জন্ম ১৯৫২, ঢাকায়। পড়াশোনা গবর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। ১৯৭০ সালের ডাকসু নির্বাচনে মুহসীন হল ছাত্র সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বিএলএফের সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দৈনিক গণকণ্ঠ-এ কাজ করেছেন প্রতিবেদক ও সহকারী সম্পাদক হিসেবে। দক্ষিণ কোরিয়ার সুংকোংহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘মাস্টার্স ইন এনজিও স্টাডিজ’ কোর্সের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক। তাঁর লেখা ও সম্পাদনায় দেশ ও বিদেশ থেকে বেরিয়েছে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা অনেক বই।
ভয়াল ২৫ মার্চ এবং ১৫ আগস্ট এ দু'সময়ের তাৎপর্যপূর্ণ কিছু তথ্যকে ঘিরে সাক্ষাতকার মূলক বিবৃতিতে দাঁড়িয়েছি বইটি। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর রোড ৬৭৭ নম্বর বাড়িটিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী সঙ্গে অনেক ভুল তথ্য এর সংশোধন। যেমন একটা ঘটনার কথা বলি-বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মমিনুল হক খোকা তার কোনো বইতে উল্লেখ করেছেন, ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের ফ্যামিলি পাশের মোশাররফ হোসেনের বাসায় আশ্রয় নেয়। কিন্তু আশ্রয় দিয়েছিলেন ৩২ নম্বরের পাশের বাড়িটির মালিক ড.আবদুস সামাদ খান চৌধুরী। মোশাররফ হোসেন ছিলেন এ বাড়িটির দোতালার একজন ভাড়াটিয়া মাত্র।
একটা সাংঘাতিক ঘটনা ঘটলে পাঁচমিশালি মসলার মাধ্যমে তার বিবরণ পরবর্তীতেতে হয়ে যায় অনেকটা ঘোলাটে এবং কনফ্লিক্টেড। অনেকরকম জটলা আসল সত্যকেই ধামাচাপা দিয়ে দেয়। এরকম ঘটনা ঘটলে খুব কাছ থেকে যারা টের পায় তারা হচ্ছে প্রতিবেশী। অনেক রকম ছোট ছোট গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে তাদের কাছ থেকে। ঠিক এমন ভূমিকা পালন করেছিলো ৩২ নম্বরের পাশের বাড়িটি। এ বইয়ে বেশিরভাগ বয়ান দিয়েছে ড.আবদুস সামাদ খান চৌধুরী এর বড় ছেলে আহাদ এবং ছোট ছেলে সালমান। সাথে ১৫ই আগস্টের নৃশংসতার বিবরণ পাওয়া যায় রাজসাক্ষীদের জবানবন্দিতে।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে।কারণ এই বাড়িটিতে থাকতেন শেখ মুজিব।এ বাড়িটি থেকেই শেখ মুজিব ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চে গ্রেফতার হোন পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আবার এ বাড়িতেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি হত্যাকাণ্ডের শিকার হোন।এ দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা সম্পর্কে অনেক বই লেখা হয়েছে।ঘটনাগুলোর মোটামুটি একটা প্রতিচ্ছবি এখন আমরা সবাই জানি।কিন্তু বঙ্গবন্ধুর পাশের বাড়িতে যারা থাকতেন তাদের বয়ান এ দুটি ঘটনার ক্ষেত্রে কিরকম?সে ব্যাপারটাই তুলে ধরতে চেয়েছেন লেখক মহিউদ্দিন আহমদ।
বঙ্গবন্ধুর পাশের ৬৭৬ নম্বর বাড়িটিতে থাকতেন ডাক্তার আবদুস সামাদ খান চৌধুরী।তার পরিবারই ২৫ মার্চ রাতে শেখ মুজিবের গ্রেফতারের পর বেগম মুজিবসহ বাকিদের আশ্রয় দিয়েছিলেন।ডাক্তার সামাদের দুই ছেলে আবদুল আহাদ খান চৌধুরী ও আবদুল আলীম খান চৌধুরী তাদের বক্তব্যে তুলে এনেছেন সে রাতে তাদের অভিজ্ঞতা।
