'একানড়ে' আপাতদৃষ্টিতে হরর উপন্যাস হলেও আসলে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রয়াস, যা লোককথা, প্রবাদ ও লৌকিক দেবতাদের সম্বল করে আখ্যানের উপরিতল নির্মাণ করে, সেখানে জনপ্রিয় জঁরের দিকে বাড়ানো থাকে একটি হাত; অপর হাতের প্রণতি অবতলে গড়িয়ে যায় আবহমান বাংলার ভাষাশ্রমিকদের প্রতি ৷ জাদুবাস্তবতার বুননে পরাবাস্তবতার চুমকি মেশানো উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে এখানে উত্থান হয়েছে ইভিলের। সেই অশুভকে নির্মাণ করার মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে ভাষাকাঠামো, যার মাণিক্যময় জৌলুষের অভ্যন্তরে ঘাতক ছুরির মত সযত্নে হননবৃত্তান্ত লুকনো থাকে। এই আখ্যান দেখিয়ে দেয় ইভিল একটি দৈনন্দিন স্বত্ত্বা আপনি যখন স্বপ্নে বিভোর তখন নিঃশব্দে সেই ইভিল আপনার সর্বাংগ কুড়ে খেয়ে ফেলে।
"শেষ মৃত পাখি"র মাধ্যমে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের সাথে পরিচয়। এরপর "একানড়ে" পড়ে বুঝলাম শাক্যজিৎ লেখক হিসেবে বহুমাত্রিক ও মানবমনের অন্ধকার সব কোণে আলো ফেলতে সক্ষম। জনরা হিসেবে সাদা চোখে বইটি "হরর" কিন্তু লেখনীর গুণে তা হয়ে উঠেছে তার চেয়েও বেশিকিছু। গল্পটা খুব সরলরৈখিক। এ অন্ধকার, এ নরক, এ দুর্জ্ঞেয় রহস্য আমরা জীবনে প্রত্যক্ষ করেছি একটা সময় (করেছি কি?) কাহিনির সাথে মিল রেখে গল্পের ভাষা টানটান, ছায়াচ্ছন্ন ও হিমশীতল। যেতে যেতে গল্পটা এমন জায়গায় যেয়ে থামলো যা শেষ হওয়ার বহুক্ষণ পরেও তাড়া করে ফেরে মনকে। এ ভয়াল গল্পের কোথাও না কোথাও আমরা রয়ে গেছি; না চাইতেও।
এই দুনিয়ায় অনেক রকমের ভূতের হদিশ পাওয়া যায়। "একানড়ে" তেমনই একরকম ভূতের নাম। তালগাছের উপরে বাস করে এই ভূত। এই ভূতের একটা পা নেই। নিজের অবশিষ্ট একখানা পা ঝুলিয়ে সে বসে থাকে তালগাছের মগডালে। প্রচলিত গ্রাম্য শিশুতোষ ছড়া আছে :
যে ছেলেটা কাঁদে তাকে ঝুলির ভেতর ভরে গাছের উপর উঠে তুলে আছাড় মারে।
অর্থাৎ যারা দুষ্টু ছেলেমেয়ে, এই ভূত তাদের ধরে নিয়ে গিয়ে শাস্তি দ্যায়। ছোটো ছেলেমেয়েদের ঘুম পাড়ানো খুব কঠিন একটা কাজ। আগেকার দিনে এইরকম ভয়ানক সব ছড়া শুনিয়ে তাদের ঘুম পাড়ানো হতো!
কিছুদিন আগেই এই লেখকের গোয়েন্দা উপন্যাস "শেষ মৃত পাখি" পড়েছিলাম। আজকে দুপুরে গুডরিডসের সূত্রেই এই উপন্যাসটার সন্ধান পেলাম। কী মনে হলো, ইন্টারনেটে খুঁজে দেখলাম এবং পেয়েও গেলাম। ছোটো সাইজের উপন্যাস, তাই পড়া শুরু করে দিলাম।
লেখকের মৌলিক গদ্যভাষার খানিকটা পরিচয় "শেষ মৃত পাখি"-তে পেয়েছিলাম। কিন্তু "একানড়ে" উপন্যাসটির অসামান্য গদ্যশৈলী ইদানিংকার বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের কারো কলম থেকে বেরিয়েছে বলে আমার জানা নেই। চিত্রকল্প এবং রূপকের অনবদ্য ব্যবহারে, শব্দচয়ন এবং বাক্যের সযত্ন নির্মাণে, কাহিনিতে যুক্ত করেছেন হিমশীতল হিংস্র অনুভূতির আলাদা একটা প্রান্তর।
এরপর আসি গল্পের কথায়। "একানড়ে" অলৌকিক গল্প হয়েও ঠিক অলৌকিক গল্প নয়, আবার বাস্তবতার গণ্ডিতেও পুরোপুরি আটকে থাকেনি এই গল্পের প্লট। রিভিউয়ের শুরুতেই "একানড়ে" নামক ভূতের যে রেফারেন্স দিলাম, সেগুলো চমৎকার বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করেছেন লেখক। তার সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন শিশু-মনস্তত্ত্ব, অন্ধবিশ্বাস এবং ভুতুড়ে পরিবেশ-নির্মাণের মেধাবী কৌশল।
নয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা, তার মানসিক স্ট্রাগল, বড়োদের জগতের সঙ্গে তার নিজের জগতের টানাপোড়েন— এই সবকিছু মিলিয়ে মিশিয়ে লেখক এমন একটা কাহিনি ফেঁদেছেন, যেটা পড়তে গিয়ে আজকে এই উল্টোরথের দিনে, বৃষ্টি থৈ থৈ বিকেলবেলাটা, সন্ধেবেলাটা, রাত্রিবেলাটা— বেশ চমৎকার কাটলো।
বড়ো হয়ে যাওয়ার পরে আমরা এখন বেমালুম ভুলে গেছি : আমরা যখন বেশ ছোটো ছিলাম, আমাদের মনের ভিতরে লুকিয়ে ছিলো একটা সম্পূর্ণ গোপন রহস্যময় জগৎ। যে-জগৎটার হদিশ কেউ জানতো না। বড়োরা না, বন্ধুরা না, ভাইবোনেরা না, কেউ না। একটা রোমাঞ্চকর নিষিদ্ধ জগৎ।
জানতাম শুধু আমরা নিজেরা। আমাদের সেই জগৎটা কিন্তু মোটেও "ছোটোদের" জগৎ ছিলো না। "নিষ্পাপ" জগৎ ছিলো না। বিস্মৃত সেই রহস্যময় জগৎটার কথা আজকে খুব ক্ষীণভাবে আবার মনে পড়ে গ্যালো।
হাবিজাবি তন্ত্র মন্ত্র পিশাচ ভুজুংভাজুং থোড়-বড়ি-খাড়া আবর্জনায় ডুবে থাকা বাংলা সাহিত্যের আজকের এই মধ্যমেধাবী লেখকদের জমানায় এরকম বুদ্ধিদীপ্ত সুলিখিত অলৌকিক একখণ্ড আনন্দ দেওয়ার জন্যে— লেখককে কুর্নিশ!
