মানুষের অনুভূতি কত বিচিত্র! তার কার্যকলাপের কোন মাথামুণ্ডু অনেক সময়ই বোধগম্য হয় না। কেন মানুষ মরিচীকার দিকে দৌড়ায় সেটা মরিচীকা জেনেও? কে বলবে তার গূঢ় অর্থ কোথায় আছে।
একেকজন মানুষ থাকে যাদের দেখলেই প্রবল আকর্ষণ অনুভূত হয়। মনে হয় যেন একে পেলে, এর বন্ধুত্ব-ভালোবাসা পেলে জীবন ধন্য হয়ে যাবে। কিন্তু এই মানুষগুলো তা কিছুতেই বোঝে না। তাদের স্বভাব থাকে তীব্র, তারা কেন কী করে কিছুই সাধারণ ছকে ফেলা যায় না। তাদের রাগ-দুঃখ-চাওয়া সবই থাকে প্রবল, এমনকি ভালোবাসাও।
একা এবং কয়েকজন উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্রের একটি সূর্যকুমার ভাদুড়ি ঠিক তেমনই একটি চরিত্র। অমিত সম্ভাবনা এবং তেজ নিয়ে নষ্ট হয়ে যাওয়া এক মানবসন্তান। যে জগতে এসেছিল অকিঞ্চিৎকর ভাবে, বিরাট কিছু করার সম্ভাবনা জেগে উঠেছিল তাকে ঘিরে, কিন্তু সে হারিয়েও গেল ঠিক সেই ভাবেই।
গোয়ালিয়র এর এক রূপসী বাইজী কিংবা সূর্যের বাবা অমরকুমার ভাদুড়ির মতে এক সত্যিকারের শিল্পী নাসিম আরা বানু ওরফে বুলবুলের সন্তান সে। যদিও তাকে বড় করেন তার সৎ মা পূর্ণিমা দেবী, কারণ সূর্যের জন্মের পরেই আত্মহত্যা করেন বুলবুল। সেই সূর্য ঠিক সূর্যের মতোই প্রখরতা নিয়ে বড় হতে থাকে, দেশ কী, স্বাধীনতা কী ঠিকভাবে বোঝার আগেই জড়িয়ে পড়ে স্বাধীনতা আন্দোলনে। সদা গম্ভীর সূর্যের চাহিদা সে তার জেদ দিয়েই পূরণ করে নিতে চাইত। জীবনে গভীরভাবে চেয়েছে সে তিনটি নারীকে, শ্রীলেখা যে সূর্যের সম্পর্কে বোন হয়, তার সৎ মায়ের ভাইয়ের মেয়ে হচ্ছে শ্রীলেখা। তাই তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় এই সম্পর্ক ছিল অসম্ভব। আর শ্রীলেখার ভালোবাসার জোর থাকলেও মনের জোর স্বভাবতই তত ছিল না। কাজেই প্রত্যাখ্যাত হয় সূর্য। পরবর্তীতে তার আন্দোলনেরই এক সহকর্মী দীপ্তি দি, যিনি সূর্যের চাইতে বয়েসে আট বছরের বড়। তীব্রভাবে চেয়েছে সূর্য দীপ্তিকে, কিন্তু দীপ্তির চরিত্রে সবসময়ই এক ধরনের দোদুল্যমানতা ছিল। তবুও কাছে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি সূর্যের। আর সেই কাছে আসাটাই এক রকমভাবে কাল হয়ে দাঁড়াল সূর্যের জীবনে। আর এক বাইজী বুলবুলকে আশ্রয় করতে চেয়েছিল সূর্য, কিন্তু সেও মারা যায় টিবি রোগে।
সূর্য আপাদমস্তক এক অস্থির চরিত্র। দেশপ্রেম, মানবিকতা তার চরিত্রে খুব প্রকটভাবে ছিল না কখনোই। সবসময়ই সে তার ইচ্ছে-রাগ-জেদের বশে চলেছে। তার বাবার জন্যও খুব বেশি টান ছিল না তার। ভালোবাসা মানেই তার কাছে যেন ছিল এক অধিকারবোধ। পাওয়ার এক তীব্র আক্রোশ নিয়েই অকালে কোন বিশেষ কাজ ছাড়াই, কোন মহৎ অবদান ছাড়াই, এমনকি এককালে স্বদেশী আন্দোলনের জন্য জেল খাটা বিখ্যাত সূর্যকে তাই চলে যেতে হয় অস্তাচলে, নিভৃতে।
আর এক প্রধান চরিত্র বাদলরঞ্জন। ছোটবেলা থেকেই যে সূর্যকে আদর্শ মেনে বড় হয়েছে, চেয়েছে দুজন মিলে একসাথে বড় কিছু করতে। কিন্তু সূর্য আর বাদল কি কখনো একসাথে থাকতে পারে?
