Bimal Mitra (bengali: বিমল মিত্র) was a prominent Bengali writer who wrote several novels. Bimal Mitra was equally adept in writing in Bengali as well as in Hindi, and has more than one hundred novels and short stories to his credit. Many of Bimal Mitra's novels have been made into successful films. One of his most popular works, Shaheb Bibi Golam (January 1953) which was adapted into a hugely popular movie
ঘোরের ভিতর ছিলাম । একটা ক্লাসিক বই থ্রিলার বইয়ের মতো করে টেনে টেনে পড়ব ভাবিনি। বিভিন্ন বইয়ে ১৯২৯ সালে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মন্দার কথা পড়েছি আর পড়াশোনার সুবাদে জানতে পারলাম আরও অনেক কিছুই, সেই সময়টার নাম দেয়া হয়েছে গ্রেট ডিপ্রেশন। কিন্তু পড়ার বইয়ের রসকস জিনিসগুলো যখন গল্পের বইয়ের পাতায় পাতায় উঠে এসেছে জীবন্ত হয়ে। শুরু থেকেই ভাল লেগেছে দীপঙ্কর চরিত্রটি... দীপঙ্করের প্রশ্নগুলো যেন আমারও প্রশ্ন। কড়ি দিয়ে কি আসলেই সব কেনা যায়? এই বইয়ের রিভিউ কিংবা পাঠপ্রতিক্রিয়া লেখা আমার কম্ম না। পড়ার পর একটাই ফিলিংস- না পড়লে আসলেই অনেক বড় একটা জিনিস মিস করে ফেলতাম... এক জীবনে পড়ার মতো আরও কত্ত কি যে আছে!
কড়ি দিয়ে কিনলাম' তো আর শুধুই তেরোশো পৃষ্ঠার একটা উপন্যাস না, যে পড়া শেষ করলাম আর রিভিউ লিখে ফেললাম! দীপঙ্কর কি শুধুই লেখকের কল্পনায় সাদা কালো অক্ষরে আঁকা একটা চরিত্র? তাই কখনও হয়! তারচেয়ে বরং গল্প শোনাই............... কালিঘাটের এক অখ্যাত গলি, সাতটা-পাঁচটা অফিস করার পর যেখানকার মধ্যবিত্ত মানুষগুলোর বিনোদন বলতে একসাথে চালের দর থেকে চার্চিলের পিটিশন পর্যন্ত উদ্ধার করা। উঠতি বয়সের ছেলেগুলো পাড়ার রকে ঝড় ওঠায়। বাচ্চারা স্কুলের পর সারাদিন ঘুড়ি ওড়ায়, হাতে পয়সা পেলে তেলেভাজার দোকানে ধর্না দেয়। গিন্নীরা সংসার ঠেলে ক্লান্ত চোখে ছেলের ফরেন স্কলারশিপ আর মেয়েদের ভাল বিয়ের স্বপ্ন দেখে। আবার এই ঈশ্বর গাঙ্গুলী লেনেই অঘরদাদুরা টাকার পাহাড় জমায়। দেবতার নৈবেদ্য চুরি করে বদ্ধ ঘরে পঁচায়। যখন তখন হুঙ্কার করে ওঠে; কড়ি দিয়ে সব কেনা রে হতভাগা, সব পাওয়া যায়! মায়ের রান্নাঘরের রোয়াকে বসে ক্লাসের বইতে মুখ গুজে হতভাগা ভাবে, কড়ি দিয়ে কি বাবাকেও ফিরে পাওয়া যায়? কিরণের দুঃখ ভোলানো যায়? ও আচ্ছা! এই হতভাগা হচ্ছে দীপঙ্কর।দীপুর মা অঘরদাদুর বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন, হতচ্ছাড়া বলে ডাকলেও বৃদ্ধ দীপুকে অনেক স্নেহ করতেন। নতুন ভাড়াটে আসার পর যেদিন প্রথম ঘুঙুরের আওয়াজ পেয়েছিল, যেদিন লক্ষীদি দাতারবাবুর সাথে পালালো, তেত্রিশ টাকা ঘুষে সে রেলের কেরানি হয়ে বসল, মিস মাইকেল খুন হলেন, গাঙ্গুলী বাবু ওয়েটিং রুমে গলায় ফাঁস নিলেন, যেদিন মা মারা গেল, রেল অফিসের সবচেয়ে বড় পদে অধিষ্ঠিত হয়ে দীপঙ্কর থেকে সে সেন বাবু হয়ে গেল....... সেসব দিনে এই অঘোর দাদুর কথাই দীপঙ্করের বারবার মনে পড়েছে। এমনকী প্রিয়নাথ মল্লিক রোডের বাড়িতে সতীর কথা ভেবে সনাতনবাবু বা নয়নরঞ্জিনী দাসীর মুখোমুখি হতে গিয়েও মনে একই প্রশ্ন এসেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজারে, যখন দোকানে তেল নেই, চালের জন্য দীর্ঘ লাইন, বাতাসে মানুষের হাহাকার, তখন গড়িয়াহাট রেল ক্রসিং এ লক্ষীদির বাড়িতে চায়ে চিনি কম হলেও চাকরের চাকরি যায়! সুধাংশুবাবুর হুইস্কিতে ভেজাল হলে পুরো কলকাতায় হুলুস্থুলু বেঁধে যায়! কোর্টের ফ্ল্যাটে মিনিটে মিনিটে লাখ টাকার হাতবদল হয়! এককালের টপগুণ্ডা ছিটে আর ফোঁটা কংগ্রেসের মেম্বার হয়ে টন কে টন চাল মজুত করে। নির্মল পালিতরা সরোজিনি নাইড়ু থেকে শুরুকরে সকলের টাকা আত্মসাৎ করে! তখনও দীপঙ্কর সেই পুরোনো প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজে। কড়ি দিয়ে কি কেনা যায় আসলে? এত