দোতলা বাড়ি, সবুজ গম্বুজ, একটা খোলা জানালা, জানালা থেকে দেখা যায় একটা তালগাছ, ওই গাছে থাকে একটা 'একানড়ে' ভুত। 'একানড়ে' ছেলেপিলেদের কান কেটে নিয়ে লবণ মাখিয়ে খায়। টুনুর অবশ্য সব শোনা কথা, দিদার কাছে, বিশ্বমামার কাছে, পরেশের কাছে। কেউ অবশ্য খোলে কিছু বলে না, সব আবছা আবছা, কুয়াশার মতোন, স্বপ্নের মতোন। তাই টুনু নিজেই চিঠি লিখে 'একানড়ে'কে। জিজ্ঞেস করে ছোটমামার কথা, জানায় ছোটমামার জন্য দিদার অমন আনমনা থাকার কথা। কিন্তু কোন জবাব আসে না, সঙ্কেত আসে৷ টুনুর ভয় হয়, বুকের ভেতর মেঘ গুড়গুড় করে। ভয় হয় আমারও। একটা আবছা ভয়াল শীতল ছায়াচ্ছন্ন আবেশ আমার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। 'একানড়ে' পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে, আমি কোনো অতল ঘুমের গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছি। ঘুমের মধ্যেই পড়ছি। টুনু, দিদা, বিশ্বমামা এরা সবাই যেন একটা স্বপ্নের অংশ। হিমশীতল একটা আবেশ ছড়িয়ে হেঁটে চলছে এদিক ওদিক৷ আমার টুনুর জন্য ভয় হয়, বিশ্বমামা ও দিদার জন্য করুণা জাগে মনে। টুনুর ঘুম ভাঙার পর কুয়োর জলের শব্দ আর বিশ্বমামার গুনগুনে গান, মনেহয় সবকিছুই যেন এক পরাবাস্তব ক্যানভাসে আঁকা। মনে আছে আমার ছোটবেলার ভয়াল স্বপ্নগুলোর কথা। শুরু হতো, একদম সাধারণ, সবকিছু ঠিকঠাক। যখন স্বপ্নে বিভোর থাকি, অসাবধান থাকি, তখনই সেই অশুভ তাড়া করতো আমায়। 'একানড়ে'র শেষটাও হয়েছে ছোটবেলার ভয়াল স্বপ্নগুলোর মতোন। যখন স্বপ্নে বিভোর থাকি, অসাবধান থাকি, তখনই সেই অশুভ নিঃশব্দে আমাদের সর্বাঙ্গ কুরে কুরে খায়।
The One Legged, written originally in Bengali by Sakyajit Bhattacharya and translated into English by Rituparna Mukherjee, was shortlisted for this year’s JCB Prize. This slim novel reaffirms the fact that there are many Indian translated books that carry immense potential, a genre that needs to be fully explored and celebrated. The One Legged, at its very core is a psychological thriller but as the story unravels, it offers so much depth about human psyche. Every character has something to offer but in the midst of it is our little protagonist, Tunu, who has been sent to his grandparent’s house in rural Bengal while his mother tries to fix her marriage. It is in that old house that Tunu familiarises himself with Ekanore, the one legged monster.
One of my favourite things about this book was how layered it was, a skill that elevated the story and brought much suspense to it. While we see Tunu trying to figure out his uncle’s disappearance, a tragedy that occurred decades ago, there’s another story that unspools simultaneously. And it suddenly makes sense when the stories meet in the end. It almost felt like a moment of reckoning, like a veil that was suddenly lifted from my eyes.
Spun around the lore of the one legged ghost, the author pens down a powerful thriller that is more than what meets the eye. The translation was brilliant. The One Legged is a tale of a lonely boy who believes in ghosts and darkness, it’s about time and how it both changes things but also leaves behind people in its shadow.
বইটার জনরা নিয়ে বিভ্রাটে পড়তে পারেন পাঠকরা। প্রথম থেকে হরর মনে হলেও মাঝপথ সেটা গতি পাল্টাতে থাকে। মানুষের মনে অন্ধকার কোণকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা লেখকের শতভাগ সফল। টুনু চরিত্রটাকে পুরোপুরি পাঠকদের সামনে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন লেখক। অসাধারণ লেখনীতে বর্ণনা দিয়ে সারাটা সময় মোহাবিষ্ট করে রেখেছেন লেখক। শেষে এসে দারুণ কিছু চমক পেয়ে সত্যিই ভালো লাগলো বইটা। টুনু চরিত্রটাকেও ভালো লাগলো। পুরো বইটা দারুণ এক অভিযাত্রা। লেখকের প্রথম কোনো বই পড়লাম, বাজিমাত করেছেন লেখক। লেখকের বহুলালোচিত ‘শেষ মৃত পাখি’ পড়ার অপেক্ষায়!
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা পড়ছি দ্বিতীয়বার, তাকে প্রথম পড়েছি গুরুচন্ডালী প্রকাশনা থেকে প্রকাশিত 'অনুষ্ঠান প্রচারে বিঘ্ন ঘটায় দুঃখিত' পাঠের মাধ্যমে। তার গদ্যের অভিঘাত মারাত্মক, কোনো কৃত্রিমতা নেই, চুম্বকের মত আকর্ষণ করছে পরের অধ্যায়ে। বাক্যের গঠন এবং বিন্যাস, শুধুমাত্র আভাস ইঙ্গিতের মাধ্যমেই এক অলৌকিক জগতের পরিমন্ডল গড়ে তোলা মুগ্ধ করছে এই কাহিনিতে। উপন্যাসের প্রথম তিনটি অধ্যায় পড়ে এই আমার উপলব্ধি। সপ্তর্ষি প্রকাশন থেকে ২০২২ আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে 'একানড়ে' উপন্যাসটি। কিছুটা অংশ বন্ধু পাঠকদের সুবিধার্থে তুলে ধরলাম, শেষ দুটি বাক্যের জন্যই লেখককে আলাদাভাবে কুর্নিশ জানাতে ইচ্ছে হয়।
"ভয়? আমারও ভয় লাগে।" দিদার গলায় পৌষের রাত ভর করেছিল। অন্যমনস্কের মতো উঠে জানলার কাছে গেল, "খেতে আয় টুনু। মাছের ঝোল জুড়িয়ে গেল।" কিন্তু নিজে দাঁড়িয়ে আছে জানলার শিক দু'হাতে চেপে। টুনু খেল কি খেল না, ভুলে গেছে আবারও। ছোটমামা আসবে বলে অপেক্ষায়। দিদা, যার রাধারানি নামটা সবাই ভুলে গেছিল, বিয়ের পর ভুবন মাস্টারের বউ, এরপর ছয় বছর মাম্পির মা, তারপর বারো বছর মাম্পি আর মাম্পির ভাইয়ের মা, তারপর থেকে আবার শুধুই মাম্পির মা, কুড়ি বছর আগের এক শীতার্ত সন্ধেবেলা থেকেই তার যে ছেলের বয়েস বারো বছর থেকে আর বাড়লনা, নামটাও যেন সবাই ভুলে গেছে, সেই দিদা পথ চেয়ে বসে থাকে সারাদিন। আর এখন সেই ছেলেটাই দিদাকে ভুলিয়ে দিচ্ছে টুনুর কথা।..."
