শ্রীপান্থের জন্ম ১৯৩২ সালে, ময়মনসিংহের গৌরীপুরে | লেখাপড়া ময়মনসিংহ এবং কলকাতায় | শ্রীপান্থ তরুণ বয়স থেকেই পেশায় সাংবাদিক | আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদকীয় বিভাগের সঙ্গে যুক্ত | সাংবাদিকতার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণামূলক রচনাদি লিখে যাচ্ছেন তিনি | তাঁর চর্চার বিষয় সামাজিক ইতিহাস | বিশেষত কলকাতার সমাজ ও সংকৃতি | তিনি সতীদাহ,দেবদাসী,ঠগী,হারেম-ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যেমন লিখেছেন, তেমনিই কলকাতার পটভূমিতে লিখেছেন একাধিক রচনা | তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য: আজব নগরী, শ্রীপান্থেরকলকতা, যখন ছাপাখানা এল, এলোকেশী মোহন্ত সম্বাদ, কেয়াবাৎ মেয়ে, মেটিয়াবুরুজের নবাব, দায় ইত্যাদি | বটতলা তাঁর সর্বশেষ বই | কলকাতার শিল্পী সংস্কৃতি বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু প্রবন্ধ ইংরেজিতেও প্রকাশিত হয়েছে | বাংলা মুলুকে প্রথম ধাতব হরফে ছাপা বই হালেদের 'আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গোয়েজ'-এর দীর্ঘ ভূমিকা তার মধ্যে অন্যতম | পঞ্চাশের মন্বন্তরের দিনগুলোতে বাংলার শিল্পী সাহিত্যিক কবিদের মধ্যে নব সৃষ্টির যে অভুতপূর্ব বিস্ফোরণ ঘটে তা নিয়ে লেখা তাঁর 'দায়'বইটির ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হতে চলেছে |
জিপসীর কথা-- ''নিজের জন্য মাটি চাই না,ছকবাঁধা ধর্ম চাই না,নিশ্চিত রুটির প্রতিশ্রুতি চাই না। একমাত্র কামনা আমার শান্তি।’’
জিপসীদের নিয়ে বাংলায় লেখা এরচেয়ে তথ্যবহুল বই দ্বিতীয়টি নেই। শ্রীপান্থ তার ঝরেঝরে গদ্যে ঢাকা যে গল্পের বাক্স খুলেছিলেন,সেই বাক্স থেকে জিপসীদের যে গল্প,যে তথ্য বেরিয়েছে তার সবই উপাদেয়। রীতিমতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মতো। আবার জিপসীর দলে নাম ভেড়ানোর মতো উসকানিও কম নেই সেখানে!
জিপসি। বেদে। যাযাবর। তোমার দেশ কই? আমরা অভিশাপে ঘরছাড়া। আমরা ফিলিস্তিনে ছিলাম, রাজা হেরড যখন মাতা মেরিকে তাড়িয়ে ফিরছে। মেরি আমাদের আশ্রয় চেয়েছিল, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ রাজার ভয়ে তা দেয়নি। সেই পাপেই আমরা ছন্নছাড়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি দেশ থেকে দেশে।
আবার অন্য কোনো দল শোনায় অন্য গল্প। "যীশুকে ক্রুশবিদ্ধ করার সময়, দুই হাতে আর পায়ে গাঁথার জন্য তিনটা পেরেক চাওয়া হয়েছিল। কোনো কারিগর তা বানিয়ে দিতে চায়নি। দুর্ভাগা আমাদের পূর্বপুরুষ, বানিয়ে দিল সেই পেরেক। তারপর থেকে আর স্বস্তি পায়নি সে, রক্তমাখা পেরেক দেখতে পেতো যেখানে পালায় সেখানেই। আমরা তার বংশধর, আমরাও পালিয়ে বেড়াচ্ছি দেশ থেকে দেশে, আমাদের কোথাও ঠাঁই নেই।"
একই গল্প শোনাতে পারে ভারতের 'বাজিকর'-রা। "রহু চন্ডাল, আমাদের আদি পিতা, ভয়ংকর পাপ করেছিল। আমরা আদতে গেরস্থ জাতি, বানজারাদের মতো যাযাবর নই। কিন্তু রহু'র পাপে আমরা উৎখাত হই বারবার, যত জায়গায় বসত গাড়তে চেয়েছি। পুরুষানুক্রমে আমরা অপেক্ষায় রয়েছি রহু চন্ডালের হাড় খুঁজে পাবার। যেদিন সে বস্তু হাতে আসবে, শেষ হবে আমাদের দুর্দশা।"
একাধারে পথ চলা যাযাবরদের। য়ুরোপে, ভারতে, আরবে। দেশে দেশে তাদের বেশভূষায় যেমন বৈচিত্র, তেমন তফাৎ আবাস এবং বাহনেও। কেউ অশ্বারোহী, মাথার ওপর খোলা আকাশা ছাড়া আর আশ্রয় নেই। কারো আবাস মধ্যযুগের মতো তাঁবুতে। কোনো দল খড়কুটো আর ঘাসপাতায় গড়া আশ্রয়ে, কোনো দল ঘোড়ায় টানা গাড়িতে, কেউ নৌকায়। ক্যারাভান চলেছে। নিরন্তর। কিন্তু সেসব তফাৎ বাইরের বিষয়। ঘোড়ার পিঠে হোক আর গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে, তাদের জীবন মূলত এক।
রাইন অথবা গঙ্গাতীরে, ভলগা অথবা মিসিসিপির ধারে জিপসি জীবন প্রায় অভিন্ন। কেউ নাচে গায়, কেউ মিস্ত্রির কাজ করে, কেউ পশু বা ঘোড়ার সওদাগর বা কেউ ভালুকের বাজিকর। মেয়েরা হাত দেখে, টুকিটাকি জিনিস বা ওষুধ বিক্রি করে। বাংলার রাস্তায় বোঁচকা মাথায় হাঁক দেয় বেদেনী, "পোক খোয়াই, জোঁক খোয়াই, শিঙা লাগাই..."।
এমন এক বেদের মেয়ে মহুয়া যখন নদের চাঁদকে পাগল করে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে, দূর স্কটল্যান্ডের এক লর্ডের তরুণী বউ তখন এমন আরেক বেদে জনি ফে'র গান শুনে হয়েছেন ঘরছাড়া। নদের ঠাকুর কী করেছিলেন মনে আছে? ওই যে মৈমনসিংহ গীতিকায় পাওয়া-
জনি ফে'র গান শুনে পলাতকা কাউন্টেস তখন বেদের দলের মাঝে গান গাইছেন : "Once I could lay on the bed / The best feather bed ever made; / But now I am pleased just to lay on the sod" —"একসময় আমি নরম পালকের শয্যায় শুতাম, আজ এই ঘাস-মাটির শয্যায়ই আমি সুখী!" তাঁকে আর ঘরে ফেরানো গেল না।
সেসব ঘটনা কয়েকশ' বছর আগের না হয়ে গতকালেরও হতে পারতো। কারণ ওরা শতকের হিসেবে কাল মাপে না। কাল মাপার জন্য তাদের কোনো পঞ্জিকা নেই। হিসাবের খাতা, ইতিহাস নেই। যেন ঝাঁক ঝাঁক পাখি, শত শত বছর ধরে আকাশে উড়ে চলেছে—একই পাখি পাখি, একই রঙ, একই সুর,—একই গান।
জিপসিরা আসলে কোন জাতির, বা কোন দেশ থেকে আগত, তা বের করতে বেশ সময় লেগেছে। তার কারণ তারা নিজেরাও ঠিক জানে না কোন দেশ থেকে বেরিয়ে পড়েছিল তাদের পূর্বপুরুষ, তারপর হেঁটে চলেছে পৃথিবীর পথে। তাদের হরিণ-চোখ, বাদামী গায়ের রঙ য়ুরোপীয়দের থেকে ভিন্ন। নিজস্ব ভাষা আরবদের থেকে আলাদা। সে ভাষায় সে জানায়, —ময় হু কালো! —মান্ডে হে দাদেসক্রো ওয়াৎস! —ময় হু সাচো পাসকেরো রোম! অর্থাৎ, আমি কালো। আমার পিতৃভূমি আছে। আমি একজন সাচ্চা 'রোম', খাঁটি মানুষ।
বিশ্বব্যাপী যাযাবর 'রোমানি'-রা যে ভারতের মানুষ, তা বেরিয়ে এসেছিল অনেক পরে, ভাষার দিকে তাকিয়ে। য়ুরোপীয় জিপসিদের ভাষায় যত শব্দ আছে, তার অধিকাংশই সংস্কৃত আর ভারতীয় অন্য ভাষা থেকে পাওয়া। এমনকি উপমহাদেশকে তারা ডাকে 'বড়া তান'—বড় স্থান—বড় দেশ!
