ঢাকার এক মফস্বল এলাকায় হুট করেই পাওয়া গেল একটি লাশ। যার ডান হাতের কব্জিতে মার্কার কলম দিয়ে লেখা - ঋ! তদন্তে নেমে পড়লেন জায়েদ হাসনাত। সাথে এসে জুটেছে সদ্য ডিটেক্টিভ ট্রেনিং শেষ করে আসা মেজবাহ কবির। ঠিক তখনই একজন আগুন্তুক এসে দেখা করলেন জায়েদ হাসনাতের সাথে। দাবী করলেন, খুন গুলো নাকি তিনিই করেছেন। একের পর বলে যেতে লাগলেন খুন সম্পর্কে তাক লাগানো তথ্য! কিন্তু প্রমাণ কোথায়? একের পর পর হয়ে চলেছে খুন, একই রকম ভাবে কব্জিতে লেখা - ঋ। সেই আগুন্তুকও জানিয়ে যাচ্ছেন খুনের তালিকা এবং বিষদ বিবরণ। কিন্তু কোথাও প্রমাণ নেই! বিস্তৃত জটিল জঁট ছাড়াতে গিয়ে, অন্যকোনো জালে আটকা পড়ছেন না তো দারোগা জায়েদ?
‘‘ঋ হচ্ছে একধরনের কুৎসিত সত্য। যার অস্তিত্বে সবাই বিশ্বাস করে, কিন্তু স্বীকারে নেই।’’
মনস্তাত্ত্বিক বিষয়বস্তু নিয়ে থ্রিলার লিখাটা বেশ কষ্টসাধ্য ও শ্রমের কাজ। লেখক যদি ক্রাইম হিসেবে পুরো গল্পটাকে ব্যাখা করেন, সেখানে পাঠক শেষ টুইস্টে মুগ্ধ অবশ্যই হবেন যদি সেটা ভেবে রাখা ধারোনার বাহিরে হয়। ‘ঋ’ গল্পে ক্রাইম একেবারে প্রতিটা ঘটনার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা লেখক আকঁড়ে ধরে রেখেছেন সিদ্ধহস্তে! ‘ঋ’ উপন্যাসকে অনেকে দেখলাম ‘‘সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার’’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন, কিন্তু আমি সেটা পুরোপুরি করতে পারছি না। খুনী যখন একাধিক খুন করার মাধ্যমে পাশবিক আনন্দ উদযাপন করতে থাকে সেটাকে ‘‘সিরিয়াল কিলার’’ বলাটা উত্তম, অন্যদিকে মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে যে ব্যাখা গুলো ফুটে উঠে সেটা ‘‘সাইকোপ্যাথ’’ হিসেবে বিবেচনা করা যুক্তিযুক্ত। সিরিয়াল কিলিং—এর প্রধান একটা বিষয় থাকে ‘মোটিভ’ যেটা সচারচর অন্যান্য অনেক ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাসে দেখা যায়। এই গল্পটার মধ্যেও সেই মোটিভের সংযোজন রয়েছে তবে সেটা ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপনা হয়েছে। যদিও এই মোটিভ নিয়ে অনেকে দ্বিমত পোষণ করতে পারে!
সাইকোলজিক্যাল ও ক্রাইম ঘরনার মধ্যে বিস্তর ফারাক থাকে, তারপরেও দুটো জনরাকে যখন একই পাত্রে ঢালা হয় সেক্ষেত্রে সৃষ্টি হয় ‘ঋ’—এর মতই সুখপাঠ্য তরল (রক্ত অথবা রক্তাক্ত) উপন্যাস। অতিরিক্ত আশা নিয়ে পড়তে আমি যাইনি কারণ বইটা সম্পর্কে পূর্বে বিভিন্ন আলোচনাতে বেশ কথোপকথন করতে দেখেছি, মিশ্র প্রতিক্রিয়াটা সেখানেও বিরাজমান ছিল। দেশীয় প্লটে লিখা এই উপন্যাসে অনেক কিছুই রূঢ় বাস্তব বলে প্রতিফলিত হয়েছে, লেখক শুরুতে এই বিষয়ে একটা হিন্টস পাঠকদের দিয়েছেন। অর্থাৎ এই গল্পের প্লটে অনেক কিছু সত্য এবং আমাদের সমাজের সাথে ‘ঋ’ গল্পের প্লটে সামঞ্জস্যতা রয়েছে।
‘ঋ’ বইটা বেছে নেওয়ার কারণ হিসেবে বলবো উপন্যাসের নাম ও ফ্ল্যাপের লিখাটা আকৃষ্ট করেছিল। গল্পটার স্তম্ভ কিন্তু বেশ শক্ত তবে আরেকটু যদি গুছানো যেত তাহলে ব্যাপারটা অন্যরকম হতে পারত। গল্পে ইউনিক হচ্ছে খুন করার প্রক্রিয়া, বিভৎস সাথে অর্থপূর্ণ এবং দার্শনিকতার ভিত্তিতে উপস্থাপন করা ধ্রুব সত্য ঠাঁই পেয়েছে সুনিপুণ ভাবে।
➲ আখ্যান—
ঢাকার এক মফস্বল এলাকায় হুট করেই পাওয়া গেল একটি লাশ। যার ডান হাতের কব্জিতে মার্কার কলম দিয়ে লেখা - ঋ! তদন্তে নেমে পড়লেন জায়েদ হাসনাত। সাথে এসে জুটেছে সদ্য ডিটেক্টিভ ট্রেনিং শেষ করে আসা মেজবাহ কবির। ঠিক তখনই একজন আগুন্তুক এসে দেখা করলেন জায়েদ হাসনাতের সাথে। দাবী করলেন, খুন গুলো নাকি তিনিই করেছেন।
একের পর বলে যেতে লাগলেন খুন সম্পর্কে তাক লাগানো তথ্য! কিন্তু প্রমান কোথায়? একের পর পর হয়ে চলেছে খুন, একই রকম ভাবে কব্জিতে লেখা - ঋ।
সেই আগুন্তুকও জানিয়ে যাচ্ছেন খুনের তালিকা এবং বিষদ বিবরণ। কিন্তু কোথাও প্রমান নেই! বিস্তৃত জটিল জঁট ছাড়াতে গিয়ে, অন্যকোনো জালে আটকা পড়ছেন না তো দারোগা জায়েদ?
➤ পাঠ প্রতিক্রিয়া ও পর্যালোচনা—
জনরা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা লেগে থাকলেও সেদিকটা নিয়ে আর গ্যাঁজানোর ইচ্ছা নাই। বইটা শুরু থেকে শেষ অব্দি কেমন লেগেছে সেটা জানাবো। ‘ঋ’ গল্পটা মূলত টাইমলাইন নির্ভর, অর্থাৎ দুইটা টাইমলাইনে চলা গল্প একটা সময়ে সমান্তরালের রূপ নিয়েছে। টাইমলাইনে রয়েছে বর্তমান অতীতের ঘটা নানা কর্মকাণ্ডের সংযোজন সাথে ফ্ল্যাশব্যাক ও সাব প্লটের ছড়াছড়ি। ব্যাখা দিতে গেলে এই রিভিউ ছোটখাটো উপন্যাসিকাতে পরিণীত হবে তাই সেদিকে যাচ্ছি না।
উপন্যাসে জাম্প ছিল প্রচুর সেই সাথে চরিত্রের বৃষ্টি! ধুপধাপ ভাবে চরিত্র যখন আসতে থাকবে পাঠক কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে যাবে, বলতে হয় ‘ঋ’ গল্পে চরিত্র সংখ্য নেহায়েত কম নয়। লেখক চেয়েছেন পাঠক কনফিউজড হোক কারণ চরিত্রের আচরণে গল্পের কাহিনীর শেষটা চাইলে সহজে আন্দাজ করা যায়। তবে ব্যাখাটা খুঁজতে দেরি হবে অনেক। লাটিমের মতই চোখের সামনে ঘটনা ঘুরতে থাকলেও বুঝে নিতে কষ্ট হবে না পরবর্তীতে কি হতে যাচ্ছে বা হবে। লেখক স্টার্টিং করেছেন খানিকটা ধীরেসুস্থে কিন্তু চরিত্র ব্যবহার বা তাদের ফ্ল্যাশব্যাক নিয়ে আসতে যখন থেকে শুরু করেন তখন ডানে বামে তাকানোর সময় একেবারে পাননি বলে মনে হয়।
প্লট বিল্ডিং বেশ ভালো, ব্যাক্তিগত ভাবে পছন্দ হয়েছে। তবে সেটা পছন্দের মধ্যই সীমাবদ্ধ রেখে দিতে হয়েছে। গল্পের আঙ্গিকে চরিত্রের যাবতীয় কাজের বর্ণনা এবং পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে ঘটনাগুলোর বিস্তারিত ফুটিয়ে তুলেছেন ভালোভাবে। চরিত্র গুলোকে লেখক যেভাবে ফোকাস দিয়েছে একইভাবে যদি প্লটটাকে আরেকটু ফোকাস দিয়ে গুছিয়ে নিতেন, যদি তাড়াহুড়োটা না করতেন তাহলে তৃপ্তির ঢেঁকুর তিনটে থেকে ছয়টা হতো। স্টোরিটেলিং নিয়ে বললাম, আরেকটু বলতে গেলে গল্পটা বাস্তবের মতই মনে হয়েছে এদিকটাতে লেখক ফুল মার্কস পাবেন।
সমাপ্তি ঠিকঠাক থাকলেও মন ভরেনি, সেটা হতে পারে আমারো কিছু চরিত্রের ন্যায় খিদা অনেক বেশি ছিল। লেখক পুরোটাই উপন্যাস জুড়ে আমাদের সমাজের নারী ও পুরুষের মধ্যে থাকা যতরকমের ক্রাইসিস ও ঝগড়া বিবাদের বিষয়বস্তু আছে প্রত্যকটা তুলে নিয়ে এসেছে হয়তো খানিক বাকিও থাকতে পারে! নারীর বিদ্বেষ ও পুরুষের অহংকার যখন দুইয়ে দুইয়ে চার হয় তখন গল্পে কিছুটা পরিপূর্ণতা আসে। লেখক ধরে রেখেছেন বোধহয় নারীদের যত প্রকার খারাপ রূপ রয়েছে সব এই উপন্যাসের মাধ্যমে দূতি ছাড়িয়ে যাচ্ছেন কিন্তু গভীরতা বুঝতে পারলে বাস্তবতা টের পাবেন। তবে এক্ষেত্রে লেখক যে সাইকোপ্যাথ চরিত্রের সৃষ্টি করেছেন তার দার্শনিকতা অন্যকে বেশ ভালোই প্রভাবিত করেছে, এতোটা অনুপ্রাণিত যেটাকে শুদ্ধ ইংরেজী ভাষায় ‘ব্রেইন ওয়াশ’ বলা হয়ে থাকে।
টুকটাক বানান ভুল, কিছু ব্যাখার অসংগতি বাদ দিয়ে এই কনসেপ্টের স্ট্যান্ড এলোন হিসেবে ভালো একটি বই। বইটা সব পাঠকদের একবার হলেও পড়া উচিত কারণ সাইকোলজিক্যাল ও ক্রাইম থ্রিলার ক্রসওভারে বেশ ভালো ফ্লেভার পাওয়া গিয়েছে। চরিত্রের নামধাম বলে বলে তাদের ইতিহাস জানানোর দরকার নেই, বেশি জানতে হলে বই কিনে পড়া শুরু করে দিবেন যদিও বইটা স্টক আউট, তবে চিন্তা নেই ডিসেম্বর নাগাদ হাতে পেয়ে যাবেন।
‘‘মস্তিষ্কের বিকৃতি কতটা মারাত্মক হলে একজন মানুষের বিনোদন হয়ে উঠতে পারে - খুন!?’’
