল সাহেব যদি শুধু "সাক্ষ্য" দিতেন তবেই বোধহয় ভালো হত। নিজস্ব বিশ্লেষণ ও অতিরিক্ত "ধারণা" থেকে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অনেক ঘটনার যে রায় দিয়েছেন সেগুলো দুর্বল বলা চলে।
"মুক্তিযোদ্ধা সেনা" নামক যে দম্ভ আমাদের সেনাবাহিনীর বিভাজনের অন্যতম কারণ ছিল সেটা মইনুল সাহেবের মাঝে অতিমাত্রায় লক্ষ্য করা যায়। এ শ্রেণির সেনা কর্মকর্তাদের প্রতি তার যে প্রচ্ছন্ন সহানুভূতি ও সমর্থন ছিল সেটাও স্পষ্ট বোঝা যায় তার সাক্ষ্যদানে। বিশেষত মঞ্জুর হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে তিনি যতটা সরব ও তৎপর ছিলেন, জিয়া হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে ছিলেন ঠিক তার উল্টো যা তার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
একজন সামরিক অফিসারের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে লেখা, স্বাভাবিকভাবেই আমজনতার অনুভূতি ও পরিস্থিতির ইতিহাস নাও থাকতে পারে। কিন্তু সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি আলোচনা বিভিন্ন পয়েন্টে অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল, যেটা একেবারেই মিসিং ছিল।
টিপিক্যাল বইয়ের মত ৭২-৭৫ এর ইতিহাস নাই বললেই চলে। মানে বিজয়ের আগমূহুর্ত থেকে ৭২ এর প্রথমাংশ ও ৭৫ পরবর্তী ইতিহাস যেভাবে আলোচনা করেছেন লেখক সে তুলনায় ৭২-৭৫ এর আলোচনা নেই বললেই চলে।
লেখকের মতে মুক্তিযোদ্ধা ও অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারদের মধ্যকার হিংসা-বিদ্বেষ ছিল ততকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্য দায়ী৷ কিন্তু লেখক নিজেও লেখনির মধ্যে এই দুই গ্রুপের পোলারাইজেশন করেছেন। ঠিক যেভাবে অমুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসারেরা সব দোষ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের ঘারে দিতো, মুক্তিযোদ্ধা লেখকও অমুক্তিযোদ্ধাদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছেন; যেখানে দুগ্রুপই সময়ের ব্যপ্তিকালে ভুল ডিসিশনস নিয়েছে।
বিতর্কিত অনেক ইতিহাসের বিষয় নিয়ে নিজের পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে লেখক আলোচনা করেছেন, সেটার জন্য বইটা সাধুবাদ পাওয়ার মত।
অনেক দিন পর মুক্তিযুদ্ধের উপর কোনো তথ্যবহুল বই পড়লাম,আরও নির্দিষ্ট করে বললে মুক্তিযুদ্ধের পরের গল্পগুলো। আসলে গল্প বললে ভুল হবে,হবে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী রক্তাক্ত ঘটনাগুলো।আরও কাব্যিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের হৃদয়ের রক্তক্ষরণ!
একসময় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেছি, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ঘটনাগুলোও জেনেছি। এই সময়ের অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৯১ এর কথা পড়লে রীতিমতো হতাশ হতে হয়।কিন্তু দেশের এই ক্রান্তিকালীন সময়ের উপর বিশ্বাসযোগ্য বই খুব কম,প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশই পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। কোন বই এ নিজেদের পাওয়ার গেমকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে,আবার কোনো বইতে নিজেকে বা নিজের দলের কার্যকলাপকে মহান করা হয়েছে। সঠিক তথ্যের বদলে গুজব স্থান পেয়েছে অনেক লেখকের লেখায়।
এই দিক দিয়ে 'এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য ' মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশ এর উপর নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে লেখা একটি তথ্যবহুল বই। বইটির লেখক মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীর চোখে দেখা অস্থির সময়ের এক প্রতিচ্ছবি। লেখক নিজেও তখন ছিলেন সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, যিনি রাজনিতির উর্দ্ধে স্থান দিয়েছিলেন নিজের দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বকে। বইটি থেকে ৭১ পরবর্তী সময়ের অনেক দ্বিধাদ্বন্দের অবসান হবে,মনের অনেক ধোয়াশা পরিষ্কার হবে বইটি পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের উপর এমন নিরপেক্ষ বই খুবই কম। যারা মুক্তিযুদ্ধ ও তার পরবর্তী সময় সম্পর্কে নিরপেক্ষভাবে জানতে চায়,তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য এই বইটি।
বইটি মূলত ৭১ এর শেষ দিক থেকে স্বাধীনতার প্রথম দশকের ঘটনাবলী নিয়ে লেখা। অনেকটা দিনলিপির মতো করে ঘটনাসমূহ বর্ণনা করা হয়। এর লেখক মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব.) নিজেকে সেনাবাহিনীর প্রতি নিষ্ঠাবান বলে দাবী করেছেন, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরে থাকুক এমনটাই তিনি চাইতেন। মুজিবহত্যা ও জিয়াহত্যার সময় তিনি যথাক্রমে কর্নেল ও মেজর জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও এর কোনোটিতেই তাকে অভিযুক্ত করা যায়নি। এছাড়াও বইয়ের বর্ণনানুসারে তাকে সুশীল শ্রেণিভুক্ত করা চলে এবং অন্যান্য ঘটনাবলির আলোকে তার লেখাকে নিরপক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির বলে বিবেচনা করা যায়। তবে কলেবরে বড় হয়ে ঘটনাসমূহের বিস্তারিত বিবরণ থাকলে এ বিষয়ে নিশ্চিত মতামত দেওয়া যেতো; যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয়নি।
বইয়ের শুরুতে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিনগুলোতে যুদ্ধের কথা আলোচিত হয়েছে। আর বইটির শেষদিকে পরিশিষ্ট শিরোণামে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন কিছু ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ। যাহোক, অপারেশন জ্যাকপট বা ঢাকা দখলের অভিযানে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে ভারতীয় বাহিনীর নেতৃত্ব পাকিস্তান আর্মিতে কর্মরত অনেক অনেক মুক্তিযোদ্ধাই মেনে নিতে পারেন নি, জেনারেল মইনুল তাদেরই একজন। ব্রিগেডিয়ার মিশ্রর নিষেধ সত্বেও তিনি তার বাহিনী নিয়ে ঢাকা অভিমুখে রওনা হন। তার মনে হয়েছে ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীকে গুরুত্ব দিচ্ছেনা। ভারতীয় বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের দন্দ্বের বিষয়টি ও ভারতীয় সেনাদের অহংবোধ মুক���তিযোদ্ধারা যে ভালোভাবে নেয়নি তা একটি ঘটনার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়। কামালপুরের যুদ্ধে ভারতের সরবরাহকৃত ওয়ারলেসের মান নিয়ে মেজর জেনারেল গুলবৎ সিং এর সাথে লেখকের কথোপকথন ছিলো অনেকটা এরকম- লেখক : ১৯৪৮ ও ১৯৬৫ সালে তোমরা ভারতের সাথে দুটো যুদ্ধ করেছো। দুটো যুদ্ধই ছিলো তোমাদের জন্য জিরো সাম গেইম। এই '৭১ এ এসে তোমরা পেয়েছো শতাব্দীর সবচেয়ে বড় সুযোগ,পাকিস্তান ভাঙার। তোমরা চাও পাকিস্তান ভাঙতে, আমরা চাই স্বাধীন দেশ। তাই তোমাদের নিজেদের স্বার্থেই সর্বাত্মকভাবে আমাদের সাহায্য করা উচিত"। লেখকের পিঠ চাপড়ে গুলবত সিং বলেন, "মইন তুম বহুত চাল্ল্যু হ্যায়"।