পৃথিবীব্যাপী কয়েক লাখ সংখ্যক জিপসীদের নিয়ে গবেষণা শুরু হবার আগেও তারা চিরকালই ছিল স্থানীয়দের আগ্রহের বস্তু। কখনো মুগ্ধতার, কখনো ঘৃণার। স্বাভাবিকভাবেই শেকড়-গাঁড়া মানুষদের নিয়ম-কানুন নিয়ে বিশেষ মাথাব্যাথা জিপসীদের কখনো ছিল না, যখন যেটা লেগেছে গৃহস্থের বাড়ি থেকে তুলে এনেছে। তার জন্য ধাওয়া খেলেই বা কী, আজ বাদে কাল তো আর তাকে এক জায়গায় পাওয়া যাচ্ছে না!
যেমন স্থানীয় নারী-পুরুষের চোখ ধাঁধিয়েছে জিপসী, তেমনি তাকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চোখে পড়েছে শতকে শতকে। সর্বশেষ নজির হয়তো হিটলার, ইহুদীর মতো যে জিপসিদেরও নিধনে মেতে উঠেছিল।
কিন্তু জিপসিদের একটা ব্যাপারই বুঝতে পারেনি মানুষ, 'সাধারণ' চোখে তাকে মাপার চেষ্টা ফল দিবে না। ইংল্যান্ডের শিক্ষার হার শতভাগ হতে পারেনি শুধু জিপসিরা নিরক্ষর থাকছে বলে। সেজন্য ইংরেজ সরকারের চেষ্টার অন্য নেই! তোমাদের স্কুলে আসতে হবে না, স্কুল তোমাদের সাথে চলবে ঘোড়ার গাড়িতে করে, কিন্তু তাতে তাদের থোড়াই কেয়ার। বরং গেরস্থ মানুষদের সভ্যতাকে আরো দিয়েছে ওরা, ধাতুবিদ্যা, কারুশিল্প, সার্কাসের প্রচলনে ওদের অবদান ছিল। স্পেনে মাখনের প্রচলন হয় জিপসিদের হাতে। কিন্তু দিয়েই খালাস, গেরস্থ 'গাজো'-দের সভ্যতায় তারা অংশ নিতে চায়নি। কারণ 'গাজো'দের দুনিয়ায় অনেক ঝামেলা। "কেন ঘুরে বেড়াও তোমরা?" এই প্রশ্নের জবাবে গলা ছেড়ে গান ধরবে জিপসী—
আমি কালো হয়ে জন্মেছি; আমার বাড়ি নেই, আমি ঘুরে বেড়াই, নিঃসঙ্গ শিশু আমি...। ফুল কখনো ভালো জামাকাপড় পরে কি? পাখি কখনও রাই ভানে? ঈশ্বর আমার পিতা, তিনিই দায়িত্ব নিয়েছেন আমার ।
কেন তুমি ঘুরে বেড়াও?— জানতে চায় ওরা! আমি জানি না, উড়ে যাচ্ছে যে পাখি উত্তর দিক সে । উত্তর দিক—বনের হরিণ।...
এই না হলে নন-ফিকশন! বলছিলাম শ্রীপান্থ'র জিপসীর পায়ে পায়ে বইটার কথা। গল্পের আমেজে যাযাবর জাতির কথা পেড়েছেন শ্রীপান্থ, এমন মধুর বর্ণনায় জড়িয়ে ফেলেছেন শুরু থেকে, তাতে করে বিষয়বস্তুর প্রতি আকৃষ্ট এবং সংযুক্ত বোধ করতে শুরু করেছি কিছুদূর পর থেকেই। যেমনটা ফিকশনে হয়। নয়তো, আমি কি ভেবেছিলাম কোথাকার কোন যাযাবর, যাঁদের সাথে ক্বদাচিৎ দেখা হয়েছে অভিজিৎ সেন-এর রহু চন্ডালের হাড় পড়ে, তাদের নিয়ে আটঘাট বেঁধে পড়তেই বসে যাব?