➢ লেখক, প্রচ্ছদ, মলাট ও বাইন্ডিং—
মুসফিক উস সালেহীন ‘ঋ’ উপন্যাসের পূর্বে ‘‘জাদুকর’’ ও ‘‘ইন্দ্রলিপি’’ নামে দুইটি ফ্যান্টাসি ঘরনার বই রয়েছে একই সিরিজের। সামনে উক্ত বই দুইটির সিক্যুয়েল ‘‘রাজগড়’’ আসবে এবং নতুন স্ট্যান্ড এলোন হিসেবে ‘কাকতাড়ুয়া’ নামের আরেকটা ক্রাইম থ্রিলার জনরার উপন্যাস আসবে বলে কনফার্ম হয়েছে। লেখকের লিখনশৈলী ও বিস্তারিত বর্ণনা বেশ ভালো, খাপছাড়া ভাবটা একেবারে নেই। চরিত্রের বিশ্লেষণে বেশ দারুন ফ্ল্যাশব্যাক সৃষ্টি করার দক্ষতা চমৎকার, শুধুমাত্র প্লট সাজানো আরেকটু বেটার হলে সাথে খুনের সাথে রিলেটেড রয়েছে সেগুলো আরেকটু এক্সপ্লোর করলে বেটার হতো বলে মনে করছি। পর্ব হিসেবে গল্প টানলেও একইসাথে সব চরিত্রের ফ্ল্যাশব্যাক বা সাবপ্লট না ঢুকানো ভালো এক্ষেত্রে নতুন পাঠক অনেক সময় দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে।
প্রচ্ছদ করেছেন ‘সজল চৌধুরী’ ভাই। বইটাকে নিজের ক্রিয়েটিভ ডিজাইনে দিয়েছে অন্যমাত্রা। সচারচর কাজ গুলো থেকে খানিকটা ভিন্ন বটে�� প্রচ্ছদের ফ্রন্ট ও বেক ভালো লেগেছে সাথে ‘ঋ’ লেটারিং টাও। প্রচ্ছদ নিয়ে কোন কথা হবে না। আপ টু দ্য মার্ক।
‘‘চিরকুট’’ প্রকাশনীর বইগুলা হাতে নিয়ে পড়তে সাথে সংগ্রহ রাখতে অন্যরকম অনুভূতি পাওয়া যায়। শক্তপোক্ত বাইন্ডিং সাথে ক্রিম কালারের মোটা পৃষ্ঠা বইটাকে পড়তে আনন্দ দেই ভীষণ। এইভাবে চলতে থাকুক, সামনে এগিয়ে যাক।
✬ গুডরিডস— ৪.২৬/৫ (২৩) ✭ ব্যাক্তিগত রেটিং— ৩.৫/৫
‘ঋ, একটি ক্রাইসিসের গল্প যেটা শুরু হয় শৈশব থেকে শেষ হয় মৃত্যুর স্বাধীনতা দিয়ে। যে মৃত্যুতে শুধুই রয়েছে লোভ, ঘৃণা, বৈষম্য, অহংবোধ, হিংসা! যেখানে ঠাঁই পাইনি ভালোবাসার কিঞ্চিৎ ছোঁয়া! এইটাই ঋ।’
➠ বই : ঋ | মুসফিক উস সালেহীন ➠ জনরা : সাইকোলজিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার, ফিকশন ➠ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০ ➠ প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী ➠ প্রকাশনী : চিরকুট | মূল্য : ৩৮০ টাকা মাত্র
বই শেষ করার পরে যদি তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাতে হয়, তাহলে আমি বলবো জাস্ট থ হয়ে গেছি। এর আগে এমন বই পড়ার অভিজ্ঞতা আমার হয়নি।
ঢাকার ভেতরেই এক মফস্বল মতন জায়গা হচ্ছে মণিপুর। মণিপুরে আছে ২৭টা বাড়ি নিয়ে গঠিত মমতা কলোনি। এই মমতা কলোনি ও তাদের বাসিন্দাদের নিয়েই কাহিনী আবর্তিত হয়েছে। কোণাপাড়া স্কুলের হেড মাস্টার রমজান আলী এক শীতের রাতে খুন হলেন। গলায় তিন বার ছুরি চালানো হয়েছে, তারপর সেখানে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে একটা এক টাকার কয়েন, হাতের কব্জিতে লেখা হয়েছে 'ঋ'। মণিপুর থানার দারোগা বিখ্যাত গোয়েন্দা জায়েদ হাসনাতের অধীনে কাজ করতে পাঠানো হলো সদ্য ডিটেকটিভ ট্রেনিং শেষ করা মেসবাহকে। এদিকে এখানে ওখানে সেইম প্যাটার্নে খুন হয়েই যাচ্ছে, কিন্তু দিশা মিলছে না। একদিন হুট করে হাসান রিদওয়ান নামের এক লেখক জায়েদ হাসনাতের কাছে এসে বললেন তিনিই খুনি। এমনকি খুঁটিনাটি এমন তথ্য দিতে লাগলেন যা একমাত্র খুনি ছাড়া অন্য কারো পক্ষে জানানো সম্ভব না। কিন্তু তিনি গারদে থাকা অবস্থায়ও খুন থামলো না। তাহলে কে খুনি????
উপন্যাস সম্পর্কে প্রথমেই বলবো লেখকের অসাধারণ লেখনীর কথা। বইয়ের কাহিনী, লোকেশন, চরিত্র সবাই যেন জীবন্ত। শুধু ভাষা দিয়ে একটা গল্প চোখের সামনে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। এক বসায় পড়ে ফেলার মতো বই। সবচেয়ে বড় কথা বইয়ের মাঝপথেই খুনি কে সেটা আপনি ধরতে পারবেন। কিন্তু খুনের মোটিভ জানতে পারলে একটা প্রচন্ড নাড়া খাবেন। মানুষের মনের একদম গহীনের অন্ধকার, অশুভ দিকটা ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। যার কারনে এই উপন্যাসটা ইউনিক। অসাধারণ। টুকিটাকি ভুল যে ছিল না তা নয়, কিন্তু সেগুলো খুব বড় কিছু না। কিছু অযাচিত বর্ণনা যেমন মনোবিজ্ঞানী নাসির রহমানের ফ্যামিলি ডিটেইলস দেয়া হয়েছে, যার আসলে প্রয়োজন ছিল বলে আমার মনে হয় না।
সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসাবে বাংলাদেশের অন্যতম সেরা মৌলিক ঋ। ব্যক্তিগত পছন্দ হিসাবে জাহিদ হোসেনের গিলগামেশের পরেই রাখবো ঋ কে।
পড়তে একটু দেরিই হয়ে গেল উপন্যাসটা। সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে বেশ উপভোগ্য। তবে ভালো লাগল অন্য কিছু কারণে। প্রথমত উপন্যাসটা প্লট ড্রিভেন নয়, ক্যারেক্টার ড্রিভেন। প্রত্যেকটা চরিত্র ও এদের কার্যকলাপ নিখুঁতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যা এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে উপন্যাসকে। আর ডিটেইলিং মারাত্মক, অনেক মানুষ বিরক্ত হলেও যেটা ভালো লেগেছে আমার। দ্বিতীয়ত থ্রিলার হলেও সামাজিক উপন্যাসের ছাপ রয়েছে, এটাও ভালো দিক। তৃতীয়ত সাইকোলজিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার, তদন্তের প্রক্রিয়া ও দর্শনের দিকগুলোও ভালো ছিল। খুনের মোটিভগুলো সরল, যে প্রক্রিয়ায় খুনগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে সেটা প্র্যাকটিক্যালি কতটা পসিবল জানি না, যদিও শেষে সাইকোলজিক্যাল এনালাইসিস করে ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। যাক গে, এসব ব্যাপার না, ব্যাপার হল বইটা উপভোগ করেছি। পোয়েটিক জাস্টিস টাইপ এন্ডিংও মনমতোই ছিল, লেখক গড়বড় করেননি।
ঋ বইটার প্রাণশক্তি হলো নিপুণতম চরিত্রায়ন। প্রতিটা চরিত্রগুলো এতোটা নিঃখুত এবং বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছিল যে সবকিছু বাস্তব ঠেকছিল। যদিও চরিত্রের সংখ্যা যথেস্ট বেশি (থাকাটা স্বাভাবিক, কেননা বাংলাদেশ জনবহুল দেশ :3), তবুও খেই হারাইনি। চরিত্রায়নের পাশাপাশি উপস্থাপনাও বেশ লেগেছে। টানটান উত্তেজনা কিংবা মাথা ঘুরানো টুইস্ট না থাকলেও দার্শনিক ও মনস্তাত্ত্বিক আলাপ এবং নান্দনিক বর্ণনাশৈলি আপনাকে প্রতি পাতায় আসক্ত থাকতে বাধ্য করবে। এক কথায়, বেশ উপভোগ্য এক মৌলিক পড়লাম।
মুশফিক উস সালেহীনের লেখা এইটা আমার প্রথম বই। শুরুতেই বলে ফেলি বইটা আমার বেশ ভাল লেগেছে। এর কারণের মধ্যে অন্যতম হল সিরিয়াল কিলিং বিষয়টি নিয়ে বাংলা সাহিত্যে যত বই পড়ছি তন্মধ্যে এইটা ব্যতিক্রম। ব্যতিক্রম হবার কারণটা বলে দিলে বিশাল স্পয়লার হবে বলে আগালাম না আর। চরিত্রগুলা খুব সুন্দর করে বোনা হয়েছে। রহস্য আস্তে আস্তে জট ছাড়িয়ে অন্তিমের দিকে গিয়েছে। এই গল্পের নায়ক কে আর ভিলেন কে সেটা নির্ণয় করতে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হবে। মানুষকে প্রভাবিত করা যে একটা শিল্প সেইটা লেখক খুব সুন্দর করে তুলে এনেছেন। মনোবিজ্ঞানে পড়াশোনা করা লোক যে মনের বিজ্ঞানকে সুন্দরভাবে তুলে আনবেন সেইটা প্রত্যাশিত ছিল। বইটা যখন শেষের দিকে যাচ্ছিল তখনো আমার মনে হচ্ছিল এর শেষটা আমার পছন্দ হবে না। কিন্তু বিস্ময়করভাবে লেখক বেশ দক্ষতার সাথে বইটা যে সমাপনী টেনেছেন সেটা আমার কাছে খুব ভাল লেগেছে। হুট করে শেষ করলেও কোনভাবেই আমার কাছে বেখাপ্পা লাগল নাহ। সুতরাং সব মিলিয়ে বইটাকে ৫ দেয়া যেত। কিন্তু দিতে পারলাম না। এক কারণটা হয়ত অনেকের কাছে পছন্দ হবে না, তাও বলি। হুমায়ুন আহমেদের মিসির আলী সিরিজে আমি বেশ কিছু মনোবিজ্ঞানের টার্ম পড়েছিলাম যেটা কিনা গল্পের প্লটের সাথে এমনভাবে মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল যাতে কিনা পাঠক এক অবর্ণনীয় আনন্দের সুযোগ পায়। এইটার অভাব আমি বোধ করেছি এই বইয়ে। নাসির সাহেবের কাছে চমকপ্রদ কিছু আশা করেছিলাম যাতে উনি ব্যর্থ। সে জন্য একতারা কেটেই নিলাম।