২৫ মার্চ নিয়ে তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা,বেগম মুজিবসহ বাকিদের আশ্রয় দেয়ার কথা ইতিহাসে দারুণ সংযোজন।কিন্তু তথ্যের মধ্যে ডিটেইলিংয়ের অত্যন্ত অভাব পরিলক্ষিত হয়।খুব সম্ভব লেখক চাইলে বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারতেন।
আবার ১৫ আগস্টের ঘটনার বেশ কয়েকটি নতুন দিক উঠে আসে আহাদ আর আলীমের স্মৃতিচারণায়।সে রাতে শেখ কামালের গাড়ি ড্রেনে পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা আমার একেবারেই অজানা ছিলো।তাছাড়া শেখ রাসেলকে ড্রেনের স্ল্যাবে ঢুকিয়ে বাঁচানোর চেষ্টাও করা হয়েছিলো - এ তথ্যটাও নতুন।হত্যাকাণ্ডের আগের দিন মিলিটারির লোকেদের রেকি করার ব্যাপারেও জানা যায় তাদের বক্তব্য থেকে।আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় কতটুকু নৃশংস হত্যাকাণ্ড ছিলো সেটি।
মহিউদ্দিন আহমদের প্রবন্ধ সবসময়ই দারুণ।এই বইটাও দারুণ।বঙ্গবন্ধুর প্রতিবেশীদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়গুলো দেখার ভাবনাটাও ইন্টারেস্টিং।কিন্তু ডিটেইলিংয়ের বড্ড অভাব।সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবিটা ফুটে উঠতে গিয়েও ফুটে উঠে না।পাঠক হিসেবে যা বিরক্ত লেগেছে।আরেকটু বড় পরিসরে বইটা পেলে পাঠক হিসেবে ক্ষুধা মিটতো!তারপরও ইতিহাস পাঠকের জন্যে বইয়ের ভাবনাটা লোভনীয়!
আমি যখন শেষ করলাম “৩২ নম্বর পাশের বাড়ি” বইটি, তখন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। তবে এই বাড়িটি ইতিহাসেরই এক অংশ—বিশেষ করে দুটি রাতের জন্য: ২৫শে মার্চ এবং ১৫ই আগস্ট।
তখন এই বাড়ির পাশে ছিল আরও দুটি বাড়ি, যা পরে জাদুঘর নির্মাণের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—সে রাতগুলো পাশের বাড়ির মানুষরা কী দেখেছিলেন? কীভাবে তারা প্রত্যক্ষ করেছিলেন ২৫শে মার্চের রাত আর ১৫ই আগস্টের ভোর?
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তার গবেষণায় সেই প্রতিবেশীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। যদিও তখন আওয়ামী লীগ সরকার তথা শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা ক্ষমতায় ছিলেন, তাই সাক্ষাৎকারদাতারা কতটা নিরপেক্ষভাবে বলতে পেরেছেন—সে প্রশ্ন তুললে ভুল হবে না। তবুও বইটি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও অজানা বিষয় উন্মোচন করে, যা পাঠকের ভাবনার খোরাক জোগায়।
যেমন—২৫শে মার্চ রাত ৩টার দিকে বেগম মুজিব দেয়াল টপকে পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। বাড়িগুলোর মাঝে একটি গেট থাকলেও সেই মুহূর্তে তা কাজে লাগেনি। কাজে এসেছিল গেটবিহীন পাশের দেয়াল। ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিব দেশে ফেরার পর নির্দেশ দিয়েছিলেন: “ডান পাশের বাড়ির সাথে গেট বন্ধ করো, বাম পাশে একটি গেট তৈরি করো।” কারণ সংকটের মুহূর্তে সেই গেট কার্যকর হয়নি। যদিও পরে পুরনো গেট বন্ধ হয়নি, তবে নতুন একটি গেট অপর পাশের বাড়ির সঙ্গে তৈরি করা হয়েছিল।