বইয়ের শুরুতে জিপসীদের কথা পেড়ে, পরের অধ্যায়েই দরকারি প্রশ্নটা করে ফেলেন লেখক—কোথা থেকে এলো তারা, কোন ভূমি তাদের দেশ। সে জবাব তখুনি পাবার আগে আমরা দেখতে পাই শতাব্দীক্রমে তাদের ঘুরে বেড়ানোর আর স্থানীয়দের সাথে মেশার গল্প। স্থানীয় তথা 'গাজো'-দের কাছে যেটা অনেকাংশেই একতরফা আপদ। এবং যুগে যুগে জিপসীদের প্রতি অনাচারের উল্লেখ।
তবে তাদের প্রতি আগ্র���ী হয়ে সাহিত্যে, নাটকে তাদের স্থান দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল। সবচে কৌতুহলের ঘটনাগুলোর মাঝে একটা ছিল নাটকে জিপসী মেয়ের চরিত্রে সম্রাট চতুর্দশ লুই-এর স্ব-প্রণোদিত হয়ে অভিনয় করতে নামা। পল্লী বাংলা'র মহুয়া গীতি-ও উল্লেখ্য, যা য়ুরোপের জিপসিদের মাঝে তো সমাদৃত ছিলই, এমনকি নেটিভরাও তা পছন্দ করেছিল।
বইয়ে একটা অধ্যায় আছে জিপসিদের ভাষা, নিজ ভাষায় তার অর্থ, এবং সংস্কৃত/ভারতীয় প্রতিশব্দ দিয়ে। কারণ আগে বলেছিলাম, একটা সময়ে ভাষাতাত্ত্বিক গবেষণায় জানতে পারা যায় জিপসি-রা ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তারপর কয়েক অধ্যায় জুড়ে তাদের সামাজিক রীতিনীতি, জীবনযাত্রা নিয়ে শোনান হয়েছে। জিপসি বিয়ের রীতি, জীবিকা, সংস্কৃতি এসেছে। এসেছে সমাজের নিয়মের অংশ না হয়ে সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের পন্থায় মানিয়ে চলার বর্ণনা।
যে সময়ে প্রকাশিত হয় জিপসীর পায়ে পায়ে, তখন বাংলা ভাষায় যাযাবর সম্প্রদায়কে নিয়ে উল্লেখ করার মতো বই ছিল না, নিজেই বলেছেন। বই যত এগিয়েছে সাহিত্যিক চারুতার চেয়ে তথ্য উপস্থাপনে লেখক ঝুঁকেছেন ধীরে ধীরে। তারপরও, দেড়শ পাতার মাঝে অনেক কিছু ধরতে পেরেছেন লেখক, আর তাঁর ভাষা এবং বর্ণনা বইটাকে সুখপাঠ্য করে তুলেছে।
আমার চার চারটে মস্ত প্রাসাদ রয়েছে। অবশ্য, তোমরা বলো আমি ভিখারি, আমি তস্কর। কিন্তু আমার হাসপাতাল আছে, আমার জেলখানা আছে - আমার গির্জাও আছে। আমার কবর আছে।
- ফঁরাসি জিপসী গান
ঈশ্বর তখন শশব্যস্ত সৃষ্টির আদি তৈরী করতে। একদিন তার এই মহাসৃষ্টির মহাযজ্ঞ শেষ হলো, তিনি কাজের ইতি টানবেন। কিন্তু একজন তুখোড় শিল্পী যেমন অনেক ভেবেচিন্তে দারুণ কিছু তৈরী করার পর, শেষ মুহূর্তে তার সাথে আরও কিছু একটা জুড়ে দেয়, তেমনি ঈশ্বর কী খেয়ালে যেন আরও দুইজন মানুষ সৃষ্টি করলেন, একটি পুরুষ একটি নারী। তারপর ছেড়ে দিলেন পৃথিবীর বুকে ছেড়ে দিলেন সওয়ারি হিসেবে, যেন ওরা এই পৃথিবীর সৌন্দর্যের উপর দুটি অলংকার। সেই থেকে ওরা ধরিত্রীর পথে ঘুরে ঘুরে ফিরছে। ওরাই নাকি এই জিপসী। যখন কোনো সাধারণ মানুষ, অর্থাৎ কোনো 'গাজো' জিপসীদের কাছে তাদের সৃষ্টি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তারা জবাবটা দেয় এভাবেই।
বাঁধাহীন রোমহর্ষক আর বোহেমিয়ান জীবনের প্রতি ছাপোষা বাঁধাধরা মানুষের যেই দুর্নিবার আকর্ষণ আর ফ্যাসিনেশন, সেখান থেকেই জিপসীদের নিয়ে কৌতূহলের শুরু। যারা গত এক সহস্র বছর ধরে নাড়ির টান, স্থবির জীবনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে পৃথিবীর বুকে বীরদর্পে পা ফেলে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে নিরুদ্দেশে, তাদের গন্তব্য নেই, এই যাত্রাপথই তাদের জীবন। তাদের এই জীবন, ইতিহাস, বিশ্বাস, মিথ, পৃথিবীজুড়ে তাদের ইতিহাসের উপর ঘাত প্রতিঘাত, তাদের গান-সুর, তাদের প্রমোদ, তাদের এই মহাযাত্রা - সব নিয়েই শ্রীপান্থের বই 'জিপসীর পায়ে পায়ে'।
বাংলায় বিষয়ভিত্তিক পপ ননফিকশন রাইটারদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় শ্রীপান্থ, তার সুখপাঠ্য লেখনী আর চমৎকার স্টোরিটেলিং স্টাইলের জন্য। ঠিক আসর জমিয়ে গল্প বলার মতো করে লেখেন শ্রীপান্থ, যেন সন্ধ্যার মুখে তেলচানাচুর আর গরম চা নিয়ে গল্পের আসরে বসেছেন তিনি, একাগ্র শ্রোতাদের সামনে গল্পের ফাঁকে ফাঁকে মুঠোয় করে চানাচুর তুলছেন মুখে, মাঝে মধ্যে চা। আবার গৃহকর্তার অনুমতি নিয়ে সিগারেটেও টান দিচ্ছেন আয়েস করে, আর আসরে বসা শ্রোতারা গোগ্রাসে গিলছে তার গল্প, গল্প তো নয়, কোনো মহাকাব্যিক ইতিহাস। লেখকের দুর্ধর্ষ বই 'ঠগী' পড়ার পর আরেকটি ননফিকশন 'হারেম' ছিলো 'চলনসই', কিন্তু 'জিপসীর পায়ে পায়ে' দিয়ে লেখকের প্রতি মুগ্ধতা আবারও নতুন করে পেয়ে বসলো।
জিপসীদের নিয়ে শ্রীপান্থের এই বইটি পড়ে আমার ভেতর দু’রকম অনুভূতির জন্ম হয়েছে—একদিকে ঈর্ষা, অন্যদিকে অশেষ মায়া। এই বোহেমিয়ান নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার দুটো দুর্ভেদ্য ঢাল ছিল—তাদের রোমানি ভাষা আর অননুমেয় দারিদ্র্যতা। আজ দুটোই বিলুপ্তপ্রায়।
