একটা ট্যাক্সি। পিছনের সিটে তিনজন মানুষ। তিন বয়সের। সামনে ড্রাইভার। বাইরে অঝোর বৃষ্টি। দুপাশের দুজন নেমে যাওয়ার পর ট্যাক্সি ড্রাইভার দেখল মাঝের জন মৃত… একটা বাড়ি, তার ছাদে একজন মানুষ। প্রায় বৃদ্ধ। হঠাৎ একটা শব্দ, দেখা গেল বৃদ্ধের শরীরটা আছড়ে পড়েছে বাড়ির সামনের রাস্তায়। আত্মহত্যা? কিন্তু কেন? এক অষ্টাদশীর সঙ্গে এক প্রৌঢ়ের অবৈধ প্রণয়। পরকীয়া। মেয়েটি বোকা না তার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। দিনের পর দিন লালসার শিকার কি চুপ করে থাকবে? সব প্রশ্নের উত্তর একজনের কাছেই মিলতে পারে। শবর দাশগুপ্ত। গোয়েন্দা বিভাগ। লালবাজার!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বাঙালি সাহিত্যিক।
তিনি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত ময়মনসিংহে (বর্তমানে বাংলাদেশের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন—যেখানে তাঁর জীবনের প্রথম এগারো বছর কাটে। ভারত বিভাজনের সময় তাঁর পরিবার কলকাতা চলে আসে। এই সময় রেলওয়েতে চাকুরিরত পিতার সঙ্গে তিনি অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের বিভিন্ন স্থানে তাঁর জীবন অতিবাহিত করেন। তিনি কোচবিহারের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। শীর্ষেন্দু একজন বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি আনন্দবাজার পত্রিকা ও দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িত।
তাঁর প্রথম গল্প জলতরঙ্গ শিরোনামে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। সাত বছর পরে সেই একই পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে তাঁর প্রথম উপন্যাস ঘুণ পোকা প্রকাশিত হয়। ছোটদের জন্য লেখা তাঁর প্রথম উপন্যাসের নাম মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি।
বৃষ্টিমুখর দুর্যোগের রাত। সিঁথির মোড় থেকে সুমিতের ট্যাক্সিতে ওঠে তিনজন প্যাসেঞ্জার। দুজন পুরুষ। এক মহিলা। তার গাড়িতে তারই অজান্তে ঘটে যায় এক চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড। বুঝে ওঠার আগেই আততায়ীরা হাওয়া। মৃতদেহ পুলিশ স্টেশনে নিয়ে যায় সুমিত। সন্দেহের তীর নিবদ্ধ হয় তারই দিকে।
তদন্তে নামে শবর দাশগুপ্ত!
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের শবর কাহিনীগুলোর মান গল্প-প্রতি বদলে যায়। চরিত্রটিকে নিয়ে যেমন, 'ঋণ' বা 'সিড়ি ভেঙে ভেঙে'-র মত অসাধারন কটা উপন্যাস লিখেছেন লেখক। সেভাবেই 'পদক্ষেপ', 'আলোয় ছায়ায়' বা 'মারিচ' এর মতন কিছু মহা-দায়সারা গল্পেও শবরকে উপস্থাপিত করেছেন উনি। এই স্কেল অনুযায়ী, 'তীরন্দাজ' এর অবস্থান মাপকাঠির মাঝ-বরাবর কোথাও। অরিন্দম শীলের নতুন ছবিখানা কদিন আগেই প্রেক্ষাগৃহে দেখে আসার দরুন গল্পের পরিণতি অজানা ছিল না। আশ্চর্য হলাম না তাই।
তবে, সাসপেন্স ফ্যাক্টর কম থাকলেও ছোট উপন্যাসখানি পড়ে নিদ্রা যাওয়ার জো নেই। লেখকের কলমগুণ তো আছেই। সাথে, সমান্তরাল ন্যারেটিভে বস্তি-জীবনের প্রতিচ্ছবি। পঙ্কিল এক জগতের অসুস্থ উজানে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখে কিশোরী দিয়া। ভালো-খারাপের মাঝে, স্বপ্ন দেখে তার 'বুলুদা' সুমিতকে নিয়ে। তাতে অঙ্কুরিত হয় নতুন প্রেমের গুঞ্জন। (এহেন সম্পর্কের অসমবয়সী পরিণতি নিয়ে আদালতে মামলা করতে চাইলে, করতেই পারেন। আমি আগ-বাড়িয়ে আটকাতে যাবো না। জয় শীর্ষেন্দু!)
