কবর: একুশের প্রথম নাটক
১৯৫৩ সাল, ভাষা আন্দোলনের সেই রক্তাক্ত দিনের বর্ষপূর্তি- ঢাকার রাজপথ থেকে তখনও শুকোয়নি শহিদের রক্তের দাগ, কারাগারে বন্দি অসংখ্য আন্দোলনকারী। আন্দোলনের বর্ষপূর্তিতে বন্দিরা সিদ্ধান্ত নিলেন ভাষাদিবসের স্মরণে জেলখানাতেই একটি নাটক মঞ্চস্থ করার। রাজবন্দি কমিউনিস্ট নেতা রণেশ দাশগুপ্ত অনুরোধ করলেন মুনীর চৌধুরীকে- জেলখানায় মঞ্চস্থ করার উপযোগী একখানা নাটক লেখবার জন্য। তখন মুনীর চৌধুরী নিজেও একজন বন্দি হিসেবে জেলখানাতে আটক। জেলখানাতে যেহেতু সীমিত সুযোগ, নারী চরিত্র রাখার সুযোগ নেই, তাই সেরকম করেই একখানা নাটক রচনা করা হলো। নাটকের আয়োজন অতি সাধারণ, চরিত্র মোটে চারটি, ব্যাপ্তি মধ্যরাত থেকে ভোরের আলো ফোটা অবধি, গোরস্থানের আলোআধারি দৃশ্যপট। কিন্তু এক অঙ্কের এই নাটকটিই যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো অনেক কিছু, শাসকশ্রেণির প্রতি হানল মোক্ষম আঘাত। দিনেদিনে এটিই হয়ে ওঠে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতদিন বাঙালির ইতিহাস বাঁচবে, ততদিন উঠে আসবে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের প্রথম চরণ- ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস; আর যত দিন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস জীবিত থাকবে, ততদিনই অবধারিতভাবে চলে আসবে সার্থক এই একাঙ্কিকার নামটি।
নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র তিনটি: নেতা, যিনি অত্যাচারী শাসকযন্ত্রের প্রতিনিধি; ইন্সপেক্টর হাফিজ, শাসকযন্ত্রের হাতিয়ার; এবং মুর্দা ফকির, যে আবির্ভূত হয় জাতির বিবেকরূপে। ভাষা আন্দোলনের শহিদ হিসেবে আমরা যে-কজনের নাম জানি, '৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে এরচেয়ে অনেক বেশি মানুষ নিহত হন। তবে তাঁদের পরিচয় আমরা পাই না কেন? কেননা, সেইসব নাম না-জানা মানুষদের লাশ গুম করে ফেলা হয়েছিল রাতের অন্ধকারে। আর সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই লেখা হয় এ নাটকটি।
নাটকের শুরুতে আমরা দেখতে পাই- নেতা এসে তড়িঘড়ি করে লাশ কবর দেওয়ার নির্দেশ দেন; আর সেই কাজে সহযোগিতা করে ইন্সপেক্টর হাফিজ। নেতার ভাষ্যে, ভাষা আন্দোলন হলো 'সামান্য গণ্ডগোল', আর ভাষাশহিদরা হচ্ছেন 'কিছু দুষ্টু ছেলে'। পুরো নাটকজুড়ে তিনি মদ খান, আর নির্দেশ দিতে থাকেন লাশ লোপাটের; তার ক্রমাগত মদ্যপান-ই যেন নির্দেশ করে তার নৈতিক চরিত্রের দিকে। এর সাথে যুক্ত হয় ইন্সপেক্টর হাফিজ, যার সাহায্যেই সমস্ত ঘটনা পরিচালিত হয়- লোপাট হতে থাকে সবকিছু। এ-পর্যন্ত তাদের পরিকল্পনা মাফিক চললেও হঠাৎ উদয় হয় মুর্দি ফকির; সে এসে সমস্ত ঘটনার নতুন রূপ দেয়। লাশগুলো যখন মাটির গর্তে ধামাচাপা দেওয়া হয়, তখন সে এসে দাবি করে- লাশগুলো জীবিত, তাদের গায়ে এখনও রক্তের স্পন্দন; অন্যদিকে সে মৃতের গন্ধ পায় নেতা ও তার সহযোগী ইন্সপেক্টর হাফিজের গায়ে। সত্যিই তো, যাঁরা শহিদ হয়েছেন ভাষার জন্য, যারা প্রাণ দিয়েছেন দেশের জন্য, মানুষের অধিকারের জন্য; তাঁরা কখনও মরতে পারে না, তাঁরা কখনও হারিয়ে যেতে পারে না- দেশের মানুষ আজও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে সকল ভাষা শহিদদের। অন্যদিকে যে শোষকের নির্দেশে নির্যাতনের শিকার হলো দেশের মানুষ, ভাষার জন্য অকালে প্রাণ দিলো তাজা তাজা প্রাণ; তারাই আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তারাই আজকে মৃত, তারাই বাতিল। মুর্দা ফকিরের এ দাবির পরে নেতাও যেন দেখতে পান জীবিত সেই লাশের সারি, যেন লাশগুলো উঠে এসে আবারও যাবে মিছিলে, আবারও করবে অধিকারের আন্দোলন। ক'টা বুলেট দিয়ে ঠেকানো যাবে সে মিছিল, ক'বার মারলে সত্যিই মরবে তাঁরা?
ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখা হলেও এ নাটক মূলত তুলে ধরে পাকিস্তানোত্তর সমাজবাস্তবতা, রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতা ও সাংস্কৃতিক নিষ্পেষণকে। নাট্যকার নিজেও এ বিষয়ে বলেন, "নাটকটিতে শুধুমাত্র একুশের তাৎপর্য খোঁজা হলে খানিকটা ভুলই বরং করা হবে, হয়তো আর বেশি কিছু বলার চেষ্টা করেছি আমি। আরও বেশি কিছু।"
একটি নাটকের সফলতা নির্ভর করে এর দৃশ্যায়ন, চরিত্রায়ণ ও সংলাপের উপরে; সেদিক থেকে বলা যায়- নাটকটি অত্যন্ত সফল ও শক্তিশালী। তাছাড়া নাটকের সফল মঞ্চায়নও নাটকটিকে বাঁচিয়ে রাখে দর্শকদের মাঝে। নাটক-টি ১ম মঞ্চস্থ হয় ১৯৫৩ সালে- কারাগারে, বন্দিদের অভিনয়ে; এরপরে কারাগারের বাইরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে ১৯৫৫ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি নাটক-টি মঞ্চস্থ হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত, সারাদেশে এ নাটক-টি সফলভাবে মঞ্চস্থ হয়ে আসছে, আর সমাদৃত হচ্ছে সচেতন দর্শক ও পাঠকমহলে। এ নাটকের পরিসর অন্তত ছোট, বিষয়বস্তু জোরালো, চরিত্র ও সংলাপ দুর্দান্ত; এদিক থেকে ভাষা-আন্দোলনকেন্দ্রিক সাহিত্যকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী রচনা হিসেবে নাটকটিকে চিহ্নিত করা হলেও অত্যুক্তি করা হবে না।