জিপসীরা পরকালীন স্বর্গের প্রতি চরম উদাসীন, এজন্যই তারা স্বর্গকে নামিয়ে এনেছে এই পৃথিবীতে—নাচ, গান, রঙ, রূপ আর আদিমতার মাঝে। তারা উচ্চাশাহীন, ভূমিহীন, পদাতিক। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল কেবল একটিই—শান্তি। জিপসীরা নিজেদের পরিচয় দেয় "রোম" নামে—অর্থাৎ শুদ্ধ মানুষ। বিপরীতে তারা "গাজো"দের—অর্থাৎ গৃহস্থদের প্রতি রাখে চরম উদাসীনতা।
এই পৃথিবীতে যত ধরনের অন্যায়, দোষ আর পাপের ইতিহাস আছে, জিপসীরা তার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে প্রস্তুত থেকেছে সবসময়। কেন? কারণ গাজোরা জিপসীদের পরিচয় জানতে ব্যাকুল। আর সেই জানার চাপে পড়ে জিপসীরা বানিয়ে গেছে আজগুবি গল্প—ইহুদি বংশ, ইজিপশিয়ান রাজকুমারী কিংবা বাইবেলিক পৌরাণিক ইতিহাসের জাল। তারা ছিল দুর্দান্ত গল্পকার, আর সেই গল্পগুলোর মাধ্যমে গাজোদের চোখে ধুলা দিয়ে তারা বারবার পিছনের দরজা দিয়ে পালাতে চেয়েছে—দূরে কোথাও, যেখানে শান্তি এখনো নিখাদ।
জিপসীদের ওপর যুগে যুগে নেমে এসেছে নিষ্ঠুরতার খড়গ। তাদের বলা হয়েছে—যাদুকর, দস্যু, তস্কর, গুপ্তচর। জিপসী নারীরা হয়ে উঠেছে লোককথার ডাইনি। তাদের বলা হয়েছে—বিদেশি, অস্থিরতা আর বিশৃঙ্খলার প্রতীক। কিন্তু সত্যি তো এই: তারা ছিল বিশুদ্ধ রোম—সৃষ্টিশীল, স্বাধীন, নৃত্য-সংগীত আর সম্পর্কের বন্ধনে গড়া এক স্বর্গীয় ভবঘুরে সম্প্রদায়।
তারা কখনো নিজেদের পরিচয় দিয়েছে ইহুদি, কখনো প্রাচীন মিশরীয় বলে; অথচ ইতিহাস বলে—তারা ভারতের সন্তান। তাদের ভাষা রোমানি—যা ইন্দো-আর্য ভাষাগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত৷ এক হাজার খ্রিস্টাব্দের দিকে মধ্যভারত থেকে আফগানিস্তান হয়ে তারা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র ইউরোপে তারপর আফ্রিকা আর আমেরিকায়। তবে তাদের সঙ্গে সাধারণ বেদে বা যাযাবরদের পার্থক্য বিশাল; তারা ছিল একেবারে আলাদা, একেবারে স্বতন্ত্র।
আজকের আধুনিক সভ্যতার কাঁটাতারে জিপসীরা বন্দি। যারা ছিল পদাতিক ভবঘুরে, তারাই আজ ভূমিদাস, বাধ্য হয়ে গৃহস্থ হয়ে উঠছে। তারা চাকরি করছে, ব্যবসা করছে, কেউ কেউ শিল্পী, সাহিত্যিক, এমনকি বিজ্ঞানীও হচ্ছে। তবু তাদের বোহেমিয়ান জীবনে যে আত্মার মুক্তি ছিল, তা কি সত্যিই মুছে গেছে? না, থেকে গেছে—মনের গহীনে জমে থাকা এক রকম দীর্ঘশ্বাস হয়ে। শুদ্ধ রোমেরা ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে গাজোয়—অশুদ্ধ, পরাধীন, আটকে পড়া মানুষে।
“কেন তুমি ঘুরে বেড়াও? জানতে চায় ওরা! আমি জানি না, উড়ে যাচ্ছে যে পাখি— উত্তর দিক সে। উত্তর দিক—বনের হরিণ।
যাদের আত্মায় ছিল জন্মগত ভবঘুরে হাওয়ার টান, মাঠি ছিল যাদের বিছানা আর আকাশ ছিল ছাদ, তাদের একমাত্র পরিচয় ছিল—অস্থায়ী আশ্রয়, দারিদ্র্যতা, শান্তি আর স্বাধীন জীবন। আজকের এই কৃত্রিম সমাজে তারাই পরিণত হয়েছে গৃহস্থে, হারিয়ে ফেলেছে সেই অবাধ্য, অদম্য রোমান আত্মাকে।
জিপসীদের নিয়ে লেখা এমন ঐতিহাসিকভাবে সমৃদ্ধ বই বাংলা ভাষায় এককথায় অনন্য। সবারই এই বইটি পড়া উচিত। আর বিস্ময়করভাবে এই অসাধারণ গ্রন্থের লেখক শ্রীপান্থের জন্মস্থানও আমার জন্মস্থানের খুব কাছাকাছি। তার লেখা ঠগী, হারেম, দেবদাসী—এই বইগুলোও আমার পড়া�� তালিকায় যুক্ত হয়ে গেল।
এই লেখাটি এক গৃহস্থের পক্ষ থেকে ভবঘুরে জিপসীদের প্রতি নিঃশব্দ শ্রদ্ধাঞ্জলি। যারা একদিন ছিল পৃথিবীর শেষ সত্যিকারের স্বাধীন মানুষ।
‘জিপসী জীবনকে ভালোবাসে। সে সাজতে ভালোবাসে, হাসতে ভালোবাসে। ভালবাসে ভালবাসতে।‘
কিন্তু জিপসীদের কেউ ভালবাসে না।
ইজিপশিয়ান শব্দটিই সংক্ষিপ্ত হয়ে জিপসী শব্দটি এসেছে, জানা ছিল না! জানা ছি��� যে ভারতবর্ষের পাঞ্জাব থেকেই জিপসীরা ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে, মূলত ইউরোপে, আমাদের দেশের বেদেদের বাহিরে জীবনে প্রথম আধুনিক জিপসীদের দেখি ফিনল্যান্ড যেয়ে, যারা প্রাচীন জীবনধারা ত্যাগ করে ফ্লাটবাড়ীতে থিতু হতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু সেই সাথে বজায় রেখেছে স্রোতের বিপরীত চলার বিদ্রোহ। ফিনল্যান্ডের টের পেলাম, ফিনিশরা যতখানি সেই জিপসীদের অপছন্দ করে, তার চেয়ে লক্ষগুণ জিপসীদের ঘৃণা করে সেখানের বাঙ্গালী ভাইয়েরা, কিন্তু কেন?
কিভাবে সারা ইউরোপে এই ঘৃণার চাষ শুরু হয়েছে শত শত বছর আগেই, সুযোগ পেলেই ডাইনি সন্দেহে পুড়িয়ে মারা হয়েছে জিপসীদের, হিটলার চেয়েছিল তার রাজ্য হবে জিপসীমুক্ত, ৫ লক্ষ জিপসীকে খুন করেছিল নাৎসি বাহিনী, তাদের কথা কেউ স্মরণ করে না।
অথচ জিপসীরা ইতিহাসের সুক্ষতম কারিগরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম, ধারণা করা হয় প্রাচীন ভারত থেকে তারাই নানা ধাতু ছাঁচে ফেলে অল্প সময়ে সামান্য উপাদান থেকেই অসামান্য সব নক্সা তৈরির পথে খুলে দিয়েছিল।