১৬ ডিসেম্বরের পর ঢাকায় লুটপাটের ঘটনা বর্ণনা করা হয়। সেসময় ভারতীয় বাহিনীর নিষেধে ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো দল উপস্থিত ছিলোনা; তবে জেনারেল মইনের ২য় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছাড়া যারা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঢাকা এসেছিলো। তাই লুটপাটের দায়ভার ভারতীয় বাহিনী এড়াতে পারেনা। লুটপাট এমন পর্যায়ের ছিলো যে বঙ্গভবনের থালাবাসান,গ্লাসও পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছিলোনা। এছাড়াও সেনানিবাসের অস্ত্রভাণ্ডারে প্রবেশ করে যতটা অস্ত্র থাকার কথা তা দেখতে পাননা লেখক; পরবর্তিতে ভারতীয় বাহিনী কর্তৃক অস্ত্র পাচারের বিষয়টি তুলে ধরেন। ভারতীয় সেনা ব্রিগেডিয়ার মিশ্রর বিরুদ্ধে অস্ত্র পাচারের অভিযোগে কোর্ট মার্শাল হয়, পাচারের স্বপক্ষে সাক্ষ্য দিতে দেশ থেকে কয়েকজন সেনাসদস্য পরবর্তীতে ভারতে যান।
মিরপুর-মোহাম্মদপুরে বিহারিদের সাথে সংঘর্ষ, মিলিশিয়া বাহিনী গঠন নিয়ে পিলখানায় সংঘর্ষের ঘটনা উঠে আসে লেখকের বর্ণনায়। জহির রায়হানের মৃত্যু নিয়ে চমকপ্রদ বর্ণনা পাওয়া যায়! এরপর মিলিশিয়া বাহিনীর পরিকল্পনা বাদ দিয়ে রক্ষীবাহিনী গঠনে দৃষ্টিপাত করা হয়। মূলত কাদেরীয়া ও মুজিববাহিনীর সদস্যদের নিয়ে তা তৈরি হয়। '৭১ মুজিববাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ধোয়াশার কথা স্বীকার করেন লেখক। রক্ষীবাহিনীর পোশাক ভারতীয় সেনাদের মতো জলপাই রঙের হওয়া,ভারতীয় উপদেষ্টাদের তত্বাবধানে সামরিক প্রশিক্ষণ দান( যেখানে প্রধান তিন বাহিনীর প্রশিক্ষণ দেশেই হতো), আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পক্ষপাতমূলক আচরণ ও এদের সম্পর্কে সত্য-মিথ্যা আর অতিরঞ্জিত নানা খবর শেখ মুজিবের জনপ্রিয়তায় চীড় ধরায় বলে লেখক দাবী করেন৷
জ্যেষ্ঠতাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে মেজর শফিউল্লাহ'র সেনাপ্রধাণ হওয়া ও শফিউল্লাহ-জিয়া-খালেদ মোশারফের সম্পর্ক নিয়ে আলোকপাত করা হয়। মুক্তিযোদ্ধা সেনাসদস্যদের ২ বছরের জ্যেষ্ঠতা প্রদান নিয়ে '৭৩ এ পাকিস্তান ফেরত সেনাসদস্যদের সাথে দন্দ্ব, '৭২ এ বিমানবাহিনীতে জ্যেষ্ঠতা নিয়ে বিদ্রোহ, চাকুরীরত অবস্থায় কর্ণেল জিয়াউদ্দিনের স্বনামে "হিডেন প্রাইজ" প্রবন্ধে ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীচুক্তির সমালোচনা করা (সরকারের তরফ থেকে এর বিরোধীতা করে বিবৃতি দেওয়া হয়নি) ও নানা ঘটনায় সামরিক বাহিনীর অস্থিতিশীলতা ফুটে উঠে।
মুক্তিযোদ্ধা সনদের অগ্রহণযোগ্যতা এবং মুজিব সরকার ও জিয়ার শাসনামলে এ নিয়ে দুর্নীতির কারণে এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার) কে ফ্রাইডে ফাইটার বলে অনেকে ঠাট্টা করতেন বলে উল্লেখ করেন লেখক। উল্লেখ্য '৭১ এর ১৬ই ডিসেম্বর দিনটি ছিলো শুক্রবার।
'৭৩ এর নির্বাচনে আওয়ামীলীগ জয়লাভ করলে সমাজতান্ত্রিক দলগুলো কারচুপির অভিযোগ আনে যার সব সত্য ছিলোনা বলে লেখকের মত; তার মতে কারচুপি না হলেও আওয়ামীলীগ অনায়াসে ২৮০ আসন পেতো।
'৭৪ এ মিশরের উপহার পাঠানো ট্যাঙ্কগুলো রংপুর সেনানিবাসে ট্যাংক রেজিমেনন্টে পাঠানোর অনুরোধ করেন লেখক; উপেক্ষা করে তা ঢাকায় রাখা হয়। '৭৫ এর আগস্টে এই ট্যাঙ্কগুলোই ব্যবহৃত হয়।
শেখ কামালের ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা যে সম্পূর্ণ মিথ্যাচার ও বানোয়াট তা উল্লেখ করেন লেখক। সাথে সিরাজ হত্যা নিয়েও বলেন, উল্লেখ্য, সিরাজ অনেকটা হারকিউলিসের মতো ছিলো জনগনের কাছে।
'৭৫ এ ফারুকের মেজর জিয়ার সাথে দেখা করার বিষয়টির সত্যতা তিনিও উল্লেখ করেন৷ সাথে ভবিষ্যতে জুনিয়র অফিসারদের এভাবে আসতে দিতে জিয়ার নিষেধাজ্ঞার কথাও উল্লেখ করেন।
"জয় বাংলা" থেকে "বাংলাদেশ জিন্দাবাদ" ধ্বনি খন্দকার মোশতাক চালু করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
'৭৫ এর ৩ ও ৭ নভেম্বরের সেনা অভ্যুত্থানের বিষয়টিও উঠে আসে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে অভ্যুত্থানকারী সব সেনা সদস্যের সমর্থন না থাকা ও অভ্যুত্থানকারীদের সঠিক কোনো পরিকল্পনা না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন লেখক। এর মাঝে '৭৫ এর হত্যাকারীরা জেলহত্যা করে দেশত্যাগ করে। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান সমর্থনে আওয়ামীলীগের মিছিল ও এতে খালেদ মোশারফের মায়ের অংশগ্রহণ একে ভারতঘেঁষা বলে রটিয়ে দেয়; যদিও এর সাথে ভারতের ইন্ধন থাকার বিষয়টি মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন লেখক।
জিয়াউর রহমানের সেনাপ্রধাণ হওয়া, রাজনীতিতে অংশগ্রহণের ইচ্ছা ও এর পেছনে এরশাদের ইন্ধনের কথা উল্লেখ করা হয়। লেখক বারবার জিয়া কে রাজনীতি থেকে বিরত থাকার কথা বলেন। এরপর রাজনৈতিক স্বার্থে ২৮ জন কর্নেলকে ব্রিগেডিয়ারে পদোন্নতি ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অসামঞ্জস্যতা তুলে ধরেন।
জিয়া হত্যার ব্যাপারে জেনারেল মঞ্জুর ও জেনারেল শওকতের ষড়যন্ত্রের খবরকে মিথ্যা ও এরশাদের দ্রুত কোনোরকমের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই জিয়াহত্যার দায়ে বহু মুক্তিযোদ্ধা আর্মি অফিসারকে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত করস্র বিষয়টি উল্লেখ করেন। দ্রুততার কারণ ছিলো প্রকৃত ঘটনা উন্মোচিত হতে না দেওয়া; জিয়া হত্যা যদিও কোনো সেনা অভ্যুত্থান ছিলোনা। নিরপরাধ সেনাসদস্যের ফাঁসি রুখতে লেখক জেনারেল ওসমানীর সাথে তার আত্মীয়ের বাড়ির পেছনের দেওয়াল টপকে দেখা করেন( তখন লেখককে নজরদারিতে রাখা হতো), তবে ওসমানী লেখকে হতাশ করেন সাথে আমাকেও, তিনি এ কাজ করতে পারবেন না বলে জানান। এরপর এরশাদ মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চাকুরিচ্যুত করেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বদলি করেন, স্বেচ্ছা অবসরগ্রহণে বাধ্য করেন।
