১৯৫৩ সাল। জয়নুল আবেদিন ক্লাস থেকে তার ছাত্র দেবদাস চক্রবর্তীকে ডেকে নিয়ে বললেন এয়ারপোর্টে যাও, একটা পাগল আসছে। দেবদাস তার সহপাঠী রউফকে নিয়ে রওয়ানা হলেন এয়ারপোর্টের দিকে। জয়নুল আবেদিন তখন আর্টস কলেজের প্রধান। করাচি থেকে দিল্লী হয়ে সুলতান সেদিনই ঢাকা আসছেন। দেবদাস বা রউফ কেউই সুলতানের চেহারা চেনেন না। জয়নুল আবেদিন চেহারার একটা বর্ণনা দিয়ে রেখেছেন যদিও তারপর আবার বলেছেন সেই বর্ণনা এখন হয়তো মিলবে না। সুলতান বহুরুপী, এর মধ্যে নিশ্চয়ই নিজেকে বদলে ফেলেছে।সেদিন এয়ারপোর্টে ঋষি-ফকিরদের মতো লম্বা চুলের ফরসা, দীর্ঘদেহী সাদা আলখাল্লা পরা সুলতানকে দেবদাস আর রউফ ঠিকই চিনে ফেলতে পেরেছিলেন। কিন্তু মানুষ সুলতানকে চিনতে, বুঝতে পেরেছিলেন কয়জনই বা।
শিল্পকলা একাডেমির খোলা আর্ট গ্যালারীতে সুলতানকে ছবি আঁকতে দেখে কৌতুহলী হয়েছিলেন আহমেদ ছফা।সুলতানের এসিসট্যান্ট বাটুলকে জিজ্ঞেস করে জানলেন এই শিল্পীর নাম সুলতান। ছফা অবাক, অনেক শিল্পীকেই চেনেন, মেশেন কারো মুখে কখনো এর নামও তো শোনেন নি। পরদিনই ছফা আর্ট কলেজে যান শামিম শিকদারের কাছে, প্রশ্ন একটাই কে এই সুলতান। শামিম বলেন সুলতান হচ্ছেন দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস। সত্যিই তাই। আর বহুরুপী। খাকসার আন্দোলনের সমর্থক হিসেবে সুলতান ধরেছিলেন আলখাল্লা পরার অভ্যাস। এক পর্যায়ে পায়ে খরম পরে সন্ন্যাসীদের মতো গেরুয়া বেশেও ছিলেন কিছুদিন। ১৯৫৩ থেকে ৬৫ প্রায়ই পরতেন শাড়ি, পায়ে নূপুর, আলতা, মাথার চুলে ফুল। বলেছিলেন এটা নিজের মধ্যে বাঙালিত্বকে ধারণ করার জন্য করতেন, ছিলেন রাধাভাবে বিভোর। লুঙ্গি, পাঞ্জাবিও পরেছেন অনেকসময়।তবে মূলত পোশাক ছিল আলখাল্লাই। একের মধ্যে তিনি যেন বহু, অথবা বহুর মধ্যে এক।
নড়াইলের মাসিমদিয়া গ্রামের এক রাজমিস্ত্রী শেখ মেসেরের ছেলে লাল মিয়া। বাবা প্রায়ই জমিদার রায়বাবুদের বাসার বিভিন্ন স্থাপনার কাজ করতেন। সেগুলোর অনেকগুলোর নকশা করে দিতেন বালক লাল মিয়া।জমিদার ডি এন রায় দেখতে চাইলেন ছেলেটিকে। অন্য শরিকের ছেলে অরুণ রায়কে ভার দিলেন তাকে ছবি আঁকা শেখানোর।অরুণদার কাছে ছবি আঁকা শিখলেন লাল মিয়া বেশ কিছুদিন। ক্লাস এইটে উঠে বাড়িতে আর মন টিকলো না।সেটা ১৯৩৮ সাল। ততোদিনে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। নিজের মা তো সেই ছোটবেলাতেই মারা গেছেন। গিয়ে উঠলেন ডি এন রায়দের কলকাতার বাড়িতে। আট শরিকের বাড়িতে ভাগাভাগি করে তিন বছর ঘরের ছেলের মতোই থাকলেন। তারপর ভর্তি পরীক্ষা দিলেন কলকাতার আর্টস কলেজে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম, কিন্তু এন্ট্রাস পাস না করলে ভর্তি