১৮০ নং পৃষ্ঠায় নাম নিয়ে একটা ভুল রয়ে গেছে�� এছাড়াও হাসান সাহেব, হাসান ঋদওয়ান দুই রকমের ব্যবহার চোখে লেগেছে। খুব একটা ভুল চুক হয়নি বানানে। প্রচুর চরিত্র এসেছে গেছে। নাম নিয়ে আমি বরাবরই একটু অমনোযোগী, মনে থাকে কম। তবুও খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি। প্রচুর তত্ত্ব, দর্শনের ছড়াছড়ি পাতাগুলো জুড়ে। বেশ কনভিন্সিং করে উপস্থাপন করেছেন লেখক। পরতে পরতে রহস্য এগিয়েছে, খুলেছে। শেষটা নিয়ে আরো ডিটেইলিং হলে বেশ হতো। মাঝামাঝি বেশ কয়েক জায়গায় অতিরিক্ত ডিটেইলিং কিছুটা বিরক্তির সৃষ্টি করেছিলো। ওভারওল বেশ ভালো একটা বই। পাঠকের মস্তিষ্ক নিয়ে টানাটানি করা সব উপকরণ দিয়ে সম্মৃদ্ধ।
ঢাকার এক মফস্বল এলাকায় এক সকালে পাওয়া গেল একটি লাশ। লাশের হাতের কব্জিতে মার্কার পেন দিয়ে লেখা - ঋ! খুনের রহস্য উদঘাটনে নামলেন দারোগা জায়েদ হাসনাত। সহকারী হিসেবে সাথে যোগ দিয়েছে মেজবাহ কবির, যে কিনা সদ্যই ডিটেকটিভ ট্রেনিং শেষ করে এসেছে। খুনটা ঠিক কি কারণে হয়েছে তা নিয়ে যখন জায়েদ হাসনাত খাবি খাচ্ছিলেন, তখনই একজন আগুন্তুক এসে দেখা করলেন জায়েদ হাসনাতের সাথে। দাবী করলেন, খুনটা তিনিই করেছেন। এরকম কেস জায়েদ হাসনাত আগেও দেখেছেন। একজনের খুনের দায় আরেকজন নেয়। এক্ষেত্রেও তাই ভাবলেন। কিন্তু সেই আগন্তুক শুধু দাবিই করলেন না, এমন কিছু তথ্য জানালেন যেগুলো আসলে খুনী ব্যতিত কারো জানার কথা না। তৎক্ষনাৎ তাকে গ্রেপ্তার করলেন। কিন্তু সে লোক থানা হাজতে থাকা সত্ত্বেও আরেকটা খুন হলো এবং সেই খুনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিলেন লক আপে আটকে থাকা সেই রহস্যময় আগন্তুক। কিন্তু এটা কিভাবে সম্ভব? খুনী বলে যাকে গ্রেপ্তার করেছেন সে যদি খুনি না হয় তাহলে খুনী কে? আড়ালে বসে কলকাঠি নাড়ছে কে?
একটু আলাদা প্লটের বই ‘ঋ’ এর স্পেশালিটি যতটা না প্লট তারচাইতে বেশি চরিত্রায়ন। প্রায় প্রতিটি চরিত্রকেই লেখক এত সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছেন যে মনে হচ্ছিলো এদেরকে আমি দেখতে পাচ্ছি। আর মূল চরিত্রের চরিত্রায়ন তো লা জওয়াব। মানে কোন একজন লেখক কোন একটা বইতে কোন একটা চরিত্রকে যদি এমনভাবে তৈরী করেন যে, বই শেষ হবার পরেও সে চরিত্রটি মাঝে মধ্যেই মনে পড়ে এবং সে টাইপের চরিত্রের প্রসঙ্গ কোন আড্ডায় আসলেই বলে উঠি, ‘আরে এতো পুরা অমুকের মত,’ তাহলেই তো বলা যায়, চরিত্রায়নে লেখক সফল, নাকি? মুশফিক উস সালেহীন ‘ঋ’ তে ঠিক তাই করেছেন। তবে তার চরিত্রায়নের এই গুণ আগেই টের পেয়েছি ‘কাকতাড়ুয়া’তে (লেখকের এ বইটাই আমি আগে পড়েছি)। ঐ উপন্যাসে লেখক মুশফিক উস সালেহীন দারুণ ভাবে তৈরী করেছিলেন বঙ্কিম চরিত্রটাকে। ইদানিং আমাদের দেশে অনেকেই থ্রিলার লিখছে এবং তারা আসলেই বেশ ভালো লিখছে। তবে তাদের মারমার কাটকাট হার্ড থ্রিলার পড়ার সময় দারুণ লাগলেও বেশিরভাগই মনের কোণে জায়গা করে নিচ্ছে না। ‘ঋ’ এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। বইয়ের মাঝে যে দূর্বল কিছু পাইনি এমন নয়, তবে তা ছাপিয়ে ঋ চরিত্রটি আমাকে মুগ্ধ করেছে বেশ, তাই সে ভুল গুলো, লুপহোল কিংবা আননেসেসারি জায়গাগুলোকে আমি সজ্ঞানে বায়াসড ভাবে এড়িয়ে গেলাম। তবে একটা জিনিস না বললে পাঠকের সাথে অন্যায় করা হয়। তা হলো, খুনি যেভাবে মানুষকে কনভিন্স করছে এটা আমার কাছে প্রপার মনে হয়নি। মানুষ এত সহজে এত বড় কাজ করার জন্য কনভিন্স হবার কথা না। অন্তত আমি হতাম না আর কি।
এক্সিকিউশনে খানিকটা দূর্বলতা, মিডিওকোর একটা প্লট নিয়ে বইটা এভারেজ হতে পারতো। কিন্তু মূল চরিত্রের মাঝে যে কাব্যিক দর্শন আমি পেয়েছি তা মূল চরিত্রকে কাগজের মানুষ থেকে একটা অস্তিত্বতে পরিণত করেছে আমার মনে। আর এ কারণেই বইটা আমার কাছে বাংলা ফিকশনের জগতে অনন্য একটা সংযোজন বলে মনে হয়েছে।
সাব-জনরার মারপ্যাঁচে না গিয়ে বলা যায়, 'ঋ' মোটা দাগে থ্রিলার জনরার এক ভিন্ন স্বাদের কাজ বটে! শুরুটা বেশ ধীর। অনেক চরিত্রের আগমন, এখানে-ওখানে। আসল ঘটনা ঘটাতে লেখক সময় নিয়েছেন বেশ। তবে পাতার পর পাতা পড়া চলে তেমন বিরক্তি ছাড়াই। জাদুকর থেকেই দেখে এসেছি, লেখকের ডিটেইলেইং বেশ ভালো, যেটা আরও পোক্ত হয়েছে এই বইয়ে। অন্তত একঘেয়ে, বিরক্তিকর নয়। তবে এত চরিত্র মাথায় রাখতে মাঝে সাঝে হিমশিম খেতে হয়েছে বৈকি। পুরো বইটাই ধীরগতির হলেও অর্ধেক পেরুবার পর আমি একটানা পড়ে গেছি। মূল চরিত্রদের কাজকারবার আটকে রেখেছিল ভালোই। বইয়ের সবচেয়ে পছন্দের দিক হচ্ছে ক্যারেক্টারাইজেশন। প্রতিটা চরিত্রকে আলাদা স্বত্তা হিসেবে অনুভব করা যায়। আরেকটা পছন্দের ব্যাপার ছিল-গতানুগতিক থ্রিলারের মতো শেষে গিয়ে নাটুকে টুইস্ট দেয়ার চেষ্টা করেননি লেখক। কাহিনী থামিয়েছেন নিজের মতো করে, চরিত্রের প্রয়োজনে চরিত্রের ইচ্ছায়। সব মিলিয়ে ভিন্ন স্বাদ দিয়েছে ঋ। এই বই সবাইকে রেকমেন্ড করার মতো না। মানুষ আর রুচি বুঝে রেকমেন্ড করতে হবে।
প্রচ্ছদ: চমৎকার। প্রোডাকশন: পিডিএফ পড়েছি বলে এ ব্যাপারে মন্তব্য নেই। ৪/৫
মৌলিক সাইকোলজিকাল আমাদের দেশে খুব বেশী নাই। যেগুলো আছে তার মধ্যে "ঋ" কে সেরাগুলোর একটা বলা যায়। "মন নিয়ে খেলা" বলে যে একটা কথা আছে, তার প্রয়োগ ভালো ভাবেই করা হয়েছে বইটাতে।
প্রথম দিকে অসংখ্য চরিত্রের ভিড়ে কূল-কিনারা করতে পারছিলাম না। প্রথম ৫০/৬০ পেজ পর সবগুলো চরিত্রকে গুছিয়ে আনা শুরু হয়। তখনই এতো চরিত্রের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারি।
প্রতিটা চরিত্রের বিল্ডআপ ছিলো পরিপূর্ণ। এতোটা বিস্তারিত ভাবে চরিত্রগুলো গঠন করেছেন লেখক যে প্রত্যেক ব্যক্তিকে খুব চেনাজানা লাগছিলো। (বইয়ের শুরুতেই অবশ্য লেখক বলে দিয়েছেন চরিত্রগুলো বাস্তব থেকে নেয়া)
লেখকের আরো কয়েকটা বই পড়েছি। সেখানে লেখককে দৈনন্দিন জীবন-যাপন, আচার-আচরণের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বর্ণনা দিতে দেখেছি। যা অনেকের কাছে হয়তো ভালো লাগেনি, কিন্তু আমার কাছে ব্যক্তিগত ভাবে বেশ ভালো লেগেছিল। এই বইয়ে লেখক তা কমিয়ে এনেছেন। (একটা চরিত্রের মুখ দিয়ে লেখক সে কথা বুঝিয়েও দিয়েছেন কেন কমিয়ে দিয়েছেন)
একটা কলোনীকে কেন্দ্র করে মূল প্লট। সেখানকার অধিবাসীদের জীবন, পারিপার্শ্বিক বর্ণনা খুব গোছানো ভাবে ব্যখ্যা করা হয়েছে। প্রতিটা ঘরের সদস্য থেকে শুরু শুরু করে উঠানের পাশের কাদা মাখা কলপাড়ের বর্ণনাগুলো পর্যন্ত ছিলো পুরোপুরি বাস্তবতা সম্বলিত, পড়ার সময় মনে হয়েছে এই কলোনীতে হেটে বেড়াচ্ছি।
খুনী কে, কিভাবে খুন হচ্ছে সব জানার পরেও বইটা একবার পড়ে আপনি তৃপ্তি পাবেন না, মনে হবে আরেকবার পড়ি। কি যেন একটা আকর্ষণ আছে লেখাগুলোর মাঝে। সিরিয়াল কিলিং এবং সাইকোলজিকাল থ্রিলারের মিশেল হলেও, পরিপূর্ণ সাইকোলজিকাল খেলায় আবদ্ধ হবে পাঠক।
মৌলিক বই হিসাবে পছন্দের সাইকোলজিকাল থ্রিলারের লিস্টে অবশ্যই বইটাকে রাখবো। এটা এমন বই যেটা কাউকে সাজেস্ট করতে পারি চোখ বন্ধ করে।
কাহিনি সংক্ষেপঃ ঢাকার অদূরের এক মফস্বল কোণাপাড়া। শান্ত-নিস্তরঙ্গ এই মফস্বল হঠাৎই চঞ্চল হয়ে উঠলো। একজন শিক্ষক খুন হলেন। গলা কেটে খুন করা হয়েছে তাঁকে, আর ক্ষতস্থানে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে এক টাকার একটা কয়েন। শরীরে মার্কার দিয়ে লেখা 'ঋ'। অদ্ভুত এই খুন নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করা শুরু করলেন কোণাপাড়া থানার দারোগা জায়েদ হাসনাত। এই লোকটাও বেশ অদ্ভুত। কোন একটা বিচিত্র কারণে জায়েদ সাহেব কোন প্রোমোশন চান না। দারোগা হয়ে থাকতে পেরেই তিনি খুশি। কিন্তু মেধাবী এই লোকটা সমাধান করে ফেলেছেন প্রায় ২৭ টা কেস!