লেখক সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার বিষয়ে আলোকপাত করেন বারবার। আর্মিতে শৃঙ্খলা না থাকলে সমস্যা যে অবশ্যম্ভাবী তার প্রমাণে উল্লেখ করেন, জিয়াকে টপকে শফিউল্লাহর সেনাপ্রধাণ হওয়া, এরশাদের ৭ বছরে লে. কর্নেল থেকে লে. জেনারেল হওয়া(!), জেনারেল দস্তগীরকে টপকে এরশাদের সেনাপ্রধাণ হওয়া- এর একটিও ভালো ফল বয়ে আনেনি।
বইটের চমকপ্রদ কিছু তথ্য হচ্ছে- অ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের সোনালী ব্যাংক থেকে ২০ হাজার পাউন্ড লোন নিয়ে তা ফেরত না দেওয়া ও একে মুক্তিযুদ্ধে তার অবদানের পুরস্কার হিসেবে দাবী করা যা সম্পূর্ণ বানোয়াট। এরপর এরশাদের সহায়তায় পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে "The legacy of blood" রচনা করেন। '৭৬ এ মুজিবের ছবি সম্বলিত ছাপানো কোটি কোটি টাকা পুড়িয়ে ফেলা যার খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করে। এরশাদ পাকিস্তান আমলে স্বল্পমেয়াদী কমিশনে চাকুরিতে যোগদান করেন, তার সমসাময়িকরা কয়েকবছর পরই অবসরে যান (পূর্বনির্ধারিত ছিলো), তবে এরশাদ থেকে যান।
জেনারেল মইন সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত থাকেন অনেকটা সময়। সেনাবাহিনীতে ফিরে আসার জন্য তার আকুতি এ লেখায় ফুটে উঠে। বিএনপি-আওয়ামীলীগ দুই সরকারের আমলেই তিনি সেনাবাহিনীতে ফেরত আসার আবেদন করেন; হাইকোর্টে করা তার রিট খারিজ হয়ে যায়। তার শৃঙ্খলা, কর্তব্যনিষ্ঠার কথা সবাই জানতেন; খালেদা জিয়াকে বিস্তারিত বললে তিনি জবাবে বলেন," আই নো ইউ ক্যান কন্ট্রোল আর্মি ভেরি ওয়েল বাট হু উইল কন্ট্রোল ইউ?" সরকারপ্রধাধাণের সামর��ক আইনের প্রতি এই অনাস্থা ব্যক্তিগতভাবে আমাকে মর্মাহত করেছে।
- ১৯৭২ এর ৩০ জানুয়ারি মিরপুর এলাকায় বিহারিদের সাথে সেনাবাহিনীর বেশ বড় রকমের সংঘাত হয়। এই সময়ে ৪২ জন সেনাসদস্যের পাশাপাশি কয়েকজন সিভিলিয়ানও নিহত হয়। লেখকের মতে ইনাদের একজন জহির রায়হান। তিনি ওই সময়ই তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজে মিরপুরে গিয়েছিলেন এবং খুব সম্ভবত সেখানেই দুই পক্ষের গোলাগুলির মধ্যে প্রাণ হারান।
- লেখকের মতে ৭২-৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তায় চিড় ধরার অন্যতম কারণ রক্ষীবাহিনী। বাম দলগুলোর গুপ্ত হামলা, খুন ও আওয়ামীলীগ নেতাদের ওপর হামলার ক্রিয়ার বিপরীতে রক্ষীবাহিনীর প্রতিক্রিয়া অনেকাংশেই মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। তবে জনগণের রক্ষীবাহিনীর ওপর নাখোশ হওয়ার মূল কারণ সম্ভবত অন্য। যেখানে সেনাবাহিনী, বিডিআর এর অফিসারের দেশেই প্রশিক্ষণ নিতো, সেখানে রক্ষীবাহিনীর সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিতো ভারতে গিয়ে এবং তাদের ইউনিফর্ম এর রঙ ও ছিলো ভারতীয় সেনাবাহিনীর জলপাই রঙের পোশাকের আদলে।
- জিয়াউর রহমান ও কে এম শফিউল্লাহ একই দিনে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলে যোগদান করেন এবং একই দিনে কমিশন পেয়ে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে নিয়োগ পান৷ তবে সেনাবাহিনীতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ করা হয় সার্বিক ফলাফলের ভিত্তিতে। একই দিনে কমিশন পেলেও সার্বিক প্রশিক্ষণের ফলাফলে জ্যেষ্ঠতা পান জিয়াউর রহমান। অথচ সেনাপ্রধান করা হয় শফিউল্লাহকে। ৭৫ এও যখন আবার শফিউল্লাহকেই সেনাপ্রধান করা হয় তখন কষ্ট পেয়ে জিয়াউর রহমান পদত্যাগপত্রও জমা দেন এবং সম্ভবত ৭৫ এর ১লা সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হওয়ার কথা ছিলো ( বেলা অবেলা - মহিউদ্দিন আহমেদ)।
- এম আর আখতার মুকুলের 'মুজিবের রক্ত লাল বইতে এন্থনি ম্যাসকারেনহাস এর বঙ্গবন্ধুর কাছে ২০ হাজার পাউন্ডের সাহায্য চাওয়ার তথ্য জানতে পারি। এই বইতে সেই তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায়।
বেশ অনেক কিছু জানা গেলো এই ছোট কলেবরের বইটা থেকে। লেখক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা গুলোর সার তুলে ধরেছেন, ফলে অহেতুক বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়েনি।
<শুরুতেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিই সাদিউল ভাইয়ের এত ঘটনবাহুল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একটা বই দিয়ে আমাকে বাধিত করার জন্য।>
এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য বইটি এমন এক সময়ে আমি পড়লাম যখন প্রকৃতপক্ষেই আমাদের সেনাবাহিনীর কার্যকালাপ আজ প্রশ্নবিদ্ধ এবং আলোচনা সাপেক্ষ। মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী এখনো আমাদের দেশে তেমন আলোচিত নাম নয়। যদিও তিনি একজন সেনাপ্রধান হবার যোগ্য দাবীদার ছিলেন। এই বই তিনি এক নিরপেক্ষ দলিল হিসেবে সকলের জন্য রেখে গেছেন। ধাপে ধাপে ঘটনানুসারে তিনি সবকিছু উল্লেখ করেছেন নিজের সুনিপুণ নিরপেক্ষ গুণে। এই বইয়ে তার কোন আত্মগৌরবমূলক কোন বিশ্লেষণ নেই। অথচ তার বেশ সুযোগ ছিল নিজের আত্মপ্রচার করবার। তিনি নিজেকে একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে এবং ব্যবস্থাপক হিসেবে গড়ে গেছেন। যুদ্ধের দিন থেকে শুরু করে তিনি এ দেশের সকল গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা নীবিড়ভাবে প্রতক্ষ্য করেছেন। তবে নিরপেক্ষতার সুতোই তিনি খারাপকে ভালো বলেননি বই ভালোকে ভালো বলেছেন। শফিউল্লাকে যেরকম দায়ী করেছেন সেনাবাহিনীর অশৃঙ্খলতার বিস্তারের জন্য জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেছেন সেনাবাহিনীতে থেকেও রাজনীতি করার জন্য। তার অটল ব্যক্তিত্ব এবং পেশাদারীত্ব স্পষ্ট ফুটে উঠে যখন তিনি নির্ধিদায় একা জিয়ার বাসায় যান, জিয়া তখন বন্দী। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের সাথে থাকা সত্তেও তিনি তাদের সাথে আপোষ করেননি। মোশতাকের চা-চক্রের নিমন্ত্রণ প্রত্যাখানই তার দৃঢ়তার বহিঃপ্রকাশ এবং তা শুধু এই ঘটনায় নয় আরো বহু ঘটনায় তা বর্ণিত এই বইয়ে। লেখক সেনাবাহিনীর গাঠনিক কাঠামো এবং শৃঙ্খলা নিয়ে খুবই সচেতন ছিলেন এবং উদ্ধেগ ছিলেন। বারবার তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নিয়ে এবং এর গাঠনিক সংবদ্ধতা নিয়ে। যুদ্ধের পর হতে হতাশ মন নিয়েই তিনি সেনাবাহিনীর এই বক্র গতিপথ প্রত্যক্ষ করেছেন। এই বক্রপথচলা যে শুধু সেনাবাহিনীর জন্য ক্ষতিকর নয় দেশের জন্যও যে ক্ষতিকর তা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। সেনাবাহিনীকে রাজনৈতিক দলাদলি থেকে মুক্ত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়েছেন যার ফল স্বরূপ কখনো তিনি সেনাপ্রধান হতে পারেন নি। এই বই সুখপাঠ্য নয় কিন্তু যে কোন নিয়মিত-অনিয়মিত পাঠকই একটা তাড়না এবং গতির সঞ্চার অনুভব করবেন। আর সবচেয়ে বড় কথা বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই বইয়ের বিষয়বস্তু আমাদের সেনাবাহিনীর গঠন এবং কার্যাবলীর জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের সেনাবাহিনী আমাদের একটা গর্বের সম্পদ। এই সম্পদকে যেভাবে ব্যবহার করা হয়ে আসছে যুদ্ধের পর থেকে তার পরিসমাপ্তি এই গুণধর লেখক থেকে শুরু করে আমাদের সকলেরই কাম্য।