হওয়া যায় না, নিয়ম নেই। ডি এন রায়ের পরামর্শে গেলেন হাসান শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে। ইনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বড় ভাই। রাজনীতিবিদ নন, তবে শিক্ষিত, শিল্পবোদ্ধা মানুষ। বললেন লাল মিয়া নাম চলবে না। তিনিই নাম দিলেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান, সংক্ষেপে এস এম সুলতান। শাহেদ সাহেবের অনুরোধে নিয়ম বদলে এন্ট্রাস পাস না হওয়া সত্ত্বেও ভর্তি করা হলো তাকে আর্টস কলেজে। পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড ই হতেন,থার্ড ইয়ার পর্যন্ত পড়েছেন সেই কলেজে। এই সময়টায় থেকেছেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও শাহেদ সোহরাওয়ার্দীর বাড়িতে। কিন্তু মন টিকলো না বাঁধাধরা নিয়মে। বের হলেন দেশ ভ্রমণে, পড়াশোনা আর শেষ হলো না।
আগ্রা, দিল্লী, আজমীর, লক্ষ্ণৌ। যেখানেই গেছেন সেখানের মানুষের সাথে মিশে গেছেন।ভালোবাসা পেয়েছেন, দিয়েছেন। কিন্তু মন বেশিদিন টেকে নি কোথাও। সিমলা গিয়ে জীবনের প্রথম চিত্র প্রদর্শনী করলেন এক ইংরেজ ভদ্রমহিলার সাহায্যে। পাঞ্জাবের কাপুরতলার মহারাজা সেই প্রদশর্নীর উদ্বোধন করলেন। তার আমন্ত্রনে গেলেন পাঞ্জাবে, জলন্ধরে। সেখানে পরিচয় হলো এক ধনী জমিদার আমীর হাবিবুল্লাহ খানের সাথে।সেই জমিদার বাড়িতে কাটিয়ে দিলেন ছয় বছর পরিবারের একজন হয়েই। বাবার মৃত্যুর পর একবার নড়াইলে এলেন। যোগ দিলেন কৃষক আন্দোলনে। মন টিকলো না। আবারও জলন্ধর, সেখান থেকে দেরাদুন হয়ে মুসৌরির পথে। তারপর শ্রীনগরে থিতু হলেন কিছুদিনের জন্য। এরমধ্যে দেশভাগ হয়ে গেছে। কাশ্মীর নিয়ে লড়াই বাঁধলো ভারত পাকিস্তানের মধ্যে। একটা ট্রাকে চেপে শিয়ালকোট হয়ে পাড়ি দিলেন লাহোরে। মানুষের ভালোবাসা সেখানেও পেলেন।
পরিচয় হলো ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, সাদাত হোসেন মান্টো এবং আরও অনেক বিখ্যাত, অখ্যাত মানুষের সাথে। এখানেই ধরলেন চরসের নেশা। দেশে এসে অবশ্য চরসের বদলে গাজা ধরেছিলেন।নেশাকে তিনি ভাবতেন আধ্যাত্মিকতায় পৌছাবার উপায় হিসেবে। লাহোরে ঠিক মন বসলো না। সেখান থেকে গেলেন করাচিতে। করাচিতে আলাপ হলো খান আতা, ফতেহ লোহানী প্রমুখের সাথে।কালচারাল এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যাওয়ার সুযোগ হলো আমেরিকায়, সেখান থেকে লন্ডনে। চিত্র প্রদশর্নীও করলেন সেখানে। সেই একজিবিশনে ছিল পিকাসো, মাতিসের মতো শিল্পীদের ছবিও। তবু ফিরে এলেন করাচিতে। কাটিয়ে দিলেন দুবছর। থাকতেন ক্যাসিনো গেস্ট হাউজে। সেটা হয়ে উঠলো করাচির শিল্পী সাহিত্যিকদের আড্ডা। নিয়মিত আসতেন বড়ে গোলাম আলীর মতো শিল্পী। প্রচুর ভালোবাসা পেয়েছেন সেখানকার মানুষের, লোকে বলতো সুলতানকে সবাই ভালোবাসে, বাঙাল মুলুকের লোক জাদু জানে। চিত্র প্রদশর্নী করেছিলেন লাহোর আর করাচিতে। তবু সব ছেড়ে ঢাকায় চলে আসলেন।
