হিমালয়ের উত্তরে 'পৃথিবীর ছাদ' এর ঘাড়ের উপর তখন নিঃশ্বাস ফেলছিল রাশিয়া আর চীন, যা হয়ে দাঁড়ালো ভারতের তখনকার ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মাথাব্যথার কারণ। ভূরাজনীতির খেলায় এগিয়ে থাকতে দরকার ভেতরকার খবরাখবর, অথচ চীনারা ছাড়া কারোরই সেখানে প্রবেশাধিকার নেই, এমনকি ভারতীয়দের জন্যও ছিল প্রায় অসম্ভব, সাদা চামড়ার মানুষ তো আরো অনেক পরের কথা।
তা সত্ত্বেও ভারত আর তিব্বত সীমান্তের অধিবাসীদের মাঝে ব্যবসা বাণিজ্য চালু ছিল, সেই সুবাদে যাওয়া আসাও চলতো। আরেকটি দলও নির্বিঘ্নে আসা যাওয়ার সুযোগ পেতেন - বৌদ্ধ ভিক্ষুরা।
ব্রিটিশরা এই সুযোগ কাজে লাগানোর চেষ্টা করলো গুপ্তচরদের ভিক্ষু সাজিয়ে। এদের অনেকেই যাত্রাপথে ধরা পড়লো কিংবা মারা গেলো। কিন্তু ব্যতিক্রম ছিলেন এক বাঙালি, শরৎ চন্দ্র দাস, চট্টগ্রামের সন্তান। তিনি ১৮৮০ সাল এর দিকে দুবার তিব্বত ঘুরে আসেন। উনাকে ঠিক গুপ্তচর বলা উচিত নাকি কূটনৈতিক দূত, সে নিয়ে এখনো মতভেদ আছে।
তিব্বতের উপর দুর্নিবার আগ্রহ থেকে অগাধ পড়াশোনা করেন তিনি এই অঞ্চলের উপর, আর তাকে ভ্রমণের উৎসাহ আর সাহস জোগায় পূর্বে তিব্বত ঘুরে আসা দুই ব্রিটিশ অভিযাত্রীর ভ্রমণ কাহিনী। পেশায় সিভিল ইঞ্জিনিয়ার শরৎ ছিলেন তিব্বতের জনগণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার জন্য ব্রিটিশদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের লোক। তিব্বতিরাও শরৎ এর পান্ডিত্য আর আগ্রহ দেখে তাকে সাদরে গ্রহণ করে নেয়। ফিরে এসে তিনি দুটি বই লিখেন তার তিব্বত ভ্রমণের অভিজ্ঞতার উপর। এই বইগুলো থেকেই বাঙালির সামনে নতুন করে আলোয় আসে এক বিস্মৃত ইতিহাস - শরৎ চন্দ্রই তিব্বতে ভ্রমণকারী প্রথম বাঙালি নন।
বৌদ্ধ ধর্ম ভারত থেকে তিব্বতে যায় চতুর্থ শতক নাগাদ। বুদ্ধের মৃত্যুর পর ধীরে ধীরে বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষয় হতে থাকে, তিব্বতেও এর আঁচ লাগে। ১০০০ শতক নাগাদ তিব্বতের তৎকালিন রাজা তখন বৌদ্ধ ধর্মের সংস্কারের জন্য আমন্ত্রণ জানান আচার্য অতীশ দীপঙ্করকে। তিনি আমন্ত্রণ গ্রহণ করে তিন বছরের জন্য তিব্বত যান, কিন্তু ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর ফিরে আসতে পারেন নি। তার সংস্কার কাজের ফলে পুনর্জন্ম পায় বৌদ্ধ ধর্ম, তাঁকে উপাধি দেয়া হয় "দ্বিতীয় বুদ্ধ" ।
ততদিনে গোটা ভারতেই বৌদ্ধ ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়েছে কিন্তু ছড়িয়ে পড়েছে আশে পাশের দেশগুলোতে। বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন পাল বংশের রাজারা। পাল বংশের পতনের পর ১৩ থেকে ১৪ শতক নাগাদ বৌদ্ধ ধর্মের ও পতন ঘটে, বাংলার মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায় অতীশ দীপঙ্কর এর নাম। তার জন্মভূমিতে বাড়ির চিহ্ন ও খুঁজে পাওয়া যায় না আর, শুধু উঁচু এক ঢিবিকে স্থানীয় মানুষেরা চেনে "নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা" নামে।
