বিস্ময়কর একধরনের ব্লাস্ট হলো, রাজশাহী সুলতানাবাদে। সেখানে ছুটে চলল বেগুনীঘোড়া সংগঠন, সাথে রয়েছে শোয়েব। উদ্ভট সব পরিবর্তন আসছে ব্লাস্টের জায়গায়। আবারো ফিরতে চাইছে ইন্দ্রলিপির স্রষ্টারা। কিভাবে তৈরি হল এই অমরত্বের মন্ত্র? কাললিপিই বা কি করে এলো পৃথিবীতে? মহাবিশ্ব থেকেও পুরোনো কি এমন বিজ্ঞান, যা ইন্দ্রলিপি পর্যন্ত ধ্বংস করতে পারে? গর্ত থেকে বেরিয়ে এসেছে কালকর্কট, সাতশ বছর আগে শুরু হওয়া লড়াই এক নতুন মোড় নিয়ে শুরু হলো।
চারপাশের এত মুখোশের আড়ালে, কি করে সত্যিকার শত্রুকে চিনতে পারবে শোয়েব?
বইটা ভালো। লেখকের কল্পনাশক্তি খুবই শক্তিশালী। সিরিজের দুইটা বই পড়েই যেটা বুঝলাম, তা হচ্ছে- উনি বর্ণনামূলক ন্যারেশন পছন্দ করেন। কিন্তু, দূর্ভাগ্যজনকভাবে, বর্ণনাগুলোর বড় একটা অংশ বেশ বিরক্তিকর হয়ে উঠেছে। উঁচুমানের সম্পাদনা করে, বইতে কিঞ্চিৎ কাটাছেঁড়া করা অতি জরুরী ছিল।
কাহিনি সংক্ষেপঃ অমরত্বের চাবিকাঠি ইন্দ্রলিপির ধারক হয়ে ওঠার পর দুই বছর সময় পার করে ফেলেছে শোয়েব হাসান। ইকবালকে সাথে নিয়ে রহস্যময় ড্রাগ কিউফি প্রস্তুত ও ডিস্ট্রিবিউট করে চলেছে সে। কিন্তু হঠাৎ করেই নেপালের টাউফা মন্দিরে পাড়ি জমাতে হলো শোয়েবকে। ডা. রায়হান হাবীব, গৌরব রায়, মিস রিভেরা, মুজতবা আহমেদ ও নাফিস শাহরিয়ারের সাথে ওকে যোগ দিতেই হলো, যখন তাঁরা সকলেই নিজেদেরকে সাতশো বছরের পুরোনো গুপ্তসঙ্ঘ বেগুনীঘোড়া সংগঠনের সদস্য বলে পরিচয় দিলো। সেই বেগুনীঘোড়া সংগঠন, যাদের কাজ যুগ যুগ ধরে ইন্দ্রলিপি ও এর ধারককে রক্ষা করা। শোয়েবের ভাগ্য যেন সম্পূর্ণভাবে জুড়ে গেলো এই মানুষ গুলোর সাথে।
অদ্ভুত ধরণের এক ব্লাস্ট হলো রাজশাহীর সুলতানাবাদে। একটা ব্লাস্ট হয়েই থেমে থাকলো না, বরং একের পর এক ব্লাস্ট হতে লাগলো ঢাকার বেশ কিছু স্থান সহ মায়ানমারেও। এমন রহস্যময় ব্লাস্ট এর আগে কেউ কখনো দেখেনি। ক্ষয়ক্ষতির ধরণ দেখলে মনে হয়, ব্লাস্টের জায়গা গুলোতে সময় আর স্থানের ভেতরে যেন রীতিমতো সংঘর্ষ ঘটে গিয়েছে। এমন একটা ব্যাপার, যা প্রচলিত বৈজ্ঞানিক ধারণা ও যুক্তি দিয়ে মোটেও ব্যাখ্যা করার মতো না।
পুরো দেশ নড়েচড়ে বসলো এসব অদ্ভুত সিরিয়াল ব্লাস্টের মুখোমুখি হয়ে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হয়ে উঠলো। রাস্তাঘাট ছেয়ে গেলো আর্মিতে। কিন্তু ফলাফল শূন্য। কোনভাবেই বের করা যাচ্ছে না কেন হচ্ছে এসব ব্লাস্ট।
বেগুনীঘোড়া সংগঠনের সদস্যরা কিন্তু জানে এসব আসলে স্বাভাবিক কোন ব্লাস্ট না। আর ঠিক এখানেই শোয়েব জানলো জাতূষের কথা। ফাহু, রক্র, মিধিষ, ত্রিষু সহ অনেক অজানা ব্যাপারেই শোয়েব জানতে পারলো ধীরে ধীরে। আর যে ব্যাপারটাতে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়লো শোয়েব, সেটা হলো ধৃক; যা খুব শীঘ্রই হস্তগত করতে না পারলে ইন্দ্রলিপির মালিকানা সঙ্কটে পড়ে যাবে।