সিআইডি'র নতুন রিক্রুট মেজবাহ কবির। তাকে পাঠানো হলো কোণাপাড়া থানায় ফিল্ড এক্সপেরিয়েন্স গ্যাদার করতে। আদতে দারোগা জায়েদ হাসনাতের আন্ডারের তাকে ইন্টার্নি করতে হবে। এদিকে আরেকটা খুন হয়ে গেলো। খুনের প্যাটার্নও সেইম। কাটা গলা, ক্ষতস্থানের মাঝে ঢুকিয়ে রাখা এক টাকার কয়েন, মার্কার দিয়ে লেখা 'ঋ'। মেজবাহ কবির অ্যাসিস্ট করতে শুরু করলো জায়েদ হাসনাতকে।
মোটামুটি অখ্যাত এক লেখক ও অনুবাদক হাসান ঋদওয়ান। সরাসরি দারোগা জায়েদ হাসনাতের কাছে এসে তিনি দাবী করলেন, খুনগুলো তিনিই করেছেন। কোণাপাড়া থানায় মোটামুটি সাড়া পড়ে গেলো। কিন্তু ঋদওয়ান সাহেবের দাবীর সপক্ষে কোন রকম প্রমাণ জোটাতে ব্যর্থ হলো পুলিশ। কিন্তু খুনগুলোর ব্যাপারে এতো ডিটেইল কিভাবে জানে এই লোক? তার আসল উদ্দেশ্য কি?
এদিকে খুন কিন্তু থেমে নেই। একের পর এক মানুষকে একই প্যাটার্নে খুন করা হচ্ছে। অথচ পুলিশের হাতে বলতে গেলে কোন সূত্রই নেই। অতীত ঘেঁটে জানা গেলো, এমন ঘটনা এর আগেও ঘটেছে। সম্পূর্ণ মুখোশধারী এক খুনীর পেছনে ছুটছেন দারোগা জায়েদ হাসনাত ও তাঁর টিম। অজ্ঞাত এই সিরিয়াল কিলার কি আসলেই কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে নাকি সে নেহাতই উন্মাদ!
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ 'ঋ' পড়বো পড়বো করছিলাম প্রকাশের পর থেকেই। ধরাই হচ্ছিলো না। দীর্ঘদিন ধরে বইটা পড়ে ছিলো আমার কাছে। অবশেষে পড়ে শেষ করতে পারলাম। 'ঋ' একটা বিশুদ্ধ সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হতে পারতো। 'হতে পারতো' এই কারণেই বললাম, কারণ খুনীর মনস্তত্ত্বকে এখানে লেখক মুশফিক উস সালেহীন যেভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন সেগুলোর অনেক পয়েন্টের ব্যাপারেই আমার দ্বিমত আছে। অন্যকে প্রভাবিত করতে পারার অসীম ক্ষমতা অনেকের ভেতরেই ছিলো ও আছে। কিন্তু প্রভাবিত করার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু দর্শন ও যুক্তি শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। 'ঋ' পড়ে আমার কাছে এই দর্শন ও যুক্তি ইন্টারেস্টিং মনে হলেও দুর্ভেদ্য মনে হয়নি। তবে লেখকের জীবনবোধের প্রশংসা করার মতো বেশ কিছু দার্শনিক মতবাদ আমি এই বইয়ে পেয়েছি, যা আমাকে চিন্তার খোরাক যুগিয়েছে। চিন্তা করতে ভালো লেগেছে সেগুলো নিয়ে।
বইয়ে মমতা কলোনির বাসিন্দাদের সম্পর্কে যে বর্ণনাগুলো লেখক দিয়েছেন, সেগুলো যথেষ্ট উপভোগ্য লেগেছে আমার কাছে। প্রায় প্রত্যেকটা চরিত্রকেই তিনি বেশ কাছ থেকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন যা অনেকাংশেই সফল মনে হয়েছে আমার কাছে। অর্থাৎ, 'ঋ'-এর চরিত্রদের চরিত্রায়নে আমি সন্তুষ্ট। দারোগা জায়েদ হাসনাত, হাসান ঋদওয়া, মেজবাহ কবির, বাবুর্চি খুরশেদ পাটোয়ারি, নিজাম ড্রাইভার, তারেক হাসান, সুরবা চৌধুরী সহ অন্যান্য চরিত্রগুলো নিজ নিজ অবস্থানে বেশ শক্তিশালী ছিলো।
বইয়ের সমাপ্তিটা আমার কাছে ভালোই লেগেছে। কাহিনির মাঝে ও শেষাংশে এসে কিছু জায়গায় যদিও কিছুটা বোর হচ্ছিলাম, কিন্তু ক্লাইম্যাক্সটা সেই বোরিংনেস পুষিয়ে দিয়েছে। লেখক মুশফিক উস সালেহীনের দুটো বই আমি এর আগে পড়েছি। ফ্যান্টাসি থ্রিলার 'জাদুকর' ও 'ইন্দ্রলিপি'। ফ্যান্টাসির মতো ক্রাইম থ্রিলার ও সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারেও লেখক সময়ের সাথে আরো সাবলীল হবেন আশা করি।
সজল চৌধুরীর করা প্রচ্ছদটা চমৎকার লেগেছে আমার কাছে। আর চিরকুটের প্রোডাকশন বরাবরের মতোই প্রিমিয়াম। বইটা সম্ভবত আউট অভ প্রিন্ট। তবে বইঘর অ্যাপে এর ইবুক অ্যাভেইলেবল আছে যতোদূর জানি। আগ্রহীরা চাইলে পড়ে ফেলতে পারেন 'ঋ'।
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৩.৫/৫ গুডরিডস রেটিংঃ ৩.৯২/৫
#Review_of_2022_16
~ শুভাগত দীপ ~
(৩০ নভেম্বর, ২০২২, বিকাল ৫ টা ১৩ মিনিট; নিজ রুম, নাটোর)
খানিকটা স্পয়লার থাকতে পারে, তবে মনে হয় না তাতে কোন সমস্যার সৃষ্টি হবে।
"ঋ" মুশফিক ভাইয়ের বেশ আলোচিত একটা বই। মুলত সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার জনরায় লেখা বইটা। আমার আসলে এই জনরা সম্পর্কে খুব একটা পরিচয় নাই। তো একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে কয়টা কথা বলতে চাই বইটা সম্পর্কে।
বইটা এক কথায় দারুণ লাগলো। এই রাত প্রায় আড়াইটায় পড়ে শেষ করে সাথসাথ এই ছোট্ট রিভুটা লেখতে বসছি।
সে যাক, পুরো বই জুড়ে লেখক যে মাথার খেলা খেলেছেন তা বেশ উপভোগ করেছি। তেমন মেজর কোন টুইস্ট নেই বা আমার কাছে তেমন লাগেনি তারপরও টানা পড়ে গেছি শেষে কি হয় তা জানার জন্য। কালপ্রিট যথাযথ শাস্তি পায় কিনা তার জন্য। বলতে হবে শেষ করে তৃপ্তি এসেছে তবে মন ভরেনি। কারণ, কালপ্রিটের উত্তরসুরি ঠিকই তৈরি করে গেছেন তিনি। বিষয়টা আমার ঠিক হজম হয়নি।
বইয়ে কাল্পনিক এক চরিত্রের মাধ্যমে তিনি মোটামুটি সকল থ্রিলার পাঠকদের ধুয়ে দিলেন বলে মনে হলো। 😷 আমরা বর্ণনা পছন্দ করি না। দুপদাপ এ্যাকশন চাই আমরা। তাই মনযোগ দিয়ে বইটার অতিরিক্ত বর্ণনা পড়ে গেছি। সত্যি বলতে, বিন্দুমাত্র আপসোস নাই। মারাত্মক ইঞ্জয় করেছি বর্ণনাগুলো। চোখের সামনে ফুটে উঠতে দেখেছি দৃশ্যপটগুলো। এতোটাই বাস্তব ছিল ওনার বর্ণনা। আর ওনার ভাষাশৈলি বা বাক্য বিন্যাস দেখে বারবার মুগ্ধ হয়েছি। বারবার পড়তে ইচ্ছে করছিল।
**
শুরুর দিকে এতো এতো চরিত্রের আনাগোনা। খেই হারিয়ে ফেলছিলাম কেন যেন। পরে আস্তে আস্তে তা মানিয়ে নিতে পারছি। আর অতিরিক্ত বর্ণনা ভালো লাগলেও কিছু জায়গায় ঠিকই তা বিরক্তের উদ্রেক করেছিল। গল্পের সাধারণ ফ্লো-টা নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বলে মনে হয়েছে। বানান ভুল খুব একটা চোখে পড়েনি। প্রিন্টিং মিস্টেক ছিল কিছু। যেমন, কাশেম এক জায়গায় কালাম হয়ে গেছলো। এগুলো আসলে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। তারপরও পাঠক হিসেবে নিজের দায়িত্ববোধ থেকে বললাম আরকি।
মোটা দাগে, ভালো একটা বই, বিষাদময় একটা বই। সকলের পড়া উচিত। ভালো না লাগুক, কিছু শেখা যাবে বা উপলব্ধি করা যাবে বলে মনে করি।
বইটা মাস তিনেক আগে পড়া শেষ করেছিলাম, আর আমি আজ বসছি রিভিউ লিখতে! [ কি পরিমাণ অলস আমি এটাই প্রুভ করে ]
ঋ বইটির দিয়ে ই "মুশফিক উস সলেহীন " এর লেখা প্রথম পড়ি আমি। ' ঋ ' বইটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে ধরা হয়। ফ্লাপের লেখা পড়ে'ই আমার বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মেছিলো।
লেখক প্লটটা দারুণ ভাবে সাজিয়েছেন। প্রথম দিকে ধীরস্থির মনে হলেও একটু সামনে আগানোর পর খুব স্মোথ ভাবে প্লট আগায়। লেখকের চরিত্র বর্ণনার ধরন দারুণ। কিন্তু বইটাতে চরিত্রের পরিমাণ নেহাত কম নয়! মাঝে মাঝে হিমসিম খেতে হয়েছে চরিত্রগুলো নিয়ে! কিন্তু একদম শেষ পর্যন্ত ই যেনো, চরিত্রের তাগিদেই প্লট এগিয়ে গেছে। হুট করে শেষে শক দেয়ার মতো কিছু করেননি লেখক। এ ব্যপারটা খুব ভালো লেগেছে। পুরো প্লটটাতে একটা সামাজিক গল্প আছে, নারী - পুরুষের কাহিনি, ঝগড়া ! সব মিলিয়ে যেনো মনে হচ্ছিলো আমাদের আশেপাশের গল্প। চরিত্রগুলো, কাহিনি গুলো যেনো চোখের সামনে ভাসছিলো৷ আর আমার মনে হয় একজন লেখকের স্বার্থকতা এখানেই!