শরৎ চন্দ্র দাস তাঁর তিব্বত ভ্রমণের সময় জানতে পারেন অতীশ দীপঙ্কর এর বাড়ি বিক্রমপুরের (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) বজ্রযোগিনী গ্রামে। কিন্তু সেই গ্রামে ততকালীন সময়ের যথেষ্ট পরিমাণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তখনো পাওয়া যায়নি। ২০১৩ তে প্রথমবারের মত চীন ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ উদ্যোগে সেখানে শুরু হয় প্রত্নতাত্ত্বিক অভিযান, তিন বছরের মাথায় মেলে এক বেশ বড়সড় বৌদ্ধ বিহারের সন্ধান - নাটেশ্বর বৌদ্ধবিহার। সময়কাল ১০ থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত। এরপর থেকে প্রতি বছর ই চীনা প্রতিনিধি দল শীতকালে এসে খননকার্য চালিয়ে যেতে থাকে, যদিও এ বছর এখনো আসে নি।
১৯৭৮ সালেই অতীশ দীপংকরের দেহভস্ম নিয়ে আসা হয় ঢাকায়, সংরক্ষিত আছে বাসাবোর বৌদ্ধবিহারে। ২০১৩ সালে অতীশ দীপঙ্কর এর ভিটায় স্থাপন করা হয় "অতীশ দীপংকর মেমোরিয়াল কম্পলেক্স"।
অতীশ দীপঙ্কর তিব্বত গমনের পূর্বে বাংলার সোমপুর বিহারের আচার্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সোমপুর বিহার নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার নামেও পরিচিত।
বাংলা আর তিব্বতের সংস্কৃতির মেলবন্ধনের এই দুর্দান্ত ইতিহাস এর খুব অল্পই মেমোরিয়ালের পরিচিতি দেয়ালিকাতে লেখা। অতীশ দীপঙ্করের হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের ধারণা পাই সেখানকার এক মেমোরিয়ালের এক নিবাসীর সাথে কথা বলতে যেয়ে। বিস্তারিত জানতে বাসায় এসে গুগল সার্চ দিতেই পেয়ে গেলাম শরত চন্দ্রের উপর এক আর্টিকেল আর অতীশ দীপঙ্করের উপর পঞ্চাশ পাতার এক ছোট বই। বইটা একদম ই দুর্দান্ত। ঘন্টাখানেক এর মাথায় উনার জীবনি, বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা, তার ছড়িয়ে পড়ার ইতিহাস সম্পর্কে আগাগোড়া সব জানা হয়ে গেল।
মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সের একপাশের দেয়ালে গীতা, কুরআন, বাইবেল ও ত্রিপিটকের বাছাই করা কয়েকটা বাণী ঝুলিয়ে রাখা। বাণীগুলো অপরিচিত নয়, ছোটবেলায় টিভিতে দেখেছি কিংবা পত্রিকায় পড়েছি। কিন্তু এখন আবার পরতে যেয়ে অন্যরকম লাগলো, হয়তো জীবনের অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি কিংবা বোঝার ক্ষমতা। উপলব্ধি করলাম মনীষীদের জীবনভর সাধনার উদ্দেশ্য, জীবনের জট গুলো ছাড়িয়ে সহজবোধ্য করা।
গীতা: যে ব্যক্তি ইন্দ্রিয় সংযত ও ফলাকাঙ্ক্ষী নন, সেই কর্মযোগীই প্রশংসার পাত্র।
কুরআন: তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশিয়ে দিও না এবং জানা সত্ত্বেও সত্যকে গোপন করো না।
বাইবেল: যারা মন্দ পরিকল্পনা করে তাদের অন্তরে প্রতারণা হয় তবে যারা শান্তির পরিকল্পনা করে তারা আনন্দিত হয়।
ত্রিপিটক: শত্রু শত্রুর যতখানি অনিষ্ট করে, মিথ্যায় আকৃষ্ট চিত্ত তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