শবরের ডায়ালগ বরাবরের মতই মনোরঞ্জক। কাঠখোট্টা, স্ট্রেট-টু-পয়েন্ট, শুকনো। ড্রাই-হিউমারে সিক্ত। আফসোস একটাই। সংলাপ ও ইন্টারোগেশনের বাইরে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় শবরকে আলাদা ভাবে কোনোদিনই তুলে ধরলেন না। চরিত্র হিসেবে লালবাজারের এই আইকনিক গোয়েন্দাটি তাই মাঝেমধ্যেই মাত্রা হারায়। এছাড়াও চোখে লাগে, গল্পে নারী চরিত্রদের সংলাপ। ভিন্ন সামাজিক স্তরের ভিন্ন নারীদের মুখেই, মাগো, ওমাগো, বাবাগো, ইস, এমা, প্রভৃতি শব্দসমষ্টিদের সার্বজনীন বাড়াবাড়ি। যা আখেরে... স্টিক্স আউট লাইক এ সোর থাম্ব!
তবুও সব মিলিয়ে তিনটি তারা। সিরিজের অনেকগুলো গল্পের থেকে এ জিনিস অনেকগুণ বেটার। তীরন্দাজের তীর লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে হতেও হলো না তাই।
শবর দাসগুপ্ত সিরিজের মোটামুটি চলনসই রকমের একটা থ্রিলার। লেখকের স্বাদু বাচনভঙ্গির জন্যে টানা পড়ে ফেলা যায়। শুরুটা বেশ সাদামাটা হলেও, ক্লাইম্যাক্সে এসে ভালোই লেগেছে। আগাগোড়া সংলাপ নির্ভর।
"ঈগলের চোখ" দিয়ে আমর শবর সাথে পরিচয়। তবে প্রথম বই টা তেমন টানে নি। কেমন জানি খাপছাড়া লেগেছিল।
এবার দ্বিতীয় টা পড়লাম,"তীরন্দাজ "। ঈগলের চোখের তুলনায়,এটা বেশ ভালো। তবে আহামরি নয়। সত্যি বলতে কী আমার গোয়েন্দা গল্পের মত লাগেই নি! গোয়েন্দা গল্পের চেয়ে,প্রেম কাহিনি মনে হয়েছে বেশি! কয়েকজন কে জেরা করল,কথার মধ্যেই হুট হাট তদন্ত শেষ! কেমন জানি মেকি ঠেকল আমার কাছে। গোয়েন্দা গল্পে একটু উত্তেজনা, মারমার কাটকাট ভাব,একটু ঘোরেল গল্প এসব না থাকলে ঠিক জমে না। যদিও আমি গোয়েন্দা গল্পের পাঠক নই,আমার এসব মারকাটারি ভালো লাগে না। তাও,বেশ কয়েক খানা গল্প আমার পড়া হয়েছিল,সেই নিরিখে বললাম আরকি!
