মোঘল সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লীর মসনদ দখলের লড়াইয়ে মেতে ওঠে তার তিন পুত্র। দুই ভাইয়ের কাছে যুদ্ধে হেরে পলায়নরত স্বঘোষিত সম্রাট শাহ সুজা আরাকান রাজের আশ্রয়ে অতিথী হলে, লোভী আরাকান রাজ রাতের আঁধারে হামলা চালায় তার বাসভবনে। কিন্তু সম্রাট সুজার সাথে থাকা মোঘল সম্পদের বিরাট ভান্ডার দখলের আগেই সম্রাট সুজার একান্ত কাছের মানুষ সেটা নিয়ে রওনা দেয় বাঙাল মুল্লুকের উদ্দেশ্যে। তাকে ধাওয়া করতে আরাকান রাজের নির্দেশে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের নিয়ে গঠন করা হয় বিরাট বাহিনী। বিপরীতে চট্টগ্রাম থেকে এই বিরাট বাহিনী প্রতিহত করে সুজার একান্তু কাছের মানুষকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হয় মোঘল নৌবাহিনীর প্রাক্তন কাপ্তান চট্টগ্রামের তালেব কিরানকে।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা রোডে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে এক ব্যাক্তি। মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে দেশে-বিদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক মহল। ঘোলাটে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম পাঠানো হয় সদ্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং শেষ করে দেশে আসা পিবিআই এর স্পেশাল ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে। কিন্তু চট্টগ্রামে পৌছে পরিস্থিতি সামলানো তো দূরে থাক বরং একের পর এক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে সে। একদিকে অথরিটির চাপ, অন্যদিকে অচেনা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সেইসাথে নিজের আত্মসম্মাবোধ, সবমিলিয়ে শারিয়ারকে সামলাতে হবে এমন এক পরিস্থিতি যেখানে বিবেকের চাইতে অনেক ওপরে স্থান দিতে হবে বিবেচনাবোধ আর সাহসকে। বাধ্য হয়ে অথরিটির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে কাজে নামতে হয় নিজের টিম নিয়ে। ঘটনার পরিক্রমায় সে জানতে পারে ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ের সংযোগ আছে এই ঘটনার যা আজ বিলীন প্রায়। শারিয়ার আর তার দল কি পারবে ইতিহাসের অতল থেকে সেই হারানো অধ্যায় খুঁড়ে বের করতে ...?
২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধার মতো ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস ও শব্দজালের মতো সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার দিয়ে বাংলাদেশ ও কোলকাতায় পাঠক প্রিয়তা অর্জন করা লেখক রবিন জামান খানের উপন্যাস মগরাজ- যেখানে ইতিহাসের হারানো অংশ থেকে তুলে আনা হয়েছে হারানো এক অধ্যায়।
রবিন জামান খান একজন বাংলাদেশি কথাসাহিত্যিক । রবিন জামান খানের জন্ম ময়মনসিংহ শহরে, পৈত্রিক নিবাস নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে পড়ালেখা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষাতত্বে দ্বিতীয় মাস্টার্স সম্পন্ন করেন তিনি। পড়া-পড়ানো, শেখা-শেখানোর চর্চা থেকেই শিক্ষকতাকে পেশা ও লেখালেখিকে নেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ইতিমধ্যেই বিভিন্ন সংকলনে বেশকিছু মৌলিক ও অনুবাদ গল্প লেখার পাশাপাশি লিখেছেন একাধিক টিভি নাটক। তার মৌলিক থৃলার উপন্যাস শব্দজাল, ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা, ফোরটি এইট আওয়ার্স, দিন শেষে, আরোহী ও অন্ধ প্রহর ইতিমধ্যেই অর্জন করেছে বিপুল পাঠক প্রিয়তা। বাংলাদেশের পাশাপাশি কলকাতা থেকে প্রকাশিত তার মৌলিক গ্রন্থ ২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু ও শব্দজাল পশ্চিম বঙ্গের পাঠক মহলে ভালোবাসা কুড়িয়েছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসের রহস্যময় ঘটনাবলী, সেইসাথে মানব মনের জটিল মনস্তত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহ থেকে উনি বর্তমানে কাজ করে চলেছেন একাধিক ইতিহাস নির্ভর ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস নিয়ে। এরই প্রেক্ষিতে খুব শিঘ্রই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে তার মৌলিক থ্রিলার উপন্যাস বিখন্ডিত, রাজদ্রোহী, ধূম্রজাল, সিপাহী, অশ্বারোহী, মুক্তি। রবিন জামান খান ঢাকায় প্রথম সারির একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবষেণা করছেন তিনি।
সাধারণত বেশিদিন একটা বইয়ের অপেক্ষায় থাকলে সেটা পরে পড়তে নিলে খুব পানসে লাগে। মগরাজের ব্যাপারে সেরকম আশংকা ছিল। পড়া শুরু করার পর ভুল ভাঙতে শুরু করে, আর শেষ করে ভেবে দেখলাম এত বড় একটা বইয়ের কোন পাতাই পানসে ছিলনা।
১৬৬০ এ সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার খবর পেয়ে সিংহাসন দখলের চেষ্টায় সব হারান তার পুত্র শাহ সুজা। পালিয়ে বেড়াতে গিয়ে বিশ্বাসঘাতকতার স্বীকার হন তার সাথে থাকা বিপুল পরিমাণ মুঘল ধন-সম্পদের কারণে। পিছনে লাগে আরাকানের মগ আর পর্তুগীজ জলদস্যু। অনেক যুদ্ধ-বিগ্রহ, কৌশলের মধ্য দিয়ে সেই সম্পদকে বাংলার মানুষের জন্য রক্ষা করতে গিয়ে একটা রহস্যঘেরা একটা ইতিহাস তৈরি করে তালেব তৈমুর আর বাকিরা মিলে। আর বর্তমানে একটা সাধারণ রোড এক্সিডেন্টের ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে বাধ্য হয়েই সেই ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে পরে শারিয়ার আর বাকিরা, সাথে যোগ হয় আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত অপরাধী চক্র। প্রথম থেকে বইটা টেনে ধরে রাখে। ১৬৬০ আর বর্তমান কোনটাই কম না সাসপেন্স, আতঙ্ক, ক্ষোভ, দুঃখ, থ্রিল কোন দিক দিয়ে। দুই সময়ের দুই গল্পের বিন্যাস অনেক সুন্দর ভাবে খাপে খাপে মেলানো। প্রথম থেকে ২০০/২৫০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত সমস্ত ঘটনায় বইয়ের মূল চরিত্রগুলোকে সময় নিয়ে পরিচয় করানোর ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। প্রতিটা চরিত্রের অতীত, বর্তমান সব জানা- গোলন্দাজ, গোমেজ, বৈঠা, পদ্ম - এখনকার সব পদ্মরাও যদি ঠিক এরকম পদ্ম হতে পারতো.... এরপর একের পর এক রণকৌশল, উপস্থিত বুদ্ধি সবকিছুই দারুণ। আরেকদিকে বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য শারিয়ার, ভুবন সহ বাকি সবার সাহস, প্রযুক্তির ব্যবহার, চক্রান্তের ভিতরেও আরো চক্রান্ত ভেদ করার বর্ণনা। পুরো বইটাই দারুণ।
বইয়ের কিছু নেগেটিভ দিক আমার মতেঃ প্রথম দিকে ৩/৪ জায়গায় বাক্য অনেক বড় ছিল। কয়েকবার করে পড়ে অর্থ বোঝা লেগেছে। বেশ কয়েকটা বড় ঘটনায় শারিয়ার আর তানভীর এর নামের অদল বদল হয়ে যাওয়াটা অনেক বেশি চোখে লেগেছে। আরো কয়েক জায়গায় এরকম ঈগল<=>চিল, শারিয়ার <=> কিরান এর অদলবদল হয়েছে। আর বানান আর প্রিন্টিং এর ও অনেক ভুল চোখে পড়েছে।
আর যদি শুধু কাহিনী বিবেচনা করি এটা নিঃসন্দেহে অসাধারণ একটা বই। এই সিরিজের আগের বইগুলো পড়ে এটাও ভালো হবে আশা ছিল। তারপরেও বাংলাদেশের ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে এত সুন্দর থ্রিলার উপন্যাস কয়েক বছর আগেও কেউ বললে আমি বিশ্বাস করতাম না।
"শূন্য থেইকা আসে মানুষ, শূন্যে মিলাই যায়, নাওয়ের মাঝি হাল ধইরাছে, খবর কে-বা পায়।"— মগরাজ, রবিন জামান খান - মগরাজ - সম্রাট শাহজাহানের শাসনকালের শেষ পর্যায়ে দিল্লীর মসনদে শুরু হয় টালমাটাল অবস্থা। তার তিন পুত্র দারা সুকো, শাহ সুজা আর আওরঙ্গজেব নিজেদের ভেতর শুরু করে ক্ষমতা দখলের লড়াই। এ লড়াইতে ঘটনাক্রমে জড়িয়ে পড়েন চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী তালেব তৈমুর। সম্রাট শাহজাহানের এক পুত্র বিশেষ কিছু সম্পদ তার কাছে গচ্ছিত রাখেন যার পিছনে পরে যায় মোগল দরবার, আরাকান রাজ্যের লোকজন থেকে শুরু করে পর্তুগিজ জলদস্যুরা ।
তালেব কিরান, একসময়ের তুখোড় জাহাজী তথা কাপ্তান, এখন খন্ডালের মাঠে নানা ধরণের কর্মকান্ড পরিচালনা করে। হঠাৎ এই কাজ করতে গিয়ে সে এমন এক অবস্থায় পরে যার কারণে তাকে আবারো জাহাজ পরিচালনার কাজে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এই কাজের জন্য দরকার পরে তার আগের সঙ্গী-সাথীদের। তাই তালেব কিরান নেমে পড়ে তার পূর্বের জাহাজ পরিচালনার সঙ্গীদের একত্র করার কাজে। - বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামে ঘটে যায় এক অনাকাঙ্খিত দুর্ঘটনা, গাড়ি চাপায় মারা যান এক লোক। লোকাল অথোরিটি সেই লোকের ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শুরু করলে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। তাই সেই কেস চলে যায় পিবিআই এর কাছে, আর কেসের দায়িত্ব দেয়া হয় পিবিআই এর বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত অফিসার শারহান শারিয়ার কে।
কেসের দায়িত্বশীল অফিসার হিসেবে শারিয়ার চট্টগ্রামে এসেই পরে যায় একের পরে এক ফ্যাসাদে। একদিকে চেষ্টা চালানো হয় তাকে অপহরণের, সেই সাথে এই কেসে যুক্ত হতে থাকে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা। এর ফলে কেসের তদন্ত শুরু করার আগেই এই কেস থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ার মতো অবস্থা তৈরী হয়ে যায়। - এখন সম্রাট শাহজাহানের সেই পুত্র আসলে কি মূল্যবান সম্পদ তালেব তৈমুরের হাতে সপে দিয়েছেন? তালেব কিরান এবং তার দলবল কিভাবে এই সম্পদ রক্ষার অংশ হয়ে যায়? কয়েক শতাব্দী প্রাচীন এই ঘটনাগুলোর সাথে চট্টগ্রামের বর্তমান ঘটনাগুলোর কি সম্পর্ক? বিশেষ ট্রেনিং প্রাপ্ত অফিসার শারিয়ার কি পারবে অতীত এবং বর্তমানের মিশেলে ধোয়াঁশায় ঘিরে থাকা রহস্যগুলোর সমাধান করতে? বার বার কারা এই কেসে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাওয়া যাবে লেখক রবিন জামান খান- এর বৃহৎ পরিসরের হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার ঘরানার উপন্যাস "মগরাজ"- এ। - মগরাজ ৫৬০ পেইজের বিশাল কলেবরের ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার উপন্যাস। এটি মূলত লেখকের নিজস্ব এক ইতিহাস আশ্রিত - ইউনিভার্সের তৃতীয় বই। তাই আমার পরামর্শ থাকবে এই বইটি পড়ার আগে এই সিরিজের আগের দুইটি বই "সপ্তরিপু" এবং "ব্ল্যাক বুদ্ধা" বইদুটো পড়ে নেয়ার জন্য। মগরাজ বইয়ের মূল প্রেক্ষাপট দুই টাইমলাইন ধরে শুরু হয়েছে এবং সেভাবেই এগিয়ে গিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপট দুইটির একটি হচ্ছে মোগল আমলের সময়কাল আরেকটি হচ্ছে বর্তমান সময়ের চট্টগ্রাম অঞ্চল। অনেকটা সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলে শেষদিকের এক অধ্যায়ে এসে চমৎকারভাবে মিলে গিয়েছে এই দুই টাইমলাইন এর কাহিনি। - মগরাজ বইয়ের স্টোরিটেলিং এর দিকে নজর দিলে দেখা যায় লেখক বইটিকে দুইটি মূল ভাগে ভাগ করেছেন। এই বইয়ের প্রারম্ভের অংশের নাম অশ্রুপতন এবং শেষ অংশের নাম শূন্য জীবন। বইয়ের প্রারম্ভ অংশে আমরা মূলত বইয়ের প্রায় সবগুলো প্রধান চরিত্রের সাথে পরিচিত হই এবং অন্তিম অংশে আমরা জানতে পারি গল্পটিতে তাদের পরিণতি। অশ্রুপতন অংশে কাহিনির বিল্ডাপের কারনে গল্প বেশ ধীরগতিতে আগালেও শূন্য জীবন পর্বের শেষদিকে ব্যাপারটি পুষিয়ে দেয়া হয়। - মগরাজ বইটির বর্তমান কালের কাহিনি প্রবাহের সাথে এই ইউনিভার্সের আগের দুইটি বইয়ের বর্তমান কালের কাহিনি প্রবাহের বেশ মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে সপ্তরিপুতে ময়মনসিংহ এবং ব্ল্যাক বুদ্ধাতে সিলেটের নানা জায়গার মতোই এবারে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অ্যাডভেঞ্চার বেশ উপভোগ্য ছিলো বরাবরের মতোই। সেদিক থেকে মগরাজ বইয়ের অতীত পর্বের বর্ণনায় মগ এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের বর্ণনা, সে আমলের অস্ত্রশস্ত্র এবং নৌপথে যুদ্ধের কৌশল ব্যাপারগুলো ইউনিক লাগলো। বইটির অতীত অংশে লেখক তখনকার আমলের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থা যেভাবে বর্ণনা করেছেন তাতে বোঝা যায় বেশ ভালোভাবে রিসার্চ করে তিনি বইটিতে সে সময়কালের বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন। এছাড়াও তখনকার সময়ের সন্দীপ অঞ্চলের বর্ণনা আমার বিশেষভাবে ভালো লাগলো। মগরাজ বইটির অতীত অংশের এ ধরণের ডিটেইল্ড বর্ণনার কারণে লেখকের অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্য। সবমিলিয়ে তাই বইটির অতীত সময়ের অংশটিই বর্তমান সময়ের চেয়ে বেশি উপভোগ করেছি। - ৫৬০ পেইজে�� বিশাল বইয়ের কারনে মগরাজ বইতে চরিত্রের সংখ্যাও মোটামুটি ভালোই। এই বইতে অতীত কালের প্রধান চরিত্র হিসেবে ছিল জাহাজী তালেব কিরান আর বর্তমান সময়ের প্রধান চরিত্র হিসেবে ছিল পিবিআই এর স্পেশাল এজেন্ট শারহান শারিয়ার। এছাড়াও বইটিতে প্রচুর পার্শ্ব চরিত্র এসেছে যার ভিতরে অতীত পর্বে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে গোমেজ, সিলভেরা, বৈঠা, বেদু, গোলন্দাজ রঙ্গন, পট্টবর্ধন, পদ্মরানী এবং তালেব তৈমুর। অতীত পর্বের এই পার্শ্ব চরিত্রের ভিতরে কামাঞ্চি রঙ্গন, তালেব তৈমুর এবং সিলভেরাকে সবথেকে ইন্টারেস্টিং লেগেছে। কিন্তু এই পর্ব তথা বইয়ের সবচেয়ে দারুণ চরিত্র চিত্রণ মনে হয়েছে তালেব কিরান এর। একসময়ের জাহাজী, তারপরে সব হারানো এক জুয়াড়ী, তারপরে আগের আগের পেশায় ফিরে যাওয়া পর্যন্ত প্রতিটি সময়েই দারুনভাবে অনুভব করতে পেরেছি কিরান চরিত্রটিকে। তাই লেখক খুবই যত্নের সাথে তালেব কিরান চরিত্রটি চিত্রণ করেছেন, তা পাঠক হিসেবে বলাই যায় । তবে কয়েক জায়গায় অতীতকালের চরিত্র তাদের চরিত্রের বাইরে গিয়ে আঞ্চলিক ভাষার পরিবর্তে বর্তমান সময়ের চরিত্রের মতো প্রমিত উচ্চারণে কথা বলেছে, যা ঠিকভাবে সম্পাদনা করা হলে আরো কমানো যেতে পারতো।
এদিকে বর্তমান কালের পার্শ্ব চরিত্রের ভিতরে ভুবন, সুমন, ড. শশী, রুম্পা তালুকদার, হুয়ান যেমন ছিল তেমনি আগের বইয়ের পিবিআই এর পরিচিত কিছু অফিসারকে এই বইতে পাওয়া গিয়েছে। তার ভিতরে নতুন চরিত্রে হিসেবে হিসেবে ভুবনকে ভালো লাগলো। এই পর্বের প্রধান চরিত্র হিসেবে পিবিআই এর স্পেশাল ফিল্ড এজেন্ট, রগচটা মেজাজের শারহান শারিয়ার মোটামুটি মানিয়ে গেলেও অতীত কালের কিরানের তুলনায় তাকে কিছুটা নিষ্প্রভ লেগেছে বেশিরভাগ সময়। এখন পর্যন্ত এই ইউনিভার্সের সেরা পিবিআই এজেন্ট হিসেবে শারিয়ারের চেয়ে ব্ল্যাক বুদ্ধা এর প্রোটাগোনিস্ট তানভীরকেই এগিয়ে রাখবো আমি। - মগরাজ বইয়ের বর্ণনাভঙ্গি এর আগের দুই খন্ডের মতোই টার্ন এবং টুইস্ট দিয়ে ভরপুর, যার বেশিরভাগই পাওয়া যায় গল্পের শেষ অংশে এসে। তাই বেশ বিশাল কলেবরের প্লট এবং প্রথমদিকের কিছু জায়গায় অত্যধিক বর্ণনার জন্য মাঝে ঘটনাপ্রবাহ বেশ ঝিমিয়ে গিয়েছে। এ কারণে হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার বা বড় ধরণের উপন্যাস পড়ার অভ্যাস না থাকলে মাঝে গিয়ে অনেক পাঠক বিরক্ত হয়ে যেতে পারেন। কিন্তু গল্পটার শেষ ভাগ "শূন্য জীবন" শুরু হবার পরে গল্পে বেশ গতি আসে, অবশ্য এ পর্যন্ত আসতে আসতে বানান ভুল এবং টাইপিং মিস্টেকের কারনে আমার পড়ায় বেশ কয়েকবার বিঘ্ন ঘটেছে। তবে বইটির শেষদিকে মোটামুটি পয়সা উসুল টাইপের এক ফিনিশিং পাওয়ায় বানান ভুলের ব্যপারটা কিছুটা লাঘব হয়েছে। - বইয়ের নাম মগরাজ হওয়ায় এবং প্রচ্ছদে জাহাজের ছবি থাকায় নদীপথে যে রকমের একশন দৃশ্য আশা করেছিলাম তার পরিমাণ ছিল বেশ কমই, কিন্তু বাদবাকি অ্যাকশন সিকোয়েন্স কাহিনির প্রয়োজনে বেশ ভালো পরিমাণেই এসেছে। বইয়ের সংলাপের ব্যাপারে আমার খানিকটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। বইয়ের কিছু সংলাপ খুবই সাবলীল ছিল যা ভালো লেগেছে আবার কিছু সংলাপকে একেবারেই টিপিক্যাল এবং ক্লিশে মনে হয়েছে, এদিকটাতেও কিছু উন্নতি হয়তো করা যেতে পারতো। অবশ্য সেরা সংলাপগুলোর বেশিরভাগ অতীত কালের জন্য বরাদ্দ থাকলেও বর্তমান কালেও বেশ কিছু সংলাপ আর কয়েক জায়গায় হিউমারের প্রয়োগ ভালোই লাগলো। - মগরাজ বইয়ের সবথেকে নেগেটিভ সাইড আমার মনে হয়েছে বইটির সম্পাদনা এবং প্রুফ রিডিং। বইটি পড়ার সময়ে আমার মনে হচ্ছিলো যে সম্পাদনা কিংবা প্রুফ রিডিং বলে আসলেই কি কিছু হয়েছে নাকি এই বইতে। বইয়ের প্রায় প্রতিটি পার্ট- তা সংলাপই হোক কিংবা চরিত্রায়ণ, অনেক সময় কিছুটা হালকা হয়ে গেছে বইয়ের সম্পাদনাহীনতার কারণে, যার কারনে পড়তে গিয়ে বারবার মনোযোগ বিঘ্নিত হয়েছে। বলতে গেলে প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠাতেই ছিল বানান ভুল এবং প্রিন্টিং মিস্টেক এর ছড়াছড়ি। ব্যপারটা একবার-দুইবার চোখে পড়লে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে, কিন্তু একটা বইতে শত শত প্রিন্টিং মিস্টেক থাকলে তা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। প্রিন্টিং মিস্টেকের সাথে কখনো প্রয়োজনীয় যতিচিহ্নের অভাব, কোথাও একাধিক শব্দের একসাথে জোড়া লেগে যাওয়া আবার কোথাও বাক্যের মধ্যে শব্দ উধাও হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক সময় অনেক বাক্যই ঠিকভাবে পড়া যাচ্ছিলো না। এর সাথে গোদের উপর বিষফোঁড়া এর মতো রয়েছে চরিত্রের নাম অদল-বদলের মহামারি। কোন অধ্যায়ে শারিয়ারের নাম কখনো হয়ে যাচ্ছে তানভীর আবার কখনো হয়ে যাচ্ছে কিরান। কোন অধ্যায়ে কিরান আবার কখনো হয়ে যাচ্ছে শারিয়ার। এমনকি একটি অধ্যায়ে শারিয়ারকে তানভীর বলে সম্বোধন করা হয়েছে ৩০ বারের অধিক! একটা বইতে এতবার চরিত্রের নাম অদল-বদলের পরেও সেটা কিভাবে সম্পাদনা এবং প্রুফ রিড পার হয়ে প্রিন্টে গেল তা আমার কাছে অত্যাশ্চর্য ব্যাপার। এছাড়াও বড় করে হেডিং দিয়ে সে অধ্যায়ে সময়কাল ভুল দেয়াও অবাক লাগলো। সবমিলিয়ে এ ধরনের মুদ্রিত মূল্যের একটি বইয়ের সম্পাদনা এবং প্রুফ রিডের অবস্থা দেখে আমি বেশ অসন্তুষ্ট। সম্পাদনার কথা বাদ দিলে বইয়ের বাধাই, কাগজ নিয়ে আমার তেমন অসন্তোষ নেই। বইয়ের প্রচ্ছদের ফ্রন্ট কভার এবং লেটারিং ভালো লেগেছে, তবে বইয়ের ব্যাক কভারে আরো কাজ করা যেতে পারতো বলে মনে হয়েছে। - এক কথায়, মোগল আমলের আরাকান রাজ্য থেকে শুরু করে বর্তমান আমলের চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত সুবিশাল এক উপন্যাস হচ্ছে মগরাজ। এই ইউনিভার্সের সপ্তরিপু বইটির পরেই এই বইটির অবস্থান থাকবে আমার দৃষ্টিতে। বানান ভুলগুলো ইগনোর করতে পারলে এবং বিশাল কলেবরের বাংলা মৌলিক থ্রিলার পড়ার আগ্রহ থাকলে তাদের বইটি মিস করা উচিত হবে না। তবে আবারো আমার সাজেশন থাকবে "মগরাজ" বইটি পড়ার আগে এই সিরিজের আগের দুইটি বই "সপ্তরিপু" এবং "ব্ল্যাক বুদ্ধা" বইদুটো পড়ে নেয়ার জন্য, তাহলে বইটি সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করা যাবে। জানামতে এটি সাত পর্বের একটি সিরিজ হবে, সপ্তরিপু এবং ব্ল্যাক বুদ্ধা এর পরে তার তৃতীয় পর্ব ছিলো মগরাজ, এবং যতদূর জানি সিরিজের পরবর্তী বইগুলোর নাম রাজদ্রোহী, সিপাহী, অশ্বারোহী এবং মুক্তি। সিরিজের পরবর্তী বই "রাজদ্রোহী" এর স্পষ্ট ইংগিত এই বইয়ের মাঝে ভালোভাবেই দেয়া আছে, তাই রাজদ্রোহী সহ সিরিজের পরবর্তী বইগুলোর জন্য শুভকামনা রইলো।
সিরিজের আগের বই দুইটা প্রায় কমপ্লিট স্টোরি দিলেও এইটাতে কেমন ক্লিফহ্যাং কইরা রাখছে। অবশ্য এই ক্লিফহ্যাংটা তেমন একটা ইনকমপ্লিট ফিল দেয় নাই। স্টোরি, টুইস্ট সব মিলায়া মোটামুটি ভালো একটা থ্রিলার। কিছু জিনিস প্রায় প্রথম থাইকাই বেশ বিরক্তি দিয়া আসলেও শেষ কইরা ভালা লাগছে।
তবে এই ঢাউস বইটা নিয়া আমার বেশ কয়েকটা অভিযোগ আছে।
প্রথমত, একটা থ্রিলারে এতো লাগামহীন বর্ণনা থাকবে কেন? একটা ঘটনা ঘটছে, আমি দেখছি, সেইটা আবার কথকরে দিয়া ইনডিটেলসে বলানো লাগবে কেন? গল্পে পাঠকের পার্টিসিপেশন থাকবে। কিছু জিনিস, ঘটনা নিজে কল্পনা কইরা নিবে। সেই সুযোগটা একদম পাই নাই। ছোটখাটো মুভম্যান্ট, জিনিস, সারাউন্ডিংস নিয়া মাঝেমাঝে এতো আলাপ পারা হইছে, সেগুলা বারবার গল্পের মূল জায়গা থাইকা, ঐ মুহূর্তে ঘটতে থাকা ঘটনা থাইকা দূরে ঠেইলা দিছে।
দ্বিতীয়ত, বইটাতে প্রচুর বানান আর দাড়ি, কমা সংক্রান্ত ভুল। প্রচুর। বারবার এইগুলা ইন্টারাপ্ট করছে। একজন লেখক বছর ���েড়, দুয়েক খাইটা একটা লেখা উপহার দেয়। প্রকাশনীগুলা একটু সময় নিয়া, দক্ষ কাউরে দিয়া প্রুফ রিড করায় না কেন?
