এ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনে নকশালবাড়ির ঝাপটা এসে লেগেছিল। ১৯৬৮ সালে সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে তৈরি হয় পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন, যা পরে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টিতে রূপান্তরিত হয়। তরুণদের একটি বড় অংশ এই দলের সশস্ত্র রাজনীতির ধারায় শামিল হন। বাংলাদেশের সর্বহারা রাজনীতির তত্ত্ব, রূপকল্প ও কর্মসূচি এবং একঝাঁক মেধাবী তরুণের স্বপ্নযাত্রা ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প এ বইয়ে তুলে ধরেছেন অনুসন্ধানী গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।
জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
১. আমি সম্ভবত 'আই হেইট পলিটিক্স' জেনারেশনের সামান্য আগের মানুষ। কিংবা ওই প্রজন্মের হয়েও (আমার অনেক বন্ধুবান্ধব এমনই) রাজনীতি আর ইতিহাসে একটু কাঁচা বয়সেই আগ্রহ তৈরী হয়েছিল। পত্রপত্রিকায় রাজনীতির হাল হকিকত দেখা থেকে শুরু করে এই দেশের ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে আগ্রহ ছিল। কিন্তু ওই বয়সে বইপত্র যোগাড় করা সহজ ছিল না। যেখানে 'কিশোর উপন্যাস' পড়ারই সুযোগ নেই, সেখানে রাজনীতি, ইতিহাসের বই কোথা থেকে আসবে। তবু তখন পত্রিকাগুলো এখনকাল তুলনায় ভালো ছিল। 'ব্রেকিং নিউজ' বাদেও অনেক কিছু থাকত। টিভিতে কিছু ভালো 'টক শো' হতো। কিন্তু তখনও বুঝতাম যে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা একদমই নেই।
কলেজে ওঠার পর বহির্জগতের সাথে পরিচয় বাড়ার পর বইপত্র যোগাড় করার পথ কিছুটা সুগম হলো। কিন্তু তাও কতোটা? টাকা পয়সাও তো লাগে। তবু টুকটুক করে যোগাড় হলো কিছু হার্ড কপি, কিছু সফট। ঘর থেকে বেরনো বন্ধ করে ডেস্কটপেই পড়তাম। এতো বড় স্ক্রিনের মোবাইল তো নেই। একটা পড়ে আরেকটার সাথে মেলানো। নতুন তথ্য খোঁজা! কিন্তু এমন অনেক বিষয় ছিল, যা নিয়ে লেখাই হয়নি। হলেও তা দুর্লভ।
সিরাজ সিকদারের নাম কেবল না, সর্বহারা পার্টি এবং তাদের 'তান্ডব' নিয়ে কিছু কিছু কথা জানা ছিল। হতে পারে বাবা কখনও কারও সাথে আলাপ করেছিল, কিংবা কখনও কোন পত্রিকায় পড়েছি। পরবর্তী সময়ে (২০১১/১২) মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নানা বয়ান পড়ার পর আমার আফসোস হতো '৭১ থেকে '৭৫ নিয়ে আমাদের দেশটা এতো নীবর কেন! ২০০৮ পূর্ববর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হতো কিনা বা সে বয়ান কেমন ছিল, ওই তর্কে না গিয়ে বলি, ১২/১৩ থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ফের একটা আলোচনা-স্রোত তৈরী হয়, যেটা সবাই কম বেশি জানেন। কিন্তু তখনও আমার ওই আফসোসটা ছিল! '৭২ থেকে '৭৫ এর রাজনীতি এবং ইতিহাস আলোচনায় কেবল কয়েকটা ঘটনার কথাই আসতো। সত্যি বলতে এই সময়কার 'রাজনৈতিক ইতিহাস'-এর অভাব ছিল। অন্তত, গুছিয়ে করা কাজের অভাব ছিল।
মহিউদ্দিন আহমদ সেই অভাব মেটাবেন, জানতাম না। তার 'আওয়ামী লীগঃ উত্থানপর্ব' কেনার সামর্থ্য হয় অনেক পরে। তার আগেই 'জাসদের উত্থান পতন এবং অস্থির সময়ের রাজনীতি' পড়া হয় এবং আমার মনে হয়েছিল এবার অপেক্ষা করা যায়। ভদ্রলোক আরও অনেক কিছু জানাবেন। গত বছর 'বেলা-অবেলা' সেই অনেকদিনের প্রতীক্ষা শেষ করেছিল। গত বারো বছরে অনেক বইই লেখা হয়েছে কিন্তু ভক্তিবাদ সরিয়ে রেখে যুক্তি এবং অন্তদৃষ্টির নিরিখে কতগুলো লেখা হয়েছে জানি না। মহিউদ্দিন আহমদ সেটা করেছেন।
২. সত্তর দশকে পশ্চিম বাংলা এবং বাংলাদেশে যে কমিউনিস্ট অ্যাক্টিভিটি হয়েছিল, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর প্রভাব সক্রিয়। সর্বহারা পার্টির রাজনীতি কাম অ্যাক্টিভিটি, এর মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। আর এই সর্বহারা পার্টিরই সর্বেসর্বা সিরাজ সিকদার। মেধাবি এক ইঞ্জিনিয়ার থেকে দেশের মোস্ট ওয়ান্টেড। এই কথা লিখতে লিখতে মনে হলো গত বছরের (নাকি ২০১৯?) কেজিএফ সিনেমার মতো একটা সিনেমা তাকে নিয়ে বানানো যায়। সিকদার সম্পর্কে যারাই কথা বলেছেন, অনেকেই বলেছেন তাকে নিয়ে উপন্যাস লেখা যায়।
সেই সিরাজ সিকদারের সিরাজ সিকদার হয়ে ওঠা, কোন এক চেতনা থেকে একটি দল তৈরী করা এবং সে দলের পরিণত হতে না হতে শেষ হয়ে যাওয়ার 'ইতিহাস' মহিউদ্দিন আহমদের 'লাল সন্ত্রাস'। লেখক বরাবরই ইতিহাস লেখেন এবং সেটা একাডেমিক। যদিও একাডেমিক ধারার মতো প্রচুর ফুটনোট থাকে না, একটা 'জার্নি' থাকে যা সাধারণ পাঠককেও 'ইতিহাস' পড়তে সহায়তা করে। এই বইও ব্যতিক্রম নয়। তবে এই বইটি লেখকের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় খানিক ব্যতিক্রম কেননা অন্যান্য বইয়ে লেখক ইতিহাস বলতে বলতে তার মাঝে তার গৃহীত সাক্ষাৎকার কোট করে থাকেন, এখানেও করেছেন, তবে পার্টির বেশ কয়েকজন সদস্যের ভাষ্য আলাদা ভাবে একটি অংশে উল্লিখিত হয়েছে। মূলত বইটি দুই ভাগে বিভক্ত যার প্রথম ভাগে পার্টি, সিকদার এবং সেই সময়ের ইতিহাস; দ্বিতীয় অংশে সদস্যদের বয়ান। লেখকের মতে, মানুষ বাদ দিয়ে তো ইতিহাস হয় না এবং এক্ষেত্রে এই মানুষেরা সর্বহারা পার্টির ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
সর্বহারা পার্টির শুরু থেকে শেষ অবদি তাদের কর্মকাণ্ড, ইশতেহার, বিভেদ, খুনোখুনি, সরকার এবং অন্যান্য দলের সাথে সম্পর্ক; সবকিছুই উঠে এসেছে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশের তৎকালীন রাজনীতির একাংশের অবস্থা যা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে, তা ফুটে উঠেছে। তবে জটিলতার মধ্যে বারবার হারাতে হয়। তাই বলে রাখা ভালো, বাংলাদেশের রাজনীতি, ইতিহাস, কমিউনিস্ট আন্দোলন এমনকি চীন, রাশিয়ার বিপ্লব, কমিউনিস্ট শাসন সম্পর্কে খানিক ধারণা না নিয়ে এই বই পড়লে কিন্তু অনেক কিছুই বুঝতে পারবেন না।
৩. 'লাল সন্ত্রাস' নাম নিয়ে অনেকে কিছুটা দ্বিধায় ভুগছেন। ধরে নিয়েছেন বইয়ের নামেই সিরাজ সিকদারকে 'সন্ত্রাসী' বলা হচ্ছে। কিন্তু আদতে নামটা কতোটা পারফেক্ট, সেটা পৃথিবীর কমিউনিস্ট আন্দোলন, লাল-সাদা তত্ত্ব তথা নানা পরিভাষা জানা থাকলে বোঝা যায়। না জানলেও, বইয়ের ভূমিকা পড়লে বোঝা যাবে।
এখানেই শেষ নয় অবশ্য। অনেক কিছুই রয়ে গেছে। লেখক নিজেও তার প্রতিটা বইয়েই বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসের কিছু কালপর্ব নিয়ে লেখার সময় কেবল শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে ফাঁকা জায়গাগুলো পূরণ হবে।
সিরাজ সিকদার সম্পর্কে একেবারে কিছু না জানলেও ‘সর্বহারা সিরাজ সিকদার' নামটি শুনলেই কৈশোর পেরুনো তরুণ থেকে শুরু করে যে কোনও বয়সের মানুষই মাথা ঝাঁকায়- কারো না কারো কাছ থেকে এই নামটি শুনেছে সবাই, সর্বহারা পার্টি নামের একটা দলের নেতা ছিল লোকটা। কী সব বিপ্লব টিপ্লব- খুন খারাপি করে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল সে! তাঁর মৃত্যুটাও ছিল বেশ রহস্যজনক। বেপরোয়া বিপ্লবী আর ভয়ংকর শক্তিশালী রহস্যময় একটা ইমেজ ভেসে ওঠে সিরাজ সিকদার নামের সঙ্গে। অনেকের মতো আমারও সিরাজ সিকদার সম্পর্কে মোটামুটি এটুকুই জানা ছিল এত দিন।
কিন্ত মহিউদ্দীন আহমেদের লাল সন্ত্রাস শেষ করে ইতিহাসের অজানা আরেকটি অধ্যায় স্পষ্ট হলো। বইয়ের রসদ মূলত সিরাজ সিকদারকে কাছে থেকে দেখেছে এমন বহুজনের সাক্ষাৎকার, সেই সময়ের পত্রিকা আর সর্বহারা পার্টি ও পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন বিবৃতি। সেই সাথে আছে সিরাজ সিকদার আর সর্বহারা পার্টির দোষগুন নিয়ে তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সঙ্গীদের নিজস্ব বয়ান। এ সমস্ত কিছুকে এক জায়গায় এনে মহিউদ্দীন আহমেদ সিরাজ সিকদারকে নিয়ে নিজে কোনও মতামত দাঁড় করাননি, বরঞ্চ পাঠককে সুযোগ করে দিয়েছেন নিজের মতো করে ইতিহাসকে আবিষ্কার করার। আমার এ বিষয়ে পাঠ-স্বল্পতার কারণে এ লেখার জন্য আমি পুরোপুরি নির্ভর করছি এই বইটির উপর, অর্থাৎ মোটাদাগে মহিউদ্দীন আহমেদের লেখা থেকেই আমার আবিষ্কৃত সিরাজ সিকদার আর সর্বহারা পার্টিকে উপস্থাপনের চেষ্টা থাকবে এই লেখায়, অনেকটা বইটার সারসংক্ষেপ বলা যায়।
সিরাজ সিকদার আসলে কে? সর্বহারা পার্টি আসলে কী? সর্বহারাই বা কাদেরকে বলে? বইটা পড়ার আগে এই বিষয়গুলো সম্পর্কে কিঞ্চিৎ ধারনা থাকলে বুঝতে সহজ হবে। শুধুই ইতিহাস জানার জন্য আগ্রহী কিন্তু অ-প্রস্তুত পাঠক বইটা খুলে বসার আগে আরও কিছু বিষয়, যেমন- বিপ্লব কী, সেই সাথে মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদসহ কমিউনিজম ও সোশ্যালিজম সম্পর্কে অল্পস্বল্প ধারণা রাখতে পারলে ��ো সোনায় সোহাগা।
ধরেই নিচ্ছি, বই পড়ুয়া সকলেরই কিছুটা হলেও ধারনা আছে কমিউনিজম-সোশ্যালিজম কিংবা সামাজিক মালিকানা সম্পর্কে । কার্ল ম��র্কস যে বিবর্তনের ধারায় শ্রেনী সংগ্রামের তত্ব দিয়েছেন তার বাস্তব প্রয়োগ দেখিয়েছেন লেনিন। মার্কস ও লেনিনের তত্বকে মিলিয়ে নতুন এক মতবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মাও সে তুং। সিরাজ সিকদার ছিলেন সেই মাও সে তুং-এর অনুসারী। মাওয়ের আদর্শে তিনি ধারণ করতেন মার্কসবাদ ও লেনিনবাদকে, যে মাও কিংবা লেনিনের আদর্শকে ধারণ করে বলশেভিক থেকে নকশালের বিপ্লবী চেতনায় অসংখ্য তরুণ একসময় যুক্ত হয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রামে, হয়ে উঠেছিল সর্বহারা।
সর্বহারার ইংরেজি প্রলেতারিয়েত। যারা শ্রম বিক্রি করে দিন আনে দিন খায়, যাদের শ্রম থেকে আসা মুনাফা বুর্জোয়া শ্রেনী ভোগ করে, তাদেরকেই তাত্বিকভাবে বলা হয় সর্বহারা। কিন্তু বিপ্লবী চেতনায় এই সর্বহারা হলো তারাই, যাদের হারানোর কিছুই নেই, বিপ্লবের ময়দানই যার ঘর সংসার এবং বিপ্লবের জন্য জীবন দিতে যারা সদাপ্রস্তুত। (তবে, বাংলাদেশে এখনো বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে সর্বহারা নামে যাদের খবর পাওয়া যায়, তাদের সাথে সিরাজ সিকদারের সর্বহারাদের কোনো সংযোগ নেই। সিরাজ সিকদারের দলের ছিল বিপ্লবী আদর্শ, আর এদের আদর্শ পুরোপুরি ডাকাতি।)
সত্যিকারের সেই সর্বহারা এসেছিল বাংলাদেশেও, বাংলাদেশের সর্বহারা পার্টির স্রষ্টা সিরাজ সিকদারের হাত ধরে। সিরাজ সিকদারের জন্ম ২৭ অক্টোবর ১৯৪৪-এ। এর কিছুদিন পরেই ভারত ভাগ হলো। সে সময় উপমহাদেশে ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৪৮ সালে কলকাতায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের কমিউনিস্ট নেতারা প্রস্তাব করলেন পাকিস্তানে আলাদা কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে; এরপরই গঠিত হয় পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। মনি সিংহ, সরদার ফজলুল করিম , শহীদুল্লা কায়সারসহ অনেকেই ছিলেন সেই কমিটিতে। কিন্তু ৫৬ সালে মস্কোয় অনুষ্ঠিত কংগ্রেসে সোভিয়েত পার্টির সঙ্গে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির বিভেদ সৃষ্টি হলে সেই ঢেউ পূর্ব পাকিস্তানেও এসে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৬৫ সালে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনও বিভক্ত হয়ে যায়; তৈরি হয় রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে চীনপন্থি গ্রুপ আর মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে সোভিয়েতপন্থী গ্রুপ। ৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে চীনপন্থী ও সোভিয়েতপন্থী আলাদা কমিটি গঠন করে। এর ফলে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, পূর্ব বাংলা বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের পূর্ব বাংলা সমন্বয় কমিটিসহ বিভিন্ন নামে কমিটি গঠিত হতে থাকে।
ঠিক এই সময়টিতেই সিরাজ সিকদারের আবির্ভাব। সে সময় তিনি বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, এবং চীনপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের হল কমিটির সভাপতি। প্রচুর পড়াশুনা করতেন, গোগ্রাসে গিলতেন মাও সে তুং, কার্ল মার্কসসহ রথি মহারথিদের যত লেখা। সমাজের নানা অংশের বৈষম্য তাকে আঘাত করতে থাকে। “আমি” শব্দের অহংবোধ থেকে বেরিয়ে “আমরা” হওয়ার সংকল্প করেন তিনি। সমাজের বৈষম্য দূর করতে ছাত্র অবস্থাতেই বাড়ি গিয়ে কাজের মেয়ে রওশন আরাকে বিয়ে করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ১৯৬৭ সালে বর্তমান বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ প্রথম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হন, কিন্তু মনের মাঝে বিপ্লবী চেতনা। চারপাশের যত কমিউনিস্ট নেতাকর্মী আছেন সবাইকে তাঁর কাছে সংশোধনবাদী মনে হতে থাকে। তাঁর কাছে তিনিই একমাত্র আদর্শ বিপ্লবী। তাই দেশের জন্য কিছু করতে হলে নিজের আদর্শে নতুন করে দল গঠন করতে হবে। কিন্তু একা তো কিছু করা যাবে না, তাই সমমনা ইউনিয়নের আরো কিছু মেধাবী বন্ধুদের সঙ্গে নতুন পরিকল্পনা করলেন। তাদেরকে পড়তে দিলন মাও সে তুং-এর রচনাবলী, ভিয়েতনামের গেরিলাযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করলেন সবার সাথে। সেই গেরিলাযুদ্ধের রোমাঞ্চ অনেক বেশী উদ্বুদ্ধ করে সবাইকে। সিরাজ সিকদার তাদেরকে বোঝালেন- পূর্ববাংলাকে মুক্ত করতে হবে পাকিস্তানের আগ্রাসন থেকে। মুক্ত করে তার দায়িত্ব নেবে তারা। বুর্জোয়ারা জাতীয় শত্রু। কমিউনিস্ট নামধারী অন্যান্য দলগুলোও মূলত সংশোধনবাদী, তারা ভন্ড কমিউনিস্ট। মার্কস-লেনিনকে মনে প্রাণে ধারন করেন একমাত্র তিনিই, তাই দেশ রক্ষা ও গঠনের অধিকার একমাত্র অধিকার তাদেরই আছে। তারাই নেতৃত্ব দেবে স্বাধীন পূর্ব বাংলার; কিন্তু তার আগে খতম করতে হবে সকল শ্রেণীশত্রুদের। পিকিং থেকে প্রকাশিত বিপ্লবীদের পত্রিকায় সংবাদ ও ছবি ছাপা হয়– গেরিলা যুদ্ধ হচ্ছে পাহাড়ে আর জঙ্গলে। তাই বিপ্লবের জন্য মনে মনে তেমন জায়গাই খুঁজতে থাকেন সিরাজ সিকদার।