বইটি প্রথমেই খুন দিয়ে শুরু৷ আর খুনের, এ এক ভিন্ন পদ্ধতি! খুনি খুন করে মার্কার দিয়ে হাতে কবজিতে 'ঋ' লিখে দিয়ে যায়। তদন্তে নেমে পড়ে জায়েদ হাসানাত। তার সাথে এসে জুটে সদ্য ডিটেকটিভ ট্রেনিং শেষ করা মেজবাহ্ কবির। এদিকে গল্পে বলা হয় আরেকজনের কথা যিনি লেখক (অনুবাদক) রিদওয়ান হাসান (ঋদওয়ান হাসান) !
তদন্তের এক পর্যায়ে রিদওয়ান হাসান জায়েদ সাহেবের কাছে স্বীকার করে সে খুনি৷ খুনের বর্ণনা দেয় একটার পর একটা! এবং এমন সব তথ্য দেয় যা কেউ জানে না। বাধ্য হতে হয় মেনে নিতে যে তিনিই খুনি কিন্তু রিদওয়ান হাসান যে খুনী করে তার কোনো প্রমাণ নেই! তাহলে তারপর কি হয়?.....
সাইকোলজি আর ক্রাইম থ্রিলারকে একসঙ্গে জুড়ে অসাধারণ একটা থ্রিলার উপন্যাস তৈরি করেছেন লেখক। এর মাধ্যমে লেখকের লেখনীও মাপা যায়!
বইটাকে সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে আখ্যান দেয়া হলেও বইটার জনরা নিয়ে যেনো আমার মনে প্রশ্ন জাগে! এই ভাবে একের পর এক খুন, সিরিয়াল কিলিং এর কথা ইঙ্গিত করে। আবার খুন করে প্রশান্তি পাওয়ার ব্যপারটা ভাবলে যেনো মনে হয় খুনি সাইকো, সাইকোপ্যাথ যাকে বলে। আবার একদিক থেকে ভাবলে সিরিয়াল কিলিং এর মতো এখানেও কিন্তু মোটিভ ছিলো! কিন্তু যাই হোক এসব নিয়ে তর্ক করতে চাই না, বইটা দারুণ লেগেছে এটাই সবচেয়ে বড় কথা।
মুশফিক উস সলেহীন এর ট্রিলজি জাদুকর, ইন্দ্রলিপি, আর এর পরের টা মেবি হবে রাজগড়। রাজগড় বের হয়েছে কি না সেটা আমি জানি না৷ তারপর তার লেখা থ্রিলার উপন্যাস ঋ, কাকতাড়ুয়া। উনার ট্রিলজির কথা শুনেই উনাকে চেনা। বাট লেখকের ট্রিলজির বইগুলো আমার পড়ার সৌভাগ্য হয়নি। তবে ঋ এবং কাকতাড়ুয়া পড়া হয়েছে। লেখক দারুণ লিখেন। খুব শীঘ্রই উনার বাকি বইগুলো পড়ে ফেলার ইচ্ছে আছে। আর কাকতাড়ুয়া নিয়ে না হয় আরেকদিন বলা যাবে! আরেকটা ব্যপার নিয়ে তো বলা ই হয়নি, প্রচ্ছদ আর বাইন্ডিং। দুটোই দারুণ। প্রচ্ছদ দেখে তো আমি প্রচ্ছদের প্রেমে পড়ে গেছি। আর চিরকুটের বাইন্ডিং, সুন্দর! ❤️
খুব ভালো লেগেছে বইটা, দারুন একটা সাইকোলজিকাল থ্রিলার বই। শুরু দিকে খুব স্লো লেগেছে অনেক চরিত্র কিন্তু ধিরে ধিরে ভালো লাগা শুরু হয়। বইটার শুরুতে লেখক বলে দিয়েছেন " ঋ-তে উল্লেখিত প্রত্যেকটি প্রধান চরিত্র এবং তাদের পরিণতি সম্পুর্ণ বাস্তব থেকে হুবুহু টুকে নেয়া...এমনকি চেহরার বর্ণনাটুকুও" এর কারনে বইটা শেষ করে অনেক সময় ধরে ভাবাবে পাঠাক দের কে। কিন্তু বইতে বেশ কিছু বানান ভুল ছিল আশা করবো পরের সংস্করণে ঠিক করে দিবে।
'কিছু বাস্তব সত্যিই এতটা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয় যে, তাঁদের প্রকাশের জন্য কল্পনার আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। 'ঋ' তেমন একটি গল্প। 'ঋ' তে উল্লেখিত প্রত্যেকটি প্রধান চরিত্র এবং তাঁদের পরিণতি সম্পূর্ণ বাস্তব থেকে হুবহু টুকে নেওয়া। ঋ একটি সম্মিলিত চরিত্র। মোট পাচজন ব্যক্তির সমন্বয়ে 'ঋ' এর সৃষ্টি।'
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ
কিছু উপন্যাস আছে, যেগুলো পড়ার পরে বই নিয়ে মুক্তোমনা আলোচনা করতে আপনি আরামবোধ করবেন। এই বইটিও আমার কাছে সেরকম। কিছু বই আছে প্রতিটা মূহুর্ত আপনি উপভোগ করবেন, শেষ হবার পরেও চিন্তার রেশ টা আপনার মধ্যে থেকে যাবে। ঋ তেমন একটি বই। আমি আসলে এত সুন্দর করে আলোচনা করতে পারি না। অনেকে হয়তো আমার সাথে ডিফার করতে পারেন, বইটি আদৌ এতো ভালো কি না। ব্যক্তিগত যুক্তিগুলো উপস্থাপনের চেষ্টা করছি।
বইটি প্রকাশিত হয়েছে সাইকোলজিকাল থ্রিলার/ক্রাইম থ্রিলার- উভয় জনরার অন্তর্ভুক্ত হয়ে। সে হিসেবে বইতে তথা-কথিত সাইকোলজিকাল ব্যাপারস্যাপার নিয়ে অতিরিক্ত কপচাকপচি একদম ই পাইনি। অপরাধ বা ক্রিমিনোলজি নিয়েও অতি আলচনাও একদম ই নেই। লেখক সুকৌশলে তথাকথিত আলোচনা গুলো এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু পড়া শেষে বইটিকে সাইকোলজিকাল থ্রিলারের জনরাতে রাখতে আমার বেগ পেতে হচ্ছে না।
তারপরে বলতে হয় লেখকের সুগভীর জীবনবোধ। একটি সাইকোলজিকাল থ্রিলারে মধ্যবিত্ত শহুরে জীবন, মফস্বল জীবনের জীবনবোধ তীব্রভাবে উপভোগ করেছি। এক পর্যায়ে আমার ক্ষনিকের জন্য সন্দেহ হচ্ছিলো বইটিকে সাইকোলজিকাল থ্রিলারেই ফেলবো না কি জীবনবোধ জনরাতে। প্রত্যেকটা ঘটনা উপস্থাপনের পরেই সে সম্পর্কিত একটি দর্শন বা মন্তব্য লেখক উল্লেখ করেছেন যা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে পাঠককে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। কখোনো দাগ কেটেছে।
তারপর আসে ক্যারেক্টার বিল্ডাপ। এ কথা স্বীকার্য, শুরুতে একের পর এক অসংখ্য চরিত্র এসেছে। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে এগোনোর পরে আমি খুব ই অবাক হয়ে লক্ষ্য করেছি, গল্পের প্রত্যেকটি চরিত্র সুন্দর বিল্ডাপ এর সাথে আন্তঃসংযুক্ত কোনো না কোনোভাবে।
গল্পের মূল প্লট সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে এগিয়ে গেছে। তাঁর সাথে লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে একই সাথে এগিয়ে নিয়েছেন একটি সাবপ্লট। যেখানে জীবনবোধের ছোঁয়া বেশ তীব্র। খোরশেদ বাবুর্চীর পারিবারিক গল্প (বাবা-মায়ের), সামু পাগলার হাফেজ বাবার গল্প, সামুকে খোরশেদ বাবুর্চীর দেখভাল করা, সাইকোলজিস্ট সাহেবের পরিবার এবং তাঁর ছেলের গল্প, তারেক ছেলেটার পরিবারের গল্প, নিজাম ড্রাইভারের পরিবারের, দারোগা সাহেব ও সুরবার নিত্যনৈমত্ত্বিক ঝগড়া ইত্যাদি মধ্যবিত্ত টানাপোড়েন এবং জীবনবোধ পাঠককে ছুঁয়ে ক্ষান্ত হয়নি। ভাবিয়েছে অনেকটা সময়। অনেকগুলোই গল্পের সংগে সরাসরি সংযুক্ত নয়। কিন্তু সাবপ্লটকে লেখক মূল প্লটের সাথে সাদৃশ্য রেখে সুন্দর লেখনশৈলীতে এমনভাবে এগিয়ে নিয়ে গেছেন, আপনি বিরক্ত হবেন না।
হ্যা, আপনি যদি রগরগে হার্ডকোর থ্রিলার বা কন্সপারেসি প্রেমী হয়ে থাকেন, তবে আমার সাথে আপনি একমত হতে পারবেন না। এই আশা নিয়ে এই বই না পড়াই মনে হয় ভালো। এছাড়া, আপনি যদি জীবনবোধ প্রেমি হোন বা আমার মত সব্যসাচী হোন, তাহলে বইটি আপনাকে টানবে বলে বিশ্বাস করি।