উপন্যাসটির সমাপ্তি লেখক যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা চিন্তার বাইরে, অন্ততঃ আমার মত ক্ষুদ্র এক পাঠকের কাছে। এইভাবেও যে এই উপন্যাসের পরিসমাপ্তি ঘটানো যায়, পাঠান্তে বিশ্বাস হয় না। শুধু এই কারণেই শাক্যজিতের এই উপন্যাস আমার পছন্দের সারিতে প্রথমদিকে জায়গা করে নিয়েছে।
সপ্তর্ষি প্রকাশন এই বইটিতেও বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদ রেখে গিয়েছেন, আশা করি পরবর্তী মুদ্রণে তা শুধরে নেবেন।
শাক্যজিতের অন্য দুটি বইও ভবিষ্যতে পড়ব বলে মুখিয়ে আছি, বিশেষ করে আপনপাঠ থেকে প্রকাশিত 'আক্রান্ত ও অন্যান্য গল্প' গল্প সংকলনটির কথা অনেক পাঠকের কাছেই শুনেছি।
Haven't we all grown up hearing stories of ghosts? Long before "Gabbar Singh" became the preferred bogeyman, weren't we warned against doing things because a specific ghost punishes kids who do that? The author takes the tale of the one legged Ekanore who lives on palm trees and preys on naughty children and weaves it into this genre bending novella. Nine year old Tanu has been sent to spend the holidays with his grandparents in a large and crumbling mansion in rural Bengal, while his mother tries to sort out her own marriage. After he finishes reading all the Feluda and Tintin books he got with him, he finds he has nothing to do in a house that is still in mourning for his uncle who disappeared twenty years back and never returned. From snatches of conversation, Tanu deduces that Ekanore was responsible for taking away the 12 year old child, and his barely there grandmother still leaves food for her son at the palm tree. Tanu spies a group of children who play in the fields beyond the palm tree, but is not encouraged to join them. He senses a malevolent presence in his uncle's room which is now preserved as a shrine, and is drawn to a mysterious dome in the middle of the forest. Things come to a head when a child disappears. Violence is unleashed. Stories collide. There are snatches of déjà vu. Nobody is what they seem. When the climax comes, you finally release your breath. The worst demons are those that are within you. The book takes you deep into the psyche of a lonely young boy. It explores themes of jealousy, of neglect, of wanting to belong, of the inherent cruelty present in each of us. It also looks at how society is in the grips of casteism, classism, superstition and poverty. At no stage did I feel I was reading a translated work, though there were many conversations which my brain automatically translated back into Bangla. I particularly loved how the rural landscape was brought to life in the book. The cover is stunning, and I am almost tempted to buy a physical copy of the book just for the cover! This is not a book that I would have normally read, and I am glad the JCB Shortlist forced me out of my comfort zone.
বইটাকে শুধু হরর বলে থাকলে ভুল এবং অন্যায় দুটোই হবে। এ যেন তার থেকেও বেশিকিছু। শাক্যজিৎ বাবু গল্পটা যেভাবে শুরু করলেন এবং যেভাবে শেষ করলেন তাতে চোয়াল ঝুলে যেতে বাধ্য।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের একানড়ে নিঃসন্দেহে বাংলা হরর সাহিত্যের এক অনন্য সংযোজন। গল্পের বিন্যাস, ভীতিকর আবহ এবং রহস্যের মোড়কে মুড়ে রাখা প্রতিটি মুহূর্ত এক কথায় অসাধারণ।
গ্রামের লোককথা ও ভয়ঙ্কর কাহিনিগুলোকে বর্তমানের ঘটনাবলির সঙ্গে দক্ষতার সাথে মিলিয়ে লেখক গল্পটিকে এক বাস্তবসম্মত অনুভূতি দিয়েছেন। একানড়ের মতো গ্রাম্য ভূতের গল্প যে এমন আধুনিক উপস্থাপনায় প্রাণবন্ত হয়ে উঠতে পারে, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।
গল্পের শেষটা অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিকভাবে উদ্বেগজনক এবং যথাযথভাবে পরিবেশিত, যা পাঠকের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। যারা বাংলা হরর ভালোবাসেন, তাদের জন্য এটি অবশ্যই পড়ার মতো একটি বই!
পরাবাস্তবতা হল, হরর হল, লৌকিকতা হল, সামাজিক বৈষম্য নিয়ে আলোচনা হল, শুধু প্লটটাই বড্ড দুর্বল রয়ে গেল।
তবু তিনখানা তারকা লেখকের অসম্ভব সুন্দর লেখনীর জন্য, যা আমাকে এক লহমায় আমার ছোটবেলার ভয়মাখানো দুপুরবেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেছিল। সেইসব দিনে আমার নিজের মামাবাড়ি রহস্যময়তার প্রাসাদ ছিল, আর সন্ধ্যার অন্ধকারে ভূতেরা নেমে আসতো গাছের গা বেয়ে।
বইটির প্লট, ভাষা কিংবা তার উপস্থাপনা বড়ই সুললিত, এবং তার র মধ্যে লেখকের কুশলতার ছাপ স্পষ্ট। এই নাতিদীর্ঘ নভেলাটির প্রায় সবটুকু বড় উপভোগ করেছি আমি, হয়ত কেবল শেষটুকু ছাড়া । শেষের বাস্তব ব্যাখ্যাটুকু না দিয়ে লেখাটাকে ওপেন এন্ডেড করে রেখে দিলে হয়ত তার ব্যাপ্তিটা আরো প্রসারিত হত বলে মনে হয়। লেখক শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যকে বেশ কিছুদিন ধরে পড়ছি, এবং তার থেকে আরো আশা রইল