একের পর এক জাতূষ কাণ্ডে দিশেহারা অবস্থাতেও সিআইডি'র সিনিয়র অফিসার জাফর উদ্দিন ঠিকইশোয়েব-ইকবালের কিউফি নেটওয়ার্কের তালাশ করে চলেছেন। এদিকে কিউফির ফর্মুলা হস্তগত করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে আরো একটা পক্ষ, যার পেছনে বসে কলকাঠি নেড়ে চলেছেন চতুর দীনেশ বাগচী।
বেগুনীঘোড়া সংগঠন যখন জাতূষের ভয়াবহতা প্রতিরোধে ব্যস্ত, ঠিক তখনই ওদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন রহস্যময় স্বভাবের জুয়েলারি ব্যবসায়ী শাহাদাত খন্দকার ও লতা তালুকদার। আসলে ওদেরই বা স্বার্থ কি শোয়েবদেরকে সাহায্য করার পেছনে? একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর শোয়েব ঠিকই বুঝতে পারলো ইন্দ্রলিপি ধারণ করা কোন সহজ ব্যাপার না।
সাতশো বছর ধরে চলে আসছে দুই গুপ্তসঙ্ঘ বেগুনীঘোড়া সংগঠন ও কালকর্কটের মধ্যেকার লড়াই। এতোদিন পর সেই লড়াইটা জমে উঠলো আবারো, যেখানে কেউ জানে না কিসের আড়ালে লুকিয়ে আছে কোন শত্রু আর তার উদ্দেশ্যই বা কি!
পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ গতো বছর ঠিক এরকমই একটা সময়ে পড়েছিলাম মুশফিক উস সালেহীনের ইন্দ্রলিপি ট্রিলোজি'র প্রথম বই 'জাদুকর'। আজ শেষ করলাম দ্বিতীয় বই 'ইন্দ্রলিপি'। ফ্যান্টাসি থ্রিলার ঘরানার 'ইন্দ্রলিপি'-এর কাহিনি শুরু হয়েছে 'জাদুকর'-এর সমাপ্তির দুই বছর পর থেকেই।
প্রথমেই বলে নিই, এই বইটার কলেবর বেশ বড়সড়। কাহিনির বিস্তৃতিতেও বেশ ব্যাপকতা আছে। আর এই কারণেই বোধহয় চরিত্রের সংখ্যাও বেশি। মুশফিক উস সালেহীন মূলত তিনটা সেগমেন্টে এগিয়ে নিয়ে গেছেন 'ইন্দ্রলিপি'-এর কাহিনি, যেগুলো একের পর এক বর্ণিত হয়েছে; বেগুনীঘোড়া সংগঠনের কর্মকাণ্ড, দীনেশ বাগচীর কর্মকাণ্ড ও সিআইডি অফিসার জাফর উদ্দিনের কর্মকাণ্ড।
ফ্যান্টাসি উপন্যাস হওয়ার কারণে এখানে জাতূষ, রক্র, ফাহু, মিধিষ, ত্রিষু সহ বেশ কিছু ম্যাজিক রিলেটেড টার্ম সামনে এনেছেন মুশফিক উস সালেহীন। ইন্টারেস্টিং লেগেছে এগুলোর ব্যাখ্যা। বিশেষ করে জাতূষ তৈরি হওয়ার পর এর আশেপাশের ধ্বংসযজ্ঞের যে বর্ণনা 'ইন্দ্রলিপি'-তে পড়েছি, সেসব বেশ অন্যরকম লেগেছে আমার কাছে। লেখকের কল্পনাশক্তির প্রশংসা করতেই হয়। উপন্যাসের প্রথম দিকে আমার কাছে কাহিনির গতি বেশ ধীর মনে হচ্ছিলো। তবে মোটামুটি ১০০ পৃষ্ঠার পর থেকে কাহিনির ভেতরে বেশ গতিশীলতা লক্ষ্য করেছি। সবচেয়ে বেশি যে জিনিসটা ভালো লেগেছে সেটা হলো, লেখক তাঁর পূর্ববর্তী বইয়ের চেয়ে এই বইয়ে ডিটেইলিং-এর দিকে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। পারিপার্শ্বিক সবকিছুর বর্ণনার ব্যাপারে তাঁর দক্ষতা বেশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার কাছে। শেষের দিকে এসে যদিও সামান্য তাড়াহুড়া লক্ষ্য করেছি৷ ধীরে ধীরে তাঁর লেখনশৈলী উন্নত হচ্ছে ও ভবিষ্যতে আরো হবে বলে আমার বিশ্বাস।
