একটি ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়িকে ঘিরে রয়েছে কিছু রহস্যময় ইতিহাস আর রয়েছে বংশপরম্পরায় বয়ে চলা এক প্রাচীন অভিশাপ। চারটে দশক ধরে চারটে অস্বাভাবিক মৃত্যু—আত্মহত্যা নাকি খুন? পরিত্যক্ত অন্দরমহলের আনাচেকানাচে নাকি দেখা যায় কুয়াশা ঢাকা এক ছায়ামূর্তিকে। কে সে?
মসক্রপ পরিবারের সমাধির নিচে কে ঘুমিয়ে আছে দুশো বছর ধরে? একটি বাচ্চা মেয়ের কয়েক শতাব্দী পুরোনো ডায়রি কীসের ইঙ্গিত দেয়? বারবার কোন স্বপ্নের কথা ডায়রিতে লিখত সে? সেখানেই কি লুকিয়ে আছে রহস্যের সমাধান?
নাকি আরও গভীরে? মানব সভ্যতার ইতিহাসের বুক থেকে সরিয়ে নেওয়া কয়েকটা পাতা খুঁজতে হবে আমাদের। যুগযুগান্ত করে চলে আসা কিছু লোককথা এবং পৌরাণিক গল্পের ছলে আমাদের যে সংকেত দিতে চেয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা...
প্রতি পাতায় ভয়াবহ মোড় বদলাতে থাকা সায়ক আমানের প্রথম অলৌকিক রহস্য উপন্যাস— “তার চোখের তারায়”।
প্রায় দুশো বছরের পুরোনো খ্রিষ্টান গ্রেভইয়ার্ডে হেঁটে বেড়াচ্ছে সুনন্দা আর পায়েল, সাথে দশ বছরের ছোট্ট মেয়ে তুলি। সারি সারি সমাধি আর শ্বেতপাথরের ফলকে ইংরেজিতে লেখা নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। একটি সমাধি দৃষ্টি আকর্ষণ করলো পায়েলের। বাচ্চা মেয়ে, মারা গেছে মাত্র পাঁচ বছর বয়সে। সেই ১৮০৪ সনে, নাম - এলিজাবেথ মসক্রপ। খেলাচ্ছলে এলিজাবেথের নাম ধরে ডাকলো পায়েল, 'বেথ...বেথ!' সুনন্দার শিরদাঁড়া বেয়ে গেল শীতল অনুভূতি, সমাধির ভেতর থেকে উঠে আসছে মৃদু শব্দ, যেন কথা বলছে কেউ!
দত্ত জমিদারবাড়িটি তৈরী হয়েছে কয়েক শতক আগে। ভগ্নপ্রায় বাড়িটিতে এখন কিছু শরিকদের বসবাস, আর তার লিজ নিয়েছেন নাথ দম্পতি। তাদের একমাত্র মেয়ে তুলিকে বাড়িতে রেখে বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছেন। তার তত্বাবধানে বাড়ির বাঁধা লোকদের বাইরেও নিয়োগ দিয়েছেন সুনন্দা ও নীলাদ্রি স্যানালকে।
তুলিকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে পেরে খুশিই ছিল সুনন্দা। নিজের জীবনের ট্র্যাজেডি এবার ভুলে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু জমিদারবাড়িতে পা রাখার পর থেকে মনটা দমে এলো। চার দশকে চারটে মৃত্যুর ইতিহাস আছে এ বাড়িতে। খুন না আত্মহত্যা তার সমাধান হয়নি কোনোবারই। উত্তরের অন্দরমহল থেকে কে যেন বারবার ডেকে যায় তুলিকে। কালো কাপড়ে ঢাকা ছায়ামূর্তি আর অভিশাপের গল্পও শোনা যায় জমিদারবংশে।
পায়েল রায়চৌধুরীর শিরায় বইছে দত্ত জমিদারবংশের রক্ত। মাঝেমধ্যে পূর্বপুরুষের ভিটেতে বেড়াতে আসে চব্বিশ বছরের মেয়েটি। এবার সুনন্দার সঙ্গে বেশ বন্ধুত্ব হলো তার। দুজনে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পেল দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষ লীলাবতী দত্তের এক পেইটিং৷ যিনি দেখতে হুবুহু পায়েলের মতন। তার ছবিতে ছোট ছোট করে আঁকা অদ্ভুত কিছু চিহ্ন, আর একটি নাম, এলিজাবেথ মসক্রপ!
কী সম্পর্ক মসক্রপদের সঙ্গে দত্ত পরিবারের? উত্তরের অন্দরমহলে রহস্যময় কী আছে? এতো অপঘাতের ছায়া কেন এই বাড়িতে? পায়েল আর সুনন্দার উপস্থিতিতেই এবার আত্মহত্যা করলো দত্তবাড়ির এক শরিকের বারো বছরের ছেলে অতীন। এমন ছোট একটা ছেলে কি আদৌ নিজেকে হত্যা করতে পারে? কিছুই যেন স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
প্রাচীন জমিদারবাড়ি, রহস্য আর আধিভৌতিক আবহের গল্প পড়তে সবসময় ভালো লাগে। সেই আগ্রহ থেকেই পড়তে শুরু করা 'তার চোখের তারায়' বইটি। হতাশ হওয়ার কোনো সুযোগ রাখেননি লেখক। তন্ত্রচর্চা, নিষিদ্ধ ধর্ম, অভিশাপ, কুয়াশায় ঘেরা নারীমূর্তি আর হত্যারহস্য মিলিয়ে উপাদেয় পরিবেশনা পেশ করেছেন পাঠকদের জন্য।
উপন্যাসটিকে কেবল ভূতের গল্প বলা যাবে না কোনোভাবেই। অলৌকিক পটভূমি যতটা আছে, সাথে পায়েলের ক্ষুরধার বুদ্ধিতে রহস্যভেদও রয়েছে। অনেকগুলো চরিত্রের আগাগোনা ছিল গোটা গল্পে, সবার ভূমিকাও জরুরী। কাহিনির বিস্তৃতি এবং লেখকের বর্ণনাভঙ্গি পড়তে ভালো লেগেছে।
কিছু অসঙ্গতি চোখে পড়েছে গল্পে যেগুলোর উত্তর মিলাতে পারিনি। বইটিতে ছাপার ভুল ছিল, তবে তা খুব যে বিরক্ত করেছে তেমন নয়। কিছু কিছু জায়গায় কলকাতার বানানরীতির পার্থক্যের কারণে হোঁচট খেতে হয়। তবে সবমিলিয়ে আধিভৌতিক ও রহস্য রোমাঞ্চের একটি উপভোগ্য বই 'তার চোখের তারায়'।
নামটা যেন ক্যামন ক্যামন, কিন্তু লেখক যখন সায়ক আমান তখন না পড়েই বোঝা যায় ভিতরের গল্পটা অবশ্যই জমজমাট কিছু!
একটা জমিদার বাড়িকে ঘিরে গড়ে উঠে রহস্য। তবে সে রহস্য আজ-কালকের নয়, বহুকাল আগের৷ সেই ইংরেজ আমলের কিছু কিছু কিংবদন্তি, কিছু রহস্য আর বেশ ক'টা অস্বাভাবিক মৃত্যু। আত্মহত্যা নাকি খুন? বইয়ের অন্যতম চরিত্র তুলিকে দেখাশোনার জন্য দিন সাতেকের জন্য জমিদার বাড়িতে আসে সুনন্দা ও তার স্বামী। সেখানেই পরিচয় হয় জমিদার বাড়ির আরেক শরীকের মেয়ে পায়েলের সাথে। উত্তরের অন্দর থেকে কে বা কারা যেন ডাকে তুলিকে। এদিকে রহস্যময়ভাবে আত্মহত্যা করে জমিদার বাড়ির আরেক শরীকের ছেলে অতীন। ফরেনসিকে আত্মহত্যা বললেও সবাই জানে ব্যাপারটা খুন। তদন্তে আসে পুলিশ... পায়েলও বসে থাকে না।জমিদার বাড়ি থেকে অল্প কিছু দূরে অবস্থিত শতবর্ষী পুরোনো গ্রেভইয়ার্ডটিও জড়িয়ে যায় এসব কিছুর সাথে।
ভৌতিক আবেশ পুরোটা বই জুড়ে। কেমন গা ছমছমে টাইপ। আমি পুরোটা সময় আতঙ্কে অস্থির হয়ে পড়ে যাচ্ছিলাম বইটা, না জানি কখন, কোথায় কোন ভূতের সাথে দেখা হয়ে যায়, না জানি কি ঘটে। বলার অপেক্ষা রাখে না লেখক খুব সুন্দরভাবে পুরোটা বইয়ে জালের মতো করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছেন রহস্যগুলোকে। এরপর... এরপর কেবল জাল গুটিয়ে আনা। পেটের ভিতর এক দুইটা প্রশ্ন ভুটভুট করলেও বলতেই হয় জাল গুটানোতে লেখক সফল হয়েছেন দারুণভাবে। ভয়ংকর ভৌতিক জাতীয় ঐরকম কিছু হয়তো নেই বইয়ে কিন্তু দারুণ ছমছমে লেখনীর জন্যেই নাকি আমি ভীতু মানুষ বলেই কি না কে জানে, মূল রহস্য যখন উদঘাটিত হচ্ছিল তখন ভয়ের চোটে রুমের দরজা জানালা লক করেও শান্তি পাচ্ছিলাম না। একটু পর পর চমকে উঠছিলাম, আচ্ছা! খাটের নিচ থেকে 'সে' আবার উঠে এসে আমার পা চেপে ধরবে না তো! তবে মজা লেগেছে অন্য একটা ব্যাপার। মিতিন মাসী বা এই জাতীয় গুটি কতক কেন্দ্রীয় নারী চরিত্র ছাড়া বাদবাকি পুরোটা বাংলা সাহিত্যই পুরুষ গোয়েন্দাদের দখলে। নারী চরিত্র থাকলেও সাইড ক্যারেক্টার হিসেবে গোয়েন্দাদের কখনও সাহায্য করে কখনও বা বাধার সৃষ্টি করা পর্যন্তই ছিল তাদের মূল কাজ 😏 সেখানে পায়েল লিড ক্যারেক্টার.. ভাল্লাগসে ব্যাপারটাহ। ফ্যান্টাস্টিক! জোস 🔥❤
বইয়ের নাম ও প্রচ্ছদ পছন্দ না হলেও পুরোনো জমিদারবাড়ি, ইতিহাস, অকাল্ট, অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার, মার্ডার মিস্ট্রি সব মিলিয়ে জমাটি গল্প। পড়তে ভালোই লাগলো।