আরেকটি ছোট্ট কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে শেখ কামালকে ঘিরে। সাক্ষাৎকারদাতার ভাষায়— “সবার রুমে থাকে বুকশেলফ, কিন্তু শেখ কামালের রুমে ছিল গানশেলফ।”
বইটি আকারে ছোট, কিন্তু বিষয়বস্তুতে বেশ আলাদা। এক কথায় বলতে গেলে—আগ্রহী পাঠকদের এটি অবশ্যই পড়া উচিত। কারণ শেখ মুজিব, ২৫শে মার্চ ও ১৫ই আগস্ট নিয়ে যত লেখা হয়েছে, তার অধিকাংশই হয় পক্ষপাতদুষ্ট প্রশস্তি, নয়তো বিদ্বেষপূর্ণ আক্রমণ। নিরপেক্ষ, গবেষণাধর্মী কাজ খুব একটা হয়নি।
পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে গেছে। এখনও যদি সৎভাবে কাজ শুরু করা যায়, তবে সম্ভব। নইলে সময়ের সাথে সাথে তা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
প্রকাশনী বাতিঘর কেঃ ছোট লেখাটি আলাদা করে বই করেছেন, ঠিক আছে। তবে এভাবে টেনেটুনে ১০৮ পৃষ্ঠা না করলেও পারতেন। সাইজ ছোট বই, তারপর এত বেশি ফাঁকা! ঠিকঠাক করলে এই বই ৬০ পৃষ্ঠার বেশি এক অক্ষরও হবে না।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর শুনলেই আমাদের যার কথা মাথায় আসে বইটি সেই মানুষের জীবনের সাথে জড়িত বিভীষিকাময় দুই রাত নিয়ে লিখা। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি যে বাড়িটি আর সে দুই রাত জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের ইতি��াসে। স্বাধীনতার আগে পরে সেখানে তিনি তার পবিবার নিয়ে থাকতেন। একজন খুব সাধারণ মানুষের মতো তিনিও আসে পাশের মানুষের সাথে দেশ, দেশের মানুষ আর রাজনীতি নিয়ে আলাপ আলোচনা করতেন। প্রতিবেশীদের বাসায় তার উঠা-বসা, যাওয়া-আসা ছিল। বইটিতে তার সম্পর্কে জানা অজানা অনেক তথ্য উঠে এসেছে। আর এ সকল তথ্য লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিবেশী, তার বাড়ির পাহারাদার, বাড়ির কাজের লোক আর বিভিন্ন সুত্র থেকে সংগ্রহ করেছেন। লেখক আর বাকি সকল মানুষের সরাসরি কথোপকথন লিখা হয়েছে পুরো বই জুড়ে। এক কথা অনেক সময় বার বার আসলেও লেখক সে কথা মুছে ফেলেন নি বরং রেখে দিয়েছেন যা আমাকে কোন ইন্টারভিউ পড়ার মতো অনুভূতি দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিবেশী ছিলেন ৬৭৬ নম্বর বাড়ির আবদুস সামাদ খান চৌধুরী এবং তার পরিবার। তিনি বেঁচে নেই তবে তার ছেলেরা আছেন বিধায় লেখক তাদের কাছে গিয়ে সেই দুই রাত নিয়ে কথা বলেছেন যে দুই রাত আমাদের কারো কাছেই অজানা না। ২৫ মার্চ আর ১৫ আগস্ট। ঠিক কি ঘটেছিল এই দুই রাতে? সে নিয়ে আছে অনেক কৌতূহল আর ধোঁয়াশা। ২৫ শে মার্চ সম্পর্কে আমরা সবাই-ই কম বেশি জানি। দেশের সে করুণ অবস্থা আর বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার। সে রাতে বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে গেলে বেগম মুজিব সহ বাড়ির সবাই আশ্রয় নেয় চৌধুরী সাহেবের বাসায়। রাতে তারা কিভাবে কাটিয়েছেন?পরদিন সকালে কি হলো? তারা পরে কোথায় গিয়েছিলেন?