এবার ভুল-ভ্রান্তির ব্যাপারে আসা যাক। ৪০ তম পৃষ্ঠায় চিফ ডিরেক্টর মোশাররফ হোসেনের অফিস তিন তলাতে থাকলেও ১০৮ তম পৃষ্ঠায় সেটা হয়ে গেছে চার তলা। ডিরেক্টরের নাম হয়ে গেছে মোশাররফ করিম। বানান ভুলের মাত্রাও ছিলো চোখে পড়ার মতো। কেটে-কে কেঁটে, হাঁটা-কে হাটা, পাক (ঘূর্ণন)-কে পাঁক (কাদা), কাত-কে কাঁত, পড়া (পতিত হওয়া)-কে পরা (পরিধান করা), দুই চোখ বিস্ফারিত হওয়াকে বিস্ফোরিত হওয়া সহ আরো বেশ কিছু বানান বিপর্যয় লক্ষ্য করেছি৷ আগামী বই গুলোতে লেখক এসব ভুলের ব্যাপারে নজর রাখবেন আশা করি।
'ইন্দ্রলিপি'-এর কাহিনি বেশ ইন্টারেস্টিং একটা জায়গায় এসে থেমে গেছে৷ আর এই কারণেই ট্রিলোজি'র শেষ খণ্ড 'রাজগড়' পড়ার একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে আমার ভেতরে। অচিরেই হয়তো মুশফিক উস সালেহীনের কল্যাণে ট্রিলোজি কমপ্লিট করতে পারবো৷ দেখা যাক।
সজল চৌধুরী'র করা 'ইন্দ্রলিপি'-এর প্রচ্ছদটা উপন্যাসের সাথে পুরোপুরি ভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়েছে৷ বেশ ভালো লেগেছে প্রচ্ছদটা। বইটার বাঁধাই বেশ শক্তপোক্ত আর কাগজের মানও ভালো লেগেছে।
সংযুক্তিঃ 'ইন্দ্রলিপি' যেহেতু ইন্দ্রলিপি ট্রিলোজি'র দ্বিতীয় বই, অতএব যাঁরা পড়তে চান তাঁরা ট্রিলোজি'র প্রথম বই 'জাদুকর' আগে পড়ে নেবেন। এতে কাহিনি বুঝতে কোন সমস্যা হবে না। আমার জানামতে দুটো বই-ই বাজারে অ্যাভেইলেবল আছে।
কাহিনী সংক্ষেপ: শোয়েব গিয়ে যোগ হয়েছে বেগুনীঘোড়া সংগঠনের সাথে। তখনই দেখা দিল বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অদ্ভুত সব ব্লাস্ট হচ্ছে। ব্লাস্টের ফলে জায়গাগুলোর অনেক রকম পরিবর্তন হচ্ছে, যেমন দেয়াল ফুড়ে গাছ বের হচ্ছে, মেঝে উত্তপ্ত হয়ে গলে যাচ্ছে ইত্যাদি। এদিকে ইন্দ্রলিপি কেড়ে নেয়ার অস্ত্র ধৃক এর খোঁজে ঘুরছে শোয়েব। কেউ বা কারা গোপনে ছক সাঁজাচ্ছে, বিগ-ব্যাঙেরও আগেকার প্রাণী ফাহু দের ফিরিয়ে আনবার। পদ্মফুলের মত হাত নেয়া শ্বেতমূর্তি গুনজালদার হাতবদল হতে যাচ্ছে। বারবার আহত হচ্ছেন ইন্সপেক্টর জাফরউদ্দিন। একের পর নতুন জট এসে হাজির হচ্ছে। ওদিকে পুরো দেশে কারফিউ! ব্লাস্টের ফলে গণহারে মানুষ পঙ্গুত্ব বরন করছে, বেশিদিন বেঁচেও থাকতে পারছে না। বিদেশী জৈব-অস্ত্র সন্দেহে মাঠে নেমে গেছে মিলিটারি। থমথমে চারপাশ! এই নিয়ে এগিয়ে চলেছে কাহিনী!