সায়ক আমানের সাথে পরিচয় সানডে সাসপেন্সের কিছু ছোট গল্পের মাধ্যমে। গল্প 'ছোট' হলে কী হবে, বেশ 'বড়' আকারের ভয় ধরাতো। তারপর আরিন ও আদিম দেবতার উত্থান পড়ে মুগ্ধতার পারদ উপরেই দিকেই উঠেছিল। 'তার চোখের তারায়' পড়ে সেই মুগ্ধতা বেড়েছে বৈ কমেনি।
শুরু করার পর থেকে দারুণ গতির জন্যে থামতে পারছিলাম না কোথাও। এছাড়া যে বর্ণণা দিয়েছেন লেখক, পড়তে পড়তে মাথার ভেতর একের পর দৃশ্য যেন সিনেমার মতো চলছিল। আর ঠিক এইজন্যেই বইটা মনের উপর বেশ ভালোই প্রভাব ফেলেছে।
'তার চোখের তারায়' বইটিকে বেশ অন্যরকম একটা হরর থ্রিলার বলা যায়। যেখানে হরর এলিমেন্টের চেয়ে থ্রিলটাই বেশি ছিল। কিন্তু হরর এলিমেন্টগুলো লেখক জায়গামতো এমনভাবে দিয়ে রেখেছেন যে পড়তে গেলে গা শিউড়ে উঠছিল। এছাড়া পুরোনো জমিদার বাড়ির দুর্দান্ত বর্ণণা হরর এলিমেন্টগুলোকে অন্য একটা মাত্রা দিচ্ছিল।
সবমিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। লেখকের পরবর্তী ��ৌলিকের অপেক্ষায় থাকবো।
বইটা কেনার সময় আমার বর খুব অবাক হয়েছিল.. আসলে সে একটু নাক উঁচু টাইপ এবং sunday suspense এ সায়ক আমানের গল্প তার একেবারেই ভালো লাগে না.. অবশ্য সেটা যে শুধু আমার বরের মনোভাব তা নয়.. আমিও একই দোষে দোষী. তবে এই বইটা লেখকের নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে অল্প খানিক (teaser) শুনে বইটি সম্পর্কে কৌতুহল জন্মেছিল বই বের হওয়ার আগেই.. কিন্তু আমি প্রবাসী মানুষ আর online-এ বই কেনার ব্যাপারে আমার বরাবরই একটু allergy আছে.. তাই শেষমেশ ২০২০ তে প্রায় বছর তিনেক পর কলকাতায় এসে আর খানিকটা কাকতালীয় ভাবে বইমেলার সময় এসে ঠিক করলাম এই বইটা কিনতে হবেই.. যাই হোক, অনেক হ্যাজালাম এবার বইটির প্রসঙ্গে আসি.. ১) A5 সাইজের ৩২০ পাতার বইয়ের দাম আধুনিক কায়দায় Rs.299 দেখে ঘাবড়ে গেছিলাম.. কিন্তু মনে পড়ছিল এটাও যে এই বইটা আমায় আকর্ষণ করেছিল তার ভাষার পরিপাট্যের জন্যে। তাই কিনে নিলাম। কিন্তু প্রকাশকদের ওপর বেশ রাগ হচ্ছিল। আরে বাবা! এমনিতেই এখনকার ছেলেমেয়েদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ অনেক কম.. এবার প্রায় বছর দশেক বাদে বইমেলায় যতো না বই কেনার ব্যস্ততা দেখলাম তার থেকে selfie/groupfie তোলার ভিড় দেখলাম বেশি.. এমন অবস্থায় প্রকাশক কি ভেবে বইয়ের এতো দাম রাখলেন কে জানে.. কলেজ পড়ুয়া যে দু চার জন বই পড়তে আগ্রহ দেখাবে তারা কি করে এতো দাম দিয়ে বই কিনবে কে জানে!! রিভিউএকটা তারা এই বইটির জন্য তাঁরা নিজ গুণে খসালেন! ২) বইটার লাস্ট দশ বারো পৃষ্ঠা বাদ দিলে এক কথায় unputdownable একটি বই.. প্রথম পাতা থেকে টানটান উত্তেজনা ছিল, অসম্ভব সুন্দর বর্ণনা করেছেন সায়ক একটি ভগ্নপ্রায়, রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়ির, তার প্রায় সমসাময়িক একটি অতি প্রাচীন চার্চ ও তার সংলগ্ন গ্রেভইয়ার্ডের... পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল সুনন্দা, পায়েল, মালতী বা তুলি নয় আমি যেন ঘুরে বেড়াচ্ছি প্রাসাদের উত্তর, দক্ষিণ ও অন্দরমহলের এখানে ওখানে। যেহেতু গল্পের প্রধান চরিত্র হলো সময় তাই আমি একটু দ্বিধা বোধ করছিলাম যে সায়ক এই time-travel কে সঠিকভাবে বুনতে সক্ষম হবেন কিনা.. তবে আমার ধারণা সম্পূর্ণ উল্টে পাল্টে যাকে বলে ঘেঁটে ঘ করে তিনি অসম্ভব নিপুণতার একটি সুন্দর মালা গেঁথেছেন সময়ের সুতোর সাথে গল্পের ইতিউতি ছড়ানো চরিত্রগুলিকে নিয়ে। এছাড়া লেখকের cult বা ধর্ম এবং মনস্তত্ব নিয়ে গভীর গবেষণাও প্রশংসনীয়। আমার ভিনদেশী তিন তারা সেই ভালো লাগার আজ্ঞা বাহক। ৩) শেষ তারা খসার জন্য দায়ী অ্যারিস্টটালের থিওরি অফ ড্রামা!! মানে Exposition, Rising Action, Climax যতখানি রূদ্ধশ্বাসকর ততোখানি এলোমেলো হয়ে গেছে Falling Action এবং বিশেষ করে Resolution-এর জায়গাটা.. কোথাও গিয়ে আমার মনে হলো সায়ক উপন্যাসটির ভিত তৈরী করলেন যত্ন নিয়ে, সুন্দর একটা কাঠামো তৈরি করলেন, এমনকি ছাদের ঢালাইও করলেন নিপুণ ভাবে কিন্তু সে বাড়ির জানলা দরজা বানাতে হয়ত ভুলে গেলেন বেমালুম। তাই পাঠক হিসেবে বাইরের চাকচিক্য দেখে মুগ্ধ হলেও এর ভেতরে প্রবেশ করা গেল না। মসক্রপ পরিবারের সঙ্গে দত্ত পরিবারের যোগাযোগ বা পায়েলর রহস্য উন্মোচন করার পেছনে লজিক বা থিয়োরি কিভাবে তৈরী করা হলো তা একেবারেই স্পষ্ট নয় আর যেটুকু বলা হয়েছে তা যেন বড্ড তাড়াহুড়ো করে একটা জোড়াতাপ্পি দেওয়ার চেষ্টা। তাই শেষ পাতায় এসে একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলা মন বারবার ভাবছিল বহু শতাব্দী ধরে বয়ে যাওয়া এক রহস্যময় ইতিহাসকে কেন যে উনি (লেখক) আরো সময় ধরে উন্মোচন করলেন না কে জানে! তার চোখের তারায় আরেকটু গভীরে গিয়ে খুঁজলে হয়ত আমার দ্বিতীয় তারা খসার সুযোগ পেত না।
কাহিনি সংক্ষেপঃ পুরোনো এক জমিদারবাড়ি। অবস্থান কলকাতা শহর থেকে বেশ দূরের এক মফস্বলে। ভগ্নপ্রায় এই জমিদার বাড়িকে ঘিরেই এই কাহিনি। জমিদারবাড়িটা অনেকের কাছেই অভিশপ্ত। গতো কয়েক দশকে অস্বাভাবিক কিছু মৃত্যুর স্বাক্ষী এর পুরোনো ক্ষয়াটে নোনাধরা দেয়াল গুলো। কেউ মারা গেছে সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে, কেউ কুয়ার ভেতরে পড়ে, কেউ পানিতে ডুবে আবার কেউ নিয়েছে গলায় ফাঁস। আপাতদৃষ্টিতে সবগুলো মৃত্যুই হয়তো দুর্ঘটনা বা আত্মহত্যা মনে হবে। আসলেই কি তাই?
বেবি সিটিংয়ের কাজে অনেকটা অপ্রত্যাশিত ভাবেই এই অভিশপ্ত জমিদারবাড়িতে পা পড়লো সুনন্দা ও নিলাদ্রি সান্যাল দম্পতির। দশ বছরের ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে তুলিকে কয়েকদিনের জন্য এখানেই দেখেশুনে রাখতে হবে ওদেরকে, যতোদিন মেয়েটার বাবা-মা বিদেশ থেকে ফিরে না আসেন। জমিদারবাড়ির বর্তমান অধিবাসীদের মধ্যে আছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। আর এদের সাথে এসে যুক্ত হলো দত্ত জমিদারবংশের লতায়-পাতায় এক বংশধর, তরুণী পায়েল রায়চৌধুরী।
কৌতূহলী ও বুদ্ধিমতী পায়েলের সাথে সুনন্দার দারুণ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠলো। দুইশো বছর আগে মারা যাওয়া বাচ্চা একটা মেয়ের কবরে কি এমন লুকানো আছে, যা ওদের দু'জনকে টানছে? এলিজাবেথ মসক্রপ নামের বাচ্চা মেয়েটার পুরোনো ডায়েরির পাতায় লেখা অচেনা হরফ দেখে গভীর জলে পড়লো পায়েল ও সুনন্দা। এদিকে জমিদারবাড়ির উত্তরদিকের অন্দরমহলে হেঁটেচলে বেড়ায় এক অলৌকিক ছায়া, যার ধোঁয়াটে অস্পষ্ট চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে থাকে জ্বলজ্বলে দুই চোখের তারা।
আবারও একটা মৃত্যু। খুন নাকি আত্মহত্যা? দশ বছর আগে বড়বাজারের ব্যবসায়ী শশীভূষণ সরকার কেন আত্মহত্যা করেছিলেন? পুরোনো দত্ত জমিদার পরিবারের ভেতরের রহস্য আসলে কি? পায়েল নামের এক নাছোড়বান্দা তরুণীকে আরো কতো প্রাচীণ রহস্যের মুখোমুখি হতে হবে?