দেশে দেশে জীপসীদের রূপ আলাদা, কেউ ভাগ্য গণনা করে, কেউ হাতের কাজ, কেউ গীটার বাজায়, কিন্তু আমজনতা বলে জীপসীরা কেবল চুরি-বাটপারিই করতে পারে, আর কিছু নয় আর ইউরোপ কৃতজ্ঞ জিপসীদের প্রতি তাদের সঙ্গীত ও নাচের জন্য। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক পত্রিকায় বেশ ক’বছর আগে ছাপা ‘জিপসী’দের উপর ফিচার পড়েও দেখেছিলাম যে গান ও নাচের উপরে তাদের সৃষ্টিশীলতা নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা। আর সেই সাথে আছে তাদের ফ্যাশন সচেতনতা, আর জিপসী তরুণীর সৌন্দর্য, যা মাত করে দিয়েছিল সারা ইউরোপ। কোন ছেলেটা আছে যে জিপসী মেয়ে ‘এসমারেল্ডা’ কে লুকিয়ে কিলুয়ে ভালোবাসেনি? মনে আছে এসমারেল্ডার কথা, যাকে ভালোবাসে অমর হয়ে রয়েছে কুঁজোপিঠ কোয়াসিমোদো ভিক্টর হুগোর ‘হ্যাঞ্চব্যাক অফ নোতরদাম’ উপন্যাসে।
অতি প্রিয় লেখক শ্রীপান্থের ‘জিপসীর পায়ে পায়ে’ বরাবরের মতই ইতিহাসের নানা গলি-কানাগলি ঘুরিয়ে কুয়াশাঘন আঁধার থেকে সত্যের সন্ধানে পথচলা এক আলেখ্য। দে’জের প্রথম সংস্করণ ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। করোনা কালে গতকাল পড়লাম ১২৮ পাতার জ্ঞানের আঁকরখানা।
শত শত বই ঘেঁটে, নানা উদাহরণ দিয়ে লেখক টেনেছেন জিপসী ঘেঁষা নানা ঘটনা, ইতিহাস, পুরাণ এবং জিপসী শব্দভান্ডার। আগ্রহীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
"জিপসী"-দের কথা অনেকেরই জানা।তাদের জীবন দেখে আপনারও ইচ্ছা করবে তল্পিতল্পা নিয়ে দুচোখ ভরে পৃথিবীর রুপ দেখতে। আপনি বোহেমিয়ান,ভবঘুরে,যাযাবর হতে হয়তো পারবেন কিন্তু "জিপসী" হয়ে ওঠা হবে না।কারণ তারা নিজস্ব এক সম্প্রদায়।তাদের আছে আলাদা রীতিনীতি,ভাষা,ইঙ্গিত এবং রক্তের বন্ধন এবং দলগত থাকার স্বভাব।
"জিপসী" নামটি শুনলেই চোখে ভেসে উঠবে পথের ধারে জোড়াতালি দেয়া তাঁবুর কাছে চকচকে রঙিন ঘাঘরা,শরীর ভর্তি গয়না এবং উল্কি আঁকা বন্য রমণীদের কথা।শুধু রমণী না তাদের দলে থাকে হরেক মানুষ এবং চিড়িয়া। কিন্তু ভালো করে দেখতে না দেখতেই তারা উধাও হয়ে যাবে তাদের ক্যারাভান সমেত। ক'দিন আগেও যারা ছিলো এই গঙ্গাতীরে,আজ তারা হাজারীবাগের কোনও ছোট্ট শহরের কোণে।ক'সপ্তাহ পরেই তাদের হয়তো দেখা যাবে মহীশূরের চন্দন বনে কিংবা কাশ্মীরের শালিমার বাগানে। আবার একই ক্যারাভানের উপনগরী হয়তো ঠাঁই নিয়েছে আফগানিস্তানের রুক্ষ উপাত্যকায়,হারুন-উল-রসিদের শহর বাগদাদের প্রাচীন মসজিদের পেছনে,প্যালেস্টাইনের কোনও খেজুর বনে।হয়তো বা আরও দূরে মায়ালোক প্যারিসের শহরতলীতে,স্পেনের পর্বত কন্দরে,ব্রিটেনের সবুজ স্নিগ্ধ গ্রামাঞ্চলে,নিউইয়র্ক কিংবা ক্যালিফোর্নিয়ার আলো ঝলমলে পথে।
কিন্তু এই জিপসী জীবনের শুরু কোথায়??কিভাবে তারা শতাব্দী ভরে সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছে?আধুনিক যুগে বিভিন্ন রাষ্ট্রের সীমানার বেড়াজালে পড়ে তাদের ভ্রাম্যমান জীবন কি শেষ? জিপসীদের নিয়ে অসংখ্য গবেষণা নথি বিদেশী ভাষায় থাকলেও বাংলায় সেরকম বিস্তর পড়াশোনা করবার মতো তথ্য নেই।"শ্রীপান্থ" রচিত বইটিতে জিপসী সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য রয়েছে যা জিপসী সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে জানার জন্য যথেষ্ট।
"নিজের জন্য মাটি চাই না, ছকবাঁধা ধর্ম চাই না, নিশ্চিত রুটির প্রতিশ্রুতি চাই না। একমাত্র কামনা আমার শান্তি।" এটা জিপসীর কথা।
জিপসী শব্দটি এসেছে ইজিপসিয়ান শব্দ টা সংক্ষিপ্ত হয়ে।
কোন এক খোলা জায়গাতে হঠাৎ করেই দেখা যায় ছোট ছোট ছেড়া তাঁবু, তাবু জীর্ণ হলেও জিপসী মেয়েদের পরনে আছে রংবেরঙের ঘাগড়া ও গয়না, ছেলেদের পোশাকেও আছে বৈচিত্র্য। তাদের নিদিষ্ট একটা ভূখন্ড না থাকলেও আছে নিজেদের নিজস্ব কিছু আচার-আচরণ রীতিনীতি। নিজেদের সমাজ ব্যবস্থায় তারা যথেষ্ট কঠোর। পৃথিবীর দেশে দেশে তারা নিজেদের একক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য নিয়ে বিরাজ করে। তবে তাদের কাজেরও আছে বৈচিত্র্যতা। জীবিকা হিসেবে যে কাজটা তারা জনস্বার্থে করে সাথে নিজেদের প্রয়োজনে সেই কাজগুলো তারা নিজেদের জন্য কখনও করে না। তাছাড়া তাদের নামে কিছু অপবাদ আছে যা আদেও তাদের ক্ষেত্রে সত্য নয়। সভ্যতার ইতিহাসে তাদের অবদান টাও কম নয়। তবে একটা সময় আসে তখন শুরু হয় জিপসীদের নির্মূল করে দেওয়ার অভিযান। তার পরও টেকে আছে তারা দেশে দেশে তাদের সমহিমায়।
জিপসী মানে মূলত যাযাবর জাতি বা বেদে বোঝান হয়। লেখক মাত্রই তাঁর স্বতন্ত্র নিজস্ব একটা লেখার বৈশিষ্ট্য থাকে। লেখক শ্রীপান্থ এর লেখায়ও সেই বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। লেখকের বেশ কয়েকটা বই পড়েছি, প্রতিটি বই পড়া শেষে আলাদা এক অনুভূতি ছুঁয়ে থাকে। জিপসীদের নিয়ে এতো বিস্তারিত ও তথ্যবহুল লেখা আর আছে কিনা তা আমার জানা নাই, তবে অসাধারণ একটা বই বলতেই হবে।
'কেন তুমি ঘুরে বেড়াও?- জানতে চায় ওরা! আমি জানি না, উড়ে যাচ্ছে যে পাখি উত্তর দিক সে। উত্তর দিক-বনের হরিণ।...'