ভালো ঘরে বিয়ে হয়েও তো সতী ভালবাসা পায়নি! এত ক্ষমতা থাকার পরও তো এতটুকু সুখ পায়নি লক্ষীদি! মিস্টার ঘোষলরা কেন অসৎ হয়, এত থাকার পরও হোসেন ভাই বা নির্মল পালিতরা আরো চায়! দীপু জীবনভর খুঁজেও এসব প্রশ্নের উত্তর পায়নি। শত কাজ আর দায়িত্বের মাঝেও সতীর জন্য, সাথে কিরণের মায়ের জন্য, ক্ষীরোদা আর সন্তোষ কাকাদের জন্য, রেলের ক্লার্ক থেকে শুরুকরে কারাগারে বন্দী মহাত্মা গান্ধী বা সুভাষ বোসের জন্য, নিজের কেউ নয় এমন অনেকের জন্য ভেবেও যে মানুষের দিন কাটতে পারে, কড়ি দিয়ে কিনলাম পড়ার সময় তা শুধু আপনিই বুঝবেন।বাকিরা তো কলকাতার ব্ল্যাকআউট এর অন্ধকারে নিজের বর্তমান আর ভবিষ্যতের চিন্তায় মগ্ন। খুব খাপছাড়া গল্প তাই না? এই খাপছাড়া আবেগগুলোকে একসুতোয় বাঁধতে হলে বইটাতে একবার ডুব দিতে হবে! সতীর জন্য কাঁদতে হবে, লক্ষীদির জন্য করুণা করতে হবে, সনাতন বাবুকে শ্রদ্ধা আর মি. ঘোষালকে ঘৃণা করতে। দীপঙ্করকে ভালোবাসতে হবে, খুব ভালোবাসতে হবে। দীপঙ্করের সাথে ঘুরে ঘুরে 'মানুষ' খুঁজতে হবে।
"কিন্তু বড় হবার পর দীপঙ্করের মনে হয়েছিল নদী নয়-যেন আকাশ।মানুষ জীবনটা যেন আকাশ।যে আকাশ ফ্রেমে আঁটা জানালার ভিতর দিয়ে দেখা যায়, সে আকাশ নয়।যে আকাশ সঙ্কীর্ণ সংসারের ফুটো দিয়ে দেখা যায়, সে আকাশও নয়। সেই আকাশ -যেখানে দিকচক্রবালের শেষ সীমারেখাটা পর্যন্ত ভাস্বর,যেখানে দিনের বেলা সূর্য উঠলে উজ্জ্বল হয়, সুস্পষ্ট হয়,আবার রাত্রি হলে রহস্যের হাতছানি রোমাঞ্চিত হয়ে উঠে।মানুষের সেই আকাশে ..................।।"
কিছু কিছু উপন্যাস আছে ,যেগুলো ভাবায়,অন্যভাবে বলতে ভাবতে বাধ্য করে।বিমল মিত্রের 'কড়ি দিয়ে কিনলাম' ঠিক এরকম একটি উপন্যাস। অবশ্য শুধু উপন্যাস বললে ভুল হবে,বলা যায় এপিকধর্মী উপন্যাস।উপন্যাসের সময়কাল বিংশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত,বড় অস্থির সময়ের গল্প।তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে,পৃথিবিতে চলছে ট্রেড ডিপ্রেশন। এই রকম সময়ে দীপঙ্করের বেড়ে উঠা ঈশ্বরপুকুর লেনের অঘোরদাদুর বাসায়।একদম শূণ্য থেকে শুরু করে শিখরে উঠার গল্প দীপঙ্করের,যে সারাজীবন খুজে গিয়েছে একটি প্রশ্নের উত্তর "কড়ি দিয়ে কি সব কেনা যায়?"
ঈশ্বরপুকুর লেনের দীপঙ্করের নিস্তরঙ্গ জীবনে ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটে দুই নারীর- লক্ষীদি ও সতির।বলতে গেলে তাদের প্রভাবে দীপঙ্করের জীবনের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে যায়। নিজের জীবন, ক্যারিয়ার বিপন্ন করে সতীর জন্য।শত অপমান সত্ত্বেও ফিরে যায় সতীর কাছে। কিন্তু কিসের টানে? শুধু কি বন্ধুত্ব? নাকি অন্যকিছু?রেলের অনেক উচু কর্মকর্তা হয়েও দীপঙ্করের জীবনে এত দুঃখ কেন? কেন সে অন্য সবার মতো হতে পারে না? - এর উত্তর জানতে হলে, পড়তে হবে তেরশ পৃষ্ঠার এই বিশাল উপন্যাসটি।
কড়ি দিয়ে কিনলাম উপন্যাসটিতে আসলে গল্প বা প্লট মূখ্য নয়,গল্পের বিচারে খুব সাধারন মানের উপন্যাস, যেখানে দীপঙ্কর সর্বংসহা হয়ে সব সহ্য করে গিয়েছে, অনেক সময় সতীর জন্য নিজের কর্তব্য পর্যন্ত ঠিকভাবে করতে পারে নি,আর সতী নিজের প্রতিশোধ তুলতে সবাইকে ব্যবহার করেছে, সর্বগ্রাসীর ন্যায় সবাইকে বিদ্ধস্ত করেছে।শেষে নিজের জীবন দিয়ে তাকে এর মূল্য দিতে হয়েছে।কিন্তু উপন্যাসটির অসাধারনত্ব অন্যখানে, সেটা হল জীবনকে অন্য চোখে দেখা,দীপঙ্কর যেন এক ব্যর্থ মানুষের প্রতিমুর্তি ,যারা জীবনের যাতাকলে নিজেকেই হারিয়ে ফে��ে।আসলে দীপঙ্কর কারা?আমরাই দীপঙ্কর, কড়ির পিছনে ছুটতে ছুটতে নিজেকেই হারিয়ে ফেলি একসময়।যখন বুঝতে পারি,তখন আর ফেরার উপায় থাকে না।দীপঙ্ক��� তবুও তার প্রশ্নের উত্তর পেয়েছিল- কড়ি দিয়ে শুধু মৃত্যুকেই কেনা যায়-আত্মার মৃত্যু,বিবেকের মৃত্যু ঘটে এই কড়ি বা টাকার কাছে। আমরা সকলে কি এই প্রশ্নের উত্তর খুজতে যাই? বা উত্তর খুজে পাই?