"একানড়ে" শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য্যর লেখা, আমার পড়া তার লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস। সত্যি বলতে খুব একটা এক্সপেক্টেশন নিয়ে বইটি শুরু করিনি, বিষয়বস্তু অতি অলৌকিক এবং কিশোর অপরাধ হলেও লেখক বেশ একটা অন্ধকার ভাবপরিবেশ সৃষ্টিতে সফল হয়েছেন। লেখকের গদ্যভাষার পরিচয় কিছুটা শেষ মৃত পাখি তে পেয়েছিলাম, কিন্তু একানড়ে উপন্যাসটির গদ্য শৈলী ইদানিংকার যেকোনো লেখার থেকেও অনেক বেশি বলিষ্ঠ এবং সাবলীল। প্রচ্ছদটিও উপন্যাসটির সঙ্গেও বেশ মানানসই। জনরা হিসেবে অতি অলৌকিক হলেও লেখনীর গুনে বইটি এই বছরের আমার পড়া সেরা উপন্যাস গুলির মধ্যে প্রথম দিকে থাকবে।
পটভূমি -
বইয়ের ব্লার্বের অংশটুকু তুলে ধরলাম - 'একানড়ে' আপাতদৃষ্টিতে হরর উপন্যাস হলেও আসলে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রয়াস, যা লোককথা, প্রবাদ ও লৌকিক দেবতাদের সম্বল করে আখ্যানের উপরিতল নির্মাণ করে, সেখানে জনপ্রিয় জঁরের দিকে বাড়ানো থাকে একটি হাত; অপর হাতের প্রণতি অবতলে গড়িয়ে যায় আবহমান বাংলার ভাষাশ্রমিকদের প্রতি ৷ জাদুবাস্তবতার বুননে পরাবাস্তবতার চুমকি মেশানো উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে এখানে উত্থান হয়েছে ইভিলের। সেই অশুভকে নির্মাণ করার মূল মাধ্যম হয়ে ওঠে ভাষাকাঠামো, যার মাণিক্যময় জৌলুষের অভ্যন্তরে ঘাতক ছুরির মত সযত্নে হননবৃত্তান্ত লুকনো থাকে। এই আখ্যান দেখিয়ে দেয় ইভিল একটি দৈনন্দিন স্বত্ত্বা আপনি যখন স্বপ্নে বিভোর তখন নিঃশব্দে সেই ইভিল আপনার সর্বাংগ কুড়ে খেয়ে ফেলে। নয় বছরের একটা বাচ্চা ছেলের দৈনন্দিন জীবন, বড়দের জীবনের সঙ্গে তার টানাপোড়েন, এই সবকিছু মিলিয়ে লেখক যে একটি গল্প ফেদেছেন তা এক কথায় অনবদ্য। এক নি:সঙ্গ দুপুরে এই বই পড়ার সময় শিরদাঁড়া বরাবর ভয়ের একটা হিমেল স্রোত বইয়ে যেতে বাধ্য। গল্পটি অলৌকিক হলেও ঠিক অলৌকিক নয়, শিশু মনস্ত্ত্ব ও অন্ধবিশ্বাস এর মিশেলে এবং লেখকের গদ্য শৈলী ভুতুড়ে পরিবেশ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া -
একানড়ে সম্ভবত সাইকোলজিক্যাল হরর হিসেবে বাংলা সাহিত্যে বেশ উপরের দিকেই থাকবে । পড়লে মন বিকল হয় অথচ এই রূঢ় সত্য এড়িয়ে যাওয়ার বা অস্বীকার করারও উপায় নেই কারন এসব ঘটে । ঠিক হলিউডি ভুতুড়ে ছবি গুলিতে ভূতের থেকেও পরিবেশ, আবহাওয়া এবং ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের উপর জোর দেওয়া হয় তেমনি এই বইটিতে, একটি খোলা মাঠ, তালগাছ, মাঠের ওপারের জঙ্গল এবং জঙ্গলের মাঝে একটা গম্বুজ এই পরিবেশেও যে ভয় সৃষ্টি করা যায় শুধু মাত্র গদ্যের জোরে তা লেখক খুব ভালো ভাবে বুঝিয়েছেন। এই ধরনের লেখা অনেকটা শ্রদ্ধেয় তারাদাস বন্দোপাধ্যায় এর তারানাথ তান্ত্রিক এর গল্প গুলো তেও পেয়েছিলাম, ভৌতিক পরিবেশ সৃষ্টি করতে শাক্যজিৎ বাবুর লেখনীর বেশ প্রসংশা করতেই হয়।
উপন্যাসটির সমাপ্তি লেখক যেভাবে করেছেন তা আমার মত ছোট পাঠকদের কাছে চিন্তা ভাবনার বাইরে, জাস্ট ছিটকে যাওয়া যাকে বলে। এই উপন্যাসটি শেষ হয় এমন এক জায়গায় যেখানে আমরা এই উপন্যাসের কোথাও না কোথাও রয়ে গেছি নিজেদের অজান্তেই। হাবিজাবি, তন্ত্র মন্ত্র, পিশাচ এই সব বাদ দিয়ে এই বুদ্ধিদীপ্ত সুলিখিত অলৌকিক উপন্যাসটি তুলে নিতেই পারেন - বিফল যাবে না কথা দিলাম।
"একানড়ে, কানেকড়ে তেঁতুল পাড়ে, ছড়ে ছড়ে এক হাতে তার নুনের ভাঁড়, আরেক হাতে ছুরি কান কেটে, নুন ঘসে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি৷..." - সলিল চৌধুরী
'একানড়ে' হল আমাদের গ্রাম বাংলার এক বিশেষ প্রজাতির ভূত। মনে করা হয়, একানড়ে তালগাছে থাকে এবং এদের একটাই পা থাকে। বাচ্চাদের বাগে পেলে তাদের কান কেটে নুনের কৌটে জিইয়ে রাখে আর খিদে পেলে সেই জিইয়ে রাখা কান খেয়ে পেট ভরায়।
গল্পের প্রধান চরিত্র, একটি বাচ্চা ছেলে টুনু, এসেছে তার দাদু দিদার কাছে বেড়াতে বা থাকতে। টুনু চরিত্রটি আর পাঁচটা বাচ্চার মতোই নানা আজগুবি চিন্তায় মশগুল, তার মাথায় সারাক্ষণ কিছু না কিছু চলছে। বাবা মায়ের বিবাদের মধ্যে বেড়ে ওঠা টুনু আশা করেছিল মামাবাড়ি এলে দিদা ও দাদু ও মামাবাড়ির আর সকল সদস্যদের সামগ্রিক মনোযোগ সে একাই পাবে, এবং তার মা তাকে এই বিষয়ে যথেষ্ট আশ্বস্ত করেছিলেন। কিন্তু মামাবাড়ি আসার পর তার সমস্ত আশাই মাটিতে মিশে গিয়েছিল। কারণ, কোনোকিছুই তার আশানুরূপ ছিল না। তার দিদা সর্বদা অন্যমনস্ক থাকতেন তার মামার কথা ভেবে ভেবে, যেই মামা অনেক ছোটবেলায় হারিয়ে গেছিলেন, এবং শোনা যায় তার মামাকে একানড়ে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। টুনুর দিদা সারাদিন তার অপেক্ষায় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকতেন। এছাড়া সদস্যদের মধ্যে ছিলেন দাদু, বিশ্ব মামা, বিশ্বমামার বৌ ও তাদের একটি সন্তান গুবলু। টুনুর দিদা যখন অন্যমনস্ক থাকতেন না, তখন বেশীরভাগ সময়টাই গুবলুকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। এইসমস্ত কারণে টুনুর মনে একটা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল গুবলু এবং তার নিঁখোজ মামার প্রতি। তার প্রতিনিয়ত মনে হত, এদের জন্যই বুঝি তার দিদা তার প্রতি মনোযোগী নন।