বাই দ্য ওয়ে, টমি পোদ্দারের মতো এতো বড় ডাটা এনালিস্ট, আইটি এক্সপার্ট কেমনে ল্যাটিটিউড, লঙ্গিচিউড কী, তা জানে না? মানে, অনেকেই অনেক কিছু জানবে না। স্বাভাবিক তো! কিন্তু সে যে ফিল্ডে কাজ করে, এইখানেতো এই দুইটা জিনিস বেশ কমন! না? 😛
অবশেষে একটানে পড়ে শেষ করলাম মোঘল-আরাকান-মগ জলদস্যুদের নিয়ে লিখা এক বিশাল ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস। '২৫শে মার্চ','সপ্তরিপু' ইত্যাদি ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করা লেখক রবিন জামান খান এর লেটেস্ট ড্রিম প্রজেক্ট 'মগরাজ' নিয়ে অনেক পাঠকের মনেই অনেক জল্পনা কল্পনা ছিলো। তো কেমন হলো এই 'মগরাজ' ?
শুরুতেই বইয়ের কয়েকটা ঋণাত্নক দিক নিয়ে আলোচনা করি।
১. বানান ভুলের মচ্ছব। বই শেষ করে মনে হলো বাতিঘরের সাথে বানান ভুলের কম্পিটিশনে নেমেছে অন্যধারা প্রকাশনী। প্রচুর পরিমাণে প্রিন্টিং মিস্টেক লক্ষ্যনীয়। ১৬৬০ হয়ে গেছে ১৮৬০, শারিয়ার হয়ে গেছে তানভীর, কিরান হয়ে গেছে শারিয়ার। আরেক জায়গায় তালেব কিরান হয়ে গেছে তালেব তৈমুর। অসহ্য। তবে বইয়ের বাইন্ডিং, প্রিন্টিং এবং কাভার ডিজাইন অনেক ভালো হয়েছে।
২. স্ট্রং ফিমেল ক্যারেক্টার এর অভাব। এই জিনিসটার অভাব ভালো মতই চোখে লেগেছে। পিবিআই অফিসার রূম্পার রোলটা আরো মজবুত হতে পারতো। যদিও শুরুতে ভালোই ছিল। কিন্তু পরে আর দাঁড়াতেই পারেনি। পদ্মরানির ক্যারেক্টার বিল্ডাপ ভালো মতো হইতে গিয়েও হয় নাই। শুধু তার কিছু পাস্ট হিস্ট্রি গড়গড় করে বর্ণনা করে দিয়েই শেষ। আর ড. শশীর কথা কি বলবো! এই চরিত্রটাকে একদম শুরু থেকেই মনে হয়েছে ডিজাস্টার!
৩. ক্লিশের ব্যবহার। টিপিক্যাল হলিউডি একশন থ্রিলার প্যাটার্ন এর ক্লিশে গুলো যথেষ্টই বিরক্তিকর ছিল। সব মূল চরিত্রই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সেই 'এক্স মিলিটারি ', নাইলে 'এক্স কমান্ডো', নাইলে 'এক্স প্যারা কমান্ডো', নাইলে 'আগে মিলিটারিতে ছিল কিন্তু সিনিয়রের আদেশ অমান্য করায় আর্মি থেকে বের করে দিয়েছে' ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব টিপিক্যাল ক্লিশে গুলো না থাকলে কি থ্রিলার হয়না নাকি? এগুলো আর কত?!
৪. অতি বর্ণনা। বেশ কিছু জায়গায় অতিরিক্ত বর্ণনার ব্যবহার বিরক্তির উদ্রেক করেছে। সেই অতিরিক্ত অংশগুলো ঝেড়ে ফেলে দিলে বইটাও এত বেশি মোটা হতোনা, আবার কাহিনীটাও হতো অনেক Precise এবং Compact. পড়তে তখন আরো আরামদায়ক হতো।
এবার বলি বইয়ের কিছু ধনাত্মক বৈশিষ্ট্য নিয়ে।
১. প্লট। এই বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী পয়েন্ট হচ্ছে এটার প্লট। ১৬৬০ সালে সেই মোঘল আমলে সুবাদার শাহ সুজার মোঘল সিংহাসন হারানোর কাহিনি থেকে শুরু করে আরাকান মগ জলদস্যু, পর্তুগীজ জলদস্যু, চট্টগ্রাম অঞ্চলের তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং তাদের বানিজ্যের সাথে আরাকান রাজ এর সংশ্লিষ্টতা - এসব কিছুই এক প্লটে সুন্দরভাবে উঠে এসেছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে বর্তমান কালে চলমান আরেকটা কাহিনির ধারা, যেটার সাথে শাহ সুজার হারিয়ে যাওয়া গুপ্তধন এবং মগ জলদস্যুদের সম্পৃক্ততা আছে। এত বিশাল এক প্লট ৫৬০ পেজের ঢাউস সাইজের এক বইয়ে গুছিয়ে নিয়ে আসা সহজ ব্যাপার নয়। এই জায়গায় লেখক যথেষ্ট ধৈর্য এবং স্থৈর্যের প্রমাণ দিয়েছেন। (অথবা একটা ক্লিশে ফ্রেজ ব্যবহার করলে বলা যায় - 'মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন' 😂)
২. ইতিহাস। এটি যেহেতু ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস, সেহেতু ইতিহাসের নানান উপাদান উঠে এসেছে এতে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের মগ ও আরাকান জলদস্যুদের কাহিনি সম্পর্কে তেমন কোন বিশেষ সাহিত্যকর্ম আগে খুব কমই লিখা হয়েছে বলে আমার জানা নাই (লিখা হলেও সেগুলো হয়তো কাঠখোট্টা একাডেমিক টাইপের কোন গবেষণা বা প্রবন্ধ। 'বিশেষ সাহিত্যকর্ম' বলতে সেই ইতিহাসকে কেন্দ্র করে রচিত গল্প/উপন্যাস বুঝিয়েছি)। ইতিহাসের এই অংশটা সম্ভবত দেশের বেশিরভাগ মানুষের কাছেই ঘোলাটে। যার ফলে এই দিকের এই বিশেষ ইতিহাসটা নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল অনেক। তাই যখনি শুনলাম মগ পাইরেটদের কাহিনি নিয়ে লিখা বই বেরিয়েছে , তখনি দেরি না করে সংগ্রহ করে ফেলি বইখানা। রবিন ভাইকে ধন্যবাদ এই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের উপর নতুন করে আলোকপাত করার জন্য।
৩. চরিত্রায়ন। মূল চরিত্রগুলো মোটামুটি ভালোভাবেই নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমান কাহিনির পিবিআই স্পেশাল অফিসার শারিয়ার এবং তার সাপোর্টে থাকা এক্স স্পেশাল অপস কমান্ডো ভুবন শর্মার চরিত্র গঠন হয়েছে নিপুনভাবে। অপরদিকে প্রাচীন কাহিনির মূল চরিত্র মোঘল নৌ বাহিনীর এক্স ক্যাপ্টেন তালেব কিরান এবং তার সাপোর্টে থাকা গোলন্দাজ, হেকমত বৈঠা, পর্তুগীজ দানব গোমেজ, লাঠিয়াল তুলারাম, বাজিকর বেদুর চরিত্র গঠনেও লেখক দক্ষতা দেখিয়েছেন। প্রাচীন কাহিনির এন্টাগনিস্ট/ভিলেন হিসেবে ছিল তৎকালীন দক্ষিন সমুদ্রের ত্রাস পর্তুগীজ পাইরেট সিলভেরা গঞ্জালেস। সিলভেরা ছিল এক বিশালদেহী দস্যু, লেখকের ভাষায় "দেড় মানুষ সমান লম্বা এবং তিন মানুষ সমান চওড়া"। তবে এরপরেও আমার কাছে মনে হয়েছে সিলভেরার "ভিলেনগিরি" টা ঠিক ভালোমতো ফুটে নাই। কোথাও কিছু একটা যেন মিসিং মনে হচ্ছিলো।
৪. গতি। দুর্দান্ত একশন এডভেঞ্চার থ্রিলারগুলো যেরকম সুপার ফাস্ট হয়, এটাও মোটামুটি সেরকমই ছিল। কোন জায়গাতেই খুব একটা স্লো লাগেনি আমার কাছে। ৫৬০ পৃষ্ঠার এই বিশাল বই শেষ করতে আমার লেগেছে মাত্র দুইদিন। এটা থেকেই বোঝা যায় যে কাহিনিটা অনেক এনগেজিং।
বইয়ের জনরার মধ্যে হিস্টোরিক্যাল ফিকশন/হিস্টোরি আমার সবচেয়ে প্রিয়। এই জনরা নিয়ে সমসাময়িক ভালোমানের কাজ খুব বেশি একটা হয়নি আমার জানামতে। সেদিক থেকে আমি লেখক রবিন জামান খানকে তার এই হিস্টোরিক্যাল ফিকশন এর সিরিজটা নিয়ে কাজ করার জন্য জানাবো সাধুবাদ। আশা করি এই সিরিজের পরের বইগুলো হবে আরো বেশি ইন্টারেস্টিং এবং গতিময়।
৩.৫/৫ একচুয়ালি। অতীতের গল্পটা টানটান, উপভোগ্য, সিনেম্যাটিক। পড়ছিলাম আর কল্পনায় মনে হচ্ছিলো কোনো বিগবাজেট পিরিয়ড সিনেমা দেখছি। বর্তমানের গল্পটা মোটামুটি লেগেছে। কিছু জায়গায় বেশ বিরক্তিকর আর স্লো লেগেছে। আবার গল্পটা অসম্পূর্ণ ও রয়ে গেছে। পরবর্তী বই 'রাজদ্রোহী' তে জানা যাবে বাকি ঘটনা। 'ব্ল্যাকবুদ্ধা' আমার পড়া হয়নি তবে 'সপ্তরিপু'কে অনেকটাই এগিয়ে রাখবো 'মগরাজ' থেকে।
আগের দুটো বইয়ের মতোই অতীত এবং বর্তমানকে একত্রিত করে রহস্যজট সমাধান। বর্তমানের চেয়ে অতীতের গল্পটাই বেশি ভালো লেগেছে। বড় হই হওয়া সত্ত্বেও কাহিনি স্লো লাগে নাই। এই বইটার সাথে চমৎকার সময় কাটলো। রেটিং ৪.৫
এক বৃষ্টির রাতে বড়লোকের কিছু ���োলাপান গাড়ি নিয়ে চিল করতে বের হয়ে মুখোমুখি হয় এক দুর্ঘটনার। এক লোক রাস্তা পার হবার সময় গাড়িটি ধাক্কা দেয়, ফলাফল তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। এরকম দুর্ঘটনা আমাদের দেশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে, স্পেশাল কোন কেস না। কিন্তু ব্যাপারটা স্পেশাল হয়ে যায় তখনই, যখন গাড়ির ধাক্কা খেয়ে মৃত লোকটির পরিচয় প্রকাশ পায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনি থেকে শুরু করে বিভিন্ন কুখ্যাত সংগঠন নড়েচড়ে বসে এ মৃত্যুতে। একদল চায় সত্যের উন্মোচন আরেকদল চায় স্বার্থ উদ্ধার করতে। পেঁয়াজের খোসার মতো পরতে পরতে নানান ঘটনা... একের ভিতর আরেক সত্য। যার মূল অতীতে..
মোটাদাগে এই হলো ঘটনা। লেখকের টাইম সিরিজের তৃতীয় বই। কেমন লেগেছে এই প্রশ্ন করলে একটু ভাবতে হবে, মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলা যায়। বইয়ের কাহিনি শুরু হতে হতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে (যদিও বর্তমানে বিভিন্ন এ্যকশন দৃশ্য দিয়ে পাঠককে একটু রিলিফ দেয়ার চেষ্টা করেছেন লেখক) মোটের উপর নট ব্যাড। কাহিনির একদম শেষ দিকে এসে একটু গতি পেয়েছে, এছাড়া অতিরিক্ত বর্ণনা, প্রচুর পরিমাণে 'বানাম বুল' আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হচ্ছে নায়কের নামটাই চেঞ্জ হয়ে যাওয়া 🐸 এক দুই বার না, বেশ কয়েকবার এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। আমি যেই বইটা পড়েছি, সেটা সেকেন্ড এডিশন ছিল.. জানি না নতুন এডিশনে এই 'বুল'গুলো ঠিক করা হবে কী না। এইটা প্রকাশনার সাথে যারা যুক্ত থাকে তাদের জন্য বেশ বড় একটা ব্যর্থতা। আচ্ছা, এবার তুলনায় আসি। কিছু কিছু ব্যাপার ব্ল্যাকবুদ্ধায় বেশি ভালো লেগেছে, কিছু কিছু ব্যাপার মগরাজের ভালো লেগেছে। ব্ল্যাকবুদ্ধার কাহিনি আকর্ষণীয় ছিল, স্লো ছিল না মোটেও, এবং ওই বইয়ের অতীত বর্তমান দুইটাই বেশ ভালো ছিলো কিন্তু কাহিনির টুইস্ট বা মূল ভিলেনকে আরেকটু ভালোভাবে বিল্ড-আপ করলে আরও ভালো হতো। এছাড়া বইয়ের দুই অংশের দুই নায়ক, তানভীর এবং শামান দুইজনই নায়ক হিসেবে প্লাস এজ এ্য ম্যান হিসেবে চোখ ধাঁধানো টাইপ ছিলো। অই দুই জনের তুলনায় মগরাজের স্পেশাল এজেন্ট, বর্তমানের নায়ক রাফ এন্ড টাফ শারিয়ারকে অতো একটা ভাল্লাগে নাই (কিন্তু সহকারী ভুবনকে আবার খুব ভাল্লাগসে) দুই নায়কের মাঝে আমার ধীর স্থির ঠান্ডা মাথার তানভীরই ভালো। আবার অতীতের নায়ক তালেব কিরানকে অবশ্য ভালো লাগসে। আবার জলদস্যু সিলভেরা সেই জোস ছিলো... জলদস্যু বললে আমরা যেমন কল্পনা করে থাকি, সিলভেরা ঠিক সেরকম। বইয়ে প্রথম ওর আগমন, সে যেই সিনগুলোতে ছিল সেগুলো ছিল সেই রাজসিক টাইপের। ভাল্লাগসে খুব। আর বর্তমানের ভিলেনকে যেভাবে রিপ্রেজেন্ট করা হয়েছে ওদের কর্মকাণ্ডে বা লাস্ট একশন সিনে অইটার ঠিক প্রতিফলন দেখা গেছে বলে মনে হয় না। যদিও চোর-পুলিশ খেলা অনেক হয়েছে। অনেক ডেসপারেট টাইপ একশনও প্রচুর ছিল, তাও! গল্পের ক্লিফ হ্যাঙ্গার পরবর্তী বইটা পরার জন্য অবশ্যই উদ্বুদ্ধ করবে। আমার পরবর্তী লিস্টেও আছে অবশ্য। কাহিনিতে দেখা যাচ্ছে মাথা ঠান্ডা তানভীর পরবর্তী মিশনে খুব সম্ভবত নেতৃত্ব দিবে, ওরা একটা স্পেশাল টিম গঠন করছে। এখন দেখা যাক.. কেমন হয় চতুর্থ পর্ব।
গল্পটা মুঘল সম্রাজ্যের। ভারতবর্ষে তখন সম্রাট শাহজাহানের শাসনকাল। বয়সের ভারে বার্ধক্য আসে, রোগশোক ছড়িয়ে যায়। শাহজাহানের হয়েছে সেই দশা। অসুস্থ অবস্থায় থাকা ভারতবর্ষের সম্রাটের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে পুরো সম্রাজ্যে। সত্য, না গুজব? কেউ জানে না। শাহজাহান পুত্র শাহ সুজা তখন বাংলার সুবাদার। পিতার চিন্তায় অস্থির অবস্থায় খবর এলো তার-ই ভাই দারাসাকো দখল করে নিয়েছে দিল্লির মসনদ। শাহ সুজা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। সভাসদদের প্ররোচনায় বাড়তে থাকে লোভ। যিনি কখনো সাম্রাজ্য অর্জনের চিন্তা করেননি, তিনি নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে ছুটে চলেছেন দিল্লির অভিমুখে। লক্ষ্য, সিংহাসন দখল। কিন্তু মাঝপথেই বিপর্যয়। যুদ্ধে হেরে, সবকিছু হারিয়ে দলবল নিয়ে শাহ সুজা ফিরতি পথ ধরেন।
যখন তিনি নতুন অনুপ্রেরণায় আবারও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখনই খবর আসে তার-ই আরেক ভাই আওরঙ্গজেব দখল করে নিয়েছেন দিল্লির রাজ দরবার। আবারও জোর প্রস্তুতি, আবার যুদ্ধের দামামা। কিন্তু এবারও ভাগ্য বিরূপ। এবারের বিপর্যয় আরও বিশাল। পালিয়ে বেড়ানো ছাড়া উপায় নেই। এমন অবস্থায় আরকান রাজ্যে আশ্রয় মিললেও কপালে যে এমন বিশ্বাসঘাতকতা মিলবে কে জানত? মৃত্যু যেখানে আসন্ন, সেখানে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস রক্ষা করা মূল দায়িত্ব। শাহ সুজার নির্দেশে তার উপদেষ্টা, বন্ধু তালেব তৈমুর এক বিশেষ জিনিস রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। যার পেছনে ছুটছে আরকানরাজ, সম্রাট আওরঙ্গজেব ও বাংলার জলস্থানে বিচরণ করা পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যু।
বাংলার জলপথে তখন দস্যুদের জাহাজের নৃশংসতা। পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে উপকূলীয় মানুষদের জীবন অতিষ্ঠ। লুটপাট করছে, সব জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিচ্ছে, খুনে নেশায় মত্ত হচ্ছে! এমন পরিস্থিতিতে এদের থামাতে হবে। কে এই সাহস দেখাবে? এমন ভয়ানক জলদস্যুদের সাথে লড়াই করার ক্ষমতা যে সবার থাকে না। এই কাজের জন্য তালেব কিরানকে নির্ধারণ করা হয়েছে। আগেও একবার দসুদের সাথে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আছে তার। কিরানকে নির্ধারণ করার আরেক কারণ, সে যে তালেব তৈমুরের পুত্র। বাবাকে খুঁজে পেতে আগুনে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত সে। দল প্রস্তুত থেকে শুরু করে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া সম্পন্ন। কিন্তু সে জানত না, কীসের চোরাবালিতে ডুবে গিয়েছে। ভুল বোঝানো, মিথ্যের আশ্রয় তাকে দিশাহারা করে দিয়েছে। যে পথে সে পা বাড়িয়েছে, সেখানে যে — মৃত্যু অনিবার্য!