পাঠ প্রতিক্রিয়া: জাদুকর পড়েছি ১৫ দিনও হয়নি, তারপরই হাতে পেলাম ইন্দ্রলিপি। পুরো বইটা শেষ করার পর খালি একটা কথা মনে হচ্ছে বারবার - ইন্দ্রলিপির কাছে জাদুকর বইটা নস্যিমাত্র!! লেখক নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে চলে গেছেন। প্যাচের পর প্যাচ আসতেই থাকে! অর্ধেক পড়ার পর ভাবছিলাম - নতুন লেখক, এক বইয়ে সমাদৃত হয়ে হয়তো কনফিডেন্স বেড়ে গেছে, আবেগে পড়ে যেভাবে কাহিনীতে জট পাঁকাচ্ছেন, সেই জট খুলতে পারবেন তো? জট ছাড়িয়েছেন তো ছাড়িয়েছেন, এমন ভাবে ছাড়িয়েছেন যে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় বাকি নেই! সবচেয়ে ভালো লেগেছে এই জিনিসটা যে সব রহস্যের ক্লু আসলে জাদুকর বইয়েই দেয়া ছিল। জাদুকর বইটা যে কত ইস্টার এগে পরিপূর্ণ তা ইন্দ্রলিপি পড়লে বোঝা যায়। আমার মতে এই লেখক টুইস্টের জাদুকর! মাথা হ্যাঙ করে রেখে দেবে। আমি শেষের পরিচ্ছেদ তিনটে পড়ে নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না! সবকিছু আমার চোখের সামনেই ছিল, এমনকি জাদুকর বইয়েই বলা ছিল। তবুও আমি ধরতে পারিনি। সবমিলিয়ে ইন্দ্রলিপি আমার কাছে অন্যতম বেস্ট বাংলা থ্রিলার বই!
ক্রিটিক: *জাদুকরের চেয়েও বর্ণনার পরিমান ইন্দ্রলিপিতে অনেক বেশি। মাঝে একটা গোটা চ্যাপ্টার আছে যার কোনো প্রয়োজনই নেই আসলে। তবে হ্যা, এটাও মানতে হবে বই শেষ করার পর ওই বর্ণনাগুলোই মাথায় ঘুরবে। এত গোছানো বাক্য।
*বইয়ের কোয়ালিটি ভালো ছিল, কিন্তু বাইন্ডিং এত বেশি শক্ত, যে বই খুলে রাখা শক্ত।
*কোনো এক কারণে, আমার প্রচ্ছদটা বিশেষ পছন্দ হয়নি (ব্যক্তিগত মতামত)
*এই বইয়েও টাইমলাইনে সামান্য ঘোটালা ছিল। কিন্তু আমি সেটা উল্লেখ করবও না। কারন গোটা বইয়ের তুলনায় এই ভুল অনেক সূক্ষ্ম। তবে জাদুকরের তুলনায় কমই ভুল চোখে পড়েছে।
*বইটা চাইলেই আরেকটু গতিসম্পন্ন করে লেখা যেত। লেখক অনেক জায়গায় গল্প সরলরেখায় না নিয়ে, ঘুরপাক খাইয়ে আবার একই জায়গায় এনেছেন। মানছি তাতে বেশি রিয়ালিস্টিক লাগে, কারন চরিত্র ভুল করতেই পারে। তবে মোটা বইয়ে এরকম রিয়েলিজম না থাকলেই পড়তে সুবিধে।
*হামিদ মুরতাজা চরিত্রটাকে অহেতুক মনে হয়েছে আমার। এখন জানিনা, রাজগড়ে কি হয়। কারন জাদুকরে যেই চরিত্রগুলো অহেতুক মনে হয়েছিল, তারাই ইন্দ্রলিপির চালিকাশক্তি।
*জাদুকর ফেরত এসেছে, মার্কেটিং এর জন্য এই ভাইভটা তৈরী না করলেও হত।
রেটিং - ৯.৫/১০
[ইন্দ্রলিপি পড়া শেষ হলে দয়া করে জাদুকর বইয়ের ৪২-৪৩ পৃষ্ঠা পড়ে দেখবেন। অবশ্যই ইন্দ্রলিপি পড়া শেষে দেখবেন]