আমার বরাবরই মনে হয়, শিশুমন আর ডার্ক সাইকোলজি খুব গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সম্প্রতি সায়ন্তনী পূততূণ্ডের একটি বইতে লেখিকা খুব সরলভাবে এই বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। তিনি একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লিখেছেন যে, শিশুরা যেরকম সরল, ঠিক তেমনই ভয়ঙ্করও। একটি শিশু অবলীলাক্রমে এমন কিছু কাজ করতে পারে যা একজন সুস্থ ও পরিণত মনের মানুষ কখনও করবেন না। খুবই সাধারণ দুটি ঘটনা উদাহরণ হিসাবে বলব, ছোটবেলায় আমরা অনেকেই পিঁপড়েদের ছোট কৌটতে ভরে বদ্ধ করে রাখতাম, নিছক খেলাচ্ছলে। এখনও, কালি পুজোর সময় অনেক কুকুরের লেজে কালিপটকা বেঁধে দিতে দেখা যায় বাচ্চাদের, এটিও নিছক খেলাচ্ছলেই। বোধ বুদ্ধি প্রায় না থাকায় বা কম থাকায় এরম অনেক ঘটনা তারা প্রায়শই ঘটিয়ে থাকে এবং অসম্ভব বেশি আজগুবি চিন্তা ভাবনা করতে বাচ্চাদের জুড়ি মেলা ভার। যা মিলেমিশে গিয়ে অনেক সময়ই অনেক অঘটন ঘটে যাবার প্রবল সম্ভাবনা থাকে। তাই বাচ্চাদের প্রতি অনেক বেশি মনোযোগী হতে বলা হয়। পরিবারের সমস্যা, বিবাদ শিশুমনে গভীর দাগ ফেলতে পারে।
টুনুর ক্ষেত্রে এসবই বর্তমান ছিল। তার মা বাবার বিবাদ, সেসব থেকে দূরে রাখতে তার মা তাকে মামাবাড়ি পাঠালেন। কিন্তু সেখানেও, তার প্রতি তার দিদার অনীহা তার শিশুমনে একরাশ অভিমান ও কৌতূহল এনে জড়ো করে। মা বাবার বিবাদ, একানড়ে, নিঁখোজ মামা, দিদার অনীহা, মামার বন্ধ ঘর, এই সব মিলিয়ে তার মন আস্তে আস্তে অতলে তলিয়ে যাচ্ছিল।
শেষ অবধি টুনুর কী হলো জানতে 'একানড়ে' বইটি পড়তে হবে। বাংলা সাহিত্যে এই ধরনের লেখা আমার কাছে নতুন, এবং আমার বেশ ভালো লেগেছে। এর আগে শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা পড়ার সুযোগ আমার হয়নি, লেখকের লেখা এই প্রথমবার পড়লাম। তবে মনখারাপ থাকলে, মানসিক চাপ থাকলে এই বইটি এড়িয়ে চলাই ভালো বলে আমার মনে হয়, কারণ আমার মনে বেশ ভালোরকম প্রভাব ফেলেছিল এই বইটি।
বাস্তবতার সাথে মিশে যায় এমন এক জগৎ, যার অস্তিত্ব বিশ্বাস করা কঠিন আবার অবিশ্বাস করাও অসম্ভব।
বাবা মায়ের দ্বন্দের ফাঁদে পড়ে, বিচ্ছেদের মাঝে টুনুকে পাঠিয়ে দেয়া হয় (দাদুবাড়ি) নানাবাড়িতে। এখানে এসে ৯ বছরের টুনুর জীবনের গতি থমকে যায়। তার ছোটমামা কে বহু আগে একানড়ে ধরে নিয়ে গেছে। ওই যে এক পেয়ে তালগাছ। সেই গাছে থাকে একানড়ে। ছোটমামাকে খাবার দিতে দিদা(নানী) প্রতিদিন যায়। খাবার রেখে আসে, ফিরে আসে, রোজ সে খাবার ফেলে দেয়। বিশ্বমামা, তার স্ত্রী আর গুবলু, তাদের ছেলে, টুনুর দাদুবাড়ির বংশ পরম্পরায় কাজের লোক। ছোট্ট গুবলুকে দাদু দিদা সবাই খুব আগলে রাখে। কিছুটা যেন বাড়াবাড়িই।
বিশ্বমামার স্ত্রীকে নিয়ে, কেবল ৯ বছরে পা রাখা টুনুর ফ্যান্টাসি কাজ করে। যেটা এই বয়সে এক দিকে অস্বাভাবিক আবার একেবারে হাওয়ায় ভাসানো না।
এ বাড়ির নিষিদ্ধ এলাকা হল ছোটমামার ঘরে যাওয়া, কিন্তু টুনু যেতে চায়, যায় একদিন। এ বাড়িতে পা রাখার আগে কিংবা আরো আগেই বদলে গেছে টুনুর জীবনের গতি। গনেশ, দেবু, বাবান সহ সব বন্ধুদের দল। বন্ধুত্ব যেমন আছে, তেমন দ্বন্দ। মা/রা।মা?রি। একদিন ক্রিকেট খেলায় দ্বন্দের জের ধরে ঘটে যায় মারাত্মক কিছু দুর্ঘটনা। দু জন বাদে হারিয়ে যায় সবাই। কাউকে যখে টানে তো কেউ পুড়ে ম:!”রে, কেউ এক্সি:ডএন্ট করে, কেউ পাগল হয়৷ কাউকে ছেলে/ধএড়া টানে, কাউকে তাল গাছের মাথায় আটকে রাখে একানড়ে। বুলিং/র্যাগিং এর শিকার ছিল বাবান। ক্যালানে বলে খেপানো হতো তাকে, এমনকি তার বান্ধা কাজের লোকও তাকে ঢি/ল ছুড়ে, চুড়ান্ত অপমান, ব।ল।আলতকারের শিকার হল বাবান। একজন ও বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি, উঠে গেল সেই তালগাছ বেয়ে।
প্রচন্ড ক্ষোভে সেদিনের পর থেকে কেউ তচনছ করে দিয়েছে অনেকগুলো জীবন।
সেই তাল গাছের মাথায় শকুন উড়ে।
একদিন হারিয়ে যায় গুবলু। ছেলে./ধ.রা না একানড়ে না যখের শিকার সে? গুবলুকে ফিরে পাবে সবাই?
টুনু মায়ের আদর চাচ্ছে খুব করে, আর আসে না মা৷ ফোনে কথ�� বলা অব্দিই শেষ, টুনু জানে মা আসবে না।
ছোটমামার ঘরে কেউ যেন তার ঘাড়ে নি:শ্বাস ফেলে, সংকেত দেয় তাকে কিছুর। সে খুঁজে পায় অনেক তথ্য, যত তথ্য পায়, তত সে জ্বরে কাতর। সে জানে, তাকে কেউ বলেছে ছোটমামার সেদিন খুব যন্ত্র।ণা হয়েছিল, সে জানে মামার কষ্ট বাড়লে দেয়ালের ওই স্যাতস্যেতে অংশের কষ্ট বাড়ে। টুনুকে কে কী জানাতে চাইছে? আর কেন? কে সব শেষ করে দেবে? কী হবে?
দুটো সমানতালে চল গল্প, কে কীভাবে সংযুক্ত জানতে হল বইটা পড়তে হবে। বাস্তব, জাদুবাস্তব আর পরাবাস্তব জগতের মিশেলে এক অন্য জগতের গল্প। লোককথা আছে, বাস্তব আছে।
গল্প অতি দ্রুত এগিয়েছে, চাইলে আরো কিছু যুক্ত করা যেত, কিন্তু আমার মনে হয়, এই দ্রুত গতির জন্য এই গল্পটা জাস্টিফাইড হল।
বইটার লাস্ট টুইস্ট সেই শেষ ম/ঋত পাখির মতই অদ্ভুত ছিল। বইটা আমার কিছু পেইজ বা প্যারা সম্ভবত মিসিং ছিল। যার কারণে কিছু ব্যাপার পরিষ্কার নয়। মাঝদিকে কিছুটা একঘেয়ে লেগেছিল। কিন্তু কিছু পরেই আবার ট্র্যাকে ফিরে এসেছে।
