ভুল সময়ে সঠিক বই জীবনে এলে কী করেন আপনি? চেয়ার টেনে দেন? বসতে বলেন? নাকি প্যানিক বশে মুখের ওপর দরজা টেনে দেন? একে কী আদৌ প্যানিক বলা চলে? নাকি আফসোসের ছাদনাতলায়, হাঁটু মুড়ে গুম মেরে যাওয়াতেই আসল শান্তি? আমার অবস্থাটা এই মুহুর্তে কতকটা এমনই শোচনীয়। 'বৃশ্চিকচক্র'-এর দোহাই। দর্শনা বোসের কসম। পিয়া সরকার দ্য উওম্যান ইউ আর!
সেই কবে, প্যান্ডেমিক নামক পলাশীর আমলে, 'বিসাশন' পড়ে ওনার কলমের টানে মুগ্ধ হওয়া। আজ এই অ্যাত্ত বছর বাদে, লেখিকা আমার এক রাতের কাঁচা ঘুম প্রায় টেনে হিঁচড়ে ছিনিয়ে নিলেন গায়ের জোড়ে। আর আমি...এই অপগণ্ড আমি...ফ্যালফ্যাল করে বসে থেকে, ট্রেনের রিডিং লাইটের চরম অপব্যবহার করে স্রেফ গোগ্রাসে গিলে নিলাম দর্শনার যাবতীয় ট্র্যাজেডি!
সত্যি বলছি। তিন কি চার, পাঁচ, সাত, দশ.. অনেকগুলো সত্যি! বাড়িয়ে বলে আমার কী লাভ? আমি গাধা হতে পারি (নইলে এমন সিরিয়াস বই নিয়ে কেউ ট্রেনে ওঠে?) কিন্তু গ্যাসওয়ালা নই। ফাঁপা কাঠামোয় হাওয়া মেরে আমার মুনাফা কোথায়? আমি স্রেফ মাথায় রাখি মুগ্ধতার মারণ ছবি। লেয়ার্ড টেনশন। বাস্তবধর্মী চরিত্রচিত্রণ। সাথে লেখিকার কনফিডেন্ট গদ্যে, দর্শনার ফ্যাকাশে উপলব্ধি ও স্বাধীন পুলিশি স্বেচ্ছাচার। প্রসিডিউরলের প্রাপ্তবয়স্ক কারাগারে, সমাজ নামক এক সাময়িক নাট্যমঞ্চের ট্র্যাজেডি-সম বিকৃতি!
অগত্যা, রাতবিরেতে প্রায় চারশো পাতার বৃহৎ বইখানি শেষ করে, টু-টায়ারের জানালা দিয়ে ঠাঁয় তাকিয়ে থেকে, জোনাকিদের সাথে রংমিলান্তি খেলতে চাওয়াটা ভীষন রকমের স্বাভাবিক। ওতে কোনো মার্কামারা ভুল নেই। ভুল যদি থেকেই থাকে তবে সেটা আমার লেখার ধরণে। যা সময়ের অভাবে লঘু আঁচে রান্না করা শেষপাতের ডেজার্ট সমান। এর ভিত্তিতে কোনো গুরুতর ডিসিশন নেবেন না আবার। দায়িত্বটা পূর্ণতই আপনার নিজের। বাংলা ভাষায় রচিত আধুনিক অপরাধ-সাহিত্য নিয়ে অল্প কৌতুহলী হলেও, বইটা পড়া আপনার কর্তব্য সমান।
হ্যা, মানছি, প্রথম কাহিনী 'বৃশ্চিক' দ্বিতীয়টির তুলনায় যৎসামান্য দুর্বল। তা সে গল্পটির স্বল্প দৈর্ঘ্যই বলুন বা রহস্যভেদের কষ্টকল্পিত পরিণতি। লেখাটি স্রেফ কোনো জেনেরিক গোয়েন্দা গল্পের হিসেবে, নম্বর খোয়াবে অবশ্যই। তবে ক্যারেক্টার ড্রামা? ওয়ার্ল্ড বিল্ডিং? সংলাপ? এখানেই যে লেখিকা আমাদের মাথায় সম্মোহনের গোলাপ জল ছিটিয়ে দেন। আমরা, বোকা পাঠকেরা, চাইলেও উঠে আসতে ভুলে যাই। অন্ধকারে দেওয়াল হাতড়াই কেবল। লাইটের সুইচ বা দরজার অভাবে বসে থাকি ঠাঁয়। নাকে ভেসে আসে, হোল্ডিং সেলের পরিযায়ী আঁশটে ঘ্রাণ...
কবিতা নয়। লেখিকার কল্পিত জগৎ জুড়ে কেবল রক্তের দাগ। সহস্র কত টেনশনের সিঁড়িতে ত্রিমাত্রিক ট্রমার অ্যাসিডিক বৃষ্টিপাত। যা প্রজন্মগত। আক্ষরিক। ও যারপরনাই বাস্তব। স্রেফ দর্শনার খাতিরে। মেয়েটির মানসিক দ্বন্দ্বের তুমুল তাড়নায় ক্ষমা করা যায় ন্যারেটিভ দুর্বলতা। ভুলে থাকা যায় প্লট-হোলের জোৎস্নাময় ঝাকুনি।
আর না করে উপায়টাই বা কী?
বইয়ের দ্বিতীয় তথা সেরা উপন্যাস, 'বৃশ্চিকচক্র' অবধি পৌঁছতে হলে, অল্প-বিস্তর হোঁচট খাওয়াটা যাকে বলে ডিজার্ভড রাইট অফ প্যাসেজ। লেখাটি, আমার মতে, বাংলা ভাষায় রচিত এযাবৎ সমস্ত প্রসিডিউরালদের ভিড়ে, অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। অন্যতম গুরুত্বপূর্ণও বটে। লেখিকার কলম এই দ্বিতীয় প্রান্তে আরও ধীর। আরও স্থির ও কনফিডেন্ট। তীক্ষ্ণ যত্নের কাঁধে সংযমের প্রাপ্তবয়স্ক সহাবস্থান। হিন্টারল্যান্ড রাজনীতি। মাওবাদী ইতিহাস। কেজো পুলিশী লেগ-ওয়ার্ক। সমাজ-বিরোধী বাস্তবতা। রিচুয়াল হত্যা। সেরিব্রাল ককটেল। আমলাতন্ত্রের ক্লান্তিময় হাই-ফাইভ। ইত্যাদি। ইত্যাদি।
এই এত কিছুর বিনিময়ে, লেখিকা আপনার কাছে কেবল একটা জিনিসই চাইবেন। ধৈর্য। এক চিমটে ধৈর্য। দিতে পারবেন, আশা করি। না দিলে, দিনশেষে, আপনারই ক্ষতি। স্রেফ তাড়াহুড়োর তাগিদে, এমন একটি সুগঠিত, বাস্তবানুগ পৃথিবীর দোরগোড়া হতে খালি হাতে ফিরে আসতে হবে। বিশ্রী হবে একেবারে।
পারবেন না বলুন? স্রেফ অল্প একটু ধৈর্য। ব্যাস! দেখবেন কী নিপুণ হাতে, লেগো সেটের ধূসর টুকরোগুলো নিয়ে মানচিত্র সাজিয়েছেন লেখিকা। কী সহজে, গোয়েন্দা কাহিনীর ট্র্যাডিশনাল পাল্পি হৃদয়টিকে হাতে রেখে, সিনেমার সেপিয়া ফোকাসে, একটি কালো, কষ্ট-সর্বস্ব ট্র্যাজেডি গড়ে তুলেছেন পিয়া সরকার...
অগত্যা, শুরুতে যা বলেছিলাম, শেষেও তা। দ্য উওম্যান ইউ আর! লেখিকা। দর্শনা। দুজনেই। দ্য উওমেন ইউ বোথ আর!