প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের আড়ালেও রয়ে যায় কিছু বিশ্বাস; যে বিশ্বাস গুলো হয়তো কখনোই পুরোপুরি হারায় না৷ বংশানুক্রমে যেগুলো প্রোথিত হতে থাকে অনুসারীদের মাঝে। এই বিশ্বাসই জন্ম দেয় সব রহস্যের, আবার রহস্যের ওপর আলোকপাত করেও এই বিশ্বাসই।
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ সুপারন্যাচারাল ও হরর গল্প ভিত্তিক বিখ্যাত ইউটিউব চ্যানেল মিডনাইট হরর স্টেশন যারা শোনেন তাদের কাছে সায়ক আমান পরিচিত একটা নাম। তাঁর গল্প নিয়মিত পাঠ করা হয় রেডিও মির্চির বিখ্যাত সেগমেন্ট সানডে সাসপেন্স-এও। গল্প বলতে বলতে গল্প লেখার তাগিদ। আর সেই তাগিদেরই প্রথম ফলাফল 'তার চোখের তারায়' উপন্যাসটা।
বইটা প্রথম যখন শুরু করলাম, তেমন একটা টানছিলো না আমাকে। কেমন যেন একটা বাধার সম্মুখীন হচ্ছিলাম পড়তে গিয়ে। লেখকের বক্তব্য একটু প্যাঁচানো বলে মনে হচ্ছিলো। তবে ধীরে ধীরে যতোই কাহিনির গভীরে প্রবেশ করেছি, আগ্রহটা ফিরে পেয়েছি। পড়ার ক্ষেত্রে গতিও এসেছে। যদিও নানা কারণে বইটা শেষ করতে আমার প্রায় ৭ দিন লেগে গেছে।
সায়ক আমার তাঁর প্রথম এই উপন্যাসে একটা অভিশপ্ত জমিদারবাড়িকে তুলে এনেছেন। আর এই পুরোনো ইমারতের অধিবাসী ও এর সাথে সম্পর্কিত চরিত্রদেরকে পুঁজি করেই এগিয়ে নিয়ে গেছেন 'তার চোখের তারায়'-এর কাহিনি। এই কাহিনির পুরোটা জুড়েই যে অলৌকিকতা ছিলো, তা কিন্তু মোটেও না। বরং প্রলেপ ছিলো মার্ডার মিস্ট্রি, হিস্ট্রি ও সাসপেন্সেরও। বিশেষ করে উ���ন্যাসের শেষ দিকে রহস্যভেদের জায়গাটা বেশ অনেকটাই গোয়েন্দা কাহিনির ক্লাইম্যাক্সের মতো; যুক্তিনির্ভর। মূল থিমটা মোটামুটি ভালোই লেগেছে আমার কাছে৷ লেখকের প্রথম পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হিসেবে 'তার চোখের তারা' নিয়ে যে তিনি অনেক ভেবেচিন্তে এগিয়েছেন, তা বোঝা যায়।
এই উপন্যাসের দুটো প্রধান চরিত্র পায়েল রায়চৌধুরী ও সুনন্দা সান্যাল। এই দুটো চরিত্র সহ অন্যান্য চরিত্র গুলোর ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্টের ব্যাপারে সায়ক আমান কোন তাড়াহুড়া করেননি। ডিটেইলড ছিলো চরিত্র গুলো সম্পর্কে বর্ণনা। পারিপার্শ্বিকের বর্ণনাও ভালো ছিলো। শেষে�� দিকে গিয়ে সামান্য চমকেছি। সেটা কেন, তা আর না বলি। পড়েই দেখবেন না হয় বইটা।
এর আগে সায়ক আমানের একটা বই পড়েছিলাম যার নাম 'আরিন ও আদিম দেবতার উত্থান'। ওটা সম্ভবত লেখকের দ্বিতীয় বই ছিলো। ওটার মতো না হলেও 'তার চোখের তারায়' আমার কাছে খারাপ লাগেনি। বলতে গেলে ভালোই ছিলো।
বইয়ের ভেতরে বেশ কিছু ছবিও ছিলো। ব্যাপারটা ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে সজল চৌধুরীর করা চমৎকার প্রচ্ছদ। ওপার বাংলার সংস্করণের চেয়ে এপারের সংস্করণের প্রচ্ছদটাই বেশি ভালো হয়েছে৷ অবশ্য সজল চৌধুরীর প্রায় সব কাজই এমন প্রো লেভেলের।
বইটা এপার বাংলায় প্রকাশ করার জন্য ধন্যবাদ ভূমিপ্রকাশ-কে। সুপারন্যাচারাল থ্রিলারের সাথে যারা একটু মিস্ট্রির মিক্সচার চান, তারা পড়ে ফেলতে পারেন বইটা।
ভাসানবাড়ির পর আশাটা অনেক বেড়ে গেসলো। এইডা ভালোই, শুধু গোজামিলের পরিমানটা একটু বেশি। হরর-থ্রিলার টা লেখার কায়দাটা দুর্দান্ত। শেষ অব্দি আটকে রাখে। কিন্তু অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়না, পাওয়া গেলেও সেটা কতটা যুক্তি-যুক্ত সে ব্যাপারটাও রয়ে যাচ্ছে। তাই উপভোগ্য হলেও, একটু হতাশ করলো এই যা। কিন্তু প্রচুর তথ্য রয়েছে, আর পড়তে সেসব বিরক্তিও আসে না একদম উপস্থাপনার জোরে। সবমিলিয়ে এক বিকেলে পড়ে ফেলাই যায় আরকি।
একটি পুরনো জমিদারবাড়িকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে ঘনিয়ে উঠেছে রহস্যের জাল। এই বাড়িতে তুলি নামের একটি ছোট মেয়েকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য থাকতে আসছে সুনন্দা ও নীলাদ্রি। অন্যদিক থেকে পায়েল, যে কিনা সেই জমিদারবাড়ির উত্তরপুরুষের একজন, সেও এসেছে এখানে বেড়াতে। গত কয়েক দশক ধরে এই বাড়ির এক একটি মানুষ রহস্যজনকভাবে মারা যাচ্ছেন। দেখে মনে হচ্ছে খুন, কিন্তু আইনের পথে হাঁটতে গেলে কোন প্রমাণ না পাওয়ায় সবগুলো মৃত্যুই বলা হচ্ছে 'আত্মহত্যা'। সুনন্দা ও পায়েল কৌতুহলবশে এই রহস্যের সন্ধানে জড়িয়ে পড়ে। পায়েলের মনে হয় যে পার্শ্ববর্তী ক্রিশ্চান কবরস্থানে শায়িত মসক্রপ পরিবারের সাথে কোনভাবে এক সুত্রে গাঁথা আছে এই অস্বাভাবিক মৃত্যুগুলো। শেষ পর্যন্ত কি তারা মেলাতে পারে সেই অঙ্ক?
'তার চোখের তারায়' উপনাসটিতে গোয়েন্দাগিরি থাকলেও সেটা তথাকথিত গোয়েন্দা উপন্যাস থেকে আলাদা। কারণ এখানে রহস্যের সাথে আলৌকিক ঘটনা রয়েছে। এমন কিছু ব্যাপার রয়েছে যেগুলো আমাদের তথাকথিত আইন বা বিজ্ঞান বিশ্বাস করে না। শেষের দিকে যখন রহস্যের সমাধান হল, তখন দেখা গেল যে সেই সমাধান কেবল একজনের দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাপারটা সাজানোর পর সম্ভব হচ্ছে।
নিঃসন্দেহে, চোখের পাতা না ফেলে পড়ার মত ছিল বইটি। কিন্তু পুনর্জন্ম, তন্ত্রসাধনা, ভুতপ্রেত, ইত্যাদি ধারণায় যদি আপনি বিশ্বাসী না হন অথবা আপনি এগুলো পড়তে পছন্দ না করেন তবে এই উপন্যাস আপনাকে নিরাশ করতে পারে। আবার কিছু পাঠক, বরং অধিকাংশ পাঠকেরাই আমার মত হন, যারা এগুলো বাস্তবে বিশ্বাস করেন না কিন্তু এই বিষয়ে গল্প বা সিনেমা উপভোগ করেন। সেরকম পাঠকের জন্য এই বই খুব রোমাঞ্চকর হবে। তা ছাড়া ধর্ম ও প্রাচীনকালের বিশ্বাস, ধ্যানধারণা নিয়ে বেশ অনেক তথ্য রয়েছে গল্পে। এগুলো আমার ভালো লেগেছে।
আমার মতে, বইটির সব কথা চোখ বন্ধ করে নাই বা করলেন বিশ্বাস, কিন্তু শুধু একটি রোমাঞ্চকর গল্প উপভোগ করার জন্য এই বইটি পড়া যেতেই পারে।
ইউটিউবে যারা আমার মতো হরর স্টোরি / অডিওবুক শুনতে পছন্দ করেন তাদের মধ্যে সায়ক আমানকে চেনেন না এমন কেউ সম্ভবত কেউ। মিডনাইট হরর স্টেশনের প্রতিষ্ঠাতা এই লোকটার গল্পের চয়েস এবং গল্প পড়া দু'টোই আমার ভীষণ পছন্দ। স্বভাবতই তার লেখার স্বাদ নেয়ার ইচ্ছা বেশ অনেকদিন যাবত ছিলো।
সায়ক আমানের লেখার ধরণ কিছুটা অন্যরকম - হয়তো এ যুগের পশ্চিমবঙ্গের কারো লেখা সেভাবে পড়া হয় নি বলেও অন্যরকম লেগে থাকতে পারে। খাপ খাইয়ে নিতে আর বইয়ের ঘটনায় মনোযোগ দিতে একটু সময় লেগেছে। কিন্তু একবার বইতে ঢুকে যাবার পর রুদ্ধশ্বাসে পড়ে ফেলেছি। একবসায় যেভাবে তার গল্পগুলো অডিও স্টোরি হিসাবে শুনে ফেলি ঠিক সেভাবেই।
বাস্তব জীবনে পুরানো জমিদার বাড়ি নিয়ে আমার অদ্ভুত রকমের ফ্যাসিনেশন আছে, যেজন্য বইয়ের পাতায়ও খুব ভালোবাসি এ সংক্রান্ত লেখা। শতাব্দী প্রাচীন এক জমিদার বাড়িকে ঘিরে দারুণভাবে রহস্যের ধোঁয়াশা সৃষ্টি করেছেন লেখক। টান টান উত্তেজনা বজায় রেখেছেন প্রায় পুরোটা জুড়ে। আর পরবর্তীতে রহস্য খোলাসাও করেছেন দক্ষ হাতে।
তার মাথা খুব ভালো খেলে বুঝতে পারলাম। এতো ইনটেন্স ধরণের রহস্য তৈরি কিংবা সেটাকে প্লটহোলে ভর্তি হতে না দিয়ে ঠিকভাবে চালিয়ে নেয়া অনেক জটিল কাজ, সবার দ্বারা সম্ভব হয় না। এতো মনোযোগ সহকারে নিবিষ্ট হয়ে পড়লাম!