প্রাক স্বাধীন ভারতের প্রেক্ষাপটে রচিত দুইখন্ডের এই বিশাল উপন্যাস। প্রধান চরিত্র দীপঙ্করের বাল্যকাল থেকে মধ্যযৌবন পর্যন্ত ব্যাপ্ত এই উপন্যাসের বিভিন্ন দিক লেখক দীপঙ্করের মাধ্যমেই তার পাঠকদের দেখিয়েছেন। ছিলো না বাহুল্য কোন চরিত্রের উপস্থিতি, কাহিনীর প্রয়োজনেই এসেছে প্রতিটি চরিত্র, আর প্রতিটি চরিত্রকেই বিশ্লেষন করা হয়েছে গভীরভাবে।
দীর্ঘ উপন্যাস বলেই হয়তো কিছু কিছু জায়গায় একি ঘটনার উল্লেখ দু'বার, তিনবার এমনকি চারবার পর্যন্ত করা হয়েছে। এইটুকু বাদ দিলে নিঃসন্দেহে এটা বিমল মিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।
প্রিয় দীপঙ্কর, ভালো আছ? জানো আমারো না তোমার মত ট্রেনের সামনে এসে সবকিছু ভুলে যাবার রোগ হয়। দূর থেকে ট্রেন আসে-মাঝে মাঝে দোকানের আলোর সাথে ট্রেনের আলো মিলে যায়। মনে হয় ওই ট্রেন আসছে। ট্রেন কখন আসে কিভাবে বুঝা যায় জান? লাইনের সাথে সাথে আলোর ছায়া যখন এগিয়ে আসে, তারপরে পায়ে কাপুনি পাওয়া যায়, তারপরে হুইসেলের শব্দ। ছিঃ ছিঃ কাকে কি বলছি। তুমি কত বছর রেলওয়েতে কাজ করেছ, আর তোমাকে বলছি এই কথা।
আমারো তোমার মত মনে হয়-কেন এত পড়াশুনা, এত ডিগ্রী, প্রাননাথবাবুর ক্লাস। সবকি সেই গাদা গাদা ফাইলের স্তুপের পিছে-উইপোকার খাদ্য হবার জন্য। তুমি তাও কত নিঃস্বার্থ তা কি জানো? বলতো লক্ষীদী, সতী তোমার কে? কেউ না। জোর তোমার পাশের বাড়ীর প্রতিবেশী। আমি তো আমার উপরে কে থাকে তাই বলতে পারিনা। আর পাশের বাড়ী তো দুরের কথা। পাশের বাড়ীতে বিয়ে হয়-বিয়ের খাবারের গন্ধে টিকা দায়, গানের চোটে ঘুমানো সায়-তাও যদি বর কনের নাম জানতাম। আর তুমি কিনা সেই লক্ষীদী, সেই সতী এর জন্য এত চিন্তা কর।কোন মেয়ে বিপদে আপদে হাত ধরলেও তো আমার বুক কেপে উঠে, আর যখন সিআইডি কাকাবাবুর রোষে জনগন থেকে তুমি সতীকে বাচালে-তোমার বুক কাপেনি,সতীকে বুকে জড়িয়ে আড়াল করতে? সতীকে তুমি ভালোবাসনি? সতী তোমাকে কেন সেদিন চড় মেরেছিল জান? তোমার বদলে আমি হলে কবেই প্রেমে পড়তে চাইতাম। কিন্তু পড়তে পারতাম নারে পাগলা। বামুন হয়ে চাঁদকে সিনেমাতেই ছোয়া যায়। কড়ি দিয়ে কি সতীর জুতা মাথার অপমান রক্ষা করা যায়? যায় না
কড়ি তো সবারই হয় রে। কেউ কড়ি দিয়ে বাড়ী গাড়ি কিনে, আর কেউ কড়ি দিয়ে অঘোরদাদুর মত মরার আগেই সিন্দুক ভাঙ্গার মত জীবন দিয়ে যায়। আর তুমি কড়ি দিয়ে কী কিনতে চেয়েছিল? কিরণের মত বন্ধুকে ফিরে পেতে চেয়েছিলে? জীবনের একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলে? লেখকের মত মরার ঘন্টা বাজিয়ে বলতে ইচ্ছে করে-সে সব পরের কথা। ভাগ্যিস কেউ আমায় আগে থেকেই বলেনি-ওরে বাছা তোর মরণ তো ওই আমড়া গাছের নিচে। সে সব কথা পরে হবে। ইতি তোমার পাঠক।
বিংশ শতাব্দীর গ্রেট ডিপ্রেশন তথা অর্থনৈতিক মন্দার যুগে বাঙালির আর্থসামাজিক অবস্থা ও সংসার-আদর্শের দ্বন্দ্বে মনুষ্যত্ববোধের পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রচিত সুবৃহৎ উপন্যাস কড়ি দিয়ে কিনলাম । অধিবক্তা দীপঙ্করের দৃষ্টিতে সমগ্র কাহিনীর রসভাষ্য যেখানে দীপঙ্কর তার সমগ্র জীবন ‘মানুষ’ এর সন্ধান করে — যার মাঝে নেই অর্থ ও ক্ষমতার লিপ্সা, বরং সহমর্মিতা, আত্মবিস্তৃত তীব্র আদর্শবোধ, ন্যায়পরায়ণতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা বিদ্যমান। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে, পারিপার্শ্বিক অবস্থা প্রত্যক্ষ করে দীপঙ্কর একসময় কড়ি দিয়ে সুখ ক্রয় করতে চায়। কিন্তু সতীর মৃত্যু তার আজীবনের প্রশ্ন ও নঞর্থক মতবাদের জবাব দেয় যে – কড়ি দিয়ে জীবনের সুখ-শান্তি কেনা অসম্ভব।
বিমল মিত্র কর্তৃক রচিত এ উপন্যাস যেমন পাঠকবৃন্দকে মোহাচ্ছন্ন করতে সক্ষম, তেমনই বসুধৈবকুটুম্বক উদার-মানস গঠনে ভূমিকা রাখবে।
এই এতবড় বাস্তবতার কোন রিভিউ আমার দ্বারা হবে না। এই বইটা আমি আমার করে রেখে দেব।
ভাবছেন পাগল হয়ে গেছি? মানুষ শিশু থেকে কিশোর হয়, শরীর ও মনে, বোধবুদ্ধিতে বিরাট একটা পরিবর্তন আসে, তাকে কি কোন কিশোর ব্যাখ্যা করতে পারে? কৈশোর থেকে সে যখন যৌবনের নির্মম সংগ্রামের পথে নামে, মায়ের আচঁল ছেড়ে, বন্ধু বান্ধবের হাত ছেড়ে পথের রুক্ষতায়, কদর্যতা ও মহত্ত্বের মধ্যে নামে, তখন তার কেমন ফিল হয়, তা কি লেখা যায়? আবার যখন পুরুষ হয়ে ওঠে, তার কেমন লাগে, বলতে পারবেন? কিংবা জীবন সায়াহ্নে?