পুলিশ অফিসার দর্শনা বোসের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল ২০২০-র 'একচালা' পূজাবার্ষিকীতে প্রকাশিত 'বৃশ্চিক'-এর মাধ্যমে। সেই লেখাটি শুধু আমায় নয়, এই সময়ের প্রায় সব রহস্য-রোমাঞ্চ সাহিত্যের অনুরাগীকেই মুগ্ধ করেছিল। তখন থেকেই দাবি উঠেছিল, দর্শনাকে যত দ্রুত সম্ভব ফিরিয়ে আনার। তিনি ফিরলেন এই বইয়ের মাধ্যমে। শক্ত মলাটে, ভালো বাঁধাই এবং মোটা কাগজে পরিষ্কার ও নির্ভুল ছাপায়, ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলংকরণে সমৃদ্ধ হয়ে আমাদের কাছে এসে পৌঁছোল মোট দু'টি লেখা~ ১) বৃশ্চিক; ২) বৃশ্চিকচক্র। এই দু'টি কাহিনি নিয়ে সংক্ষেপে কিছু বলতে গেলে একগাদা স্পয়লার বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা আছে। তাও লেখার চেষ্টা করি। প্রথমটি বড়োগল্প। তার বিষয় হল একটি খুনের তদন্ত। কিন্তু সেই তদন্তের সূত্রে একে-একে বেরিয়ে এল অনেক পুরোনো পাপ আর তার দীর্ঘতর ছায়া। শৈশব থেকে যে অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে চলেছে দর্শনা, তারই সঙ্গে মিশে গেল সেই ছায়ারা। গল্প শেষ হল একবুক উৎকণ্ঠায় পাঠককে রেখে। দ্বিতীয়টি উপন্যাস। এও আপাতভাবে একটি খুনের তদন্ত। কিন্তু তারই মধ্যে মিশে আছে বাংলার রাজনীতি আর রক্ত— দুইয়েরই লাল রঙ। এরও শেষে, অনেক আগুন পেরিয়ে, দর্শনা পেল তার জীবনের আরও একটি ধাঁধার সমাধান। কিন্তু এবার কোনদিকে যাবে সে? তিনটি কারণে এই বইটিকে আমি রহস্যপ্রেমীদের অবশ্যপাঠ্য বলে দাবি করব। তারা হল~ (১) রাজর্ষি দাস ভৌমিকের 'কলকাতা নুয়া'-র মতো এও এক নিবিড়ভাবে বাস্তবানুগ পোলিস প্রসিডিওরাল। কিন্তু এর রূপ, রস, গন্ধ ও স্পর্শ— ওই সিরিজের থেকে একেবারে আলাদা। পদ্ধতির প্রতি বিশ্বস্ত থেকেও এটি দারুণভাবে ভাববাহী। অজস্র সীমাবদ্ধতার মধ্যেও আইনরক্ষকেরা কীভাবে সত্যের সন্ধানে এগিয়ে যেতে পারেন (এবং যান)— তার এক দুর্ধর্ষ নিদর্শন এই দু'টি তদন্ত। (২) দর্শনা বোসের মতো রক্ত, ঘাম, অশ্রু দিয়ে গড়া বাস্তব রহস্যভেদী বাংলায় এর আগে আমরা কক্ষনও পাইনি। এই চরিত্রটির সঙ্গে পথ চলার টানেই এই বই পড়ে যেতে হয়। (৩) রাজনীতি বস্তুটিকে রহস্য কাহিনিকারেরা এড়িয়ে চলেন নানা কারণে। এই দু'টি উপন্যাস কিন্তু ভীষণভাবে ব্যতিক্রমী। এখানে বাংলার রাজনীতি নিজেই একটা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। অথচ কেঠো বিবৃতি বা প্রোপাগান্ডার ফাঁদ এড়িয়ে লেখা দুটো দাবার চালে বোড়ে হয়ে পড়া অসহায় মানুষদের কেন্দ্রে রেখে এগিয়েছে। তার সঙ্গে যুক্ত হয় মনস্তত্ত্বের গভীর প্রয়োগ। ষড়রিপুর সঙ্গে মিশে যান সুকুমার রায়। আর সবার উপরে থাকে বিষে নীল হয়ে যাওয়া এক সময়— যার স্রোতে ভেসে যায় দেশ, সমাজ, সম্পর্ক। 'বৃশ্চিকচক্র' শুধু পড়তে শুরু করুন। বাকিটা এই লেখারাই করে নেবে। আর তারপর আমার মতো আপনিও ভাববেন, "আবার কবে দর্শন দে��ে, দর্শনা?" অলমিতি।
বৃশ্চিক পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, বৃশ্চিকচক্রও হতাশ করেনি। এবার দর্শনা বোস ফিরেছে আরও বড় পরিসরে, রহস্যের জাল এবার আরও জমাট বাঁধা। নিখুঁত পুলিশি তদন্ত, ডিটেইলিংয়ের সাথে বামপন্থী উগ্রবাদী রাজনীতি, ভেতরের দুর্নীতি, স্পাইয়িং, মাফিয়া কারবার যুক্ত হয়েছে। দুটো ভিন্ন জায়গায় একের পর এক বীভৎস খুন, এরপর পিয়াজের খোসার মত রহস্য উন্মোচন, ফরেনসিক ডিটেইল, ন্যারেটিভ সবমিলিয়ে ভালোই উপভোগ করলাম। শেষে বেশ কয়েকটা ভালো টুইস্ট আছে। দুয়েকটা যদিও আন্দাজ করতে পেরেছি, তবুও ব্যাখ্যা মনঃপুত হয়েছে। আউট অফ ব্লু কিছু নেই। পুরো বইই ভালো লেগেছে, তবে মাওবাদীদের কর্মকাণ্ড মধ্যখানে একটু বিরক্তির উদ্রেক ঘটিয়েছে। সবমিলিয়ে যাদের পুলিশ প্রসিডিওরাল পছন্দ তাদের জন্য রিকমেন্ডেড।
বেশ ভালো। অনেক দিন পরে বাংলায় এরকম কড়া গোয়েন্দা কাহিনি পড়লাম। দর্শনার চরিত্রটাও দুর্দান্ত লাগলো, সাথে পুরুলিয়ার প্রকৃতির সুন্দর বর্ণনা। পায়খানার বর্ণনা একটু কম হলে পাঁচতারা দিতাম।
অতঃপর শেষ করলাম। কিন্তু শেষ করার পর একটাই অনুভূতি হচ্ছে আর সেটা হলো দর্শনা বোসের মত আমার নিজেরও ভেতরটা দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে। কিছু কিছু সত্য হয়ত অপ্রকাশিত থাকাই মঙ্গল।
পাঁচ তারকা দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু মাওয়িস্টদের নিয়ে একটু বেশি আলাপ বিলাপ পছন্দ হয়নি ওটা পাশ কাটিয়েও হয়ত যাওয়া যেত কোনোভাবে।
দর্শনা বোস সিরিজের নতুন বই 'নিষাদ' পড়বো বলে ভাবলাম আগেরগুলোয় চোখ বোলানো যাক। সিরিজের প্রথম বই 'বৃশ্চিক' আগে পড়া ছিলো, তাই সেটা রি-রিড হলেও 'বৃশ্চিকচক্র' আগে পড়িনি।
দর্শনা বোস এবারেও দারুণ গল্প নিয়ে এসেছেন। এবারেরটা আগেরটার সাথে বেশ অনেকটাই লিংকড, কিন্তু আরো বৃহৎ পরিসরে। নিশ্ছিদ্র থ্রিলার হিসেবে এটাও বেশ উপভোগ করেছি। বেশি ভালো লেগেছে দর্শনা বোসের পার্সোনাল ট্রাজেডিটার লিংকটা এত সুন্দরভাবে মিলিয়ে ফেলতে পারার ব্যাপারটা। জানি না প্রথম বইটা লেখার সময়ই লেখক এটা মাথায় রেখেছিলেন কিনা। তবে যেটাই হোক দারুণ লেগেছে ব্যাপারটা।