▪️বড়লোকের বখে যাওয়া সন্তানেরা যা ইচ্ছে তাই করতে পারে। নেশা, ফুর্তিতে তারা কী যে করে, তার দিশা থাকে না। এমনি অভিজাত ঘরের কিছু আদরের দুলাল-দুলালী রাতের অন্ধকারে পতেঙ্গার পথে চলতে গিয়ে ঘটিয়ে ফেলে এক দুর্ঘটনা! এক পথচারীকে ভুল করেই গাড়ি চাপা দিয়ে দেয়। অন্যায় করা যত না দোষের, তার চেয়েও শতগুণ দোষের অন্যায়কে ধামাচাপা দেওয়া। এমন ভুল করার পরও সেই লাশকে গায়েব করে দিতে গিয়ে ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। উন্মুক্ত হতে থাকে একের পর চাঞ্চল্যকর রহস্য!
বিদেশ থেকে ট্রেনিং শেষে দেশে ফিরে যেখানে কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার কথা ছিল, সেখানে শারিয়ার পাওয়া যায় বাইক রেসিং ময়দানে। সেখান থেকে উঠিয়ে আনতে হয় আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন ফিল্ড অফিসারকে। বিষয়টা ভালো, না খারাপ কে জানে? তবে সামনের আসন্ন দিনগুলো যে ভালো হচ্ছে না, তা বলাই বাহুল্য। কেননা এখন যে তাকে যেতে হবে চট্টগ্রামে। এমন এক রহস্য সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, মনে হয় আন্তর্জাতিক কোনো চক্র এখানে ভূমিকা রাখছে।
যে ব্যক্তিটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছে, আদতে তাকে সাধারণ পথচারী মনে হলেও তার যে অতীত সামনে এসেছে— তা অবিশ্বাস্য! সাধারণ কোনো মানুষ সে নয়। একজন বিখ্যাত আর্কিওলিজিস্ট, যিনি নিজ কর্মক্ষেত্রে বেশ জনপ্রিয়। গত তিন বছর ধরে লাপাত্তা ছিল। যেন পৃথিবীর বুকে তার কোনো অস্তিত্বই ছিল না কখনো। তার রহস্য সমাধান করতেই মূলত শারিয়ারকে পাঠানো হয় চট্টগ্রাম। এখানে আন্তর্জাতিক অপরাধের যেমন রহস্য আছে, তেমনই আছে গোপন কোনো কাজের সম্ভাবনা। কিন্তু চট্টগ্রামে পা রাখতেই এমন ভজকট পাকিয়ে ফেলবে শারিয়ার, কে জানত? এমনকি তাকে এই অপারেশন থেকে অব্যাহতি দেওয়ারও সম্ভাবনা তৈরি হয়। রুম্পা তালুকদারের অধী��ে কাজ করতে গিয়ে শারিয়ার এমন কিছু আবিষ্কার করে, যা তাকে নিয়ে যায় অতীতের কোন এক সময়ে। এখান থেকেই সব কিছুর সূচনা হয়েছিল, এখানেই হবে শেষ। শত্রুপক্ষরা ধেয়ে আসছে চারিদিক থেকে। এখানে কি গল্পের শেষ হবে, না-কি নিজেদের?
কীসের টানে ছুটছে সবাই? শেষবেলায় কী উন্মোচিত হবে? অতীত পেরিয়ে বর্তমান আবারো মিলিত হবে এক বিন্দুতে। উন্মুক্ত হবে অনেক কিছু, আবার হয়তো কিছুই না!
▪️ রবিন জামান খানের সময় উপখ্যান সিরিজের তৃতীয় বই “মগরাজ”। সিরিজের অন্যান্য বইয়ের মতো এই বইটিও অতীত ও বর্তমান সমান্তরালে চলে। যদি তিনটি বইয়ের মধ্যে তুলনা করা হয়, তবে গল্পের দিক দিয়ে “মগরাজ” বেটার। বিশেষ করে বর্তমান সময়ের ঘটনা প্রবাহে প্রথম দুইটি বইয়ের চেয়ে ভালোই এগিয়েছে। অতীতের গল্পটিও তুলনামূলক ভালো। লেখক যে সময়ের বর্ণনা করেছেন, সে সময়ে মগ জলদস্যুদের প্রভাব বিস্তারে উপকূলের মানুষের জীবন হয়ে উঠেছিল অতিষ্ঠ।
ঐতিহাসিক থ্রিলারের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বর্তমান সময়ের সাথেই অতীতের বর্ণনা চলে। ফলে মুখের বাণীতে অতীতকে অনুধাবন করতে হয়। সময় উপাখ্যান সিরিজ এদিক থেকে ব্যক্তিক্রম। লেখক বর্তমান ঘটনা প্রবাহের পাশাপাশি অতীতকেও জীবন্ত করে তোলেন। হয়তো এই কারণেই সিরিজটি পাঠক প্রিয় হয়ে উঠেছে। চোখের সামনে অতীতের ঘটনা, ইতিহাস, সেই সময়ের পারপর্শ্বিক অবস্থা বেশ ভালোভাবেই অনুভব করা যায়। বিশেষ করে এই বাঙাল মুল্লুকের গল্পগুলো লেখক এমনভাবে বর্ণনা করেছেন, আগ্রহ জাগানিয়া। শুধু যে ইতিহাস এমন নয়, মিথ সম্পর্কিত কিছু সত্যতা, গল্পের প্রতিও লেখক আলোকপাত করেছেন। যেমন, মগের মুল্লুক বা মগবাজারের প্রকৃত ইতিহাস।
আমরা নিজেদের মূল্যায়ন করি খুব কম। নিজেরা যোগ্য থাকার পরও বিদেশ বিভূঁইয়ের অযোগ্যতাও আমাদের কাছে সেরা হয়। এই বাংলার ভূখণ্ড একসময় সম্পদ, ঐশ্বর্যে সেরা ছিল। তাই হয়তো মধুর নেশায় যেমন মৌমাছি ছুটে আসে, তেমনই করে ছুটে এসেছিল ইউরোপের বর্বর জাতিরা। এসেই দখলের পাঁয়তারা করেছে। মসলিন, তাঁত, জামদানির পাশাপাশি, উপমহাদেশের মশলার লোভেই তাদের আগমন। আর এরপরের ঘটনা তো সবার জানা । দুইশ বছরের পরাধীনতার শিকলে আবদ্ধ। ইংরেজরা আসার আগেও অনেক জাতি এখানে বিচরণ করে গিয়েছে। তার মধ্যে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে পর্তুগীজ জলদস্যুরা। তাদের হিংস্রতার গল্প উঠে এসেছে “মগরাজ” বইতে।
লেখক পুরো বইটিকে দুটি অংশে বিভক্ত করেছেন— অশ্রুপতন ও শূন্য জীবন। এর আগে পূর্বকথা দিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। মোট ৪৫টি অধ্যায়ে লেখক বইটিকে রচনা করেছেন। অশ্রুপতন অংশে মূল ঘটনার শুরু। গল্পের গভীরে প্রবেশ করার ঘটনাই মূলত বর্ণিত হয়েছে এই অংশে। দ্বিতীয় অংশ, মানে শূন্য জীবন অংশে ঘটনা সমাধানের দিকে মনোযোগ দিয়েছেন লেখক। আমার বর্তমানের চেয়ে অতীত একটু বেশি পছন্দ হয়েছে। যদিও সিরিজের প্রথম দুই বইয়ের চেয়ে এই বইয়ের বর্তমান সময়কাল একটু বেশি পরিণত লেগেছে। বিশেষ করে যেভাবে শেষ সময়ের মঞ্চ উপস্থিত করেছেন লেখক, বুদ্ধির তারিফ করতে হয়।
সমাপ্তির অংশ আসলেই দুর্দান্ত। শেষের ঘটনাক্রম এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল, একের পর এক চমকে নিঃশ্বাস ফেলার সময় ছিল না। যেখানে অতীত, বর্তমান একসাথে মিলেমিশে এক হয়ে হয়েছিল। একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল গল্পের স্রোতে। দুর্দান্ত লেগেছে এই অংশটি। শেষের এই অংশেই লেখক তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন।
“মগরাজ” কেবল যে ইতিহাসের ঘটনা বর্ণনা করে, কিংবা বর্তমানে এক রহস্য সমাধানে এগিয়ে চলে তেমনটা নয়— এর সাথে ফুটে উঠেছে মানব মনের অনুভূতি। বন্ধুত্ব, আবেগ, ভালোবাসা, পিতার প্রতি সহমর্মিতা, একসাথে কাজ করলে যে ভাতৃত্ব বোধ গড়ে ওঠে— সবকিছুই লেখক তার কলমের মাধ্যমে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
▪️বইটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ চরিত্র। অতীত, বর্তমান মিলিয়ে অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা ছিল। লেখক কিভাবে সব চরিত্র ব্যবহার করেন তা নিয়ে সংশয় জেগেছিল। এক্ষেত্রে লেখক নিজের কাজটাই করে গিয়েছেন। মূল চরিত্রের পাশাপাশি যতগুলো পার্শ্ব চরিত্র ছিল, প্রত্যেকেই সমানভাবে নিজের কাজটি করে চলেছে। কাউকে বেশি বা কম হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। যার যতটুকু ভূমিকা ছিল, সে ভূমিকা প্রত্যেকেই পালন করেছে। এই দিকটি ভালো লেগেছে।
অতীতের মূল চরিত্র কিরান ও বর্তমানে মূল চরিত শারিয়ার। সময় উপেক্ষা সিরিজের ক্ষেত্রে একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, প্রতিটি বইয়ের অতীত ও বর্তমানের মূল চরিত্রগুলোর মধ্যে কিছু না কিছু মিল রয়েছে। “সপ্তরিপু”-তে ম্যাকফি ও বাশারের ডিমোশন পেয়ে অন্য জায়গায় কাজ করতে যাওয়া, “ব্ল্যাকবুদ্ধা”-তে শামান ও তানভীর একইভাবে নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে পেতে চায়। তেমনই “মগরাজ”-এ কিরান ও শারিয়ার একই ভাবেই গল্পে প্রবেশ করে। একজন বাইক রেসিংয়ের মাধ্যমে, আরেকজন ষাঁড়ের লড়াইয়ে।
সিরিজের তিনটি বইয়ে তিন চরিত্র — বাশার, তানভীর, শারিয়ারের মধ্যে আমার শারিয়ারকে একদম পছন্দ হয়নি। কারণ, তার হামবড়া ভাব। বড়লোকের সন্তান হিসেবে ঔদ্ধত্য দেখানো, ইগো নিয়ে থাকা, অন্যদের ছোটো করার প্রবণতার কারণে চরিত্রটা শুরু থেকেই অপছন্দের। যেমন একটা উদাহরণ দেওয়া যায়, শুরুতেই একটা গোলমাল করানোর পর জন্য রুম্পা তালুকদার প্রবেশ করে, তখন শারিয়ারের একটা তীর্যক কথা ভালো লাগেনি। এটা পেশাদারিত্বের মধ্যে পড়ে না।
এছাড়াও শুরুর দিকে প্রশিক্ষণ শেষ করে দেশে ফিরে রিপোর্ট না করে বাইক রেসে যাওয়া অপছন্দের মূল কারণ। শেষের দিকে তার কাজকর্ম ভালো লাগেনি। একজন অপরাধীর সাথে সিগারেটের বিনিময়ে বন্ধুত্ব পাতানোর কারণ বোধগম্য লাগেনি। না-কি বিপরীত লিঙ্গের সুন্দরী দেখে এভাবে গলে গিয়েছিল? শশীর সাথে যখন শারিয়ারের দেখা হয় তখন যেভাবে থা প্প ড় দিয়েছিল, সেটা মেয়েটার শক্তি সামর্থ্যকে বোঝালেও গল্পের মাঝে কারণে অকারণে হাততালি দিয়ে ওঠা শিশুসুলভ লেগেছে। মিলল না বিষয়টা।
মূল দুই চরিত্রের মধ্যে কিরানকে আমার পরিণত ও যোগ্য মনে হয়েছে। সেই সাথে মানবিকও। তবে শেষের দিকে এসে রুম্পা তালুকদারকে শেষ সময়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তার জায়গা থেকে আরেকটু সময় দেওয়া যেত। অতীত থেকে কিরানকে যেমন ভালো লেগেছে, তেমন পদ্ম, গোমেজকে পছন্দ হয়েছে। আবার বর্তমান সময়ের দিকে ভুবন, তানভীর, টমি পোদ্দার পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে।
খল চরিত্রগুলো আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়লেও শেষে এসে শক্তিমত্তার উন্মোচন ভালো লেগেছে। জেড মাস্টারের পর মাস্টার ইউ যেন লেখকের বর্ণমালা নিয়ে খেলার প্রবণতাকে দৃশ্যমান করে।
▪️লেখকের বর্ণনাশৈলী সাবলীল। লেখনী সহজ। কোনো রকমের জড়তা লক্ষ্য করা যায় না। বিস্তারিত বর্ণনার আশ্রয় নেন লেখক। আমি মূলত এমন বিস্তারিত বর্ণনা পছন্দ করি। কিন্তু তারপরও কিছু বর্ণনা যেমন গলার কাটার মতো আটকে থাকে। এই বইয়ের দশা হয়েছে তেমনই। এত এত বিস্তারিত বর্ণনা লেখকের লেখায় পাওয়া যায়, এখানে মূল গল্পের আকর্ষণ কক্ষচ্যুত হয়ে যায়। একটা উদাহরণ দিই — শারিয়ারের এন্ট্রি হয় এক বাইক রেসের ময়দানে। সেই ঘটনার বর্ণনায় লেখক দুই অধ্যায় খরচ করেছেন। যার কোনো দরকার ছিল না। ১৫০ পৃষ্ঠা অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি মূল ঘটনা না জানা যায়, কিংবা ২৫০ পৃষ্ঠা শেষ হওয়ার পরও যদি দেখা যায় এখনো মূল ঘটনা শুরু হয়নি— তাহলে বিষয়টা বিরক্তিকর বটে। এমনকি ৫৫০ পৃষ্ঠার বইয়ে ৪৫০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বর্তমান চরিত্রগুলো জনেই না, তারা আসলে কীসের পেছনে ছুটছে।
একই কথা বারবার ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বর্ণনা করার জন্য বইয়ের দৈর্ঘ্য বাড়িয়েছে কেবল। সংলাপের ক্ষেত্রেও এই বি��য় লক্ষ্য করেছি। একই কথা একাধিকভাবে একাধিকবার বলার কারণে কোনো কোনো সংলাপ অর্ধেক পৃষ্ঠা বা কোনোটা পুরো একটা পৃষ্ঠা পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হয়েছিল। ফলে ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিল বারংবার। আমার মনে হয়েছে ৫৫৯ পৃষ্ঠার বইটি বাহুল্য বর্জিত হলে ৩৫০-৪০০ পৃষ্ঠার মধ্যে অনায়াসে শেষ করে দেওয়া যেত। লেখকের লেখার বাহুল্যতাই পৃষ্ঠা সংখ্যা বাড়িয়েছে।
লেখকের লেখায় এক ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করেছি, তিনি সম্ভবত দামি ব্র্যান্ডের প্রতি অবসেসড। আর সেটা তার লেখায় স্পষ্ট। নাহলে একটা ল্যাপটপে কাজ হবে, সেটা যে অ্যাপলের ল্যাপটপ তা একধিকবার বলার কারণ দেখি না। একইভাবে দামি সিগারেট ব্র্যান্ড ডানহিলের কথা এতবার আসছিল যে বিরক্ত লাগছিল। লেখকের লেখায় আরেকটা জিনিস পছন্দ হয়নি, যেখানে বডি শেমিং ভাবটা প্রকট। আগেও লক্ষ্য করেছি একটু স্বাস্থ্য ভালো হলে মোটু, মোটা, ভুঁড়ি নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্�� একটু বেশিই থাকে। টমি পোদ্দারকে নিয়ে এখানেও করেছেন। টাক মাথার কাউকে টাকলু বলা, “সপ্তরিপু” বইয়ে জয়া সরকার কালো ছিল বলে সেখানেও বেশ কিছু অসম্মানজনক কথা ছিল। যেগুলো ভালো কোনো ইঙ্গিত বহন করে না।
এছাড়া আরেকটা বিষয় নিয়ে কথা বলা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন একসাথে কাজ করার মাধ্যমে একটা সুসম্পর্ক বজায় উঠে। সেই সম্পর্কের জোরে সম্বোধন ভিন্ন হতেই পারে। কিন্তু একদিনের পরিচয়ে, যাদের সাথে কাজই ঠিকমতো হলো না, কয়েক ঘন্টার পরিচয়— তাদেরকে তুমি থেকে সরাসরি তুই বলে সম্বোধন করা কেবল যে অপেশাদার আচরণ তা নয়, দৃষ্টিকটুও বটে। তাছাড়া সিরিয়াস সময়ে চরিত্রগুলো অকারণে “হেসে ওঠা”র মতো কারণে আমি খুবই বিরক্ত। ভাই, তোরা জানিস না এখান থেকে বেঁচে ফিরবি কি না, এই অবস্থায় হাসি আসে কী করে? অতীত, বর্তমান সব চরিত্রের মধ্যেই এই গুণ (কিংবা দোষ) লক্ষ্য করেছি।
লেখকের আগের দুই বইয়ে হিউমার সমৃদ্ধ লেখা বেশ লক্ষ্য করেছিলাম। যা অজান্তেই মুখে হাসি নিয়ে এসেছিল। এই বইয়ে সেটা অনুপস্থিত। মনে হয়েছে লেখক যা কৌতুক বা হাস্যরস আনার চেষ্টা করছেন— তা জোর করে আনার চেষ্টা। যা হাসির চেয়ে বিরক্তি আনছিল বেশি।
তবে লেখকের বর্ণনা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে, তিনি যখন যুদ্ধের বর্ণনা দেন। গোলা, কামান, যুদ্ধের পারপর্শ্বিক পরিস্থিতি— সবকিছুতে যেভাবে লেখক বর্ণনা করেন, মনে হয় যেন নিজেই যুদ্ধের একটা অংশ। এক্ষেত্রে লেখক অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পড়তেও ভালো লাগে।
▪️যখন কোনো বইয়ের শুরুর শিরোনামের সময়কাল ভুলক্রমে দুইশ বছর পরের দিয়ে দেওয়া হয়, তাহলেই বোঝা যায় বইটির সম্পাদনা আসলে কেমন হয়েছে। অতীতের ঘটনাক্রম মুঘল আমলের হলেও প্রথম অধ্যায়ের সময় সেটা ভুলক্রমে ইংরেজ শাসন হয়ে গিয়েছিল। আর এই বিশাল বড়ো ভুল ছিল ট্রেলার। যার পুরো দৃশ্যপট ছিল বইজুড়ে। বানান ভুল, ছাপার ভুল, কোথাও দুটি শব্দ এক হয়ে যাওয়া, কোথাও শব্দের উধাও ভালোই প্যারা দিয়েছে। এ দায় প্রকাশনীর। লেখকের দেওয়া ফাইলটিই বোধহয় ছাপিয়ে দিয়েছে কোনো প্রকার সম্পাদনা ছাড়াই।
তবে লেখকের কি দায় নেই? লেখক চাইলেই একবার চেক করতে পারতেন। তাহলে হয়তো শারিয়ারের নাম পুরো একটা অধ্যায়ে তানভীর হয়ে যেত না। এখানে লেখকের দায়সারা কাজের আভাস পাওয়া যায়। আমাদের দেশে প্রকাশনী থেকে যেখানে সম্পাদনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না সেখানে লেখককেই দায়িত্ব নিতে হয়।
সিরিজের প্রচ্ছদগুলো আমার বেশ লাগে। এটাও বেশ। বর্তমান সময়ে বইয়ের পৃষ্ঠা কালো, সবুজ রংয়ের বের করার একটা প্রচলন দেখা যায়। এই কাজ অন্যধারা প্রকাশনী ঢাকঢোল না পিটিয়ে আগে থেকেই করে। তাদের অনেক বইয়ে দেখেছি এমন। এই বইটির পৃষ্ঠাও হালকা সবুজাভ। এমন পৃষ্ঠা পড়তে আরাম লাগে। বাঁধাই থেকে শুরু করে প্রোডাকশন কোয়ালিটির দিকে অভিযোগ করার সুযোগ নেই।
▪️পরিশেষে, রাতের অন্ধকারের মতো জীবনেও অন্ধকার নামে। কখনো সে অন্ধকার দূরীভূত হয়ে আলোর দেখা পায়। হয়তো অপেক্ষাটা কেবল দীর্ঘায়িত হয়। আর এই অপেক্ষা ক্রমশ পেরিয়ে হাজার বছরের গল্পকে হারিয়ে লক্ষ বছরের পুরনো কোনো গল্প লেখে।
বই : মগরাজ লেখক : রবিন জামান খান জনরা : হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার প্রকাশক : অন্যধারা সংস্করণ : ফেব্রুয়ারি ২০২১ (১ম মুদ্রণ) মুদ্রিত মূল্য: ৭০০ টাকা পৃষ্ঠা : ৫৫৯ আইএসবিএন : 978-984-95403-9-7 প্রাপ্তিস্থান : অন্যধারা, বাংলাবাজার, ঢাকা ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫ ----------------------------------------------------------------
" শূন্য থেইকা আসে মানুষ, শূন্যে মিলাই যায় নাওয়ের মাঝি হাল ধইরাছে, খবর কেবা পায় ।"
■ কাহিনী সংক্ষেপ