এমনই এক সময়ে চাকরি নিয়ে চলে যান টেকনাফে, সাথে স্ত্রী রওশন আরা। পাহাড় অরন্যের টেকনাফ, পাশেই আরাকান। সেখানে আছে ট্রটস্কিবাদী রেড ফ্ল্যাগ আর মাওবাদী হোয়াইট ফ্ল্যাগ। আরাকানে গিয়ে নতুন করে বিপ্লবী চেতনায় দল গঠনের চিন্তায় আ. কা. ফজলুল হক, সামিউল্লাহ আজমীদের নিয়ে যান টেকনাফে, উদ্দেশ্য আরাকানের মাওয়াবাদী হোয়াইট ফ্ল্যাগের কর্মীদের সাথে সলাপরামর্শ করে দল গঠনে করা যায় কী না, সেই ব্যাপারে আলোচনা। সিরাজ সিকদারের সাথে মিলে টেকনাফ এলাকাতেই মুক্তাঞ্চল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন তারা। কিন্তু কিছু কারণে আরাকান মিশন ব্যর্থ হয়।
চাকরি ছেড়ে দিয়ে ঢাকায় ফিরে ১৯৬৮ সালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামে দল গঠন করলেন সিরাজ সিকদার। দেশে আওয়ামী লীগ, মুসলিম লীগ, জামাতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম, বা কমিউনিস্ট পার্টি নামের দল থাকলেও সম্পূর্ণ বাংলা নামের একটি রাজনৈতিক দল গঠন হলো এই প্রথম। দলের সদস্যদের প্রত্যেককেই গোপন একটি নাম দেয়া হলো। এজন্য মালিবাগ মোড়ে একটি অফিস নেওয়া হলো যার নাম দেয়া হলো মাও সেতুং চিন্তাধারা গবেষণা কেন্দ্র।
এরপর পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের থিসিস প্রস্তুত করলেন সিরাজ সিকদার। সেই থিসিসকে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র হিসেবে উপস্থাপন করেছেন বইয়ের লেখক। কোনও স্বায়ত্তশাসন নয়, পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের শপথ উচ্চারণ হয় সেই থিসিস থেকেই; সেখান থেকেই প্রথমবারের মতো লাল ও সবুজ রঙের পতাকার কথা জানতে পারি আমরা। এরপর থেকে মূলত সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীন করার প্রতিজ্ঞা করে শ্রমিক আন্দোলন। এজন্য সেসময়ের সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশপ্রেমিক সমমনাদেরকে একত্রিত করার চেষ্টা চালান সিরাজ সিকদার; কর্নেল তাহেরসহ আরো অনেকেই ছিল তাদের মধ্যে।
কিন্তু একই সাথে সরকারি চাকরি করার সুবিধাবাদী পেটিবুর্জোয়া মানসিকতা আর বিপ্লবকে পছন্দ করতেন না সিরাজ সিকদার। তাই কর্নেল তাহেরকে অতিথি বিপ্লবী হিসেবে দলে নিতে চাননি সেসময়। ৭০ সালে ছাত্রলীগের কর্মীরা যখন “জয় বাংলা” স্লোগান দেয়, তখন তাদেরকে ভারতের দালাল অভিহীত করে “জয় পূর্ব বাংলা” স্লোগানের কথা বলেছিলেন সিরাজ সিকদার। মূলত তাঁর এই প্রশ্নের কারণে পরবর্তীতে ৭০ সালে ছাত্রলীগের এক র্যালিতে লাল সবুজ পতাকায় লাল বৃত্তের মাঝে পূর্ববাংলার সোনালি মানচিত্র আঁকা পতাকা তোলা হয়। ৭১ এর ৮ জানুয়ারি পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সিরাজ সিকদার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি দেন। মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার আগে এই বিবৃতিতে অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বাংলোদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা। বিবৃতির অংশ বিশেষ হলো:
পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলার জনগণের সশস্ত্র সংগ্রাম কিছুতেই দাবিয়ে রাখতে পারবে না। ১৯৭০-এ পূর্ববাংলার জনগণের যে গণযুদ্ধ হয়েছে, তা দাবানলে রূ�� নেবে ১৯৭১-এ। পূর্ববাংলার গ্রামে গ্রামে দাউ দাউ করে জ্বলবে গণযুদ্ধের দাবাগ্নি। আর তাতে পুড়ে মরবে পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার শত্রুরা, তাদের দালাল আর বিভিন্ন আকৃতির সংশোধনবাদীরা। এই প্রবল ঝড়ে থরথর করে কাঁপবে পুরো দুনিয়া, গড়ে উঠেবে জনগণের গেরিলা বাহিনী, প্রতিষ্ঠিত হবে পূর্ব বাংলার শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি।
একাত্তরের জানুয়ারি থেকেই জাতীয় শত্রু খতমের নাম করে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের গেরিলার অ্যাকশন শুরু হয়। এরপর যুদ্ধ শুরু হলে এপ্রিলের মাঝামাঝি সিরাজ সিকদার দলবল নিয়ে চলে যান বরিশালের স্বরূপকাঠিতে। সেখানে একটি নির্জন পেয়াবাগানে জাতীয় মুক্তিবাহিনী গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পেয়ারাবাগানকে ঘিরে এলাকাটিকে আটটি সেক্টরে ভাগ করে তারা অনেক সফল অপারেশন চালায়। এরই মাঝে জুনের ৩ তারিখে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন অবলুপ্ত করে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে নতুন দলের আত্মপ্রকাশ ঘটে। সেই কমিটির আহ্বায়ক হন সিরাজ সিকদার। এই পেয়ারাবাগান নিয়ে সিরাজ সিকাদারের আবেগের শেষ ছিল না। এখান থেকেই শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে তাদের প্রথম প্রতিরোধ। নারী নেতৃত্বে সশস্ত্র প্রতিরোধও হয়েছে এখান থেকেই। এসব নিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন কবিতাও লিখেছেন তিনি। সর্বহারাদের মতে রোমান্টিক বিপ্লবী সিরাজ সিকদার। রণাঙ্গন নিয়ে কবিতায় লিখেছেন অনেক–
“তোমরা কি দেখেছো পেয়ারাবাগান? শুনেছো ভিমরুলী, ডুমুরিয়া আটঘর, কুড়িয়ানার নাম?... শত্রুর অপেক্ষায় আমরা অ্যামবুশ পাতি। যুদ্ধ আর সংগঠন, পার্টির ক্লাস মনে হয় বাংলার ইয়েনান এই পেয়ারাবাগান।”
এই পেয়ারাবাগানেই দলের নারী ও পুরুষ যোদ্ধাদের মধ্যে প্রেম ও বিয়ের ঘটনাও ঘটেছে। যাদের মধ্যে সেলিম শাহনেওয়াজ ও আলমতাজ বেগম ছবি এবং ফজলু-মিনু অন্যতম। তবে, এইসব বিয়ে ও প্রেমের সম্পর্ক অনেক সময় মেনে নিতে পারেন নি সিরাজ সিকদার। একজনের থেকে অন্যজনের তাত্ত্বিক ও সাংষ্কৃতিক মানের তুলনা করে বিয়েতে আপত্তি করেন সিকদার। নিজের বিয়ের ব্যাপারে কোনো যুক্তি না মানলেও পার্টির সদস্যদের মধ্যে প্রেম ও বিয়ে নিয়ে সিরাজ সিকদারের অদ্ভুত সব যুক্তির কথা উঠে এসেছে এই বইয়ে- সিকদারের যুক্তি হল তাত্বিক ও সাংষ্কৃতিক মান গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত এ ধরনের বিয়ে প্রকৃতপক্ষে পেটিবুর্জোয়া মানসিকতার প্রতিফলন। এখানে ব্যক্তিস্বার্থ এবং যৌনতাকেই প্রশ্রয় দেয়া হয়। শুধু যৌন কারণে অপরিবর্তিত বুদ্ধিজীবী মেয়েকে বিয়ে করা যৌনতার কাছে আত্মসমর্পন করা। এটা হল যৌনস্বার্থের কাছে বিপ্লব, জনগণ ও পার্টি স্বার্থকে অধীন করা। এ তো গেল প্রেম বিয়ের প্রসঙ্গ। এর বাইরেও কেবল মতের মিল না হওয়ার কারণে সর্বহারা পার্টিতে অসংখ্য খুনোখুনি হয়েছে। যুদ্ধ চলাকালে শুধু পাকিস্তানী বাহিনী না, ভিন্ন আদর্শের অন্য দলের অরো অনেকেকেই সর্বহারারা হত্যা করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে। একই সাথে জাতীয় ঐক্যের ডাক দেয়া সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অনেকে সর্বহারার অনেক সদস্যকে হত্যা করেছে বলেও অভিযোগ আছে। সর্বহারা সদস্য ফিরোজ কবিরকে ১৯৭১ সালের আগস্টে বরিশালে পাকিস্তানী সেনারা হত্যা করে । যুদ্ধের সময় মতভেদ হওয়ার কারণে তাকে দল থেকে বহিস্কার করেছিলেন সিরাজ সিকদার। সিরাজ সিকদারের ভাই বাদশা আলমকে একাত্তরে গুম করে পাকিস্তানীরা। স্বাধীনতার পরেও সর্বহারাদের অনেককেই নির্মমভাবে হত্যা করেছে ক্ষমতাসীনরা।
যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আওয়ামীলীগকে বৈরী মনে করলেও স্বাধীনতার পর তাদের সরকারকে মেনে নিয়েই খোলা চিঠি লেখে দলটি। এই চিঠিতে অনেকগুলো দাবি উপস্থাপন করা হয়; এর মধ্যে ছিল নারীদের সমানাধিকার, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা, আট ঘন্টা শ্রমসময়, ফারাক্কা বাঁধ-জনিত সমস্যার ন্যায্য সমাধান, ইত্যাদি বিষয়গুলো। তবে, সেবছরই মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ঢাকা আসার বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি সর্হারা পার্টি। ২৫ বছর মেয়াদি শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির ব্যাপারটির সমালোচনা করে তারা বলতে থাকে, একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আবার ভারতের উপনিবেশ হয়ে গেছে পূর্ব বাংলা।
স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি সর্বহারা পার্টির প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। এই কংগ্রেসের পরপরই দলের মধ্যে নেতৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়, এবং মতভেদ থেকে উপদলের সৃষ্টি করে ফজলু-সুলতান গ্রুপ। সে বছরই সর্বহারা পার্টি থেকে সেলিম শাহনেওয়াজ, সুলতান, জাফরদের বহিষ্কার করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই সেলিম শাহনেওয়াজকে হত্যা করে সর্বহারা পার্টি। তার দুইদিন পর হত্যা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কবি হুমায়ুন কবিরকে, এবং বিবৃতি দিয়ে এই খুনের দায় নেয় সর্বহারা পার্টি। দলের প্রতি প্রেম থাকলেও সাহিত্যিক হিসেবে যশ-খ্যাতি পাওয়ার মোহে দলত্যাগ করার কারণেই তাকে সংশোধনবাদী আখ্যা দিয়ে এই খুন করা হয় বলে জানায় সর্বহারা। ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত এই দুই বছরে সর্বহারা পার্টি সবচেয়ে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। ৭২ সাল থেকেই মূলত বঙ্গবন্ধু সরকারের সাথে বিশাল বৈরিতা সৃষ্টি হয় সিরাজ সিকদারের। সিরাজ সিকদার হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধুর কাছে সবচেয়ে আতঙ্কের নাম; হয়ে ওঠে রাজনৈতিক জাতীয় শত্রু। ঠিক এই সময়ে, যখন রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন নিপীড়নে অতিষ্ট সাধারণ জনতা, তখন জোয়ারের নতুন পানির মাছের মতো দলে দলে কিশোর তরুণরা যুক্ত হতে থাকে সর্বহারা পার্টিতে। বিপ্লবের জন্য সবাই টগবগ করছে।পার্টির সদস্য রইসউদ্দীন আরিফ বলেছিলেন-
রাতারাতি বিপ্লব করার উন্মাদনা, গুপ্তহত্যার রোমান্স, এসব প্রবণতা তাদের পেয়ে বসেছে। একজন কল্পিত শত্রুকে খতম করতে পারাটাই তাদের কাছে বিপ্লব। কথায় কথায় বিপ্লব, পান থেকে চুন খসলে মার্কসবাদ যেন অপবিত্র হয়ে যাবে; এবং ভাবতে থাকে তারাই জগতের শ্রেষ্ঠ পন্ডিত, আর কল্পনায় নিজেদেরকে বানায় মহাযুদ্ধের নায়ক।
৭৩ সালে সর্বহারা পার্টি গঠন করে নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনী। এদের হাতে দেয়া হয় পিস্তল, রাইফেল, স্টেনগান, হ্যান্ড গ্রেনেড, ছুরি, ইত্যাদি অস্ত্র। সুবিধামতো অস্ত্র পাওয়া না গেলে ঠগিদের মত শুধু গামছা ব্যবহার করেও কাজ চালিয়ে গেছে অনেক গেরিলা। এমনকি লোহার শিক, পেন্সিলে এমনকি ব্লেড দিয়েও মানুষকে- তাদের ভাষায় শ্রেণীশত্রুকে- প্রাপ্য শাস্তি দিতে হত্যা করেছে সর্বহারা। আর এইসব গেরিলাবাহিনী চালানোর জন্য অর্থের প্রয়োজনে সর্বহারার দল শুরু করল একের পর এক ব্যাংক ডাকাতি। তবে, ব্যাংক ডাকাতির টাকা নিয়ে কোনো দুর্নীতি হয়নি; সিরাজ সিকদার স্বচ্ছতার সাথে হিসেব রাখতেন সব। একটু এদিক সেদিক হলেই মৃত্যুদন্ড। তবে সেসময় সর্বহারা পার্টির নাম করে আরো অনেক গ্রুপ ডাকাতির ও হত্যাকান্ড চালিয়েছিল বলেও বিভিন্ন তথ্যে উঠে এসেছে। অনেক পুলিশ ফাঁড়িতে আক্রমন চালিয়ে অস্ত্র লুট, হত্যাকান্ড, এসব দায় এসে পড়েছে সর্বহারা পার্টির ওপরই। সর্বহারা পার্টির এক নেতার জবানে- চুয়াত্তর সালে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং-এ সর্বহারা পার্টি ছিল ৩টি। একটি সিরাজ সিকদারের, আর দুটি আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রভাবশালী দুই নেতার। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টির কাজ ছিল জাতি ও জনগণের জন্য বিপ্লব করা। আর আওয়ামী নেতাদের সর্বহারা পাটির কাজ ছিল সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির নামে স্লোগান দিয়ে নিরীহ মানুষকে হত্যা করে, লুট করে, বিপ্লবী পার্টিকে সাবোট্যাজ করা।
তবে, সিরাজ সিকদারেরর সর্বহা��া পার্টির দ্বারা কোন নিরীহ মানুষকে খুন বা অকারণে ব্যাংক লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। তারা তাদের দলীয় আদর্শমতে(এই আদর্শ নিয়ে বিতর্ক আছে) জাতীয় শত্রুদের খতম করার নামে ভিন্নমতের মানুষকে হত্যা করেছে যা সর্বহারাদের সবচেয়ে নির্মম নীতি। দেশজুড়ে দুর্ভিক্ষে দেশের পরিস্থিতি যখন খারাপ হয়ে পড়ে তখন সর্বহারারা স্বপ্ন দেখে এবার হাল ধরবে দেশের। এজন্য তারা সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ রাখছিল। সামরিক শাসনের পক্ষে না থাকলেও সমমনা সামরিক কর্মকর্তাদের নিজেদের দলভুক্ত করতে আগ্রহী ছিল।