নোট: এই বই আমার বেশ ভালো লেগেছে। কিছু ড্র/ব্যাক ছিল৷ তবে পড়ে ভালো লাগবে। যেহেতু,বাস্তবতার সাতগে জাদুবস্তবতা আর পরাবাস্তবতার মিশেলের গল্প, তাই লজিক খুঁজতে না করব। আকাশে কেন গরু উড়লো বা পানির তলে শহর কিভাবে গেল এইগুলো খুঁজতে চাইলে এই বই আপনার জন্য না।
"একানড়ে,কানে করে তেঁতুল পাড়ে,ছড়ে ছড়ে এক হাতে তার নুনের ভাঁড়,আরেক হাতে ছুরি কান কেটে,নুন ঘষে বেড়ায় বাড়ি বাড়ি।"
একানড়ে প্রাচীন বাংলার ভূত। তালগাছে থাকে,এক পায়ে চলে,বাচ্চাদের কান কেটে নুনে জারিয়ে খায়। ভূতের সমনামী এই উপন্যাসকে কি ভূতের বলা যায়? না,'একানড়ে' ভূতের নয়,ভয়ের। সার্থক ভয়ের কাহিনির পটভূমি নির্মাণ গুরুদায়। পুরনো একটি ভূমিরূপ; সেখানে নিঃসঙ্গ বেদনামোহিত ছায়াগ্রস্ত বাড়ি,বাড়ির পারে একলা তালগাছের মাঠ,মাঠের পারে অন্ধকার জঙ্গলের মেঝেয় রোদের গুপ্তমোহর,জঙ্গলের অন্ত্রে মল্লরাজাদের পরিত্যক্ত ফাঁসুড়ে গম্বুজ। অঘ্রাণের চাপ চাপ সায়ম-রাত,স্বেদ স্বেদ কুয়াশা। পাঁচুঠাকুরের মেলা বসে,জ্বরাসুর দাঁপিয়ে বেড়ায়,যখ টেনে ধরে অতল জলের নাভিতে। পাঠক জানলা দিয়ে অন্ধকার দেখেন,আঁধারে আঁধার খোঁজেন বিষাদমূলগত,শূন্যদৃষ্টি প্রতীক্ষার কারণরূপ। দমচাপা অপেক্ষা করেন কখন ভূত আসে। খুঁজতে খুঁজতে টানা জ্বরের বিভ্রমে কখন বাইরে থেকে চোখ ফিরে যায়,দৃষ্টি পড়ে নিজের ভিতরের কালোপানা স্পৃহা ও শিরদাঁড়া-শিউরোনো কান্নাজড়ানো ভালোবাসা চাওয়া ও না-পাওয়া সদৃশ নিষ্ঠুরতায়। খুঁজতে খুঁজতে ভ্রমিত অনুসন্ধানের ঘোরে খেয়ালই হয় না যে,ভূত সেই কখন এসে বসে আছে। যেখানে পাঠক আছেন,সেখানেই। যে বোঝে সে জানলার গরাদ ভেঙে এক পায়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে মাঠ পেরিয়ে তালগাছে উঠে যায়,তার ভয় পাওয়ার পালা শেষ। একানড়ে তার আশ্রয়।
শাক্যজিতের গদ্য বলিষ্ঠ নির্মেদ ও আশাতীত যা তা হল,এই উপন্যাসের কাহিনি আপন্নসত্ত্বা। অন্তরীণ সেই হৃদস্পন্দন শুধু অনুভব করা যায়। লেখক ন্যূনতম বিস্ময়চিহ্নটুকুও ব্যবহার করেন না,আমরা ভয়েরও অতিরিক্ত কোনও শিরশিরানিতে কেঁপে উঠি। এই নির্মোহতা-পোষিত সফল অভিঘাতেই উপন্যাসের স্মরণীয়তা।
"বাড়ির যে গুমোট অবসাদ, মা সারাক্ষণ কাঁদে দাদার জন্য আর বাবা গুম মেরে থাকে, যে ঘরের লাল মেঝেতে শুয়ে বাবা দিনরাত একদৃষ্টে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিউরে উঠে গোঙালে বাপ্পার মনে হয় তার গলা টিপে ধরেছে, সেই ঘর এবং সে দুঃস্বপ্ন অন্ধকার ফাঁসুড়ে গম্বুজের মাথায় বন্ধুদের হট্টগোলের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে দুম করে হারিয়ে গেছে।"
"মেলায় এসেও টুনুর বারবার মনে পড়ছিল দিদার কথা। তার দুইপাশে বিশ্বমামা আর রীণামামিমা, যার কোলে গুবলু নেই, রেখে আসা হয়েছে দিদার কাছে।"
"আর্ত চিৎকার তার চারপাশে চৌচির হয়ে ফেটে পড়ছিল, জ্ঞান হারাবার মুহূর্তে টুনু অবাক হয়ে সে আর্তনাদের উৎসকে খুঁজেওছিল।"
"বাড়ির পেছনে আমগাছের তলায় চেয়ার পেতে বসে আছে সেদিনকার মেলার দেখা পরেশ নামের লোকটা। চা খাচ্ছিল, টুনুকে দেখে উঠে দাঁড়াল, এবং হাসিটা চোখ অবধি এভাবে ছড়িয়ে ফেলতে তার ছোট্ট জীবনে সে খুব বেশি লোককে দেখেনি, সুতনু সরকার বাদে, যে টুনুকে দেখলেই গত বছর পর্যন্ত কাঁধ ঝাঁকিয়ে এমন একটা মিষ্টি হাসি দিত যে পাবলো বা শিবাজীর যখন তখন গাট্টা মারা অথবা টিফিন বক্স ছত্রখান করে ছড়িয়ে দেওয়া সমস্ত চাউমিন, বেঞ্চে মেঝেতে ব্যাগের ওপর, ফিকে হয়ে যেত সে নির্ভার নিষ্ঠুরতা।"
কিন্তু এগুলোই chatGTP তে ইংরাজীতে অনুবাদ করলে এমন দাঁড়ায়,
The suffocating gloom of the house—mother cries all day for brother, and father stays silent. In that room with the red floor, where father lies day and night staring unblinkingly at the beams, shivering and groaning as if someone is strangling him— that room, and that nightmare, have suddenly vanished, unable to compete with the noisy chatter of friends atop the dark executioner’s dome.
Even at the fair, Tunu kept thinking about Dida. On either side of her were Bishwamama and Reenamami, whose lap was empty—Gublu had been left with Dida.
Piercing screams shattered around her, and in the moment before losing consciousness, Tunu, bewildered, even tried to find their source.
Behind the house, under the mango tree, sat the man named Paresh, whom she had seen at the fair that day. He was drinking tea. Seeing Tunu, he stood up, and the way his smile reached his eyes—she hadn’t seen many people smile like that in her short life, except for Sutanu Sarkar. Until last year, whenever he saw Tunu, he would shrug his shoulders and flash such a sweet smile that all of Pablo and Shivaji’s casual cruelty—punches out of nowhere, tiffin boxes knocked over, chow mein scattered across the bench, floor, and bags—seemed to fade into insignificance.
আমার কাছে ইংরাজী অনুবাদ অনেক বেশি বোধগম্য লাগল। তেমন ভাবে বাংলাতে কি একটু অন্যভাবে লেখা যেত না?
যাই হোক!