#আমার_বইপড়া_২০২২ #শুভর_আলোচনায় #bookish_subhajit 📎 বই- বৃশ্চিকচক্র 📎 লেখিকা- পিয়া সরকার 📎 প্রকাশনা- আনাড়িমাইন্ডস পাবলিকেশন 📎 মুদ্রিত মূল্য- ৪০০/- 📎 পাতা- ৩৬০ টি 📎 প্রচ্ছদ- অর্ক চক্রবর্তী 📎 অলঙ্করণ- ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য 📎 হরফসজ্জা - ঋতাক্ষর 📎 হার্ড বাইন্ডিং, জ্যাকেট সহ -------------------------------------------------------- 📎 এই বই নিয়ে একটাও কথা বলার আগে, আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি লেখিকা দিদি পিয়া দি এর কাছে। কারণ এই বই আমি কলকাতা বই মেলার আগেই পড়ে ফেলেছি। এবং এর রিভিউ এর কিছু অংশ তখন থেকেই লেখা হয়ে ছিলো। তাও এই পাঠ অনুভূতি জানতে বেশিই দেরী হয়ে গেলো তাই। ------------------------------------------------------- 📎 প্রচ্ছদ- প্রচ্ছদ শিল্পী অর্ক চক্রবর্তী বাবু এই বই এর ক্ষেত্রে একটা অন্যরকম একটা অন্য ধারার কাজ দেখিয়েছেন তা প্রচ্ছদ দেখলেই যে কেউ বলে দেবে। আমাদের এক ম্যাম বলেন সাদা আর কালোর কম্বিনেশন হলো পৃথিবীর সবথেকে শ্রেষ্ঠ কালার কম্বিনেশন। আর এই বই এর প্রচ্ছদ হলো সেই শ্রেষ্ঠ এর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত একটি ছবি। অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন একটি কাজ।
📎 অলংকরণ- ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্য এই একটা নামই হয়তো যথেষ্ঠ বই এর অলংকরণ কেমন তা বোঝানোর জন্য। বই এ ছবি বিশেষ নেই, কিন্তু যেটাই আছে সেটা দেখার পর মুখ থেকে একটাই কথা বেরিয়ে আসে মার্ভেলাস অ্যান্ড মাইন্ডব্লোইং ।
📎 বই এর বাঁধন এবং পাতার মান- এই বই এর প্রকাশনা সংস্থা হলো 'আনাড়িমাইন্ডস পাবলিকেশন' এনাদের কোন বই আমি এর আগে পড়িনি। কিন্তু এনাদের এই বই কাজ আমাকে মুগ্ধ করেছে। কারণ ৩৬০ পাতার অবয়বের একটা বইকে এত সুন্দর ,মজবুত, এবং সবথেকে বড় কথা এত ছিমছাম ভাবে বাঁধাই হয়তো বড় বড় প্রকাশনাও করতে পারেনা। কিন্তু এনারা সেটাই করেছেন চরম দক্ষতার সাথে। আর পাতার মান বেশ উন্নত। ধন্যবাদ প্রকাশনা এর পুরো টিমকে। এত সুন্দর ভাবে বইটিকে উপস্থাপন করার জন্য। -------------------------------------------------------- 📎 বিষয়বস্তু- " তিমিরহননে তবু অগ্রসর হ’য়ে আমরা কি তিমিরবিলাসী? আমরা তো তিমিরবিনাশী হ’তে চাই। আমরা তো তিমিরবিনাশী।" - জীবনানন্দ দাশ ভাবছেন এই রহস্য উপন্যাস এ হঠাৎ করে জীবনানন্দ দাশ এলো কেন, আর এই কবিতাটা ই বা এলো কেনো। না এটা আমি নিজের মন থেকে লিখিনি, এটা স্বয়ং লেখিকা লিখেছেন একদম শুরুতেই, তবে এর অর্থ অনেক অনেক অনেক গভীর, এর অর্থ লুকিয়ে আছে একদম পৃথীবির কেন্দ্র, আর সেই কেন্দ্রেই আবর্তিত হয়েছে এই বই এর দুই উপন্যাস, বৃশ্চিক এবং বৃশ্চিকচক্র। এই দুটি উপন্যাস নিয়ে পৃথক ভাবে বিষয়বস্তু বলার আগে বলি এই দুটি উপন্যাস এর নায়ক বা নায়িকা যাই বলুন না কেন, তিনি হলেন ইন্সপেক্টর দর্শনা বসু। তার তদন্তের কাহিনী হলো এই দুই উপন্যাস। দর্শনা বোস, সে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সাব ইনস্পেক্টর। এই উপন্যাস দুটী তাঁর জীবনের কথা বলে আমাদের। তাঁর বুদ্ধি প্রখর , তাঁর দৃষ্টি যেন মাইক্রোস্কোপিক। আর অবজারভেশন পাওয়ার তুখোড়। যে কোন গোয়েন্দাপ্রেমী মানুষকেই তার ব্যাক্তিত্ব মুগ্ধ করে দেবেই দেবে। তার চরিত্রের আর একটি বড়দিক হলো ঠান্ডা মস্তিষ্কের মানুষ, আর সেই কারণে কেশ যেন আরো বেশি সরল হয়েছে। এই দুটো উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে দর্শনা এর জীবনের অতীতের কাহিনী, আর সেই অতীত আমাদের অনেকের অতীতের মতই অন্ধকার। সেখানে আছে শুধুই দুঃখ, আছে শুধুই বেদনা। আছে এক ভয়ানক খেলা, এক রক্তাক্ত জীবন দর্শন। যাই হউক এই ভাবেই দর্শনা হয়ে উঠেছে অনবদ্য এবং অন্যান্য। এই দর্শনা এর সাথে আমার প্রথম আলাপ একচালা এর শারদীয়া পত্রিকাতে। আর সেখানেই আমাকে মুগ্ধ করেছিলো পিয়া দির এই চরিত্র। যাই হোক এবার বলি উপন্যাস দুটি নিয়ে কিছু কথা। তবে একদমই বেশি বলবো না। কারণ এই দুটো উপন্যাস পরস্পরের পরিপূরক। এরা একই সুতোয়া গাঁথা দুটি সুগন্ধি ফুল। তাই সামান্য কিছু কথা। 🔪 বৃশ্চিক- এই উপন্যাস এর পটভূমি রচনা হয়েছে আমার নিজের জেলা বর্ধমান এর এক গ্রাম নবগ্রামে। আর এই নবগ্রামে খুন হয় এক মেয়ে মৌপিয়া হালদার। তার খুন নিয়ে শুরু হয় তদন্ত। সেই তদন্তে পুলিশ প্রথম ধরে মৌপিয়া এর প্রেমিক বিধান কে। তারপর শুরু হয় জিজ্ঞাসাবাদ। এরপর এই কেশ মোর নেই এক অন্যদিকে, এই কেশ এর তদন্ত করতে নামে দর্শনা বোস। তারপর আরো জমজমাট হতে থাকে রহস্যের জট। আর দর্শনা তার ঠান্ডা মাথায় সাজাতে থাকে রহস্যের চক, তারপর একের পর এক কাটতে থাকে রহস্য জালের প্রতিটি জট, প্রতিটি দড়ি। অবশেষে ঘটে এক চমকপ্রদ ব্যাপার, কিন্তু তার মাঝেও ���টে অনেক রোমাঞ্চকর ঘটনা, যার সাক্ষী আমরা পাঠকরা। কে খুন করলো মৌপিয়া কে? তার মোটিভ কী? নাকী এই খুন নিতান্তই এক দুর্ঘটনা? এর পিছনে কোন আরো বড় ষড়যন্ত্রের ছক নেই তো? কেন উপন্যাস এর শেষ পর্যন্ত চরিত্রদের এক গোপন ঘেরাটোপে রাখা হল? এই সবকিছুর উত্তর দিয়েছে এই লেখা। তবে শেষ এর চমককে যে মারাত্মক বললেও কম বলা হবে, তা উপন্যাস টা যখন পড়বেন তখন বুঝতে পারবেন। আর এই উপন্যাস ই বীজ বুনেছে পরবর্তী রহস্যের।