পঁচাত্তরের ১ জানুয়ারি দলের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের সাথে একটি গোপন বৈঠকে যোগ দিতে চট্টগ্রামে যান সিরাজ সিকদার। সেখান থেকেই তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় আনা হয়। ২ জানুয়ারি মাঝরাতে সাভারে রাস্তার পাশে হত্যা করা হয় তাঁকে, যে ধরনের হত্যাকাণ্ড পরবর্তীকালে ক্রসফায়ার নামে পরিচিতি পায়। যদিও সেসময়, একালের মতোই, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, পালাতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন তিনি। তবে সিরাজ সিকদারের মৃত্যু নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য উঠে এসেছে এই বইয়ে। কেউ বলছেন, ২ তারিখে গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সামনে হাজির করা হয়েছিল তাঁকে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর সাথে কথা কাটাকাটি হওয়ার কথাও উল্লেখ করেছেন অনেকে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্য জায়গায় নেয়া হয়। তবে, "ক্রসফায়ার"-এ যে সিরাজ সিকদারের মৃত্যু হয়েছে এটি বেশিরভাগ মানুষের বক্তব্যেই স্পষ্ট। কেউ কেউ বলেছেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বিচারবহির্ভুত হত্যাকান্ড ক্রসফায়ারের শিকার হন সিরাজ সিকদার। পরদিন পত্রিকায় পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিচিত আত্মগোপনকারী চরমপন্থী দলের নেতা সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর খবরটি কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি। সিরাজ সিকদারের মত রহস্যময় শক্তিশালী মানুষকে পুলিশ মেরে ফেলতে পারে এটা যেন অবিশ্বাস্য! তার পরদিন সিরাজ সিকদারের মৃতদেহের ছবি ছাপালে সবাই বিশ্বাস করে। মূলত নিজের কর্মকান্ড দিয়ে যতটা না পরিচিত সিরাজ সিকদার, তার চেয়ে বেশি পরিচিতি তার রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা দিয়ে।
সিরাজ সিকদারকে দাফন করা হয় মোহাম্মদপুর কবরস্থানে। পরবর্তীতে কোনও এক জনসভায় বঙ্গবন্ধুর দাম্ভিক উচ্চারণ, “কোথায় আজ সেই সিরাজ সিকদার?" আজও বহুজনের কাছে স্বৈরশাসকের উত্থানের চিহ্ন বলে মনে হয়।
এই ঘটনার বিবরণ পুলিশের প্রেসনোটের উদ্ধৃতি দিয়ে সেই সময়ের বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরাজ সিকদার গ্রেফতার হওয়ার পর তার পার্টি-কর্মীদের কয়েকটি গোপন আস্তানা এবং তাদের বেআইনি অস্ত্র ও গোলাবারুদ রাখার স্থানে পুলিশকে নিয়ে যেতে রাজি হন। সে অনুযায়ী ২ জানুয়ারি রাতে একটি পুলিশ ভ্যানে তাকে ওইসব আস্তানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি সাভারের তালবাগ এলাকায় ভ্যান থেকে লাফিয়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় পুলিশ গুলিবর্ষণ করলে তৎক্ষণাৎ ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এ ব্যাপারে সাভার থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সিরাজ সিকদার হত্যাকাণ্ডের প্রায় ১৭ বছর পর ১৯৯২ সালের ৪ জুন সিরাজ সিকদার পরিষদের সভাপতি শেখ মহিউদ্দিন আহমদ সিএমএম কোর্টে মামলা দায়ের করেন। সিরাজ সিকদারকে গ্রেপ্তার ও হত্যার বিবরণ দিয়ে এ মামলার আর্জিতে বলা হয়, ২ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পুলিশ ও রক্ষীবাহিনীর বিশেষ স্কোয়াডের অনুগত সদস্যরা গণভবনে শেখ মুজিবের কাছে সিরাজ সিকদারকে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় নিয়ে যায়। সেখানে শেখ মুজিবের সঙ্গে তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলীসহ আসামিরা, শেখ মুজিবের ছেলে শেখ কামাল এবং ভাগ্নে শেখ মনি উপস্থিত ছিলেন। সে সময় আসামি মাহবুব উদ্দিন তার রিভলবারের বাঁট দিয়ে মাথায় আঘাত করলে সিরাজ সিকদার মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। শেখ কামাল রাগের মাথায় গুলি করলে তা সিরাজ সিকদারের হাতে লাগে। এর পর শেখ মুজিব, মনসুর আলী এবং আসামিরা সিরাজ সিকদারকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন এবং মাহবুব উদ্দিন আহমদকে নির্দেশ দেন। মাহবুব উদ্দিন আহমদ অন্য আসামিদের সঙ্গে বন্দি সিরাজ সিকদারকে শেরে বাংলানগর রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরে নিয়ে যান। সেখানে তার ওপর আরও নির্যাতন চালানো হয় এবং ২ জানুয়ারি আসামিদের উপস্থিতিতে রাত ১১টার দিকে রক্ষীবাহিনীর সদর দফতরেই সিরাজ সিকদারকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে বিশেষ স্কোয়াডের সদস্যরা পূর্বপরিকল্পনা মতো বন্দি অবস্থায় নিহত সিরাজ সিকদারের লাশ সাভারের তালবাগ এলাকা হয়ে সাভার থানায় নিয়ে যায় এবং সাভার থানা পুলিশ পরের দিন ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে প্রেরণ করে।
সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মূলত সর্বহারা পার্টির পতন হতে থাকে। যদিও দলের নেতাকর্মীরা গোপনে অনেকদিন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। মৃত্যুর পরে সিরাজ সিকদারকে নিয়ে বৃদ্ধিজীবী মহলের অনেকেই ইতিবাচক বক্তব্য দিয়েছেন। সিরাজ সিকদারের আদর্শকে বিপ্লবী আদর্শ উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আহমদ শরীফ লিখেছিলেন 'সিরাজ সিকদার আজ আর কোনো ব্যক্তির নাম নয়। সিরাজ সিকদার একটি সংকল্পের, একটি সংগ্রামের, একটি আদর্শের, একটি লক্ষ্যের, একটি সংকল্পের , ইতিহাসের একটি অধ্যায়ের নাম।'
মূলত ৭৫ এর আগে দেশের যে দুরাবস্থা তৈরী হয়েছিল তাতে অনেক মানুষই ভেতরে ভেতরে ক্ষমতাসীনদের উৎখাতে বিপ্লবী আদর্শকে ধারণ করেছিল। তাই তারা মনে রেখেছিল সিরাজ সিকদারকে।
সর্বহারাই বলি, বিপ্লবীই বলি আর রক্ষণশীল সন্ত্রাসবাদীই বলি, নির্দিষ্ট একটা আদর্শ থেকেই মানুষ এমন জীবন বেছে নেয়। বলশেভিকরা, নকশালরা যেমন নিয়েছিল, ঠিক তেমনই। অনেক সময় সেই আদর্শ যেন শুধুই মরীচিকা। তাতে কার লাভ হয়, কার ক্ষতি হয়, দেশ কী পায় সেসবের উত্তর না মিললেও সেসব ঘটনা যে ইতিহাসে স্থান পায়, এটাই চরম সত্য। তাই স্বঘোষিত রোমান্টিক বিপ্লবী সিরাজ সিকদার দেশকে কী দিয়েছেন তার উত্তর না মিললেও দেশের ইতিহাসে যে রহস্যময় এক অধ্যায় যুক্ত করেছেন, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
এই বইয়ে সিরাজ সিকদারের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট যে সিরাজ সিকদার একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিলেন; যে রাষ্ট্রে নারী-পুরুষে ভেদাভেদ থাকবে না, ধর্মীয় স্বাধীনতা থাকবে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সংখ্যালঘুদের অধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, মানুষ সুশিক্ষিত হবে, জাতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে, এমনই অনেক কিছু। সেই রাষ্ট্রের স্বপ্ন তো আমরা এখনো দেখি ।
শেষ করব মহিউদ্দীন আহমেদের লেখা থেকেই: এ দেশের রাজনীতির ডামাডোলের বছরগুলোতে সিরাজ সিকদারের উত্থান। নানা কারণে তিনি নিন্দিত ও নন্দিত। ইতিহাস তাকে মূল্যায়ন করবে কীভাবে? তিনি বিপ্লবী না সন্ত্রাসী, সফল না ব্যর্থ। মাত্র ৩০ বছর ২ মাস ৬ দিন বেঁচেছিলেন। এটুকু সময়ের মধ্যে তিনি সরকারের কাছে হয়ে উঠেছিলেন মোস্ট ওয়ান্টেড। কেমন ছিল তার জীবনবোধ তা তিনি নিজেই লিখেছেন কবিতায়— কতগুলো সফলতা কতগুলো ব্যর্থতা কতগুলো যোগ্যতা কতগুলো সীমাবদ্ধতা কতগুলো ভালো আর কতগুলো খারাপ এই তো জীবন।
সুলেখক মহিউদ্দিন আহমদের 'লালসন্ত্রাস' পড়লাম, বেশ মনোযোগ দিয়েই টানটান উত্তেজনায় ভরা কমরেড সিরাজ সিকদারের জীবন ও রাজনীতিকেন্দ্রিক বইটি পড়লাম।
কোনো ব্যক্তি বা মতাদর্শ নিয়ে লেখালিখি করার একটা বড়ো হ���যাপা হলো নিজেকে যে কোনো প্রকারে ব্যক্তি অথবা মতবাদের সাথে যুক্ত করে ফেলা। ভালো-মন্দ কোনো একটি অনুভূতিই লিখতে গেলে কলমকে নিজের অজান্তেই মোহময় করে তোলে। মহিউদ্দিন আহমদ নিজে সিরাজ সিকদারের অন্যতম বিরোধীপক্ষ জাসদের রাজনীতি করতেন এবং ভূমিকাতে লেখক ইঙ্গিত দিয়েছেন তার ঘনিষ্ঠ দু'জন সর্বহারা দলের রাজনীতির 'বলি' হয়েছিল। অর্থাৎ সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা দল নিয়ে লেখকের পূর্বের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। স্বভাবতই এই নেতিবাচক অনুভূতি লেখাকে প্রভাবিত করেছে।
সিরাজ সিকদার কেন খুনের রাজনীতি বেছে নিলেন তা স্পষ্ট নয়। পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিল শুধু সর্বহারা দল বিরোধীপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অপরপক্ষ কিছুই করেনি। আবার, রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে থাকা সিরাজ সিকদার হত্যার ঘটনায় তৎকালীন সরকার কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। সেই সরকারকে দায়মুক্তি দিতে যেসব যুক্তির অবত��রণা মহিউদ্দিন সাহেব করেছেন তাতে হাসি পাচ্ছিল।
ব্যক্তিগত আবেগের গণ্ডি পেরিয়ে লেখালিখি করা অত্যন্ত কঠিন। আরও দুঃসাধ্য হলো ভারসাম্য রাখা। ব্যক্তির ভালো-মন্দ দুটোই তুলে ধরব ; কোনটি সঠিক তা পাঠক বুঝবেন - এই নীতি হতো শ্রেষ্ঠ কৌশল। মহিউদ্দিন সাহেব পাঠককে স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছেন 'ভুল বিপ্লবের বাঁশিওয়ালা' সিরাজ সিকদার ও তার দলকে তিনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন। তাতে পাঠকের বিচার-বিবেচনার ���ীমা সীমিত হয়ে গেছে এবং ক্ষুণ্ণ হয়েছে লেখক মহিউদ্দিন আহমদের ভাবমূর্তি।
সিরাজ সিকদার লিখেছিলেন,
' ইতিহাস সকল ভাঁড় ও ভাঁওতাবাজদের, আগে হোক পরে হোক, চূড়ান্তভাবে কবরস্থ করবেই। '
এদেশের রাজনীতিতে অনেক ভাঁওতাবাজ ও ভাঁড় সদর্পে টিকে আছে। হয়েছে বড়ো বড়ো পদে আসীন। কিন্তু কমরেড সিরাজ সিকদারের মতো দেশপ্রেমিককে ইতিহাস যোগ্য মূল্যায়ন করেছে কি না তা বিবেচনার সময় এসেছে।
লাল সন্ত্রাস পড়ে শেষ করলাম। এই একটা বইতে যে পরিমাণ বিস্ফোরক তথ্য আছে, সেটা যে কারো মাথা ঘুরায়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমার মাথাও ঘুরতেছে। একটা উদাহরণ দিই।
বইটার শেষ অর্ধেকে অনেকগুলা সাক্ষাৎকার আছে। সেরকম এক সাক্ষাৎকারে সর্বহারা দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড রানা বলতেছে, 'আমরা জাফরুল্লাহ চৌধুরীকে সন্দেহ করতাম, সে মোসাদের লাইনটা মেইনটেইন করে। তাকে ওয়াচ করার জন্য আমরা দুইজন সহকারীসহ রওশন আরাকে দিলাম।' - কোথায় দিলেন? 'গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে।'
জানা যায়, সর্বহারা দল ৭৫-এর ক্যুর কথা জানত। ওরা পাকিস্তানের সাহায্য পাওয়ার একটা প্রক্রিয়া শুরু করছিল শেখ মুজিবকে সরানোর জন্য। শেখ মুজিব র-এর সতর্কবার্তা শুনে কোনো স্টেপ নেয় নাই, তা না। নিছে। কিন্তু গুছাইতে পারে নাই। এদিকে, সর্বহারা দল প্রথম নিজেদের নামে পাকিস্তান আমলে পূর্ব বাংলা কথাটা লাগায়। আর কোনো রাজনৈতিক দল এটা করে নাই। সংখ্যালঘুদের নিয়ে প্রথম গুছানো একটা দাবী ও নীতি তারা লেখে। বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় পতাকার নকশা করছেন মূলত সামিউল্লাজ আজমী এবং মনজি খালেদা বেগম দম্পতি। মজার ব্যাপার, আজমী জন্মসূত্রে বাঙ্গালী নন! এই দেশটার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল।
এরকম আরও অনেক বিস্ফোরক তথ্যে ঠাসা পুরো বইটা। রাজনীতি পছন্দ করেন, এমন যে কারো জন্যই এইটা রেকমেন্ডেড। তবে আগে জাসদ বইটা পড়লে ভালো হবে। পাশাপাশি, প্রতিনায়কও একই সময়ের গল্প। পড়লে পূর্ণতা পাবে চিত্রটা।
শেষ করার আগে একটা কুইজ। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ক্রসফায়ারে নিহত হন কে? - সিরাজ সিকদার, সর্বহারা দলের প্রধান।
পুরো গল্পটা এত থ্রিলিং, কোনো থ্রিলার পড়ে এইরকম অনুভূতি পাওয়া দুষ্কর।
বেশ ভালো একটা রিড ছিল। সর্বহারা পার্টি নিয়ে আগে ভাষা ভাষা জানাশোনা ছিল। এটা পড়ে আরও বিস্তারিত জানলাম। আর দিন শেষে যা বুঝলাম ৭৫ সালের মুজিব আর শিকদার একই পথে হেটেছিলেন ( একনায়কতন্ত্র), আর পরিনতিও শেষ পর্যন্ত একই হয়েছে। লেখক শিকদারকে শত্রু হিসাবেই প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। শিকদার কিংবা তার চরিত্র নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে কিংবা আইডিওলজি ভুল হলেও একথা তো ফেলে দেওয়া যাবে না যে, শিকদারের ডাকে হাজার হাজার তরুণ আগুনে ঝাপ দিয়েছিল। নিশ্চয় শিকদারের মধ্য কিছু একটা ছিল। ওই জিনিসটা জানা হলো না। এটা জানতে পারলে ভালো হতো। লেখক নিজে বিচার না করে পাঠকের হাতে ছেড়ে দিতেন বিচারের ভার। ইতিহাসের বই এরকটাই হওয়ার দরকার ছিল। তবুও নিষিদ্ধ একটা দল সম্পর্কে অনেক বিষ্ফোরক তথ্যই ছিল, চমকে দেওয়ার মতো। তবে এটা ঠিক, এদেশে কোন কালেই বামদের ভবিষ্যতে ছিল না, আর হবেও না। এরা নিজেরাই আসলে নিজেদের ঘাতক। আদর্শের দিক দিয়ে এবং কাজকারবার দিক দিয়ে। সস্তা বিপ্লবী জোশই এদের একমাত্র পজিটিভ দিক।
সম্পূর্ণরূপে আন্ডারগ্ৰাউন্ড একটি চরিত্র। স্বল্পভাষী, গম্ভীর। অথচ তার হাবভাবে ও কথাবার্তায় অনেকেই নাকি বুঝে ফেলতে পারতেন — ইনিই সিরাজ সিকদার। একেই ব্যক্তিত্ব বলে না?