মোঘল সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লীর মসনদ দখলের লড়াইয়ে মেতে ওঠে তার তিন ছেলে। নিজের দুই ভাইয়ের কাছে যুদ্ধে হেরে পলায়নরত স্বঘোষিত সম্রাট শাহ সুজা আরাকান রাজের আশ্রয়ে অতিথী হলে, লোভী আরাকান রাজ রাতের আঁধারে হামলা চালায় তার বাসভবনে। কিন্তু সম্রাট সুজার সাথে থাকা মোঘল সম্পদের বিরাট ভান্ডার দখলের আগেই সম্রাট সুজার একান্ত কাছের মানুষ সেটা নিয়ে রওনা দেয় বাঙাল মুল্লুকের উদ্দেশ্যে। তাকে ধাওয়া করতে আরাকান রাজের নির্দেশে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের নিয়ে গঠন করা হয় বিরাট বাহিনী। বিপরীতে চট্টগ্রাম থেকে এই বিরাট বাহিনী প্রতিহত করে সুজার একান্ত কাছের মানুষকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হয় মোঘল নৌবাহিনীর প্রাক্তন কাপ্তান চট্টগ্রামের তালেব কিরানকে।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা রোডে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে এক ব্যক্তি। মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে দেশে-বিদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক মহল। ঘোলাটে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম পাঠানো হয় সদ্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং শেষ করে দেশে আসা পিবিআই এর স্পেশাল ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে। চট্টগ্রামে পৌছে পরিস্থিতি সামলানো তো দূরে থাক বরং একের পর এক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে সে। বাধ্য হয়ে অথরিটির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে কাজে নামতে হয় নিজের টিম নিয়ে। ঘটনার পরিক্রমায় সে জানতে পারে ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ের সংযোগ আছে এই ঘটনার যা আজ বিলীন প্রায়। শারিয়ার আর তার দল কি পারবে ইতিহাসের অতল থেকে সেই হারানো অধ্যায় খুঁড়ে বের করতে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া ---------------------------
লেখক শুরু থেকেই বলেছেন 'মগরাজ' তার ড্রিম প্রজেক্ট । বইটা নিয়ে তাই আমার আগ্রহের কমতি ছিল না । শুরু থেকেই লেখককে বহুবার বিরক্ত করেছি এটাসেটা প্রশ্ন করে, 'কবে আসতে পারে বইটা, কলেবরে কত পৃষ্ঠা হতে পারে' ইত্যাদি নানা প্রশ্নবাণ ছুড়েছি লেখককে। অবশেষে বইটা এবারের বইমেলায় প্রকাশিত হয়েই গেল । তো কী আছে মগরাজে? কেমন কাটলো জার্নি আমার? পাঁচশো পৃষ্ঠার ঢাউস সাইজের এই বইটিতে লেখক কতটা সফল, কোথায় এখনও ত্রুটি রয়ে গিয়েছে, প্রোডাকশনে কতটা বাজিমাত করতে পারল অন্যধারা প্রকাশনী, সর্বোপরি পাঁচশত টাকা সমমূল্যের এই বইটি আপনার কেনা উচিত হবে কিনা - এসবকিছু নিয়েই আজকের আলোচনা ।
● প্লট
প্রথমেই প্লটের আলাপটা সেরে নিচ্ছি । হিস্টোরিক্যাল থ্রিলারে রবিন জামান খান এক ও অদ্বিতীয় । যারা লেখকের সপ্তরিপু কিংবা ব্ল্যাক বুদ্ধা পড়েছেন তারা জানেন লেখকের ইতিহাসে জ্ঞানের পরিসীমা কতটা দীর্ঘ । ইতিহাসের খুব বেশি আকর্ষণীয় অধ্যায়গুলোই লেখক তার চমকপ্রদ লেখনশৈলীতে সিরিজের প্রতিটি বইয়ে তুলে ধরেছেন । একই কথা মগরাজের বেলায়ও। তবে সিরিজের অন্য দুইটি বইয়ের তুলনায় মগরাজের প্লটকে বেশি এগিয়ে রাখবো আমি।
● প্রারম্ভ
সিরিজের অন্য বই দুটোর মত মগরাজ বইয়ের শুরুটা ততটা নাটকীয় নয় । বেশ ধীরস্থিরভাবে গল্প শুরু হয় । ত্রিপুরা রাজ্যের ছোট্ট এক গ্রাম তুলপাধলা ও তার বাসিন্দাদের রোজকার জীবনের চিত্রায়নের মাধ্যমে লেখক তার বিশাল ক্যানভাসের সূচনা করেন । সদা কর্মব্যস্ত গ্রামবাসীর নিস্তরঙ্গ জীবনে দেখা দেয় নতুন উত্তেজনা । লোকমুখে চাউর হয়ে যায় রাজার এক বিশেষ অতিথি এসেছেন । যদিও ভোরের কুয়াশার ন্যায় গ্রামবাসীর উত্তেজনাও দ্রুত মিলিয়ে যায় যখন তারা বুঝতে পারে রাজার অতিথিও রাজার মতই জাঁকজমকহীন, নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপন করে । হঠাৎই একদিন ঘোষণা আসে অতিথি বটতলায় বসে সকলকে পুঁথি পাঠ করে শোনাবেন । সুললিত কণ্ঠে আরম্ভ হয় গল্প, এভাবে চলতেই থাকে । গ্রামবাসী মন্ত্রমুগ্ধের মত শোনে সে গল্প । পরবর্তী কয়েক মাসে গল্পে ধীরে ধীরে উপভোগের মাত্রা আচ্ছন্নের পর্যায়ে চলে যায় গ্রামবাসীর । ঘণ্টার পর ঘণ্টা যেন শুনতেই হবে সে গল্প । এভাবে চলতে থাকে গল্পের আসর । নাম না জানা অতিথি তারপর একদিন শুরু করল দরদী এক যুবরাজের গল্প । বটতলার অগ্নিকুণ্ডকে ঘিরে তন্ময় হয়ে সকলে শুনতে থাকে সেই গল্প । কী সেই গল্প? পাঠক, আপনি কি গল্পটা শুনতে আগ্রহী?
● চরিত্রায়ন
বর্তমান ও অতীত - দু'টো টাইমলাইনে সমান্তরালভাবে এগিয়েছে গল্প । অতীতের নায়ক তালেব কিরান এবং বর্তমান সময়ের শারিয়ার দুজনের ক্যারেক্টারাইজেশন ই বেশ ভালো । জীবনের প্রতি সম্পূর্ণ উদাস দুজন ছন্নছাড়া মানুষের জীবনে হুট করে বিশাল পরিবর্তন, সেই পরিবর্তনের সাথে স্বল্প সময়ে খাপ খাইয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে নানারকম মানসিক দ্বন্দ্বের বিপরীতে তাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিত্ব এবং ডিসিশন মেকিং - বেশ উপভোগ করেছি । আর এজন্য লেখকের প্রশংসা না করলেই নয় । ঢাউস সাইজের বইটাতে চরিত্রায়নে বেশ খানিকটা সময় ই ব্যয় করেছেন লেখক । যদিও তাতে গল্পের ওপর প্রভাব খুব বেশি পড়েনি। বরঞ্চ তাতে চরিত্রগুলোকে অত্যন্ত বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছিল । কিরান চরিত্রটি প্রতিটা অধ্যায়ে চোখের সামনে কল্পনা করতে পেরেছিলাম । একইকথা শারিয়ারের বেলায়ও । এছাড়া গল্পের প্রয়োজনে অসংখ্য চরিত্রের আনাগোনা দেখা যায় মগরাজ বইটিতে । লেখক বেশ শক্তহাতেই প্রতিটি চরিত্র ডেভেলপ করেছেন এবার । সিরিজের বাকি দু'টো বইয়ের চেয়ে এখানেও এগিয়ে রাখবো 'মগরাজ' বইটিকে । অন্যান্য পার্শ্বচরিত্রের মধ্যে বর্তমানে সময়ের ভুবন চরিত্রটি বেশ পরিণত ও স্মার্ট লেগেছে আমার কাছে । অতীতের বর্ণনায় চরিত্রের সংখ্যা অনেক বেশি । এদের মধ্যে পদ্ম চরিত্রটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য । স্ক্রিনটাইম খুব বেশি না হলেও এই চরিত্রটি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে । শারিয়ার কিংবা কিরানের পরে আমার সবথেকে পছন্দের চরিত্র সম্ভবত পদ্ম ই । সে যতবার কিরানকে উদ্দেশ্য করে 'জাহাজী' বলে সম্বোধন করেছে ততবার আমি নিজের মধ্যে একটা শিহরণ টের পেয়েছি যেন । কল্পনার চোখে দেখতে পেয়েছি সর্বস্ব হারানো এক নারীকে যে পুরুষদের সাথে সমানতালে যুদ্ধ করছে, যার চোখে একরাশ ক্রোধ, অন্তরে মায়া । আরেকটি চরিত্র আছে যার কথা না বললেই নয় । তার নাম সিলভেরা । তার সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য বা বর্ণনা বইতে নেই তবে কিরান বা অন্যদের ভাষ্যে যেটুকু বর্ণনা উঠে এসেছে তাতেই তাকে আমার ভীষণ ভালো লেগে গিয়েছে । তাই পুরো বইজুড়ে আমি সিলভেরাকে নিয়ে আরো বিস্তৃত কিছু আশা করেছিলাম । কিন্তু সেটা খুব বেশি পাইনি । বিশেষত সিলভেরার সাথে কিরানের পূর্বে সংঘটিত লড়াইয়ের বিশদ বর্ণনা আশা করেছিলাম। সিলভেরার মত এতটা শক্তপোক্ত চরিত্রকে আরেকটু সময় লেখক চাইলে দিতেই পারতেন । যাহোক, অতীতের অন্যান্য চরিত্র যেমন আকরাম বেগ, পট্টবর্ধন, বৈঠা, গোমেজ ইত্যাদি সকল চরিত্রকে বেশ উপভোগ করেছি । আর তালেব তৈমুরের কথা না বললেই নয় । এই চরিত্রটির স্ক্রিনটাইম খুবই কম কিন্তু রেশ অনেক বেশি । এই চরিত্রটির জন্য একটামাত্র বাক্য ই যথেষ্ট - 'তালেব তৈমুরের তূল্য কেউ নেই!'
● ভাষাশৈলী
সাড়ে পাঁচশোরও বেশি পৃষ্ঠার একটা বই লিখতে ভাষাগত দক্ষতা যে কতটা জরুরি সেটা পাঠকমাত্রই বুঝে ফেলবেন । কেননা ভাষার মাধ্যমেই পুরো গল্পের উপস্থাপনের ভিত্তি তৈরি হয় ; পাশাপাশি পাঠককে গল্পে ধরে রাখার জন্য কৌশলী ও সাবলীল ভাষাশৈলী যেকোনো লেখকের জন্যই বেশ চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার । তবে যারা রবিন জামান খানের লেখা পড়েছেন তারা ইতিমধ্যেই জানেন তার ভাষাজ্ঞান কতটা ভালো । বিশেষত লেখকের 'শব্দজাল' পড়লেই তার ভাষাগত দক্ষতার ব্যাপারে সম্যক ধারণা পেয়ে যাবেন । মগরাজ বইটিতেও লেখক দক্ষতার সাথেই ভাষার ব্যবহার করেছেন । অতীতের বর্ণনায় পুরোনোকালের টোনে শব্দচয়ন যেমন লক্ষণীয়, তেমনি বর্তমান অংশের ভাষায় পুরোপুরি ভাষাগত আধুনিকতার ছাপ স্পষ্ট । তবে কিছু কিছু জায়গায় উপমার ত্রুটি চোখে পড়লো । বিশেষত একশন দৃশ্যে ক্রিকেটীয় উপমা একটু বেমানান ই বটে । এছাড়া ৫২২ নম্বর পৃষ্ঠায় শেষের দিকের অনুচ্ছেদে একটা বাক্যের ক্রমাগত রিপিটেশন পেলাম । বাক্যটা হল 'কিরানের নজর সিলভেরার দিকে।' খেয়াল করলাম বাক্যটি ঐ অনুচ্ছেদে একটু রকমফের করে তিনবার এসেছে ।
● বর্ণনাভঙ্গি
যেহেতু বিশাল কলেবরের বই তাই বর্ণনার বেলায় বেশ সুন্দরভাবে সবকিছু ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক । বিশেষত স্থান ও পরিবেশের বর্ণনা আমার খুব বেশি ভালো লেগেছে । এই সুযোগে শুরুর অনুচ্ছেদটা হুবুহু তুলে দেবার লোভ সামলাতে পারছি না । বইটা উল্টেই যখন আপনি এমন কোনো বর্ণনা পড়বেন তখন অজান্তেই আপনার মনটা ভালো হয়ে যাবে -
" পশ্চিম দিগন্তে হেলতে থাকা সূর্যের তীর্যক আলোতে সোনালি কার্পেটের মতো ঝকঝক করছে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত গমখেত । আর কিছুটা সময় পার হলেই পাহাড়ের আড়ালে ঝপ করে মুখ লুকাবে পড়ন্ত সূর্যটা । গোধূলি আর বিকেলের দড়ি টানাটানি শেষ না হতেই হুট করে নেমে আসবে পাহাড়ি সন্ধ্যা । আর ঠিক সে সময়ের ই অপেক্ষা করছে ত্রিপুরা রাজ্যের ছোট্ট গ্রাম তুলপাধলার বাসিন্দারা ।"
এরকম বেশ সুন্দর উপস্থাপন ও উপমার প্রয়োগ পুরো বইতেই লক্ষণীয় । বিশেষত বরাবরের মত অতীতের অংশটা খুব বেশি ডিটেইলড্ । ব্ল্যাক বুদ্ধা এবং সপ্তরিপু বইতেও একই ব্যাপার খেয়াল করেছি । সত্যি বলতে হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার লিখতে হলে এটা খুবই জরুরি । কেন ইতিহাসের যে অধ্যায়টা ঘিরে রহস্য সেটার পুরোপুরি চিত্রটা পাঠকের সামনে তুলে না ধরতে পারলে পাঠক তা কল্পনা করতে ব্যর্থ হয় । সিরিজের অন্য বই দুটোর মত মগরাজ বইটিতেও অতীতের বর্ণনাভঙ্গি আমি খুব বেশি উপভোগ করেছি । বিশেষত যুদ্ধ ও যুদ্ধের অস্ত্রসস্ত্রের বিশদ বর্ণনা খুবই ভালো লেগেছে । বর্তমান সময়ের একশন সিনগুলোও ভালো লেগেছে । তবে সর্বোপরি বর্তমানের চেয়ে অতীতের বর্ণনার গভীরতা অনেক বেশি ভালো লেগেছে ।
● স্টোরিটেলিং
শুরুতেই বলেছি অতীত ও বর্তমান - দুটো টাইমলাইনে গল্পটা বলেছেন লেখক । আর এজন্য পুরো বইটাকে দুইটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন তিনি - অশ্রুপতন ও শূন্য জীবন । এক্সপোজিশনের আলোচনায় দেখতে গেলে প্রথম ভাগ হল বইটির ক্যারেক্টার ইন্ট্রোডাকশন এবং শেষের ভাগ অর্থাৎ 'শূন্য জীবন' অংশটি হল বইয়ের দ্য হুক অংশ । প্রথম ভাগের বেশিরভাগ সময়ই চরিত্রগুলো ডেভেলপ করেছেন লেখক । বিশেষত কিরান চরিত্রটির ডেভেলপমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে । তার অতীত ও বর্তমান সবকিছুর এতবেশি ডিটেইলিং ছিল যে এই চরিত্রটি একদমই বাস্তবিক লেগেছে আমার কাছে । কিরানের তুলনায় পিছিয়ে থাকবে কিন্তু শারিয়ার । শারিয়ারও যথেষ্ট স্ক্রিনটাইম পেয়েছে তবু কিরানের মত শতভাগ ডেভেলপড্ তাকে মনে হয়নি আমার । লেখকের হিস্টোরিক্যাল থ্রিলারগুলোর অতীতের চরিত্রের প্রতি বরাবর ই আমার দুর্বলতা কাজ করে । এখানেও একই ব্যাপার ঘটেছে । শারিয়ারকে ভালো লেগেছে তবে কিরান আমার মন ছুঁয়ে গিয়েছে । যাহোক স্টোরিটেলিং এ ফিরি । যেমনটা বললাম, ক্যারেক্টার ইন্ট্রোডাকশন, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড, বর্তমান অবস্থা, ব্যক্তিত্ববোধ ইত্যাদি ব্যাপারগুলো ফুটে উঠেছে অশ্রুপতন অংশে । এরপর শুরু হয় 'শূন্য জীবন'। এই খণ্ডটাকে আমি দ্য হুকের আওতাধীন বললাম কেননা এখান থেকেই মূলত বইটির চুম্বক অংশ শুরু হয়েছে । প্রথমভাগ পড়তে আমার কিছুটা সময় লেগেছে , তবে শেষের ভাগ রীতিমত গোগ্রাসে গিলেছি । যেহেতু ক্যারেক্টার ইন্ট্রোডাকশনে লেখক কিছুটা সময় নিয়েছেন তাই গল্পের শুরুটা পাঠকের কাছে স্লো মনে হতে পারে । তবে একবার মূল গল্পে ঢুকে পড়লে সমস্যাটা আর হবে না বলেই মনে করি আমি । অতীতের অংশের স্টোরিটেলিং খুবই ভালো লেগেছে আমার । কিন্তু বর্তমানের স্টোরিটেলিং কিছুটা ক্লিশে লেগেছে আমার কাছে । বিশেষত চরিত্রগুলো কেমন যেন একপেশে । তবে বর্তমান অংশের ভুবন, টমি এরা এককথায় দূর্দান্ত ছিল পুরোটা সময়জুড়েই । আরেকটা ভালো দিক উল্লেখ না করলেই নয় ; সিরিজের অন্য দুটি বই অর্থাৎ সপ্তরিপু ও ব্ল্যাক বুদ্ধা - তে গল্প যতই সামনে এগোচ্ছিল ততই প্রধান কালপ্রিট বা মূল গল্পটা ক্রমশ রিভিল হয়ে পড়ছিল । মগরাজে সেটা একেবারেই পাইনি । পুরো বই জুড়ে গল্পের পরিণতি নিয়ে একটা ধোঁয়াশা ছিল । পরিণতি সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্তে আসা যাচ্ছিল না যতক্ষণে বইটা শেষ না করেছি । তাই বইটা পড়ার সময়ে সামনে কী ঘটবে এটা জানার আগ্রহ ক্রমশ বেড়েছে । এছাড়া প্রতিটি অধ্যায়ের শেষে টুকরো টুকরো সূত্র, ছোটখাটো টুইস্ট ও আকস্মিক বাঁক - গল্পের সাসপেন্স বাড়িয়ে তুলেছে ।
● পরিণতি
বইয়ের সবথেকে আকর্ষণীয় অংশ হল এর পরিণতি । মগরাজের শেষের দিকে যতই গল্পের রহস্যটা উন্মোচন হচ্ছিল ততই উত্তেজনার পারদ ক্রমশ বেড়েছে । শেষের দিকে বেশ কিছু টুইস্ট ছিল । কিছু আগে থেকেই ধারণা করতে পেরেছিলাম ; কিছু পারিনি । তবে শেষের অধ্যায়ের মেজর টুইস্টটার জবাব নেই । কস্মিনকালেও এমন হতে পারে ভাবিনি । সব মিলিয়ে শেষের অধ্যায়ের চমকটা খুব বেশি উপভোগ করেছি । তাই মগরাজের পরিণতি নিয়ে আমি শতভাগ সন্তুষ্ট ।
● প্রোডাকশন
বইটা এবারের বইমেলায় অন্যধারা প্রকাশনীর ব্যানারে প্রকাশিত হয়েছে । প্রোডাকশনের দিক থেকে চমৎকার কাজ দেখিয়েছে তারা । শুরুতে বইয়ের দামটা বেশি মনে হলেও বইটা হাতে নিলে দারুণ একটা অনুভূতি হয় । শক্ত ও প্লেইন হার্ডবোর্ডের ওপর নান্দনিক প্রচ্ছদ ও নামলিপির পাশাপাশি বাঁধাইও চমৎকার । পৃষ্ঠার মান ও বেশ ভালো ।
● সম্পাদনা, বানান ও অন্যান্য
সম্পাদনার বেলায় কিছুটা ত্রুটি লক্ষণীয় বটে । বইয়ের শুরুতে সময়ের একটা ওলটপালট চোখে পড়েছে - যেখানে ১৬৬০ হয়ে গেছে ১৮৬০ । এছাড়া শারিয়ার এবং তানভীর দুজনের নাম ওলটপালটও হয়ে গিয়েছে একটা অনুচ্ছেদে । এগুলো একটু দৃষ্টিকটু ই বটে । এত ভালো প্রোডাকশনের একটা বই অথচ এরকম মেজর ত্রুটি আসলেই কাম্য নয় । এছাড়া বানান ভুলও পেয়েছি বেশ কিছু । মগরাজের দ্বিতীয় মুদ্রন ইতিমধ্যেই চলে এসেছে । আশা করি সেখানে সবকিছু সংশোধন করা হয়েছে । প্রচ্ছদটা সাদামাটা হলেও ভালোই লেগেছে আমার কাছে । তবে ব্যাকসাইডে কিছু এলিমেন্ট যোগ করলে ভালো হত । তবে নামলিপিটা বেশ আকর্ষণীয় ।
● লেখক সম্বন্ধে -
রবিন জামান খানের লেখার সাথে পরিচয় ২৫ শে মার্চ বইটির মাধ্যমে । সেটাও হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার ই বটে । এরপর সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধা মত লেখকের অন্যতম সেরা দুইটি বই পড়ে ফেলেছি । এরপর পড়লাম লেখকের সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার 'শব্দজাল' । রবিন জামান খানের লেখনশৈলী বরাবরের মতই আমার বেশ ভালো লাগে । বিশেষত ব্যক্তিগতভাবে 'সপ্তরিপু' আমার অনেক প্রিয় একটা বই । আর তাই এবার পড়ে ফেললাম লেখকের নতুন হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার 'মগরাজ' । মোটামুটি এক সপ্তাহ লেগেছে কলেবরে বিশাল পরিসরের বইটা শেষ করতে । আর সব মিলিয়ে বর্তমান অংশের কিছু ব্যাপার বাদ দিলে বইটা মোটা দাগে আমার ভালো লেগেছে ।
● সিরিজ প্রসঙ্গে -
ইতিমধ্যেই লেখক জানিয়েছেন এই সিরিজে মোট ৭ টি বই হবে : সপ্তরিপু - ব্লাক বুদ্ধা - মগরাজ - রাজদ্রোহী - সিপাহী - অসারোহী - মুক্তি । মগরাজ এই সিরিজের তৃতীয় বই । চলমান ভ্রান্তির উত্তর দেওয়া যাক এবার ।
মগরাজ বইটির কাহিনী বুঝতে হলে কি সিরিজের প্রথম দুইটি বই অর্থাৎ সপ্তরিপু ও ব্ল্যাকবুদ্ধা পড়ে নিতে হবে?