বাদল বড় হয়ে ওঠে তার মতো। সমস্ত দারিদ্র্য, না পাওয়া সত্বেও তার জীবনে আসে কবিতা। আপাদমস্তক রোমান্টিক চরিত্র হলেও সেও রাজনীতিতে নাম লেখায়। কিন্তু কেউ কেউ আছে কোন চাওয়াই তীব্রভাবে প্রকাশ করতে পারেনা। তাদের যেন কোন এক দোলাচল রয়ে যায়, মা-বাবা-প্রেমিকার পিছুটানকে সে সূর্যের মতো করে অগ্রাহ্য করতে পারেনা। বাদলের জীবনের এক ধ্রুব সত্য রেণু। তার আবাল্য প্রেম, নানান ঝক্কি পেরিয়েও উপন্যাসের শেষপ্রান্তে এসে দুজন দুজনের হাতে হাত রাখে এবং স্বভাবতই পাঠকেরাও স্বস্তি পান!
বাদল চরিত্রটি বাঙাল, লেখকের নিজ জীবনের অনেকখানিই যেন এই বাদল চরিত্রটির মধ্যে পুরে দেওয়া আছে।
গোটা উপন্যাস জুড়ে অঙ্কিত হয়েছে উপমহাদেশের এক অস্থির সময়। স্বদেশী আন্দোলন, দেশ ভাগ, মিথ্যে স্বাধীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, কংগ্রেসের উত্থান, নেতাদের ভোল বদল ইত্যাদি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের মধ্য দিয়েই বেড়ে উঠেছে প্রতিটি চরিত্র। কেউ কেউ সরাসরি প্রভাবিত, কেউ কেউ আবার দূর থেকে অবলোকন করে গেছেন। যেমন, বাদলের বাবা চিররঞ্জন, যিনি শত পালাবদলের মধ্যেও রয়ে গেলেন আত্মবিশ্বাসহীন এক বেকার বাবা।
রেণু চরিত্রটি মোটামুটি তখনকার সময়ের এক প্রগতিশীল তরুণীর কথা বলে। শিক্ষা-সংস্কৃতির প্রতি বিশেষ আগ্রহ থেকে যারা একটু একটু করে পুরনো খোলস ভেঙে প্রগতিশীলতার দিকে এগুচ্ছে।
আপাদমস্তক সংশয়ী চরিত্র দীপ্তিদি। একজন বিপ্লবী হওয়া সত্বেও তাঁর চরিত্রের দ্বিধা রীতিমতো পীড়াদায়ক এবং পরিণতিও সুখের নয়। সূর্যের বাবা অমরকুমার আর এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বইটির, যৌবনে অনেকটা সূর্যের মতোই একরোখা থাকলেও পরবর্তীতে তাঁর সন্তানবাৎসল্য চোখে পড়ার মতোই। যদিও বারবার তিনি অপমানিত হয়েছেন সন্তানের কাছে।
সুনীলের সেই সময়, প্রথম আলোর কাতারে না গেলেও একা এবং কয়েকজন একটি সুখপাঠ্য ঐতিহাসিক উপন্যাস যেটি পাঠে ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দিকে ফিরে দেখার সাথে সাথে কয়েকজন মানুষ কিংবা অধিকাংশ মানুষের বেড়ে ওঠা, ভাবনা, অনুভূতি অবলোকন করা যায়। ভাবনায় ডুবিয়ে দেয়ার মতো বেশ কিছু লাইন আছে বইটিতে, আছে বেশ কিছু দর্শনের সহজ বয়ান যা সুনীলের সহজাত।