অতিপ্রাকৃত যে আবহটুকু ছিলো তার জন্য শীতের মাঝরাতে অন্ধকার ঘরে পড়তে গিয়ে একটু ভয় ভয় লাগছিলো। সেটাও আমার জন্য বলা যায় মজার অভিজ্ঞতা। সব মিলিয়ে বইটা নিয়ে চমৎকার সময় কাটালাম।
বইটি একবার পড়তে শুরু করলে ছাড়া সম্ভব নয়। মূলত হরর থ্রিলার। বইয়ের প্রথম থেকে টানটান একটা উত্তেজনা পাঠককে বেঁধে রাখতে সক্ষম। অনেক চরিত্রের আনাগোনা এবং প্রত্যেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শেষে এসে লেখক যেন বড় বেশি তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন। আরো একটু যত্নের দরকার ছিল।
গল্প সংক্ষেপ📝- সুনন্দা আর নীলাদ্রির আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়৷ কাজের সন্ধান করতে করতে তাদের কাছে চলে আসে একটা অদ্ভুতরকমের কাজ৷ একটি বাচ্ছা মেয়ে তুলি , তাকে সাতদিনের জন্য দেখাশোনা করতে হবে৷ তুলির ব���বার লিজ নেওয়া এক প্রাচীন জমিদার বাড়িতে থেকেই তুলির দেখাশোনা করতে হবে৷ জমিদার বাড়িতে আসার পর সুনন্দার পরিচয় হয় সেই জমিদার বংশেরই এক বংশধর পায়েলের সাথে৷ বাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদের থেকে জানা যায় এই বাড়িতে চারটে দশকে চারটে অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘটেছে-কেউ বলে আত্মহত্যা কেউ বলে খুন৷ আস্তে আস্তে তারা জড়িয়ে পড়তে থাকে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর সাথে৷ সত্যিই কি মৃত্যুগুলো স্বাভাবিক না বংশপরম্পরায় বয়ে আসছে কোনো প্রাচীন অভিশাপ?
পাঠ-অনুভূতি📝- আমি পড়া শেষ করার পর থেকে শুধু একটা কথাই ভাবছি, লেখক এরকম একটা অভিনব আর দুর্দান্ত প্লট জাস্ট ভাবলেন কিকরে৷ আসলে এটাই হয়তো সায়ক আমানের লেখার বিশেষত্ব৷ সায়ক আমান সবসময় চেষ্টা করেন পাঠকদের নতুন কিছু দেওয়ার৷ তাই ওনার প্রত্যেকটা লেখা প্রত্যেকটার থেকে আলাদা৷ প্রতিটা লেখা ইউনিক৷ ◾আর যেটা সবচেয়ে বেশী ভালো লাগে সেটা হল কোনো লেখা শুরুর আগে research. সায়ক আমান একটা লেখা লিখতে যতটা পড়াশোনা আর পরিশ্রম করেন সেখান থেকেই বোঝা যায় ওনার লেখার প্রতি ভালোবাসা কতটা৷ ◾লেখককে নিয়ে অনেক কথা বলে ফেললাম৷ আসলে এটা পড়ার পর না বলে থাকতে পারলাম না৷ এবার আসি মূল গল্পে৷ এটা আসলে একটা অলৌকিক থ্রিলার৷ যেখানে রহস্যর সাথে সাথে অতিলৌকিক ব্যাপারও জড়িয়ে আছে৷ উপন্যাসের গতি শ্লথ হলে বোর লাগে৷ কিন্তু বিশ্বাস করুন এক্ষেত্রে ৩২০ পাতা জাস্ট কিচ্ছু না৷ কেউ যদি চায় একদিনে শেষ করে ফেলতে পারে৷ বইয়ের প্রত্যেকটি পাতা রহস্য ঘেরা৷ ◾এই উপন্যাসে লেখক পায়েল চরিত্রটিকে যেভাবে সাজিয়েছেন তা অতুলনীয় ৷ অসম্ভব বুদ্ধীমতি আর সাহসী একটা চরিত্র যে পড়ার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে৷ ◾সায়ক আমানের "তার চোখের তারায়" নিঃসন্দেহে একটা অসাধারণ অলৌকিক থ্রিলার এবং থ্রিলার প্রেমীদের কাছে অবশ্য পাঠ্য৷
A married couple are going through an abrupt financial crisis. In search for a job, they come across an intriguing offer. One which will require them to look after a little girl while her parents are away. The only condition, is that they need to shift to an old mansion while doing so.
This book was one of the scariest I've read in a long long time.Now horror books have always been one of my first preferences. And saying, that this book spooked me out in the way it did, is a testament to it's strength.
The author, Sayak Aman is one of the brightest new additions to the Bengali literary scene. He has an eye for the twisted. His storytelling, brilliant. For those of you who don't follow the Bengali audio story circuit, do check out his YouTube channel, 'Midnight Horror Station'. I'm indebted to his brilliant translations of Lovecraft, King, Blackwood, Poe and many more.
His original creations may even serve as a starting point for a new era of intellectual storytelling in Bengali.
And this book's no different as well.
A mystery spanning generations. A zamindar mansion with a string of seemingly unconnected deaths. A forgotten tomb in a sprawling cemetery. A recurring dream of a little girl.
The book triumphs in it's atmospheric setting. Successfully pushing the reader in a state of trance, a constant feeling of dread. An emphasis on terror rather than horror. You have this feeling that something's going on. There's no space for relaxation, as you're always on edge.
However, like many books in such genre. The climax could have been a bit stronger. The characters could've done with some more fleshing out, although none of them ever feels unnecessary at any point, even adding to the plot at different facets.
লেখকের সত্যি জবাব নেই। খুব সুন্দর একটা প্লট। দারুন ভাবে সাজানো চরিত্ররা। প্রথম প্রথম একটু confusing লাগলেও যেই আস্তে আস্তে গল্পের পরত উঠতে থাকল অমনি গল্পে একদম ডুবে গেলাম। প্রথম থেকেই সাসপেন্সের দড়ি একদম টানটান করে ধরে রাখা আছে। কয়েকটা খুনের তদন্ত নিয়ে এই ভৌতিক ক্রাইম থ্রিলার ( হ্যাঁ genre টা এটাই হবে।) দুটি আলাদা স্বাদকে এত সুন্দর অনুপাতে মিশিয়ে এই গল্পটি রান্না করেছেন তা চেখে না দেখলে বোঝানো সম্ভব না।
কিছু জিনিস গল্পের খুব ভালো লেগেছে। এক) গল্পের মূল গোয়েন্দা চরিত্র আর তার সহকারীর মধ্যে সদা-ক্রিয়াশীল sisterhood। এটার represntation সত্যি খুব দরকার ছিল। দুই) প্রত্যেকটি স্থানের এবং চরিত্রের সহজপাচ্য, সাবলীল ও নিখুঁত বাহ্যিক বিবরণ। আর তিন) নায়িকার ইনভেস্টিগেশনের পদ্ধতি।
320 পাতার বই। একদিনের ছুটিতেই সেরে ফেলেছি। লেখক আরও এরকম লিখতে থাকবেন আশা করছি।
PS: বন্ধু মৃন্ময়কে ধন্যবাদ বইটি পড়তে দেওয়ার জন্য। তুই না থাকলে কি হত মাইরি। 🤣🤣
এতো জটিল আর অহেতুক টেনে বড় করা যে শেষ করতে প্রচুর সময় লেগে গেল। রহস্য- লৌকিক- অলৌকিক মিলিয়ে এমন এক জগাখিচুড়ি যে বোধগম্য করতেই বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ভালো লাগার মত সমস্ত উপাদানই এই বইতে ছিল (অন্তত আমার প্রথমে তাই মনে হয়েছিল।) পুরোনো জমিদার বাড়ি, প্রাচীন অভিশাপ, পরপর কয়েকটা খুন, সব কিছুই একটা জমজমাট গল্প তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু অভিনব কিছু লেখার আশায় জিনিসটা এতটাই জটিল হয়ে গেছে যে শেষ পর্যন্ত শেষটা জানার ইচ্ছেই হারিয়ে গেছিলো। কোনো চরিত্রই তেমন মনে দাগ কাটতে পারেনি। শেষে গিয়ে একটা হাস্যকর ক্লাইম্যাক্স। সায়ক আমানের বেশ কয়েকটা গল্প আমি সান্ডে সাসপেন্স-এ শুনেছি। কয়েকটা ভালো লাগলেও অনেকগুলোই ভালো লাগেনি। এই লেখকের অতিনাটকিয়তার প্রতি একটা ঝোঁক আছে। সবকিছুই যেন বাড়িয়ে বাড়িয়ে লেখা। গ্রাফিক ভায়োলেন্স দিয়ে পাঠককে হকচকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। এই কায়দাটা আমার খুব নিম্নমানের বলে মনে হয়। ভালো গল্পে এইসবের দরকার হয় না। থ্রিলার গল্প বা উপন্যাস টানটান উত্তেজনা-পূর্ণ হলেই বেশি ভালো লাগে। এই উপন্যাসে তার কোনোটাই না পেয়ে বেশ হতাশ হলাম।
বই: তার চোখের তারায় লেখক: সায়ক আমান ধরণ: ভৌতিক, থ্রিলার উপন্যাস মলাট মূল্য: ৩৬০ টাকা প্রকাশকাল: ২০২০
কাহিনী সংক্ষেপ ও পাঠ প্রতিক্রিয়া: এক ধনী দম্পতি সপ্তাহখানেকের জন্য জরুরি দরকারে বিদেশ যাচ্ছেন। ঘটনাচক্রে তাদের দশ বছর বয়সের একমাত্র মেয়ে তুলিকে এক্ষুনি তারা সাথে নিয়ে যেতে চাইছেন না। তাই সাতদিনের জন্য মেয়েকে দেখেশুনে রাখার রাখার দায়িত্ব নেয় সুনন্দা ও নিলাদ্রি। তবে থাকতে হবে তাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে থাকা পুরনো একটি জমিদারবাড়িতে।
পুরনো ভগ্নপ্রায় একটি জমিদারবাড়ি। সেটিকে ঘিরে রয়েছে অসংখ্য রহস্য। চার দশকে চারটি অস্বাভাবিক মৃত্যু। আপাতদৃষ্টিতে আত্মহত্যা মনে হলেও আসলেই আত্মহত্যা কিনা কারো জানা নেই। পরিত্যক্ত অন্দরমহলের আনাচেকানাচে দেখা যায় কুয়াশা ঢাকা এক ছায়ামূর্তিকে। কে সে?
জমিদারবাড়িতে গিয়ে সুনন্দার সাথে পরিচয় হয় কোনভাবে ওই জমিদারেরই উত্তরপুরুষ পায়েল রায় চৌধুরীর সাথে। সময়টা ভালোভাবেই কাটছিল। একদিন কাছের একটি ক্রিশ্চিয়ান গ্রেভইয়ার্ডে ঘুরতে গিয়ে তারা মসক্রপ পরিবারের সমাধি আবিষ্কার করে। কৌতূহল থেকেই প্রবেশ করে তার মধ্যে। খুঁজে পায় মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এলিজাবেথ মসক্রপের ডায়েরি। কি লেখা ছিলো ডায়েরিতে?