: না । আগের দুইটা বই পড়া না থাকলেও আপনি অনায়াসে মগরাজ শুরু করতে পারেন এবং পুরো গল্পটাই আপনি বুঝতে পারবেন ।
অর্থাৎ আপনি যদি শুধুমাত্র মগরাজ বইটি উপভোগ করতে চান তবে তার জন্য সিরিজের আগের দুটো বই পড়ে নেওয়ার দরকার নেই । আর আপনি যদি পুরো সিরিজটা উপভোগ করতে চান তবে শুরুতে সিরিজের অন্য দুইটি বই পড়ে নেওয়ার পরামর্শ থাকবে ।
● শেষের কথা
অনেক তো আলাপ হল । এবার উপসংহারে আসা যাক । ইতিহাস পছন্দ করেন এবং হিস্টোরিক্যাল থ্রিলারে আপনার আগ্রহে থাকলে বইটা অবশ্যই আমার পক্ষ থেকে রেকমেন্ডেড থাকবে । আশা করি ভালো লাগবে বইটা । শীঘ্রই ভারতের 'দ্য ক্যাফে টেবল' থেকে বইটার ভারতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হতে চলেছে । লেখককে ধন্যবাদ এত সুন্দর একটা বই পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য । তার পরবর্তী বইয়ের জন্য শুভকামনা রইল ।
ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলারের প্রতি আমার অন্যরকম এক আগ্রহ কাজ করে সব সময়। তাই রবিন জামান খানের নতুন বই 'মগরাজ' সম্পর্কে জানার পর থেকেই পড়ার প্রবল ইচ্ছা জেগেছিল মনে। লেখকের পূর্বে প্রকাশিত আরও অনেকগুলো বই বেশ পাঠকপ্রিয়তা পেলেও পড়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তাই এই বইয়ের প্রতি আগ্রহ একটু বেশিই ছিল। প্রচুর সমস্যা থাকলেও ৫৫৯ পৃষ্ঠার এই বিশাল বইটি একেবারেই হতাশ করেনি। এর মূল কারণ হলো চমৎকার প্লট। লেখক বেশ পারদর্শিতার সঙ্গে দুইটি ভিন্ন সময়ের গল্পকে সমান্তরাল ভাবে বলতে বলতে এক বিন্দুতে এনে মিলিত করেছেন।
১৬৬০ সালের দিকে সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সময় দিল্লির সিংহাসনের জন্য তার পুত্রদের মাঝে লড়াই, এবং সেই লড়াইয়ে হেরে গিয়ে শাহজাহানের দ্বিতীয় পুত্র শাহ সুজার আরাকান রাজের কাছে আশ্রয় নেয়া, যা তার জন্যই কাল হয়ে দাড়ায়, সেই সাথে তৎকালীন বাংলায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আধিপত্যে দোজখে পরিণত হওয়া উপকূলীয় জনপদের গল্প যেমন উঠে এসেছে, তেমনি বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া এক সাধারণ রোড এক্সিডেন্টের কেস কিভাবে আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী সংস্থাদের সম্পৃক্ততায় গিয়ে পৌছায় সেই রোমাঞ্চকর অভিযানও উঠে এসেছে বইয়ের কাহিনীতে। এই দুটো সময়কে এক করে দেয় ইতিহাসের এমন এক অধ্যায় যার মাঝে লেগে আছে অনেক রক্তের দাগ। বইয়ের প্রধান চরিত্রগুলোকে বেশ যত্ন সহকারে সময় নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে। প্রথম অংশে অনেকটা সময় নিয়ে চরিত্রগুলোর অতীত, তাদের জীবনে ঘটে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং বর্তমান অবস্থানে আসার পেছনের কারণগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে দুয়েকটি চরিত্রের ভূমিকা আরও বিস্তৃত হলে ভালো লাগতো। এতো বড় একটি কাহিনী, যেখানে দুট��� সময়ের মধ্যে লেখক ক্রমাগত ঢুকছেন আর বের হচ্ছেন, সেখানে পাঠকের আগ্রহ ধরে রাখাটাও বেশ দক্ষতার কাজ যা লেখক সফল ভাবেই করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমান সময়ের চেয়ে অতীতে অংশটিই অনেক বেশি উপভোগ্য মনে হয়েছে আমার। বর্তমান সময়ের অংশটুকুতে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের অফিসারদের কাজের ব্যাপারগুলোতে আরেকতু নতুনত্ব আসলে বোধহয় ভালো লাগতো। কাহিনীতে রহস্যের পাশাপাশি আছে একশন। বইটিতে একই সাথে জলদস্যুদের সময়ে সাগরের মাঝে জাহাজে করে কামান, তরবারি, বর্শা সহকারে রোমাঞ্চকর লড়াই এবং বর্তমান সময়ের আধুনিক অস্ত্র ও সরঞ্জামের ব্যাবহার, এই দুইয়ের মজাই পাওয়া যাবে।
সমস্যাগুলোর কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয় বানানের কথা। পুরো বইয়ে অসংখ্য ভুল বানানের ছড়াছড়ি। অনেক জায়গায় যতিচিহ্নের উল্টোপাল্টা ব্যবহার, বাক্যের গঠনে বিভিন্ন ধরণের অসঙ্গতি চোখে পড়েছে। আরেকটি বড় সমস্যা ছিল চরিত্রের নামে ভুল। বইয়ের বেশ কয়েকটি জায়গায় এক চরিত্রকে আরেক চরিত্রের নামে ডাকা হয়েছে যা বেশ কনফিউশন তৈরি করেছে। এই ধরণের গুরুতর ভুলগুলো বইয়ের মান অনেকটাই কমিয়ে দেয়। এইবার বইমেলায় প্রকাশ হওয়া আরও কিছু বইয়ে এই ধরণের সমস্যাগুলো অনেক চোখে পড়েছে। আশাকরি পরবর্তী কোন সংস্করণে এই ভুলগুলো ঠিক করে নেয়া হবে।
ইতিহাস নির্ভর এমন থ্রিলার আমাদের দেশে খুব কমই লেখা হচ্ছে। বাংলায় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের লুটপাট-অত্যাচার, ব্যাবসা-বাণিজ্যে আরাকানিদের আধিপত্য বিস্তার, তৎকালীন সময়ে বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা, মুঘল সাম্রাজ্যে ক্ষমতার লড়াই, সেই সময়ের যুদ্ধ কৌশল সবই চমৎকার ভাবে উঠে এসেছে বইটিতে। তার সাথে রহস্য-রোমাঞ্চ যোগ হয়ে বইটিকে নিঃসন্দেহে দারুণ উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইতিহাস নির্ভর থ্রিলার পছন্দ করলে বইটি অবশ্যই পড়ে ফেলা উচিত।
সুজলা সুফলা এই বাংলার মানুষ স্বভাবত্বই আরাম প্রিয়। এই বাংলার মানুষের বিনোদনের অন্যতম একটি মাধ্যম গল্প বলা আর শুনা। সেই সকল গল্পে কখনো উঠে এসেছে রাজ রাজা কিংবদন্তি কিংবা মিথলজি আবার কখনোও বা দস্যু ঠগী ফিরিঙ্গিরা। এরা বাস্তব, বাংলার আরাম প্রিয় মানুষদের জীবনে অশান্তি নিয়ে এসেছে এরা। আজ কথা বলবো মগ জল দস্যুদের নিয়ে। বাংলার দক্ষিন-পূর্বা অঞ্চলের মানুষের কাছে সমুদ্রের জল দস্যু এক বিশাল ভীতিকর এক নাম। তারা যখন হানা দেয় শুধু সম্পদ লুট না, নির্বিচারে মানুষের পিঠে চাবুক চালিয়ে যায় আর সেই সাথে অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী মানুষদের নিয়ে বিক্রি করে হুগলী আরাকানের বাজারে। এটা সেই সময়ের কথা প্রায় আজ থেকে চারশ বছর আগে যখন দিল্লীর মোঘল সালতানাতের পতাকা উড়ছিলো।
বলছিলাম মগ জলদস্যুদের নিয়ে। সুলেখক রবিন জামান খানের নতুন উপন্যাস " মগরাজ" সম্পর্কে। লেখকের সাথে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেয়ার তেমন কিছু, বিগত বেশ কয়েক বছর যাবৎ বাংলার পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছেন একের পর এক ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার উপন্যাস। সেই ধারাবাহিকতায় এবার এর বিষয় "মগরাজ"।
প্রথমে কাহিনী সংক্ষেপের আলোচনা সারি। রবিন জামান খানের হিস্টোরিক্যাল উপন্যাসের সাথে যারা পরিচিত তারা জানি তার লেখার ধরন। ডাবল টাইম লাইনে সমান্তরাল ভাবে কাহিনীর এগিয়ে চলা। ১৬৬০ সাল যখন মোঘল সালতানাতের পতাকা দিল্লীর আকাশে বাতাশে, মোঘল সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ। তার অসুস্থতার খবর ছরিয়ে পরলো দিল্লী ছেরে বাংলা পর্যন্ত। সম্রাট এর চার সন্তানদের মাঝে অভ্যান্তরী কোন্দল শুরু হয়ে যায়, তখন বাংলার সুবাদার ছিলেন শাহ্ সুজা। শাহ্ সুজা তার নিজের দুই ভায়ের কাছে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পলায়ন করে আরাকান রাজ দরবারে। কিন্তু আরাকান রাজ তাকে আশ্রয় দেয় ঠিকই কিন্তু সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পরে তার উপর। প্রাণ নিয়ে বাঁচার তাগিদে শাহ্ সুজা পলায়ন শুরু করে তখন তার পিছু নেয়, আরাকানরাজ, মগ আর পর্তুগীজ জলদস্যুরা। এদিকে শাহ সুজার বিশ্বস্ত সহযোগি তালেব তৈমূর হারিয়ে যান। তাকে ফিরিয়ে আনার জন্য ডাক পরে আরাকান এর সাবেক এক নৌ যোদ্ধা তালেব কিরান এর।
এদিকে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামে বড়লোক ঘরের একদল বেপরোয়া ছেলে মেয়ে রাতে ফুর্তি করতে গিয়ে তাদের গাড়িতে এক্সিডেন্ট হয় এক বিখ্যাত আর্কেলজিষ্ট ডক্টর সুলতান আবেদল। ডক্টর সাহেব এর প্রোফাইল চেক করে দেখা যায় বছর পাঁচেক আগে বাংলাদেশ সরকার তার আর্কেলজির লাইসেন্স বাতিল করে দেয়। এবং সেই থেকে প্রফেসর কিছু খোঁজার তাগিয়ে একদম চিরতরে তার গবেষনা কর্ম নিয়ে হাইবানেশনে চলে যায়। এবং তার গবেষনা পাওয়ার জন্য বিদেশি কিছু বৈধ অবৈধ সংস্থা শুরু করে নানান চক্রান্ত। এই কেসে ডাক পরে সদ্য জার্মান থেকে ট্রেনিং প্রাপ্ত পিবিআই অফিসার শারিয়ার এর। আর এভাবেই শুরু হয় ডাবল টাইম লাইনে খেলা।
সুলেখক রবিন জামান খানের আগের দুটো হিস্টোরিক্যাল থৃলার এর চেয়ে মগরাজ আমার কাছে একটু ভিন্ন লেগেছে। তাই এখন ধীরে ধীরে আলোচনা করবো।
প্রথমে আসি প্লটের ব্যাপারে, লেখক ডাবল টাইমলাইনে সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে যাওয়া এবং শেষে দুই প্লটকে এক বিন্দুতে এনা বেশ দারুণ বলা চলে। লেখক আগের দুটো বই এর মতো হুটহাট করে শুরে করেন নি, বুঝাই গেছে বইটি বেশ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে লেখা। কারন শুরু থেকে ধীরে ধীরে লেখক গল্পে এগিয়েছেন। গল্পের প্রারম্ভ অংশে তুলাপাধা গ্রামের বর্ননার মধ্য দিয়ে তারপর অতীত কাল নিয়ে লেখক শুরু করেছেন, আর ঐদিকে শারিয়ার কে দিয়ে বর্তমান। লেখক বেশ সময় নিয়ে তৈরি করেছেন প্লট তা বুঝা গেছে ভালোই। কোন তারাহুরার ছাপ ছিলোনা। কোন ধীপ ধাপ কাজ ছিলো না, ফলে পাঠক হিসাবে একটু বোরিং লেগেছে। এবার লেখক দুই অংশে বইটি ভাগ করেছেন, অশ্রুপতন এবং শূন্য জীবন।
এবার আসি চরিত্রানয়ের দিকে, সারে পাঁচশ পেজের ঢাউস সাইজের বই, এতে প্রায় পঞ্চাশটিরও বেশি প্রধান অপ্রধান চরিত্র ছিলো। দুই অংশে দুই নায়ক। যেন এক টিকেটে দুই নায়কের সিনেমা। তালেব কিরান আর বর্তমান এর শারিয়ার। তালেব কিরান সাবেক নৌ যোদ্ধা। তার আগমন ঘটে ষাঁড়ের লড়াই এর মধ্য দিয়ে। তার চরিত্রের দৃঢ়তা বীরত্বতা, তার স্থির মানসিকতা বেশ ভালো ছিলো, শারিয়ার তুলনামূলক বিপরীত একটু ইগোয়েটিক পারসোনাল, সেই সাথে যথেষ্ট বুদ্ধিমান তা গল্পের ভিতরে পেয়েছি। শারিয়ার চরিত্রটি আরেকটু জোরদার হওয়া দরকার ছিলো। যদিও শেষাংশে তার ভিতরে নায়ক চরিত গুন পাওয়া গেছে ভালোই। এছাড়া অতীতে কিরানের সাথের বেদু, গোলন্দাজ, বৈঠা, গোমেজ এই চরিত্রগুলো বেশ ভালো ভাবে মানিয়ছে, আর বর্তমানে শারিয়ার এর সাথে টমি, সুমন, ভুবন। রুম্পার কথা ভুলি কিভাবে, লেখক রুম্পার প্রথম বর্ননায় মাথা শ্যারোন স্টোন কে ঢুকিয়ে দিয়েছে। হাহা। অতীতের চরিত্র গুলো আমাকে বেশি টেনেছে, যাকে কেন্দ্র করে রহস্য তালেব তৈমূর তাকে বেশ লেগেছে, এছাড়া অন্যান্য চরিত্র গুলো আহমেদ বেগ, চাচা, পদ্ম দস্যু রাণী বেশ মনে ধরার মতো। পদ্ম দস্যূরানী চরিত্রটা একটু বেশি ভালো লেগেছে যেভাবে তার উৎত্থান এবং তার চলায়ন দৃঢ় একজন নারী হিসাবে অসাধারন। খলচরিত্রে সিলভেরা ভালো ছিলো। বর্তমানের চরিত্রগুলো একটু খাপ ছাড়া ছিলো।
আমি আবারো বলছি যে বইটার শুরুটা ছিলো ধীর গতির। যতটুকু জানি লেখক এর ড্রিম প্রোজেক্ট মগরাজ। তো এর বর্ননা ভঙ্গি ছিলো বেশ ঢিলেধালা, অর্থাৎ খুব সাধারণ জীবন যাত্রার কাহিনী দিয়েই দুই অংশ শুরু আর তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়া। লেখক খ��ব সুন্দর ভাবে সেই সময়ের চটাগাঁও, আর বর্তমানের চট্টগ্রাম এর বর্ননা দিয়েছেন। স্পেশালী আমার ভালো লেগেছে চারশ পেজ এর পর থেকে যখন চট্টগ্রাম কোর্ট, মহসিন কলেজ আরো বেশ কিছু জায়গা, আর অতীতে জংলাটিলা সন্দ্বীপ। টুর প্রেমিদের জন্য বেশ ছিলো। আগ্রহ জাগানিয়া বর্ননা।
লেখকের ভাষাশৈলী ছিলো ভালো। কোথাও অঞ্চলিকতা আর প্রমিত এর মিশ্রণ ছিলো না। লেখকের ভাষা বিজ্ঞান সম্পর্ক কে ভালো জ্ঞান আছে তা সেই "শব্দজাল" উপন্যাসেই পেয়েছিলাম।
গল্পটির প্লট স্টোরি এবং চরিত্র সবকিছু বেশ ভালোই ছিলো, এবং শেষাংশে পরিনতিই ইতিবাচক। একদম জায়গাম মতো টুইস্ট এবং সসময়ে একেক জনের উপস্থিতি বেশ ভালো ভাবেই শেষ হয়েছে। আমাকে সবচে বেশি টেনেছে চারশ পেজের পরের পেজ গুলো সে ছেড়ে উঠাই আমার জন্য মুশকিল ছিলো। অতীতাংশ বেশি ভালো ছিলো।
আগেই বলেছি মগরাজ লেখকের ড্রিম প্রোজেক্ট। মগরাজ নিয়ে আমার এগিয়ে চলা ছিলো কচ্ছপ গতির। কখনো রাতে ঘুমানোর আগে কখনো সকালে ঘুম থেকে উঠে কিংবা ইফতারের আগে পরে এভাবে কেটেছে। আসলে গত দুবছর করোনা মহামারীর জন্য আমার বই পড়া জীবনে বেশ ভাটা এসে লেগেছে, তাই স্লো থেকে স্লোতর হয়ে গিয়েছি। মগরাজ নিয়ে আমার জার্নিটা ভালো ছিলো। মাঝখানে ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিলাম বাট সময় নিয়ে ধরে রেখে এগিয়েছি এবং আরেকবার প্রমাণ করতে পারলাম ধৈর্যের ফল দারুণ কিছু হবে। সো মগরাজ নিয়ে আমার জার্নি বেশ ভালো ছিলো।
মগরাজ বইটি প্রকাশ করেছে অন্যধারা প্রকাশনী। প্রকাশনা জগৎ এ অন্যধারার বেশ সুনাম শুনেছি, কিন্তু মগরাজ নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা ভালো না। বই এর প্রডাকশন বেশ ভালো ছিলো। বাঁধাই বেশ শক্ত পক্ত, মলাট বেশ হার্ড, ফ্লাপ ছিলো কার্ড কাগজের, সেলাই ছিলো বেশ, বইটি অন্য সব বই এর চে একটু লম্বায় বড়, সাইজেও বড় ওজনেও বড়। সর্বাপরি প্রাইম একটা লুক। কিন্তু ভিতরে এ কি হাল? বই এর বেশ কয়েকটা পেজ ভাজ করা ছিলো। সেটা বড় কথা না বই তে অনেক অনেক ভুল, অনেক মেজর পয়েন্ট এ ভুল। একদম শুরুতেই ১৮৬০ যেটা হবে ১৬৬০ সাল। তাছারা বর্তমান অংশের গল্পে শারিয়ার বারবার হয়ে যাচ্ছে তানভির। তাছারা বানান ভুল অহরহ। আরো আছে কমা, দাড়ি, ইনভাইটেট কমা ঠিক মতো পরেনি। একজায়গায় একটি ইনভাইটপট কমা আরেক জায়গায় নেই, শব্দের মাঝে স্পেস মিসিং, বানান ভুল, প্যারা মেকিং এ ভুল, অতীত অংশে কিরান এর জায়গায় শারিয়ার এর এসে পরা, শারিয়ার এর জায়গায় কিরান। উফ্। ভাই বই পড়ে শিখতে বসছি ভুল ধরতে নয়। অন্যধারা প্রুফ রিডার ছাড়াই বইটি প্রকাশ করেছে বেশ আঘাত পেয়েছি মনে। পাঠক এতো টাকা খরচ করে যদি এতো ভুলে ভরা জিনিশ নেয় তখন। তাহলে প্রথম মুদ্রণ এর বই পড়াই বাদ দিবো? প্রচ্ছদ নিয়েও অসঙ্গতি। কেন আমাদের দেশের প্রকাশনী গুলো এতো উদাস?? আমার মতে প্রডাকশন ভালোর চেয়ে বই এর ভিতরের বানান এবং ভুল গুলোর দিকে নজর দেয়া উচিত।
আর আলোচনা বাড়াবো না, মগরাজ বইটি নিয়ে বেশ দারুণ কিছু দিন কেটেছে আমার। লেখক রবিন জামান খানের প্রায় সব বইই পড়া। "সপ্তরিপু", "ব্ল্যাক বুদ্ধা" এর পর যোগ হলো "মগরাজ"। এছারা লেখক এর সাইকোলজিক্যাল থৃলার "শব্দজাল" এবং মুক্তিযুদ্ধ ভিক্তিক থৃলার "২৫শে মার্চ", এসবের সাথে আমার পড়া তালিকায় যুক্ত হলো "মগরাজ"। "মগরাজ" নিয়ে আপনাদের জার্নি বেশ ভালো কাঁটবে আশাকরি আগ্রহী পাঠকরা পড়তে পারেন।
পুনশ্চ : রাজদ্রোহী এর একান্ত অপেক্ষায় আছি।
পারসোনাল রেটিং : ৪.৫/৫, গুডরিডস রেটিং : ৪.১৫/৫।
ফিরে দেখা,