না, পারবেন না। প্রতিটা মানুষের ভাষা, অনুভব আলাদা। প্রতিটা মানুষ আসলে একটা জীবন্ত মহাকাব্য। এই বইটা সেই মহাকাব্যিক অনুভবই দিয়ে গেল আমাকে।
পৃথিবীর সাতশ কোটি মানুষের ভেতরের ও বাইরের খবরই জানি আমরা? না। কাছের মানুষগুলির ভেতরটাই পড়তে পারি না মাঝে মাঝে। কে জানে কার মনে কি আছে!
দীপঙ্কর সেন আসলে একটা চরিত্র, তার উন্মেষ হচ্ছে। শিশু থেকে কিশোর, কিশোর থেকে যুবক, যুবক থেকে পুরুষ। প্রতিপদে ঘা খেতে হচ্ছে, আবার আদরও যে পাচ্ছে না, তা নয়। কিন্তু ঘা সে কেন খাচ্ছে? কেনই বা আদর পাচ্ছে? কেনই বা মায়ের কোল থেকে, পবিত্রতার থেকে পতন হয় তার, তার বন্ধু কিরণের, পাশের বাসার লক্ষ্মীদির, সতীর? টাকা, সম্মান, দারিদ্র্য, সংগ্রাম এসব আসলে কিসের জন্য?
১৯৩০ এর গ্রেট ডিপ্রেশন তখন তুঙ্গে। এদিকে যুদ্ধ লাগবে লাগবে ভাব। সবমিলিয়ে টাকা নেই, চাকরি নেই- সেই নেইয়ের ধাক্কা এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। একদিকে টাকা নেই, আবার স্বদেশী আন্দোলনও তো হচ্ছে। সেসময়ের জনজীবনের, অফিস পাড়ার এক অমলিন চিত্র পাই আমরা কড়ি দিয়ে কিনলাম বইটাতে। মনুষ্যত্ব এর উত্থান-পতনের এক বাস্তবচিত্র।
টাকাই কি সব? তাহলে যে অঘোরদাদু টাকা বলতে পাগল, সে কেন দীপুর মাকে থাকতে দিল, কি স্বার্থ? কেনই বা প্রাণমথবাবু দীপুর পড়ার খরচ দিলেন? কেনই বা লক্ষ্মীদি অত বিলাস ব্যাসন ছেড়ে এক কর্পদকশূন্য যুবকের সাথে এক কাপড়ে চলে গেল? আর টাকাই যদি সব হয়, তবে সতী কেন বড় বাড়িতে গিয়ে সুখ পেল না?
কেনই বা ৩৩ টাকা ঘুষ দিয়ে চাকরিতে ঢুকতে হয়, সেই একটা চেয়ারের কত দাম! এই চাকরিতে যে নিত্য কথা শুনতে হয়, মনুষ্যত্ব থাকে না, তাও কত লোক ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা চাকরির জন্য! যারা চাকরি পেয়েছ, পদোন্নতির জন্য তা���ের কত কাহিনী! কি হয় এসব করে!
সব মানুষ তার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিসে সুখ? টাকা, সামাজিক মর্যাদাই কি সব? সুখ জিনিসটাই বা কি! চাইলেই কি সুখে থাকা যায়? আর টাকাই কি চাইলে পাওয়া যায়?