এই বইটা ধরার সংকল্প হয় গত কিছুদিন আগে "বুয়েট" ও "রাজনীতি" সংক্রান্ত ডিসকোর্সের মাঝে। বুয়েট এককালে এরকম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব তৈরি করেছিল। মনে হতে পরে — মহিউদ্দিন আহমেদের এই বইটা হয়তো একতরফা সিরাজ সিকদারের জীবনী অথবা একতরফা সর্বহারা পার্টির ইতিহাস। কিন্তু বইটার আসল গুণই হলো বইটা কোনো অর্থেই একতরফা না। এবং আপনি এখানে সিরাজ সিকদারের একপ্রকার জীবনী, সর্বহারা পার্টির একপ্রকার ইতিহাস, এবং এই দেশের একটি বিশেষ সময়কালের (১৯৬৮-১৯৭৫) রাজনৈতিক পরিস্থিতির একপ্রকার ধারণাও পাবেন।
এ বইতে সর্বহারা পার্টির তিনটি বড় কালবিভাগ বর্ণিত আছে। তার বেশিরভাগ বর্ণনা ন্যারেটিভের মতো ফ্লো'তে আগায়। মাঝেমধ্যে তথ্য-উপাত্তের বাহুল্যে একটু শ্লথ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে একটা ডায়েরি বা নোটপ্যাড চালু রেখে তাতে বিভিন্ন চরিত্র ও ঘটনাবলির বিবরণ সাজিয়ে রাখলে সুবিধা হয়। সিরাজের মৃত্যুর পরবর্তী একটা অধ্যায় আছে, সেটা অতিরিক্ত দুর্বোধ্য লাগে পড়তে — যেহেতু সকল পার্টি মেম্বারদের পার্টি নাম সহ আঞ্চলিক ভাগবাটোয়ারা সম্পর্কে আগে থেকে বেশি জানা নেই। এইভাবে গল্পচ্ছলে আর বিভিন্ন উপাত্তের জালে প্রথম অংশ শেষ হয়।
বইয়ের সবচেয়ে দারুণ অংশ আমার মনে হয় সকলেরই লাগবে দ্বিতীয় ভাগ। বিভিন্ন চরিত্র, যাদের বর্ণনা শুনে আসছি লেখকের কাছে, তাদের সাথে সরাসরি আলাপ হয়। ইতিহাসের বই, আমার ন্যারেটিভের দিকে অতোটা জোর দেয়া উচিত না — তবু বলতে হয় তাঁদের সকলের বক্তব্যের মিশেলে একটা "সংকলন"এর ভাব এবং বর্ণনায় বিচিত্র ভঙ্গির আমদানি হয় — যা পাঠে গতি দেয়।
আমি আজমী এবং ফারুক সাহেবের সাক্ষাৎকার ভালো উপভোগ করেছি। মধ্যিখানে কোথাও ফারুক সাহেবের ব্যক্তিগত জাজমেন্ট কিছু ছিলো, যেগুলো সর্বহারা পার্টি এবং তৎকালীন রাজনীতিকে দেখার ভিন্ন লেন্স দেয়। হাফিজ এবং আরিফ সাহেবের সাথে কথোপকথনও চমৎকার। তাঁরা একই সাথে সিরাজকে অ্যাডমায়ার ও করছেন আবার কিঞ্চিত সমালোচনাও, হাফিজের বেলায় সমালোচনা পুরোটা। সবশেষে বুলু'র বয়ান নাড়িয়ে দেয়ার মতো। আর রানা সাহেবের সাক্ষাৎকার এতো চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে আনে — যার সত্য মিথ্যা বিবেচনা দ্বন্দ্বে ফেলতে বাধ্য — কিন্তু যা পড়ে জটিলতায় একটা ছবি পাওয়া যায়, পরবর্তী জাজমেন্ট পাঠকের ওপরেই থাকে।
জিয়াউদ্দিনের বয়ানগুলো তেমন গুরুত্বপূর্ণ বা পাঠযোগ্য মনে হয়নি। ওগুলো বইয়ের সবচেয়ে দুর্বল অংশ।
মূল লেখক, মহিউদ্দিন সাহেব, কিন্তু পুরো বই জুড়ে নিরপেক্ষ থাকেন নি। যেমনটা আগে বললাম, উনি একতরফা নিরপেক্ষ-ও নন। যখন যে বিষয়ে যেমন নিরিক্ষণ প্রয়োজন, এবং সত্য যেখানে যেভাবে সামনে আসে — সেভাবে প্রেজেন্ট করার চেষ্টা করেছেন। সাবজেক্ট ম্যাটার নিয়ে ওনার কিছুটা প্রেজুডিস আছে মনে হতে পারে, এবং তা ওনার নির্বাচনকে কতোটা প্রভাবিত করেছে বলতে পারি না। অস্পষ্ট জায়গাগুলিতে উনি বিভিন্ন তথ্যসূত্র তুলে ধরেন, তা নিয়ে শেষ মতামত দেন, এবং কোনো উপসংহারে না আসতে পারলে তা ওভাবেই অস্পষ্ট রেখে ছেড়ে দেন। শেষের দিকে রানা সাহেবকে উনি যেভাবে চ্যালেঞ্জের সামনে ফেললেন তা উপভোগ্য। আমার তো এরকমও মনে হচ্ছে যে সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির সাথে লেখক স্বয়ংও বইয়ের একটি চরিত্র।
বইটিকে অবশ্য পরিসরে যতোটা বিশাল মনে হয়েছিল তার তুলনায় বইটা সংক্ষিপ্ত। বেশিরভাগ পৃষ্ঠাই ছবি আর কবিতা দিয়ে ভরা। তাছাড়া সাবল��লভাবে পড়তে পড়তে একসময় সব ফুরিয়ে যায়।
সর্বহারা পার্টি। একে বাদ দিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা ভাবা যাবে না। তাত্ত্বিকভাবে সর্বহারা পার্টির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা ছিলো পূর্ব বঙ্গের কেন্দ্রীয় দ্বন্দ্ব গুলিকে তুলে ধরায়। স্পট অন। সিরাজ সিকদার সর্বপ্রথম ম্যানিফেস্টোর মাধ্যমে সরাসরি বক্তব্য দেন পূর্ববঙ্গ হচ্ছে পাকিস্তানের উপনিবেশ। তিনিই প্রথম স্বায়ত্বশাসনের বদলে "স্বাধীনতা"র কথা বলেন। এছাড়া একটি উজ্জ্বল চরিত্র — সামিউল্লাহ আজমী, তিনি বাংলাদেশের পতাকার নকশা করেছিলেন। পার্টির প্রারম্ভকালে তিনি বলতে গেলে পার্টির প্রাণ ছিলেন। এ বই থেকে আর কারো না হোক — সামিউল্লাহ আজমীর নামটা মনে রাখতেই হবে।
পার্টির জন্মলগ্নে তারা অধিক অনুপ্রাণিত ছিলো মাও সে তুং দ্বারা। এতোটাই যে তারা চীনের জিওলজিকাল সিচুয়েশনের সাথে চট্টগ্ৰামের আত্মিক মিল পেয়ে বসে। কোনো রিসোর্স ছাড়াই, কেবল বিপ্লবের জোশে, তারা পাহাড় ভাঙতে বেরিয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে পার্টিই টুকরো টুকরো হয়ে যায়। এই জোশ অবশ্যই অ্যাপ্রিশিয়েবল। কিন্তু বাস্তববোধের একটা দরকারও তো ছিলো। এবং শুরুর দিকের এই ঘটনাটি পার্টির পরবর্তী যাত্রাগুলিতে বারবার রিপিট হতে দেখা যায় — এমনকি সর্বহারা পার্টির জীবনটিকেও এই একটি ঘটনার সিম্বলিজমে ধরতে পারা যায়।
ভ্যানগার্ড পার্টি বুঝলাম, তারা রণাঙ্গনে বীরত্ব দেখিয়েছেন। কিন্তু রানা সাহেব যেমনটা বললেন, থানা আর ব্যাংক লুট করে কতোটা বিপ্লব হয়? মার্ক্সিস্ট বিপ্লবের যেটা কেন্দ্রীয় শক্তি — জনসাধারণ — তাদের কতোটা এংগেজ করা গিয়েছিল? হাফিজ সাহেব বলছেন—
"কিন্তু আমার একধরনের উপলব্ধি হতে লাগল, আমি যেখানেই গেরিলা বাহিনীতে গিয়েছি, যেমন বিশেষ করে মঠবাড়িয়া এবং পাদ্রিশিবপুর, একটা জিনিস লক্ষ করেছি, আমাদের সাথে স্থানীয় গণমানুষের বিচ্ছিন্নতা। আমরা যে গরিব শ্রমিক- কৃষকের কথা বলতাম বাস্তবে তাদের সাথে তেমন কোনো সংযোগ ছিল না, তাদের অংশগ্রহণ ছিল না। দেখা যেত আমরা কিছু শহুরে কিশোর-যুবক একেকটা এলাকায় গিয়ে গেরিলাযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এই অল্প কিছু কিশোর-যুবকের প্রচেষ্টায় গণমানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া ওইসব অস্ত্র দিয়ে কি স্বাধীনতা সম্ভব হতো? স্থানীয় মানুষদের, বিশেষ করে কৃষকদের সংগঠিত করা তো দূরের কথা, তারা আমাদের কেন যেন ভয় পেত, সন্দেহের চোখে দেখতো"
এখন আমি একবাক্যে আপামর বাঙালি জনসাধারণকে "পলিটিকালি ইগনোরেন্ট লুম্পেন" বলে দিলে ব্যাপারটা বেশি রিডাক্টিভ হয়ে যায়। সর্বহারা পার্টিও কম চেষ্টা করে নি। তবে কেন জনসাধারণের সমর্থন পায় না — এটা বিশেষ চিন্তার বিষয় হতে পারে।
সিরাজ সিকদার পার্টি তৈরি করেছিলেন প্রফেটের মতো। তার একার ব্যক্তিত্বের বলে পার্টি চলতো। কিন্তু একটিমাত্র সূত্রে পার্টি টেকানো গেল না। তার কোনো ডিসিপ্লিনারি উত্তরাধিকার নেই। এটা আমার ব্যক্তিগত ধারণা — কেবল এই একটা বই পড়ে — যে, সর্বহারা পার্টি বাইরে থেকে রাজনৈতিক পার্টির মতো ফাংশন করলেও তার ইনার ওয়ার্কিংস একটা কাল্টের মতো ছিলো। প্রফেট সমালোচনার উর্ধ্বে। তিনি স্বতঃস্ফূর্ত। তার নির্দেশে মানুষ খুন হয়। এমনকি তিনি দলীয় সদস্যদের যৌনজীবনের নিয়ন্ত্রণ ও নিয়ে নিতেন। সর্বহারা পার্টি, তার কেন্দ্রে একটি কাল্ট ফিগার। কেন্দ্র বিনষ্ট হওয়ায় পার্টি নিজেদের মধ্যে রক্তারক্তি করে বিলুপ্ত হলো। এটা সমালোচনা না, আমার উপসংহার। ভবিষ্যতে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে অবশ্যই বদলাতে পারে।
আরেকটা কথা বলেছি? সিরাজ সিকদার ভালো কবি ছিলেন। বইয়ের একটা উল্লেখযোগ্য গুণ হলো সিরাজের কবিতাগুলো। সুন্দর কবিতা।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট অান্দোলনের ধারা শুরু হয় ১৯৬৮ সালে সিরাজ সিকদারের হাত ধরে। সত্তরের দশকে রাজনৈতিক তাল-মাতাল অবস্থায় গড়ে ওঠে বাংলার সর্বহারা পার্টি। তরুণদের একটা বড় অংশ এই দলে শামিল হয়েছিলো। মাও ৎসে-তুং, লেনিন ভাবধারায় বিশ্বাসী হয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলো স্বাধীনতার দিকে। ব্যক্তি জীবনকে তুচ্ছ করে সামগ্রিক দেশ ছিলো যাদের কাছে প্রধান। তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে অাছে নানা অালোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক অার বিভ্রান্তি। লেখক মহিউদ্দিন অাহমেদ তুলে ধরেছেন সেই সমালোচনা অার বিতর্কিত কর্মকাণ্ডগুলো।
বইটি কোন ভাব ধারায় লেখা বুঝতে হলে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দুইটি ভিন্ন ধারার কথা লেখা যাক। বঙ্গবন্ধু জাতির জনক নাকি দেশদ্রোহী? পক্ষে বিপক্ষে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করে নেবে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা। একজন অাদর্শ নেতা, যার হাত ধরে অামরা পেয়েছি অামাদের স্বাধীনতা। এখন বঙ্গবন্ধুকে দুইটি ভিন্ন চরিত্রে কল্পনা করা যাক।
দৃশ্য (১)
পাকিস্তানি শাসন অার শোষনের বিরুদ্ধে যিনি বজ্র কন্ঠের ডাক দিয়েছেন তিনি বঙ্গবন্ধু। যিনি বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের স্বাধীনতার জনক।বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
[একজন বাংলাদেশী এই কথাগুলো বলবে]
দৃশ্য (২)
১৯৪৭ এর দেশ বিভাগের পর ভারত পাকিস্তান নামে জন্ম হলো পৃথক দুইটি স্বাধীন রাষ্টের। পাকিস্তান রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে পায়তারা শুরু করলেন মুজিব। তাতে মদদ দিলো অাওয়ামি পন্থী নেতাগোষ্ঠী। একটা স্বাধীন দেশকে বিভক্ত করার মতো জঘন্যতম কাজটি যে মানুষের দ্বারা হয়েছে তিনি সর্বদা ক্ষমার অযোগ্য। ক্ষমতালোভী এই মানুষটি পাকিস্তানকে বিভক্ত করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রধান অাসনে বসলেন।
[ইয়াহিয়া কিংবা ভুট্টো এমন ভাষণ দিবে।]
উপরোক্ত দৃশ্য দুইটি বর্ণনা করা হয়েছে লাল সন্ত্রাস বইয়ের বর্ণনা শৈলী বোঝার সুবিধার্থে।
সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টির অতীত ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয়েছে এই বইয়ে। কিন্তু ইতিহাস না বলে সঠিক হবে কেমন ছিলেন তারা? তাদের খারাপ দিকগুলো কি ছিলো সে-সব সুনিপুণ হাতে বর্ণনা করা হয়েছে। সিরাজ সিকদার কিংবা সর্বহারা পার্টিকে দেখানো হয়েছে দ্বিতীয় দৃশ্যের মতো করে। তাদের বিতর্কিত বিষয় অার সমালোচিত দিক গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
সব তথ্য গুলো অামি সঠিক কিনা জানি না। যদি সঠিক হিসাবেও ধরে নেওয়া হয় একটা বিপ্লবী গোষ্ঠীর কিছু বিপ্লবী দিক থাকে, লেখায় বলতে গিয়েও ফিরে এসেছেন লেখক। কিছু ইশতেহার, কিছু কথা ভালো বলতে গিয়েও খারাপ বলে ব্যাখ্যা করা। এই দিকটি খুবই দৃষ্টিকটু লেগেছে।
ভালো খারাপ মিলিয়ে মানুষ। অনেক খারাপ দিক এই সর্বহারা পার্টির মধ্যে ছিলো। কিন্তু একটাও কি ভালো দিক ছিলো না? কি তাদের কর্মকাণ্ড বা কি কি করেছেন তা সব বর্ণনা করা যেত। নিরপেক্ষ ইতিহাস বর্ণনা করা যেত কিন্তু বইয়ে সে-সব খুঁজে পায়নি। প্রতি পৃষ্ঠায় কয়েক বার বলা হয়েছে ওরা খারাপ। সেই ভালো খারাপের ভার পাঠকের উপর বর্তিয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যা করলে উত্তম একটা বই হতে পারতো।
বইটির নাম লাল সন্ত্রাস কিন্তু এখানে ওনাদের সন্ত্রাস অাখ্যা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ওরা তো লাল সন্ত্রাস, সন্ত্রাস নয়। কারণ সিরাজ সিকদারকে বিচ্ছিন্নতাবাদী বিপ্লবী বলা যেমন একচোখা বিশ্লেষণ তেমন সাচ্চা বিপ্লবী বলাও সঠিক নয় বলে মনে করি।
লেখা শুরু করি বইয়ের একেবারে শেষ অধ্যায়ের কিছু কথা দিয়ে। "১৯৪৯ সালের পয়লা অক্টোবর কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে চিনের মুক্তিফৌজ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশটিতে বিপ্লব সংঘটিত করে। এটি ছিলো বিশ শতকের একটি বড় ঘটনা, যা বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে দারুণ সাড়া জাগায়।" তো সেই ঐতিহাসিক ঘটনার রেশ বাংলাদেশেও আসে। তবে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলন একটা নতুন মোড় নেয় ১৯৬৭ সালের নকশালবাড়ি আন্দোলনের প্রেক্ষিতে। এই দেশে কয়েকটি গ্রুপ চারু মজুমদারের লাইনকে সঠিক রণনীতি হিসেবে গ্রহন করে। এ সময় সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে তৈরি হয় পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। এই দলটি চারু মজুমদারের রাজনৈতিক লাইন হুবহু অনুসরণ করেনি। তারা পূর্ব বাংলার স্বাধীনতার ডাক দেয় এবং একই সাথে গ্রহন করে চারু মজুমদারের সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের লাইন। গ্রামে ঘাঁটি বানিয়ে মুক্তাঞ্চল তৈরি করে শহর ঘেরাও, অথঃপর জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব। কিন্তু একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বরের পরে দেখা দেয় নতুন অস্থিরতা। সিরাজ সিকদার ঘোষনা করেন পাকিস্তান থেকে স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ হয়েছে ভারতের উপনিবেশ। এখানে বসেছে ভারতের পুতুল সরকার। তাই সশস্ত্র গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে এই পুতুল সরকারকে সরিয়ে কায়েম করতে হবে জনগণতান্ত্রিক পূর্ব বাংলা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ বাংলাদেশ পার করেছে এক অস্থির সময়। এই সময়ে দুইটা রাজনৈতিক ধারা মানুষের নজর কেড়েছিলো। একটা ছিলো জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), অন্যটি পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি। জাসদকে নিয়ে কম-বেশি লেখালেখি হলেও সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ সিকদারকে নিয়ে লেখা তেমন হয়নি। কারণ এটি ছিলো একটি গোপন সংগঠন। ফলে তাদের ভিতরের অনেক কথাই তাদের কর্মীদের সাথেই হারিয়ে গেছে। এমন একটা কঠিন বিষয় নিয়ে গবেষণা করার জন্য লেখককে সাধুবাদ জানাতে হয়। বইয়ের প্রায় অর্ধেক অংশজুড়ে সর্বহারা পার্টি ও সিরাজ সিকদারের ইতিহাস। বাকি অর্ধেক অংশে বিভিন্ন কর্মিদের সাক্ষাৎকার। দ্বিতীয় অংশ আমি বেশি উপভোগ করেছি কারণ বিভিন্ন মানুষের সাক্ষাৎকারে প্রকাশ পেয়েছে কিছু হোঁচট খাওয়ার মত তথ্য। সর্বহারা পার্টি নিয়ে জনমনে বিভিন্ন মতামত আছে। কেউ তাদের বলে বিপ্লবী, কেউ বলে সন্ত্রাসী। বিপ্লব আর সন্ত্রাস আসলে একই মূদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। এটা নির্ভর করে আপনি কোন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে এটাকে বিচার করছেন। আমি ব্যাক্তিগতভাবে সবসময়ই কমিউনিজম বা সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে কথা বলি। সমাজতন্ত্রের মোড়কে যে বিপ্লব, তাকে আমার বাড়াবাড়ি মনে হয়। অন্তত এই দেশে। ফলে আমার ব্যাক্তিগত দৃষ্টিতে সিরাজ সিকদার ও তার সর্বহারা পার্টি সন্ত্রাস। কিন্তু তাই বলে পূর্ব বাংলার জন্য তাদের ত্যাগকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ফলে শুধু ঢালাওভাবে তাদের সন্ত্রাস আখ্যা দিলে তাদের প্রতি অবিচার করা হবে। মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।