বইয়ের নাম : মগরাজ লেখক : রবিন জামান খান জনরা : হিস্টোরিক্যাল থ্রিলার উপন্যাস। প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারী ২০২১ প্রচ্ছদ : আশরাফ ফুয়াদ প্রকাশনা : অন্যধারা প্রকাশনী। পৃষ্টা সংখ্যা : ৫৫৭ পেজ প্রচ্ছদ মূল্য :৭০০ টাকা।
ধন্যবাদ, ভালো থাকবেন, সাবধানে থাকবেন সবাই।
বই ধার চাইবেন না, বই ধার দেইনা। মগরাজ তো ভুলেও না।
রবিন জামান খান স্যারের লেখনীর কোনো জবাবই নেই। সময় উপাখ্যান সিরিজ একটা মাস্টারপিস। এর আগে শুধু সপ্তরিপু পড়েছি,গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতোন। আজ পড়লাম "মগরাজ"।সেই গভীর লেখনী,প্রখর বুদ্ধিমত্তা,প্রতি পাতায় থ্রিল। অসাধারণ এককথায়! ইতিহাসে বরাবরই আগ্রহ আমার,আর ইতিহাসনির্ভর থ্রিলার হলে তো কথাই নেই। কখনো কেঁদেছি,কখনো হেসেছি,কখনো ভয়ে কুঁকড়ে গেছি, কখনো গা ছমছম করেছে,কখনো ভেবেই গেছি এরপর কি হবে,কি হবে! পাঁচ তারা দেওয়াই যুক্তিযুক্ত মনে হলো! এতো বড়ো একটা বই,৫৫৯ পৃষ্ঠার বই,পুরোটা যে কারো মনোযোগ ধরে রাখতে বাধ্য আর এখানেই লেখকের সার্থকতা।
১৬৬০ সালে সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার খবর পেয়ে সিংহাসন দখলের দৌড়ে নেমে পরপর দুইবার পরাজিত হন সম্রাটের পুত্র শাহ সুজা। ছোটভাই আওরঙ্গজেব বাবাকে বন্দি করে উপহার হিসেবে পাঠিয়েছেন তার পিয় পুত্র দারাশিকোর খন্ডিত মস্তক। নিজের পথ সম্পূর্ণ নিষ্কণ্টক করর উদ্দেশ্যে শাহ সুজার ও একই অবস্থা করতে চাইলেন তিনি। বংলার অমূল্য সম্পদ এবং প্রাণ বাচানোর জন্য পালিয়ে গিয়ে আরাকানের রাজার কাছে সপরিবারে আশ্রয় নিলেন শাহ সুজা। কিন্তু আরাকান রাজের বিশ্বাসঘাতকতায় সপরিবারে নিহত নিহত হলেন। কিন্তু সেখান থেকে তার সমদ নিয়ে পালালেন শাহ সুজার বন্ধু তালেব তৈমূর। সেই অমূল্য সম্পদ হস্তগত করার উদ্দেশ্য আরাকানের রাজা হাত মেলালো পর্তুগীজ ও মগ জলদস্যুদের সাথে। এই সময়কালে বাংলার মানুষ এসব জলদস্যুদের অত্যাচারে অতিষ্ট ছিলো। তারা শুধু সম্পদ লুট করে ক্ষান্ত থাকত না, বরং তাদের লুটের মূল সামগ্রী ছিল মানুষ। তারা কোন একটি গ্রাম বা মহল্লায় আক্রমণ করে শিশু এবং বৃদ্ধদের মেরে ফেলত। প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে যা করত তা ছিল আরো নিষ্ঠুর। তাদের হাতের তালুতে ফুটো করে তার মধ্যে দিয়ে নলখাগড়া ঢুকিয়ে কয়েকজন কে ফেলে রাখা হতো জাহাজে যতদিন পর্যন্ত না তাদের মানুষের হাট থেকে কেউ কিনে নিয়ে যেত দাস হিসেবে। মেঝেতে চাল ছড়িয়ে রাখত খাওয়ার জন্য। তালেব কিরান কে ধরার জন্য যে দল গঠন করা হয়েছিল সেই দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছিল সিলভেরা। সিলভেরা ছিল লম্বায় দেড় মানুষ এবং প্রস্থে তিন মানুষ সমান এক অতিমানব। বাংলার মানুষকে সিলভেরার অত্যাচার থেকে বাঁচানোর জন্য এবং তালেব তৈমূর ও শাহ সুজার সম্পদ রক্ষা করার জন্য নিজের দলবল নিয়ে অভিযানে নামে কিরান। _ বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামে খুব সাধারন একটি সড়ক দুর্ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে একের পর এক রহস্যে জড়িয়ে যাচ্ছিলো পুলিশ বিভাগ। শেষ পর্যন্ত তদন্তের ভার পরে স্পেশাল পুলিশ অফিসার শারিয়ারের ওপর। সাধারন এই দুর্গটনার মধ্যে তারা দেখতে পার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চোরাচালানকারী সংগঠনের তৎপরতা। সামান্য সড়ক দুর্ঘটনার তদন্ত পরিনত হয় শাহ সুজার গুপ্তধন খোঁজার মিশনে। _ সময় উপাখ্যান সিরিজের তৃতীয় বই এটা। যদিও আগের দুটো পড়া হয়নি, এটা পড়তে কোন অসুবিধা হয়নি। সমান্তরাল ভাবে অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনাপ্রবাহ এগিয়ে চলেছে খুব সুন্দরভাবে। বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে একইসাথে এরকম মানের ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং থ্রিলার আমি আগে পড়িনি। অতীতের বর্ননাগুলো সত্যিই অসম্ভব সুন্দর। মোঘল, আরাকান, পর্তুগিজ ও মগ জলদস্যু ,তৎকালীন সমাজ ও পরিবেশ যেভাবে লেখক গল্পের মধ্যে তুলে নিয়ে এসেছেন সেটা সি���্যিই প্রশংসনীয়। পর্তুগীজ জলদস্যুদের নিয়ে খানিকটা জানলেও মগদের কে নিয়ে কিছুই জানতাম না। মগের মুল্লুক বা মগবাজার এগুলোর সাথে পরিচিত হলেও কখনো মগ জিনিসটা কি সেটা জনতাম না। বইটাতে এরকম আরো অনেককিছুই উঠে এসেছে। পুরো বইটাই ছিল এডভেঞ্চারে পরিপুর্ণ, ৫৬০ পাতার ঢাউস বইটা পড়তে গিয়ে একবারও বিরক্ত তো হই ই নি, বরং বইটাকে শেষ না করা পর্যন্ত ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। বর্তমান সময়ের গল্পটাও একইরকম থ্রিলিং এবং এডভেঞ্ছারাস। শারিয়ার-ভুবন জুটি বইটাকে অন্যরকম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। আর যদি শুধু শারিয়ারে কথা বলি, তবে বলতে হবে শারিয়ার সাহসিকতা, বুদ্ধি এবং শক্তিতে পরিপূর্ণ একটা চরিত্র। এরকম শক্তিমান একটা চরিত্র গল্পটাকেও অনেকাংশে শক্তিশালী করেছে। তাছাড়া পারিপার্শ্বিক চরিত্রগুলো, বর্তমান সময়ের ভুবন, সুমন,টমি, শশী এবং অতীতের তালেব তৈমুর গোমেজ, গোলোন্দাজ, মগদোষীদ, পট্টবর্ধন গল্পটাকে অনেক স্কেল আপ করেছে। য়ার লেখক বেশ সময় নিয়ে চরিত্রগুলোকে পরিচয় করিয়েছেন, যেটা আমার বেশ ভালো লেগেছে। আর শেষের টুইস্টগুলো আমি এখনু হজম করতে পারিনি। এগুলোর জন্যই এত বড় বইটা পড়া সার্থক মনে হয়েছে। _ এবার কিছু নেতিবাচক দিক নিয়ে বলি। প্রথমত, বানান ভুল এবং সম্পাদনার ত্রুটি। আমি প্রথম এডিশনটা পড়েছি,। আমি সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছি না যে অন্যপ্রকাশের মতো এত বড় একটা প্রকাশনা সংস্থা কীভাবে এত ভুল করতে পারে। বইটা কেউ আদোও সম্পাদনা করেছে কীনা আমার জানা নেই। শারিয়ার তানভীর কিরান, বেশ কয়েকবার এদের নাম পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। আর বানান ভুল তো অসংখ্য। এরকম বড় মাপের, এত ভালো কোয়ালিটির বইতে এরকম ভুল মেনে নেওয়া কষ্টকর। পরবর্তী এডিশন গুলোতে হয়ত সেগুলো ঠিক করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে আরো সতর্ক হওয়া উচিৎ। গল্পের সাথে এইসব ভুল একেবারেই বেমানান। আরেকটা বিষয় ঠিক নেতিবাচক না, তবে কারো কারো কাছে বর্ননা একটু অতিরিক্ত মনে হতে পারে। তবে আমার কাছে মোটেই অতিরিক্ত মনে হয়নি, বরং বইয়ের বর্ননারে ধরন বেশ উপভোগ্য ছিল। এর পরের বিষয়টা নেতিবাচক তো নয় ই এটাকে ইতিবাচকই বলা চলে, সেটা হলো গল্পটা সম্পূর্ন নয়, তবে এই অসম্পূর্নতা পুরোপুরি অসম্পূর্নতা না। বরং বইটাকে বেশ ভালোভাবেই শেষ করা হয়েছে। ৫৬০ পৃষ্ঠার এত বড় একটা বই পড়ে মোটেই হাতাশ হইনি। একই সাথে সিরিজের অন্য সব বই বিশেষত পরবর্তী বই রাজদ্রোহী পাড়ার জন্য আর ধৈর্য ধরতে পারছি না। যদিও আমি চাই এই সিরিজটা আরো অনেক দিন চলুক, তার পরও আমি আশা করব, পরবর্তী বই অর্থাৎ রাজদ্রোহীতে এর একটা পরিপূর্ণ সমাপ্তি পাব। "শূন্য থেইকা আসে মানুষ, শূন্যে মিলাই যায়, নাওয়ের মাঝি হাল ধইরাছে, খবর কে-বা পায়।"
This entire review has been hidden because of spoilers.
"এক লোক শ্বশুরবাড়ি গেছে। বৃষ্টির দিন। তো সেই লোক দুয়ারে দাঁড়াইয়া ভিজতাছে। কারণ শ্বশুর বাড়ির ঘরের চাল ভাঙা। ঘরে যারা আছে তারাও ভিজতাছে। তাই শাশুড়ী জামাইরে ডাক দিয়া বলতাছে, জামাই বাইরে দাঁড়াইয়া ভিজতাছো কেন? ঘরে আইসা গোসল করো।"
দিল্লির সিংহাসনে তখন মোঘল সম্রাট শাহজাহান। সম্রাটের তিন পুত্র দারাশিকো, শাহ সুজা এবং আওরঙ্গজেব সকলেই পরবর্তী সম্রাট হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। পিতার মৃত্যু সংবাদে সকলেই ক্ষমতার দিকে হাত বাড়ায়। বড় ছেলে দারাশিকো দিল্লিতে থাকলেও অপর দুই ছেলে ছিল দিল্লি থেকে দূরে। তারা নিজ নিজ সৈন্য নিয়ে রাজধানীর দিকে ধাবিত হয়। দারাশিকোকে পরাজিত ও হত্যা করে নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করে আওরঙ্গজেব। শাহ সুজা যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েও আওরঙ্গজেবের শক্তিশালী বাহিনীর সাথে পেরে উঠতে না পেরে রণে ভঙ্গ দিয়ে পালিয়ে আসেন বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে আরাকান রাজার আশ্রয়ে। কিন্তু আরাকান রাজা বিশ্বাসঘাতকতা করে হত্যা করে শাহ সুজার পরিবার ও সেনাবাহিনীকে। এই বিশ্বাসঘাতকার যবানিকাপাতের অন্যদিকে ছিল বিশ্বস্ত সহচর তালেব তৈমুর। তিনি শাহ সুজার সকল সম্পত্তি নিয়ে রওনা হয়ে যান, যাতে করে এসকল সম্পত্তি আরাকান রাজ বা পর্তুগিজ জলদস্যুদের হাতে না পড়ে। এদিকে সেই দলের পিছু নেয় পর্তুগিজ জলদস্যু সিলভেরা। চাঁটগায়ের ব্যবসায়ী তালেব কিরান হলো তালেব তৈমুরের সন্তান। মগ ও পর্তুগিজরা আগে থেকেই উৎপাত করে আসছিল দক্ষিণাঞ্চলে। তবে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি শাহ সুজার কারণে। এদিকে শাহ সুজা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার কারণে চাঁটগায়ের ব্যবসায়ীরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। এমন সময়ে তালেব কিরানকে তার শুভাকাঙ্ক্ষীরা পরামর্শ দেয় যুদ্ধ অভিযানের প্রস্তুতির জন্য। যে যুদ্ধ পর্তুগিজ জলদস্যু সিলভেরার বিরুদ্ধে যার সাথে তালেব কিরানের রয়েছে পুরনো শত্রুতা। এছাড়া এই অভিযানের আরেকটি উদ্দেশ্য তালেব তৈমুর ও শাহ সুজার ধন-সম্পদ উদ্ধার করা। তালেব কিরান ও তার বাহিনী কি পারবে এই অভিযানে সফল হতে নাকি আরেকবার পরাজিত হবে দস্যু সিলভেরার হাতে?
চট্টগ্রামের পতেঙ্গা হাইওয়েতে এক বৃষ্টির রাত। বড়লোকের নষ্ট হয়ে যাওয়া কিছু সন্তান বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালাচ্ছে। এমন সময় এক ব্যক্তিতে ধাক্কা মারে এবং ঘটনাস্থলেই তিনি মারা যান। লাশ রাস্তা থেকে সরানোর আগেই পুলিশের কাছে ধরা পড়ে যায় তারা। দেখলে মনে হবে সাধারণ একটা সড়ক দূর্ঘটনা। কিন্তু লোকটির পরিচয় জানার পর আর ঘটনাটি সাধারণ থাকেনা। লোকটি একজন নামকরা প্রত্নতত্ত্ববিদ। যিনি কিনা কয়েকবছর যাবত নিখোঁজ। এতদিন পর তাও আবার রাতের বেলায় তিনি ওই রাস্তাতেই কী করছিলেন? এই কেসের সমাধান করতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে পাঠানো হয় সদ্য স্কটল্যান্ড থেকে প্রশিক্ষণ শেষ করে আসা শারহান শারিয়ারকে। পিবিআইয়ের এই মাথা গরম এজেন্ট কি পারবে এই সমস্যার সমাধান করতে? যেখানে রহস্য কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই কারো!
আগের দুই বই সপ্তরিপু ও ব্ল্যাক বুদ্ধার তুলনায় এই বইটির গল্পটা ভালো লেগেছে। মোঘল সময়টাতে বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলে পর্তুগিজ ও মগদের বর্বরোচিত আক্রমণ এবং মানুষদের দাস হিসেবে বিক্রি করে দেয়া তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ মনোভাবের সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া মগদোষী নারীদের প্রতি সহানুভূতি ত ছিলই। লেখক সপ্তদশ শতাব্দীর আবহ সৃষ্টি করতে পেরেছেন বলে আমার বিশ্বাস।
'সময়' সিরিজের তিনটি(প্রকাশিত; আরো চারটি প্রকাশিত হবে।) বইয়ের মধ্যে এই বইটি সেরা হতে পারতো। কিন্তু হয়নি প্রকাশকের ব্যবসায়িক চিন্তায় দায়িত্বহীনভাবে দ্রুত বই বের করা এবং লেখকের অবহেলায়।
রিভিউয়ের শুরুতে যে গল্পটা বললাম, বাতিঘর থেকে অন্যধারাতে যাওয়ার পর রবিন জামান খানের বইয়ের অবস্থা তেমনি হয়েছে। শুধু প্রকাশনীকে আমি দোষ দিব না। কারণ প্রকাশনী বই দ্রুত বের করতে চাইবেই, এতে তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে। কিন্তু লেখক কি একটা ফাইনাল রিডিং দিতে পারতেন না? এত টাকার বই, মানেও ত সেইরকম করা উচিৎ। চরিত্রের নাম ভজঘট, বাইরের নামও আছে। বিস্তর বানান ভুল। বাক্য ভুল। এগুলা বিরক্তিকর।
বইটা এত বড় হওয়ার কারণ লেখকের গল্প বলার ধরণ। লেখক একটা জিনিসকে বারেবারে বলে সেইটারে শুধু টেনে লম্বা করেছেন। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। যখনই কেউ কোনো ঘটনা সম্পর্কে জ্ঞাত ব্যক্তিতে জিজ্ঞাসা করছেন কী হয়েছে; তখন তিনি সেই দিকে না গিয়ে শুধু বলেছেন সেইটা পরে বলবে। আগে অন্য কথা বলে দৃশ্যপট দীর্ঘায়িত করেছেন। কয়েক জায়গাতেই এমন পুনরাবৃত্তি। এছাড়া সপ্তদশ শতাব্দীর মানুষদের চিন্তাভাবনা এত আধুনিক ছিল কিনা সে-সম্পর্কে সন্দেহ রয়েছে।
লেখকের মেধা আছে; আছে পরিশ্রম। এখন শুধু উপস্থাপনা অর্থাৎ প্রকাশনীর কার্যক্রম এবং লেখার সম্পাদনা ঠিকঠাকমতো করতে পারে তাহলেই সামনের বইগুলো আরো ভালো হবে আশা করি। হ্যাপি রিডিং।
মোঘল সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়তেই দিল্লীর মসনদ দখলের লড়াইয়ে মেতে ওঠে তার তিন পুত্র। দুই ভাইয়ের কাছে যুদ্ধে হেরে পলায়নরত স্বঘোষিত সম্রাট শাহ সুজা আরাকান রাজের আশ্রয়ে অতিথী হলে, লোভী আরাকান রাজ রাতের আঁধারে হামলা চালায় তার বাসভবনে। কিন্তু সম্রাট সুজার সাথে থাকা মোঘল সম্পদের বিরাট ভান্ডার দখলের আগেই সম্রাট সুজার একান্ত কাছের মানুষ সেটা নিয়ে রওনা দেয় বাঙাল মুল্লুকের উদ্দেশ্যে। তাকে ধাওয়া করতে আরাকান রাজের নির্দেশে মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের নিয়ে গঠন করা হয় বিরাট বাহিনী। বিপরীতে চট্টগ্রাম থেকে এই বিরাট বাহিনী প্রতিহত করে সুজার একান্তু কাছের মানুষকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব নিতে বাধ্য করা হয় মোঘল নৌবাহিনীর প্রাক্তন কাপ্তান চট্টগ্রামের তালেব কিরানকে।
অন্যদিকে বর্তমান সময়ে চট্টগ্রামের পতেঙ্গা রোডে অ্যাক্সিডেন্টে মারা পড়ে এক ব্যাক্তি। মানুষটির মৃত্যুর সাথে সাথে দেশে-বিদেশে সক্রিয় হয়ে ওঠে একাধিক মহল। ঘোলাটে পরিস্থিতি সামাল দিতে চট্টগ্রাম পাঠানো হয় সদ্য বিদেশ থেকে ট্রেনিং শেষ করে দেশে আসা পিবিআই এর স্পেশাল ফিল্ড এজেন্ট শারিয়ারকে। কিন্তু চট্টগ্রামে পৌছে পরিস্থিতি সামলানো তো দূরে থাক বরং একের পর এক আক্রমণে বিপর্যস্ত হয়ে ওঠে সে। একদিকে অথরিটির চাপ, অন্যদিকে অচেনা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ সেইসাথে নিজের আত্মসম্মাবোধ, সবমিলিয়ে শারিয়ারকে সামলাতে হবে এমন এক পরিস্থিতি যেখানে বিবেকের চাইতে অনেক ওপরে স্থান দিতে হবে বিবেচনাবোধ আর সাহসকে। বাধ্য হয়ে অথরিটির বিরুদ্ধে গিয়ে তাকে কাজে নামতে হয় নিজের টিম নিয়ে। ঘটনার পরিক্রমায় সে জানতে পারে ইতিহাসের এমন এক অধ্যায়ের সংযোগ আছে এই ঘটনার যা আজ বিলীন প্রায়। শারিয়ার আর তার দল কি পারবে ইতিহাসের অতল থেকে সেই হারানো অধ্যায় খুঁড়ে বের করতে ...?