কারো জীবনের হিসাব আসলে মেলে না। মিলিয়ে নিতে হয়। যে যার মত মিলিয়ে নেয়। অনেক চোখের জলের পথ বেয়ে, হাসি আর সুখের মধ্যে দিয়ে, নানা প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির মধ্যে দিয়ে।
আমার বয়স এখন ২৭। আমি হয়ত যু���কই রয়ে গেছি, পুরোপুরি পুরুষ হতে পারিনি। তবে এই বইটা হয়ত ওই পুরুষত্বের প্রারম্ভেই পড়লাম। ধন্যবাদ, বিমল মিত্র। আপনি একটা রাস্তা দেখিয়ে দিলেন, মনকে শক্ত করে দিলেন। দীপুর মত আমি আর ডিস্ট্র্যাকটেড হব না। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।
অনেকে দেখলাম দীপঙ্করকে গালি দিচ্ছে। লেখক আসলে দীপঙ্করকে উপলক্ষ করে মানুষের চরিত্রকে তার উত্থান-পতনকে দেখতে চেয়েছিলেন হয়ত। এজন্যই দীপঙ্করকে কোন শক্ত মতামতই দিতে দেননি। He is nobody, জাস্ট একটা আয়না, যাতে সেসময়ের ছায়া পড়েছে।
বি.দ্র: বইটার ভাষা একটু নীরস, কিন্তু বইটার বাস্তবতা আপনাকে ঘোর লাগাতে বাধ্য।
কড়ি দিয়ে কিনলাম দুই খন্ডে রচিত এক দীর্ঘ উপন্যাস । এটা প্রথম খন্ডের আলোচনা। উপন্যাসের নায়ক দীপু সর্বদাই ভাবুক প্রকৃতির, হীনমন্যতায় ভোগা এক চরিত্র যে মায়ের একমাত্র অবলম্বন। তার এই হীনমন্যতার কারন ঘুষ দিয়ে কোম্পানির অধীনে চাকরি করে অর্থের উপায় করা।কারন এটি তার কাছে স্বদেশ বিরোধী কাজ।নিজের মার পা ছোয়া প্রতিজ্ঞা রাখতে গিয়ে দেশ মাতার প্রতি অবজ্ঞা তাকে মোটা অঙ্কের বেতন পেলেও মনে স্বস্তি দিতে পারেনি। প্রথম খন্ডে পরিচিত হই অনেক গুলো চরিত্রের সাথেই যাদের মধ্যে আঘরদাদু সর্বপ্রথম কড়ির মাহাত্যের কথা বলেন।বলেন,"কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়, সব হয় কড়ি থাকলেই।"কিন্তু আসলেই কি তাই? তাই যদি হত তাহলে সতীর এত কষ্ট কেন? আর তাই যদি না হয় কেনই বা লক্ষ্মীর এত দুর্দশা? পর হয়েও মানুষ কিভাবে আপন জনায় পরিনত হয় আর আপন হয়ে যায় অনেক দূরের কেউ! এখানেই শুরু হয় কড়ির খেলা।
বইটা পড়তে গিয়ে রাগও হচ্ছিল, কষ্ট ও হচ্ছিল। আবার ভাবছিলাম রাগ করে কি করব? এটাই তো বাস্তবতা। এটাই তো হয়ে আসছে। সেই ১৯৩৯ সালেও হয়েছে এই ২০১৯ সালেও হচ্ছে। সব চেয়ে বিরক্ত লেগেছে গল্পের নায়ক দীপঙ্কর কে। ৫ এ ৫ দিতাম, শুধু ওর জন্যই দিলাম না। কিছু কিছু জায়গায় পড়া থামিয়ে বসে ছিলাম। এত টানাপোড়েন, মানুষের নির্দয়তা আর ভাল লাগছিল না। তাও বই রেখে উঠা সম্ভব ছিল না। কড়ি দিয়ে যে সব কিছু কেনা যায় তাও যেমন ফুটে উঠেছে এই বইয়ে, তেমন কিছু কিছু জিনিস যেমন সুখশান্তি কেনা যায় না তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটা অবশ্য পাঠ্য বই
বিমল সাহেব সবথেকে দারুন যে স্কিল টা দেখিয়েছেন তাহলো- আমার মনে হইসে আমার সামনে বসে কেউ একজন কথা বলছে। আমি তন্ময় হয়ে শুনে যাচ্ছি।
তবে এতে যে ঝামেলাটা হয়েছে, একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি, বারংবার বর্ণনা। কেটে ঝেটে আরো ঝরঝরা করা হয়নি বলে মনে হয়েছে।
যাপিত সমাজ নিয়ে ক্ষোভ কি না জানিনা। শেষের দিকে এসে সমাজের চরিত্রগুলোর কাজকর্ম অতি নাটকীয় কি না জানি না। লেখক যে সময়ের সমাজের বউ-শ্বাশুড়ীর কথা বলেছেন, সেটা আসলে ধারণা করে নিতে হবে। অতি রঞ্জিত কি না বলা সম্ভব না।
আশাপূর্ণা দেবীর প্রথম প্রতিশ্রুতি আর তারবাদে এই এইটা, দুটো বইতে আমি বিংশ শতাব্দীর পারিবারিক মানসিক নির্যাতনের একই রকম গল্প শুনেছি।
সময়টা খুব অস্থির ছিলো? নাকি এখন আমরা অস্থির? টাকা কড়ি দিয়ে কি আমরা অস্থিরতা কিনছি?
দীপঙ্করের যাপিত জীবনের অলিগুলিতে লেখক ঘুড়ে বেড়িয়েছেন উত্তরগুলোর খোঁজে। যার সমাপ্তি, কখনোই সুখকর হতে পারে নাহ।
দীপঙ্কর যেন আমার মত অনেকেরই সত্তার প্রতিফলন। প্রায় ৯০ বছর আগের যেই চিন্তা ভাবনা, বিবেক এবং মানুষের ভালো করার নেশা সেটা আজও বহমান আমাদের মত অনেকেরই মধ্যে। কেবল ভালো চাওয়ার মধ্যে যে কত কষ্ট, বঞ্চনা তা লেখক চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। একি সাথে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের যেই উঠে আসা, কারো অতীত চাপা পড়ে কারো ফ্ল্যাশ করে, সবাই যে দিনশেষে টাকার পিছনে ছোটে এবং যে সেই পথে যেতে চায়না সেই যেন আসামি এক ব্যক্তি হয়ে দাঁড়ায়, এই ডিলেমা তো আজও আমাদের মত দেশে চাকরির পিছনে ছুটে চলা মানুষের জন্য খুব সত্যি। আজও। এই ২০২৪ সালেও, দীপঙ্কর হওয়া যেন ভুল। মনুষত্ব থাকা অপরাধ।