From his book, General Moin comes across as a 'straight-shooter' (no pun intended) and a stickler for discipline within the army. He believed that a military man has his allegiance to his country and the army he serves. He has described the turbulent decade and some more after 1971. He has tried to narrate events as dispassionately as possible. He, however, did not mince words when he showed his grievance at accommodating all repatriated army officers from Pakistani POW camps. He has shown his disgust at the junior officers who caused the coup in August 1975 but he has not gone into too much detail about the roles of Col Taher and JSD during the coup of 7th November of the same year. However, he has correctly pointed out the devious nature of General Ershad and his machinations that resulted in the deaths of General Zia and General Manzur - two birds with one stone. Also his hand in the gradual elimination of army officers who participated in our liberation war.
An interesting read for people who would like to know more about the decade of the 1970s, a decade full of ambitions, coups and counter-coups and all the treachery within.
রাজনীতি মূলত রাজার নীতি অর্থাৎ দেশ কিংবা রাজ্য পরিচালনার একটি উপায় হলেও আমাদের মনুষ্য অনুভূতির কাছ এই নীতির ভ্যালিডেশন হারিয়ে যায়। কেননা মানুষ মাত্রেই ক্ষমতাপূজারী এবং ক্ষমতা প্রাপ্তির পর যেকোনো ভাবেই সে ক্ষমতা আকড়ে রাখবার চেষ্টা সে করবেই।
মইনুল হোসেন চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে মেজর হিসেবে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তখন এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল জয়দেবপুরে। ১৯ মার্চ জয়দেবপুরে সংঘটিত প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধের ইতিহাসে তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি বাঙালীদের ওপর গুলি চালাতে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের দেওয়া নির্দেশ সরাসরি অমান্য করেন। ২৫ মার্চের পর এই জয়দেবপুর থেকেই পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাঙালী সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধে যোগ দেন। কামালপুরসহ আরও কয়েক স্থানে তিনি যুদ্ধ করেন। মইনুল হোসেন চৌধুরী মেজর জেনারেল হিসেবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। সেনাবাহিনীতে চাকরিরত থাকাকালে প্রেষণে বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হন। এক জেনারেল এর নিরব স্বাক্ষ্য বইটি মুলত তার কর্মজীবনে ঘটা ঘটনাবলির একপ্রকার জবানবন্দি বলা যায়।
মইনুল হোসেন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে ���েশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পটভূমিতে নিজের ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে তার কর্মকান্ডে নিষ্ক্রিয়তা দেখা দেয়। এবং দেশের এই প্রতিকূল সময়ে বেশ বড় সময় তিনি রাষ্ট্রদূত হিসেবে বেশ কয়েকটি দেশে অবস্থান করেন তাই যুদ্ধপরবর্তীয় রাজনৈতিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা অনেকাংশে কম। তবু যুদ্ধকালীন সময়কার ভূমিকার কারনে পরবর্তীতে নিজের প্রতি দাম্ভিক মনোভাব পোষণ করাটা বেশ দৃষ্টিকটু। নিজ লেখায় তিনি নিজেকে পেশাদার হিসেবে একাধিকবার দাবি করেছেন যা একজন সত্যকারের পেশাদার সৈনিক এর কাছে আশা করা যায় না৷ তবে বইয়ের পুরোটা জুড়ে সিংহভাগ দেখা গিয়েছে তার ব্যক্তি মতাদর্শের প্রতিফলন, যা অনেকাংশেই একপেশে বিবৃতির দিকে মোড় নিয়েছেন। হয়ত অনেকেই আমার কথার সাথে একাত্মতা প্রকাশ করবেন না তবে আমার সাথে একাত্ম হতে হবে তাতে কোনো সম্যসা নেই। তবে আমার দৃষ্টিতে ব্যক্তি আদর্শের প্রতিফলন বইয়ে ঘটানোটা অপ্রত্যাশিত।
মইনুল সাহেব বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের বেশ ঘৃণা করতেন। এমনকি মেজর ফারুক, মেজর রশিদ ও মেজর ��ালিমের দেশে আসাকে নানাভাবে রোধ করেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাদের কাজকে ঘৃনা করতেন এবং তার সাথে জড়িত সকলকেই বেশ তুচ্ছের সাথে পরিবেশন করেন। তবে যুদ্ধ-পরবর্তী দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটের অবনতি এবং এক্ষেত্রে শেখ মুজিবের অবস্থান ও করনীয় সম্বন্ধে তেমন কোনো মন্তব্য করেননি, তবে তার হত্যাকান্ডকে অন্যান্য দের থেকে কিছুটা ভিন্নভাবে, অর্থাৎ ঘৃণার চোখে দেখেছেন।
এছাড়া তিনি এন্থনি ম্যাসকারেনহাস এর উপর বেশ বড় রকমের আক্রোশ পোষণ করেন। তার লেখা বই "বাংলাদেশে এ ল্যাগেসি অব ব্লাড" বইয়ের অনেকগুলো তথ্যকে ভুল হিসেবে ব্যাক্ষা করেন এবং তার বই ছাপানো ও প্রচার একটি প্রপাগান্ডার সাথে তুলনা করেন। এছাড়া তার সে সময় বাংলাদেশের সোনালী ব্যাংকে থাকা ঋন পরিশোধ না করাকে বেশ গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তবে তাতেও তার ব্যক্তিগত আক্রোশের কিয়দংশ ফুটে উঠে যা আমি ভুল হতে পারি। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি এবং সেনাপ্রধান হুসেইন মোহম্মদ এরশাদ কে নিয়েও বেশ কিছু তথ্য তিনি তুলে ধরেন।
এরশাদ কে পাকিস্তান থেকে ভারত আনার পর থেকেই তৎকালীন দেশপ্রধান জিয়াউর রহমান কে নানাভাবে প্রভাবিত করবার চেষ্টা করেছেন তিনি। এমনকি লেখকের বিপক্ষেও এরশাদ তার প্ররোচোনা চালান যার ফলে তিনি বেশ রুষ্ঠ হন। পরবর্তীতে এই উচ্চাভিলাষী নেতা দেশপ্রধান জিয়াউর রহমানকেও হত্যায় ভূমিকা রাখেন। জেনারেল মঞ্জুর এর ভূমিকা তিনি বেশ সাবলীলভাবেই নাকচ করেন, যেটি অবাক করার বিষয়। এন্থনি ম্যাসকারেনহাস যেখানে পুরো ব্যাপারটাকেই জেনারেল মঞ্জুর এর উপর চাপিয়ে দেন, লেখক পুরো অন্য দিকে ধাবিত হন। তিনি প্রচলিত এরশাদের ভূমিকাকে জিয়াহত্যার মূল হিসেবে প্রচার করেছেন। তবে এক্ষেত্রেও তার ব্যক্তি মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটেছে যদিও এরশাদ যে আসলে ভালো মানুষ ছিলেন তা আমি বলছি না।