🔪বৃশ্চিকচক্র- এই সেই রহস্য যার বীজ বুনেছিলো বৃশ্চিক। তবে এই উপন্যাস নিয়ে বেশী কিছু বলবো না, কারণ একটা শব্দেই হতে পারে স্পয়লার। তাই এটু��ু বলছি এই উপন্যাস ও এক খুনের তদন্ত এরই উপন্যাস। তবে এখানে যেমন আছে খুন যখম এর কালো রক্ত, ঠিক তেমনই আছে রাজনীতি এর রক্ত। আর রয়েছে লেলিহান শিখায় প্রজ্জ্বলমান লাল গনগনে আগুন, আর সেই আগুনের মধ্যেই সীতার ন্যায় হেঁটেছে দর্শনা। আর হয়ে উঠেছে কঠিন থেকে কঠিনতম। হয়ে উঠেছে রক্তে, মাংসে, আগুনে মাখা এক বাস্তব রহস্যভেদী চরিত্র। আর এই উপন্যাস এও দর্শনা সন্ধান পায় তার জীবনের আর এক অজানা অধ্যায় এর। যার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষমতা হয়তো আমাদের মত সাধারণ মানুষের নেই, কিন্তু তা দর্শনার আছে। আর এখানেই আবার সে হয়ে উঠেছে অনন্যা হয়ে উঠেছে প্রথমা। কিন্তু তার সাথে তার জীবনের স্রোত ও দিক পরিবর্তন করেছে। এবার তার জীবন কোন পথে যাবে? সেটার অপেক্ষায় থাকলাম। ------------------------------------------------------- 📎 এই বই এর খারাপ লাগার দিক আমার কাছে অন্তত কিছু নেই। তাই এখানে শুধুমাত্র ভালো লাগার দিক গুলোই উল্লেখ করলাম, বা বলা ভালো এই দিক গুলোর জন্যই একবার নয় বারবার এই বই পড়া যায়, আর এই দিক গুলোর জন্য এই বই হয়ে উঠেছে অনবদ্য। ১.) পিয়া দি এর লেখনী দক্ষতা। অসাধারণ রকমের আকর্ষণীয় এবং মনগ্রাহী, টানটান উত্তেজনা পূর্ণ লেখনী। মেদহীন ঝড়ঝড়ে লেখা যে কোন পাঠককে মুগ্ধ করতে বাধ্য। ৩৬০ পাতায় কোথাও বোরিং ফিল হয়নি, কোথাও মনে হয়নি এটা ওই রকম হলে ভালো হতো। ২.) দর্শনা বোস এই একটা চরিত্র কে দিদি সৃষ্টি করেছে নিজের জীবনের সবটুকু দিয়ে। কারণ তা না হলে হয়তো এই রকম চরিত্র সৃষ্টি করা কঠিন কাজ। এত বাস্তবতা এর সাথে মুগ্ধতা এখন আর কোন চরিত্রেই পাওয়া যায় না। ৩.) এই উপন্যাস দুটি রহস্য উপন্যাস হলেও এরা সাহিত্যরসে, রুপে, গুনে অনন্য। অসাধারণ । ৪.) ইনফরমেশন এবং মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের সাথে রাজনিতী আর রহস্য মিলে মিশে বিষয়টা ঠিক যেন জমে ক্ষীর। -------------------------------------------------------- 📎 বই এর অভার অল রেটিং- ( ৫/৫) ⭐⭐⭐⭐⭐ ------------------------------------------------------- 📎 পিয়া দি এর কাছে দাবি থাকলো দর্শনা কে যত তাড়াতাড়ি পারো আবার নিয়ে এসো। কারণ এই লেখার পর অপেক্ষা করা বড্ড কঠিন কাজ। আর দিদির আরও লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। -------------------------------------------------------- ধন্যবাদ সকলকে 🙏 ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন 😍 আর অবশ্যই সাহিত্যে থাকুন 😍 আরও বেশি করে বই পড়তে থাকুন এবং সমৃদ্ধ হতে থাকুন 🙏😍🤩 এই ধরনের আরও রিভিউ পেতে লাইক করতে পারেন আমার ফেসবুক পেজ Bookish Subhajit কে। এবং সাবক্রাইব করতে পারেন আমার ইউটিউব চ্যানেল Bookish Subhajit কে। ধন্যবাদ 🙏 📸 ছবি- আমার তোলা Piya Sarkar
"বৃশ্চিক" এর চেয়েও ভালো লেগেছে। বৃশ্চিক এ যে ক্লিফহ্যাঙ্গার দিয়ে শেষ করছিল, সেইটার কাহিনীও সুন্দরভাবে এখানে শেষ করছে। সাথে তো এই পর্বের নতুন কেসের দুর্দান্ত ইনভেস্টিগেশন আছেই।
দুটি গল্পের ( উপন্যাসিকা ও উপন্যাস) প্রথমটি যদি ঝড়ের পূর্বাভাস হয় তাহলে দ্বিতীয়টি একেবারে সাক্ষাৎ কালবৈশাখী। একটি বিশেষ অঞ্চলের ইতিহাসের জ্যামিতিতে দম দিয়ে বঞ্চনা,সমাজবাদ, পুলিশি তদন্তের একঘেয়েমি, প্রতিশোধ আর ইস্কাপনের টেক্কার মতো সুকুমার রায় কে সূত্রে ফেলে রহস্যের ক্যালকুলাস কষেছেন লেখিকা।
❛মিথ্যে লড়াই মিথ্যে ফাইট ভেল্কি, ফাঁকি, অলরাইট। শেকহ্যান্ড আর দাদা বল সব শোধবোধ ঘরে চল।❜ পুরুলিয়া জেলার পাহাড়ি এলাকা বাঘমুণ্ডি। একসময় যা ছিল মা ও বা দী দে র আখড়া। খু ন, র ক্ত পা ত, বিপ্লবে পূর্ণ ছিল এলাকাটি। দর্শনা বোসের পরবর্তী পোস্টিং হলো ঠিক এ জেলাতেই। পানিশমেন্ট পোস্টিং বলা যায়। জয়েনিংয়ের প্রথম দিনেই লা শ মেলে ভবেশ বাউরির। সেটা নিয়েই তদন্ত শুরু হয়। সাথে পাবলিকের রোষানল তো আছেই। দর্শনা সাথে অসীমকে নিয়ে সম্ভাব্য কারণ খুঁজতে থাকে। নানা প্রশ্ন বাসা বাঁধে। উত্তর খুঁজতে গেলেই বাঁধা। অ স্ত্র মামলা আর পুলিশের সাথে ডাবল ক্রস করার ফলে পুলিশের খোচর গণেশের দিন কাটছে জেলে। দোলের দিন রহস্যজনকভাবে খু ন হয়ে যায় সেও। ইন্ধনদাতা কে? এক খু নে র তদন্ত শেষ না হতেই ❛গোদের ওপর বিষফোঁড়া❜ এর মতো দেখা দিয়েছে আরেক সমস্যা। প্রাক্তন মা ও য়ি স্ট নেতা নিশীথ মাহাতোকে অপহরণের পর নৃ শং স ভাবে খু ন করা হয়। এলাকায় অস্থির অবস্থা বিরাজ করে। জনমোর্চার পক্ষ থেকে আল্টিমেটাম দেয়া হয়। স্বয়ং ডিআইজি অভিনন্দন রায় হাজির হন। চার্জশিট দাখিল আর সম্ভাব্য খু নি অসীমকে দ্রুত বিচারের আওতাধীন করতে দল গঠন হয় যার নেতা মতিলাল। মতিলালকে সাথে নিয়ে দর্শনা নেমে পড়ে কাজে। তদন্তে উঠে আসে আরো চমকপ্রদ সব তথ্য। ১৫ বছর আগের কেসও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিশীথ মাহাতোর বাড়ি থেকে উদ্ধার হয় বহু পুরোনো এক অ্যাটাচি। যার থেকে পাওয়া এক ডায়েরি নিয়ে তৈরি হয় রহস্য। সুকুমার রায়ের ছন্দে লেখা কবিতা আর কবিতায় হতাশা প্রকাশ। দিবাকর বিশ্বাস, দেবাশিষ মাহাতো সহ আরো কিছু নাম উঠে আসে। নিশীথের হ ত্যা মা ম লা যেন সমাধান হয়েও হয় না। কোথাও একটা কিন্তু রয়ে যায়। নতুন আসা নাম, ১৫বছর আগের পাপ, বর্তমানের কেস কোথাও কি একসূত্রে গাঁথা? নিশীথের মৃ ত্যু র দিনই কী করে গণেশের খু ন হয়? সুতোটা মিলেছে ঠিক কোথায় গিয়ে? একজন দারুণ ব্যক্তি, যার রেকর্ড উজ্জ্বল তার কি অন্য কোনো চেহারা থাকতে পারে? সুন্দর সাফল্যের মুখোশের আড়ালে কী কদর্য থাকে? কারণ প্রদীপের নিচেই তো থাকে অন্ধকার। দর্শনার অতীতের সেই ঘা, যা তাকে প্রতিরাতে দুঃস্বপ্ন দেখায় তার অবসান হবে কি এই অশুভের চক্রে? পাঠ প্রতিক্রিয়া: প্রথম বই ❝বৃশ্চিক❞ প্রায় রোলার কোস্টার বেগে পড়ে শেষ করেছিলাম। দ্বিতীয় কিস্তি রোলার কোস্টার বেগে না ছুটলেও তিনদিন লেগেছে। ❝বৃশ্চিকচক্র❞ প্রথম বইয়ের থেকে স্বাস্থ্যের দিক থেকে বেশ ভালো। এবং কিছুটা ধীরগতির। তবে এটাও পড়তে বেশ লেগেছে। ❝বৃশ্চিক❞ এর শেষ থেকেই ❝বৃশ্চিকচক্র❞ এর সূচনা করেছেন লেখিকা। এখানে আমার সবথেকে ভালো লেগেছে পাহাড়ি এলাকার বর্ণনাগুলো। সাথে ২০১০ পর্যন্ত সে এলাকার রাজনৈতিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি লেখিকা বেশ দক্ষতার সাথে তুলে এনেছেন। রিলেট করেছেন। এ বইয়ের ঘটনা বেশ বিস্তৃত। মা ও বা দীদের তৎপরতা, তাদের দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান আর অসহায় মানুষের আজীবন অসহায় রয়ে যাবার ব্যাপারগুলো লেখিকা দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। এখানে রহস্যের জল ছড়িয়েছেন যেভাবে ঠিক সেভাবেই শেষের দিক জাল গুটিয়ে এনেছেন। অ প রা ধী র অ প রা ধ করার জন্য মনে যে আতশবাজির দরকার তার কারণগুলো বেশ আবেগ দিয়ে লিখেছেন। কল্যাণের নাম করে যারা নিজের আখের ভরে তাদের চরিত্র আর নিপীড়িত মানুষের মুক্তির কথা লেখিকা কয়েকটা চরিত্র দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন। পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। বর্ণনা ছিল প্রচুর। সাথে দর্শনা বোসের পুলিশি বুদ্ধি দিয়ে রহস্য সমাধানের চেষ্টা এবারও মুগ্ধ করেছে। দর্শনা সুপর্ন্যাচারাল কেউ নন। চোখ বন্ধ করেই সব সমাধান করেন না। যুক্তি আর বুদ্ধি দিয়ে বিচার করেন। এই ব্যাপারগুলো দর্শনা চরিত্রকে ভালো লাগতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। অনেকটা আগেই র��স্যভেদ বা খ ল নায়কের ব্যাপারে বুঝে গেছিলাম বা বলা যায় সন্দেহ করেছিলাম। তেমনটাই হয়েছে। শেষের দিকে দর্শনা নিয়ে একটা অতৃপ্তি রয়ে যাবে ভাবছিলাম তখনই লেখিকা সেই অতৃপ্তি ধুয়ে দিয়েছেন। শেষটা খুবই পারফেক্ট ছিল। পুরো উপন্যাসে ভালো লাগার পাশাপাশি কিছু বিষয় বিরক্তিকর লাগছিল। আবার কিছু খটকা ছিল। সেগুলো একটু বলি, *স্পয়লার থাকতে পারে, চোখ বন্ধ রাখুন* প্রথমত, দিবাকর বিশ্বাসের স্ত্রীর ব্যাপারে প্রথম বলার সময় বলেছেন সদ্য বিবাহিতা। কিন্তু পরে বললেন ১৫ বছর ধরে স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন। মানে বিয়ে করেননি। এখানে কি ১৫ বছর আগের সদ্য বিবাহিত অবস্থার কথা বলেছেন না-কি বুঝতে পারিনি। দ্বিতীয়ত, ইদানিং লেখক বা লেখিকাদের মাঝে বাংলায় ইংলিশ লেখায় প্রবণতা অনেক বেশি দেখা যায়। এই লাইনগুলো পড়তে বেশ অস্বস্তি হয়। এ বইয়ের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটা অনেক বেশি দেখা গেছে। এজন্য পড়তে কিছুটা সমস্যা হয়েছে। বাদবাকি ❝বৃশ্চিকচক্র❞ বইটা উপভোগ্য একটি বই। কিছুটা ধীরগতির এবং চমৎকার সমাপ্তির জন্য বইটা পড়ে ভালো সময় কেটেছে।
“আমাদের চারপাশে যে সব প্রিয়জন থাকেন, তাদের হঠাৎ নেই হয়ে যাওয়াটা মানতে এক আলোকবর্ষ সময় লাগে না। ছন্দে গাঁথা প্রতিটা মানুষের জীবন, বিন্দুমাত্র ছন্দচ্যুতিতে প্রাকৃতিক অসুবিধা, জীবনের অসীম অপচয়! কিন্তু যারা সেই ছন্দে কম্পিত হতে অস্বীকার করেন, তাদের উপর ঠিক কতটা প্রতিকূল হয়ে জীবন প্রতিশোধ নেয়, তা আমার জানা আছে। অথচ সেই সব মানুষের প্রতিস্পর্ধাকেই তো আতশবাজির সঙ্গে তুলনা করি আমরা।”
এক অ*স্ত্র ব্যবসায়ীর সাথে যোগাযোগ থাকায় পুলিশি জেরার মধ্যে পড়ে দর্শনা বোস। শাস্তি হিসেবে নবগ্রাম থেকে ট্রান্সফার করে পাঠানো হয় বাঘমুন্ডি তে। পুরুলিয়া জেলার এক পাহাড়ি এলাকা। বর্তমানে শান্ত হলেও রক্তাক্ত এক অতীত ইতিহাস আছে এই এলাকার। মা*ও*বা*দী*রা একসময় আস্তানা গেড়েছিল সেখানে। বর্তমানে ওরকম কোনো সমস্যা না থাকলেও রাজনৈতিক দিক দিয়ে বাঘমুন্ডি খুবই ক্রিটিক্যাল এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। এমনই এক এলাকায় পোস্টিং হয় দর্শনার।
বাঘমুন্ডি থানায় যোগ দেওয়ার প্রথম দিনেই সমস্যায় পড়ে দর্শনা। থানার সামনে জটলার কারণ উদঘাটন করে জানতে পারে ভবেশ বাউরি নামে এক স্থানীয় এর ডে*ডবডি পাওয়া যায় জংগলে। তদন্তে সাধারণ মৃ*ত্যু*র প্রমাণ মিললেও দর্শনার গাটস ফিলিং বলে অন্য কিছু। কিন্তু পুলিশি তদন্তে গাটস ফিলিং এর যে জায়গা নেই। সলিড প্রুফ লাগবে।
নিশীত মাহাতো। বাঘমুন্ডি'র এক প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। তার আরেকটা পরিচয় আছে। সে মা*ও*বা*দী আন্দোলনের সাবেক নেতা। ভবেশ বাউরি'র ঘটনার কিছুদিন পরই নিশীত মাহাতো খু*ন হয়ে যায়। হেভিওয়েট নেতা হওয়ায় উপরমহল থেকে প্রেশার আসে কম সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করার। একজন সাবেক মা*ও*বা*দী এবং প্রভাবশালী নেতার খু*নে*র তদন্ত নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করা সহজ কথা নয়।
নিশীথের বর্তমান ইমেজ ক্লিন। তদন্তে কোনো অগ্রগতি আসে না। কিন্তু তার অতীত! একজন ভয়ংকর মাওয়িস্ট ছিল সে। সে সময়ের কোনো পাপের প্রায়শ্চিত্ত দিতে হয়ত তাকে খু*ন হতে হলো। হঠাৎ করে দর্শনার হাতে একটি ডায়েরি এলো। ছড়ার ডায়েরি। কিন্তু নিশীথ এর সাথে ছাড়ার ই বা কি সম্পর্ক?