জিপসী! নামটাই কেমন রহস্যে ঘেরা, যেন যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াচ্ছে জন্ম-ভবঘুরে, যাদের কুল কি কেউ জানেনা। কেউ জিজ্ঞেস করলে রহস্যময় হাসি হেসে শোনাবে একের পর এক গল্প। তা সে বাইবেল থেকে হোক অথবা রূপকথা থেকে। একেক জায়গায় একেক গল্প বলে তারা গৃহস্থ মানুষকে বোকা বানিয়ে মজা পায়। কেউ বলে তারা রোমান, কেউ বলে এশীয় আবার কেউ বলে ইজিপশিয়ান। আসলে জিপসী নামটাই এসেছে, ইজিপশিয়ান থেকে। যদিও আদপে তারা ইজিপশিয়ানও নয়। একগাদা ঘোড়া, ভালুক,কুকুর থাকবে তাদের ভাম্যমাণ বাসস্থানের সাথে, লম্বা ঘাগড়া, কালো চুল আর চোখের জিপসী তরুণ-তরুণীদের দেখলে চোখ ফেরানো দায়! এমন দুর্বার আকর্ষণ যে রাজা-রাজড়াকেও ঘরছাড়া করে ফেলে! হাত দেখা, ধাতুবিদ্যা ইত্যাদি অদ্ভুত প্রাচীন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করতো তারা। আমরা, যারা ঘর বেঁধে বাস করি,তাদের জিপসীরা বলে গাজো। গাজোর চোখে জিপসীরা যেমনই হোক, জিপসীদের চোখে গাজোরা ছিল ভীতিকর। তারা চায়নি ঘর বেঁধে বাস করতে, কিন্তু সভ্য পৃথিবীর নানাবিধ প্ররোচনা অতি প্রাচীন এই যাযাবর-বোহেমিয়ান জাতিটিকে পৃথিবী থেকে করে দিচ্ছে প্রায় নিশ্চিহ্ন। তাতে সভ্য মানুষ খুশি, তারা রহস্যময় জিপসীদের জয় করতে পেরেছে। কিন্তু এক দেশ থেকে অন্য দেশে ঘুরে বেড়ানো এই জিপসীরা থাকলেই যেন ভালো হত আগের মতো।আমাদের উপমহাদেশের বেদেরাও যাযাবর, কিন্তু ঠিক জিপসী নয়। জিপসীদের সাথে তাদের কিছু মিল থাকলেও রয়েছে বিস্তর অমিল। ধর্মবিশ্বাস, আইন, খাওয়া-দাওয়া, আচরণবিধি সবই জিপসীদের স্বতন্ত্র। 'ঠগ���' পড়ে এবং নানান বইয়ের নাম শুনেই আমি শ্রীপান্থের ভক্ত বনে গিয়েছিলাম। 'জিপসীর পায়ে পায়ে' পড়ে নিশ্চিত হলাম, ভুল করিনি। বিষয়বস্তু যেমন বিচিত্র, তেমনি আকর্ষণীয় লেখনশৈলী। আরো অনেক পড়তে হবে শ্রীপান্থ।
জিপসী ঠগীদের পর আমার দ্বিতীয় আগ্রহ জিপসীদের নিয়ে,আমার শুধু এইটুকু জানা ছিলো যে এরা ইউরোপের দিকে ঘুরে বেড়ানো যাযাবর। এদেরকে আমি আমাদের দেশীয় যাযাবর সম্প্রদায় 'বেদে'দের সাথে গুলিয়ে ফেলেছিলাম। ওদের মধ্যে মিল থাকলেও তারা মূলত এক নয়। জিপসীদের রোমানি ভাষার অনেক শব্দ সংস্কৃত থেকে এসেছে বলে অনেকগুলো রোমানি শব্দের অর্থ সহজে বুঝা যায়। শ্রীপান্থের এই জিপসীর পায়ে পায়ে বইয়ে জিপসীদের ইতিহাস, পরিচয়, রীতিনীতি, জীবন জীবিকা, ভাষা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের ভুবনে শ্রীপান্থ এক অনন্য নাম। তাঁর ভ্রমণকাহিনিগুলো নিছক স্থানবর্ণনা নয়; এগুলো মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি ও সমাজকে দেখার এক অন্য চোখ। “জিপসির পায়ে পায়ে” বইটি হাতে নিলেই বোঝা যায়, লেখক কেবল দেশভ্রমণ করেননি, বরং সেই ভ্রমণকে আত্মস্থ করে পাঠকের কাছে এক সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা হিসেবে হাজির করেছেন। বইটির নামেই যেন লুকিয়ে আছে এর মর্মার্থ। জিপসি মানে চিরভ্রমণকারী, স্থিরতা-অস্বীকারকারী, এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরে বেড়ানো মানুষ। শ্রীপান্থ নিজের ভ্রমণকাহিনিকে এই জিপসিদের পদচিহ্নের সাথে যুক্ত করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে ভ্রমণ মানে কেবল দৃশ্য দেখা নয়, বরং সংস্কৃতির গভীরে প্রবেশ, ইতিহাসের আলোছায়ায় দাঁড়িয়ে বর্তমানকে চিনে নেওয়া, মানুষের অন্তরঙ্গ জীবনে ডুব দেওয়া।
এই বইয়ের ভাষা কাব্যিক অথচ তথ্যবহুল। শ্রীপান্থ কোনো জায়গার বর্ণনা দিতে গিয়ে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই আঁকেন না, সেই জায়গার অতীত, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের টানাপোড়েনও তুলে ধরেন। ফলে পাঠক একদিকে যেমন বালুকাবেলার বিস্তীর্ণ মরুভূমি, পাহাড়শ্রেণির খাড়া ঢাল বা নগরের আলোকোজ্জ্বল রাতকে চোখের সামনে দেখতে পান, অন্যদিকে জানতে পারেন সেই মরুভূমি কত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের সাক্ষী, সেই পাহাড় কিভাবে মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে, কিংবা সেই নগরের ভেতরে আধুনিকতা ও ঐতিহ্যের সংঘাত কেমন করে প্রতিদিন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। লেখক ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্বকে এমনভাবে বুনেছেন যে, পাঠক মনে করেন তিনি যেন ভ্রমণের পাশাপাশি গবেষণার এক ভাণ্ডারে প্রবেশ করেছেন।
শ্রীপান্থের দৃষ্টি সবসময় মানবকেন্দ্রিক। তিনি যেখানে গেছেন, সেই জায়গার প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি সেখানকার সাধারণ মানুষদের জীবনযাপন, বিশ্বাস, লোকসংস্কৃতি ও আনন্দ-বেদনার রং তুলে ধরেছেন। তাঁর ভ্রমণগল্পে লোকগান, লোককাহিনি, আচার-অনুষ্ঠান কিংবা ধর্মবিশ্বাসের মতো উপাদানগুলি এসেছে একেবারে স্বাভাবিকভাবে। এর ফলে “জিপসির পায়ে পায়ে” কেবল ভ্রমণসাহিত্য নয়, বরং এক জীবন্ত লোকসংস্কৃতির দলিল হয়ে উঠেছে। পাঠক যেন বইটি পড়তে পড়তে লোকসংস্কৃতির সুর শুনতে পান, বাজারের কোলাহল কিংবা অচেনা শহরের গলিঘুঁজির গন্ধ অনুভব করতে পারেন।
বইটির এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর বর্ণনার বহমানতা। পাঠক কখনো মরুভূমির নিস্তব্ধতায় নিমগ্ন হন, আবার হঠাৎই ভেসে যান সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে বা অচেনা নগরের কোলাহলে। এই বর্ণনাশক্তির কারণেই পাঠক মনে করেন, তিনি নিজেও লেখকের সাথে ভ্রমণে নেমে পড়েছেন। তবে কিছু কিছু জায়গায় লেখকের তথ্য ও বিশ্লেষণ এত ঘন হয়ে যায় যে পাঠকের ধৈর্যের পরীক্ষা নেয়। যারা হালকা ভ্রমণগল্প খুঁজছেন, তাদের কাছে এই বই কিছুটা ভারী লাগতে পারে। কিন্তু যারা সত্যিকার ভ্রমণসাহিত্যপ্রেমী, যারা ভ্রমণের ভেতর দিয়ে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানবসভ্যতার পথচলা খুঁজে পেতে চান, তাদের কাছে এই বই অনন্য হয়ে উঠবে।