সবশেষে বইটি পড়বার পর নানা প্রশ্ন মাথায় এসেছে। তবে বইটির তথ্যাবলীর গোছানোর ধরন এবং লেখার মান কিছুটা খারাপ। সবকিছুর ক্ষেত্রে তিনি একদম ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার র তথ্য ঢেলে দিয়েছেন তাই ইতিহাস জানার পর বইটি পড়া উচিত বলে মনে করি। কেননা তিনি তার তথ্যের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে তেমন অবহিত করেননি কিংবা প্রয়োজন বোধ করেননি। তবে রেফারেন্স হিসেবে একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তিনি প্রদান করেছেন যা জানার জন্য হলেও এটি পড়া উচিত।
বইটিতে মূলত ৭১ পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ পর্যন্ত সময়াকালের কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে বেশ অনেকগুলো বিষয় জানা থাকলেও নতুন করে বেশ কিছু বিষয় জানতে পেরেছি। এন্থনি মাসকারেনহাসের লিগেসি অফ ব্লাড যে এরশাদের প্রণোদনাতে লেখা, এটি জানা ছিলো না। তার কাছে থেকে বাংলাদেশ সরকার তৎকালীন সময়ে ২৫ হাজার পাউন্ড পেত, যা কিনা কখনই ফেরত পাওয়া যায় নি এই বিষয়টি বেশ ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এর বাইরেও বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডে জড়িতদেরকে কিভাবে পরবর্তী সময়েগুলোতে বিভিন্ন পদে স্থাপন করে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, এদের বিষয়তে তৎকালীন সময়ে সেনাবাহিনী ও রাজনীতিবিদরা কি ধারণা পোষণ করতেন, এ বিষয়ে বেশ ভালো একটা ধারণা পাওয়া যায়। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের উত্থানের আলোচনা উঠে এসেছে এই বইতে, যেটা আগে সেভাবে পড়া হয় নি। সব মিলিয়ে চমৎকারই বলতে হবে বইটিকে। লেখনী খুব একটা সাবলীল বা গোছানো মনে হয় নি। তবে ফ্যাক্ট টেলিং এর ক্ষেত্রে নিউট্রালিটি বজায় রাখাটা বেশ কষ্টসাধ্য হলেও, এই ক্ষেত্রে লেখককে এই দায়িত্ব চমৎকারভাবেই পালন করতে দেখা গিয়েছে বলে মনে করি।
একটা জিনিস কখনো খেয়াল করেছেন? মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে যখন কোথাও আলোচনা হয় তখন সবথেকে বেশি উঠে আসে রাজনৈতিক আলাপগুলো! কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুধু রাজনীতির টেবিলেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, মুক্তিযুদ্ধ যেমন রাজনীতির দাবার বোর্ডে একের পর এক চালে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করেছে, ঠিক তেমনি আবার যুদ্ধের ময়দানে সৈনিক মুক্তিযোদ্ধারা নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে পাকিস্তানি বাহিনীকে। একদিকে রাজনৈতিক চাপ, অন্যদিকে যুদ্ধের ময়দানে বাংলাদেশের সাহসী সৈনিকদের বীরত্ব গাঁথা অবদানই ছিনিয়ে এনেছে মহামূল্যবান স্বাধীনতা।
মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরীও তেমনই এক বীর সৈনিক যিনি ২৫শে মার্চে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ করে যোগ দিয়েছিলো স্বাধীনতার যুদ্ধে। শুধু কী তাই, স্বাধীনতা অর্জনের অন্তিমকালে তিনিই একমাত্র বাঙালি ছিলেন যিনি তার রেজিমেন্ট নিয়ে ঢাকার কাছাকাছি অবস্থান করেছিলেন যখন পাকবাহিনীর হাত থেকে ঢাকার পতন হয়েছিলো। ঢাকার পতনের পর পরই তিনি তার সৈনিকদের নিয়ে ঘাঁটি গাড়ে ঢাকার স্টেডিয়ামে।
সেই সময়কার ঢাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলো ভারতীয় সৈনিকেরা, তখনকার সময়ের ভারতীয় সৈনিকদের ঢাকায় লুটপাট, বিহারীদের আগ্রাসন এবং কথাপ্রসঙ্গে জহির রায়হানের হারিয়ে যাওয়ার গল্পও উঠে এসেছে লেখকের বর্ণনায়।
শেখ মুজিবর রহমানের প্রত্যাবর্তের সময়ের পর মুক্তিযোদ্ধা সৈনিকদের দুইবছরের জ্যোষ্টতা দেওয়া হয় সকল সৈনিকদের, এদিকে যুদ্ধের পর পাকিস্তান থেকে ফিরে আসা বাঙালি সৈনিকরা সেটা কখনোই মেনে নিতে পারেনি। যার ফলে তাদের মনের কোনে ক্ষোভ জমতে থাকে। যার প্রভাব পড়ে সেনাবাহিনীতেও, এতে সেনাবাহিনীর যে শৃঙ্খলা তা ভেঙে পড়তে থাকে। এদিকে যুদ্ধের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এতোটাই গরম হয়ে উঠে যে যার প্রভাব গিয়ে পড়ে সামরিক বাহিনিতেও। তার উপর সামরিকের সাথে রাজনীতির সম্পর্ক ভবিষ্যতে ১৫ই আগষ্টের পর দেশকে ঠেলে দেয় এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে। লেখক সিনিয়র অফিসারদের একজন হওয়ায় এসব দেখেছেন খুব কাজ থেকে, যার ফলে সামরিক বাহিনীতে ১৫ আগষ্টের পরিণতির ক্ষোভের কারণ এবং তার পরিণতির বর্ণনা উঠে এসেছে বইটিতে।
১৫ই আগষ্টে সবই যে ঠিক হয়ে গিয়েছিলো তা কিন্তু না, বরং সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা বলতে গেলে একেবারেই ভেঙে পড়েছিলো এই সময়ে। যার সুযোগ নিয়ে একের পর এক হয়েছে সামরিক অভ্যূত্থান, যার ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসে জিয়া, এরশাদরা। লেখকের বর্ণনায় তাদের ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসার বর্ণনা, ভূমিকা আর পরিণতির গল্প উঠে এসেছে বিস্তারিত। এবং কী জিয়া ও মঞ্জুর হত্যার বিষয়ও আছে লেখকের লেখায়। আর ঘটনাগুলো সামরিক বাহিনী ঘটানোর কারণে এবং লেখক একজন সামরিক অফিসার হওয়ায় বর্ণনা দিয়েছেন সেই সব অস্তির সময়ে দেখা কাহিনি গুলো।
সবমিলিয়ে বইটি মুক্তিযুদ্ধ থেকে একেবারে ২০০০ সাল পর্যন্ত সামরিক অভ্যূত্থানের উপর অভ্যূত্থানের বর্ণনা, যুদ্ধের সময়ের বাঙালি বিদ্রোহী সামরিক বাহিনীর সৈনিকদের বর্ণনা এবং যুদ্ধ পরবর্তী দেশ তাদেরকে বিনিময়ে কী দিয়েছে সেই গল্প উঠে ���সেছে বইয়ের পাতায়। যার প্রতিটা পৃ্ষ্ঠা পড়ে হয়েছি মুগ্ধ সেই সাথে মনের মাঝে একধরনের বিভ্রান্ত তৈরি হয়েছে কে নায়ক আর কে ভিলেন তা বিচার-বিশ্লেষণ করতে গিয়ে।
বইটা বর্ণিত হয়েছে মূলত লেখকের পাসপ্রেক্টিভ থেকে, ফলে সবকিছু লেখক যে দৃষ্টিতে দেখেছেন তাই বর্ণিত হয়েছে। তবে এ পর্যন্ত যে সকল বই পড়া হয়েছে সেই সব বইয়ের অনেক বর্ণনা এখানে মিল পেয়েছি। সবথেকে বেশি জেনে ভালো লেগেছে ১৫ই ���গষ্ট পরবর্তী অস্তির সময়ের কাহিনি পড়ে। যেহেতু এই সময় নিয়ে খুব একটা আলোচনা কোথাও চোখে পড়েনি।