২৫শে মার্চ, সপ্তরিপু, ব্ল্যাক বুদ্ধার মতো ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস ও শব্দজালের মতো সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার দিয়ে বাংলাদেশ ও কোলকাতায় পাঠক প্রিয়তা অর্জন করা লেখক রবিন জামান খানের উপন্যাস মগরাজ- যেখানে ইতিহাসের হারানো অংশ থেকে তুলে আনা হয়েছে হারানো এক অধ্যায়।
◑ বই পরিচিতি: ▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬ ➠বইয়ের নাম : মগরাজ ➠লেখক : রবিন জামান খান ➠প্রকাশকাল : বইমেলা, ২০২১ ➠প্রকাশনী : অন্যধারা ➠প্রচ্ছদশিল্পী : আশরাফ ফুয়াদ ➠পৃষ্ঠা সংখ্যা : ৫৫৯ ➠মুদ্রিত মূল্য : ৭০০ টাকা ➠জনরা : হিস্ট্রিক্যাল থ্রিলার
◑ কাহিনী সংক্ষেপ:
সময়:১৬৬০ খ্রিস্টাব্দ
পানিপথের যুদ্ধে প্রথম ইব্রাহিম লোদির বিরুদ্ধে বাবরের জয়ের মাধ্যমে মুঘল সাম্রাজ্যের সূচনা হয়। কালের ধারাবাহিকতায় সেই ❝মুগলিয়া সালতানাত❞ এর সম্রাট হিসেবে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন সম্রাট শাহজাহান। দীর্ঘ শাসনামলের পরে যখন সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন তখন দিল্লির মসনদের ভিত কেঁপে ওঠে। দিল্লির মসনদের ভিত কেঁপে ওঠা মানে পুরো মোঘল সালতানাত, মানে পুরো ভারতবর্ষের ভিত কেঁপে ওঠে। ভারত দিল্লির ক্ষমতায় আরোহণের জন্য তখন সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মাঝে যুদ্ধের আভাস। তুলনামূলক শান্তিপ্রিয় অঞ্চল বাংলার সুবাদার শাহ সুজাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন চূড়ান্ত ক্ষমতায় আসীন হওয়ার জন্য। দিল্লি অভিমুখে যাত্রা করেও বড় ভাই দারা শিকোর বাহিনীর কাছে পরাজিত হন শাহ সুজা এবং ফিরে আসেন বাঙাল মুল্লুকে। কিছুদিন পর আবারও খবর পান আরেক ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হয়েছে দারা শিকো। আবারও ক্ষমতা পাওয়ার নেশা চড়ে বসে শাহ সুজার মাথায়, অগ্রসর হন দিল্লির পথে। ভাগ্যের ফেরে এবারও পরাজিত হন এবং পালিয়ে এসে আশ্রয় নেন আরাকান রাজ দরবারে। বিশ্বাসঘাতক আরাকান রাজার নজর ছিলো শাহ সুজার সাথে থাকা সমস্ত সম্পদ ও তার কন্যার দিকে। গভীর রাতে হামলা হয় তাদের উপর। কোনমতে প্রাণ বাঁচিয়ে পাশের জঙ্গলে আশ্রয় নেন শাহ সুজা ও তার একান্ত বন্ধু তালেব তৈমুর। পরবর্তীতে সমুদ্র পথে যাত্রা শুরু করলে তাদের পিছু নেয় মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু।অন্যদিকে বিভিন্ন ধার দেনায় জর্জরিত কিরানের সামনে সুযোগ আসে এই ধার-দেনা মিটিয়ে আবারও আগের সুন্দর জীবনে ফিরে আসার। কিন্তু আরাকান রাজের নির্দেশ অমান্য করায় তাকে গ্রেফতার করে আরাকান সৈন্য। এরপরেও তার হাতে আসে একটি অন্তিম সুযোগ।দক্ষিণের সাগরে ত্রাস চালানো মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যু বাহিনীকে পরাস্ত করতে হবে। শুরুতে রাজি না হলেও পরে যখন জানতে পারে এই মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যু বাহিনী পিছু নিয়েছে তার বাবার জাহাজের, তখন বাবাকে বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য সে বাহিনী গঠন করে, সম্মুখ সমরে নামে ভয়ংকর ও অত্যাচারী জলদস্যুদের বিরুদ্ধে।
বর্তমান সময়:
চট্টগ্রামের কিছু ধনী পরিবারের বখাটে ছেলেমেয়েরা এক বৃষ্টির রাতে গাড়ি নিয়ে বের হয় লং ড্রাইভে। নেশাগ্রস্থ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়ে ধাক্কা মেরে দেয় একজন লোককে। ঘটনাস্থলেই মারা পড়ে লোকটি। অন্যদিকে, ট্রেনিং শেষ করে দেশে এসে উর্ধতন কর্মকর্তাদের না জানিয়েই নিজের রেসিং ট্র্যাকে ছুট দেয় এজেন্ট শারিয়ার এবং সেখানে গোলমাল বাধায় বাইক মাস্টারের সাথে। তাকে এরপর ধরে আনা হয় সেলে এবং বলা হয় চট্টগ্রামে যেতে, সেখানে একজন লোকের দুর্ঘটনার মৃত্যুর সাথে জড়িত রহস্য সমাধান করতে। সেখানে গিয়েই এজেন্ট শারিয়ার জড়িয়ে পড়ে এমন এক রহস্যের জালে, যার সূত্রপাত হয়েছিলো মধ্যযুগের মোঘল আমলে এবং মগ, পর্তুগিজ জলদস্যুদের সময়ে।
◑ পাঠ প্রতিক্রিয়া:
রবিন জামান খান ভাইয়ার লেখার সাথে পরিচয় হয় এই বইয়ের মাধ্যমেই। এই বই পড়ার পরেই আমি মূলত লেখকের লেখার ফ্যান হয়ে যাই। তারপর একে একে সপ্তরিপু, শব্দজাল, বিখণ্ডিত পড়ে ফেলি। আমি বেশিরভাগ সময়ই থ্রিলার জনরার বই পড়ি। এর মধ্যে আবার সাইকোলজিকাল থ্রিলার আর হিস্টরিকাল থ্রিলার খুব বেশি পছন্দের। লেখকের কোনো বই না পড়লেও এই বইয়ের আকর্ষনীয় প্রচ্ছদ আর ফ্ল্যাপ পড়ে বইটার প্রতি আকর্ষন অনুভব করি। জলদস্যু, গুপ্তধন, সম্রাট শাহজাহান ও তার তিন পুত্র এগুলো আসলেই আকর্ষনীয় বিষয়। সব দিক থেকে বিবেচনা করলে এই বইটি আমার ব্যক্তিগত পছন্দের বহিঃপ্রকাশ। মানে সহজ ভাবে বললে দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে গিয়েছে। এইজন্যই লেখকের অন্য কোনো বই না পড়লেও এই বইটির প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল, আর তাই বইটি প্রকাশিত হবার কিছুদিনের মধ্যেই বইটি সংগ্রহ করি। ভাগ্য তেমন সহায় না হওয়ায় বইটা সংগ্রহ করতেও আমাকে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়েছে। বইটির বেশ কিছু জায়গায় প্রিন্টিং মিস্টেক আছে,যা সত্যিই বিরক্তকর।যেহেতু আমারটা প্রথম মুদ্রনের বই,পরবর্তী মুদ্রণে ভুল গুলো সংশোধন হয়েছে আশাকরি। কিন্তু লেখক যেভাবে অতীত আর বর্তমান সুনিপুণভাবে একই সুতোয় বেঁধেছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। আপাত দৃষ্টিতে দুটি বিচ্ছিন্ন গল্প মনে হলেও এ��ুলো মিলিত হয়েছে ইতিহাসের হারানো এক বিস্তৃতপ্রায় অধ্যায়ে। এখানেই শেষ নয়। আগামী বইমেলায় আসছে লেখকের সময়ের উপখ্যান সিরিজের পরবর্তী বই "রাজদ্রোহী।" এরই মধ্যে বইটার পোস্টার প্রকাশিত হয়েছে। আমি যে বইটা পড়ার জন্য কি পরিমাণ আগ্রহী তা বলে বোঝাতে পারব না। মগরাজ পড়ার পর বলতে গেলে প্রায় ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলাম এটা ভেবে যে রাজদ্রোহী আসতে এখনো ১ বছর! অবশেষে সকল অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে যে আসছে এটাই বা কম কীসে! তাই লেখক এবং লেখকের পরবর্তী বই সবকিছুর জন্যই শুভকামনা!
◑ লেখনশৈলী:
লেখকের লেখা নিয়ে আসলে আর কিছু বলার নাই। এরই মধ্যে তিনি দুই বাংলায় অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছেন। ইফতেখারুল ইসলাম ভাইয়ার অনুদিত ডেভিড বালডাচির "জিরো ডে" বইয়ের উৎসর্গ পত্রে ইফতেখারুল ইসলাম রবিন জামান খানকে ❝বাংলার ড্যান ব্রাউন❞ বলে আখ্যায়িত করেছেন। আমিও একমত। লেখকের লেখার মধ্যে একটা মৌলিকত্ব আছে যা যে কেউকে আকর্ষণ করবে। লেখককে অসংখ্য ধন্যবাদ বিদেশে বসে অনেক ব্যস্ততার মধ্যেও পাঠকদের জন্য লিখে যাওয়ার জন্য!
◑ প্রোডাকশন কোয়ালিটি,বাইন্ডিং এবং অন্যান্য:
সময়ের উপখ্যান সিরিজের তৃতীয় বই এটা। বইটা অন্যধারা থেকে প্রকাশিত। এখানে একটা বিষয়, বইগুলোর প্রোডাকশন, বাইন্ডিং বিশেষ করে ডাস্ট কভারটা দূর্দান্ত লেভেলের। ডাস্ট কভারটা দিয়েই যেকোনো পেপারব্যাক বইয়ের কভার দেওয়া যায়। তবে সেই হিসেবে বইগুলোর দাম কিছুটা বেশি মনে হয়েছে। এই সিরিজের প্রথম দুইটা বই সপ্তরিপু ও ব্ল্যাক বুদ্ধা বাতিঘর প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত হলেও রিসেন্টলি বইদুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রচ্ছদে, পরিমার্জিত ও সংশোধিত সংস্করণে অন্যধারা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই বই দুইটার বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। বইয়ের দামটা আমার মনে হয় আরেকটু কম হলে ভালো হতো।
◑ এই বইয়ের পছন্দের কিছু উক্তি:
✪ ❝দুনিয়াবি কর্মপন্থা যখন শূন্যে অসার,স্রষ্টাই তখন আশ্রয়ের আধার।❞ ✪ ❝শূন্য থেইকা আসে মানুষ,শূন্যে মিলাই যায়,শূন্য থেইকা ঘুইরা দাঁড়ায়,শূন্যতেই জীবন সাজায়।❞
◑ ব্যক্তিগত রেটিং: ৮/১০
সবশেষে ধন্যবাদ দিতে চাই রবিন জামান খান ভাইয়াকে আমাদের এতো সুন্দর একটা হিস্টরিকাল থ্রিলার উপহার দেওয়ার জন্য।
আমি দুই দুইটা রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল এই বইটি৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই বই আপনাকে নেশাগ্রস্ত করে রাখবে৷ আটকে রাখবে শেষপৃষ্ঠা, শেষ লাইন পর্যন্ত৷
এডভেঞ্চার, থ্রিলার, আতংক,ভয়, সবই ছিল মুহূর্মুহু। একজনের রিভিউতে দেখেছিলাম বইটি ইংরেজিতে অনুবাদের আবেদন জানানো হয়েছে, প্রথমে অতিশায়িত মনে হলেও, পড়ার পর মনে হলো এটি আসলেই ইংরেজিতে অনুবাদ মরা হোক, হলিউড এডাপ্টেশন হোক৷
আমি তথাকথিত রিভিউয়ের মত পূঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি না৷ তবে এবারের বইমেলায় যে কটি এ পর্যন্ত পড়লাম দিস ইজ বাই ফার দি বেস্ট!!!
আমার রেটিংঃ ১০/১০ (বিশ্বাস করুন,.৫ কম দেওয়া যোগ্যতা নেই) দয়া করে, লেখকের অন্য কোন বই যা এমন জোস, সাজেস্ট করবেন৷ আর বানান, ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন৷
বাংলার ইতিহাস আশ্রিত থ্রিলার জনরার বই। অতীতের ঘটনার সাথে তালমিলিয়ে এগিয়ে গেছে বর্তমানের ঘটনাবলী। বিশেষত অতীতের কিরণ, তৈমুর আর পদ্মারাণী মনে বেশ দাগ কেটে গেছে। বর্তমানের শাহরিয়ার ও বেশ ভালোভাবেই মানিয়ে গেছে গল্পের সাথে। তবে প্রুফ রিডিং এ ভুল এবং কিছু জায়গায় তাল মিলাতে না পারায় মাঝে মাঝেই ছন্দ কেটে যাচ্ছিল। তবে সব মিলিয়ে সুখপাঠ্য বলা যায়।
I don't know. The story was developing so well at the starting and the expectation was so high. But the ending was so pale. Didn't get the starting thrill at the end. But a good sequel by Robin Bhai, But could be better.
এক টিকেটে দুই ছবির মতো এই বইতেও এক উপন্যাসে দুই গল্প। একটা গল্প বর্তমান কালের যেখানে পিবিআই এর দুর্ধর্ষ অফিসার শারিয়ার এক আর্কিওলজিস্টের হত্যার রহস্য খুঁজে বেড়ায়। অন্যদিকে জাহাজি কিরান তাঁর পিতা ও পিতার বন্ধু সুবাদার শাহ সুজার ধন সম্পদের খোঁজে নেমেছে। আর ব্যাকড্রপে সম্রাট শাহাজাহানের পুত্রদের সাম্রাজ্য দখলের কাহিনী।
দুই কাহিনীই একেবারে সমান্তরালে চলেছে পুরো টানটান উত্তেজনার এই বিশাল উপন্যাসজুড়ে। দুই কাহিনীর নায়কই এক মুহুর্তও নিঃশ্বাস ফেলারও সময় পায়নি, এক এডভেঞ্চার থেকে অন্য এডভেঞ্চারে তারা যেতেই আছেন।
কাহিনীর সাজানোর ধরণ অনেকটা গেম অফ থ্রনসের মত লেগেছে। সিরিজে যেমন প্রটাগনিস্টকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে আর এমন সময়ে অন্য প্রটাগনিস্টের কাছে চলে যায় ঘটনা এখানেও তেমন। এছাড়া আরো অনেক টিভি সিরিজ, মুভির প্রভাবও লক্ষ্যনীয়। জাহাজের ফাইট সিন পড়তে যেয়ে মনে হচ্ছিলো “ব্ল্যাক সেইলস” কোন এপিসোড।
বইটি এনজয়েবল রিড ছিলো। এমনভাবে লেখা যে পাঠক বইটা শেষ না করা অবধি হাত থেকে রাখতে পারবে না। এন্ডিং এ ততটা স্যাটিসফাইড না হলেও খারাপ লাগেনি।
(Spoiler Alert) কিছু কিছু সমস্যা লক্ষ্যণীয়ঃ - পদ্ম বাদে অন্য নারী ক্যারেক্টারগুলোর ডেবলপ করতে পারেনি, রুম্পার ভালো সম্ভাবনা থাকলেও এরকম স্ট্রং নারী পুরো উপন্যাসে তেমন রোল প্লে করেনি। - সবকিছু ওভারএক্সপ্লেইন করার একটা প্রবণতা দেখা যায় লেখকের। কিরানের লক্ষ্য ও উদ্দ্যেশ্য কি সেটা বহুবার এক্সপ্লেইন করা হয়েছে। - ডক্টরের এক্সিডেন্টকারী গ্রুপটাকে যেভাবে বর্ণনা দেয়া হয়েছিলো, ভেবেছিলাম কোন একটা যোগসূত্র থাকবে সেটার সাথে। ঐযে একটা নাটকের রুল আছে না শুরুতে যদি বন্দুক দেখানো হয়, গুলি ছোড়া হবেই। এই উপন্যাসেও এমন অনেক বন্দুক দেখানো হয়েছে যার গুলি ছোড়া হয়নি। এর বাইরে বানান ভুল, নাম বিভ্রাট এগুলো কিছুটা চোখে লেগেছে।
সবমিলিয়ে ভালোই সময় কাটলো এই বইটা নিয়ে এ কয়েকদিন, লেখকের ভবিষ্যত লেখা আরো ইম্প্রুভমেন্ট দেখবো আশা রাখলাম।
বেশ ভালো লেখা। ইতিহাস আর বর্তমানের সুন্দর মিশ্রণ। লেখকের আগের লেখার মতই সাবলিল। বইয়ের মুদ্রণ এবং কাগজের মান এক কথায় অসাধারণ। কিছু বানান এবং নামের ভুল বাদ দিলে সুখপাঠ্য একটি বই।
❛বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছ��, তাই আমি পৃ���িবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর....❜
ফরেন প্রোডাক্ট ছাড়া দিন চলেনা কিংবা দেশি জিনিসে "eww" করা জনগণ আমরা কি জানি একসময় কী বিপুল ধনরাশির ভান্ডার ছিল এই বাঙাল মুল্লুক? মসলিন, তাঁত, জামদানির বাহার ছাড়াও এদেশের মশলার চাহিদা এবং তা নিয়ে হাঙ্গামার কথা তো অজানা নয়। শত শত বছর ধরে বিদেশ বিভূঁইয়ের মানুষের দ্বারা লুটপাট হতে হতে বর্তমানের এই অবস্থা। আপাত ঝামেলামুক্ত থাকতে চাওয়া এবং সহজ এই মানুষগুলোকে পিষে মে রেছে ওলন্দাজ, পর্তুগিজ, মগ আর সবশেষ ইংরেজ। সাথে এদেশের ধনসম্পদ হাতিয়ে নেয়া তো ছিলই। সম্পদে ভরপুর মুল্লুকটি ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে তার অতীত গরিমা, জৌলুস। তবুও টিকে আছে বাঙালি সত্তা। ভাগাভাগি হয়েও অস্তিত্বে মিশে থাকা বাঙালি ধ্যানজ্ঞান অনন্য।
ক্ষমতার লোভ বড়ো খারাপ। লোভে পরে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। দিল্লির মসনদে তখন ভয়াবহ অবস্থা। সম্রাট শাহজাহানের মৃ ত্যুর খবরে সিংহাসন যখন নড়বড়ে তখন ক্ষমতার লড়াইয়ে নামলেন সম্রাটের তিন পুত্র দারাশিকো, শাহ সুজা এবং আওরঙ্গজেব। শাহ সুজা বাঙ্গাল মুল্লুক শাসন করছিলেন। প্রজাদের সুখে শান্তিতে ভরিয়ে তুলছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার ঘ্রাণ পেতেই দ্বিগিদিক জ্ঞান হারিয়ে অসম লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন দিল্লিতে। ভাইয়ের কাছে পরাজিত হয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতেই সংবাদ পেলেন আরেক ভাই আওরঙ্গজেব দারাশিকোকে হ ত্যা করে দিল্লির সিংহাসনে অধীন হয়েছেন। আবার ছুটলেন সুজা দিল্লিতে। আবারো পরাজিত হয়ে হুশ এলে সিদ্ধান্ত নিলেন পাড়ি জমাবেন মক্কার উদ্দেশ্যে।
বিশ্বস্ত বন্ধু তালেব তৈমুরের সহায়তায় আশ্রয় নিলেন আরাকান রাজ্যে। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। আরাকানরাজের কুমতলবে এক রাতেই পুরো পরিবার সহ নির্মমভাবে প্রাণ হারান বাংলার শান্তিপূর্ণ সুবাদার শাহ সুজা। এদিকে তালেব তৈমুর বন্ধুকে বাঁচাতে না পারলেও সরিয়ে নিতে সক্ষম হয় মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল ধনসম্পদের একাংশ। তার পিছেই হন্যে হয়ে ছুটে চলে আরাকান রাজ থেকে শুরু করে মগ, পর্তুগিজ বাহিনী। কিন্তু কোথায় সে সম্পদ?
তালেব কিরান। একসময় পানিতে যু দ্ধ করা জাহাজি বর্তমানে জুয়াড়ি। উশৃঙ্খল জীবন, জুয়া আর ঋণের ভারে জর্জরিত ব্যাক্তির অতীত বেশ কষ্টের। অতীত তাড়া করে বেড়ায় তাকে। অতীতের তাড়া থেকে মুক্তির জন্যই কি না তার কাছে আসে বিশাল এক সুযোগ। ভঙ্গুর দশায় আসার মূল হোতাকে শায়েস্তা এবং প্রতিশোধ নিয়ে জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে নিতে পারবে সে। পুরান সাথী এবং পরিচিতদের নিয়ে এক বাহিনী গঠন করে নেমে পরে পর্তুগিজ কাল প্রিট সিলভেরার বিপক্ষে। শুরু হয় অস্তিত্ব রক্ষা আর প্রতিশোধের লড়াই। সাথে আছে মোগল সম্পদ রক্ষা এবং পিতা তালেব তৈমুরকে খুঁজে বের করার এক দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। পারবে কি?