শীর্ষেন্দু বাবুর একটা ধর্ম হচ্ছে, উনি খুব একটা বিয়োগান্তক জিনিস পছন্দ করেন না। সেটা উনার লেখা পড়লে বোঝা যাবে। এবার মজার ব্যাপার হলো মহাশয় ব্যাপারটা গোয়েন্দা গল্পের মধ্যে ও আনলেন,শবর অপরাধী কে ক্ষমা করে দেয়,যদি সেটা খুনের মত ভারী কিছু না হয়। গোয়েন্দার ক্ষেত্রে এ জিনিস টা ঠিক মানানসই নয়,আমার মনে হয় আরকি! তবে, এসব কোন জোরালো ব্যাপার নয়। শুধু শীর্ষেন্দু বাবুর অসাধারণ লেখার জন্য এসব বই অনায়াসে পড়া যায়। লেখা নয়,যেন মাখন।
'শবর' সিরিজের কাহিনীগুলি মূলত সংলাপ-নির্ভর । এই কাহিনীগুলিতে টানটান রহস্যের চেয়েও 'মনস্তাত্ত্বিক' বিষয়গুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে । তবুও শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের ঝরঝরে গদ্যের কারণে পড়তে খারাপ লাগে না ।
শুরুরদিকে অতি শ্লো গেলেন উনি, বুলুদার চরিত্র ঠিকঠাক জাস্টিফাই করেছেন বলে মনে হয় না, তারপর হুটহাট অনেকগুলি চরিত্র এলো গেলো মনে হলো গল্প বড় করার ইচ্ছা ছিলো।
▫ বিষয়বস্তু ▫ ঝড়বৃষ্টির রাতে টেক্সির ভিতরে তিনজন যাত্রী উঠে যার মধ্যে একজন, সীতানাথ সমাদ্দার নামের বিত্তবান লোক খুন হয়, ড্রাইভার সুমিত ঘোষাল, ডাক নাম যার বুলু, তার ওপরেই স্বভাবিক ভাবে সন্দেহ জন্মায়। কিন্তু কেসটা কি এতই সোজা? ওদিকে যে বলাইবাবুর কাছ থেকে সীতানাথ কারখানাটা কিনে নেয়, সে কারখানা বিক্রির পরপরই ছাঁদ থেকে পড়ে মারা যান। তার এই অপঘাতে মৃত্যুটা সুইসাইড নাকি খুন, না কেবলই এক্সিডেন্ট, এক বাক্যে বলে দেয়া যায় না। লোকটার মৃত্যুতে সবথেকে বেশি লাভ হয় সীতানাথ সমাদ্দারের। ওদিকে সীতানাথ আর সুমিত দুজনের সঙ্গেই পরিচিত তৃতীয় যে ব্যক্তির ছায়া বারবার এসে আছড়ে পড়ে সম্পূর্ণ গল্পের ওপর তার নাম লাট্টুরাম, গোবিন্দপুর বস্তির একজন প্লাম্বার, যাকে শবর দাসগুপ্ত আখ্যা দিয়েছেন 'মার্ডার আর্টিস্ট' কিংবা 'হত্যাশিল্পী' হিসেবে।গোটা তদন্তের সাথে সে কিভাবে জড়িত? এই খুনগুলো কি লাট্টুরামই করলো? কিন্তু কেন? কার কথায় সে এ কাজ করলো? খুনের মোটিফটা আসলে কি? সীতানাথ সমাদ্দারের ব্যবসায়িক কোনে শত্রু নাকি তার যৌবন বয়সে নেয়া কোনো ভুল সিদ্ধান্ত? ▫ পাঠপ্রতিক্রিয়া (Goodreads) ▫ এই গল্পটা মোটামুুটি ভালোই লেগেছে। শবর অন্য গোয়েন্দাদের মতো না হলেও তার ইন্টারোগেশন ক্ষমতাটা চমৎকার। পড়তে পড়তে একটা অদৃশ্য জালে জড়িয়ে ফেলে পাঠকদের। মনে হয়, সেই ঘরে বসে সামনে থেকে দেখছি পুরো ঘটনাটা। শবরের গল্পে শুধু রহস্য থাকে না। গল্পগুলোতে প্রেম, ভালোবাসা, প্রতারণা, সমাজের অস্থিরতা, তথাকথিত সভ্য সমাজের ভেতরের চেহারা দারুণ ভাবে উপস্থিত থাকে। তাই কোনো গল্পকে মোটা হরফে ডিটেকটিভ নভেল না বলে সামাজিক উপন্যাস বলা চলে, যার মাত্র একটা অংশে থাকে রহস্য আর তদন্ত, আর সেখানেই পুরো উপন্যাসের মধ্যমণি শবরের দৃপ্ত পদচারণা।