এই সময়ের একটা বিশাল অংশ লেখক লিখেছেন জিয়া ও এরশাদকে নিয়ে ফলে এদের নিয়ে অনেক কিছুই জানা হয়েছে। লেখক বইয়ের বর্ণনায় প্রায়ই বলেছেন সামরিক বাহিনীকে সবসময়ই রাজনীতির বাইরে রাখা উচিত, কিন্তু প্রতিটা সময়েই দেখা গেছে ক্ষমতার পালাবদলে সামরিক বাহিনীতে রাজনৈতিক প্রভাবও বদলেছে কিন্তু তা কখনো দূর হয়নি যার ফলে সামরিকে শৃঙ্খলা ধরে রাখাটা খুব কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছে। এবং কী লেখক বিদেশে গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে কাজ করার সময়ও সেই প্রভাবের উপলব্ধির বর্ণনা দিয়েছেন।
সবমিলিয়ে দেশের ইতিহাস জানার ক্ষেত্রে এই বইটি পাঠকের জন্য চমৎকার একটা বই হবে বলে আমি মনে করি। তার উপর লেখকের অনেকটা ডায়রি বা ঘটনা ক্রমানুসারে বণনার ফলে একটা ঘটনার সাথে আরেকটা ঘটনার যে সম্পর্ক তা ধরতে পারবেন খুব সহজেই। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের বাইরে এসে সেইদিনগুলোতে সামরিক বাহিনীর কার্যকলাপ, ভূমিলা, অবদান সবনিয়ে একটা ধারনা পেয়ে যাবেন বইটিতে।
এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য:স্বাধীনতার প্রথম দশক মেজর জেনারেল মঈনুল হোসেন চৌধুরী(অবঃ) বীরবিক্রম
লেখক বইটি শুরু করেছেন মুক্তিযু্দ্ধের শেষ দিনগুলো দিয়ে। ১লা ডিসেম্বর থেকে ১৬ই ডিসেম্বর, তারপর আমাদের বিজয় আর স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশ । ছোট ছোট প্রবন্ধে তিনি ঘটনা গুলো তুলে এনেছেন।যেগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন লেখক। বইটি মূলত আত্মজৈবনিক গ্রন্থ, যাতে উঠে এসেছে সে সময়ের রাজনৈতিক সাইক্লোন।
দেশ স্বাধীন হবার পর ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লুটপাটের অভিযোগ উঠে। আত্মসমাপর্ণের পর ভারতীয় বাহিনী পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র ভারতে পাচার করে। এসব অভিযোগ ও তার কিছুটা সত্যতা মিলে এখানে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন,মিরপুরে বিহারী ও রাজাকারদের বিরুদ্ধে অভিযানের বর্ণনা।যুদ্ধের পরও চলে অভ্যান্তরীণ যুদ্ধ। জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ আর পিলাখানার সংঘর্ষ এসব ঘটনার নীরব সাক্ষ্য পাওয়া যায় বইটিতে।
লেখক তার জবানীতে রক্ষীবাহিনী গঠন প্রক্রিয়া ও পরবর্তীতে এ বাহিনী সমালোচনার মুখে পড়ার কারণ, রক্ষীবাহিনী নিয়ে জনগণের কাছে ভুল বার্তা, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে এ বাহিনীর প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম সবই তুলে আনেন।
বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পর তাঁর চারপাশে সুযোগ সন্ধানী মানুষের ভিড়। মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতার পদক ও সনদপত্র নিয়ে উঠে অনিয়মের কথা। লেখক তার বর্ণনায় লিখেছেন "স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহসিকতার জন্য পদক দেওয়া হয়েছে এমন ব্যক্তিদেরও, যাঁরা যুদ্ধের নয়মাস বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেননি।"
স্বাধীনতার পরবর্তী সময় বাংলাদেশের রাজনৈতিক অবস্থা ছিলো ঘোলাটে। চারিদিকে বিপদ, লোভী সুযোগসন্ধানী মানুষের তৎপরতা, সেনাবাহিনীতে মুক্তিযোদ্ধা অমুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের দ্বন্দ্ব।১৯৭৩ এ নির্বাচন আওয়ামীলীগের বিজয়, দূর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, বাকশাল, মুজিবহত্যা,হত্যার পেছনের কুশীলব,তাদের উদ্দেশ্য ও নিরাপদে দেশত্যাগ সবকিছুর ই সরল বর্ণন উঠে এসেছে এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্যতে..
মুজিব হত্যার পর রাজনৈতিক সংকট, মোশতাকের মসনদে বসা, জাতীয় চারনেতাকে হত্যা, ৩রা নভেম্বর অভ্যুত্থান তারপর পাল্টা অভ্যুথান। খালেদ মোশারফের নিহত হওয়ার ঘটনা, জিয়াউর রহমানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি, রাজনীতিতে উত্তরণ।চট্টগ্রামে জুনিয়র অফিসারদের অভুত্থানে নিহত হওয়ার ঘটনা, জেনারেল মঞ্জুরের উপর দায় চাপিয়ে জেনারেল এরশাদের উচ্চাভিলাষ ও ক্রমোন্নতি। আলোচিত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেণহাসের বই বিতর্ক, সেনা প্রধান নিয়োগে পদে পদে অনিয়ম আর তার ফলফল সবই মিলে এ বইতে।
মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা আর স্বাধীনতার প্রথম দশক জুড়ে যে নির্মম ইতিহাস সেসব জানার বুঝার জন্য বইটি বেশ ভালো লেখেছে। যারা রাজনীতিমনস্ক পাঠক,ইতিহাসের সত্য মিথ্যা যাচাই করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য অবশ্যপাঠ্য গ্রন্থ। আমাদের স্বাধীনতার এত সহজে যেমনি আসেনি তেমনি স্বাধীনতার পর আমরা দেশের স্থিতিশীলতাও ধরে রাখতে পারিনি। সেনাবাহিনী ছিলো পুরোপুরি বিশৃঙ্খল। রাজনৈতিক স্বার্থে সেসময়ের শাসকেরা সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছেন। যার ফলশ্রুতিতে একেরপর এক অভ্যুত্থান আর হত্যাকান্ড। এ দেশ যার কালো ছায়া বয়ে বেড়িয়েছে দীর্ঘকাল।
লেখক সম্পর্কে কিছু বলতে হয়, মেজর জেনারেল মঈনুলের জন্ম সিলেটে। ১৯৭১সালের মার্চে জয়দেবপুরে দ্বিতীয় ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে পাকবাহিনী বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অগ্রনী ভূমিকা ও যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাহসিকতার জন্য পেয়েছেন বীর বিক্রম পদক। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনিই বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা,রাষ্ট্রপতির সচিব, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসে রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেন। উচ্চ পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা হবার সুবাদে তিনি এসব ঘটনা খুব কাছাকাছি থেকে দেখেন, অনেক ঘটনায় তিনি নিজেও সম্পৃক্ত। এ বইয়ে লেখককে পাওয়া গেছে সৎ, দেশ প্রেমিক, কর্তব্যনিষ্ঠ, নির্মোহ মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার হিসেবে।
সমালোচনা: বইতে সবকিছুর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বর্ণনা দিয়েছেন, আমার মনে হয়েছে এসবের আরো বিস্তারিত বর্ণনা দেয়া যেত। শুধু তাঁর জবানীতে ঘটনা গুলো তুলে ধরেছেন হয়তো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও তৎকালীন পরিস্থিতির আলোকে তুলে ধরলে পাঠক আরো সহজে এসবের মূলে পোঁছাতে পারতো।
সবশেষে একজন জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য পড়ে স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশের চালচিত্র যেমন পেয়েছি তেমনি এর পেছনের কারণ ও এর কুশীলবদের পরিচয়ও পেয়েছি। অনেক প্রশ্নের উত্তর মিলেছে আবার অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে অমীমাংসিত .......