বইটি খারাপ না... তবে মন সন্তুষ্ট করার মতো ভালোও না। লেখক মনে হয় বর্ণনাতে একটু বেশি আগ্রহী কিন্তু এই অতিরিক্ত বর্ণনা গল্পের খেই হারিয়ে ফেলেছে। আমার মনে হয়েছে এই গল্প লেখার জন্য ২৫০ পৃষ্ঠাই যথেষ্ট। যাই হোক এখানে লেখকের কল্পনাশক্তির সামর্থ্য প্রশংসনীয়।
❛অ মরত্বের সন্ধান হয়ে আসছে সেই আদি যুগ থেকে। আবে হায়াত, অ মৃ ত যাই বলা হোক না কেন সেগুলো একটা মিথ হিসেবেই রয়ে গেছে। অ ম রত্ব কি আশীর্বাদ না অভি শা প? ইন্দ্রলিপির অ ম রত্ব সন্দেহাতীভাবেই অভি শা প। এমন দীর্ঘায়ু কি কাম্য?❜
অ ম রত্বের আশীর্বাদ কিংবা অভিশা প নিয়ে দুই বছর পার করে দিয়েছে শোয়েব। জিগাতলার ঘটনার পর সে তার জীবনে মনোযোগ দিয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে এড়িয়েছে। হাসান হিরুইঞ্চি আবার তার ❛কিউফি❜ মাদ কের ব্যবসা শুরু করেছে। তবে এমন নিস্পন্দ জীবন তো ইন্দ্রলিপির বাহকের কাটানোর কথা না। তাই আবারো মাথায় আচমকা আঘাত পেয়ে নিজেকে আবিষ্কার করে নেপালের এক মন্দিরে। জাদুকর তাঈব তথা জারতাঈব মুনেন্দ্রার বেগুনী ঘোড়া সংগঠনের কাজ সেই ফাহুদের নিয়ে জ্ঞান আহরণ এবং নানা বিষয় রক্ষা করা। ঘটনাক্রমে শোয়েব আজ তাদের সাথেই। জানছে নিজের ভেতরের লিপির নানা ব্যবহার এবং ইতিহাস সম্পর্কে। নানা নতুন শব্দ এবং এর ব্যাখ্যা জেনে নিজের জ্ঞানকে বৃদ্ধি করছে। এদিকে রাজশাহীর সুলতানাবাদে হয়ে গেলো এক ব্যাপক বিস্ফো রণ। আচানক এই বিষ্ফো রণের ধরন একেবারেই আলাদা। কে বা কারা করছে কোনো ক্লু নেই। একই রকম ঘটনা দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশেষ করে ঢাকায় হচ্ছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে সেটা মিয়ানমারেও হয়েছে। সিআইডি অফিসার জাফর এর কুল কিনারা পাচ্ছেন না। নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে সেনাবাহিনীর কাছে। দেশে থমথমে অবস্থা। কোথায় কখন ব্লা স্ট হয় আল্লাহ মালুম! এর ইফেক্টও ভয়াবহ। জায়গা পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে। আক্রান্ত মানুষের শারীরিক পরিবর্তন গা গুলিয়ে দেয়ার মতো। এটাকে কারো সংঘবদ্ধ কাজ মনে হলেও বেগুনী ঘোড়া ব্যাপারটাকে দেখছে ভিন্ন এক দৃষ্টিতে। এর সাথে যোগ আছে জাতূষ নামের এক প্রক্রিয়ার। তারা প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে একে বন্ধ করতে। কিন্তু একের পর এক বিস্ফো রণ অব্যাহত আছে। জাফর উদ্দিন ইকবাল, শোয়েবের পিছে লেগে আছেন শত প্রতিকূলতার মধ্যেও। আর্মি টেকওভার করলেও নিজের মতো তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন। থেমে নেই শাহাদাত খন্দকারও। নিক্ষপত্র, অনিক্ষপত্র, ত্রোপত্র নিয়ে নিজের কাজ করে যাচ্ছেন। এবার সাথে আছে লতা তালুকদার। তারা সাহায্য ক্রছে বেগুনী ঘোড়াকে। যেখানে আছে শোয়েব নিজেও। অনেকগুলো অজানা প্রশ্ন, রহস্য আর সন্দেহের ভিড়ে এই জগতের বাসিন্দারা।