“বৃশ্চিকচক্র”। এতক্ষণ যে গল্প নিয়ে আবছা আভাস দিলাম তা এই বইয়েরই। পিয়া সরকারের লেখা “বৃশ্চিক” এর সিক্যুয়েল। প্রথমটির মতো এটিও পলিটিক্যাল+ডিটেকটিভ প্রসিডিউরাল জনরার। বোনাস হিসেবে রিভেঞ্জ থ্রিলারের একটা ফ্লেভার পাওয়া যায়।
তদন্ত নির্ভর থ্রিলার বই আমার বরাবরই পছন্দের। কারণ হিসেবে বলা যায় এই জনরার বইয়ে ডিটেইলিং, ফরেনসিক বিশ্লেষণ এবং এমও নিয়ে বিশদ ব্যাখ্যা থাকে। একটা গল্পকে জীবন্ত করে তোলে। পিয়া সরকার এখানে দারুণ কাজ দেখিয়েছেন। সবকিছু এত সূক্ষ্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যেন আমার মনে হচ্ছিল আমি বইয়েরই কোনো একটা চরিত্র।
ইনভেস্টিগেশন এর পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের মা*ও*বা*দী দের নিয়ে একটা টাইমলাইন তৈরী করেছেন লেখিকা। সে সময়ে বিভিন্ন এলাকার স্থানীয়দের উপর মা*ও*য়ি*স্ট দের প্রভাব, রাজনীতি তে তাদের বিস্তার, সামাজিক দিক দিয়েও তাদের প্রভাব সহ বেশ কিছু ঘটনা নিয়ে মূল গল্পের সাথে মার্জ করেছেন লেখিকা। যা গল্পটাকে আরো উপভোগ্য করে তোলে। তবে এখানে একটা নেগেটিভ পয়েন্ট আছে। সেটা মা*ও*বা*দী দের নিয়ে ওভার ডিটেইলিং। কিছু বিষয় কমানো যেত বলে আমার মনে হয়েছে।
লিখনশৈলী ছিল চমৎকার। বাক্য গঠন, শব্দের ব্যবহার এসবও ছিল বেশ ভালো। পড়তে গিয়ে কোনো সমস্যা হয় নি। তবে ফরেনসিক এনালাইসিস এ ব্যবহৃত শব্দগুলো বাংলিশে না লিখে ইংলিশেই লিখতে পারতেন। পরে টীকা দিয়ে সেটার মিনিং বলে দিতে পারতেন। গল্পের শেষভাগে এসে লেখিকা তাড়াহুড়ো করেন নি। আস্তেধীরে এক্সিকিউশনে গিয়েছেন।
দর্শনার ভিতরে জমে থাকা প্রশ্ন, যে প্রশ্নটা এতদিন ধরে তাকে ঘুমোতে দেয় নি, সে প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন। হজম করতে কষ্ট হয়েছে।
ওভারল বইটা যথেষ্ট ভালো লেগেছে আমার। তৃতীয় বই “নিশাদ” বইয়ের অপেক্ষায় রইলাম। ওপার বাংলায় ইতোমধ্যে চলে এসেছে। Bookstreet এর উচিত তাড়াতাড়ি নিয়ে আসা।
অসাধারণ! অনবদ্য! চমৎকার! বইটা শেষ করে এই বিশেষণগুলোই বেড়িয়ে এলো মুখ থেকে। গত কয়েক বছরে বেশ কিছু দেশী এবং বিদেশি রহস্য উপন্যাস পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে। এই বইটি যে তাদের মধ্যে উচ্চ একটি স্থান দখল করবে তাতে দ্বিমত নেই। মূলত এস আই দর্শনা বোসের দুটি তদন্ত কাহিনী উঠে এসেছে এই বইতে। প্রথম কাহিনী বর্ধমানের মফস্বল শহরে ঘটে যাওয়া এক যুবতীর হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এবং দ্বিতীয় কাহিনী এগিয়েছে পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি অঞ্চলে পরপর ঘটে যাওয়া দুটি হত্যাকাণ্ড নিয়ে। দুটো উপন্যাসই এগিয়েছে পুলিশ প্রসিডিওরালের নিয়ম মেনে। প্রচুর ফরেনসিক তথ্য, পুলিশের কার্য পদ্ধতি, মায় খোচড়ের ব্যবহার প্রত্যেকটা বিষয় এত নিপুণভাবে বর্ণিত হয়েছে যে তাতে বোঝা যায় লেখিকার অনেক গবেষণার ফল এই লেখাগুলি। উপন্যাসদুটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন দিক হল চরিত্র নির্মাণ। উপন্যাসের মূল চরিত্র দর্শনা বোসের চরিত্র চিত্রণ তো অসাধারণ। মানসিক টানাপোড়েন, ব্যর্থতা আর সবচেয়ে বড় কথা সুপারহিরো না হওয়ার চেষ্টা এই সবই দর্শনা বোসকে রক্তমাংসের একটা চরিত্রে পরিণত করেছে। যে একাধারে কিছুটা আবেগপ্রবণ কিন্তু কাজের বেলায় বাস্তবের মাটিতে পা রেখে সমস্ত খুঁটিনাটি নজর করে তবেই কোন সিদ্ধান্ত নেয়। এখানেই এই কাহিনী অন্যদের থেকে আলাদা। এছাড়াও পার্শ্বচরিত���র এবং তাদের মনস্তত্ত্বকেও সমান গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এছাড়া রয়েছে দুটি কেসেই সরাসরি রাজনৈতিক প্রভাব। দ্বিতীয় উপন্যাসের ক্ষেত্রে যা মাও আন্দোলন এবং অস্ত্র পাচারকারি দলের সাথে সরাসরি মিশে গিয়ে একটা অসাধারণ প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে। এত কিছুর মিশেল সত্ত্বেও দুটি উপন্যাসের ক্ষেত্রে গতি এক মুহূর্তের জন্য ধীর হয়নি। দুটি উপন্যাসের শেষেই দুর্দান্ত দুটি চমক রয়েছে। এছাড়াও হার্ডকভারে বাঁধানো এবং ওঙ্কারনাথ ভট্টাচার্যের অলঙ্করণে বইটার সৌন্দর্য বৃদ্ধি হয়েছে। একটি দুটি বাদে কোনো প্রমাদ মুদ্রণও চোখে পড়েনি। তবে এত সুন্দর বইটার প্রচ্ছদ আরো খানিকটা ভালো হতো বলে আমার মনে হয়েছে। তবে এটুকু বলাই যায়, চরিত্র চিত্রণ, তদন্ত পদ্ধতি এবং অসাধারন মনস্তত্ত্বই এই বইটিকে বাজারচলতি আর পাঁচটা রহস্য উপন্যাসের থেকে আলাদা করেছে। তাই, যারা গতিসম্পন্ন অথচ বাস্তবিক জগতে��� রহস্য কাহিনী পড়তে আগ্রহী তারা অবশ্যই এই বইটি পড়ে ফেলুন।