💠বই- এক জেনারেলের নিরব সাক্ষ্য 💠লেখক- মেজর জেনারেল অবঃ মইনুল হোসেন চৌধুরী (বীরবিক্রম)।
💠পাঠ প্রতিক্রিয়া:- বইয়ের শুরুতেই রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়গুলোতে রাজনৈতিক এবং সামরিক ঘটনাগুলোর সংক্ষিপ্ত আকারের ব্যাখ্যা। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকে পুরো এক দশক জুড়ে বিভিন্ন উপাখ্যান একটা একটা করে তুলে ধরেছেন এবং তা নিয়ে কিছু তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বিজয়ের মুহুর্তে মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকা দখল, দেশ স্বাধীনের পর মিত্র রাষ্ট্র ��ারতের অস্ত্র পাচার, ৩০ জানুয়ারির মিরপুরের বিহারী পল্লি অভিযান, রাজনৈতিক এবং সামরিক মহলের মারপ্যাঁচ, তাদের আন্তঃ এবং অন্ত দ্বন্দ্ব, ক্ষমতার আসন ভাঙা-গড়ার খেলা বইয়ের মূল আকর্ষণ বিন্দু হিসেবে কাজ করেছে । এছাড়া লেখক কিছু ঘটনা ক্ষেত্রে তার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে কারণ অনুসন্ধানও করেছেন। অনেক নতুন তথ্য সম্পর্কে পাঠক অবগত হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়টা খুব সংকটপূর্ণ একটা সময়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশরক্ষার কাজে এক মন্ত্রে বলিয়ান হয়েছিলো লেখকের ভাষ্যমতে সেসময় সেসব দেশনায়করাই দেশের ক্রান্তিলগ্নে এসে ক্ষমতার লোভে বশবর্তী হয়ে তারাই একের পর এক ক্যু সংগঠিত করতে কুন্ঠবোধ করেন নি। ক্ষমতার লোভে অন্ধ হয়ে একে অন্যের অগোচরে পাশার চাল চেলেছেন। অনেকে আবার এসবে যুক্ত না থেকেও এর ফল ভোগ করেছেন। এসব সামরিক ক্যু মূলত ছিলো নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য,এতে যেমন ছিলো পরিকল্পনার অভাব ঠিক তেমনি ছিলো উদ্দেশ্যহীনতা। এতে করে দেশে তখন এক অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিলো। এসময় প্রতিনিয়ত ক্ষমতার রদবদল হয়েছে। লেখক চেষ্টা করেছেন নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো বোধগম্য করার। এক্ষেত্রে লেখক প্রায় শতভাগ সফলও হয়েছেন।
লেখক বইটিতে যেসব ঘটনায় তিনি জড়িত ছিলেন কেবল তাই বলার চেষ্টা করেছেন। বইটি শুরু হয়েছে ১৯৭১ এর ডিসেম্বর দিয়ে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ২য় বেঙ্গলই ছিল একমাত্র দল যারা ঢাকায় প্রবেশ করেছিল। বাকীরা ছিল ভারতীয় সেনা। ২য় বেঙ্গল এর নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন মেজর মঈনুল। ১৭ ডিসেম্বরের লুটপাট, পিলখানা সংঘর্ষ, রক্ষীবাহিনী, মীরপুর অভিযান সহ কিছু বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা লিখেছেন। স্বাধীনতার পর তৎকালীন সেনা অধিনায়কদের ব্যক্তিগত প্রভাব বলয় তৈরির চেষ্টায় সেনাবাহিনী অপেশাদার আচরন করার কথাও তিনি লিখেছেন। লিখেছেন পাকিস্তান ফেরৎ সেনারা মুক্তিযোদ্ধাদের সিনিয়রিটি মানতে পারে নাই। এই বিষয়টার কারনে বহু মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে প্রাণ দিতে হয়েছে। অপমানিত হতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড ও তার পরিবর্তীতে সেনাবাহিনীর আচরনের একজন কঠোর সমালোচক তিনি। যেখানে অন্যরা কতিপয় জুনিয়রের কাঁধে দোষ তুলে দিয়েছেন সেখানে তিনি বাহিনী হিসেবে সেনাবাহিনীর কমান্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার ভাষায় - আমার জানামতে এমন জঘন্য কলংকময় ঘটনা কোন দেশের সামরিক ইতিহাসে নেই। একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলতে হয়, উচ্চপদস্থ অধিনায়কদের নিয়ন্ত্রণে বিপর্যয়ের জন্য এ ঘটনা ঘটা সম্ভব হয়েছে, যদিও তাঁরা পরে নানা গবেষনা, তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে একে অপরকে দোষারাপ করতে থাকেন। পরবর্তীতে অভূর্থ্যান, জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আরোহন, এরশাদের উত্থান নিয়েও তিনি লিখেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে তার সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষন বেশ গভীর। মাওলা বাদ্রার্স প্রকাশিত ১৭৫ পৃষ্ঠার এ বইটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বেশ কিছু তথ্য সংরক্ষণ করছে।
জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অবঃ) বীরবিক্রমের লিখা "এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য-স্বাধীনতার প্রথম দশক" বইটি আমার কাছে মনে হয়েছে নিজের গুণকীর্তনের জন্যই লেখা। অফেন্সিভ হয়ে লাভ নাই। এইটা আমার পারসোনাল মতামত। . বইটিতে উত্তাল সেই সময়ের বিস্তারিত বিবরণ খুব একটা চোখে পড়ে নাই৷ শুধু মাত্র অল্প কথার বর্ননা দিয়েই কাজ শেষ করে দিয়েছেন।বিশ্লেষণের মত মতামতও খুব কম। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো জেনারেল মঞ্জু আর জেনারেল জিয়া হত্যা প্রসংগে তার মতামত। বইটি পড়লে যেসব বিষয় নিয়ে জানতে পারবেন... . ১. মুক্তিযুদ্ধের ময়দানে উনার সাহসিকতা। এবং ভারতীয় কমান্ড অগ্রাহ্য করে সবার প্রথমে ঢাকায় এসে পৌছানোর ঘটনা। ২. মিরপুরে বিহারী ক্যাম্পে আক্রমণ নিয়েও সুন্দর একটা আর্টিকেল পেয়ে যাবেন। জহির রায়হান কিভাবে নিখোঁজ হয়েছিলেন সে ব্যাপারেও বইটিতে কিছু তথ্য পাবেন। ৩. কিছু কিছু বইতে আমি পেয়েছিলাম, শেখ মুজিব ইচ্ছা করেই মুজিববাহিনী, কাদেরীয়া বাহিনীকে নিয়মিত বাহিনীর সাথে ইন্টিগ্রেট না করে আলাদা রক্ষী বাহিনী তৈরি করেছিলেন। তবে শুরুতে যে বিডিআরের সাথে মুজিববাহিনী বা কাদেরিয়া বাহিনীর ইন্টিগ্রেট করার চেস্টা করা হয়েছিলো এবং তার ফলাফল কি হয়েছিলো সেসব নিয়েও কিছু ধারনা পাবেন। ৪. মুক্তিযোদ্ধা আর্মি সদস্য আর পাকিস্তান ফেরত আর্মি সদস্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে বইটিতে। ৫. মুজিব হত্যা কারন অনুসন্ধান নামের একটা খুব বাজে বিশ্লেষণধর্মী আর্টিকেল আছে বইটিতে। ৬.প্রবাসীদের বিদেশে বসে কিছু তৎপরতা। ৭. এবং উনার কর্মময় জীবনের বর্ণনা।
তাছাড়া উনার বইতে বিশেষ কিছু জানার মত নাই...