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র হলো শবর দাশগুপ্ত, লালবাজারের গোয়েন্দা। রহস্য সমগ্র তে এর সব গল্প আছে। এই গল্পটি নেই। এটা আলাদা করে দে'জ বের করেছে। যদিও ঝাঁপি নামের ওনার আনন্দের একটি বইতে এই গল্পটি আছে।
🔹 বিষয়বস্তু 🔹
সুমিত হল একজন ট্যাক্সি চালক। তার ট্যাক্সিতে একটি খুন হয়ে যায় তার ট্যাক্সি চালানোর সময়ে। অথচ সে কিছু জানে না খুনের ব্যাপারে। যথারীতি এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তদন্ত চলে এই নিয়ে। তদন্তকারী অফিসার শবর দাশগুপ্ত, লালবাজার গোয়েন্দা বিভাগ। এর সাথে চলতে থাকে আরো কিছু কাহিনী । শেষ পর্যন্ত সব একসাথে গিয়ে মেশে না অন্য রহস্য সৃষ্টি করে তার উত্তর বইতে আছে। শেষ পর্যন্ত শবর কি ধরতে পারে খুনিকে?.... জানতে হলে বই পড়তে হবে।
🔶 এর আগে আমি শবর এর কোনো কাহিনী পড়িনি। এটা মোটামুটি বেশ আশা নিয়েই শুরু করেছিলাম। কিন্তু গোয়েন্দা কাহিনী হিসেবে খুব নিরাশ হয়েছি। শবরের তদন্দ করার যে ধরণ তা বেশ ভালো। প্লটও খুব ভালো। কিন্তু সাথে যে কাহিনী চলেছে সেটার কোনো দরকার ছিল না। মনে হয়েছে শুধু গল্পটা বাড়ানোর জন্য এমনভাবে লেখা। লেখকের লেখার ধরণ হলেও গোয়েন্দা কাহিনীতে সেটা একদম ভালো লাগেনি।
মোটামুটি এককথায় এই বইটি পড়ার অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো হলো না। এবার শবর এর কাহিনী পড়ার ইচ্ছেতে কিছুটা ভাটা পড়ল।
🔷 আমার ভালো লাগেনি বলে আর কারোর ভালো লাগবে না এটা নয়। পড়তে পারেন আপনারা। সবার পছন্দ বা ভালোলাগা এক নয়।
গল্পের বেশিরভাগটাই দুই বা ততোধিক মানুষের কথোপকথন অথবা শবরের ইন্টারোগেশনের কথাবার্তা। চলমান অ্যাকশন বলে কিছু নেই। শবর রহস্যভেদ করেন পাঠকদের চোখের আড়ালে এবং হঠাৎই সোজাসুজি ক্রিমিন্যালকে গিয়ে ধাপ্পা দিয়ে হত্যার ইতিহাস তথা মোডাস অপারেন্ডি এলাবোরেট করেন। পরকীয়া-সর্বস্ব কাহিনি। এসব আমার ব্যক্তিগত রুচির বাইরের জিনিস। কিন্তু এতই হালকা চালে লেখা যে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল, পড়তে সমস্যা হয়নি।
শবর সিরিজের এই কাহিনীগুলিতে টানটান রহস্যের চেয়েও 'মনস্তাত্ত্বিক' বিষয়গুলি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শবরের সবচেয়ে দুর্বল উপন্যাস। শুরুটা বেশ সাদামাটা হলেও, ক্লাইম্যাক্সে এসে ভালোই লেগেছে।
ছোট কলেবরে বেশ ভালো একটা বই, প্রথমে স্লো হলেও শেষে ভালোই ক্লাইমেক্স ছিলো। গোয়েন্দা শবর দাশগুপ্ত সিরিজের বই📚 সত্যি বলতে শীর্ষেন্দুর লেখনীতে ভালোলাগা থাকে😇