সবশেষে বলা যায়, শ্রীপান্থের “জিপসির পায়ে পায়ে” বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে এক বিশেষ সংযোজন। এটি একইসাথে সাহিত্য, ইতিহাস, নৃতত্ত্ব ও সংস্কৃতিচর্চার মিলনমেলা। বইটি পড়ে পাঠক শুধু নতুন দেশ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানেন না, বরং নতুন করে চিনে নেন নিজেকেও। কেননা, ভ্রমণ মানে তো শেষ পর্যন্ত আত্মঅন্বেষণ, নিজের ভেতরে ফিরে আসা। শ্রীপান্থ সেই আত্মঅন্বেষণের পথেই পাঠককে নিয়ে যান—জিপসির মতো অনন্ত ভ্রমণে।
জিপসীদের নিয়ে অনেক তথ্যবহুল একটা বই। শ্রীপান্থর লেখা ঠগী পড়ে অসাধারণ লাগে। তাই জানতাম এটাও ভাল হবে। কিন্তু প্রথম থেকেই লেখাটা অনেক ছন্নছাড়া লাগছিল। অবশ্য যে জাতির জীবন ই যাযাবর তাদের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানার কথাও না। জিপসী শব্দটা ইজিপ্সীয় থেকে আসলেও আসলে তাদের আগমন কোথা থেকে এটা নিশ্চিত নয়। তারা একেক দেশে একেক গল্প বলে। কিন্তু ভাষা আর জীবনযাত্রা খেয়াল করলে বোঝা যায় তাদের শুরুটা এক জায়গাতেই। জিপসীদের নিয়ে অনেক গকপ, সত্য ঘটনা, গুজব, অপবাদ অনেক কিছুই আছে বইটাতে, গল্প আকারে সাজানো আছে। তাও আমাকে কেন যেন জোর করে শেষ করতে হলো বইটা। ১৩০ পৃষ্ঠার বই সব মিলে ৭ ঘন্টা লেগেছে৷ হয়তো এরকম শেকড়বিহীন জীবন আমাকে টানে না বলেই এরকম লেগেছে।
দারুণ একটা বই। জিপসিদের সম্পর্কে জানার ইচ্ছে ছিল খুব। সেই জানার ক্ষুধা অনেকটাই মেটাতে সক্ষম হয়েছে এই বইটা। বইটিতে লেখক আপনাকে সাথে নিয়ে ভ্রমন করবে নানান দেশের জিপসিদের সাথে। খুজে ফিরবে তাদের আদি উৎস। অনেক তথ্য বহুল একটি বই।
সে অনেক কাল আগের কথা। ঈশ্বর চুলা জ্বালিয়ে মানুষ গড়তে বসেছেন। চুলায় আগুন দিয়ে বসেই আছেন, ওদিকে কী হচ্ছে মোটেও তাঁর খেয়াল নেই। যখন খেয়াল হল তখন ছুটে গিয়ে চুলার মধ্যের মূর্তিগুলো বের করে দেখেন যে ওগুলো পুড়ে কালো হয়ে গেছে। এরাই পৃথিবীর প্রথম মানুষ - নিগ্রো বলে যাদের ডাকা হয়। যাইহোক, পরেরবার ঈশ্বর খুবই হুঁশিয়ার! চুলায় দিয়েই নামিয়ে ফেললেন। ফলস্বরূপ এবারের মূর্তিগুলো ফ্যাকাশে রয়ে গেল। ওরাই সাদা মানুষ। তৃতীয়বার ঈশ্বর আর ভুল করলেন না। ঠিক সময়ে বের করে নিলেন পুতুল দুটি। এবার তৈরি হল খাঁটি মানুষ! খুব কালোও না, ফর্সাও না! এরাই নিজেদের রোম বলে দাবি করে। আমরা যাদের জিপসী ডাকি।
জিপসীর কথা প্রথম পড়ি সম্ভবত তিন গোয়েন্দার একটা বইতে। এক ভদ্রমহিলার কুসংস্কার ভাঙাতে এক নকল জিপসীকে সাজিয়ে আনা হয়। জিপসী বললেই চোখের সামনে ভেসে উঠে এক যাযাবর জাতির নাম, দেখতে খুব ভয়ংকর, সাজসজ্জায় ভয়ানক, যাদের কাজই হচ্ছে ভয়ংকর ভয়ংকর কালোজাদু করে মানুষের সর্বস্ব লুট করা। কিন্তু এমনটা তো জিপসীর ব্যপারে সাধারণ মানুষ ভাবে। জিপসীরা আসলে কেমন? তাদের কি ব্যাক্তিগত জীবন বলে কিছু আছে? সবচে' বড় কথা তারা এসেছেই বা কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তরই খুঁজেছেন শ্রীপান্থ 'জিপসীর পায়ে পায়ে' বইতে।
ইউরোপের দেশে দেশে জিপসীদের হেঁটেচলা ঠিক কবে শুরু হয়েছে এবং কেন সে বিষয়ে ইতিহাসবেত্তাদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। এই জাতিটি বারবারই বিভিন্ন রাজার আক্রোশের শিকার হয়েছে। বারবারই একটা নির্দিষ্ট ভূখণ্ড টেনে এদের আটকে রাখার প্রচেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু জিপসীদের হেঁটে চলা থামেনি। বইতে লেখক বারবারই বলতে চেয়েছেন যে ইউরোপের সেই জিপসী জাতির উৎপত্তি হয়েছে মূলত ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে ঘরহীন মানুষের নতুনের উদ্দেশ্যে পদচারণার মাধ্যমে। জিপসীদের ব্যবহৃত ভাষায় এমন অনেক শব্দই রয়েছে যা ভারতীয় শব্দ। এমনকি ওদের ব্যবহৃত বেহালার জন্মস্থানও ভারতে। কাজেই তাদের সাথে যে ভারতীয় সংস্কৃতির একটা সম্পর্ক রয়েছে তা বলাই বাহুল্য।
অবশ্য জিপসীরা নিজেদের উৎপত্তি নিয়ে নানারকম গল্প বানিয়ে রেখেছে, এর একটা উপরে বলা হয়েছে, গল্পগুলো স্থান, কাল, পরিবেশ আর ধর্মভেদে পরিবর্তিত হয়ে যায়।
কালোজাদুর ব্যপারে জিপসীদের ভালো দুর্নাম রয়েছে। এবিসি রেডিওতে একটা শো নিয়মিত শুনতাম। সেখানে জনৈক ব্যক্তি ট্যারট কার্ড ব্যবহার করে মানুষের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ বলে দিত! অনেক অতিপ্রাকৃত সমস্যার সমাধান দিয়ে দিত। এই ট্যারট কার্ড জিপসীরা বহুলভাবে ব্যবহার করে মানুষের ভাগ্যগণনায়। মানুষ দেদারসে যায়ও তাদের কাছে নিজেদের অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে! এগুলো আদৌ কতটা কাজ করে সেটাও একটা কথা! প্রসঙ্গত বলে রাখি, এবিসি রেডিওর ঐ ব্যক্তিকে পরবর্তীতে পুলিশ গ্রেফতার করে পাবলিক মিডিয়া ব্যবহার করে প্রতারণার দায়ে।
এত কিছুর পরে জানতে ইচ্ছা করে যে জিপসীদের ব্যাক্তিগত জীবনটা কেমন? ওদের মধ্যে মন দেওয়ানেওয়া হয়? সংসার হয়? সন্তানসন্ততি? হয়! সবই হয়! জিপসিদের মধ্যেও মন দেওয়া নেওয়া হয়। অন্যের মন পেতে কত আয়োজন। বিফলে আছে অন্য রাস্তা! ছেলেরা মেয়েদের মন পাওয়ার জন্য নদীর ধারে পৌছে পাতা নিয়ে হাত কেটে রক্ত বের করে তাতে লাগিয়ে মনে মনে নিজের নাম বলে। এরপরে... থাক আর না বলি!