বর্তমানের কোন এক সময়ে বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া একদল পোলাপান মাতাল হয়ে বৃষ্টির রাতে পতেঙ্গা রোডে লং ড্রাইভ খেলা খেলছিল। নেশার খেলার ছলেই সত্যি সত্যি রাস্তায় ধাক্কা দিয়ে বসে এক পথচারীকে। পথচারী ঘটনাস্থলেই দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে।
আপাতপক্ষে একটা সাধারণ সড়ক দুর্ঘটনার কেস-ই জটিল আকার নেয় যখন নাইট ড্রেস পরা সেই পথচারীর আসল পরিচয় বের হয়। ব্যক্তিটি বিখ্যাত এবং একইসাথে কুখ্যাত আর্কিওলোজিস্ট ডক্টর আবদেল। কয়েক বছর আগে সরকারের সাথে কোনো অজ্ঞাত কারণে বনিবনা না হওয়ায় তার লাইসেন্স বাতিল হয়ে যায়। এবং তিনি গত তিন বছর যাবত নিখোঁজ। এত বছর যাবত নিখোঁজ হওয়া ব্যাক্তি বৃষ্টির রাতে পতেঙ্গা রোডে কী করে? তদন্তে বেরিয়ে আসে চমকে দেয়া সব তথ্য। ধারণা করা যায় মরহুম আবদেল জড়িত ছিল আন্তর্জাতিক মানের অপরাধ বিষয়ক দুটো সংস্থার সাথে। কিন্তু কেন? উত্তর জানা নেই।
ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ডাক পরে আর্মি-চ্যুত, বর্তমানে পুলিশের বিশেষ উইংয়ে কাজ করা এবং সম্প্রতি বিদেশ থেকে ট্রেনিং নিয়ে আসা অফিসার শারিয়ারের। ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে ব্যাগ গুছিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় শারিয়ার। কিন্তু চট্টগ্রামের মাটিতে পা পড়তে না পড়তেই একের পর এক বিপদ, আ ক্র ম ণে র শিকার হয় শারিয়ার। কেস হাতে আসতে না আসতেই ফসকে যাওয়ার দশা হয়। কিন্তু বিচক্ষণ, বুদ্ধিমান এবং একরোখা শারিয়ার অনেক চেষ্টা করে কাজের সাথে নিজেকে জড়িয়ে রাখে এবং আশানুরূপ সাফল্য আনতে সক্ষম হয়। কিন্তু তবুও মক্কা বহুদূর অবস্থাতেই রয়ে যায়।
নিজের দল এবং আশেপাশের শত্রুর মোকাবেলা করতে করতে শারিয়ার পৌঁছে যায় এমন এক ঘটনার কাছে যার ভীত ছিল আজ থেকে শত শত বছর আগের মোগল শাসনামল এবং তৈমুরের লুকিয়ে রাখা মোগল সাম্রাজ্যের সম্পদের একাংশ। সত্য উদঘাটন করতে হলে পাড়ি দিতে হবে ইতিহাসের সেই সময় যখন দিল্লি সালতানাতে চলছিল ক্ষমতার পরিবর্তন। বাংলা ধুকছিল মগ আর পর্তুগিজ দস্যুদের অত্যাচারে।
আন্তর্জাতিক শ ত্রু, ঘরের শ ত্রু সবকিছুর মোকাবিলা করে শারিয়ার, ভুবন, টমি, রুম্পা আর সুমনেরা কি পারবে রহস্যের মূলে পৌঁছে গুপ্তধন উদ্ধার করতে? সাথে আছে এক্সপার্ট ফ্যাক্টর ডক্টর শশী। অনেক সূত্র কিন্তু এর মধ্যে আসল শিশিরবিন্দু কোনটা?
আসলেই কি বাঙ্গাল মুল্লুকের কোনো প্রান্তে চাপা পরে আছে অতীতের গুপ্তধন? অতীত আর বর্তমানের সমান্তরাল রহস্যের খেলায় এগিয়ে থাকবে কোন পক্ষ?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
আলোচনা:
সময় উপাখ্যান সিরিজের তৃতীয় কিস্তি ❝মগরাজ❞। প্রথম দুটো বই পড়া আছে এবং তৃতীয় বই শেষ করে ফেললাম। ❝সপ্তরিপু❞ এবং ❝ব্ল্যাক বুদ্ধা❞ থেকে আমার পছন্দ প্রথমটা এবং দ্বিতীয়টা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। দ্বিতীয় বইতে আশাভঙ্গ হওয়ায় তৃতীয় কিস্তি পড়তে সাহস হচ্ছিলো না। অবশেষে পড়ে ফেললাম। যদি এই তিনটার মধ্যে কাকে এগিয়ে রাখবো জিজ্ঞেস করা হয় আমায় বলবো ❝মগরাজ❞ কে। ঐতিহাসিক উপন্যাস এবং সাথে থ্রিলের মিলন আমার অন্যতম একটি প্রিয় জনরা। আর এর সাথে যদি একটু আধটু মিথ যোগ হয় তাহলে তো কথাই নেই। ❝মগরাজ❞ ঠিক তেমনই একটি ঐতিহাসিক এবং কিছুটা মিথের সংমিশ্রণে তৈরি থ্রিলার বই।
৫৫৯ পৃষ্ঠার বইটিকে লেখক দুটো অংশে (অশ্রুপতন এবং শূন্য জীবন) ভাগ করেছেন। পূর্ব কথা, শেষ কথা, অতীত এবং বর্তমানের দুটো সমান্তরাল ধারায় গল্প এগিয়েছে মোট ৪৫ টি অধ্যায়ে।
অতীতের ঘটনার সাথে তাল মিলিয়ে চলছিল বর্তমান। অতীতে ঘটনা ঘটছে আর সেটাই বর্তমানে ইতিহাস খুঁড়ে বেরিয়ে আসছিল। দুটো সময়ের সমান্তরাল ধারা আমার বেশ লেগেছে। বিশেষ করে উপন্যাসের প্রায় শেষের দিকে যখন ঘটনার যবনিকাপাত পর্ব চলছিল তখন অতীত এবং বর্তমানের একই ধারায় বয়ে যাওয়া বর্ণনাগুলো আমাকে মুগ্ধ করছিল।
লেখক ইতিহাসের পাশাপাশি ইতিহাস সম্পর্কিত মিথ এবং তার উৎস সম্পর্কেও অবহিত করেছেন যা পড়ার সময় ভালো লেগেছে। মোগলদের নির্দিষ্ট সেই সময়ের ঘটনা এবং বিভিন্ন সংস্করণ থেকে নিজের মতো ফিকশন আকারে উপস্থাপন ছিল উপভোগ্য। যেহেতু একই ঘটনার নানা ধরনের সত্য মিথ্যা তথা মিথ আছে তাই উপন্যাসকে সেভাবে উপভোগ করাই শ্রেয়। এছাড়াও মগ নিয়ে কিছু মিথ ছিল এগুলো উপন্যাস পড়েই বলা যায় প্রথম জেনেছি। বিশেষ করে মগবাজার নামের উৎস। তো বলাই যায়, ❝থ্রিলার পড়েও কিছু শেখা যায় বৈকি!❞
অতীতের ঘটনাগুলো পড়তে আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। অতীত আর বর্তমানের ঘটনা যেহেতু সমান্তরাল ছিল তাই দুটোর গুরুত্বই সমান। তবুও অতীতের প্রতি টান অথবা ইতিহাসের উপর আগ্রহ থাকার কারণেই হয়তো অতীত আমাকে টেনেছে বেশি। এছাড়াও অন্য আরেকটি কারণ বলা যায় অতীতের কিছু দৃশ্যের বর্ণনা লেখক এত দারুণ দিয়েছেন। বিশেষ করে পান��তে যু দ্ধের বর্ণনা, কামান, গোলা দিয়ে আদিকালের সেই যু দ্ধের দারুণ বর্ণনা করেছেন। মনে হচ্ছিল পড়ছি না, দেখছি। একই রকম হয়েছে বর্তমানের কিছু অ্যাকশন দৃশ্যেও। কমান্ডো ট্রেনিং করা অফিসার এবং সমশক্তিসম্পন্ন শ ত্রুর মধ্যে মা ইরপিট গুলো উপভোগ্য ছিল।
একইসাথে অতীতের কিছু আবেগঘন দৃশ্য ছিল এবং মগ, পর্তুগিজদের অ ত্যা চারের যে বর্ণনা লেখক দিয়েছেন সেগুলো মুগ্ধ করেছে। কিছু চরিত্রের উত্থান, তাদের বন্ধুত্ব, আবেগ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার যে পরিবেশ ছিল সেটা সন্দেহাতীতভাবেই প্রশংসার দাবিদার। বাংলাদেশী প্রেক্ষাপটে গুপ্তধনের খোঁজে বা প্রত্নতত্ত্ব বিষয়ে বিশাল গল্পের অবতারণা করে ফেলা নিদারুণ এক ব্যাপার।
বিশাল কলেবরের বই বিধায় লেখক চরিত্র পরিচয়, রহস্য বুনন এবং গল্পের ভিত তৈরিতে সময় নিয়েছেন বেশ। ইতিহাস, ইতিহাস আর ইতিহাসের পাশাপাশি বর্তমানের চরিত্রদের দৌড়ঝাঁপ আর সঠিক অনুমানে পৌঁছতে পৌঁছতে যখনই আপনি ক্লান্ত হয়ে যাবেন সে মুহূর্তেই নতুন রহস্য এবং আসন্ন সমাধানের সূত্র আবার চাঙ্গা করে দিবে। এবং উপন্যাসে লেখক যে সমাপ্তি টেনেছেন আমার দৃষ্টিকোণ থেকে সেটা ভালো লেগেছে। সাজানো এবং আশানুরূপ ইতি টেনেছেন লেখক। পূর্বকথায় সন্তর মধ্যে যে আবহ ছিল সেটা মুখ গল্প পড়ার সময় দ্বিধায় ভোগালেও শেষ দিকে এসে ধারনা সত্যিই প্রমাণ হয়েছে। সবমিলিয়ে বলা যায় উপভোগ্যই ছিল ইতিহাসের এক টুকরো নিয়ে রচিত উপন্যাস ❝মগরাজ❞।
চরিত্র:
একটা উপন্যাসের ভালো বা খারাপ লাগার অনেক খানি নির্ভর করে সেখানে আগত চরিত্রগুলোর উপরে। সিরিজের বই বিধায় পূর্ববর্তী বইগুলোর কিছু চরিত্র এখানে স্থান পেয়েছে এবং তাদের জায়গায় তারা ঠিক ছিল। ঐতিহাসিক যেসব চরিত্রের আগমন ছিল তারা তাদের হিসেবে ঠিকমতোই উপস্থাপন করেছেন লেখক। এখানে মুখ্য চরিত্রে ছিলেন বর্তমানে শারিয়ার এবং অতীতে কিরান। ফলে উপন্যাস তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে। বলাই বাহুল্য আমার কাছে পরিণত এবং অপেক্ষাকৃত যোগ্য মনে হয়েছে কিরানকে। শুরুতে তাকে একটু ত্যাড়া কিংবা ভিলেন জাতীয় মনে হলেও দ্রুতই কিরানের ব্যক্তিত্ব, বৈশিষ্ট্য, নেতৃত্ব সবকিছুই খুব ভালো লেগেছে। অপরদিকে শারিয়ারকে আমার কেন জানি একেবারেই পছন্দ হয়নি। সেটা লেখকের বর্ণনার জন্য না এর চরিত্রই এমন সেজন্য জানা নেই। বড়লোকের বিগড়ে যাওয়া না হলেও শারিয়ারকে উদ্ধত, অহংকারী জাতীয় হিসেবেই মনে হয়েছে। মূল চরিত্র বিধায় তার ভেতর অসাধারণ গুণাবলী থাকলেও কিছু বিষয় আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। রুম্পার সাথে শুরুর মোলাকাতেই তার ব্যবহার, আইন শৃংখলা বাহিনীর হয়েও অবৈধ কাজে লিপ্ত থাকা এবং সেগুলো নিয়ে দাদাগিরি ফলানো ব্যাপারগুলো আমার একদমই ভালো লাগেনি। এছাড়াও হুট করে সম্বোধন পাল্টে ফেলার ভঙ্গি আমার ❝ব্ল্যাক বুদ্ধা❞ এর তানভীরের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করেছিলাম। এখানেও তাই। তানভীর, শশী, ভুবন বা অতীতের পদ্ম, তৈমুর এই চরিত্রগুলো বেশ লেগেছে। বিশেষত পদ্মকে খুব ভালো লেগেছে।
আমি অপেক্ষায় আছি কোন বইতে লেখক বাশার, তানভীর আর শারিয়ারকে একত্রে আনবেন!
সমালোচনা:
অনেক ভালো একটা উপন্যাসের পড়ার অভিজ্ঞতা খুব ভালো হওয়ার সাথে সাথেও কিছু বিষয় থাকে যার জন্যে পুরোটা উপভোগ করা যায় না। এই উপন্যাসেও এর ব্যত্যয় হয়নি। বরং বেশি ছিল। আমি আগের দুটো বই পড়েও একই কথা বলেছিলাম। লেখক প্রয়োজনের অতিরিক্ত বর্ণনা দেন। যেটা দরকার নেই সেটাও দিয়ে দেন যা পড়ার মজাকে নষ্ট করে বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়।
* একই লাইনে ততোধিকবার একই শব্দের একই উদাহরণের ভিন্ন প্রয়োগ খুবই বিরক্ত লাগছিল। বিশেষ করে একই লাইনে চাচা কাম ম্যানেজার কাম এটা কাম ওটা.... এই শব্দের বহুল ব্যবহার পছন্দ হয়নি। * যে লাইনে ❛শুধু❜ শব্দের প্রয়োগ করলে সমস্যা হতো না সেখানে বারংবার ❛স্রেফ❜ শব্দের ব্যবহার শ্রুতিমধুর লাগছিল না। * একই উদাহরণকে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে একই লাইনে একাধিকবার ব্যবহার করাকে আমার ❛স্রেফ❜ লাইন বাড়ানোর উপায় ছাড়া অন্যকিছু মনে হয়নি। * আগের বইতে নায়কের জামা, জুতা, খাবারের ব্যান্ডের যেমন বিশাল ফিরিস্তি ছিল এই বইটিও সে ধারা অব্যাহত রেখেছে এবং আমার বিরক্তি বাড়িয়েছে। এখানে আবার এক কাঠি উপরে। বাইকের ব্র্যান্ডের নাম বারবার উল্লেখ, সিগারেটের থেকে শুরু করে ট্যাবটা অ্যাপেলের উল্লেখ গুলো আমার কাছে ভালো লাগেনি। কয়েক জায়গায় এরকম ব্যবহার মানা গেলেও প্রতি জায়গায় এর ব্যবহার অবশ্যই অসহ্য লাগছিল।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
বইয়ের প্রচ্ছদ আমার পছন্দ হয়েছে। প্লটের সাথে দারুণভাবে মিলে যায়। বইয়ের প্রোডাকশন তথা বাঁধাই, মান, পৃষ্ঠা ছিল দারুণ। হালকা সবুজ পৃষ্ঠা অন্যধারা প্রকাশনীর সিগনেচার স্টাইল যা আমার পছন্দ। তবে একটা বই পড়ার আনন্দকে গুড়িয়ে দিতে এরকম একটি বইয়ের প্রোডাকশনের অন্যতম একটি ধাপ ❛সম্পাদনা❜। এই বই সেই গুণে বিশেষভাবে দূষিত। নতুনভাবে একটা বই আসলে সে থেকে আমাদের আশা হয় আরো উন্নতির। তবে ফিটফাট বইটিকে সদরঘাট করে দিয়েছে এর বানান ভুলের অস্বাভাবিক মাত্রা। আমার মনে হয়না বইটির কোনো সম্পাদনা করা হয়েছে। হলেও কাজের কাজ কিছু হয়নি। পূর্ব কথায় সময়কাল ছিল ১৬৬১। মূল ঘটনার অতীতে প্রথম অধ্যায়ে বোল্ড এবং ১৬ফন্ট আকারে জ্বলজ্বল করছিল ১৮৬০ সাল। এবং আমি দ্বিধায় পরে গেলাম ওটা তো ইংরেজ আমল। ওখানে সুজা সাহেব কিতা করে? পরে বুঝলাম শুরুতেই ভুল ছাপা। ১৬৬০ হয়ে গেছিল ১৮৬০। একটা পুরো অধ্যায় শারিয়ারকে তানভীর হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়েছে। তাও মানলাম বর্তমানের সাথে বর্তমান মিসটেক হইছে। ৫০০ বছর আগের কিরানও এক জায়গায় শারিয়ারের বদলে ব্যবহার হয়ে গেছে। মোটামুটি বইয়ের অনেক জায়গায় সম্বোধনের বিভ্রাট ছিল। যা পাঠক মাত্রেই উপভোগ করবে না। দুটো শব্দের মাঝে স্পেসের অভাবে এক শব্দ হয়ে যাওয়া, বাক্যের সমাপ্তিতে অসম্পূর্ণতা ছিল লক্ষণীয়। ❛কোন❜ এবং ❛কোনো❜ এর ব্যবহারেও ভুল লক্ষ করেছি।
আমার কাছে থাকা কপিটি প্রথম এডিশনের। আশা করি পরবর্তী সংস্করণে এই বিষয়গুলো পরিবর্তন হবে। এবং পাঠক আরাম করে ইতিহাসের গহীনে ডুব দিতে পারবে।
ক্ষমতা, লোভ মানুষকে শেষ করে দেয়। আবার প্রায়শ্চিত্তের দহনে সে সঠিক মানুষে পরিণত হয়। অতীতের ঘা আমাদের তাড়িয়ে বেড়ালেও তার থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা এবং বুকের বল। যার ফলে অসাধ্য সাধন হয়ে যায়। কে জানে হয়তো গুপ্তধনও মিলে যেতে পারে!
“মগরাজ” ৫৬০ পেইজের বিশাল বই। এই বই লেখার জন্য লেখক ১ বছর বইমেলাতে কোনো বই প্রকাশ করে নি।
বইটিতে ২টি সময়ের গল্প আছে- একটা অতীত কালের, শাহ্ সুজার সময়ের এবং আরেকটা বর্তমানের। আমার কাছে কেনো যেনো বর্তমান সময়ের কাহিনীটা বেশি ভালো লেগেছে। মনে হয়েছে, লেখক শুধু বর্তমান সময়ের কাহিনী নিয়ে একটা বই লিখে ফেলতে পারতো। শুরুর দিকের চেয়ে আমার কাছে শেষের দিকে একটু বেশিই ভালো লেগেছে। বইটা ৪ স্টার দিতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কিছু ভুল থাকার কারণে ১টা স্টার কেটে দিয়েছি। কিছু চরিত্রের নাম বেশ কিছু জায়গাতে চেঞ্জ হয়ে গেছে, আর কিছু বানান ভুলও আছে। শেষটা আরেকটু সুন্দর হইতে পারত, ৫৬০ পেজের বই শেষে করে রহস্য সমাধান পাওয়া গেলো না।
কোন ভূমিকা না, ঘুরানো প্যাচানো কোন কথা না। সরাসরি ২টা অংশে পাঠ পর্যালোচনা করবো। আমি প্রচন্ড বিরক্ত এবং একই সাথে উচ্ছ্বাসিত ও বটে। তবে কোন কিছুর ভুল বা খারাপ জিনিস গুলো বলার আগে তার ভালো জিনিস নিয়ে আলোচনা করে নেওয়া উচিত। সুতরাং
আলোচনা : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একদম নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাস আশ্রিত একটা গল্প নিয়ে সৃষ্টি ‘মগরাজ’। গল্পকথক এখানে দুটো সময় নিয়ে ভীষণ দাপটে এগিয়ে গেছেন। প্রায় চারশ বছরের ব্যবধানে এগিয়ে নিয়ে গেছেন একটি সত্য সন্ধানকে। একই সময়ে আপনি চারশ বছরের এপার ওপার দুটো অংশই স্পষ্ট দেখতে পাবেন। রহস্য, এডভেঞ্চার, সাহসিকতা ও গল্পের শেষে চমকপ্রদ এক এন্ডিং বইটাকে দারুণ করে তুলেছে।
সমালোচনা : ‘মগরাজ’ প্রায় সাড়ে পাঁচশ পেজের একটা বই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস চাইলেই বইটা কম হলেও দুশো পেজ কমানো যেত। গল্পের শুরুর পর থেকে মূল গল্পের বাইরে এতো বেশি ডালা পালা যুক্ত করা হয়েছে যে বিরক্ত না হয়ে উপায় নেই। প্রথম দিকে কিছু অংশ পড়ার পরই গল্পে কি হবে বা পুরো বইটা কি বিষয়ে সেটা আপনি বুঝে যাবেন। কিন্তু গল্প কথক গল্পের সমাধানটাকে আপনার বিরক্তির তুঙ্গে তুলে টানতে টানতে পরবর্তী চারশো পেজ পার করাবেন। একটা থ্রিলার ধর্মীক বইয়ে ছোটছোট সাধারণ ঘটনার এতো বেশি বর্ণনার কোন প্রয়োজন ছিলো না। ছোট করে বললে- একটা মিশন হবে, কি নিয়ে হবে তা আপনি জানেন। কিন্তু সেই মিশনের প্রস্তুতি এতো দীর্ঘ করা হয়েছে যে আপনি উষ্ণ মস্তিষ্কের মানুষ হলে বেশ কয়েকবার বই ছুঁড়ে ফেলে দিতে ইচ্ছে হবে।
২য় কথা, গল্পকথক গল্পে চরিত্রের নামে প্যাচ লাগিয়ে ফেলেছেন। যদিও এটা প্রুফ রিডারদের ভুল। তবে এই প্যাচ এতোবার লেগেছে যে আপনার মাথায়ও তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে। কখন শারিয়ার তানভীর হয়ে গেলো, কখন কিরান শারিয়ার হয়ে গেলো তা বুঝতে হলে আপনাকে রিভার্সে পড়তে হয় এবং তখন আপনি ভুলটা ধরতে পারবেন। সাথে দাঁড়ি, কমা ও বেশ কিছু বানান ভুল স্পষ্ট লক্ষণীয় । অবশ্য এসব ভুল পরবর্তী এডিশনের পূর্বে লেখক/প্রকাশক নিজ দায়িত্বে ভালো একজন প্রুফ রিডার দিয়ে প্রুফ করিয়ে নিলেই সমাধান হয়ে যাবে।
৩য় এবং শেষ কথা, গল্পে সিনিয়র জুনিয়রের বেশ ভালো বন্ধুত্ব দেখানো হয়েছে। কিন্তু এই বন্ধুত্ব শুরুর পূর্বেই তুমি/তুমি করে সংলাপ শুরু করে দেওয়া আমার কাছে বড্ড বেমানান লেগেছে। গল্পটা বেশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের চরিত্র বিন্যাসে সাজনো। কিন্তু পেশার সাথে চরিত্রের মাঝের কথোপকথন স্মার্টলি প্রকাশ পায় নি।
পুরো গল্পটা শেষ হওয়ার পর নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। কারণ একে তো গল্পটা দারুণ এবং আপনি পুরো গল্পটাকে নিজের মত করে ছোট্ট একটি মূলভাবে দাঁড় করাতে পারবেন। কিন্তু বই পড়ার সময় সেই ভালো লাগা কাজ করবে না। কারণ লেখক আপনাকে সেই সুযোগ দেয় নি। আমার মনে হয় তিনি টার্গেট নিয়েছিলেন যেভাবেই হোক এই বই পাঁচশো পেজ ছাড়াবে। এবং তিনি সেটাই করেছেন।