দেশে এসে সেভাবে গুরুত্ব পেলেন না। অভিমান করেছেন জয়নুল আবেদিন ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের উপর, তারা সাহায্য করেন নি বলে। যশোরে তার মামা বাড়ির গ্রাম চাচুরি পুরুলিয়াতে নিজের চেষ্টায় একটা স্কুল করেছিলেন। তবে যেভাবে গড়তে চেয়েছিলেন সেভাবে হয় নি, তাই ছেড়েছুড়ে আসলেন সব। সোনারগাঁয়েও সরকারি অনুদানে ছবি আঁকার স্কুল করেছিলেন। স্থানীয়দের অসহযোগীতায় আর কিছু লোকের চক্রান্তে সেটাও ছেড়ে দিতে হলো। শেষ পর্যন্ত দেশের বাড়ি নড়াইলের গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশুস্বর্গ, সাথে ছিল নিজের পোষা পশুপাখিদের চিড়িয়াখানা।বিয়ে করেন নি, তবে ছিলেন তার ধর্ম কন্যা ও ধর্ম নাতনীরাও। স্বাধীন বাংলাদেশে সুলতান দুবার মাত্র চিত্রপ্রদশর্নী করতে পেরেছিলেন। একবার ১৯৭৬ আরেকবার ১৯৮৬ তে। দুবারই এই উদ্যোগে এগিয়ে এসেছিলেন দুইটি বিদেশি দুতাবাসের দুজন বিদেশি কর্মকর্তা। এর বেশি কিছু হলো না কেন কে জানে? হয়তো তার খামখেয়ালীপনা বা অন্যদের উদাসীনতা বা এই দুটোই তার কারণ। অথচ তার জীবদ্দশাতেই তাকে নিয়ে তারেক মাসুদ নির্মাণ করেছেন প্রামাণ্যচিত্র আদমসুরত।
এককালে ল্যান্ডস্ক্যাপ একেছেন বিস্তর, একেছেন মানুষের ছবি। এই দেশের আকাশের, এই দেশের সাধারণ মানুষের ছবি। সুলতানের ছবিতে বাঙালিরা বলিষ্ঠ, পেশীবহুল বাস্তবের বাঙালির মতো রুগ্ন নয়। বলতেন এই বলিষ্ঠ বাঙালিরাই হলো বাঙালির আসল রূপ। সুলতানের অনেক ছবি হারিয়ে গেছে, অসম্পূর্ণ রেখেছেন নিজেই কতো ছবি। এই বইয়ে শুধুমাত্র প্রচ্ছদেই সুলতানের আঁকা একটা ছবি দেয়া আছে কেবল। আরও ছবি দেয়া যেত, দেয়া উচিত ছিল বলেই মনে করি। শিল্পীর জীবনী নিয়ে বই, অথচ বইয়ে ছবি নেই, এটা একটু অদ্ভুতই লেগেছে।
হাসনাত আবদুল হাই এই বইকে বলেছেন জীবনধর্মী উপন্যাস, এই উপন্যাসে লেখক নিজেও একটি চরিত্র।বইটি লেখা হয়েছে সুলতানের জীবৎকালেই। হাসনাত আব্দুল হাইয়ের লেখা বেশ ভালো লেগেছে। সাবলীল, সুন্দর ও তথ্যনির্ভর। তবু বইয়ের একটা দূর্বলতার কথা না বললে নয়, বইটিতে ঘটনাক্রম বড়ই এলোমেলো। আগের কথা পরে, পরের কথা আগে এসেছে। হয়তো লেখক যে ধারাবাহিকতায় তথ্য পেয়েছেন সেই আঙ্গিকে লিখতে চেয়েছেন তবু বইয়ের শুরুর দিকে ঘটনাক্রমের গোলকধাঁধায় পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। তবে একবার এগিয়ে গেলে বইটি মুগ্ধ করবে। যেমন মুগ্ধ করবেন সুলতান,দ্য লাস্ট অব দ্য বোহেমিয়ানস।