❛বিগ ব্যাং এর আগে কী ছিল? আমাদের মতোই বা অন্যরকম কোনো দুনিয়া কী ছিল? থেকে থাকলে আজকের এই নয় দুনিয়ায় তাদের আবার ফিরে আসার সম্ভাবনা কতটুকু?❜
বেগুনী ঘোড়াকে বিশ্বাস করা ঠিক কি না শোয়েব জানে না। তবুও তাদের সাথেই আছে। অন্যদিকে গোপনে জেগে উঠেছে কালকর্কট নামক আরেকটি সংঘ। যার নয়া সদস্য ছিল প্রয়াত এক চরিত্র। বেগুনীর সাথে তাদের বেশ বিরোধিতা। কেউ একটা কিছু শুরু করতে যাচ্ছে তো আরেকপক্ষ বন্ধের তোড়জোড় করছে। তবে এসব কিছুর নেপথ্যে কে আছে? আগে শোয়েব শিকারি ছিল এবার সে নিজেকে বাঁচাতে পারবে নাকি শিকারে পরিণত হবে? এবারের পাঠ চুকাতে হলে যেতে হবে বরফকল। কী হবে সেখানে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝ইন্দ্রলিপি❞ মুশফিক উস সালেহীনের ফ্যান্টাসি ঘরনার উপন্যাস। জাদুকর ত্রয়ীর দ্বিতীয় বই। ❛জাদুকর❜ এর দুই বছর পরের ঘটনা থেকে এই উপন্যাসের চলাচল শুরু। আগের অনেক অমীমাংসিত এবং রহস্যের জাল এখানে খুলেছে। আগের থেকে এই উপন্যাসের কাহিনি আরো বিস্তৃত। চরিত্রের আনাগোনা বেশি। আগের ছোটো কোনো ঘটনার বিশদ ব্যাখ্যা ছিল এখানে। যাকে আপাতপক্ষে আগের ��পন্যাসে ফাউ প্যাঁচাল লেগেছিল তার কিছু এখানে মানে পেয়েছে। সে হিসেবে আগের থেকে এই উপন্যাসের প্লট এবং বিস্তৃতি বেশ ভালো। আমার সবথেকে দারুণ লেগেছে লেখকের কল্পনাশক্তি। ফ্যান্টাসি জগতের সূচনা এবং বিস্তৃতি লেখক দারুণভাবে বর্ণনা করেছেন। অনেক জাদুকরী টার্ম ব্যবহার হয়েছে। একেকটা শব্দ কঠিন হলেও তাদের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মিষিধ, ধৃক, ক্ষর, জাতূষ, ফাহু নানা শব্দের প্রয়োগ এবং ব্যাখ্যা ভালো ছিল। ভালো লেগেছে বিভিন্ন জায়গায় হওয়া বিস্ফো রণে র বর্ণনা গুলো। এরপর আক্রান্ত মানুষের যেসব অ্যানাটমিকাল পরিবর্তনের ব্যাখ্যা ছিল সেগুলো আমার বেশ লেগেছে। হ্যাঁ গুলিয়েও উঠেছে। গল্পের খাতিরে অনেক চরিত্র এসেছে, পুরোনো চরিত্রের আরো বিশদ বিবরণ এসেছে। তবে শোয়েব চরিত্রটাকে আমার আগের উপন্যাসেও ভালো লাগেনি, এখানে সে প্রায় সবটা জুড়ে থাকলেও তাকে ভালো লাগেনি। লতা চরিত্রটার উপস্থিতি যতক্ষণ ছিল ভালো লেগেছিল। উপন্যাসের অনেক ভীত পরবর্তী কিস্তিতে সমাধান হওয়ার কথা। তবে সে কিস্তি কবে আসে জানা নেই। উপন্যাসের ভালো দিক থাকলেও গতবারের মতো এখানেও কিছু অযাচিত ব্যাপার ছিল ভালো লাগেনি। লেখকের খুব বিশদ বর্ণনা করার একটা ধাত আছে। পরিবেশের একদম নিখুঁত বর্ণনা দেন যাতে করে সেটা কল্পনা করা সোজা হয়। তবে সেটা করতে গিয়ে মূল ফোকাস থেকে বিচ্যুত হয়ে যান। এখানেও আশপাশের ব্যাপারগুলোর বেশ বর্ণনা ছিল। সবক্ষেত্রে সেগুলো পড়তে ভালো লাগছিল না। আবার কিছু অযৌক্তিক তুলনা ছিল সেসবও বিরক্তির কারণ হয়ে উঠছিল।