জীবনের প্রাপ্তি ও প্রাপ্তি নিয়ে মানুষ বেচে থাকে। সুখ কি? সুখের জন্য সব কিছুই করা যায়। সবাই সুখ খুজে ফেরে। সুখ কিসের ভেতর নিহিত, সবাই কি শুধু সুখ খুজে পায়। নাকি সুখের কোন অর্থ নেই, সবই মানুষের ভ্রম। পৃথিবীতে সুখের শেষ কোথায়, সুখের আসল সংজ্ঞা কি। আজও কি কেউ সেই সুখের দেখা পেয়েছে। নাকি সব কিছুই মানুষের আত্মতৃপ্ত হবার স্বান্তনা মাত্র। সুখ কিসে পাওয়া যায়? টাকা কড়ি, ধন সম্পদ, এসবের মধ্যেই কি সুখ আছে। টাকা বা কড়ি দিয়ে কি সব কিছু কেনা যায়। সত্যি কি কড়ি দিয়ে সুখ কেনা যায়। . দীপু, পুরো নাম দীপঙ্কর সেন। দীপুর বাবা ছোট থাকতেই এক জমি জমার বিরোধে মারা যান, বলা যায় তাকে হত্যা করা হয়। ছোট্ট দীপুকে নিয়ে তার মা চলে আসে একের বি ঈশ্বর গাঙ্গুলী লেন এর অঘোর দাদুর বাড়িতে। সেখানেই সে বড় হয়। তার মা এই বাড়িতে ও বাড়িতে কাজ করে তাকে বড় করেছে। পরের বাড়িতে থাকার জ্বালা অভাব দীপু ছোট সময়েই দেখতে পেয়েছে। তবে অঘোর দাদু দীপুকে পছন্দ করত, আর বলত কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়। দীপু তখন বুঝত না। . সেই বাড়িতেই ভাড়াটিয়া হিসেবে আগমণ ঘটে লক্ষ্মীদি, সতী ও তার কাকা-কাকীর। এখান থেকেই দীপুর জীবনের অনেক পরিবর্তন আসা শুরু হয়। যেন নিয়তিও চেয়ে ছিল এভাবেই জীবনের পরিবর্তন আসুক। দীপুর জীবনের মোড় ঘুরে যায় এক নিমিষে। এই দুই নারীর প্রভাব যেন দীপুর জীবনকে এলোমেলো করে দেয়। যেন সে আর তার নিয়ন্ত্রণে নেই। তাকেই তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। . দীপু শুধু জানত তাকে বড় হতে হবে। তার মায়ের কষ্ট দূর করতে হবে। তাকে চাকরি করতে হবে। নিজের পায়ে দাড়াতে হবে। টাকা রোজগার করতে হবে। তবেই না কড়ি দিয়ে সুখ কিনতে পারবে। সত্যি কি সে সুখ কিনতে পারবে। লক্ষ্মীদি, সতী, অঘোর দাদু, সবারই তো টাকা রয়েছে, তারা কি সুখি হতে পেরেছে। তারা কি কড়ি দিয়ে সুখ কিনতে পেরেছে। কড়ি দিয়ে কি আসলেই সব কেনা যায়। . উপন্যাসের অন্যতম দিক হচ্ছে মানুষের ভাবনা জগৎ কে নাড়িয়ে দেয়া। কিছু কিছু উপন্যাসের বেলায় এটা বলা কঠিন যে জীবন কি উপন্যাস থেকে নেয়া নাকি উপন্যাসই জীবনের চিত্র তুলে ধরেছে। ঠিক এমন একটি উপন্যাস হচ্ছে বিমল মিত্র এর “কড়ি দিয়ে কিনলাম”। শুধু উপন্যাস বললে ভুল হবে। এটি আসলে এপিক ধর্মী একটি উপন্যাস। উপন্যাসের সময়কাল বিংশ শতকের শুরু থেকে মাঝামাঝি পর্যন্ত,বড় অস্থির সময়ের গল্প।তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে,পৃথিবিতে চলছে ট্রেড ডিপ্রেশন। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র দীপঙ্কর সেন এর শুন্য থেকে শিখরে ওঠার চিত্র লেখক এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন। যেখানে তিনি দীপুর আসে পাশের সকল কিছুকে তার জীবনের প্রভাবক হিসেবে দেখিয়েছেন। কিভাবে তার জীবনের পরিবর্তন এসেছে। . শুধু মাত্র যে দীপু চরিত্র মুখ্য তা নয়। তার সাথে আরও অনেক চরিত্র এই উ��ন্যাসের মুখ্য বলেই বলা যায়। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যাদের বিচরণ রয়েছে। তাছাড়া উপন্যাসটিতে লেখক সুন্দর ভাবে তুলে এনেছেন সেই সময়ের ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা। স্বদেশী দের সাথে ব্রিটিশ দের বিরোধ। . এই উপন্যাসটি একটি বিশাল কলবরে লেখা হয়েছে। তাই একে দুটি খন্ডে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম খন্ডের শেষ অনুযায়ী বই এখানেই শেষ নয়। আরও বাকি রয়েছে। তবে প্রথম খন্ড অনুযায়ী যদি বলি তবে বলতে হয় যে চরিত্র গুলোর বর্ণনা বেশ গঠণ মুলক হলেও অনেক বেশি আবেগী ও বিস্তার। যদিও এই উপন্যাসটি পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সেজন্যই হয়ত এভাবে লেখা হয়েছে। . আবার দীপুর যে চিত্র আমরা দেখতে পাই সেটাকে আসলে কিভাবে বর্ণনা করা যায় তা বলা মুশকিল। গল্পের মুখ্য চরিত্রই বেশ দুর্বল, যেন তার কোন শক্তি নেই। সে নির্জীব একজন মানুষ। অতি আবেগী বা অতি মাত্রায় চিন্তাশীল, হলেও তার কর্মকান্ড বেশ সাধারণ। যদিও লেখক এটা ভাল জানেন। তবে দ্বিতীয় খন্ড পড়ার পর হয়ত পূর্ন কিছু বলা সম্ভব।