মনঃস্তাত্ত্বিক থ্রিলার লেখা অবশ্যই অনেক যত্নের কাজ। তাঁর সাথে লেখক যুক্ত করেছেন ক্রিমিনোলজি (বা সিরিয়াল কিলিং?!), জীবনবোধ। দেশীয় প্রেক্ষাপটে এই সমস্ত কিছু আঁকড়ে ধরে পাশাপাশি এগিয়ে নেওয়া-অবশ্যই প্রশংশার দাবী রাখে।
লেখক ভূমিকাতে উল্লেখ করে দিয়েছেন, কাহিনী, চরিত্র ও প্লট- বাস্তবের সাথে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। যে কারনে, বইটি পড়া শেষে বইটি এবং চরিত্রগুলো সময় নিয়ে আপনাকে ভাবাবে। বেশ অনেকটা সময়ের জন্য হারিয়ে যাবেন নিজের কল্পনার জগতে। থাকবে দীর্ঘসময় ভাবনা চিন্তার খোঁড়াক।
সর্বশেষ- লেখকের লেখনশৈলী। অনেক ক্ষেত্রে যাকে আমরা 'ডিটেইলিং' বলে থাকি। লেখকের লেখনশৈলী একদম প্রথম শ্রেণ���র। ডিটেইলিং খুব ই স্পষ্ট এবং খুব ই সাবলীল ভাষায়। মনে হচ্ছিলো, বর্ণনা হয়তো আরো দীর্ঘায়িত হলেও বোরিং লাগতোনা। মার্ডারের স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন খুব ই সহজ-সাবলীল ভাষায় এবং কখনো অল্পকথায়।
অসামঞ্জস্যতাঃ বইটি যেহেতু আমার পছন্দ হয়েছে আমার চোখে পড়া কিছু অসামাঞ্জস্যতা উল্লেখ করবো।
চরিত্রগুলোকে লেখক খুব যত্ন নিয়ে এগিয়েছেন এবং ফোকাস করে গেছেন। এক্ষেত্রে প্লটের বেলায় মনে হয়েছে, লেখক চাইলে প্লটের দিকে আরেকটু ফোকাস দিতে পারতেন। সুখপাঠ্য এমনিতেই লেগেছে। তবে ধীরে ধীরে এগিয়ে কিছু ঘটনা হুট করে তাড়াহুরো করেই ঘটে গেলো। কিছু ঘটনা অর্ধেক বা তাঁর বেশি এগিয়ে অসমাপ্ত থেকে গেলো। তো, প্লট বিল্ডাপে আরেকটু সময় দিলে বা তাঁর যে প্রতিভার অস্তিত্ব আমরা ক্যারেক্টারে পেয়েছি সেই যত্ন এখানেও আরেকটু বাড়ালে এটাকে আমি ব্যক্তিগত 'মাস্টারপীস' তালিকায় রাখতাম।
***স্পয়লার এলার্ট*** এই প্যারাটিতে শুধু মাত্র স্পয়লার আছে
একটু আগে বলেছিলাম, অসমাপ্ততার কথা। এখানে কন্সটেবল কাশেমের কিছু জিনিস উল্লেখ্য। হাসান ঋদওয়ান হাজতে থেকে কাশেম কে বলেছিলেন, তিন দিন পূর্বের তারিখে জিডি করতে। কিন্তু কীভাবে যৌক্তিক? এই তিনদিন এর মধ্যে যদি কাশেম সাহেবের ফোনে এস আই রহীম, দারোগা সাহেব বা মিসবাহ কল দিয়ে থাকতো? তবে জিডি করতো কি করে? ধরে নিলাম, কল দেয়নি। একজন কন্সটেবল���র ফোনে তিনদিনের ভেতর থানা হতে কেনো কল আসেনি এটা স্বাভাবিক কিনা আমি কনফিউসড। তাঁর একটি ব্যাখ্যা আশা করেছিলাম। শেষ অবধি ছিলোনা। তারপরে আসি রমজান আলীর ফোনে কাশেম সাহেবের ফোন থেকে তিন বার কল গিয়েছে। কিন্তু কেনো? আদতে তো কাশেম সাহেবের ফোন হারিয়েই যায়নি। সে কেনো রমজান মাস্টার কে কল দিবে? দিতেই পারে। কিন্তু তাঁর ভ্যালিড রিসন আমি পাইনি। এ হতে পারছে না, লেখক পরবর্তি সিকুয়ালের জন্য রেখে দিয়েছেন। কারন যারা জানতো- এস আই তরফদার আর হাসান সাহেব, দুইজন ই মৃত। জিনিসটা আমার কাছে ক্লিয়ার না। হতে পারে, আমার জানার বা পড়ার কমতি আছে। কিন্তু তা না হলে, আমি একে প্লটের ল্যুপহোল হিসেবে রাখবো। ইয়াকুব মারা যাবার আগে তাঁর দারোয়ান তাহেরকে চা আনতে পাঠায় এবং চেয়ারে ফিরে এসে মারা যায়। তাহের পরে পুলিশকে বলে সে আগুন পোহাতে গেছিলো, আসেনি। কিন্তু তাঁর তো চা নিয়ে বা চা যে পায়নি তা জানাতে এসে মৃত ইয়াকুব কে আবিষ্কার করার কথা। ইয়াকুবের ভাগ্নে রেজিস্টার খাতা বদলাচ্ছে। কিন্তু কেনো? আপাত দৃষ্টিতে এটিকেও প্লটের ল্যুপহোল মনে হচ্ছে। এছাড়াও দুইটি জায়গায় অসামাঞ্জস্যতা চোখে পড়েছে। মেজবাহ রিকশা দিয়ে যাবার সময় রমজান আলীর ক্রাইম সিন দেখতে পায় এবং যেয়ে দেখে, দারোগা সাহেব লাশ নিয়ে চলে গেছেন। তো মেজবাহও রওনা দেয় থানার দিকে। পরের অংশে দেখা গিয়েছে, ভোর বেলা দারোগা লাশ এক্সামিন করতে এসেছে। এখানে দ্বিতীয় পার্টের শুরুতে একটি '৬ ঘন্টা পুর্বে' হেডলাইন দরকার ছিলো মনে হয়েছে। একইভাবে, দারোগা সাহেব বাসায় গিয়ে দেখে হাসান সাহেব তাঁর বাসায় বসে আছে, সুরবার সাথে আলাপ করছে। পরের অংশে আবারো দেখা গেছে, হাসান সাহেব মাত্র দারোগা সাহেবের বাসায় এলো এবং সুরবা দরজা খুলে দিয়ে আলাপচারিতা শুরু করেছে। এখানেও সূচনায় একটি '২০ মিনিট পূর্বে' হেডলাইন দরকার মনে হয়েছে। এখন হতে পারে লেখক ইচ্ছেকৃত এই ধারাতে লিখতে চেয়েছেন, পাঠক কিছুটা কনফিউস হয়। তবে তিনি সফল। আর যদি তা নাও হয়, লেখক কি করবেন, না করবেন না, তা পরিপূর্ণ লেখকের স্বাধীনতা। তবে কিঞ্চিত সেকেলে পাঠক হিসেবে আমার মনে প্রশ্ন এসেছে, লেখক কি পাঠকের প্রতি দায়বদ্ধতা একটু হলেও এড়িয়ে যাননি? তরফদার সাহেব যে খুনগুলো করেছেন সেগুলো আরেকটু এক্সপ্লোরিং বা ব্যাখ্যার দাবী রাখে পাঠকমনে। তবে সাবপ্লটগুলোর ব্যাপারটা এপ্রেশিয়েট করছি দারুণ ভাবে। ***স্পয়লার শেষ***
টুকটাক বানান ভুলগুলো এড়িয়ে গেলে, সুখপাঠ্য স্ট্যান্ড এলোন নোভেল হিসেবে আমি রিকমেন্ড করছি- যারা পড়েননি তাঁদের উদ্দ্যশ্যে। অনেক জ্ঞ্যানী-গুণী বোদ্ধা আছেন। আমার উল্লিখিত অসামাঞ্জস্যতা অন্যভাবে নেবেন না যেনো। বইটি আমার খুব পছন্দ হওয়ার দরুণ ব্যাপারগুলো উল্লেখ করেছি। আর লেখক নিয়ে আলাদা করে কিছু বলা প্রয়োজন বলে মনে হয়না। তাঁর লেখনশৈলী নিয়ে আলোচনা করেছি অলরেডি।
ভালোলাগার জায়গাগুলোঃ লেখকের সুগভীর জীবনবোধ আর দর্শন থেকে তুলে দিচ্ছি - 'ভদ্রতা হয়তো আমাদের আচরণে সাম্যতা আনতে পেরেছে, কিন্তু ভাবনায় পারেনি। যা বিশ্রী, তা বিশ্রাই ই ঠেকে। স্পীড ব্রেকার না থাকাতে কোনো অসুবিধে হচ্ছে না, রাস্তাঘাটের গর্ত (এ শহরে) যানবাহনের গতি রোধের দায়িত্বটি পালন করে। জীবিকার টানে যারা বাড়ি ছাড়ে, তার আর কখনো বাড়ি ফেরা হয় না। হয় নতুন বাড়ি হারিয়ে ফেরে নাহয় নতুন বাড়ি নিয়ে ফেড়ে। অধিকার খাটানো একদিন ভাল্লাগে, দুইদিন ভাল্লাহে। তিন্দিনের দিন আর ভাল্লাগেনা। সমাজের বিশাল কেউ হবার চাপ, ভদ্রতার মুখোশ, সর্বপরি বাচতে ভয় আছে আমাদের। মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে মানুষ ই। কিছু জ্বলুনি নেভাতে অন্য জ্বলুনির প্রয়োজন হয়। কিছু ক্ষতি পোষাতে আরো ক্ষতি কামাতে হয়। একজন পুরুষ তাঁর প্রেমিকার মাঝে সব চায়। এযাবত কালে যত নারীর সান্নিধ্য সে পেয়েছে, সব একসাথে। মায়ের আদর, বোনের শাসন, প্রতিবেশীনির চাহনী, পরস্ত্রীর সৌন্দর্য্য এমনকি পতিতার উত্তাপ!'