এরই মধ্যে জমিদারবাড়িতে আরেকটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যায়। দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে আত্মহত্যা করেছে সেই বাড়িরই বাসিন্দা অতীন নামের চৌদ্দ বছরের এক কিশোর! বছর দশেক আগে জমিদারবাড়ির দেখাশুনার দায়িত্বপ্রাপ্তির প্রমাণ নিয়ে হাজির হওয়ার মাস তিনেকের মধ্যে নিজের দোকানে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন শশীভূষণ সরকার। মৃত্যুর আগে শশীভূষণ তার স্ত্রীর কাছে বলেছিলেন অতীনের খুব বিপদ। অথচ অতীনের বয়স তখন মাত্র চার বছর! কিছু কি টের পেয়েছিলেন তিনি? এসকল প্রশ্নের উত্তর আছে 'তার চোখের তারায়' বইটিতে।
'তার চোখের তারায়' গল্পের লেখনশৈলী চমৎকার ছিল। গল্পের প্লটটা বেশ ভালো। ইতিহাস, অভিশাপ, পৌরাণিক আবেশ, রহস্য, রোমাঞ্চ, খুন সবই পাওয়া যাবে এক মলাটে। গল্পের পরতে পরতে রয়েছে চমক। সবথেকে অসাধারণ টুইস্টটা রয়েছে গল্পের শেষে। ত��র আগে পর্যন্ত কিছুই ধারণা করতে পারবেন না। সব মিলিয়ে বেশ ভালো লেগেছে। আপনারাও পড়ে দেখতে পারেন। আশা করি ভালো লাগবে।
‘তার চোখের তারায়’—নামটিতে রোমান্টিকতার ছোঁয়া থাকলেও আদতে এই শব্দটার মাঝেই শতাব্দী পুরনো রহস্য লুকিয়ে রয়েছে। যে রহস্যটিকে আগলে, ভীষণ যত্নে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বছরের পর বছর। একটি চোখ দিনের পর দিন সাক্ষী হচ্ছে হাজারো নিষ্ঠু'রতার, পরখ করছে বহু বছর পূর্বে ঘটে যাওয়া ভয়া'বহ সকল ঘটনার, সেই সাথে নিজের রহস্যময় দু'চোখের মণিতে ধারণ করছে অনেকগুলো মানুষের জীবনের গল্প, তাদের হাসি, কান্না, অসহায়তা, সব!
ধ্বং'স প্রায় জমিদার বাড়িটিকে একদল ছেলেপেলে লুকোচুরি খেলার জন্য আদর্শ জায়গা হিসেবে ধরে নিয়েছে। প্রতিদিন স্কুল শেষে বিকেলের শেষদিকে তারা জমিদার বাড়িতে ঢুকে পড়ে। এতে অবশ্য খানিকটা কাঠখড় পোড়াতে হয় তাদের। দারোয়ান কাশিনাথকে এক প্যাকেট সিগারেট হাতে ধরিয়ে দিলেই কেল্লাফতে! সে আর বাচ্চাদের খেলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবে না। এদের মধ্যে একটা ছেলে আছে, মাধব। সহজ সরল গোছের ছেলেটিই এবার প্রথম চোর হলো। জমিদার বাড়িটিতে রহস্যময় একটি দীঘির কথা জানা যায়। লুকোচুরি খেলার নিয়ম হলো, যে চোর হবে সে দীঘির ঘাটে গিয়ে দাঁড়িয়ে চল্লিশ পর্যন্ত গুনবে। এরমাঝে বাকিদের লুকিয়ে পড়তে হবে। মাধবও দীঘির পাড়ে চলে এসেছে। কিন্তু এখানটায় এসেই বাঁধলো বিপত্তি। মাধব ছেলেটি ঘাটে এসে দেখতে পেলো মহীতোষ নামক লোকটি ঘাটে বসে আছে। মাধবকে দেখতে পেয়ে সে হাত দিয়ে ডাকলো একবার। হয়তো কিছু বলতেও চাচ্ছিলো। তবে মাধবের চল্লিশ পর্যন্ত গোণা শেষ বলে সে আর দাঁড়ায়নি। চলে গিয়েছে বন্ধুদের খুঁজতে। কিন্তু তারজন্য পরেরদিন যে চমক অপেক্ষা করছিল তা সে জানতো না। পরেরদিন সকালবেলা মহীতোষ লোকটিকে দীঘি হতে মৃ'ত অবস্থায় পাওয়া যায়। দেখা যায়, কাঁদা মাটির উপর দিয়ে দুটো পায়ের ছাপ নিশ্চল দীঘির জলে গিয়ে মিশেছে। আর ফিরে আসেনি ছাপ দুটো। তদন্তে পুলিশও খুব বেশি কিছু বের করতে পারেনি। কেবল একটি চিহ্ন খুঁজে পায়। মশার ধূপের মতো চিহ্ন ; যার অর্থ পুনর্জন্ম!
যোগেন্দ্র নাথ ও অরুণিমা নাথ কয়েকদিনের জন্য বিদেশ যাবেন। কিন্তু একমাত্র মেয়ে তুলিকে এই মুহুর্তে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় বলে হেল্পিং হ্যান্ড খুঁজছেন তারা। কেবল বাবা-মায়ের মতন আগলে রাখাটাই হবে যাদের দায়িত্ব। এ দায়িত্বে এগিয়ে আসেন নীলাদ্রি ও সুনন্দা দম্পতি। তুলিকে নিয়ে উনারা কয়েক শতাব্দী পুরোনো এক জমিদার বাড়িতে উঠেন। কিন্তু এরপর থেকেই কিসব অদ্ভুত ব্যাপার ঘটতে থাকে ছোট্ট মেয়ের তুলির সঙ্গে। কেউ তাকে জমিদার বাড়ির ভেতরের বাগান থেকে ডাকছে তো আবার কোনো এক নারীমূর্তিকে সে দেখতে পাচ্ছে। চিন্তিত হয়ে পড়েন সুনন্দা সান্যাল।
পায়েল রায়চৌধুরী সবে জমিদার বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। আর এরই মাঝে সুনন্দার সাথে তার বেশ খাতির জমে গিয়েছে। সুনন্দার সঙ্গে মিশতে মিশতে জমিদার বাড়ির অজ্ঞাত রহস্যের সঙ্গে অজান্তেই জড়িয়ে পড়েছে পায়েল। বলতে গেলে সুনন্দার চেয়ে পায়েলের আগ্রহই আকাশছোঁয়া। এরইমাঝে প্রাসাদে চৌদ্দ কি পনেরো বছরের একটি ছেলে, অতীনের খু'ন হয়ে গেছে। যদিও ফরেনসিক রিপোর্ট বলছে এটি খু'ন নয়, বরং আত্মহ'ত্যা। এ যে হুবহু সেসকল ঘটনার সঙ্গে মিলে যাচ্ছে! যেন প্রতি দশ বছর পরপর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে চলেছে কেউ। এই ঘটনার আগেও ঘটে গিয়েছে এমনই আরো ছয় সাতটি খু'ন। আর প্রতিটির ক্ষেত্রেই খালি চোখে খু'ন বলে মনে হলেও আত্মহ'ত্যা বলেই শেষমেশ কেস ক্লোজড করা হয়। খু'ন নাকি আত্মহ'ত্যা? যেখানে এই প্রশ্নটি নিয়েই দ্বিমত থাকে, সেখানে কেস খুব বেশি এগিয়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু পায়েল স্থির করে নিয়েছে, সে এই কেসের সুরাহা করেই ছাড়বে।
জমিদার বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটি চার্চ রয়েছে। আর সেই চার্চের সমাধিক্ষেত্রে আছে এলিজাবেথ মসক্রপ নামের একটি ছোট মেয়ের কবর। মেয়েটির জীবনকাল ছিল মাত্র ৫ বছরের। কি হয়েছিল মেয়েটির সাথে সেও এক রহস্য। পায়েল সেই রহস্যের পেছনেই ধাওয়া করছে এখন। লুকিয়ে চার্চে প্রবেশ করে এলিজাবেথের কফিন খুলে সেখান থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করতে পেরেছে সে। ডায়েরিটা খুলে ভীষণ অবাক হলো পায়েল ও সুনন্দা। ডায়েরিতে প্রতি দুই পৃষ্ঠা পর পর একই ছবি আঁকা রয়েছে। ছবিগুলো দেখে মনে হচ্ছে মেয়েটি একই স্বপ্ন বারবার দেখতো এবং সেই স্বপ্নগুলোই ডায়েরিতে এঁকে রাখতে চেষ্টা করতো সে। কিন্তু কি এমন দুঃস্বপ্ন তাড়া করতো এই ছোট্ট মেয়েটিকে? আচ্ছা এমন নয়তো যে মেয়েটি কাউকে কোনো সংকেত দিতে চাচ্ছিলো? কিন্তু কিসের সংকেত সেটা?
দশ বছর পূর্বে ফেরা যাক। শশীভূষণ নামের এক ব্যক্তি জমিদার বাড়িতে নিজের অংশীদারিত্ব দাবি করেন। সেই প্রাসাদেরই এক লোকের সঙ্গে এই বিষয়ে ব্যক্তিগত কথা বলেন তিনি। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই লোকটি মারা যান। লোকটি মা'রা যাওয়ার কয়েকদিন পর শশিভূষণও মা'রা যান। আর অবাক করা ব্যাপার হলো, দুজনের মৃ'ত্যুর ধরণ ভিন্ন হলেও দুটোই খু'ন বলে বিবেচিত হতে হতেও আত্মহ'ত্যা বলে আখ্যায়িত হয়ে যায়। আরেকটা আশ্চর্যজনক ব্যাপার রয়েছে। শশিভূষণ তার মৃ'ত্যুর আগে তার স্ত্রীকে বলেছিলেন অতীনের ঘোর বিপদ রয়েছে। তখন অতীনের বয়স মাত্র তিন থেকে চার বছর। আর অতীন যখন সত্যিই বিপদে পরে মা'রা যায় তখন তার বয়স চৌদ্দ কি পনেরো! এখন প্রশ্ন হলো, এতোগুলো বছর আগে শশিভূষণ কি করে জানলেন অতীন বিপদে পড়বে বা পড়তে চলেছে? এমন নয়তো যে, শশীভূষণ এমনকিছু জেনে গিয়েছিলেন যা তার জানা উচিত হয়নি। এরজন্য প্রাণ যায়নি তো তার?
অনেকগুলো প্রশ্ন একে একে জটলা পাকাচ্ছে। খু'নগুলোর শুরু দুই শতাব্দী পূর্বে। একজন মানুষের পক্ষে কখনোই এতোদিন বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাহলে একইরকম খু'ন কিংবা আত্মহ'ত্যাগুলো হচ্ছে কি করে? আসল খু'নির পদ্ধতি অন্য কেউ জানতে পেরে সে-ই পরবর্তী খু'নগুলো করছে নাতো? যদি তাই হয়, তবে অতীনের সাথে তার কি শত্রুতা? একটি দশ বছরের মেয়ে তুলিকে কেন মা'রতে চায় সে? কে সেই আপাদমস্তক ঢাকা নারীমূর্তি? এলিজাবেথ মসক্রপের কফিনে কে শুয়ে আছে? শশিভূষণ সরকারকে কে খুন করলো? করলোই বা কীভাবে? অতীনের খু'নের পর তার বিছানার তলায় কাগজে লিখা তিনটা শব্দ পাওয়া যায়। ‘তার চোখের তারায়’— শব্দ তিনটি কে লিখেছিল? এর মানেই বা কি? অনেকগুলো প্রশ্ন। উত্তর দেওয়ার কেউ নেই। উত্তর জানতে হলে কেবলমাত্র ‘তার চোখের তারায়’ গিয়েই খুঁজতে হবে। তবে খোঁজা শুরু হোক?
একটি খুনের মোটিভ জানতে পারলে খুব সহজেই বাকি ব্যাপারগুলো আন্দাজ করা যায়। সেক্ষেত্রে ‘হু ডান ইট’ এই প্রশ্নের মাঝে আটকা পড়লেও দৌঁড়ে যাবার মতো কিছু তো একটা ক্লু থাকে অন্তত! কিন্তু যদি মোটিভটাই জানা না যায় সেক্ষেত্রে খু'ন থেকে আত্মহ'ত্যা শব্দটাই বেশি কার্যকর। কেননা, কেউ তো নিজের খেয়ালখুশির বশে একটা জলজ্যান্ত মানুষকে নাই করে দিতে পারে না, তাই না? কিছু তো একটা মোটিভ থাকা চাই! আমাদের এ গল্পে সেই মোটিভটাই মিসিং। সেটা নিয়েই যত খোঁজাখুঁজি, ঘাটাঘাটি। বলতে গেলে, এই গল্পটি দাঁড়িয়েই আছে মোটিভের উপর ভর করে। এই যে এতোগুলো খু'ন হলো, কেন হলো? খু'নির এতে কি স্বার্থ? এই প্রশ্নগুলোর পেছন পেছন দৌঁড়োতে পারলেই কেবল উত্তরের সন্ধান পাওয়া যাবে। নয়তো নয়!
৩২৫ পেইজের একটা বই। অথচ আমি ২৩২ পেইজে গিয়ে জানতে পেরেছি, নীলাদ্রি আসলে সুনন্দার স্বামী। পুরো বইয়ে এতো এ���ো টুইস্ট থাকা সত্ত্বেও একমাত্র নীলাদ্রি পুরুষ এটা জানার পরেই কয়েক মুহূর্তের জন্যে থ বনে গিয়েছি আমি। প্রথম থেকে ভেবে এসেছি নীলাদ্রি ও সুনন্দা দুই বোন। বোকা বনে গেলাম পুরোই! অবশ্য হতভম্ব হয়ে থাকতে হয়নি বেশিক্ষণ। কেননা নীলাদ্রি বোন হোক কিংবা স্বামী তাতে মূল গল্পে খুব একটা প্রভাব পড়েনি। তাকে একটা সাইড ক্যারেক্টার হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়।
‘তার চোখের তারায়’— নামটা দেখে সর্��প্রথম রোমান্টিক একটা ভাইব আসলেও পরমুহূর্তে মনে হবে এটি হরর কোনো ব্যাপার, অতিপ্রাকৃত কোনোকিছু। কোনো শতাব্দী প্রাচীন আত্মা, যা শত শত বছর ধরে হাজারো ঘটনার সাক্ষ্য বহন করছে। পুরো গল্পটা আপনাকে হরর ফিল দিবে। মনে হবে, ‘কোথাও সে আছে। নিশ্চয়ই আছে!’ কিন্তু শেষের টুইস্টটা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে। আপনার চিন্তাভাবনাকে শূন্যের কোটায় নিয়ে যাবে। শেষ টুইস্টটা আগে থেকেই ধরে ফেলা খানিকটা কঠিনই বটে। আমি অন্তত ধরতে পারিনি!
এই গল্পে বর্তমানের সঙ্গে অতীতের যোগসূত্র ঘটানো হয়েছে। ইংরেজদের আমলের একটি বংশধর; যারা কিনা অকাল্ট ফ্যান্টাসি নিয়ে কাজ করতো, জমিদার ভূপতি দত্ত ও তার বংশধর এবং মসক্রপ বংশধর এই তিনটি বংশধর ও তাদের গল্প নিয়েই মূলত এই বইটি। যদিও এদের নাগাল পেতে হলে এবং আসল রহস্য জানতে হলে বইটির শেষ অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তবে লেখকের লেখন ও বাচনভঙ্গি আমার খুবই ভালো লেগেছে। সম্ভবত এটাই লেখকের প্রথম বই। কিন্তু পড়তে গিয়ে এই কথাটি একবারও মনে হয়নি। বরং খুব ভালোই উপভোগ করেছি।
বইটি শেষ। কিন্তু একটা খটকা এখনো আমার পিছু ছাড়ছে না। এলিজাবেথ মসক্রপ ও লীলাবতীকে দেখতে একইরকম। আবার লীলাবতী ও পায়েলকে দেখতেও একইরকম। তারমানে দাঁড়ালো এলিজাবেথ, লীলাবতী এবং পায়েল তিনজনই একইরকম দেখতে (অন্যজনের কথা স্কিপ করলাম। সে টুইস্টের অংশ।)। কিন্তু কিভাবে? এ ব্যাপারটা খোলাসা করা হয়নি। নাকি আমিই লক্ষ্য করিনি? বুঝতে পারছি না ঠিক। রিভিউটা লেখকের চোখে পড়লে বা কোনো পাঠক এই প্রশ্নের উত্তর জেনে থাকলে তার মতামত আশা করছি। অগ্রিম ধন্যবাদ!
বই : তার চোখের তারায় লেখক : সায়ক আমান প্রকাশনী : ভূমিপ্রকাশ পৃষ্ঠা : ২৪০ মলাট মূল্য : ৩৬০ টাকা
একটি ভগ্নপ্রায় জমিদারবাড়িকে ঘিরে রয়েছে কিছু রহস্যময় ইতিহাস আর রয়েছে বংশপরম্পরায় বয়ে চলা এক প্রাচীন অভিশাপ। চারটে দশক ধরে চারটে অস্বাভাবিক মৃত্যু—আত্মহত্যা নাকি খুন? পরিত্যক্ত অন্দরমহলের আনাচেকানাচে নাকি দেখা যায় কুয়াশা ঢাকা এক ছায়ামূর্তিকে। কে সে? মসক্রপ পরিবারের সমাধির নিচে কে ঘুমিয়ে আছে দুশো বছর ধরে? একটি বাচ্চা মেয়ের কয়েক শতাব্দী পুরোনো ডায়রি কীসের ইঙ্গিত দেয়? বারবার কোন স্বপ্নের কথা ডায়রিতে লিখত সে? সেখানেই কি লুকিয়ে আছে রহস্যের সমাধান? নাকি আরও গভীরে? মানব সভ্যতার ইতিহাসের বুক থেকে সরিয়ে নেওয়া কয়েকটা পাতা খুঁজতে হবে আমাদের। যুগযুগান্ত করে চলে আসা কিছু লোককথা এবং পৌরাণিক গল্পের ছলে আমাদের যে সংকেত দিতে চেয়েছিলেন আমাদের পূর্বপুরুষরা... প্রতি পাতায় ভয়াবহ মোড় বদলাতে থাকা সায়ক আমানের প্রথম অলৌকিক রহস্য উপন্যাস— “তার চোখের তারায়”।
পাঠ্য প্রতিক্রিয়াঃ
বাংলা মোটর বাতিঘর যাবার সুবাদে তাহার সাথে আমার পরিচয় হয় সেই ২০১৮ সালেই৷ অনেক দিন ধরেই পড়ার লিস্টে ছিল উপন্যাসটি৷ ভূমি প্রকাশ কে একটা ধন্যবাদ দিতেই হয় বাংলাদেশী সংস্করণ আনার মাধ্যমে পাঠক মহলে সুলভ মূল্যে উপন্যাসটি পৌছিয়ে দেবার জন্য৷
গল্পটা একেবারে মেদহীন বলা চলে৷ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টান টান উত্তেজনা ধরে রাখলেও শেষের দিকে ফিনিশিং এ এসে যেন বড্ড মিইয়ে গেল। লেখকের প্রথম উপন্যাস বিধায় কিছুটা এ ব্যাপার উহ্য রাখা যায়৷ ইতিহাস, অতিপ্রাকৃত অংশ গুলো প্যারালাললি চলেছে আধুনিক সময়ের সাথে৷ সময়ের সুতো টেনে একের পর এক প্রবেশ ঘটেছে নতুন চরিত্র৷
৫ বছরের শিশু এলিজাবেথ মসক্রপের সমাধি কে ঘিরেই যেন সব সুতো এক জায়গায় এসে মিলেছে৷ পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমি ঘুরছি লেখকের হাত ধরে সে সময়ে৷ যেন হাঁটছি কোন ভগ্নপ্রায় জমিদার আঙ্গিনায় কোন রহস্য উন্মোচনের আশায়। হত্যা ও আত্মহত্যার রহস্যের ধ্রুমজাল জড়িয়ে লেখক শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে এলেন তো বটে তবে একেবারে দিন শেষে লেখা লেজে গোবর না হলে হয়তো আর একটু ভাল হত৷
যে ব্যাপারটা ভাল লেগেছে লেখকের গল্প বলার ভঙ্গিমা৷ লেখার ধরণে কখনও মনে হয়নি এইটা লেখকের প্রথম লেখা। তার ইতিহাস ও কাল্ট নিয়ে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ উপন্যাস কে অন্য মাত্রার ছোঁয়া দিয়েছে৷ একটানে পড়ার মত একটি অতিপ্রাকৃত রহস্যঘেরা উপন্যাস৷
গল্পটা পাকিয়েছে ভালোই। ওয়ানটাইম রিড। শেষের ব্যাখ্যার অংশটা সুন্দর লেগেছে। এডভেঞ্চারগুলোও। অনেক আশা নিয়ে পড়া যাবে না, তাহলে খানিকটা আশাহত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
অনেকেই প্লটহোলের কথা বলেছেন। আমার তা মনে হয়নি। ব্যাখ্যাগুলো মোটামুটি যৌক্তিক। সুতোগুলো ভালোই মিলেছে। আধা-ভৌতিক, আধা-বিজ্ঞানের অবস্থা। রাত্তিরে পড়লে একটু বেশি এনজয়েবল।
বইয়ের সবচেয়ে চমৎকার জিনিস আসলে গল্পটা না, ভূমিকা! তবে গল্পটা শুরু করল শেষ করতে ইচ্ছে করবে। বর্ণনাভঙ্গি সুন্দর। এটাই বইয়ের সবচেয়ে ভালো দিক।
সায়ক আমনের লেখা আমার পড়া প্রথম বই এটি। ওনার 'ভাসানবাড়ি' বইটির নাম শুনলেও পড়া হয়ে ওঠেনি। যাই হোক, ওয়ান টাইম রিড হিসেবে বইটি ভালো। বইটির প্রচুর সম্ভাবনাকে নষ্ট করে দিয়েছে এর ক্লাইম্যাক্স, আমার মতে। বাকি নিজেরা পড়ে বিচার করুন।
"সময়ের সীমানা পেরিয়ে, নক্ষত্রের আলোর মতো গোটা মহাকাল ফুটে উঠেছে তার চোখের তারায়... "
চকদীঘির একটি ভগ্নপ্রায় জমিদার বাড়ির উত্তর মহলের মেরামতের জন্য সিনিয়ায় ইঞ্জিনিয়ার মহীতোষ বসু কিছুদিন ধরে জমিদার বাড়িতেই থাকছেন। একদিন সন্ধ্যায় হাওয়া খাওয়ার জন্য তিনি জমিদার বাড়ির দীঘির কাছে গিয়ে বসেন। অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পরেও তিনি সেখানেই বসে একদৃষ্টে দীঘির জলের দিকে তাকিয়ে থাকেন, দীঘির জলটা যেন তাকে টানছে। এরপরের দিন দীঘিতে তার লাশ ভেসে ওঠে। তিনি কি আত্মহত্যা করেছিলেন নাকি এটা ছিল খুন? কিন্তু কে এবং কেন খুন করবে তাকে? সেই সাথে ঐদিন সকালেই বাড়ির দারোয়ান কাশীনাথ দীঘির ধারে একটি অদ্ভুত চিহ্ন দেখতে পায়, যা দেখে ঐ বৃদ্ধ বয়সেও তার মনে রীতিমতো ভয়ের সৃষ্টি হয়। কী সেই চিহ্ন? এই মৃত্যুর সাথে কি তার কোনো যোগসূত্র আছে?
এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ পর সুনন্দা এবং তার স্বামী নীলাদ্রি, ঋত্বিকা নাথ ওরফে তুলি নামে একটি বাচ্চা মে���়েকে সাতদিন দেখাশোনা করার জন্য তাকে নিয়ে ওঠে জমিদার বাড়িতে। তুলির বাবা মা-ই তাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আসার দিনই তুলির সাথে একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটে। সুনন্দা এবং নীলাদ্রি বাড়ির নিচের ঘরে থাকাকালীন কেউ জমিদার বাড়ির পুরনো অন্দরমহলের দিক থেকে তুলিকে ডাকে। সুনন্দা আর নীলাদ্রি যখন ডাকেনি তুলিকে তাহলে কে ডাকলো তাকে?
জমিদার বাড়ির পূর্বপুরুষদের অবর্তমানে শশিভূষণ সরকার নামে কলকাতা বড়োবাজারের মশলার দোকানের মালিক এই বাড়ি দেখাশোনার দায়িত্ব পাবেন বলে দাবি জানান। তিনি কাগজপত্রও দেখান। কিন্তু খুব অদ্ভুতভাবে সেখান থেকে যাওয়ার কিছুদিন পরই তিনি আত্মহত্যা করেন। পুলিশ এটাকে আত্মহত্যা বললেও সকলের ধারণা এটি খুন। আর কাকতালীয়ভাবে তার কয়েকদিন আগেই জমিদার বাড়িতেও একটি লোক আত্মহত্যা করে। অবশ্য সেটিও কি আত্মহত্যা ছিল নাকি খুন? এই দুই মৃত্যুর মধ্যে কি কোনো যোগসূত্র আছে? আর শশিভূষণ বাবু জমিদার বাড়ি থেকে ঘুরে এসে হঠাৎ আত্মহত্যাই বা করতে যাবেন কেন? কী এমন ঘটেছিল সেখানে?
বর্তমান জমিদার বাড়ির জ্ঞাতির মধ্যে একজন অনাদি রায়চৌধুরীর মেয়ে পায়েল রায়চৌধুরী কলেজ থেকে সোজা জমিদার বাড়িতে এসে ওঠে। আর এসেই সুনন্দার সাথে তার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। আসার পরেরদিন তারা তুলিকে সঙ্গে নিয়ে যায় চকদীঘির গ্রেভইয়ার্ডে। সেখানে গিয়ে তারা দুশো বছরের পুরনো মসক্রপ পরিবারের সমাধি দেখতে পায়। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার পর থেকেই সুনন্দা আর পায়েল চঞ্চল হয়ে ওঠে। দুশো বছর আগে মারা যাওয়া মসক্রপ পরিবারের সমাধির নিচে কি এমন আছে যার জন্য তারা চঞ্চল হয়ে উঠেছে?
এরই মধ্যে জমিদার বাড়িতে অতীন নামের একটি চৌদ্দ বছরের ছেলে খুন হয়। কিন্তু এই অতীনের যে বিপদ হতে পারে শশিভূষণ বাবু দশ বছর পূর্বে মারা যাওয়ার আগে তার স্ত্রীকে বলেছিলেন, অথচ তখন অতীনের বয়স মাত্র চার। একটা চার বছরের বাচ্চা ছেলেকে কেউ কেন কোনো বিপদে ফেলবে? আর ঐ দশ বছর আগের বিপদের সঙ্গে কি দশ বছর পরে ঘটা অর্থাৎ বর্তমানে অতীনের মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক আছে? চার দশক ধরে জমিদার বাড়িতে হয়ে চলেছে একের পর এক খুন। কী এই সকল খুনের মোটিভ? কে এইভাবে একের পর এক খুন করে চলেছে?
খুন, ইতিহাস, অভিশাপ, রহস্য, অলৌকিকতা, পৌরাণিক ধারণা সমস্ত কিছু মিলিয়ে সায়ক আমানের লেখা 'তার চোখের তারায়' একটি দুর্দান্ত উপন্যাস। যা একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে ওঠা যায় না। যে টানটান উত্তেজনার জন্য পাঠক পাতার পর পাতা উল্টিয়ে একদম শেষ পাতায় পৌঁছে যাবেন, সেই টানটান উত্তেজনা একদম ভরপুর আছে এই বইতে। প্রায় প্রতি পাতায় উপন্যাসটি তার ভয়াবহ মোড় বদলাতেই থাকে।
সায়ক আমানের লেখা আমি প্রথম পড়লাম। আর প্রথম পড়েই আমার বেশ ভালো লাগলো। তবে হ্যাঁ আমার মনে হয়েছে শেষটায় আর একটু কিছু করা গেলে হয়তো আরও ভালো হতো। উপন্যাসে সুনন্দা আর পায়েলের জুটিটা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে প্রশংসনীয়, বিশেষ করে পায়েলের বুদ্ধি আর সাহসিকতা। অসম্ভব সুন্দরভাবে লেখক চরিত্রটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন।
যারা থ্রিলার পড়তে ভালোবাসেন পড়ে দেখুন বইটি একবার, আশা করি ভালো লাগবে।
দত্ত জমিদারবাড়িটি তৈরী হয়েছে কয়েক শতক আগে। কলকাতা শহর থেকে বেশ দূরের এক মফস্বলের এই ভগ্নপ্রায় বাড়িটিতে এখন কিছু শরিকদের বসবাস, আর তার লিজ নিয়েছেন নাথ দম্পতি। তাদের একমাত্র মেয়ে তুলিকে বাড়িতে রেখে বিদেশ ভ্রমণে গিয়েছেন। তার তত্বাবধানে বাড়ির লোকদের বাইরেও নিয়োগ দিয়েছেন সুনন্দা ও নীলাদ্রি স্যানালকে। দশ বছরের ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে তুলিকে কয়েকদিনের জন্য এখানেই দেখেশুনে রাখতে হবে তাদেরকে, যতোদিন না মেয়েটার বাবা-মা বিদেশ থেকে ফিরে আসেন। জমিদারবাড়ির বর্তমান বাসিন্দাদের মধ্যে আছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। তুলিকে দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে পেরে খুশিই ছিল সুনন্দা। কিন্তু জমিদারবাড়িতে পা রাখার পর থেকে তার মনটা খারাপ হয়ে গেল। চার দশকে চারটে মৃত্যুর ইতিহাস আছে এ বাড়িতে। কেউ মারা গেছেন সিঁড়ি থেকে পা পিছলে পড়ে, কেউ কুয়ার ভেতরে পড়ে, কেউ জলে ডুবে আবার কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে। খুন না আত্মহত্যা তার সমাধান হয়নি কোনোবারই। পুলিশ কিনারা করতে পারেনি। আপাত দৃষ্টিতে আত্মহত্যা মনে হলেও তাতে যেনো কিছু একটা অস্বাভাবিক ব্যাপার রয়েছে। পরিত্যক্ত অন্দরমহলের আনাচে কানাচে নাকি দেখা যায় কুয়াশা ঢাকা এক ছায়ামূর্তিকে। কে সে? জমিদারবাড়ির উত্তরদিকের অন্দরমহলে হেঁটে চলে বেড়ায় এক অলৌকিক ছায়া, যার ধোঁয়াটে অস্পষ্ট চেহারায় স্পষ্ট হয়ে ফুটে থাকে জ্বলজ্বলে দুই চোখের তারা। দশ বছর আগে বড়বাজারের ব্যবসায়ী শশীভূষণ সরকার কেন আত্মহত্যা করেছিলেন? পুরোনো দত্ত জমিদার পরিবারের ভেতরের রহস্য আসলে কি?
পায়েল রায়চৌধুরীর শিরায় বইছে দত্ত জমিদারবংশের রক্ত। মাঝেমধ্যে পূর্বপুরুষের ভিটেতে বেড়াতে আসে চব্বিশ বছরের মেয়েটি। কৌতূহলী ও বুদ্ধিমতী পায়েলের সাথে সুনন্দার বেশ বন্ধুত্ব গড়ে উঠলো। দুজনে ঘুরতে ঘুরতে খুঁজে পেল দত্ত পরিবারের পূর্বপুরুষ লীলাবতী দত্তের এক পেইটিং৷ যিনি দেখতে হুবুহু পায়েলের মতন। তার ছবিতে ছোট ছোট করে আঁকা অদ্ভুত কিছু চিহ্ন, আর একটি নাম, এলিজাবেথ মসক্রপ! কী সম্পর্ক মসক্রপদের সঙ্গে দত্ত পরিবারের? উত্তরের অন্দরমহলে রহস্যময় কী আছে? এতো অপঘাতের ছায়া কেন এই বাড়িতে? পায়েল আর সুনন্দার উপস্থিতিতেই এবার আত্মহত্যা করলো দত্তবাড়ির এক শরিকের বারো বছরের ছেলে অতীন। এমন ছোট একটা ছেলে কি আদৌ নিজেকে হত্যা করতে পারে?