যেহেতু বইটা ইতিহাস আশ্রিত তাই ততটা তাত্ত্বিক বা খটমটে মনে হয়নি।সর্বহারা রাজনীতি নিয়ে পড়াশোনার ইচ্ছে ছিল কিন্তু দেখলাম আশেপাশের রাজনীতি সচেতন মানুষরাও খুব একটা কনসার্ন না এই ব্যাপারে।যাইহোক লাল সন্ত্রাসে ইতিহাসকে নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করেছেন। আশাকরি ভবিষ্যতে আরো পড়াশোনার দ্বার খুলে দিবে লাল সন্ত্রাস। বইয়ের দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ তাহাদের কথাটা বেশ বই উপযোগী, যেন এই বইয়ের পরিপূর্ণতা।লেখক সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন তবে সেই সাথে উল্লেখ করেছেন যে ইতিহাসকে সংরক্ষণ করতে হলে আরো আগেই করা উচিত নয়তো সোর্স হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।সব মিলিয়ে ভালো ছিলো। হ্যাপি রিডিং 💚
মহিউদ্দিন আহমেদের আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জাসদের ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু এসেছে এবং আরো টুকটাক নানান উৎস থেকে সিরাজ শিকদার সম্পর্কে জ্ঞানটা ছিল ভাসা ভাসা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী ইতিহাসে সর্বহারা পার্টির একটা উল্লেখযোগ্য জায়গা আছে, যেটা না জানলে বাংলাদেশের ইতিহাস জানা সম্পূর্ণ হয় না৷ সেই আগ্রহ থেকেই লাল সন্ত্রাস পড়া। বইটি আকর্ষণীয় দিক হচ্ছে, নন-ফিকশন হওয়া সত্ত্বেও বইটা একটুও বোরিং নয়, তরতর করে পড়ে যাওয়া যায়৷ অল্প জানার দরুন, ওই সময়ের অনেক কথাই রূপকথার মতো মনে হচ্ছিল। পুরোপুরি আনবায়াসড হয়ে লেখক লিখতে পেরেছিলেন কিনা সেটা প্রশ্নসাপেক্ষ, তবে তাঁর গবেষণা এবং খোঁজ বেশ সাহসী এবং প্রশংসনীয়৷ বাংলাদেশের ইতিহাসে বেশ বিতর্কিত এবং কালো অধ্যায় নিয়ে আলোচনা যেহেতু৷ জানবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিঃসন্দেহে।
সত্তরের দশকের শুরুতে কয়েকটি বছর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে প্রচণ্ড এক ঝড়ো হাওয়া। এ সময় অল্প কয়েকজন ব্যক্তি নানাভাবে এ দেশের তরুণদের মনোজগতে সাড়া জাগাতে পেরেছিলেন। তাঁদের একজন সিরাজ সিকদার। তাঁর নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি ছিলো ওই সময়ের এক আলোচিত চরিত্র। তরুণদের একটা বড় অংশ এই দলের সশস্ত্র ধারার রাজনীতিতে শামিল হয়েছিলেন। তাঁরা কারও চোখে বিপ্লবী, কারও চোখে সন্ত্রাসী। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ব্যবচ্ছেদ করতে হলে অনিবার্যভাবেই উঠে আসবে সিরাজ সিকদার এবং সর্বহারা পার্টির রাজনীতির প্রসঙ্গ। এ নিয়ে আছে অনেক আলোচনা, সমালোচনা, বিতর্ক ও বিভ্রান্তি। এ বইয়ে উঠে এসেছে অন্তরঙ্গ বিবরণ, যা পাঠককে নিয়ে যাবে পাঁচ দশক পেছনে।
এইরকম কমপ্যাক্ট নন-ফিকশন খুব কমই পড়া হয়েছে। লেখক শুরুতেই তার ব্যক্তিগত মনোভাব প্রকাশ করেছেন সর্বহারা রাজনীতির ব্যাপারে।আসলে মানুষ নিজে যেই সময় প্রত্যক্ষ করেছে তার সম্পর্কে সম্পূর্ণ নির্মোহ বিচার-বিবেচনা করা খুবই দুরূহ ব্যাপার এবং তার ছাপ এই বইয়েও বিদ্যমান তবে এর ফলে বইয়ের আকর্ষণ মোটেও নষ্ট হয়নি। লেখককে ধন্যবাদ বাংলাদেশের ইতিহাসের এই রহস্যময় সংগঠনের ব্যাপারে বই লেখার জন্য। এই বইয়ের একটা জিনিসই দৃষ্টিকটু লেগেছে এবং তা হলো ফন্ট সাইজ,স্পেসিং বাড়িয়ে বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়ানো।
মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে —মোহিনী চৌধুরী
আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে মফস্বলে। কিন্তু গ্রামের বাড়ি কাছাকাছি হওয়ায় ছোটোবেলায় ছুটি-ছাটা ছাড়াও আমার কিছু সময় কেটেছে গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের বাড়িতে বাবা-চাচা-দাদার মুখে মুক্তিযুদ্ধের নানা গল্প শুনেই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আগ্রহ, জল্পনা-কল্পনার শুরু। পরবর্তীতে আমি মুক্তিযুদ্ধের ওপর খুব বেশি না হলেও কিছু বইপত্র আর ইন্টারনেটের সুবাদে অল্পবিস্তর পড়াশুনা করেছি। কিছু বিষয় বারবার পড়ায় সেগুলি মাথায় গেঁথে গেছে, কিছু বিষয় মনে রাখতে পারিনি, আর কিছু বিষয়ে আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেন যেন খুব বেশি তথ্য সংগ্রহে আসেনি।
খেয়াল করে দেখলাম, আমাদের দেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর শত শত বই থাকলেও ’৭২ থেকে ’৭৫ সালের ভেতরে ঘটে যাওয়া রাজনীতির নানা উত্থান-পতন নিয়ে লেখা বই তুলনামূলকভাবে কম। এর মধ্যে বেশিরভাগই সিরাজ সিকদারের ‘পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন’ বা ‘সর্বহারা রাজনীতি’-কে পাশ কাটিয়ে গেছে বা কোনোরকমে ছুঁয়ে গেছে। আর যা কাজ আছে—তার সবগুলো পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সমৃদ্ধ না। তাই ধন্যবাদ লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদকে, বাংলাদেশের রাজনীতির সেই অস্থির সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু বিস্মৃত দল ও দলের প্রধান সিরাজ সিকদারকে নিয়ে তার লেখা এই বইটির জন্য।
বইয়ের সংক্ষিপ্তসার লালসন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি বইটি মূলত দুইটি ভাগে সাজানো। প্রথম পর্বে আছে ঘটনাক্রমের ন্যারেটিভ বা বিবরণ। আর দ্বিতীয় পর্বটি সাজানো সর্বহারা পার্টির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষদের জীবনের গল্প দিয়ে।
১৯৬৫ সালে সোভিয়েত ও চিনা লাইনে ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্ত হয়ে গেলে সিকদার চিনপন্থী অংশের থাকে থাকেন। ওই সময় তার মনোজগতে বড় রকমের বদল ঘটে। তিনি কি তখনও ভেবেছিলেন নিজেই একটি রাজনৈতিক দল তৈরি করে ফেলবেন? উত্তর জানার অবশ্য আর কোনো সুযোগ নেই।
১৯৬৭ সালে বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার পর সিকদার নতুন পথের সন্ধান করতে থাকেন। কিন্তু দুনিয়ার বড় কোনো কাজই কেউ একা করেননি। সঙ্গী দরকার। ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে তিনি বন্ধু ও সহযাত্রী খুঁজতে থাকেন, পেয়েও যান কিছু। পরবর্তীতে দ্য ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডে চাকরি নিয়ে টেকনাফে পোস্টিং পান সিকদার।
এসময় সিকদারের সঙ্গীরা টেকনাফে যেতে চান। তার পরামর্শ অনুযায়ী ১৯৬৮ সালের মার্চ মাসের শেষের দিকে সামিউল্লাহ আজমী, রাজিউল্লাহ আজমী, আনোয়ার হোসেন ও আবু সাঈদ (কর্ণেল তাহেরের ভাতৃদ্বয়), আকা ফজলুল হক সহ সর্বমোট নয় জন গেলেন আরাকানে, নাফ নদী পেরিয়ে, কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কথা বলতে। তাদের গাইড ট্রটস্কিবাদী রেড ফ্লাগ উপেক্ষা করে মাওবাদী হোয়াইট ফ্লাগ কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কথা বলতে গিয়ে সাতদিনেও ফিরে না আশায় পরবর্তীতে সবাই যার যার যায়গায় ফেরত যান। এখান থেকেই মূলত গল্পের শুরু। ইতিহাসের এক ঘোরলাগা বাস্তবকে যেন দারুণ এক গল্পে কাঠামো দিয়েছেন লেখক!
দলের শুরুটা হয়েছিল তাত্ত্বিক ভিত্তির খোঁজে একটি থিসিস লেখার মধ্য দিয়ে। সেখানে তুলে ধরা হয়, কে শত্রু কে মিত্র। দক্ষিণ ভিয়েতনামের গেরিলাযুদ্ধ এবং ভিয়েতকংদের বীরত্বের কথা শুনে মুগ্ধ সিকদার ও তার সঙ্গীরা। পাকিস্তানের সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য ১৯৬৮ সালের শুরুর দিক থেকেই তারা রাজনৈতিক দল হিসেবে কমিউনিস্ট পার্টি তৈরির কথা ভাবতে থাকেন, যার দানা বাঁধে একই বছরের মাঝামাঝিতে। উর্দু-আরবি-ইংরেজি মেশানো তৎকালীন সব দলগুলোর মধ্যে প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় একটি রাজনৈতিক দলের নাম রাখেন সিকদার ও তাঁর সহযোগিরা—পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। সবাই একমত হন, এটি হবে গোপন সংগঠন। সে উদ্দেশ্যে দলের সবার ছদ্মনাম, জায়গাভেদে আবার সে ছদ্মনামের পরিবর্তন এমনকি গোপনীয়তা রক্ষার উদ্দেশ্যে দলের সবাই মিলে একসাথে মিটিংয়ে না বসে খণ্ড খণ্ড আকারে মিটিং করার মত দারুণ কার্যকরী উদ্যোগ নিয়েছিলেন সিরাজ সিকদার।
পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন ও পরে সর্বহারা পার্টির পক্ষ থেকে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগ ছাড়াও সাধারণ জনগণ ও বিভিন্ন পার্টির উদ্দেশ্যে দারুণ সব খোলা চিঠি আর মেনিফেস্টো লেখেন সিরাজ সিকদার। এ বইতে দেখা মিলবে সেসবের, যাতে সম্ভাব্যতা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি দেশের জন্য সাস্টেইনেবল কর্মকাণ্ডের রূপরেখা সম্পর্কেও আলোকপাত করা হয়। সিকদারের ইনসাইট এবং দুরভিসন্ধি কী মারাত্মক ছিলো, তা বোঝা যায় দলের এইসব ইশতেহার, খোলা চিঠির মাধ্যমে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবস্থানকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু তথ্যের দেখা মিলবে। দেখা মিলবে মুক্তিবাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতা, লুটতরাজ, নির্মমভাবে খুন করার দালিলিক প্রমাণ। আসবে মহিউদ্দিন আহমেদের নিজস্ব বক্তব্য-ও। বইটি পড়তে পড়তে বেশ কিছু জায়গায় পাঠক থামবেন, চিন্তা করবেন, প্রয়োজনে তথ্য ক্রসচেইক করবেন, কিন্তু আবার ফেরত আসবেন, পড়া শুরু করবেন—বুকমার্ক করে রাখা অংশ থেকে।
সর্বহারা পার্টির ঘোষিত নীতি ‘গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা’-র ‘গণতন্ত্র’ ও ‘কেন্দ্রিকতা’ টার্ম দুইটি পারস্পারিক ভারসাম্যহীনতায় অবস্থান করার কারণে সৃষ্ট সমস্যাবলি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন লেখক। অন্যান্য পার্টির মতো সর্বহারা পার্টিও যে ‘উপদলবাদ’ বা ‘গ্রুপিং’ এর আওতার বাইরে নয়, এটা দারুণভাবে উঠে এসেছে। মূলত কমিউনিস্টদের সাথে স্থানীয় গণমানুষের বিচ্ছিন্নতা, ভয়ে থাকা, এক পর্যায়ে পার্টির গণতন্ত্রহীনতা, এক ব্যক্তির নেতৃত্ব কায়েম হওয়া, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার নামে অন্ধ উত্তেজনা থেকে আন্তঃদলীয় কিলিংগুলো নিজেদের একতাবদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গকে প্রশ্নের ওপর দন্ডায়মান করে ফেলে। জাতীয়তাবোধের অভাবহীনতার পেছনে দলীয় ভিন্নমত পোষণ থাকলেও মিউচুয়াল রেস্পেক্টের ভয়ানক অভাব—চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন মহিউদ্দিন আহমদ। বহিঃশক্তি রোধের অভিপ্রায়ে থাকা দল নিজেদের ভেতর অন্তঃকোন্দলে লিপ্ত থাকলে বিগার মোটিভ থেকে যে আসলে যোজন যোজন দূরে ছিটকে যায়, সে সত্য দারুণভাবে তুলে ধরেছেন লেখক।
১৯৭২-৭৪ সালে দুইটি রাজনৈতিক স্রোতধারা—জাসদ ও সর্বহারা পার্টি তৎকালীন বাঙালী তরুণ সমাজকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে। বিপ্লবী চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করার পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রাম পর্যন্ত যেতে তারা পিছপা হয়নি। সর্বহারা পার্টির মতো একটা রাজনৈতিক দলের সভাপতি সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর অনেক অনেক বছর পরেও সঠিকভাবে জানা যায়নি ঠিক কীভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ধরা পড়া অব্দি কম বেশি সবাই জানে, কিন্তু তার মৃত্যু কার্যকর করার পদ্ধতি নিয়ে নানা মত দেখা যায়, এখনও। বাঙালীর ইতিহাসের সাথে মিশে থাকা এরকম একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও তার সর্বহারা রাজনীতির তত্ত্ব, রূপকল্প ও কর্মসূচি এবং একঝাঁক মেধাবী তরুণের স্বপ্নযাত্রা ও স্বপ্নভঙ্গের গল্প তুলে ধরার জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ইতিহাসকে সুস্পষ্টভাবে সামনে আনার মতো সাহসী লোকের খুব প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে পৃথিবীতে অনেক অনেক চলচ্চিত্র থাকলেও আমাদের দেশকে কেন্দ্র করে এরকম চলচ্চিত্র খুবই যৎসামান্য। সেরকম রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের প্লট বা ব্যক্তিত্ব—কোনোটারই কমতি নেই আমাদের দেশে। কমতি আছে তা নিয়ে আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার।
বইটির ভালো দিক ইতিহাস পড়তে যাতে একঘেয়েমি না চলে আসে, যাতে নিরেট গৎবাঁধা ইতিহাস লেখা না হয়ে যায়, সেদিকে লেখকের নজর ছিল বরাবরই। সেজন্য তিনি সর্বহারা পার্টির সাথে জড়িতদের সাক্ষাৎকার বা রচনা নিয়ে বইটির দ্বিতীয় পর্ব সাজিয়েছেন৷ এতে দলের ভেতরকার একধরনের অন্তর্দৃষ্টি সামনে এসেছে, যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বলে বিবেচ্য। বইটিতে বেশ কিছু ছবি, দলিল ও চিঠি ব্যবহার করা হয়েছে৷ অসংখ্য বই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু কিছু আগে পড়া থাকায় মেলাতে বেগ পেতে হয়নি।
মহিউদ্দিন আহমদ তথ্য-উপাত্���ের একত্রীকরণ করে তিন্ন ভিন্ন প্রসঙ্গ কাঠামো থেকে ঘটনাগুলিকে নিজে দেখেছেন এবং পাঠকদেরকে দেখতে সাহায্য করেছেন। শুধু তাই-ই নয়, নিজের কিছু মূল্যবান মতামতও পরতে পরতে জুড়ে দিয়েছেন। একই ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার সুবিধা হচ্ছে, বস্তু বা ঘটনার পরিবেশের সাথে সবার মনস্তাত্ত্বিক পরিবেশের সামঞ্জস্যতা অনুধাবন করতে পারা এবং একই সাথে ঘটনার তথ্য-উপাত্ত ফিল্টার ও ক্রসচেইক করে ফেলা, কতটুকু বাড়াবাড়ি, কতটুকু নিখাঁদ সত্য—তা বুঝতে পারা।
বইটির খারাপ দিক ইতিহাস নিয়ে লেখার সবথেকে বড়ো সমস্যার গুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একটা নির্দিষ্ট সময়কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনাকে ব্যাসার্ধ মেনে তৈরিকৃত বৃত্তের ভেতরে কথা বলতে বলতে কথাপ্রসঙ্গে বৃত্তের পরিধির বাইরের কথা চলে আসে যা কোনো লেখক উপেক্ষা করে যেতে পারেন না। লেখক কতটুকু বলবেন আর পাঠক কতটুকু চাইবে, তার সামঞ্জস্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয় না। লালসন্ত্রাস : সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি বইয়ে-ও বিষয়টি এসেছে।
উপনিবেশবাদ নাকি জাতিগত নিপীড়ন—কোনটি প্রধান দ্বন্দ্ব—এ নিয়ে কোনোরকম আলোচনায় যাননি লেখক।
ছয় পাহাড়ের দালাল টার্মটা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করলেও এটা নিয়েও কোনো গবেষণার ছাপ পাওয়া যায়নি। যেহেতু গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিভিন্ন ইনসাইট নিয়ে কম-বেশি আলোচনা করেছেন, এই বিষয়টা নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল বলে আমি মনে করি।
’৭৫ সালে সিকদার মারা যাওয়ার পর থেকে ’৯০ সাল পর্যন্ত সর্বহারা দলের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য এসেছে খুবই সংক্ষিপ্ত আকারে।
এছাড়াও কিছু উপাত্ত নিয়ে ফার্দার ক্রসচেইক করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।
কেন পড়বেন/কারা পড়বেন দেশের কন্টেক্সটে সংক্ষিপ্ত আকারে বামপন্থী রাজনীতির সূত্রপাত এবং বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন ব্যর্থ-উচ্চাভিলাষী-আদর্শবাদী-স্বপ্নাবিষ্ট বিপ্লবী ও তার দলের গল্প, মোদ্দাকথা, দেশের কিছু অবহেলিত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস সঠিকভাবে তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে জানতে চাইলে… বইটি আপনার জন্য।