বিমল মিত্র একজন ভারতীয় বাঙালি লেখক। তিনি বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষায় সাহিত্য রচনা করেছেন। কর্মজীবনে তিনি রেলে চাকুরি করতেন। এরপর রেলের চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সাহিত্যসৃষ্টিতে আত্মনিয়োগ করেন।
তাঁর প্রথম উপন্যাস 'চাই'। প্রায় পাঁচশোটি গল্প ও শতাধিক উপন্যাস লেখেন বিমল মিত্র।
তাঁর 'কড়ি দিয়ে কিনলাম' গ্রন্থের জন্য ১৯৬৪ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। এছাড়াও বহু পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। তাঁর রচনা ভারতের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে রূপায়িত হয়েছে। শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার হিসাবে তিনি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কার লাভ করেন।
লেখক বিমল মিত্রের "কড়ি দিয়ে কিনলাম" "সাহেব বিবি গোলাম" "একক দশক শতক" এই তিনটি উপন্যাস কে ট্রিলজি বলা হয়ে থাকে। "কড়ি দিয়ে কিনলাম " দুই খন্ডে লেখা একটি উপন্যাস যা এই ট্রিলজির প্রথম উপন্যাস।
কড়িতে সব মেলে, কড়ি দিয়ে কেনা যায় সব কিন্তু আসলেই কি কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়? আমাদের চারিদিকে যত অভাব, যত যন্ত্রণা সব কিছুর মূলে আছে কড়ি।
দীপঙ্কর ডাক নাম দীপু। বিষয় সম্পত্তির জন্যই একদিন দীপঙ্করের বাবাকে হত্যা করা হয় ,তার মা তাকে নিয়ে পালিয়ে আসে অনেক কষ্টে উনিশের একের বি ঈশ্বর গাঙ্গুলী লেনে অঘোর দাদুর বাড়ীতে।দীপঙ্করের মা সেখানে রান্না র কাজ করে, দীপুকে মানুষ করার জন্য। অনেক টাকা কড়ির জন্য হত্যা করা হলো দীপুর বাবাকে আবার টাকার জন্যই দীপুর মাকে অন্যের বাড়ীতে কাজ করতে হয়। দীপুর কাছের বন্ধু কিরণ, টাকার কারনে বাবার চিকিৎসা করতে পারছে না। ছোট কিরণকে পৈতা বিক্রি করে সংসার চালাতে হয়। লক্ষ্মীদি, সতী এদেরও অনেক টাকা, দেখলে মনে হয় কি সুখী সুন্দর জীবন, আসলেই এরা সুখী?এরা কি টাকা দিয়ে কিনে নিতে পেরেছো সুখকে? অঘোর দাদু টাকাকর জন্য দেবতাদের ঠকায় এমন কি নিজের কাছের মানুষদের ঠকিয়ে টাকা জমায়। তাহলে কি টাকা থাকলেই সব সুখ সব স্বাচ্ছন্দ্য কিনে নেওয়া যায়?
সেখানে কারো অর্থ করি নাই, কারো অঢেল অর্থ করি। এরা কেউ কড়ির পেছনে ছুটেছে সবকিছু কেনার জন্য, কেউবা কড়ি থেকেও কিনতে পারেনি সব। আসলেই কি কড়ি দিয়ে সব কেনা যায়?
অনেকগুলো চরিত্র দিয়ে সাজানো অনেক কাহিনি এঁকেবেঁকে বহু পথ ঘুরে উপন্যাসের শেষের পথে হেঁটেছে।তাছারা উপন্যাস টিতে লেখক সুন্দর ভাবে তুলে এনেছেন সেই সময়ের ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা। স্বদেশী দের সাথে ব্রিটিশ দের বিরোধ।
১৯৭৫ সালে লেখক বিমল মিত্র " কড়ি দিয়ে কিনলাম " বইটার ত্রয়োদশ সংস্করণের ভূমিকা লেখেন। তাতে লেখক এই বইটা নিয়ে যতো প্রশংসা বা এর জনপ্রিয় তার কথাটা তুলে ধরেছেন। "দেশ" পত্রিকায় এ উপন্যাস টি ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল সেই সময়।
অবশ্যই পড়তে হবে, না পড়লে নয় এমন ১০০ বই এমন অনেক রকম বইয়ের লিস্টে এই বইটা প্রথম দিকে স্থান পেয়েছে। "কড়ি দিয়ে কিনলাম" অসাধারণ একটি উপন্যাস তাতে কোন দ্বিমত নাই। লেখকের লেখা, প্রকাশভঙ্গী, সাবলীলতা এসব দিক বিচারে অবশ্যই একটি ভালো উপন্যাস এটা। তবে কাহিনি র অতি বাড়াবাড়ি টা বড়ই চোখে লাগার মত। আমার মনে হয় তখন পত্রিকায় প্রকাশের জন্যই লেখক কাহিনি কে এমন টেনে একটু বেশী লম্বা করে ফেলেছেন। তাছাড়া কিছু চরিত্রের বাড়াবাড়ি রকমের গায়েপড়া যা খুব বিরক্তিকর। যেমন লক্ষ্মীদির প্রতি দীপুর আচরন। হয়তোবা চরিগুলোকে লেখক এভাবেই ফুটিয়ে তুলেছিলেন কাহিনির আলোকে। আমার মনে হয় লেখক চাইলেই কাহিনি টাকে আর ছোট করতে পারতেন আর কিছু চরিত্রকে আরও একটু বলিষ্ঠ করতে পারতেন।