এর সবকিছু আহাদ খান চৌধুরী ( আবদুস সামাদ খান চৌধুরীর বড় ছেলে) তার স্মৃতি হাতড়ে যতটুকু পেরেছেন লেখককে বলেছেন। ২৫ মার্চের পরে প্রতি রাতে ৬৭৭ নম্বর বাসায় চুরি ডাকাতির মতো ছোট খাট অনেক ঘটনাই ঘটেছে। আবার দেশ স্বাধীন হওয়া এবং বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার পরে সে দিনগুলোতে দু’বাড়ির পরিবেশ কেমন ছিল এ কথা জানা যায়। আরও জানা যায় বঙ্গবন্ধু চৌধুরী সাহেবের কাছে অনেক পরামর্শ নিতেন সে অনুযায়ী অনেক কাজও করেছেন তিনি। বাকশালের আগেও তিনি এসেছিলেন চৌধুরী সাহেবের কাছে। চৌধুরী সাহেব তাকে না করেছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু হয়ত অদৃশ্য কোন শিকলে বাঁধা ছিলেন বিধায় অনুচিত সত্ত্বেও তিনি সে কাজ করেছিলেন। ১৫ই আগস্ট রাতের ঘটনার সাথে জড়িত প্রথমের পরিকল্পনায় বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলার কোন কথা ছিল না বরং তাকে রেডিও স্টেশনে নিয়ে গিয়ে আত্মসমর্পণ করিয়ে ক্ষমতা খন্দকার মোশতাকের হাতে দেওয়ানোর কথা ছিল। কিন্তু পরে পরিবারের সবাইকে মেরে ফেলার নির্দেশ আসে। শেখ কামাল প্রথমে গিয়েছিলেন তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে। কিন্তু তিনি শেখ কামাল পরিচয় দেওয়ায় তাকে সাথে সাথে মেরে ফেলে তারা। পরে একে একে বাড়ির সবাইকে মেরে ফেলা হয়। শেখ রাসেলকে বাঁচানোর চেষ্টা করার হলেও সে চেষ্টা পরে ব্যর্থ হয়। কাকে কোথায় কিভাবে মেরে ফেলা হয়েছিল এর বর্ণনা লেখক তুলে ধরেছেন বঙ্গবন্ধু হত্যা মামালার রায় ধরে।
বইটি পড়ে শেষ করার কিছু মুহূর্ত আগে নিজেকে আর সামলে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠে নি। এতগুলো মানুষ এক রাতেই শেষ হয়ে গেলেন। রেহায় পায় নি ছোট্ট রাসেলও। লোভ মানুষকে কোথায় নামিয়ে আনতে পারে যেখানে মানুষ আর পশুর মাঝে তুলনা করা যায় না। পুরো বই অনেক সহজ পাঠ্য হওয়ায় বইটি এক বসায় পড়ে ফেলতে বেগ পেতে হয় নি আমার।
বইটা মহিউদ্দিন সাহেবের নিজের লেখার চেয়ে অনেকগুলো সাক্ষাৎকারের সংকলন বলা যায়। এই স্পেসিফিক 'প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ানে'(বা এক্ষেত্রে শোনা কথায়) টাইপ লেখায় সব সময়ই ঘটনার কিছু অংশ মিসিং থাকে বা বিপরীতমুখী বক্তব্য দেয়। সেসব বাদ দিলে বইটা পড়তে ভালই লাগে। শেখ পরিবারের হত্যাকাণ্ডের মর্মান্তিক ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়, এই দিনের পাপের বোঝা জাতি এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে।
বইটাতে দেখা গেছে ঘাতকেরা দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানিং আর রেকি করে হত্যাকান্ড সংঘটিত করতে চেয়েছেন, কিন্তু হত্যাকান্ডের সময় অনেক হঠাৎ সিদ্ধান্ত বা পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে৷ তিন সেনা অভ্যুত্থান বইতে যেমন দেখানো হচ্ছিল যে খুব সহজেই হত্যাকান্ড প্রতিরোধ করা যেত, তার কিছুটা কাউন্টার ন্যারেটিভ পাওয়া যায় এখানে।
যাহোক, ছোট সাইজের ১০৮ পেজের বই, চাইলে এক বসাতেই শেষ করা যায়। পড়লে ঠকবেন না।