বইয়ের স্বার্থকতা বইটিতে কোনোরকমে কমিউনিস্ট আন্দোলনের লাল-সাদা তত্ত্বের ভিত্তি উঠে এসেছে যাতে করে এই বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞ কোনো ব্যক্তিও একটা ন্যূনতম ধারণা নিয়ে পড়তে পারেন। কিন্তু যদি কেউ মার্ক্সবাদ, লেনিনবাদ, মাও সে তুং নিয়ে হালকা পাতলা পড়াশুনা করে থাকেন, বইটির নামকরণ কতটা যুক্তিসঙ্গত—অনুধাবন করতে পারবেন৷
এছাড়া বইয়ের মলাট, কাগজ, বাঁধাই সবকিছুই অত্যন্ত মানসম্মত। আলাদা ভাবে প্রচ্ছদ নিয়ে বললে বলতে হয় যে, লাল রঙের গুরুত্ব, মাহাত্ম্যের সাথে সিরাজ সিকদারের সম্পর্কের যথাযথ মূল্যায়ন করে দারুণ প্রচ্ছদে বইটিকে সাজিয়েছেন প্রচ্ছদশিল্পী সব্যসাচী হাজরা।
সত্যিকার রেটিং: ৩.৫/৫
ইম্প্যাক্ট বইটি আমাকে ১৯৬৭ থেকে শুরু করে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত সিরাজ সিকদার ও তার দলের সাথে দারুণ এক যাত্রায় সঙ্গী করেছে। একটা ঘটনাকে ভিন্ন ভিন্ন পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে দেখতে সাহায্য করেছে। বইটি শেষ করার পর আমি আমার বেশ কিছু প্রশ্নের জবাব পেয়েছি, কিছু পাইনি এবং কিছু নতুন প্রশ্নের উদয় হয়েছে।
আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের তুমুল আলোচিত এবং বিতর্কিত একটা চ্যাপ্টার এর সেন্ট্রাল ক্যারেকটার সিরাজ সিকদার। এই বইতে তার কার্যক্রম, তাত্ত্বিক ভিত্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা, হঠকারিতা, চারিত্রিক স্খলন, সিনিসিজম, নার্সিসিজম ইত্যাদি বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলাপ আসছে। মোটামুটি তার কমরেডদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এর মাধ্যমেই অনেক তথ্য জানা যায়।
যাইহোক, মহিউদ্দিন সাহেব খুব ঘনঘন বই লিখছেন ইদানিং, এতে মানের এদিক সেদিক হচ্ছে। এই বইটা অহেতুক এত বড় হইছে। নট রেকমেন্ডেড।
ক্রাচের কর্ণেল পড়ার সময় সিরাজ সিকদার এবং তার দল সর্বহারা পার্টির কথা এসেছে কয়েকবার। ওদিকে কোথাও থেকে জেনেছিলাম, সর্বহারা দলের সাথে নকশাল আন্দোলনের মিল পাওয়া যায়। তাই এই দল আর সিরাজ সিকদার বিষয়ে জানা যাবে এমন বই খুচ্ছিলাম। আর পেয়ে গেলাম মহিউদ্দিন আহমেদের লাল সন্ত্রাস।
সিরাজ সিকদার বুয়েটে পড়াকালীন কমিউনিস্ট ছাত্র রাজনীতিতে যোগ দেন। মাও সে তুং থেকে অনেক বেশি ইনফ্লুয়েন্স হয়েছিলেন তিনি। সাধারণে মানুষের ন্যায্য দাবি কায়েম করার লক্ষ্যে একটি দল গঠন করেন যার নাম হয় সর্বহারা কমিউনিস্ট পার্টি। এই দলে থাকতে হলে সবাইকে সিরাজ শিকদারের সাথে একমত হতে হবে। মতের অমিল হলে বা যদি দলের মনে হয় কোনো সদস্য বিশ্বাস ঘাতকতা করছে তাদের শাস্তি একটাই, "মৃত্যুদন্ড"। এদেরকে নিজেদের প্রমাণ করারো সুযোগ দেয়া হত না। কবি হুমায়ুন কবিরের প্রাণ যায় এমনই এক ঘটনার রেস ধরে। আহমদ ছফা থেকে নিয়ে বিভিন্ন গুণী উচ্চ শ্রেণীর লোকজন ছিলেন এই দলের প্রতি সহানুভূতিশীল।
লেখক সিরাজ সিকদারকে এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যে তাকে নিয়ে বেশি কিছুই বলা যাবে না। শুধু বলা যায় সিরাজ শিকদার জীবিত থাকলে হয়ত আজ দেশের রাজনীতির অনেক বড় ভুমিকায় থাকতেন। রাজনীতির মোড় ঘুরে যেত অন্যদিকে।
সিরাজ সিকদার চট্টগ্রাম থেকে পুলিশের কাছে ধরা পরে ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭৪। ১৭৭৫ সালের ২ জানুয়ারি সিরাজ সিকদার মারা যান ক্রসফায়ারে। পুলিশের ভাষ্যমতে সিরাজ সিকদার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কালে তাকে গুলি করা হয়। সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর এই ঘটনাকে ইমতিয়ার শামীমের লেখা একটি লাইন দিয়েই হয়ত ব্যাখ্যা করা যায়, " আমরা আরেকটু পর জানতে পারি ক্রসফায়ারে একজন মারা গেছে, কেননা ক্রসফায়ারে মারাই যেতে হয়"। (লাইনটি কে একটু পরিবর্তন করে এক শব্দের "ই" আরেক শব্দে বসানো হয়েছে"
মেজর নূর এবং ডালিম যুক্ত ছিলেন সর্বহারা পার্টিতে। কথিত আছে শেখ মুজিবুর রহমানকে ব্রাশফায়ার করেন মেজর নূর। এবং পরবর্তীতে মেজর নূর বলেন, "ওরা আমার নেতাকে মেরেছে, ওদের মেরে আমি প্রতিশোধ নিলাম"। শুধু এতটুকুতেই বোঝা যায় এই দল কতটা প্রতিশোধপরায়ণ ছিল।
সর্বহারা পার্টি একদিকে বিপ্লবের কথা বলেছেন অন্যদিকে শেষ পর্যায় গিয়ে এরা এত বেশি হিংস্র এবং উগ্র হয়ে উঠেছিল যে সাধারণ মানুষ এদের ভয় পেতে শুরু করে। একই সাথে দলে দলে মানুষ যোগ দিচ্ছিলো এই পার্টিতে। তারা কেনো যোগ দিচ্ছিলো এই দলের সাথে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে অনেকগুলো কথা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তা আর লিখতে চাচ্ছি না। পুরো বইটি পড়ে যেমন ক্ষোভ তৈরি হয়েছে তেমনই ভাবে সহানুভূতিয়ো এসেছে এই দলের কিছু মানুষের প্রতি।
যেকোনো নন-ফিকশান পড়ার ক্ষেত্রে তথ্য এবং মতামতের মধ্যে পার্থক্য করতে পারাটা অত্যন্ত জরুরী। Since all books are political - স্বাভাবিকভাবেই লেখার মধ্যে লেখকের নিজের বিশ্বাস, ধারণা ও দৃষ্টিকোণের ছাপ থাকবে। পাঠক হিসেবে সচেতনভাবেই সেগুলোর প্রভাব আমার/আপনার নিজের ডিডাকশনের উপর পরতে দেয়া যাবেনা। রাজনৈতিক বইগুলোর ক্ষেত্রে তো একদমই না।
বইয়ের নামকরণে ব্যবহৃত "লাল সন্ত্রাস" কথাটি আসলে সিরাজ সিকদারকে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করতে ব্যবহার করা হয়নাই। এর এক ইতিহাস আছে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর ১৯৯২ সাল পর্যন্ত সোভিয়েত রাশিয়ায় চলেছিল গৃহযুদ্ধ। বলশেভিক পার্টির নেতৃত্বে রেড আর্মি এবং কমিউনিস্ট বিরোধীদের হোয়াইট আর্মি একে অপরের ওপর দিয়েছিলো সন্ত্রাসের অভিযোগ। কমিউনিস্টরা বিশ্বাস করতেন - শ্বেত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লাল সন্ত্রাস হলো "প্রতিক্রিয়াশীলতা ও প্রতিবিপ্লবের" বিরুদ্ধে "প্রগতি ও বিপ্লবের" লড়াই। বাংলাদেশে এ লড়াইয়ে একদম প্রথম কাতারে ছিলো সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়া পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন সংগঠন যা পরে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি নামে পরিবর্তিত হয়। সেই স্লোগান থেকেই এই নাম দেয়া।
এতো বছর পর এসে সত্য উদঘাটন আসলে এক অসম্ভব ব্যাপার। সেই প্রয়াসে আমি যাইনি, যাবোও না। তবে এ বই পড়ে, শুধুমাত্র এ বইয়ের বেসিসে-সিরাজ সিকদারকে নিয়ে আমার মনে হয়, তার দেশপ্রেম এবং স্বাধীনতাকে ঘিরে তার প্রতিনিয়ত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া সত্বেও তার পতনের পিছনের তার নিজের অবদান অতুলনীয়। একটি রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা হয়ে তিনি তার পার্টির লোকদের ব্যক্তিগত ব্যাপারে প্রচুর হস্তক্ষেপ করতেন, চাপ সৃষ্টি করে তাদের নিজের মতবাদ অনুযায়ী চলতে বাধ্য করতেন, এবং তাতে ব্যর্থ হলে সেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে দিতেন। এ নিয়ে প্রচুর খুন-খারাপিও তিনি করিয়েছেন। Absurd! সিরাজ সিকদারের মৃত্যু নিয়ে এখানে কয়েকটি সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে কিছু মানুষের বক্তব্যের মাধ্যমে। একেক বক্তব্যে আছে একেক নাটকীয় দৃশ্য। কোনটা ঠিক, কে মিথ্যা বলছেন, ঘেটে দেখবার উপায় নাই, তবে বাংলাদেশের রাজনীতির সঙ্গে পরিচয় থাকলে একটু ধারণা করাই যায়।
মাঝে একটা সময় ছিলো যখন মানুষের মুখে মুখে "i hate politics, i hate history" জাতীয় কথা শোনা যেতো। সৌভাগ্যবসত এখনের সময়ে এমন কোনো ট্রেন্ড নাই। এখনের মানুষ আরও ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে জানতে বেশ আগ্রহী। সিরাজ সিকদারের রাজনৈতিক জীবন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে মিশে আছে। এ নিয়ে পড়লে সেই সময়ের ঘোলা ধারণাগুলি একটু স্পষ্ট হয়ে আসবে। বাংলাদেশের ইতিহাস, স্বাধীনতা যুদ্ধের ক্যাটালিস্টসমূহ, বিপ্লবী এক সংগঠনের প্রতিষ্ঠা, কর্মকান্ড, প্রভাব ও পতন নিয়ে আগ্রহ থাকলে "লাল সন্ত্রাস" বইটা পড়া বেশ ইফেক্টিভ হবে।
বিঃদ্রঃ এই বইয়ের পটভূমিতে সিনেমা বানালে ভালো হতো। প্রচুর ড্রামা আর অ্যাকশান দিয়ে ভরপুর এক সিনেমা হতো।
সিরাজ সিকদার এবং তার সর্বহারা পার্টি নিয়ে জানার আগ্রহ অনেক আগে থেকেই। তারই জের ধরে এই বইটা কিনে আনার সাথে সাথে পড়তে বসে যাই। প্রশ্নসমূহের বৃহদাংশের উত্তরই পেয়েছি। এছাড়াও বইটি নিয়ে অনেকের সমালোচনাও রয়েছে সেগুলোও খুব মনযোগ দিয়ে পড়লাম। হ্যাঁ হয়তো সিকদার কে এখানে একদম খলনায়ক হিসেবেই পোট্রে করা হয়েছে কিন্তু ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে মহিউদ্দিন আহমদ কিছু ভুল করেননি তা বলতে পারি৷ এতো ব্যাস্ততার মাঝেও দুইদিনে বইটি শেষ করে ফেলেছি তা ভেবে নিজেরই অবাক লাগছে!!
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম একটা অংশের উপরে লেখা বই । বাংলাদেশের শুরুর সময়গুলোতে একটা স্রোতে দেশের গতিপথ পরিবর্তন করে দিতে পেরেছিলেন একটা মানুষ - সিরাজ সিকদার । তার রাজনীতি, বিপ্লব, ব্যক্তিজীবন নিয়েই এই বইটা । ইতিহাস, বা বিপ্লব, বা দেশ, কিংবা উপরিউক্ত সবকিছু নিয়ে যাদের আগ্রহ - তাদের জন্য নিঃসন্দেহে অবশ্যপাঠ্য ।
স্বল্প সময়ে সিরাজ শিকদার প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। কিন্তু তার রাজনীতি জিততে বা টিকতে পারলো না বলা চলে। সিরাজ যেন হারিয়ে গেলেন। এখন তো অনেকেই নামটাও জানে না তার।
এক রহস্যাবৃত সময় এবং সেই সময়ের রাজনীতি। রক্তপাতে ভরা রাজনীতি। দিন বদলের প্রবল রোমাঞ্চে ছুটে চলা এক ঝাঁক তারুণ্যের অপচয়ের রাজনীতি। কখনো অনেকের থেকে, পারিপ্বার্শিক সময়ের থেকেও এগিয়ে থাকার তত্ত্ব ধারণ আবার কখনই অহেতুক বায়বীয় তত্ত্বে দ্বন্দ্বের রাজনীতি। অতি ছোট্ট কারণেও নিজেদের মধ্যে খতমের রাজনীতি। মহিউদ্দিন আহমেদ সেই সময়ের চরিত্রের বয়ানে কিছু বিস্ফোরক তথ্য সামনে এনেছেন। আবছা সময়টাকে একটু বোঝার চেষ্টা করা যায়। যদিও সত্য-অর্ধসত্যের নানান যুক্তি থাকবে। কিন্তু ঘটনাবলির সূত্র ধরে ক্রসচেকের তো সুযোগ তৈরি হয়। দারুণ সুখপাঠ্য এক বই। রাজনীতি বিষয়ে আগ্রহীদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।
১৯৬৮ সালে দেশের একদল মেধাবী তরুণেরা একটি দল গঠন করে, "পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন" নাম যারা দেয় তখন বিপ্লব তাদের শরীর জুড়ে। শ্রেণি বৈষম্য দূর করার ব্রুত নিয়ে মাঠে নামলেও তা সময়ের সাথে সাথে বিভিন্ন কর্মসূচিতে রূপ নেয়। সর্বপ্রথম পাকিস্তান হতে স্বাধীন হওয়ার উল্লেখ, পতাকার মূল নকশাকার হিসেবে পরিচিত তাদের মধ্য থেকেই একজন, দেশ স্বাধীন হওয়ার লক্ষ্যে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা, পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তি পেয়ে ভারতীয় উপনিবেশে প্রবেশ করার মতো বক্তব্য পেশ, খোলামনে মুজিব সরকার ও মুজিবকে নিয়ে সমালোচনা, দেশের অন্যান্য কমিউনিস্ট দলগুলোকে সংশোধবাদী ট্যাগ প্রদান, সংখ্যালঘুদের জন্য প্রথম আওয়াজ তোলা এমন অনেক কিছুই দলটির কর্মসূচির ঝুলিতে যোগ হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।
দলটির নাম পরবর্তীতে পরিবর্তিত হয়ে " সর্বহারা পার্টি" নামে পরিচিতি পায় যার মূল নায়ক সিরাজ সিকদার, যার নাম কিনা তখনকার সময়ে ছিল বহু আলোচিত ও সমালোচিত। আলোচিত এজন্য যে তখনকার বহু তরুণদের জন্য তিনি ছিলেন একজন আদর্শ প্রতিবাদী নেতা এবং সমালোচিত এজন্য যে স্বাধীন দেশের প্রারম্ভিক সময়গুলোতে বৈরী আবহাওয়া তৈরি করতে দলের অধিনায়ক ও তার অনুসারীদের কম ভূমিকা ছিল না। কারো জন্য দলটি ছিল দেশকে নতুন পথ দেখানোর আলোকিত দুয়ার আবার বিপরীতে অনেকের কাছে দলটি নিছক সন্ত্রাসী ছাড়া কিছুই নয়।
বইটি পড়ে এবার আমার মতামত প্রকাশ করতে যাচ্ছি যা অনেকের ভালো না লাগতেই পারে কিংবা আমি গালিও খেতে পারি।
•দলটি শ্রেণি বৈষম্য দূর করবার উদ্দেশ্য নিয়ে মাঠে নামলেও সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের সাথে তাদের ছিল যোজন যোজন দূরত্ব। ভারী ভারী শব্দ প্রয়োগ ছাড়া নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের জন্য কোনো উদ্যোগ তাদের নিতে দেখা যায়নি।
•সিরাজ সিকদার যার কিনা মন ব্যথিত হয়ে যায় বৈষম্য দেখে, যার বিশাল মাপের মন দিয়ে গৃহকর্মীকে বিয়ে করে সে উদাহরণ স���থাপন করতে চেয়েছিল সমাজে কিন্তু কোনো এক সময় তার উপলব্ধি হয় যে তার প্রথম স্ত্রী এবং তিনি একই আদর্শ ধারণ করেন না বলে তাদের তালাক হওয়াই শ্রেয়। কিন্তু বিচ্ছিন্ন হয়ে যে মেয়েটার উপরই কতো বড়ো অবিচার হলো তা দেখবার সময় বা জ্ঞান তার ছিল না। " Charity begins at home " বলে প্রবাদটা সিরাজের বেলায় খাটে না।
•যেসব কর্মকাণ্ডের কারণে মুজিব ও তার রাজনৈতিক দল সিরাজ ও তার দলের কাছে ছিল ঘোর সমালোচিত সেই একই কাজগুলো কী দেখতে পাওয়া যায় নি সর্বহারা পার্টিতে? খুন-লুট-গুম তো কম হয়নি এই পক্ষ থেকে, দেশের শান্তি বিঘ্ন ঘটাতে এই পার্টিও কম ভূমিকা পালন করেনি।
•মুজিব যদি স্বৈরাচার হয় তবে সিরাজ সিকদার হচ্ছে স্বৈরাচারের বন্ধু , ঠিক এই কারণে যে সিরাজের দলের লোকদের কোনো অধিকার ছিল না সিরাজের সমলোচনা করার, খাঁটি স্বকামী ব্যক্তিত্বসম্পন্ন একজন মানুষ। মুজিবের ঘুম হারাম করার জন্য দায়ী বলে সিরাজের এত জনপ্রিয়তা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে কিনা তবে মানুষটা নিজেই যে বিশাল স্বৈরাচারী তাতে সমস্যা খুব একটা দেখা যাচ্ছে না বর্তমানে যা বুঝলাম।
•সবচেয়ে বড় আইরনি হলো খোদ যার আদেশে কিংবা গোচরে নিজেরই দলের লোকদের বিনা বিচারে, ছোট বড় অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো তারই কিনা মৃত্যু হলো একই পরিণতির শিকার হয়ে ( সিরাজের হত্যাকে সমর্থন করছি না)
পরিশেষে, একজন মানুষ যখন দল গঠন করে শুধু নিজেকে ঊর্ধ্বে রেখে, তখন দলের আদর্শ বিঘ্নিত হতে সময় লাগে না। যার কারণে কিনা নেতা গত হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দলের ভাঙন দেখা দেয়, আদর্শ হয়ে যায় চূর্ণ বিচূর্ণ।
বইটি পড়ে কেন জানি লেখককে এই প্রথমবার বায়াসড মনে হল। শুরতেই তার আপন জন হারানোর বেদনা ছিল তাতেই মনে হয়।
বইয়ের প্রথমাংশ আমার তত ভাল লাগেনি। কারণ পার্টির দলিল ভিত্তিক যে বয়ান দিয়েছেন তাতে আসলে সর্বহারা পার্টি বা সিরাজ সিকদারকে বোঝা যায়না ভালভাবে।
পরবর্তী অংশটুকু যেখানে পার্টির মেম্বারদের কথা উঠে এসেছে সেখানে বেশ ভালই লেগেছে। অনেক অজানা কথাও উঠে এসেছে যেটা কিনা আমার জানা ছিলনা।
সর্বহারা পার্টিকে নিয়ে বড় পরিসরে লেখাগুলো পরবর্তী প্রজন্মকে ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিবে। সিরাজ সিকদারকে নিয়েও সমালোচনা আলোচনার জায়গা তৈরি করে দেবে।
বিপ্লবী আন্দোলন যারা করেন তাদের নিজের বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে বইটি খুবই কাজের। ভবিষ্যত ও উদ্দেশ্য বুঝে বিপ্লব করার যেমন সার্থকতা আছে তেমনি ভুল বিপ্লবে পা বাড়ানো যে জীবনকেই তছনছ রে দেয়। তাই বিপ্লবের দিকে পা বাড়ানো দরকার ভেবে চিনতে।