This entire review has been hidden because of spoilers.
I’ve always felt that the period from 1975 to 1990 is often glossed over in traditional textbooks, making it seem like a time of little significance. But the rule of two military generals, two assassinations and some shambles of elections paints a very different decade from a bird's-eye view.This book, however, sheds light on the era by offering insights from a key military and foreign affairs official. It provides a comprehensive overview of the chaos, uncertainty, and often melodramatic political and military events of the time.
Though the author claims to be unbiased, it's important to remember that no political narrative is entirely free from perspective. Nevertheless, the strength of the book lies in its straightforward recounting of events without imposing judgments. The author presents what he observed without hiding his personal views, making it a useful reference for understanding the period rather than for evaluating right or wrong.
While it may not be the finest piece of literary work, it’s a solid read for anyone interested in political history of Bangladesh and provides enough engagement to be worthwhile.
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তী সময় নিয়ে লেখা বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং তথ্যবহুল একটা বই। বইটির লেখক মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী (অব:) বীরবিক্রম একজন নিষ্ঠাবান সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে তার সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো তুলনামূলক কম বিকৃত করে বলা চেষ্টা করেছেন, নিজের লেখার প্রতি সৎ থেকেছেন যেহেতু তার দেশ থেকে সুবিধা নেবার তেমন কোন ইচ্ছা ছিল না। বিভিন্ন বই থেকে মুক্তিযুদ্ধ এবং তার পরবর্তী ইতিহাসকে পরিশুদ্ধ করে নেবার জন্য এই বইটি পড়া আবশ্যকীয়।
স্বাধীনতা যুদ্ধের পরবর্তীতে কিভাবে বাংলাদেশের বিশৃঙ্খলার সূচনা হল এবং তা একটি লম্বা সময় ধরে বিশৃঙ্খলার সময় সীমার ব্যাপ্তির মাঝে চলমান তা খুব ভালো ভাবে বুঝে উঠা যায় মইনুল হোসেনের বর্ণনায়। বাংলাদেশের জাতির জনক কি কারনে অজনপ্রিয় হতে শুরু করলেন, পরিশেষে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হলেন? জিয়া হত্যার কারন কি? এরশাদের দ্বারা কিভাবে মুক্তিযুদ্ধাদের কলংকিত করা এবং শাস্তির সম্মুখীন করা হয়েছে? এই প্রশ্ন গুলো জানত্র এই বইটি পড়ে ফেলতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধ একটি জনযুদ্ধ ছিল বটে কিন্তু এর কৌশল নির্ধারণ থেকে পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন সামরিক বাহিনীর নানা স্তরের কর্মকর্তারা। লেখক তেমনই একজন রণাঙ্গনের সম্মুখযুদ্ধ করা কমান্ডার। এই বইয়ের মূল থিম মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী দশকের ঘটে যাওয়ার বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা উত্থান-পতনের নানা ঘটনা। লেখক নিজকে ওসব ঘটনার একজন নিরব দর্শক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে গেছেন পুরো লেখায়,সামরিক আদর্শের প্রতি তার দৃঢ়তার কারনে ওই সময়ে ঘটে যাওয়া রাজনীতির সামরিকায়নের ক্ষেত্রে লেখক ছিলেন নিষ্ক্রিয়। যার ফলাফল দেখা যায় সামরিক জীবন থেকে তাকে দূরে পাঠিয়ে রাষ্ট্রদূতের জীবন গ্রহণ করতে হয়। ওই সময়ের ঘটনাবলী এবং ঘটনার নায়কদের সম্পর্কে যাদের আগ্রহ রয়েছে তাদের জন্য বইটি পড়া আবশ্যক।
আমি মনে করি ইতিহাস যারা বর্ণনা করেন, তারা সব সময় নিজেকেই নায়কের আসনে অধিষ্ঠিত করতে চায়, যদিও তাদের কোন ভুমিকা নাও থাকে। ইতিহাস যারা পড়ে তারা সবসময় পরবর্তী প্রজন্ম, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে যেহেতু চাক্ষুষ কোন সাক্ষী বা কোন দলিল থাকে না সেহেতু যাচাই করাও সম্ভব হয় না। তাই যেটা বলে বা উপস্থাপন করে সেটা আমরা বিশ্বাস করে নেই এবং মনে মনে কল্পনা রাজ্যে তাদের বীরত্বের উপাখ্যান নিয়ে ভাবতে শুরু করে দেই। এগুলো অবশ্য সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় তবুও অকাট্য দলিল ছাড়া বিশ্বাস করাটা বোকামি ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে করে অনেক ক্ষেত্রে যারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে ছিল তাদের ঘৃণা করে, মিথ্যা ও ভুল টিকে আলিঙ্গন করে নেই। অনেক টা আসল হীরা রেখে, নকল কাচের টুকরো কে হীরা ভেবে আপ্লুত হবার মত ব্যাপার!!
A great book especially for the writer's neutral perspective, this book is highly recommended if one is interested about the major political turmoil of Bangladesh in her first decade further this book shows the internal conflict and indisciplinary act in the army Further broke 4 myths which were about Major MA Jalil, Khaled Mosharof, Zia calling taher before the coup of 7th November and Manzoor was directly related with the assassination of zia Along with it he has also given some small description about the work of his 2nd east bengal during the Liberation war
আমাদের পাঠ্য বইয়ে যা পড়ানো হয়, যে ইতিহাস জানানো হয়। তাই কী শুধু যথেষ্ট? আমাদের পড়ানো হয় শুধু পরিকল্পিত ভাবে কিছু অধ্যায় কিছু ঘটনা। তার বাইরেও লুকোনো আছে অনেক কিছু।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কতটুকু জানি আমরা, বইয়ে যা পড়েছি সবই কী সত্য?
বাঙালি জাতির প্রাণ পুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান,কিন্তু স্বাধীনতা ৫ বছর পরই কেন নিহত হতে হয়েছে।
সামরিক বাহিনীতে নিজস্ব কোন্দল, একজনে রেখে আরেকজন সেনাপ্রধান হওয়ার যে প্রতিযোগিতা তাই বা কেন?
বীর মুক্তিযোদ্ধা মইনুল হোসেন চৌধুরীর লেখা এই বই '৭১ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় পরিষ্কার করতে সাহায্য করবে। এর মধ্যে আছে— মাসকারেনহাস, কর্নেল তাহের, এরশাদ, ওসমানী সাহেব, মেজর জিয়াউর রহমান, মেজর জেনারেল মঞ্জুর সম্পর্কে জানা অনেক কিছু। একজন পেশাদার সেনাসদস্যের কাছ থেকে এরকম বয়ান গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে থাকবে।
Comparatively more objective narrative of the events that transpired post independence. Probably the lack of sensationalization makes it a more difficult read, but this was necessary. Yet another story of power grabbing through scorching the earth. Too many politicians and very few decent administrators, and you get Bangladesh.