যেমন, * স্ট্রবেরি শেকে কমলা ছাতা দেয়াটা দোষের না। গোলাপীর সাথে মিলিয়ে গোলাপী ছাতা দিতে হবে এটা কোনো বাইবেল না * বাম চোখের ভ্রু ভেদ করে গু লি বেরিয়ে গেলে সরাসরি কপালে ঠেকিয়ে কী করে গু লি করে? * একবার বলা ছিল চিফের অফিস তিনতলায়। পরের কোনো অধ্যায়ে সেটা চার তলা হয়ে গেলো। * মোশাররফ হাসান এই বইতে এসে মোশাররফ করিম হয়ে গেলেন। * কাকতাল বেশি ছিল। যদিও এক পারফেক্ট প্ল্যান হিসেবে ধরলে অত্যুক্তি হবে না।
শেষের দিকে অনেক তাড়াহুড়ো করেছেন। এটার শেষটাও আগের মতোই। সারারাত এক কেত্তন শুনিয়ে শেষ দিকে ওয়াক্ত, জাজবাত সব বদলে গেছে। টুইস্ট বেশ ভালো ছিল যদিও। শেষটা ইঙ্গিত করছে ❛রাজগড়❜ এ আসবে নতুনত্ব অথবা সবকিছুর ইতি। পড়ার আগ্রহ রয়েছে অবশ্যই।
ইন্দ্রলিপি, কাললিপি এসবের খেল শেষ নাকি নতুন করে আরেকটা চক্র শুরু হবে সেটা সময় বলবে। কেননা, ❛লেগেছে গ্রহণ তিন চাঁদ সাত নক্ষত্রে র ক্তের রেখা শপথ এঁকেছে সে শর্তে।❜
প্রোডাকশন:
আগের বইয়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে এখানেও টাইপো, বানান ভুলের মাত্রা ভালো পরিমাণে ছিল।
❛সময়ের এই অতীত,বর্তমান, ভবিষ্যতের ধারা বন্ধ করে দিলে কী হবে? মৃ ত্যুকে অতীতের কোনো এক উপকথা হিসেবে জানলে সে পৃথিবী কেমন হবে?❜
ইন্দ্রলিপি এক কথায় বলতে গেলে অসাধারণ একটি বই। লেখকের কল্প জগৎতের বিস্তার শুধু এক জায়গায় থেমে থাকেনি৷ গল্পের শেকড় বটবৃক্ষের মত লম্বা হয়েছে, ছড়িয়েছে এর ডালপালা। তবে মাঝে মাঝে অবাঞ্চিত ডালপালা ছেঁটে ফেলতে হয় ভাল মত বৃক্ষের বেড়ে উঠার জন্য। এই গল্পটি মেদহীন হত যদি অবাঞ্চিত বর্ণনা গুলো বাদ দেওয়া যেত৷ তবে বলতে হবে তার আগের দুইটি বই পড়ার প্রেক্ষিতে বলতে পারি ইন ডেটেইলস রাইটিং তার জন্য একধারে আর্শীবাদ এবং অভিশাপ৷ থ্রিলার পাঠকদের কাছে এত বর্ণনা ভাল লাগার কথা নয়৷ তবে ধৈর্য্যশীল পাঠক এবং যারা একটু ভাবতে পছন্দ করে তাদের জন্য বর্ণনা গুলো মন্দ নয়৷
ইন্দ্রলিপি পড়ে আমার পাঠ্যনুভূতি কি? অবশ্যই বইটি ছাড়িয়ে গেছে সিরিজের প্রথম বই জাদুকর কে। একের পর এক ধাঁধা ও ধ্রুমজাল তৈরি করে পাঠক কে যেমন ডেড এন্ডে নিয়ে গেছেন লেখক। আবার রহস্যের উন্মোচ্চনের মাধ্যনে নতুন সম্ভবনা তৈরি করেছেন৷ নতুন লেখক এত জিলাপির প্যাচ মেরে শেষ পর্যন্ত গিট্টু ছুটাতে পারবেন কি না আমার সন্দেহ ছিল৷ তবে গিট্টু বেশ ভালভাবে ছুটিয়ে তৃতীয় পর্বের জন্য রেখে গেছেন প্রশ্ন এবং নতুন রহস্য? সেই রহস্যের জন্য পাঠক নিশ্চয় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবে৷