সিরাজ সিকদার সম্পর্কে কেউ গভীরভাবে না জানলেও, ‘সর্বহারা সিরাজ সিকদার’ নামটি বেশ পরিচিত। কৈশোর পেরুনো তরুণ থেকে শুরু করে যে কোনো বয়সের মানুষই এই নাম শুনলে চেনার অনুভূতি প্রকাশ করে। সর্বহারা পার্টির নেতা হিসেবে তার পরিচিতি ছিল, সেইসঙ্গে দেশজুড়ে তোলপাড় করা সশস্ত্র আন্দোলনের কারণে তার নামটি আলোচিত ছিল। তার জীবন ছিল বেপরোয়া, আদর্শ ছিল বিপ্লবী, আর মৃত্যু ছিল রহস্যময়। সিরাজ সিকদার সম্পর্কে আমার জ্ঞানও এতদিন মোটামুটি এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মহিউদ্দীন আহমেদের ‘লাল সন্ত্রাস’ পাঠশেষে ইতিহাসের একটি অল্পচেনা অধ্যায় উন্মোচিত হলো। বইটি মূলত সিরাজ সিকদারকে কাছ থেকে দেখেছেন এমন ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, সমসাময়িক পত্রপত্রিকা এবং সর্বহারা পার্টি ও পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের বিবৃতি সংকলন করে নির্মিত। একইসঙ্গে এখানে সিরাজ সিকদার ও তার দলের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়ে তাঁর একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের অভিমত উঠে এসেছে। লেখক নিজে কোনও পক্ষপাত দেখাননি; বরং তিনি পাঠককে সুযোগ দিয়েছেন নিজের মতো করে ইতিহাসের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করার।
সিরাজ সিকদার আসলে কীভাবে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠলেন? সর্বহারা পার্টির উৎপত্তি কোথায় এবং কীভাবে তা বিকশিত হলো? সর্বহারাদের প্রকৃত অর্থ কী? বইটি পড়ার আগে এসব বিষয়ে কিছুটা ধারণা থাকলে বিষয়বস্তুর গভীরে প্রবেশ করা সহজ হবে। শুধু ইতিহাস জানার ইচ্ছা থাকলেই হবে না, বরং পাঠকের যদি বিপ্লব, মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মাওবাদসহ সাম্যবাদ ও সমাজতন্ত্রের মূলনীতি সম্পর্কে সামান্য হলেও ধারণা থাকে, তাহলে বইটির বক্তব্য আরও পরিষ্কার হয়ে ধরা দেবে।
ধরা যাক, বই পড়তে ভালোবাসেন এমন যে কেউ কিছুটা হলেও কমিউনিজম, সমাজতন্ত্র বা সামাজিক মালিকানার ধারণা রাখেন। কার্ল মার্কস যে শ্রেণীসংগ্রামের তত্ত্ব দিয়েছেন, লেনিন তা বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। পরবর্তীতে মাও সে তুং এই দর্শনের সঙ্গে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি যুক্ত করে নতুন এক মতবাদ গড়ে তোলেন। সিরাজ সিকদার ছিলেন মাওবাদে বিশ্বাসী। মাওয়ের আদর্শ অনুসরণ করে তিনি মার্কসবাদ ও লেনিনবাদকে ধারণ করতেন। ঠিক যেমন বলশেভিক বিপ্লব কিংবা নকশাল আন্দোলন তরুণদের বিপ্লবী চেতনা জাগিয়ে তুলেছিল, তেমনভাবেই সিরাজ সিকদারের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেকেই সশস্ত্র সংগ্রামের পথে পা বাড়িয়েছিল এবং সর্বহারা আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল।
সর্বহারা শব্দের ইংরেজি হলো 'প্রলেতারিয়েত'। যেসব শ্রমজীবী মানুষ নিজেদের শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে এবং যাদের শ্রম থেকে উৎপন্ন সম্পদের সুবিধা ভোগ করে সমাজের উচ্চবিত্ত শ্রেণী, তাদেরই তাত্ত্বিকভাবে সর্বহারা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিপ্লবী ভাবধারায় সর্বহারা বলতে বোঝানো হয় সেই জনগোষ্ঠীকে, যারা নিঃস্ব, যাদের হারানোর মতো কিছু নেই এবং যারা সমাজ পরিবর্তনের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত। তাদের কাছে সংগ্রাম কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং সেটাই তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন, আর বিপ্লবই তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
বাংলাদেশেও সত্যিকারের সর্বহারার উত্থান ঘটে, যার নেতৃত্বে ছিলেন সর্বহারা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সিরাজ সিকদার। ১৯৪৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। সে সময় উপমহাদেশে সক্রিয় ছিল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানে পৃথক কমিউনিস্ট পার্টির গোড়াপত্তন হয়। পরে, ১৯৫৬ সালে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করে।
এই সময়েই দৃশ্যপটে উঠে আসেন সিরাজ সিকদার। তখন তিনি বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং চীনপন্থী ছাত্র ইউনিয়নের হল কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি প্রচণ্ড জ্ঞানপিপাসু ছিলেন, মাও সে তুং, কার্ল মার্কসসহ বিশ্ববিখ্যাত বিপ্লবীদের লেখা গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়তেন। সমাজে প্রচলিত বৈষম্য তার মনকে আলোড়িত করত। ব্যক্তি স্বার্থের সীমানা ছাড়িয়ে তিনি বৃহত্তর জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার সংকল্প নেন এবং 'আমি' থেকে 'আমরা' হয়ে ওঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
এরপর সিরাজ সিকদার পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলনের নীতি ও কর্মপরিকল্পনা সংকলন করেন, যা পরবর্তীতে তার দলের আদর্শিক ভিত্তি হয়ে ওঠে। বইয়ের লেখক এই ঘোষণাকে স্বাধীনতার দাবির মূল ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এটি ছিল শুধু স্বায়ত্তশাসনের আহ্বান নয়, বরং পূর্ব বাংলাকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপান্তরের দৃঢ় অঙ্গীকার। এই ঘোষণার মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো লাল ও সবুজ রঙের পতাকার ধারণার কথা জানা যায়।
১৯৭৩ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে সর্বহারা পার্টির কার্যক্রম আরও চরমপন্থী �� সহিংস রূপ লাভ করে। ১৯৭২ সাল থেকেই সিরাজ সিকদার ও বঙ্গবন্ধু সরকারের মধ্যে মতাদর্শিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রযন্ত্রের কঠোর দমনপীড়ন ও রক্ষীবাহিনীর নির্মম দমননীতি জনসাধারণের মধ্যে তীব্র ভীতি সৃষ্টি করে। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে সর্বহারা পার্টি নিজেদের সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য সুপরিকল্পিত কৌশল গ্রহণ করে। বিপ্লবের আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিপুল সংখ্যক তরুণ সশস্ত্র সংগ্রামের প্রত্যয়ে দলে যোগ দেয় এবং পার্টির আক্রমণাত্মক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ শুরু করে।
১৯৭৫ সালের ১ জানুয়ারি দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক গোপন বৈঠকে অংশ নিতে চট্টগ্রামে যান সিরাজ সিকদার। সেখান থেকে তাকে গ্রেফতার করে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। ২ জানুয়ারির গভীর রাতে সাভারের নির্জন রাস্তায় নির্মমভাবে তাকে হত্যা করা হয়, যা পরবর্তীকালে 'ক্রসফায়ার' হত্যাকাণ্ডের অন্যতম উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পায়। সরকারি ভাষ্যমতে, পালানোর চেষ্টাকালে পুলিশ গুলি চালালে তিনি নিহত হন, যদিও এ ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর সর্বহারা পার্টির ক্রমশ অবসান ঘটতে থাকে। যদিও কিছু নেতা ও কর্মী দীর্ঘদিন গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চেষ্টা করেছিল, তবুও সংগঠনটির কার্যকারিতা এবং প্রভাব দ্রুত হ্রাস পায়। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময়ে, বুদ্ধিজীবী মহলে সিরাজ সিকদার সম্পর্কে নানান ইতিবাচক এবং সমালোচনামূলক আলোচনা চলতে থাকে, যেখানে কেউ তাকে বিপ্লবের প্রতীক হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ তার কর্মকাণ্ডকে বিতর্কিত বলে আখ্যা দিয়েছেন।
বিপ্লবী, সর্বহারা কিংবা চরমপন্থী সন্ত্রাসবাদী—যে নামেই ডাকি না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই একটি নির্দিষ্ট আদর্শ মানুষকে এমন জীবন বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। বলশেভিক বিপ্লব হোক বা নকশাল আন্দোলন, সব ক্ষেত্রেই এক আদর্শিক অনুপ্রেরণা মানুষকে লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করেছে। কিন্তু বহু সময় এই মতাদর্শ কেবল মরীচিকার মতো প্রতিভাত হয়—এর প্রকৃত প্রভাব কী, তা আসলে কাকে উপকৃত বা ক্ষতিগ্রস্ত করে, কিংবা রাষ্ট্র কী হারায় বা অর্জন করে, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা মেলে না। তবে ইতিহাসের নিরিখে এক বিষয় অনস্বীকার্য—এই ঘটনাগুলো কালের স্রোতে হারিয়ে যায় না, বরং সময়ের পরিক্রমায় ইতিহাসের অঙ্গীভূত হয়।
ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির উত্থানপর্ব চলছিলো অনেকদিন থেকেই। যার স্ফুলিঙ্গ দেখা যায় ১৯৬৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়িতে। নকশালবাড়ি আন্দোলনের ঝাপটা এসে লাগে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনেও। আর সে সময় সিরাজ সিকদার নামক তরুণের হাত ধরে শুরু হয় পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন। যারা পূর্ব বাংলা স্বাধীন করার কথা ভাবে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে।
সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের রাজনীতি এক আলোচিত নাম। বুয়েট পড়ুয়া মেধাবী তরুণ। যুক্ত ছিলেন বাম ঘড়নার রাজনীতির সাথে। নকশাল বাড়ির ঝাপ্টা আর পাকিস্তানের উপনিবেশিক আচরণে এ দেশে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের উৎখাত করার কথা ভাবেন। তাদের আদর্শ ছিলো মাও সে তুং। চীনা বিপ্লব তাদের উৎবুদ্ধ করেছিলো ভীষণভাবে।
আস্তে আস্তে পার্টির পরিসর বাড়তে থাকে। তার দলে ভিড়তে থাকে তরুণেরা যাদের প্রায় সবাই উচ্চ শিক্ষিত। কেউ বুয়েটে কেউ মেডিকেলে কিংবা খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। সারাদেশকে কয়েকটি সেক্টরে ভাগ করে গোপনে চলে তাদের কার্যক্রম। মূলত তাদের কার্যক্রম চালানোর উর্বরভূমি ছিলো বরিশাল। পাকিস্তান শাসনামলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বোমা হামলা চালিয়ে জানান দেয় নিজেদের অস্তিত্বের কথা।হৈচৈ ফেলে দেয়র তৎকালীন রাজনৈতিক অঙ্গনে।
মুক্তিযু্দ্ধ শুরু হলো তারাও যোগ দিলো। তবে আওয়ামীলীগকে তারা দেশের শত্রু মনে করতো। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ তারা ভারতে নিয়ে গেছে বলে দোষারোপ করতো। তারা ভাবতো একমাত্র সশস্ত্র বিপ্লবই দেশকে মুক্ত করতে পারে। তারা পাক আমলেই সর্বপ্রথম পতাকা তৈরী করে ফেলেন,যার ডিজাইনার ছিলেন সফিউল্লাহ্ আজমী। তারাই প্রথম প্রকাশ্যে স্বাধীনতার কথা বলেন। তারা শত্রু খমতের নামে আওয়ামীলীগের লোক হত্যা করে। তারাও ছেড়ে দেবার পাত্র না পাল্টা খুনখারাবি চলতে থাকে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে সিরাজ সিকদার ঢাকা ত্যাগ করে। চলে যান বরিশালে। বিস্তীর্ণ পেয়ারা বাগানে গঠন করেন জাতীয় মুক্তিবাহিনী। পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলে। শত্রু খতমের মিশনে নেমে পড়ে। তাদের বেশ কয়েকটি অভিযান সফল হয়। তেল জল যেমন মিশ খায়না তেমনি তারাও আওয়ামীলীগের সাথে মুক্তি আন্দোলনে এক কাতারে নামেনি। শত্রুতা তখনো চরমে।
দেশ যখন স্বাধীন হয়। ১৬ ডিসেম্বর পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তারা মনে করে দেশ পাকিস্তানের হাত থেকে এসে ভারতের হাতে পড়েছে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয় তারা মানতে পারেনি। স্বাধীনতার পরের বছরে ১৬ ডিসেম্বর হরতার ডেকে বোমা হামলা করে।দেশ স্বাধীনের পর তারা বিপ্লবের নামে খুনোখুনির মিশন শুরু করে। শত্রু খমতের নামে তাদের হাতে নিহত হয় অনেকে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ স্থিতিশীল ছিলো না। সর্বত্র অস্ত্রের ঝনঝনানি। জানা যায় ১৯৭২ সালের জানুয়ারী থেকে ১৯৭৩ সালের মে পর্যন্ত দেশে গুপ্তহত্যার শিকার হয় ৪ হাজার ৯২৫ জন।
ইতোমধ্যে পার্টির নাম পাল্টে যায়। পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন থেকে পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি। [৩রা জুন ১৯৭১]সর্বহারা পার্টি চট্টগ্রাম বরিশাল ময়মনসিংহ সহ উত্তরাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি জানান দেয়। বিপ্লবের জন্য শুরু হয় থানায় হামলা। অস্ত্র লুট। তাতে মারা পরে বিপ্লবী পুলিশ উভয়ই। অর্থের জন্য শুরু হয় ব্যাংক ডাকাতি। সিরাজ সিকদারের পার্টি সর্বত্র আলোচনায়। পত্রিকার বড় বড় শিরোনাম। অপরদিকে তার পার্টির পরিচয় ব্যবহার করে হত্যা ডাকাতিতে সরকারী দলের লোকেরাও মেতে উঠে।
কমিউনিস্টদের মধ্যে বেশ কয়েকটি লাইন থাকলেও তারা নিজেদের সঠিক লাইন মনে করতো। জাসদকে ভাবতো অন্যতম শত্রু হিসেবে।পার্টির কাজ চলতো অতি গোপনে। প্রকাশ্য কার্যক্রম হতো খুব কম। বাহির থেকে তাদের জানার সুযোগও ছিলো কম। অনেকেই তাদের প্রতি সহানূভুতিশীল ছিলো। বিপ্লবের নেশায় দলে দলে তরুণেরা সর্বহারা পার্টিতে ভীড়ে। পার্টির অভ্যান্তরীণ দ্বন্দ কিংবা শৃঙ্খলাভঙ্গের নামে নিজ দলের কর্মীদের খতমেও পিছ পা হতো না তারা। এ ক্ষেত্রে ঢাবির বাংলার লেকচারার হুমায়ুম কবির হত্যাকান্ড অন্যতম।
সিরাজ সিকদার কারো চোখে বিপ্লবী কারো চোখে সন্ত্রাসী। পার্টির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে উঠেন তিনি। সরকারের কাছে মোস্ট ওয়াটেন্ট অপরাধী। তাকে গ্রেফতারে চলে জোরেশোরে তোড়জোড়। অবশেষে চট্টগ্রামে পুলিশের জালে ধরা পড়েন তিনি। কয়েকজনের বর্ণনায় জানা যায় বিমানযোগে ঢাকায় এনে হাজির করা হয় বঙ্গভবনে। শেখ মুজিবের সামনে হাজির করা হয় তাকে, চলেবাদানুবাদ।তারপর রক্ষীবাহিনীর কাছে করা হয় হস্তান্তর। ভোররাতে অস্ত্র ও গোপন আস্তানা উদ্ধারের নামে ঢাকার সাভারে গুলিতে হত্যা করা হয়। খবরে আসে পালানোর সময় হত্যা। এটিই সম্ভবত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ক্রসফায়ার।এ নিয়ে তর্কবিতর্ক এখনো চলছে।
সিরাজ সিকদারের মৃত্যুর পর পার্টি আর মাথা তুলে দাড়াতে পারেনি। নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। অনেকে ধরা পড়ে জেল খাটে। তাদের কেউ কালো জীবন ��েকে বেড়িয়ে আসে প্রকাশ্যে। এভাবেই সর্বহারা পার্টির যবনিকাপাত ঘটে। কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা পার্টি আলোচিত এক নাম। যাদের নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই।কিন্তু হ্যামিলিয়নের বাঁশিওয়ালার মতো সিরাজ সিকদার সে সময়ের শিক্ষিত তরুণের মনোজাগতে দারুণভাবে জায়গা করে নেয়।
ব্যক্তি জীবনে বিপ্লবকে ধারণ করতেন খুব তিব্রভাবে। বুয়েটে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে হতে পারতেন অধ্যাপক কিংবা বড় প্রকৌশলী। কিন্তু বিপ্লবের নেশায় বুদ হয়ে হয়ে গেলেন বিপ্লবী। প্রাণটাও বধ হলো। হয়তো তাদের পথ ছিলো ভুল। পুরো বইয়ে তাদের পার্টির কার্যক্রম পড়লেই ভুলগুলো পাঠকের চোখে ভেসে আসার কথা।
প্রায় সাড়ে চারশ পৃষ্টার বইয়ে অর্ধেক অংশ পার্টি কার্যক্রম ও সিরাজ সিকদারকে নিয়ে। বাকি অর্ধেক সর্বহারা পার্টিতে যুক্ত থাকা নানাজনের সাক্ষাৎকার। সবমিলিয়ে "লালসন্ত্রাস " সর্বহারা রাজনীতি আর সিরাজ সিকদার সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা দিতে পেরেছে। পাঠক হিসেবে বাকি বিবেচনা আমাদেরই।
বই শুরু হয়েছিলো জীবনের জয়গান, বিপ্লব আর নতুন সূৃর্যোদয়ের আশা নিয়ে আর শেষ হলো মৃত্যুর মিছিল দিয়ে। শেষ করবো এ বইয়ে বারংবার পাওয়া সেই গানের লাইন দিয়ে.....
'মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।
বই: লাল সন্ত্রাস: সিরাজ সিকদার ও সর্বহারা রাজনীতি লেখক: মহিউদ্দিন আহমদ প্রকাশনা: বাতিঘর রেটিং: ৪.০/৫.০ পৃষ্ঠা: ৪২১
সিরাজ সিকদার নামটি হয়তো বাংলাদেশের বর্তমান জেনারেশন এর অনেকে শুনে নাই। আবার এই নামটি আমাদের জেনারেশন বা তার আগের জেনারেশন অনেকের কাছেই নায়কের নাম। বাস্তব জীবনের নায়ক। একজন বিদ্রোহী নেতা; মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন। চেয়েছিল সত্যিকার এর স্বাধীন বাংলাদেশ। ইতিহাস সবসময় জয়ী নায়কের বন্দনা করে। হয়তো সিরাজ সিকদার জিতলে আমরা চে গুয়েভারার টিশার্ট না পড়ে সিরাজ সিকদার এর টি শার্ট পড়ে ফেসবুকে ছবি আপলোড দিতাম।
লাল সন্ত্রাস বইটি মূলত সিরাজ সিকদার ও উনার সর্বহারা পার্টি কে নিয়ে তথ্য উপাত্ত ভিত্তিক একটি পূর্নাঙ্গ বই বলা চলে। যারা এই সর্বহারা পার্টির সাফল্য ব্যর্থতা সম্পর্কে, উনাদের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান বা নথিপত্র চান তাদের জন্য অবশ্যই পাঠ্য একটি বই। তবে রাজনৈতিক ভাবে অনভিজ্ঞ লোকজন এই বই পড়তে যাবেন না তাহলে আপনার বই পড়ার পর বইয়ের নায়ক সিরাজ সিকদার কে খলনায়কও মনে হতে পারে। এই সাবধান বাণী দেবার কারন বর্তমান জেনারেশন খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত চলে যায় সামান্য জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে।
বইটি মূলত দুই ভাগে লেখা।প্রথম ভাগে সরাসরি তথ্য উপাত্ত আর দ্বিতীয় পর্ব আছে বিভিন্ন সর্বহারা পার্টি নেতাদের সাক্ষাৎকার। আপনি বিভিন্ন সময় একই ঘটনার সম্পূর্ণ বিপরীত তথ্য পেতে পারেন দুজনের বক্তব্যে। তাই কিছু কিছু জায়গায় আপনি ১০০% নিশ্চিত তথ্য পাবেন না। কারণ অনেকে নিজ স্বার্থে তথ্য গোপন বা বিকৃতি করতেই পারে। তাই একটু বিচক্ষণতার সাথে বইটি পড়তে হবে। প্রথম পর্বে মাঝে মাঝে একঘেয়েমি লাগতে পারে কারণ অনেক তথ্য বারবার এসেছে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে। এটি গবেষণা প্রবন্ধে হয়ে থাকে কিন্তু দ্বিতীয় পর্ব টি অনেক বেশি উত্তেজনায় পূর্ন।
পুরো বইটি পড়ে আমার মাথায় শুধু একটি চিন্তা ঘুরেছি বিপ্লবী হওয়া মুখের কথা না। অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। এখানে এতো বিপ্লবীর পরিচয় আছে যারা চাইলে বিপ্লব বাদ দিয়ে নিজ নিজ যোগ্যতায় অনেক আরামদায়ক জীবন উপভোগ করতে পারতো। কিন্তু তারা বনে জঙ্গলে পালিয়ে বিপ্লব করেছে শুধুমাত্র গণমানুষের মুক্তির দাবিতে। প্রতিটি মানুষের দোষ গুণ থাকে কিন্তু সিরাজ সিকদারও হয়তো এর উর্ধ্বে নয়। কিন্তু তার আরামদায়ক জীবন ফেলে গণমানুষের মুক্তির জন্য যে দেশপ্রেম ওটা অনেক বেশি নিখাদ ছিল। এই মানুষটিকে বাংলাদেশ এর ইতিহাসে আরো ভালভাবে স্মরন করা উচিত।
সবার শেষে লাল সন্ত্রাস সিরাজ সিকদার কে লাল সালাম। #ধূসরকল্পনা
আমি ইতিহাস আর রাজনীতি এই দুই বিষয়েই নিজের এই ছোট্ট জীবনে খুবই উদাসীন ছিলাম। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম আর মুভির পাশে বইও যে একটা জিনিস যা আমার আগ্রহ এত বাড়াতে পারে, সেটা আবিষ্কার করলাম। তখন থেকেই ইতিহাস আর রাজনীতি এসবেও আগ্রহ বারে, জানার আগ্রহ। সিরাজ সিকদার আর সর্বহারা দলের নাম নানান বন্ধুর মুখেই কমবেশি শুনেছি। বছর খানিক আগে তার একটা লেখাও পড়া হয়েছিল। যথেষ্ট আগ্রহ সৃষ্টি করতে পেরেছিল লোকটা। সেই থেকেই এই বইটা সংগ্রহতে রাখা। তবে কখনো সময় করে পড়া শুরু করিনি। এরপর দেশে আন্দোলন হলো। সরকারের পতন হলো। দেখলাম আমার মতই অনেকে ইতিহাস আর রাজনীতির প্রতি নতুন করে আগ্রহ খুঁজে পাচ্ছে। লিস্ট তৈরি হয়ে যাচ্ছে বইয়ের। সেরকম সব কয়টি লিস্টেই কমবেশি এই বইটার নাম দেখে একদিন বসে গেলাম বইটা নিয়ে। শুরু হল আমার একটা প্রিয় গান দিয়ে, "মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রান হল বলিদান লেখা আছে অশ্রুজলে।" একসময় এই গানের তালেই কতই না রক্ত গরম দেশপ্রেমিক যুবক বিপ্লবের নেশায় রাজপথে হেঁটেছে। মনে প্রশ্ন জাগে, কারো কি স্বপ্ন পুরন হল? এত এত তাজা রক্তের উপর নেতারা তাদের রাজনীতি করলো আর তারা দাবার গুটির মত খেলার মুহূর্ত খানিকের অতিথি হলো। তবুও দেশপ্রেমিকেরা এখনো দেশের জন্য কাদে। চোখ দিয়ে তাদের রক্ত পড়ছে। এবার কি স্বপ্ন পুরন হলো?
বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস লেখা হয়তো মানুষ দ্বারা বাস্তবিক অর্থেই সম্ভব না। তবুও মহিউদ্দিন আহমেদ তার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেছেন লেখাকে বস্তুনিষ্ঠ করতে। তার লেখার গুনাবলিই এমন। অনেকগুলো সোর্স থেকে ইতিহাস টেনে এনে মুখোমুখি বসিয়ে দেন। আবার সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বস্তুনিষ্ঠ যান্ত্রিকতা ছাড়িয়ে মানব স্পর্শও রেখেছেন। তাই ব্যক্তি সিরাজ সিকদার কেমন ছিলেন, তার আদর্শ কেমন ছিল, তার কর্ম আর পরিনতি সবই কয়েকটি দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখিয়েছেন।
লাল সন্ত্রাস বইটি সিরাজ সিকদার ও তার নিজ হাতে গড়া গোপন বিপ্লবী দল পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টিকে নিয়ে লেখা। সিরাজ সিকদার বিশ্বাস করতেন যে, গনতন্ত্রের/পুজিবাদের মাধ্যমে কখনো সাধারণ মানুষের মুক্তি আসবে না। সাধারণ মানুষের মুক্তির একমাত্র পথ হচ্ছে সমাজতন্ত্র। এবং সেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে তিনি চীনের মাও সেতুং কে অনুসরণ করতেন। তার কার্যক্রমের সাথে পশ্চিমবঙ্গের নকশালদের কার্যক্রমের মিল ছিলো।
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার বইটিকে দুইটি অংশে ভাগ করেছেন। প্রথম অংশে লেখক নিজের ভাষায় সর্বহারা পার্টির ইতিহাস বর্ণনা করেছেন। দ্বিতীয় অংশে লেখক পার্টির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন ব্যাক্তির সাক্ষাৎকার তুলে দিয়েছেন। সেই ব্যাক্তিরা কেউ পার্টির পক্ষে বলেছেন কেউ বিপক্ষে বলেছেন। বাংলাদেশের কিছু বিখ্যাত ব্যাক্তি যে অতীতে সর্বহারা পার্টির সাথে জড়িত ছিলো তা এই বই পড়ে জানা যায়।
সিরাজ সিকদার বাংলাদেশের ইতিহাসের একজন বিচিত্র চরিত্র ১৯৬৮ সালে পূর্ব বাংলা শ্রমিক আন্দোলন নামের সংগঠন গড়ে তোলার মাধ্যমে তিনি তার কার্যক্রম শুরু করেন যা পরবর্তীতে পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি নাম ধারণ করে। তিনি ১৯৭৫ সালের শুরু দিকে মারা যান। তার মৃত্যু নিয়েও আবার অনেক কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। এই অল্প সময়ের মধ্যে তিনি দেশের বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হন।
কেউ বলে বিপ্লবী , কেউ বলে ডাকাত।
তার পরিচয় দেওয়ার জন্য এই উক্তিটিই বোধহয় সবচেয়ে উপযুক্ত।
বইটা পড়ে মাত্রই শেষ করলাম। সত্যি কথা বলতে বইটা পড়ে সিরাজ শিকদারকে আমার একজন প্রচন্ড মেধাবী কিন্তু মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ লোক মনে হয়েছে। তিনি নিজের নেতৃত্বের গুন দিয়ে দেশের কিছু তরুণদের মাঝে একটি ক্রেজ তৈরী করতে পেরেছিলেন। কিন্তু সেটা শুধু ‘ক্রেজই ছিল কোনো আদর্শ ছিল না। যার কারণে সিরাজ শিকদার খুন হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে দলটাও বিনাশ হয়ে গেছে।
ক্ষমতা খুব খারাপ জিনিস। একক ক্ষমতা মানুষকে স্বৈরাচারি ও শোষণকারী করে তুলে। সিরাজ শিকদার নিজে যে শোষণের দেয়াল ভাঙ্গতে চেয়েছেন, দলের মধ্যে তিনি নিজেই সেই শোষণকারী হয়ে উঠেছিলেন। সবার জন্য এক আইন আর সিরাজ শিকদারের জন্য ভিন্ন আইনৎ; এগুলো আদর্শ না ভাওতাবাজি। আর এক ভাওতাবাজি হলো, নিজের বাড়ির কাজের লোককে বিয়ে করা। সাদা চোখে মনে হয় সিরাজ শিকদার বিরাট কাজ করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তিনি এই বিয়েটা করে তিনি একটা গরীব মেয়েকে নদী থেকে উদ্ধার করে সাগরে ফেলে দিয়েছেন। সেই বিয়েটা টেকেনি; আর টেকার কথাও না। পরবর্তীতে দেখা যায় সিরাজ শিকদার একজন নারী লোভী লম্পট! যারা সিরাজ শিকদারের ফ্যানবয়রা মেনে নিতে পেরেছে কিনা আমি জানি না। তবে এমন হওয়াই স্বাভাবিক।
পরিশেষে বলব, লেখক নিজেও সিরাজ শিকদারের একজন ফ্যানবয় হওয়ার পরও যেভাবে সত্যগুলোকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে। একইসাথে সিরাজের সহযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার তুলে ধরে বইটা আরও সমৃদ্ধ হয়েছে এবং বইটার গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে আমি মনে করি।
লেখকের লেখার স্টাইল বরাবরের মতই দারুন। নন ফিকশন লেখেন গল্পের মত।পড়তে দারুন লাগে।তবে এই বইটার কন্টেন্ট নট আপ টু দ্যা মার্ক। সিরাজ সিকদার সম্পর্কে খুব বেশি ইনফো নাই। সর্বহারা পার্টির এক্টিভেটিস বিশেষ করে তারা যে সব সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালিত করতো সেগুলোর বিশদভাবে লিখেন নাই লেখক। সিরাজ সিকদারকে ধরার পরে তৎকালীন সরকারের উচ্চ মহলের মানুষ এবং পুলিশ,রক্ষীবাহিনীর কর্তারা যেহেতু হাফ ছেড়ে বেচেছেন,সেই হিসাবে সর্বহারা পার্টি এবং সিরাজ সিকদার খুবই দুর্ধর্ষ ও ভয়ংকর সন্ত্রাসী তা বুঝা গেছে।কিন্তু বই এ তার প্রতিফলন ঠিকভাবে হয়নি। আবার সিরাজ সিকদারকে ক্রসফায়ারে মারার পরে বংগবন্ধু ও খালেদ মোশাররফের দুঃখ প্রকাশের পেছনের কাহিনিও ক্লিয়ার না। বইটা পড়ে মনে হইছে যে সিরাজ সিকদার নিজ দলের কর্মীদেরই বেশি শাস্তি দিতে আগ্রহী ছিলেন।"লাল সন্ত্রাস" নাম দেয়ার কোনো মাহাত্ম্য খুঁজে পেলাম না। বইয়ে পাওয়া বেশিরভাগ তথ্যই দৈনিক পত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্যের মত। লেখককে ধন্যবাদ যে এত বছর পরে সিরাজ সিকদার এবং সর্বহারা পার্টির ব্যাপারে বর্তমান প্রজন্মকে এই বইয়ের মাধ্যমে পরিচয় করে দেয়ার জন্য।
একটা বিপ্লবী রাজনৈতিক দল যার কেন্দ্রীয় সদস্যরাই জানতো না দলের অনেক সদস্যের পরিচয়, আবার অনেক সদস্যই জানতো না কেন্দ্রীয় সদস্যদের আসল নাম পরিচয়, তেমন একটা দলের ইতিহাস রচনা একটি নিতান্তই দুরূহ কাজ। এই দুরূহ কাজ করার জন্য লেখক অবশ্যই ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আরো দারুন হতো, অর্থাৎ সময়কাল বজায় রাখলে। কখনো আগাচ্ছে কখনো পেছাচ্ছে, তারপর একেকজনের দুই তিনটা করে ছদ্মনাম, এত কিছু মাথায় রাখা অনেক প্রেশার হয়ে গেছে।
সিরাজ সিকদার এর মনস্তাত্ত্ব টা বোঝা হল না, আসলে বোঝা সম্ভব না এখন আর কারো পক্ষেই। সিকদার সম্পর্কে এর আগের পড়াশুনা নিতান্তই বিক্ষিপ্ত মানের ছিল। এবার মোটামুটি একটা গোছানো ধারণা পেলাম।
সত্তর আশির দশক বাংলাদেশের রাজনীতির এক অদ্ভুৎ অধ্যায়। এসময় যেন খুলে গিয়েছিল কোন প্যান্ডোরা বক্স। এসময়টা সম্পর্কে একটা পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে পেতে বোধহয় দাঁত সব পড়ে যাবে মনে হয়। লেখককে ধন্যবাদ অনেক কিছু জানার আগ্রহ সৃষ্টি করার জন্য।