বইয়ের বিষয়বস্তু বিবেচনায় সুখপাঠ্য বলা যাবে না, তবে মহিউদ্দিন আহমেদের লেখনি সুন্দর, তাই পড়তে আরাম। আরেকটু বড় করার সুযোগ ছিলো কি না জানি না, হইলে মন্দ হইতো না।
৩২ নম্বর পাশের বাড়ি বইটি একটি সাক্ষাৎকারভিত্তিক বয়ান।বইটিতে পাঠক দু'টি বিভাজন খুঁজে পাবে। একটি ২৫ শে মার্চ অপরটি ১৫ ই আগস্ট।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোড ৬৭৭ নম্বর বাড়ি, সবাই জানে এটি শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি।তবে এই বাড়ির সাথে রয়েছে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দিনের অজানা ইতিহাস!সেই ২ তারিখ ও তার পরবর্তী ইতিহাস নিয়ে এই বইটি নিদারুণ ভাবে বাক্য বন্দী হয়েছে পাঠকের জন্য!
২৫ শে মার্চ ১৯৭১...আমরা সকলেই জানি সেই কালরাত্রে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে নেওয়া হয় এবং তিনি ছাড়া পান ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে।কিন্তু, তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁর বাসভবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের সময়কাল ও তাঁর পরিবারের সেই বছরটি কিভাবে কেটেছিল তার বর্ণনা পাওয়া যাবে এই বইটিতে।বঙ্গবন্ধু পরিবারকে কারা আশ্রয় দিয়েছেন তা নিয়ে বেশ কিছু বইয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া দুষ্কর যা এই বইটিতে স্পষ্ট করেছেন লেখক।কেননা অনেকেই জানতেন সেদিন রাতের পর বঙ্গবন্ধু পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিল এরশাদ আমলের বিশিষ্ট আমলা ও পরে বিএনপির এমপি মোশারফ সাহেব।অথচ এই তথ্যটি ভুল ছিল।মোশারফ ছিলেন ৩২ নম্বর পাশের বাড়ির একজন ভাড়াটিয়া। ২৫ মার্চ এ ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দেন ডা.আবদুস সামাদ খান চৌধুরীর বড় বড় ছেলে আহাদও ছোট ছেলে সালমান।আর বাড়ির লোকজনই সেদিন মুজিব পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিল।তাছাড়া এই পরিবারের সাথে সখ্যতার ফলে ১৯৭১ পূর্ববর্তী অনেক অজানা ঘটনা পাঠক জানতে পারবে! সেই সাথে লেখক শেখ হাসিনার স্বামী ওয়াজেদ সাহেব এর লেখা বই থেকেও অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন।কিভাবে ২৬ শে মার্চ বেগম মুজিব কে বন্দী করা হয়,১০ জানুয়ারি ফিরে এসে কোথায় ছিলেন কি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা জানতে পারা যায়।
১৫ আগস্ট ১৯৭৫...বইটিতে ৩২ নম্বর পাশের বাড়ির বয়ানে সেদিনের ঘটনা উল্লেখ করা হয় এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার যে পরিকল্পিত ছিল তারও বর্ণনা করেছেন লেখক।৩২ নম্বর পাশের বাড়ির গৃহিনী জানিয়েছিলেন কি করে বঙ্গবন্ধু হত্যার আগের দিন ১৪ আগস্ট কিছু সৈন্য ভিন্ন বেশ ধরে এসেছিল।তা আমরা অনেকেই জানি না।শেখ রাসেল ও কামাল হয়তো বেঁচে যেতে পারতো। এছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেই তার পরিবারকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যেন এই হত্যাকান্ডের কোনো সাক্ষী না থাকে,যা হুদার কথপোকথনে পাঠক জানবে। সেই সাথে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ১৫ আগস্ট হত্যাকান্ডের রাজ সাক্ষীদের জবানবন্দীও তুলে ধরা হয়েছে__যা পাঠের ফলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে অনেক ধোঁয়াশা কেটে যাবে।
ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর।এই জাদুঘরকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে বিশাল এক পরিকল্পনা, স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আশেপাশের বাড়িগুলো কিনে নিচ্ছে জাদুঘর কর্তৃপক্ষের ট্রাস্টি বোর্ড।কিছুদিন আগে এই ৩২ নম্বর পাশের বাড়িটিও কেনা হয়ে গেছে।বাড়ির মালিক ডা. আবদুস সামাদ খান চৌধুরী,শেখ মুজিবের ডাক্তার সাহেব আর নেই।তাঁর সন্তানেরা আনন্দের সঙ্গেই নিয়মনীতি মেনে বাড়িটি হস্তান্তর করেছেন।
ছোট এই বইটি এক কথায় দারুণ ভাবে অনুসন্ধানী পাঠককে ইতিহাসের অজানা ঘটনা গুলো দিয়ে তৃপ্ত করবে।
বই-৩২ নম্বর পাশের বাড়ি লেখক-মহিউদ্দিন আহমদ ধরণ-বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও ঘটনাবলি রেটিং-৪.৫/৫ পৃষ্ঠা-১০৯ প্রকাশনা-বাতিঘর
এই বইটার নাম আর প্রচ্ছদ যেকোন পাঠককে, বিশেষ করে যারা ইতিহাস পছন্দ করেন, তাদেরকে আকৃষ্ট করবেই। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ইতিহাস কমবেশি সবাই জানেন। লেখক মহিউদ্দিন আহমদ '৩২ নম্বর পাশের বাড়ি' শিরোনামে কী বোঝাতে চেয়েছেন তা-ও নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন এতক্ষণে।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটিতে থাকতেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের ঘটনা আমরা সবাই জানি। এই ৬৭৭ নম্বর বাড়ি থেকেই বঙ্গবন্ধুকে ওই রাতে গ্রেফতার করে পাক বাহিনী। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও সংঘটিত হয় এই বাড়িতেই, ১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট।
তাই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের ৬৭৭ নম্বর বাড়িটি এই দুটি ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত। এই দুটি ঘটনা নিয়ে অনেক বই লেখা হলেও মহিউদ্দিন আহমদ একটু ভিন্ন আঙ্গিকে, ৩২ নম্বর পাশের বাড়ি অর্থাৎ ৬৭৬ নম্বর বাড়ির মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বর্ণনা তুলে ধরতে চেয়েছেন।
২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের পর তাঁর পরিবারকে আশ্রয় দিয়েছিলেন এই ৬৭৬ নম্বর বাড়ির ডাক্তার আবদুস সামাদ খান চৌধুরীর পরিবার। এছাড়া শেখ কামাল, শেখ রাসেল সম্পর্কিত কিছু টুকরো স্মৃতিও সংযোজন করেছেন ৬৭৬ নম্বর বাড়ির লোকজন। বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায় এই বই থেকে। সর্বোপরি বইটাকে কতগুলো সাক্ষাৎকারের সংকলন বলা যেতে পারে।
যেসকল পাঠক বাংলাদেশের যুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বেশ ভালো পড়াশোনা করেছেন, বইটা পড়ে তারা কতটুকু নতুন তথ্য পাবেন তা জানি না। কারণ বইয়ের লেখা আমার কাছে কেমন খাপছাড়া মনে হয়েছে। কোনকিছুরই বিশদভাবে তেমন বর্ণনা নেই। তবুও, কেউ যদি ইতিহাস পছন্দ করেন, বইটা পড়ে দেখতেই পারেন।