লেখক টুনুকে এঁকেছেন অনেকটা পথের পাঁচালীর অপুর ভঙ্গিমায়। অপুর মতই কল্পনার জগতে তার অবাধ বিস্তার। পার্থক্য শুধু একটা জায়গাতেই, অপু অনেক সাবলীল, অনেক সহজ।
প্রথমে ভেবেছিলাম, মাঝপথে পড়া থামিয়ে দিই, অন্য কিছু পড়ি। শাক্যজিতের অন্য বই যেটা কিনেছি, সেটা নিয়েও সন্দিহান ছিলাম।। তবে একবার শুরু করে শেষ না করা অবধি মনে কুটকুট করতেই থাকে।
এই দুর্বোধ্যতার বেড়াজাল কোনোমতে টপকে গিয়ে পেলাম এক অবিশ্বাস্য চমক। সারা গায়ে শিহরন দেওয়ার মতন। বাধ্য হলাম আবার বইটা পড়তে, যে অংশগুলো ভ্রু কুচকে কোনোমতে উতরে গেছিলাম। সব শেষে মিলল এক অদ্ভুত মানষিক শান্তি।
অনেক দিন পরে ভালো বাংলা বই পড়ার শান্তি।
লেখার এই অসাবলীল ভঙ্গিমা কি রহস্যকে আরো ঘনীভূত করার জন্য নাকি অন্য কোনো কারন আছে? সেই রহস্যের সমাধান হয়নি যদিও।
শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যর ব্যাপারে আলাদা করে বলার কিছু নেই। কিন্তু ওনার বই আমি আগে পড়িনি। এই প্রথম পড়া।
নয় বছরের টুনু তার মা বাবার বিবাহ বিচ্ছেদের আসন্ন পরিস্থিতিতে মামার বাড়িতে গিয়ে থাকতে শুরু করে। বিশ্ব মামা আর তার বউ রীনা মামী দুজনের প্রতিই টুনুর খুব টান। টুনুর যা বয়স তাতে রীনার দিকে তার যা দৃষ্টিভঙ্গি সেটা উপন্যাসের একদম প্রথম থেকেই একটু ভাবায়। কেমন একটা লাগে। সেই গ্রামে কিছু একটা আছে। কোনো গভীর এক রহস্য। একানড়ে ! সে কি আছে? নাকি নেই? মামার বাড়ির সামনের তাল গাছের উপরেই কি সে থাকে? তার দিদা জানলা ধরে আজও ছোটমামার অপেক্ষা করে থাকে কেন? কী হয়েছিল আসলে তার ছোটবেলায় ? হারিয়ে যাওয়া ছোট মামাকে কিম্বা স্কুলের মৃত বন্ধুকেই বা কেন দেখতে শুরু করে টুনু? এসব প্রশ্নের মধ্যে দিয়েই এগিয়ে চলে গল্প। উত্তর মেলে একদম শেষে। অর্থাৎ, this will keep you guessing. টু���স্টটা নিঃসন্দেহে দারুণ !
নামটা শুনে ভৌতিক মনে হলেও এটা কি ভূতের উপন্যাস? নাকি অন্য কিছু? সবচেয়ে গোলমেলে ব্যাপার হল খোলসা করে বেশি কিছু বলতেও পারছিনা। কারণ তাতে স্পয়লার হয়ে যাবে ! তবে এটুকু বলা যায়, এটা একটা অসাধারন হরর বই, সাইকোলজিকাল হরর! হিংসা যে কি সর্বনাশা তা মূর্ত হয়ে ওঠে এই কাহিনীতে।
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে লেখকের লেখনশৈলী। কী অসাধারণ কাব্যিক ভাষা ! হরর বই অথচ ভাষা কাব্যিক ! ইউনিক না? রূপকের দারুণ ব্যবহার সত্যিই ভাবায় - এভাবেও এটা লেখা সম্ভব?
শাক্যজিত ভট্টাচার্যের লেখা “একানড়ে” একটি স্লো-বার্ণ ঘরানার সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, যার গতি প্রথমে ধীর হলেও, মাঝপথে এক আকস্মিক মোড়ে রুদ্ধশ্বাস হয়ে ওঠে। উপন্যাসের শুরুতে গল্প কিছুটা একঘেয়ে মনে হলেও, ধৈর্য ধরে পড়তে পারলে পাঠক এক সময় গল্পের গাঢ় রহস্য ও মানসিক টানাপোড়েনে জড়িয়ে পড়েন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র টুনু নামের এক বাচ্চা ছেলে, যার বাবা-মায়ের মধ্যে ডিভোর্সের মামলা চলছে। তার আশ্রয় মামাবাড়ির গ্রামে। সেই বাড়িতে থাকে দাদু দিদা, দুসম্পর্কের এক মামা মামি এবং তাদের একমাত্র শিশুপুত্র। যে গ্রামে টুনু আছে সেখানে ঘুরে বেড়ায় “একানড়ে” নামের এক ভৌতিক অস্তিত্বের গুজব। এই গ্রামের অতীতেও আছে অন্ধকার—টুনুর ছোটমামা বহুদিন ধরে নিখোঁজ, এবং লোকের ধারনা, একানড়ের সঙ্গেই তার যোগ রয়েছে। উপন্যাসটি নিছক ভয়ের গল্প নয়, বরং এটি এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক স্তরে কাজ করে। লেখকের গদ্য খুবই বর্ণনাময়—দৃশ্যপট, আবহাওয়া, চরিত্রের মানসিক অবস্থা—সব কিছুই নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে। যদিও শেষের টুইস্টটি আমি খানিকটা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিলাম, তবুও উপন্যাসটি পড়ার আনন্দ বিন্দুমাত্র কমেনি। যারা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার, ধীরে গতি বাড়ানো রহস্যঘন গল্প, এবং সূক্ষ্ম বর্ণনার গদ্য ভালোবাসেন—তাদের জন্য “একানড়ে” নিঃসন্দেহে একটি উপভোগ্য পাঠ্য হবে।
একানড়ে। শাক্যজিৎ ভট্টাচার্যের লেখা। এই বই পড়তে পড়তে সময় বাথরুমের সাবানের মতো পিছলে যায়। জানলার বাইরের শহরতা সরে গিয়ে দিগন্তজোড়া মাঠ আর নিঃসঙ্গ তালগাছ কুয়াশার চাদরে বায়স্কোপের মতো হাজির হয়। মন এককেজি তুলোর বস্তার ধন্দ নিয়ে হালকা-ভারী দোলাচলে ভোগে। পৃথিবীতে হঠাৎ করে আলস্যের শীত নামে। ব্যাঙ্গালোরের পুরুষ্টু বিকেল ছোটোবেলার রবিবাসরীয় দুপুরের মাংস রান্নার গন্ধ পায়। আর আমি খুঁজে পাই বহু পরিচিত ফাঁসুড়ে গম্বুজের রাস্তা।
ভৌতিক গল্পের আখ্যানে এ এক বাচ্চার মনস্তাত্ত্বিক ডায়েরি। আ-মরি বাংলা ভাষা এত সুন্দর, এত আলংকারিক হতে পারে, লেখকের সৃষ্টি না পড়লে তার কিছুমাত্রও কল্পনা করতে পারতাম না। একেবারে অন্যরকম গদ্যশৈলী। সেসব বাক্য একবার পড়ে শান্তি হয় না। সেসব অনুচ্ছেদ একবার পড়ে আশ মেটে না। পাতার সংখ্যায় ভারী না হলেও এই বইয়ের গভীরতা জীবনানন্দের কবিতার মতনই ।
“শেষ মৃত পাখি” দিয়ে লেখকের জগতে ঢুকে পড়া। বাংলা সাহিত্যে হিগাশিনোসম উচ্চতার থ্রিলার পড়ে বেশ কয়েকদিন ঘোরে ছিলাম। তারপর থেকে ওনার প্রায় সব বইই জোগাড় করে ফেলেছি। প্রথম বইয়ের স্তব্ধতা দ্বিতীয় বইতে মুগ্ধতায় প্রাণ পেয়েছে। সামনে আরও ৩-৪ টে বইয়ের যাত্রা । আশা করি মুগ্ধতার কুহেলিকা সহজে প্রশমিত হবে না।
বছর দশবারোর টুনু। মা বাবার সম্পর্কের টানাপোড়েনের জেরে তাকে প্রায় একপ্রকার জোর করেই রেখে আশা হয় মামাবাড়িতে। দিদা অনেক আদর করবে এই মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে। হ্যাঁ মিথ্যা। কারণ দিদা প্রায় সারাদিনই জানলা ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ছোটমামার ফিরে আসার আশায়। কি হয়েছিল ছোটমামার? এই প্রশ্ন করে সে জানতে পারে একানড়ের কথা। একানড়ে ছোটোমামাকে ধরে নিয়ে গিয়ে ওই দূরের ওই তালগাছের মাথায় আটকে রেখেছে। টুনুর আর ভালো লাগেনা মামাবাড়ির এই জীবন, দিদার অবহেলা, মাও আর খোঁজ নেয়না তার আজকাল বাবার কথা তো সে ছেড়েই দিলো। এই নিস্তরঙ্গে জীবনে সামান্য এডভেঞ্চার এর আশায় সে একদিন চুপিচুপি চাবি খুলে ঢুকে পড়ে ছোটমামার ঘরে। আর তারপরই তার জীবন নেয় এক অন্য মোড়। কি আছে সেই ঘরে ? আর কে এই একানড়ে ? তার ছোটমামার হারিয়ে যাওয়ার পেছনে কি সত্যিই তার হাত আছে?