Rating: 4.5 বৃশ্চিক পড়ার পর পর ধরেছিলাম বৃশ্চিকচক্র। এখানে কাহিনি আরও বিস্তৃত, গভীর, অতীত বর্তমান মিলেমিশে একাকার। দর্শনা এখানে তদন্তের সাথে সাথে নিজের জীবনের কিছু অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর পাবে কিনা তাও জানা যায়। বৃশ্চিকচক্র আমার বৃশ্চিক এর চেয়েও ভালো লেগেছে।কারণগুলোর মধ্যে প্রথমত, ভালো রহস্যগল্পের বাহন হলো ভালো চরিত্র। এখানে লেখিকা চমৎকার কাজ করেছেন। বইয়ের কাহিনির পাশাপাশি মূল চরিত্রের স্ট্রাগল আগের বইয়ের মতো এ বইয়েও পাওয়া যায়। এতে দুটা কাজ হয়, চরিত্রটাকে রক্তমাংসের বাস্তব কেউ মনে হয়, এবং অন্তত তার গল্পের সঙ্গী হতেও বইটা পড়তে ইচ্ছা করে। দ্বিতীয়ত, কাহিনির বিস্তার ও তাতে রাজনীতির মিশেল। আগের বইয়ের তুলনায় এ বইটা জটিল ও বহুমুখী, তাতে কাহিনি ডালপালা মেলার ভালো সুযোগ পায়। চরিত্রগুলোর সাথে একাত্ব হতে পারি, তাদের ভালো খারাপ উদ্দেশ্য যাই হোক, কার্যকারণ বোঝা সহজ হয়। রাজনীতির মিশ্রণ বইটার অন্যতম প্লাস পয়েন্ট। খুব বেশি থ্রিলার রাজনৈতিক পটভূমিতে পাওয়া যায় না। এখানে রাজনৈতিক পটভূমি তো ব্যবহার করা হয়েছেই, তা আবার খুব ভালো করে কাহিনির সাথে খাপ খেয়ে গেছে। আমি আগে বইয়ের রিভিউ পড়ে ভেবেছিলাম এখানে হয়তো রাজনৈতিক প্রিচি কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু আমার ধারণা একেবারেই ভুল ছিলো। খুবই ভালো লেগেছে রাজনীতি, উন্নয়ন কিভাবে ফাঁকা বুলি হিসেবে ব্যবহার হয় আর দিন শেষে যাদের ব্যবহার করে ক্ষমতাশালীরা, তাদের ভাগ্য অপরিবর্তিত থাকে। এর আগেও দেখেছি, লেখিকার লেখা শেষ করার পর সঙ্গে সঙ্গে আবার পড়তে ইচ্ছা করে। যে কোন থ্রিলার বা ডিটেকটিভ বইয়ের জন্যই যা কিনা খুব স্পেশাল। দর্শনার সাথে ফের দর্শন করার অপেক্ষায় থাকলাম।
প্রায় ২/৩ মাস পর শেষ করলাম এই বই☹️। বৃশ্চিক পড়ে এত ভালো লেগেছিলো শুধুমাত্র দর্শনা বোসের অতীত জানার জন্যই এই বইটা অর্ডার ফেলি। সুন্দর লিংক আপ করেছে বইটা বৃশ্চিকের সাথে কিন্তু আমার খুব কষ্ট হয়েছে বইটা শেষ করতে।
পলিটিকাল থ্রিলার যাদের ভালো লাগে তাদের হয়তো বইটা খুব ভালো লাগতে পারে। যেহেতু আমার খুব একটা পছন্দের জনরা না এটা তাই পড়তে ভালোই অসুবিধা হয়েছে আমার।
লেখিকার লেখনী যথেষ্ট সুন্দর। বইটা ঠিক স্লো রান তাও বলবো না। কাহিনি অনেকভাবে অনেকদিকে ডালপালা মেলেছে, যেহেতু আমি অনেক সময় নিয়ে পড়েছি আমার অনেক কিছু গুলিয়ে যাচ্ছিলো। আর কাহিনি যেভাবে এগিয়েছে তাতে পলিটিক্স মাওবাদী টাইপের সন্ত্রাসবাদ এগুলা সম্পর্কে পাঠকের আগে থেকেই বিস্তর ধারণা থাকতে হবে, নাহলে রিলেট করতে পারাটা একটু কষ্টকর।
রিডার্স ব্লকেও ছিলাম আমি, বইটা পলিটিক্স নিয়ে বিস্তর বলেও বইটা শেষ করতে কষ্ট হয়েছে। নাহলে বইটাকে হয়তো ৪.৫ রেটিং করতাম। বৃশ্চিক পড়ে আমার খুবই ভালো লেগেছিলো এই বইটা আমাকেও অতটাও টানতে পারেনি। তবে তাতে কাহিনির মাহাত্ম্য কমবে না।
লেখিকার লেখনী নিয়ে আমার একটু বলার আছে এটাই যে কোনো একটা বিষয় বইয়ে এমনভাবে বলা থাকে যেন পাঠকের সম্পূর্ণ ধারণা আছে ধরে নেয়া হয়েছে, কিন্তু আমার মনে হয় আমার মতো অনেকেই থাকবেন যাদের সবকিছু সম্পর্কেই সব ধারণা নেই। হয়তো গুছিয়ে বলতে পারছি না😑। বইটা পড়লেই বুঝতে পারে যাবে।
আমার দর্শনা বোসকে খুবই ভালো লেগেছে এই জায়গায় অস্বীকার করার উপায় নেই। ফিমেল লিড সবসময়ই পছন্দ আমার আর দর্শনা ১০০/১০০ উতরে গেছেন😊।
সাউথ ইন্ডিয়ান থ্রিলার মুভির একজন বড় ফ্যান আমি।ওদের স্টোরি টেলিং, সিনেমাটোগ্রাফি সব আমার ভালো লাগে।একটা অর্ডিনারি স্টোরিকেও ওরা খুব অ্যট্রাক্টিভ ওয়েতে পোট্রে করতে পারে।
কেনো জানিনা, এই বইটা পড়ার সময় আমি এমন একটা ভাইব ফিল করছি।লেখিকার প্রশংসা না করলে ব্যাপারটা খুব অন্যায় হবে।এমন একটা রহস্যোপন্যাস শেষ করার পর দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যাওয়ার যে ব্যাপারটা এবং নিজের মনের সব প্রশ্নের উত্তর পেয়ে ফেলার পর যে হালকা বোধটা হয়—এর কোন তুলনা চলেনা।আমার কাছে সেটাই ভালো বই যে বই পড়ার সময় দৈনন্দিন জীবনের নিত্যদিনকার যেকোনো সমস্যা আমি ভুলে যেতে পারি অনায়াসে।
বৃশ্চিক থেকেও বৃশ্চিকচক্র আমার অনেক বেশি ভালো লেগেছে।প্রথম পাতার প্রথম লাইন থেকে শেষ লাইন অবধি আমি পুরোটা একইরকম মনযোগে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পড়ে গেছি।নকশাল আন্দোলন কিংবা মাওবাদী গেরিলাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আমার আগ্রহের কোন সীমা পরিসীমা নাই।এই ব্যাপারে জানার আগ্রহ, পড়ার আগ্রহ আমার দিনকে দিন বেড়ে যাচ্ছে।তো সেই দিক থেকে এই বইয়ে মাওবাদী গেরিলা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে আমি একটানা পাতার পর পাতা উল্টে গেছি।সাথে পুরুলিয়ার প্রকৃতি বর্ণনা এবং লেখিকার ক্যারেক্টার বিল্ড করার প্রতিভা আমাকে আরও টেনে ধরে রাখছে।গতকাল রাত থেকে শুরু করে আজ রাতে ঘুমের আগেই প্রায় তিনশ পাতার বই শেষ।