শেষের টুইষ্ট আমার জন্য হজম করতে একটু কষ্ট হল৷ চোখের সামনেই তো ঘুরছিল ঘরের শত্রু বিভীষণ অথচ নজর যাচ্ছে এখানে সেখানে৷ ঠিক একবারে জাদুকর বইয়ের মতই শেষের টুইষ্টটা ছিল অসাধারণ৷ আমি এই বই কে শুধু থ্রিলার জনরা বেঁধে রাখতে নারাজ৷ একাধারে আরবান ফ্যান্টাসি, এডভেঞ্চার, মিথিক্যাল ফিকসন ও হাল্কা সায়েন্স এর ঘুটার সম্বনয়ও বলা যায়৷
তবে দিন শেষে প্রশ্ন তো থেকেই যায়। হামিদ মুরতোজা তোমার সারা বইয়ে কাজ কি ছিল বাছা৷ আমেরিকার কানেকসন, প্রজেক্ট মায়া এসব প্রশ্নের উত্তরবিহীন গল্পের শেষ রেখে যায় প্রশ্নের রেশ৷ এই প্রশ্নের জবাব পাওয়া কি যাবে তৃতীয় পর্বে৷ সে না হয় সময় বলে দিবে।
তবে এবার চিরকুটের প্রোডাকশন কোয়ালিটি নিয়ে কিঞ্চিত হতাশ। বইটি মোটা এক্ষেত্রে রাউন্ড বাইন্ডিং বাদ দিয়ে নতুন ধরনের পরীক্ষা একেবারেই জলে গেছে৷ এত শক্ত হয়ে ছিল পাতা, যেন খুলে আসবে। পরের বার নিশ্চিয় এই সব বিষয় খেয়াল রাখা হবে৷ এছাড়া এই বইতে বানান ভুল বা মিসস্পেল তেমন একটা খুঁজে পায়নি৷ ওভার অল এভারেজ প্রোডাকশন৷
পরিশেষে বলতে চাই ইন্দ্রলিপির সাথে আমার ভাল সময় কেটেছে৷ একবারে নতুন স্বাদের কিছু পড়তে চাইলে চেখে দেখতে পারেন ইন্দ্রলিপি৷
রাজশাহীর সুলতানাবাদে ব্লাস্ট। বেগুনী ঘোড়ার সদস্যরা ছুটে চলেছে সেখানে। তাদের সাথে রয়েছে শোয়েব। এছাড়া ব্লাস্ট হয়েছে মায়নমারেও। যেখানেই ব্লাস্ট হচ্ছে সেখানেই অদ্ভুত পরিবর্তন৷ ইন্দ্রলিপির স্রষ্টারা আবার কি ফিরে আসবে। অমরত্বের সন্ধানে ছুটে চলেছে সবাই। কিভানে সৃষ্টি হয়েছে এই অমরত্বের।
এদিকে কালকর্কট আবার ফিরে আসছে। সাতশ বছর আগে শুরু হওয়া লড়াই আবার নতুন করে শুরু হতে যাচ্ছে। কি হবে এই লড়াইয়ে। . "জাদুকর" এর পরের পার্ট হচ্ছে "ইন্দ্রলিপি"। বইটি আগ্রহ নিয়ে শুরু করি। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা কমে আসে। বইটি থ্রিল কম বর্ননা বেশি। মানুষ শুধু দৌড়ে বেড়াচ্ছে। এই এখানে তো সেখানে। সিকোয়েন্স এর ঘাটতি আছে অনেক। বলা যায় লেখক বড় প্লট নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকটা খেয়াল করেনি যে পাঠ বিরক্ত হতে পারে৷ জাদুকর বইটি ভাল ছিল। কিন্তু ইন্দ্রলিপি নামের সাথে বইটি খাপ খায়নি৷ . বরং এখানে এক ড্রাগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। তাহলে বইটির নাম ওই হিসেবেই রাখা যেতো। তাছাড়া শেষে এসে সব কিছু তাড়াতাড়ি ঘটে। কাহিনীর বিল্ড আপ এমন যেন শেষে এসে সব কিছু তাড়াতাড়ি হতে হবে। ধীরে ধীরে একের পর এক করা যেত। একটু বিরত না দিয়ে। সব এক সাথে ঘটে গেলে সেটা ভাল দেখা যায় না।
লেখকের চোখ আছে বলতেই হবে! যারা বর্ণনা বোঝে না, তারা সাহিত্যের রস জানেনা! তারা কানা! এই ছেলে এত গুছিয়ে লিখেছে, কোথাও কোনো জড়তা নেই! জাদুকর পড়ে বোঝাই যায়নি, গল্পের ব্যপ্তি এতখানি!