হেঁটে বেড়ালেও এদের নিজস্ব পরিবার আছে, সংসার আছে। সংসারের ভালো মন্দ চিন্তা আছে। পরিবারের জন্য আন্তরিকতা আছে। সন্তানের জন্য ভালোবাসা আছে।... তাদের ব্যপারে লিখতে থাকলে প্যারার পর প্যারা শেষ হয়ে যাবে কিন্তু লেখা ফুরাবে না, এদ্দূরই থাক আজ!
এই বইয়ের সন্ধান পেয়েছিলাম একটা কমেন্টে! দু'জন ব্যাক্তি আলোচনা (!) করছিলেন জিপসী আর ঠগী নিয়ে। সেখান থেকেই জেনে ফেললাম সুন্দর বইটা সম্পর্কে! ধন্যবাদ শতাব্দী আপু, ওরকম জ্ঞানগর্ভ কমেন্টের জন্য! 😛
জিপসী বা ভবঘুরে যেটাই বলি না কেন। ঘুরে বেড়ানোই যাদের নেশা। তারা থামে না, তারা স্থির হয় না। শুধুই ছুটে চলে। জীবনের প্রতি যাদের ভালবাসা আছে, জীবন কে ভালবেসে তারা ঘর ছেড়েছে। এই জীবনের তাগিদেই তাদের ছুটে চলা। নির্দিষ্ট ঘর নেই, বাড়ি নেই, তবুও তাদের মনে কোন দুঃখ কষ্ট নেই। নেই খেদ বা আক্ষেপ। সব কিছু মেনে নিয়েই ছুটে চলে অজানার পথে। দেশ থেকে দেশান্তরে। . জিপসীদের ইতিহাস সঠিক ভাবে আজও জানা যায়নি। কেউ বলে তারা হাজার বছরের পুরোন। আবার কারো কারো মনে সৃষ্টির আদিম থেকেই তারা আছে। তাদের নির্দিষ্ট কোন ইতিহাস নেই। যুগে যুগে তাদের ইতিহাস তৈরি হয়েছে। পরিবর্তন হয়েছে। তারা তাই যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়েও কোন ইতিহাসে তাদের জায়গা হয়নি। . জিপসীরা ভবঘুরে নয় আবার তারা স্থির স্বাভাবিক মানুষ নয়। তাদের এই ছুটে চলাতেই তাদের জীবনের লক্ষ্য লুকিয়ে আছে। তারা জীবন ভালবাসে। জীবনকে ভালবেসেই তারা ছুটে চলে অজানার পথে।
জিপসীদের নিয়ে অনেক তথ্যবহুল একটা বই। শ্রীপান্থর লেখা ঠগী পড়ে অসাধারণ লাগে। তাই জানতাম এটাও ভাল হবে। কিন্তু প্রথম থেকেই লেখাটা অনেক ছন্নছাড়া লাগছিল। অবশ্য যে জাতির জীবন ই যাযাবর তাদের সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানার কথাও না। জিপসী শব্দটা ইজিপ্সীয় থেকে আসলেও আসলে তাদের আগমন কোথা থেকে এটা নিশ্চিত নয়। তারা একেক দেশে একেক গল্প বলে। কিন্তু ভাষা আর জীবনযাত্রা খেয়াল করলে বোঝা যায় তাদের শুরুটা এক জায়গাতেই। জিপসীদের নিয়ে অনেক গকপ, সত্য ঘটনা, গুজব, অপবাদ অনেক কিছুই আছে বইটাতে, গল্প আকারে সাজানো আছে। তাও আমাকে কেন যেন জোর করে শেষ করতে হলো বইটা। ১৩০ পৃষ্ঠার বই সব মিলে ৭ ঘন্টা লেগেছে৷ হয়তো এরকম শেকড়বিহীন জীবন আমাকে টানে না বলেই এরকম লেগেছে।
বাংলায় জিপসী-সংক্রান্ত আর কোনো বই আছে কিনা জানি না, তবে জানি হাজার বছর ধরে চলে আসা বৈশ্বিক রাজনীতি, সংস্কৃতি আর সাহিত্যের সম্প্রসারণে জিপসীদের ভূমিকা অপরিসীম। এতদিন জিপসীদের সম্পর্কে না জেনে বিভিন্ন ফিকশনে কেবল তাদের ছোট অথচ গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতির কথা পড়েই গিয়েছি, এদের অন্তর্ভুক্তির হেতুর সন্ধান পাইনি। শ্রীপান্থ সেই সন্ধান দিয়েছেন, বা বলা ভালো, দেবার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। বুঝেছি, উদ্ভিদের পরাগায়নের মতোই জিপসীরা যুগে-যুগে কালে-কালে একের ভাষা ও সংস্কৃতি ছড়িয়ে বেড়িয়েছে অন্যখানে, যার রাজনৈতিক গুরুত্ব অবর্ণনীয়, ইতিহাস বহনে চির অনন্য।
ভাল লাগলো পড়ে। জিপসিদের জীবনযাপন সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করার জন্য খুব ভাল বই এটি। কোন নির্দিষ্ট চরিত্র না থাকার পরেও পড়তে উপন্যাসের মত লাগবে। সমস্যা হলো বইটাতে অধ্যায়ভিত্তিক কোন ইনডেক্স নেই। একেক অধ্যায়ে জিপসিদের জীবনের একেক অঙ্গন নিয়ে লেখা হয়েছে কিন্তু ইনডেক্স না থাকায় চট করে খুলে নির্দিষ্ট কোন তথ্য বের করতে বেগ পেতে হবে। ইতিহাস, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, ভাষা ও ফোকলোর ইত্যাদি নামে কয়েকটা অধ্যায় রাখা উচিত ছিল। তবে খুব সুখপাঠ্য বিধায় এসব সীমাবদ্ধতা একেবারেই গায়ে লাগবে না।
জিপসীর কথা-- "নিজের জন্য মাটি চাই না,ছকবাঁধা ধৰ্ম চাই না,নিশ্চিত রুটির প্রতিশ্রুতি চাই না। একমাত্র কামনা আমার শান্তি।” জিপসীদের নিয়ে বাংলায় লেখা এরচেয়ে তথ্যবহুল বই দ্বিতীয়টি নেই। শ্রীপান্থ তার ঝরেঝরে গদ্যে ঢাকা যে গল্পের বাক্স খুলেছিলেন,সেই বাক্স থেকে জিপসীদের যে গল্প,যে তথ্য বেরিয়েছে তার সবই উপাদেয়। রীতিমতো তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করার মতো। আবার জিপসীর দলে নাম ভেড়ানোর মতো উসকানিও কম নেই সেখানে!