একদিন দুশো বছরের পুরোনো খ্রিষ্টান গ্রেভইয়ার্ডে ঘুরতে যায় সুনন্দা, পায়েল ও তুলি। সারি সারি সমাধি আর শ্বেতপাথরের ফলকে ইংরেজিতে লেখা নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ। তারা খুঁজে পায় এলিজাবেথ মসক্রপ নামে এক বছর পাঁচেকের বাচ্ছা মেয়ের কবর। পায়েল আর সুনন্দা সেখানে খুঁজে পায় কিছু রহস্যজনক চিহ্ন। মসক্রপ পরিবারের সমাধির নিচে কে ঘুমিয়ে আছে দু'শো বছর ধরে? একটি বাচ্চা মেয়ের কয়েক শতাব্দী পুরনো ডাইরি কীসের ইঙ্গিত দেয়? বারবার কোন স্বপ্নের কথা ডাইরিতে লিখত সে? সেখানেই কি লুকিয়ে আছে রহস্যের সমাধান?
যেখানে শুধু কবরস্থান থাকে তাকে বলে সেমিটারি আর চার্চের সাথে যদি কবরস্থান থাকে তখন তাকে বলে গ্ৰেভইয়ার্ড।
যে ঘরের মধ্যে সমাধি থাকে তাকে বলা হয় মোসলিয়াম আর মৃতদেহ ছাড়া যদি শুধু স্মৃতির উদ্দেশ্যে যে ঘর তৈরি হয় তাকে বলে সেনোটাফ।
গল্পটিতে প্রথম পাতা থেকেই একটা টানটান উত্তেজনা ছিল। লেখক খুব সুন্দর বর্ণনা করেছেন একটি ভগ্নপ্রায়, রহস্যে ঘেরা জমিদার বাড়ির, তার প্রায় সমসাময়িক একটি অতি প্রাচীন চার্চ ও তার সংলগ্ন গ্রেভইয়ার্ডের। তুলি নয়, এই গল্পের প্রধান চরিত্র হলো সময়। লেখক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সময়ের সুতো দিয়ে বিভিন্ন চরিত্রগুলোকে বুনন করেছেন। গল্পের পরতে পরতে রয়েছে চমক। সবথেকে অসাধারণ টুইস্টটা রয়েছে গল্পের শেষে। তার আগে পর্যন্ত পাঠকরা কিছুই ধারণা করতে পারবেন না।
প্রচলিত ধর্মবিশ্বাসের আড়ালেও রয়ে যায় কিছু বিশ্বাস, বংশানুক্রমে যেগুলো প্রবাহিত হতে থাকে উত্তরসূরীদের মধ্যে। এই বিশ্বাসই জন্ম দেয় রহস্যের। ভৌতিক আবেশ পুরোটা বই জুড়ে। এই উপন্যাসে অলৌকিকতার সাথে রহস্য, রোমাঞ��চ, তন্ত্রচর্চা, ধর্ম, অভিশাপ, কুয়াশায় ঘেরা নারীমূর্তি, হত্যারহস্য এবং ভারতীয় ইতিহাস মিশে রয়েছে।
🔸প্রায় দুশো বছরের পুরোনো এক খ্রিষ্টান গ্রেভইয়ার্ডে হেঁটে বেড়াচ্ছে পায়েল আর সুনন্দা, সাথে দশ বছরের বাচ্চা মেয়ে তুলি । সারি সারি সমাধি আর শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা নাম, জন্ম ও মৃত্যুর তারিখ । এর মধ্যে একটি সমাধি দৃষ্টি আকর্ষণ করল পায়েলের । বাচ্চা মেয়ে... মারা গেছে সেই ১৮০৪ সালে, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে । নাম - এলিজাবেথ মসক্রপ । হঠাৎই সমাধির পাথরে কান রেখে এলিজাবেথের নাম ধরে ডাকতে লাগলো পায়েল, ‛বেথ... বেথ!’ সুনন্দার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেল এক বরফশীতল অনুভূতি । সমাধির ভেতর থেকে উঠে আসছে মৃদু শব্দ... যেন কথা বলছে কেউ ।
🔸সতেরোশো শতকে তৈরী চকদিঘীর জমিদারবাড়ি বর্তমানে ভগ্নপ্রায় । তুলি নামের একটি বছর দশেকের বাচ্চা মেয়েকে একসপ্তাহ আগলে রাখার অদ্ভুত প্রস্তাবে রাজি হয়ে সেই জমিদারবাড়িতে এসে ওঠে নীলাদ্রি এবং সুনন্দা । অতীত ঘাঁটলে দেখা যায় চার দশকে চারটি অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে এই জমিদারবাড়িতে, খুন নাকি আত্মহত্যা... তার মীমাংসা হয়নি কোনোবারেই । পূর্বপুরুষের ভিটেয় মাঝেমধ্যেই থাকতে আসে জমিদার বংশের বংশোদ্ভূত পায়েল । এবার তার বন্ধুত্ব হলো সুনন্দার সাথে । প্রাচীন জমিদার বংশের সাথে মসক্রপ পরিবারের সম্পর্কের সূত্র খুঁজতে বেরিয়ে তারা জড়িয়ে পড়তে থাকে একের পর এক রহস্যের জালে । এলিজাবেথ মসক্রপের মসোলিয়াম থেকে তারা খুঁজে পায় তারই নিজস্ব ডায়েরী । সাংকেতিক ভাষায় কি লেখা আছে সেই ডায়েরীতে ? এক ছায়ামূর্তির উপস্থিতি আতঙ্কের আবহ সৃষ্টি করে গোটা জমিদারবাড়ী জুড়ে... যেন সর্বদা মনে হয় জমিদারবাড়ীর আশেপাশেই ঘাপটি মেরে আছে ভয়াবহ মৃত্যুর বীভৎসতা ।
🔸যারা অডিও স্টোরি শুনতে ভালোবাসেন তারা নিশ্চয়ই সায়ক আমানের নামের সাথে পরিচিত । ইউটিউবে তার ‛মিডনাইট হরর স্টেশন’ চ্যানেলে বাংলায় ‛রহস্য-রোমাঞ্চ-ভৌতিক’ বিষয়গুলির উপর মৌলিক লেখা ছাড়াও বিভিন্ন বিদেশি গল্পের অনুবাদ করে পরিবেশন করেন তিনি । এটিই সায়কের প্রথম উপন্যাস... কিন্তু বলা বাহুল্য, প্রথম উপন্যাসেই তার সুন্দর লেখনীর ছাপ ফেলতে সক্ষম হয়েছেন তিনি । প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা সম্বলিত ‛আনপুটডাউনেবল’ এই উপন্যাস । অসম্ভব সুন্দর বর্ণণায় লেখক এমন দৃশ্যপট ফুটিয়ে তুলেছেন, যেন পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল আমি নিজেই ঘুরে বেড়াচ্ছি গল্পের চরিত্রদের সাথে মিশে ।
🔸এটিকে শুধুমাত্র ভৌতিক উপন্যাস জঁনরার অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না মোটেই, বরং রহস্যে ঘেরা অতিপ্রাকৃত উপন্যাস এটি । অলৌকিক পটভূমি যেমন আছে, তেমনই আছে মুখ্য চরিত্রের ক্ষুরধার বুধিমত্তার পরিচয় । ইতিহাস এবং কাল্ট নিয়ে বিষদ বিশ্লেষণ এবং মনস্তত্ত্ব নিয়ে সুন্দর আলোচনা লেখনীকে অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে । তবে রহস্য তৈরীতে যেভাবে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন লেখক, রহস্যের উন্মোচনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একটু জড়িয়ে গেছে... বারবার মনে হয়েছে আর একটু স্পষ্টভাবে, একটু সময় নিয়ে আরোও ভালো ভাবে শেষ করা যেত এই উপন্যাস । সবমিলিয়ে বলা যায় অতিপ্রাকৃত এবং রহস্য মিশিয়ে যে পদ তৈরী করেছেন লেখক, তা বেশ উপভোগ্য ।
যতটা হাইপ নিয়ে বইটা এসেছে ততটাও নয়। হরর বা এডভেঞ্চার বললেও এটা সেই রকম বলা যাবে না। জাস্ট ঐতিহাসিক কিছু অকাল্ট ও সাইন্স ফিকশন জুড়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বইটির রিভিউ দেয়ার সময় সবাই অনেক প্রশংসা করেছেন। তাই পড়া শুরু করেছিলাম। . তবে মনে প্রশ্ন জাগে বইটি এত জনপ্রিয় হল কিন্তু কেউ একটি বারও বলেনি কাহিনী প্রচন্ড রকমের ধীর। সেই সাথে ভীষণ ভাবে টেনে বড় করা হয়েছে৷ অতিরঞ্জিত বলে একটা কথা আছে, এখানে সেটাই হয়েছে। . সহজ ভাবে যেটা বলা যায় সেটা না করে তিন চার লাইনে ঘুরিয়ে বলা হয়েছে। . বইটি আমাকে কিছুটা হলেও হতাশ করেছে।
গল্পটা এত আজগুবি যে কল্পনা করতেও কষ্ট হওয়ার কথা! অথচ পড়ার সময় মনে হচ্ছিল প্রতিটা দৃশ্য আমি স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি সিনেমার মত। এতটাই স্পষ্ট যে আমি নিজেই একটা সিনেমা বানিয়ে ফেলতে পারবো! আর এই পারফেক্ট ভিজুয়ালাইজেশনের জন্যই সায়ক আমানের লেখা আমার পছন্দ। তার লেখনিতে গল্পে ধরে রাখার ক্ষমতাটা এত প্রবল যে গল্পের উইকনেস থেকে থাকলেও সেটা মাথায় আসে না। সেগুলো নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করে না। পড়ার পুরোটা সময় এনজয় করে যাওয়া যায়।
'তার চোখের তারায়' কে অনায়াশে চার বা পাঁচ তারা দেওয়া যেত। দেওয়া গেল না এই কারনে, যে গল্পটি যেরকম গুছিয়ে শুরু করে, প্রচুর লেয়ার অ্যাড করে, শেষের আগে পর্যন্ত টানটান ভাবে টেনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, গল্পের শেষটা ঠিক সেরকমই অগোছালো এবং অত্যধিক আজগুবি! হ্যাঁ অতিপ্রাক্রিতিক আজগুবি গল্পকেও সুন্দর ভাবে বিস্বাসযোগ্য করা যায়। এই গল্পটি সেটা করতে পারল না। কিন্তু উন্মোচনের আগে পর্যন্ত সত্যি সত্যি এতি একটি ভালো সুপারন্যাচারাল মিস্ট্রি। সরল লেখনি, টানটান গল্প। শেষ ভালো হলে সব ভালো হত!