অল্প কিছু ফ্যাক্ট কিংবা দর্শনা বোসের ব্যক্তিগত ক্রাইসিস কিছুটা নাটুকে মনে হলেও শেষ কথা এটাই—আমাদের রিয়েল লাইফ কোন বই কিংবা ফিল্মের চেয়েও অনেক বেশি নাটুকে :)
'বৃশ্চিকচক্র' লেখকের দর্শনা বোস সিরিজের একটি উপন্যাস। এই উপন্যাসে দেখা যায় সিরিজের আগের গল্পের ঘটনাবলীর পরে দর্শনা পুরুলিয়ার বাঘমুন্ডি থানায় জয়েন করে। সেখানে যাওয়ার পরপরেই সে একটি হত্যাকান্ডের কেসে জড়িয়ে যায় যার সাথে মাওবাদী কানেকশন রয়েছে। এখন সেই হত্যাকান্ডের সাথে ঐ এলাকার মাওবাদী এবং পলিটিক্যাল অ্যাঙ্গেল কীভাবে জড়িত তা নিয়েই লেখক পিয়া সরকারের 'বৃশ্চিকচক্র' উপন্যাসটি লেখা। - 'বৃশ্চিকচক্র' বইটি এর আগের গল্প 'বৃশ্চিক' এর continuation বলা যায় অনেকটা। তাই গল্পটি পুরোপুরি বুঝতে হলে এর আগে 'বৃশ্চিক' গল্পটি পড়তে হবে। গল্পের অনেকখানি জুড়ে মাওবাদী বিষয়ক প্লট থাকায় সে সম্পর্কে না জানা থাকলে কিছুটা বিরক্তিকর লাগতে পারে। তবে দর্শনা বোসের তদন্ত প্রক্রিয়ার ব্যপারগুলো এবারেও দারুন লাগলো। ক্রাইম এবং পলিটিক্যাল থ্রিলারের মিশ্রণে লেখা এই বইয়ের টুইস্টগুলো একেবারে অবাক করে না দিলেও এর ভেতরের কার্যকারণ শক্ত ছিল। প্রোডাকশনগত দিক থেকে দামের তুলনায় বুক স্ট্রিটের এই বইটা খুবই ভালোমানের হয়েছে। এক কথায়, পশ্চিমবঙ্গের এক বিক্ষুব্ধ সময়ের উপর ভিত্তি করে লেখা এই উপন্যাসটি পলিটিক্যাল থ্রিলার এবং পুলিশ প্রসিডিওরাল টাইপ বই পছন্দ করা পাঠকদের ভালো লাগার সম্ভাবনা অনেক।
৮.৫/১০ বৃশ্চিক পড়ার পর বৃশ্চিকচক্র প্রথমটায় একটু বোর লাগছিল। বৃশ্চিকে সব কিছু খুব ফাস্ট ��িল। কাহিনি টেনে বড় করা হয়নি৷ বইটা ভালো লাগার একটা বড় কারনই ছিল এটা। কিন্তু চক্রের শুরুতে মনে হচ্ছিল অযথাই অনেক বড় ভূমিকা টানা হচ্ছে। কিন্তু মূল গল্পে ঢুকে যাওয়ার পর সবকিছু পারফেক্ট লেগেছে। বৃশ্চিকে মার মার কাট কাট ব্যাপারটা কম থাকলেও চক্রে খুব ভালো ভাবেই ছিল৷ জমজমাট একটা থ্রিলার। শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত প্রবল আগ্রহে একটার পর একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে যাওয়া, ঠিকঠাক অ্যামাউন্টের সাসপেন্স, এটাই মনে হয় ভালো থ্রিলারের বৈশিষ্ট্য। সেইম চার তারা দিলেও বৃশ্চিক চক্রকে বৃশ্চিকের চেয়ে এগিয়ে রাখছি!
মহা বোরিং। পড়তে গিয়ে অনেকবারই ঘুমিয়ে গেছি। পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী, পুলিশ, স্থানীয় রাজনীতি মিলিয়ে একটা পুলিশ প্রসিডিউরাল থ্রিলার টাইপ বস্তু, কিন্তু এত ঘুমপাড়ানি হলে পড়া মুশকিল। বারবার ব্যাক অ্যান্ড ফোর্থ গেছে, সেখানেও সামঞ্জস্য নেই বলে আরো গুলিয়ে গেছে। তারমাঝে আবার সেই পুরানো চুলকানিও আছে, মানে বইয়ের যে কোন একটা জায়গায় কোনভাবে জানিয়ে দেয়া যে পশ্চিমবঙ্গের সকল অস্ত্র-ড্রাগ ইত্যাদি বাংলাদেশ থেকেই চালান যাচ্ছে। ঐপারের এ শ্রেণীর বুদ্ধিজীবিরা কি এই হারামিপনার জন্য মালকড়ি পায় নাকি এরা হারামি হয়েই জন্মাচ্ছে জানি না। এমনিতে হয়তো ২ দিতাম, এই বদমাইশির জন্য মাইনাস ১।
পুলিশি প্রোসিডিউরসগুলো চমৎকার করে তুলে ধরে লেখিকা মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। চরিত্রগুলো বুঝতে সমস্যা হয় নি। গল্প কোথাও তার গতি না হারিয়ে স্বচ্ছন্দেই এগিয়ে গিয়েছে। আদর্শের নাম করে সাধারণ মানুষদের রোজ বলির পাঁঠা বানানোর গল্প যেমন আছে, আছে প্রশাসনে আসীন কর্মকর্তাদের জঘন্য মুখোশধারী রুপ। আবার আছে সত্যকে তুলে ধরবার ক্ষুধা, আছে প্রতিবাদ, আছে তীব্র প্রতিশোধের স্পৃহা।
আইন আসলে কী? ন্যায়-অন্যায়ের বিচারের ধারা প্রকৃতপক্ষে কেমন হওয়া উচিত?
ফ্যান্টাস্টিক! এই সিরিজের তৃতীয় গল্প "নিষাদ" আমি আগে পড়েছি। সেখানে ট্রিটমেন্ট আরও ম্যাচিওর, কিন্তু তাতে এই বইয়ে সংগ্রহীত প্রথম দুই গল্পের আকর্ষণ কমে না। দুই গল্প এমনিতে আলাদা হলেও, কোথাও গিয়ে এক সুতোয় বাঁধা - পড়লে বুঝতে পারবেন। সম্পাদনা বা প্রুফ রিডিং, কোনোটাই ঠিক মত হয়নি - মুদ্রণ প্রমাদ তো আছেই, আনরিজলভড কোয়েশ্চেনও রয়েছে। তবে এসব নিতান্তই ছোটখাট বিষয়। গল্পগুলো চমৎকার। রিয়েলিস্টিক, হার্ড বয়েল্ড, নুয়া। এই ধারার গল্পে আগ্রহ থাকলে অবশ্যই পড়ে দেখুন।
এক কথায় বলতে হয় দুর্দান্ত। পুলিশ প্রসিডিউরাল থ্রিলারে এরকম দারুণ উপভোগ্য থ্রিলার দুই বাংলা মিলিয়ে আসলেই খুব কম। নিখুঁত পুলিশি ডিটেইলিং,পুলিশী তদন্তের সীমাবদ্ধত, ক্রস, ডাবল ক্রস, স্পাই, মাওবাদী বিদ্রোহ সবকিছু মিলিয়ে একটা কমপ্লিট প্যাকেজ। এই সিরিজের প্রথম বই বৃশ্চিক যেমন হতাশ করেনি। এই বইটাও হতাশ করেনি।
বৃশ্চিক পড়ে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তার পূর্ণতা পেল এই বইয়ে এসে। গল্পের শেষ লাইন অব্দি টুইস্ট তৈরি করা সহজ কাজ না। আর বইয়ের কোন অংশ পড়তেই বিন্দুমাত্র বিরক্ত লাগেনি।