প্রচ্ছদ, মলাট ও বাইন্ডিংঃ চিরকুট প্রকাশনীর প্রচ্ছদ, মলাট ও বাইন্ডিং নিয়ে আসলে নতুন করে উল্লেখ করবার কিছুই নেই। তবে যারা এর আগে চিরকুটের বই পড়েননি তাঁদের জন্য- বই এর প্রচ্ছদের ডিজাইনটি গল্পের প্লটের বিষয়বস্তুর সংগে অত্যন্ত সামঞ্জস্য পূর্ণ হয়েছে। বই এর নামের খাজকাটা ডিজাইন মনোমুগ্ধকর। চিরকুট প্রকাশনীর বই হাতে নিলে আমার বই পরার আগ্রহ কিছু বেড়ে যায় তাঁদের সুন্দর শক্ত মলাট,বাধাই, ক্রিম কালার পেইজিং এবং নতুন বই এর নেশা জাগানো গন্ধের কারনে। চিরকুটের প্রতি আবেদন বা অনুরোধ ই থাকবে, এই জিরো টলারেন্সের ১০০% কোয়ালিটি মেইন্টেইন্যান্সে যেনো কখোনো ছাড় না পড়ে।
➠ বই : ঋ | মুসফিক উস সালেহীন ➠ জনরা : সাইকোলজিক্যাল ক্রাইম থ্রিলার, ফিকশন ➠পৃষ্ঠা- ২৮৭ ➠ প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০ ➠ প্রচ্ছদ : সজল চৌধুরী ➠ প্রকাশনী : চিরকুট | মূল্য : ৩৮০ টাকা মাত্র রেটিংঃ গুডরিডস— ৪.১৯/৫ (২৩) ব্যাক্তিগত— ৪/৫
লেখকের লেখা এই প্রথম পড়ছি। সত্যি বলতে দারুণ চমকেছি। আমাদের দেশে এতো ভালো ভালো মৌলিক থ্রিলার হচ্ছে ইদানীং যে, যেকটা চোখে পরে সব নিয়ে নিতে ইচ্ছে হয়। আর গল্পের জনরাগুলোও চোখে পরার মতো।
এই বইটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার নাকি ক্রাইম থ্রিলারের কাতারে ফেলবো,তা নিয়ে ভীষণ ভেবেছি,যাক! এতো ভেবে কাজ নেই-এই বই দু কাতারেই ফেলা যায়। GoodReads এ গল্পের সংক্ষেপ ভালো লেগেছিলো,তাই নেয়া। গল্পের প্লট আমার কাছে যথেষ্ট নতুন,যদিও বই হাতে নিয়ে কিছুদূর যাওয়া অবদি তা বুঝিনি।ফ্ল্যাপ পড়ে চমকে উঠেছিলাম!এ মা!!শুরুতেই খুনের কথা! হারু নিশ্চয়ই এ গল্পের জানোয়ার আর হেডমাস্টার রমজান তার শিকার।
কিন্তু পাতা খুলার পর দেখি আমি কতো ভুল!এতোদিন ভাবতাম ফ্ল্যাপ পড়ে গল্পের আভাস পাওয়া যায়,কিন্তু এই বইয়ের বেলাতে তার উল্টো। 'টানটান উত্তেজনা '- লাইনটা এই বইয়ের জন্য মানানসই। এই বই পড়া অনেকে বলবেন বইতো এগিয়েছে ধীরে গতিতে, তাহলে টানটান উত্তেজন�� আসলো কীভাবে? কিন্তু এই বই পড়ে শেষ অব্দি যাওয়া,কি হবে না হবে,কেনো হচ্ছে এসব সারাক্ষণ ভাবা তো এই ক্যাটাগরিতেই পড়ে,তাইনা? পুরো বই শেষ করেও শেষ হলোনা এমন একটা ভাব ছিলো শেষে, লেখক এমন জায়গায় বই শেষ করেছেন,যেটুক পড়ে পাঠকের মনে হবে -আরেহ! এটা কি হলো,এরপর কি হলো(i may have used f-bomb several times, with full form of aggressiveness).।
তবে যাক, ঋ কি বা তার রহস্যের কিনারা পেয়েছি সেটাই অনেক।লেখক সুন্দরভাবে প্লট গুছিয়েছেন। সবাইকেই সুন্দরভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন, নিজস্বতা দিয়েছেন। আবার কেমন ভাবে যেনো সবাইকে একজনের হাতে সুতো দিয়ে বেঁধে দিয়েছেন। পুতুল বলছিনা তাদের শুধুমাত্র একটা কারণে-সুতো যতোই নাচানো হোক না কেনো,সবাই যে প্রেডিক্টেবল আচরণ করেছে, তা কিন্তু না। তবে এই যে বইতে ধুমধাম অনেক চরিত্র গজিয়েছে,তা একটু চোখে লেগেছে।
যাদের মৌলিক থ্রিলারের দিকে ঝোক আছে,নিতে পারো।খারাপ লাগবেনা।
এটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার যার অর্থ হচ্ছে বোরিং হওয়ার সব রকমের অধিকার এর আছে। একটা সময়ে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক নিজেই নিজেকে খুনি দাবী করে থানায় এসে ধরা দেয়। তবু খুন থেমে থাকে না। তাই পুলিশ তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।শেষে কিসের তদন্ত আর কিসের কী 😑 দারোগা জায়েদ হাসনাতের ভাব ভঙ্গি শুরুতে একদমই ভালো লাগছিলো না। পরে গিয়ে পরিষ্কার হয় তার মনঃকষ্ট আর অদ্ভুত আচরণের রহস্য। আমি তো ভেবে পাই নাই তাঁর মতো ভালো মানুষ এমন লোভী মেয়ের প্রেমে পড়ে কীভাবে। এমন বেকুব সব চরিত্র এত সহজেই ব্রেইনওয়াশড হয়ে যাচ্ছে দেখে খুবই মেজাজ খারাপ হইসে আসলে। আর হাসান ঋদওয়ানের মুখ দিয়ে স্বয়ং লেখকই যেন বলতেসিলো, "তুৃমি এই বই বোঝো নাই মানে হচ্ছে তোমার মাথায় গোবর!" 🤕আর যখনই এই লোক গনতন্ত্র, প্রকৃতি এইসব নিয়ে পকপক করা শুরু করতো, কী যে বিরক্ত লাগতো। মন চাইতো স্কিপ করি। লেখক যতোই নানা ভাবগম্ভীর ডায়লগ দিয়ে জায়েদ হাসনাত আর হাসান ঋদওয়ানের চরিত্রগুলারে ধারালো দেখাইতো চাইতো, ততোই এদের আমার কাছে ভোঁতা লাগতো। বইটা তো অনেক কষ্টে শেষ করলাম। মনে হয় ১ মাস ধরে পড়েছি। আশ্চর্যের বিষয়, শেষে এসে বইটার জন্য আবার খারাপও লাগতেসে৷ 😧 অথচ পড়তে গিয়ে উপভোগ করি নাই একদমই। আবার এটাও অস্বীকার করার উপায় নাই লেখক লিখেন ভালো৷ খুনের দৃশ্যগুলা চমৎকার বর্ণনা করেছেন। আবার কিছু জিনিস মেকিও লেগেছে। বইয়ের নাম : ঋ লেখক : মুশফিক উস সালেহীন বইঘর অ্যাপ থেকে লেখকের ঋ আর কাকতাড়ুয়া একসাথে কিনেছিলাম। কাকতাড়ুয়াটা পড়া বাকি এখনও। দেখা যাক।
এই বইটা ভালো! শুরুতে একটা কমপ্লিমেন্ট দিলাম যাতে একবার চোখ বুলালেই টোটাল আলাপের সামারিটা ধরা যায়। প্রচুর রিভিউ দেখেছিলাম বইটা নিয়ে। তাই আগ্রহ থেকে কিনে পড়া..
বেশি বড় ডিটেইলড আলাপে যাবোনা লেখকের মতো। লেখক সত্যিই খুব ভালো ডিটেইলিং জানেন। অত্যন্ত ভালো পর্যবেক্ষণ শক্তি আর বর্ণনাগুণ রয়েছে লেখকের। এই জিনিশটা বেশ ভালো লেগেছে। বইটা রগরগে থ্রিলার না। একদম ধুম ধাম কাহিনি হয়ে শেষ হবে এমন না। আস্তে ধীরে আগানো সামাজিক উপন্যাসের মতোই, কিন্তু একটা সিরিয়াল কিলিং থ্রিলার! অদ্ভুত না? আসলেই তাই। এই ধরণের কাহিনীতে ভালো সিনেমা বানানো সম্ভব। তবে এত বেশি ক্যারেক্টার, এত নাম..., আর কিছু কিছু জায়গায় প্রয়োজনীয় উত্তেজনাটুকুও যখন ছিলোনা, তখন খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। বেশ ছোট ছোট জীবনবোধ আর ফিলোসফিক্যাল আলাপচারিতার মধ্যে দিয়ে আমি যখন ২০০ পেইজে এসেও দেখলাম একই গতিতেই আগাচ্ছে, তখন একটু সন্দেহ হচ্ছিলো। ফিনিশিং টা কেমন হয় আবার! শেষের দিকে একটা কবিতার অংশবিশেষ ছিলো এরকম,
"এই মানুষেরা যদি, মানুষদের সত্যি জানতো! দিনশেষে মানুষ, মানুষ মুগ্ধ করতে করতে ক্লান্ত।"
তিনি চেয়েছিলেন একটা পোয়েটিক জাস্টিস টাইপ ব্যাপার দিয়ে হিসেবের খাতা পুরোপুরি বন্ধ না করেই শেষ করতে...এবং সেটায় বেশ সফল লেখক। তবে কাহিনী আরেকটু ভালো হলেও হতে পারতো। এক্সপেকটেশন এর পারদটা বেড়ে গেছে লেখার ধরণে। তবে সব মিলে একটা নতুন ধরণের বাংলা মৌলিক থ্রিলার, তাই সাধুবাদ!