অনেকের অনেক প্রিয় এই উপন্যাস টা নিয়ে নেগেটিভ কিছু লিখে ফেললাম আজ। আমার এতোটা সাহস নাই তবে আজ লেখক আমাদের মাঝে নাই তাই সাহস পেলাম।
হিন্দি সিরিয়ালের বুক ভার্সন। একই কথা বারবার তেনা পেঁচায়ে লিখে গেসে। লেখকের ধৈর্যের তারিফ দিতেই হবে কিভাবে এতো সময় নিয়ে এক কথাই ঘুরায় ফিরায় লিখতে পারছে।এটার মূল চরিত্র দীপঙ্কর আমার পড়া শ্রেষ্ঠ বিরক্তিকর চরিত্র । যারা ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায় তাদের উচিত এই চরিত্র থেকে মোটিভেশন নেয়া। খুব আশা নিয়ে বইটা শুরু করে রাগ, ক্ষোভ আর বিরক্তি নিয়ে এই বই শেষ করেছি৷ বইয়ের একটাই ভালো দিক, তৎকালীন কোলকাতার চরিত্র,চেহারা খুব ডিটেইলে ফুটে উঠেছে। ব্যস। আর কিছু নাই৷ যাদের খুব সময় আর আজাইরা ন্যাকামি ভালো লাগে তাদের জন্য মাস্ট রিড
বেশ কিছুদিন ধরেই মনোযোগ অনেকটা বিক্ষিপ্ত। একটানা কোনো বই পড়ে শেষ করতে পারি না। বিক্ষিপ্ততা কাটিয়ে ওঠার জন্য হাতে নিই ‘কড়ি দিয়ে কিনলাম’। প্রায় ১৪ শ পৃষ্ঠার বিশাল বই। বিমল মিত্রের লেখা। শুরুতে একটু দ্বিধায় ছিলাম শেষ করতে পারবো কিনা। তবুও ভাবলাম শুরু করি, দেখি কদ্দুর যেতে পারি। ধীরে ধীরে অবশেষে সমাপ্ত করলাম এই বিশাল উপন্যাস।
সেই কবে বিমল মিত্র লিখেছিল।আজ দেখি আজ দেখি আমার জীবনের সাথে মিলে যাচ্ছে।আমার আশপাশে সতী,দিপু,লক্ষীদি সবাই ঘিরে আছে।আমি এই উপন্যাস আসলে আমার সব স্মৃতি কে আবার ভাসিয়ে দিলো। আসলে সংসারে মানুষ গুলো এমন,তাদের ঘটনা, তাদের জীবন সব হাতে হাত দিয়ে দেখিয়ে দিবে।
এই প্রথম কোন এক চরিত্রকে সব দিক দিয়ে মনের মত পাওয়া গেলো! বই পড়তে গেলে সবসময় ভাবি এই চরিত্র টা এই কাজ টা এভাবে কেন করলো, ওভাবেও তো করতে পারতো! মানে চরিত্রগুলো কেনো যেন মনের মতো করে চলে না। কিন্তু এই প্রথমবার কোন চরিত্র নিয়ে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট আমি। দিপঙ্কর! এত ভালো লাগলো বই টা পড়ে, বলার মতো না।
এক কথায় বলা যায়, বইটা অসাধারণ। কিন্তু আশ্চর্য বইটার একটা চরিত্রের সাথে নিজকে মানিয়ে নিতে পারছি না। বইটা শেষ করার পর, ভালো আর খারাপ এই দুইটা শব্দ নিয়ে খুব দ্বিধাদ্বন্দে ভুগতেছি। অবশ্যই শেষটুকু পড়ার আগ পর্যন্ত দীপঙ্করের চরিত্রটা আমাকে আর্কষন করতো। মনে হতো, আমার নিজের ভেতরে একটা প্রতিচ্ছবি তৈরি করি।আমি জানি অনেক তফাৎ, তাও এক রকম কল্পনা করতে ভালো লাগতো।কিন্তু শেষটুকু পড়ার পর মনে হচ্ছে আর যাই হই দীপঙ্কর যেন না হই।
বাঙ্গালিপাঠক মাত্র হুমায়ূনের অন্ধভক্ত,আমিও ব্যতিক্রম নই,তার বেশ কিছু বইয়ে "কড়ি দিয়ে কিনলাম"এর উল্লেখ ছিল।তাই,না পড়ে থাকতে পারিনি।এত বড় উপন্যাস;পড়া শেষ করে শুধু এটাই মনে হয়েছে - না পড়া হলে কিছু বাকি থেকে যেত।কিছু বই সারাজীবন মনে থাকার মত,এটা তার মধ্যে একটা।দুই খন্ডের ঢাউস সাইজের উপন্যাস।
উপন্যাসটির প্রটাগনিস্ট দীপঙ্কর সেন।তার বাল্যকাল থেকে মধ্যযৌবন পর্যন্ত এর গন্ডী।উপন্যাসের অন্যান্য চরিত্র--অঘোরদাদু,কিরণ,সতী,লক্ষী,নির্মলপালিত,ছিটে,ফোঁটা,ঘোষাল সাহেব,উপন্যাসের কাঠামো রচনায় সব চরিত্রই গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে।বাল্যকালে দীপঙ্কর দেখে,তার অঘোরদাদুর মতে কড়ি মানে টাকা দিয়ে সব কেনা যায়।সতী আর লক্ষীদির সাথে বাল্যেই দীপঙ্করের পরিচয়। তেত্রিশ টাকা ঘুষ দিয়ে শূরু হয় দীপঙ্কর এর রেলের চাকরির জীবন।সতীর প্রতি দীপঙ্করের অপ্রকাশিত ভালোবাসা,সতী আর লক্ষীদির জীবনের ভালোমন্দ নিয়ে উৎকন্ঠা,ঘোষাল সাহেবেরমত ধূর্ত লোকেদের উত্থান,সুযোগসন্ধানী ছিটেফোটা,লোভী নির্মল পালিতের পাগল হয়ে যাওয়া--দীপঙ্করের চোখ দিয়ে অসাধারণ ভাবে লেখক দেখিয়েছেন। উপন্যাস এর প্রথম শুরু থেকে লেখক যে ছকে এগিয়েছেন তা প্রশংসনীয়।বিমল মিত্রের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং উল্লেখযোগ্য উপন্যাস এটি।
"মানুষের জীবনে ফেলে-আসা রাস্তায় ফিরে চলার মত দুর্ভোগ বুঝি আর কিছুই নেই .." এই প্রথম বিমল মিত্রের কোন বই পড়লাম। চমৎকার একটা বই! সাড়ে সাতশো পৃষ্ঠার একটা বইয়ে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আগ্রহ ধরে রাখা কঠিন ব্যাপার। তবুও ক্লান্তি আসেনি পড়তে গিয়ে।