একানড়ে আপাতদৃষ্টিতে একটি অলৌকিক উপন্যাস মনে হলেও আদতে একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রয়াস, যা লোককথা, প্রবাদ ও লৌকিক দেবতাদের সম্বল করে আখ্যানের উপরিতল নির্মাণ করে। কিন্তু তার ভীত নির্মাণ হয় জাদুবাস্তবতার বুননে, পরাবাস্তবতার ও মনস্তত্বের চুমকি বসিয়ে। যারা শাক্যজিতের আর অন্য বই পড়েছে, লেখনীর সাথে পরিচিত তারা অনুমান করতেই পারবে এই বইও ভীষণই স্লো-paced। কিন্তু লেখা যত শেষের দিকে যায় একটা একটা পরত উন্মোচন হতে থাকে ততই চেপে ধরে পাঠককে। আর শেষে এসে মনে হয় এ কি পড়লাম আমি। পরিশেষে এটাই বলার, এখানে ডেরেক বসে আছে পরে ভালো লাগলে, এই বইও আপনার নির্ঘাত ভালো লাগবে।
"এক যে আছে একানোড়ে সে থাকে তালগাছে চড়ে ... ... যে ছেলেটা কাঁদে, তারে ঝুলির ভেতর বাঁধে গাছের উপর চড়ে আর তুলে আছাড় মারে" বাংলার প্রচলিত লোক ভীতি হল একানড়ে, নিশি, যখ, মেছোভূত — অনেকের ছোটবেলাটা কেটেছে এদের হেফাজতে। খুব দুষ্টুমি করলেই নেমে আসত কৃত্রিম ভয়ের ছড়া, আর শিশু মন মেনেও নিত। কিন্তু এই নবীন প্রজন্মের কাছের এই পৃথিবীর বাস্তবতা আরও রূঢ় – বাবা-মার বিচ্ছেদ, অচেনা যৌন ঈর্শ্বা, দীর্ঘস্থায়ী শোকপালনের কুফল , অন্তস্থঃ ঈর্ষা , অতিরিক্ত কল্পনাপ্রবণ হয়ে ওঠা এবং সামান্য ভালোবাসা ও পরিচিতি পাওয়ার লোভ – সব কিছু ঠেলতে থাকে তাকে এক ভয়ার্ত, অচেনা, অজানা পথের দিকে। রিপিটিভ প্যাসেজ ব্যবহার করে শাক্যজিত যেইভাবে বিষণ্নতা ফুটিয়ে তুলেছেন উপন্যাস জুড়ে, তাকে কুর্ণিশ। শেষ কিছু মাসে একই লেখকের পর পর তিনটে বই আমি শেষ কবে পড়েছি মনে নেই — এইটুকু থেকেই হয়ত বোঝা যায় ওর ভক্ত হয়ে পড়ছি ধীরে ধীরে।
The slow descriptive pace of the novel worked well to build up the suspense while also giving you a good visual. I could see it play out like a movie, the setting, the build-up, and the climax are all done to perfection. Tunu has been left with his grandparents in the village as his parents are going through a separation. The house is filled with old memories of his uncle who had died, and Dida who refuses to let go of his memory. No one wants to talk about the past. The myth of the one-legged ghost that chops off children's ears and lives in the tree in front of their house. Tunu feels a strong pull and feels he would be the next one to be taken. But instead, it is the toddler of the servant couple who goes missing. The reveal at the end will leave you stunned.
থ্রিলার পড়তে গিয়ে আধুনিক লেখকদের চটকদার ঘটনানির্মাণের আঘাতে সাহিত্যরস থেকে পাঠক বঞ্চিতই থেকে যান। সাহিত্যরসে নিমজ্জিত গোয়েন্দা, থ্রিলার যে লেখা সম্ভব তা শরদিন্দু বাবুর দেখিয়ে গিয়েছিলেন। বর্তমান লেখকদের তান্ত্রিক, মাইথলজি নিয়ে গিল্টি করা রহস্য গল্পে বিক্ষিপ্ত ভাবে কিছু পাওয়া গেলে সর্বদা অনুপস্থিত থেকে যায় সাহিত্য রস। ব্যঞ্জনা, উপমা এসবের থেকে লেখকরা যেন পরিচিতই নন। তবে ভরসা পাই শাক্যজিৎ বাবুর লেখা পড়ে। বিষয় বৈচিত্র্যই নয়, তার সাথে সমঞ্জস্য রেখে ভাষার ব্যবহার। কী অপূর্ব উপস্থাপন, মনঃস্তাত্ত্বিক চলন! 'একানড়ে'র স্থান বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রহস্যোপনাস্যের তালিকায় থাকা উচিত। এগিয়ে চলুক শাক্যজিৎ বাবুর কলম৷
হ্যাঁ, এ হল বই। খাঁটি ভূতের গল্প বলতে পারেন বা মেটা সাইকোলজিকাল ড্রামা। কিছু না বললেও চলে। অনবদ্য প্লট ও চমৎকার উপস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গত করেছে ভাষা ও ভাবনার বিস্তার। বহুদিন পর বাংলায় এমন কিছু পড়লাম যা খাঁটি আটপৌরে ঘরানার গল্প হয়েও আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠে। বইটা নিয়ে বিশেষ আলোচনা দেখিনি। লেখকের নতুন বই 'শেষ মৃত পাখি' নিয়ে পাঠকরা উচ্ছ্বসিত, কিন্তু 'একানড়ে' বা 'কুর্বানি অথবা কার্নিভাল' অনেকেই পড়েনি। লেখকের কলমের অনুরাগীদের এই বইটিও অতি অবশ্যই পড়তে অনুরোধ করলাম।
আমার পড়া অন্যতম সেরা মনস্তত্ত্বিক থ্রিলার। প্রত্যেকটি অধ্যায়ের ছত্রে ছত্রে অসাধারণ ভাষার ব্যবহারে টুনুর মনখারাপ করা মেঘলা দুনিয়ার অত্যন্ত বাস্তবিক চিত্র তুলে ধরেছেন শাক্যজিতবাবু। চরিত্রগুলোর গভীরতা ত্রুটিহীন, বর্ণনা, উপমা, আবহ দুর্দান্ত, প্লট ইউনিক আর পরিসংহার মাইন্ড বেন্ডিং - ঠিক যেমনটি হওয়া উচিত। একানড়ে পড়ে সত্যিই নড়ে গেছি বলা যেতে পারে। হাইলি রেকমেন্ডেড। তবে মাথায় রাখবেন, উপন্যাসটা পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলবে। আমি অনেক রাত পর্যন্ত ঘুমাতে পারিনি। অলমিতি।
Bengali psychological thriller . Enjoyed reading it so much . Has an incredible plot twist that will make you question everything you've read . The writer blended Bengali lokh kotha with fiction perfectly. This book also deals with several serious psychological issues .