বইটা ভালো লেগেছে। গল্পের প্লটটা আসলেই সুন্দর। এটা টান টান উত্তেজনার কোন থ্রিলার না, ধীরে ধীরে আগানো, তবে গল্পটা জমেছে বেশ। খুনের দৃশ্য গুলো গা শিউরে ওঠার মতো ছিল। তবে বইয়ে চরিত্রের পরিমাণ বেশি মনে হয়েছে, তাই মাঝে মাঝে তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছিল একটা অন্যটার সাথে। কিন্তু গল্পের শেষ পরিনতি টা মন মত হয়েছে। তাই পাঠক হিসেবে আমি ব্যাপক খুশি। লেখকের অন্য বই পড়ার ইচ্ছা আছে। আমাদের দেশের মৌলিক থ্রিলারগুলো আসলেই অনেক ভালো হচ্ছে। যারা "সিরিয়াল কিলিং" নিয়ে বই পড়তে আগ্রহী তাদের আরও ভালো লাগবে আশা করি।
নিসন্দেহে "ঋ" ভালো একটা বই। দারুণ উপভোগ করেছি পুরোটাই। খুনগুলার ধরণ আলাদা। এটা স্বাভাবিক। সাইকোলজিক্যালি যে খেলাটা খেলা হয়েছে পুরো গল্পে তা বলাবাহুল্য। তবে শেষ অবধি কেন যেন মনে হলো, কিছু একটার কমতি রয়েই গেছে।
শেষ দিকে বইয়ের তাল হারিয়ে ফেলেছে যেন লেখক, এই একজন কে নিয়ে বলছে তো এই আরেকজন কে নিয়ে। শেষ দিকে পড়লে গিয়ে মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল। প্রথম দিকে যতটা মজা নিয়ে শুরু করেছিলাম ততটা মজা শেষটা পড়ে পাইনি। সাইকোলজি বিষয় গুলা বেশ ভালো লাগলেও শেষটা আমায় পুরোপুরি মজা দিতে পারেনি।
এরকম বই পড়লে আলোচনা করতে ইচ্ছে করে। মুশফিক উস সালেহীনের ভাষায়, সাহিত্য বই পড়া দিয়ে হয় না। হয় আলোচনায়। তবু বিস্তারিত আলোচনা করা যাবে না। তাতে স্পয়লার হয়ে যাবে।
বইতে টুকটাক ভুল-ত্রুটি আছে। সেসব নিয়ে বলতে চাই না। কারণ, বইয়ের যে চরিত্রায়ন ও গল্প বলার স্টাইল, সেটা আমার কাছে অসম্ভব ভালো লেগেছে।
হাসান ঋদওয়ানকে আমার কাছে মনে হয়েছে, ঠিক গথাম সিটির জোকার। সরা��রি অস্ত্র হাতে না নিয়ে শুধু বুদ্ধি খাটাচ্ছেন। মনে হয়েছে, ডার্ক নাইটের মতো নিঃশ্বাস বন্ধ করা গল্প। যদিও কিছু ব্যাপার একটু কেমন যেন লেগেছে। অনেকটা হুট করে হয়ে যাওয়া, ম্যাজিকের মতো।
কিন্তু পুরো শহর, দারোগা স্বয়ং যখন অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকে, বেরিয়ে আসতে থাকে পেছনের গল্পগুলো - তখন, মাথায় কেমন একটা দমবন্ধ করা উন্মত্ততা ধাক্কা দিচ্ছিল।
যে কোন গল্প বা উপন্যাসের নামকরণ চিত্তাকর্ষক হলে মানুষের সেই বইয়ের প্রতি আর্কষণ এমনেই তৈরি হয়৷ সে কথায় বলতে গেলে বইটির নামকরণের সার্থকতা একেবারে ভালোভাবে করেছেন লেখক৷ এবার না হয় বইটি উল্টিয়ে পাল্টিয়ে পড়ে আমার মনে যে ক্ষুদ্র পাঠ্যনুভূতি জমা হয়েছে তা না হয় পাঠকদের সাথে শেয়ার করা যাক৷
গল্পের শুরু ধীরলয়ে হয়ে শেষটা অতি দ্রুত হয়ে গেলে গল্পের স্বাদে একটু অপূর্ণতা থেকে যায়৷ শেষের দিকে তাড়াহুড়ো করে শেষ করাটা আমার ভাল লাগে নেই৷ তবে মুশফিকের লেখায় আমার যেইটা ভাল লাগে আবার অনেক সময় বিরক্ত লাগে সেইটা ইন ডিটেইলস রাইটিং৷ তবে তার বর্ণনার মধ্যে পাঠক কে ধরে রাখার মত ক্ষমতা আছে তাই ঐ বিষয়টি উহ্য রাখা যায়৷
হাসান ঋদয়ান, জায়েদ হাসনাত কে কেন্দ্র করে গল্পের গতিবেগ এগিয়েছে। গল্পের প্রয়োজনের এরপর এসেছে নানান চরিত্রায়ন৷ এর মধ্যে খুরশীদ বার্বুচি ও কনস্টেবল কাশেমের চরিত্র আমার কাছে ভাল লেগেছে৷ তবে খুরশীদ বার্বুচি ও খুরশীদ পাটুয়ারির লুপে পড়ে মাঝে মাঝে একটু দৃষ্টি কটু লাগছিল৷ যে কোন একটা পদবী রেখে আগালে হয়তো ভাল হত৷
এবার আসা যাক গল্পের ব্যাপারে৷ বইটা সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসাবে এক কথায় চমৎকার৷ লেখকের লেখার স্টাইল কিছু একটা আছে৷ তার জীবন নিয়ে গভীরতম বিশ্লেষণ, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার গুলো বেশ ভাল ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই গল্পে৷ একটা কোটেসন তো আমার কাছে অতীব চমৎকার লেগেছে৷ "পাপ-পূর্ণ্য হলো শাসনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র৷ ওটা দিয়ে কখনও প্রশান্তি মিলে না।" এরপর প্রবৃত্তি নিয়ে লেখকের ব্যাঙ্গ বিছের উদাহরণটিও বেশ নাড়া দেবার মত৷ এই রকম গল্পের ভিতর ছোট ছোট অনেক ম্যাসেজ, সাব প্লট ও অনুগল্প আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে৷
আসামী তার শিকারের মনস্তাত্ত্বিক জগৎ কে এভাবে দখল করার বিষয়টা বাস্তবিক জীবনে অনেক কেস স্ট্যাডিতে দেখা গেছে৷ তাই জিনিষটা আমার কাছে বেশ উপভোগ্য লেগেছে৷ এই গল্পে কে নায়ক, কে ভিলেন এই প্রশ্নের দোটানায় দিন শেষে আরও অনেক প্রশ্ন রেখে যাবে৷ সাইকোলজিক্যাল থ্রিল, টুইস্ট, সাসপেন্স কি নেই এই গল্পে৷ ঋ পড়া শেষে আমার ভাল লেগেছে৷ ৫ এর মধ্যে মার্কি দিতে বললে হয়তো এ+ পেয়ে পাস করবে৷ এত ভাল এর মধ্যে কিছু ভুল ধরার জায়গা তো থেকে যায়৷
কনস্টেবল কাশেমের মোবাইল হারিয়ে যাওয়া ঘটনার পেক্ষাপটে যেইটা মনে হয়েছে এই জায়গাটা আর একটু ভাল ভাবে লেখা যেতে পারতো। প্রতিটা গল্প সে যুগের অবহ কে ধরে রাখে৷ এই যুগে এসে মোবাইল হারিয়ে যাওয়ার পর সিম না তোলা কতটকু গ্রহণযোগ্য হবে৷
এবার আসি প্রোডাকসনের ব্যাপারে৷ চিরকুটের নান্দনিক প্রোডাকশনের ট্যাগ লাইনের মান রাখতেই যেন তারা প্রতিটা বইয়ের পিছে আদা জল খেয়ে নামে৷ প্রচ্ছদ থেকে শুরু করে বাঁধাই, কাগজের মান কোনটায় কমতি ছিল না। বইটা হাত নিলে একটা অন্য রকম ভাল লাগা কাজ করে৷ টুকটাক বানান ভুল, মিস স্পেল ছাড়া তেমন কোন মেজর ক্রুটি পায়নি৷ এবারেও চিরকুট তার নান্দনিক প্রোডাকশনের মান রাখতে পেরেছে৷
সর্বশেষে বইটি পড়ার জন্য সবার প্রতি আহবান রইলো৷ ঋ এমন একটি বই ক্রিটিক্যাল থিংকারদের ভাবাবে৷ অবশ্যই সুখপাঠ্য একটি বই৷
লেখকের পড়া প্রথম বই। ভাল লাগল! শুরুতে কাহিনি অনেক ধীর গতিতে এগোয়, প্রথম ৫০-৬০ পৃষ্ঠাতেই ব্যাপক পড়িমানে চরিত্রের আগমন ঘটে এবং তাদের বিষদ বর্ণনা দেয়া হয়। তবুও পড়তে ভাল লাগছিল, আর তারপর গল্প গতি পায়। বইটার বেশির ভাগ জিনিসই ভাল লেগেছে। তবুও কিছু ত্রুটি যে নেই তা না। আমি মনে করি কয়েকটা অধ্যায় এর প্লেসমেন্ট ঠিকমত হয়নি। আমি একসময় এটাও ভাবতে ছিলাম যে কিরে, এই অদ্ধ্যায় কি আসলেই এখানে? পরে থাকার কথা তো, প্রিন্টিং মিস্টেক টাইপ কিছু নাকি? আর দু-একটা জিনিস কিছুটা ধোয়াটে রয়েছে, যেমন দারোগা জায়েদ, ঋ এর ব্যাপারে খবরের কাগজে একটা নিউজ দেয়। কেন দেয় তা পরিষ্কার না! যাই হোক, সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হিসেবে খুব ভাল। গল্পের মাঝামাঝি এসেও শেষটা প্রেডিক্ট করতে পারবেন না। রিকমেন্ডেড টু অল!
শারীরিক সমস্যায় আমরা ডাক্তারের বিধিনিষেধ মেনে চলি অক্ষরে অক্ষরে, কিন্তু সমস্যা যদি মানসিক হয় তবে? বেশীরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের ভেতরে এক ধরণের ট্যাবু কাজ করে। তারা মানসিক সমস্যা কারো সাথে প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। কিন্তু, তার সমস্যায় জর্জরিত কোন মানুষ যদি তার সাথে তার মত বা কাছাকাছি কোন ঘটনা শেয়ার করেন, তবে তার সমস্ত সংকোচ, উৎকণ্ঠা স্রেফ বাতাসে মিলিয়ে যায়। মনের আগল খুলে ধরেন তার সামনে। প্রশিক্ষিত মনোবিদ এর থেকেও বেশী সাহায্য করে একই দোষে (!) দুষ্ট বা স্বীকার আর এক জনের অভিমত। "ঋ" সেই আগল খুলে দিয়েছে। মনের অন্ধকার জগৎ এর বিচরণ রয়েছে ঋ তে। যেটা আমরা সবসময় এড়িয়ে চলতে চায়। মুশফিক উস সালহীন এর লেখনী টা ভালো লেগেছে। কাকতাড়ুয়া তে যে রকম সাবলীল লেখনী ছিল, এটাতেও তার ব্যত্যয় ঘটে নি। তবে প্রথম দিকে এত বেশী চরিত্র আর ঘটোনার ঘনঘটায় কিঞ্চিৎ বিরক্তি ধরেছিল। ভয়ে ছিলাম শেষ পর্যন্ত আর একটা "দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দিব" ঘরানার বই পেতে যাচ্ছি কি না! তবে সব কিছু ঝেড়ে ফেলে "ঋ" সমহিমায় উজ্জ্বল।