ত্রিপিটক: মন সবচেয়ে দ্রুতগামী, মন ই প্রধান। চিন্তা বা অভিপ্রায়ের প্রতিফলন ঘটে স্বভাব বা প্রকৃতিতে। যদি কেউ মন্দ অভিপ্রায় নিয়ে কথা বলে বা কাজ করে তবে বলদের গাড়ির চাকার ন্যায় দু:খ তাকে অনুগমন করে। যদি কেউ সুচিন্তা নিয়ে কোন কথা বা কাজ করে, সুখ তাকে ছায়ার ন্যায় অনুগামী হয়।
পুনশ্চ: ঠিক বইয়ের রিভিউ বলা চলে না বোধহয় এটাকে, কিন্তু পঞ্চাশ পাতার বইয়ের রিভিউ লিখতে গেলে যে পুরোটা রিভিউতেই চলে আসবে! এর চে বরং বইটা পড়ার আড়ালের গল্পটাই বললাম, কারণ বইতে শরত চন্দ্রের অংশটুকু নেই। আমার কাছে মনে হলো অতীশ দীপংকরকে বাঙালির পুনরায় আবিষ্কারের কাহিনীও জানা উচিত। নইলে জীবনীটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বলছি অনেক দিন আগের কথা। কত আগে? তা হাজার বছর তো হবেই। এখন যেটা বাংলাদেশের বিক্রমপুর, তখন সেখানে ছিল বজ্রযোগিনী নামের এক গ্রাম, গ্রামটাতে ছিল চন্দ্রবংশের রাজত্ব। হল কী, ৯৮২ সালে সেই বংশে জন্ম নিল ফুটফুটে এক রাজপুত্র। অসামান্য সৌন্দর্যের জন্য তার নাম রাখা হল চন্দ্রগর্ভ... সবার ই নয়নের মণি ছিল সে৷ তবে, একটু চুপচাপ স্বভাবের ছিল সে.. খেলাধুলায় তেমন একটা আগ্রহ ছিল না তার। বিভিন্ন জিনিষ সম্পর্কে জানার আগ্রহ ছিল খুব। তাই এদিক সেদিক চলে যেত নতুন কিছু দেখলে। একবার সে আনমনে হাটতে হাটতে এক জঙ্গলে এসে পড়ল। সেখানে থাকত জেতারি নামে এক যোগী। সে চন্দ্রগর্ভকে বললঃ "তুমি কে? কোথা থেকে এসেছ?" চন্দ্রগর্ভ বলল, "আমি এখানকার রাজপুত্র। আপনার কাছে শিক্ষালাভ করতে এসেছি"। জেতারি বললেন, " আমার কোন রাজা নেই। তাই কোন রাজপুত্রকেও আমার দরকার নেই। আমার কোন প্রভু নেই, আমিও কারও প্রভু নই। তুমি যে-ই হও, তোমার কাছে আমার কোন প্রয়োজন নেই।" লজ্জিত চন্দ্রগর্ভ তার ভুল বুঝতে পারল।বারবার সে ক্ষমা চাইল। আর বলল, "আপন�� আমাকে শিক্ষা দিন। দরকাল হলে আমি সবকিছু ছেড়ে আসতেও রাজি।"
তার প্রবল আগ্রহ দেখে জেতারি তাকে শিক্ষা দিলেন। সেই যে শুরু, তারপরের প্রায় ৩০ টিরও বেশী বছর ছেলেটি নানান গুরুর কাছে দীক্ষা নিল। নিজেকে সমৃদ্ধ করল দিনকে দিন.. পরবর্তী জীবনে, তার জ্ঞানের আলোর ছটা দিগ্বিদিক ছড়িয়ে গেল। একসময় তিনি হয়ে হয়ে উঠলেন ভারতবর্ষের সেরা পণ্ডিত। কে এই ব্যক্তি? তিনি 'শ্রীজ্ঞান' অতীশ দীপংকর...
একরাম আলীর লেখা এই জীবনী গ্রন্থটি অতীশ দীপংকর কে নিয়েই লেখা। লেখককে আলাদা ধন্যবাদ দিতে হয়, অনেক বই ঘেটে সুন্দর ভাবে একজায়গাতে উপস্থাপন করার জন্য। সহজ ভাষায় লেখা পড়তেও একটা 'গল্প গল্প' অনুভূতি হয়। তো কি আছে বইতে?
যারা একেবারেই জানেন না, তাদের জন্য অল্প কিছু তথ্য জানিয়ে দেই। অতীশ দীপংকর ছিলেন একজন বৌদ্ধ আচার্য.. বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারেই তার জীবন কেটেছে। গৌতম বুদ্ধের মৃত্যুর পর এই ভারতীয় উপমহাদেশে যে বিভ্রান্তি, নানান অসংগতি দেখা গিয়েছিল, তা সংশোধনে তিনি ভয়াবহ(ভালো অর্থে 🙂) সব বই লিখেন। তা পড়ে শৃঙখলা ফিরে আসে৷ তবে, তিব্বতের জায়গাগুলোতে ঝামেলা থেকে যাওয়ায় তিনি সেখানকার রাজার নিমন্ত্রণে সেখানে যান। আর গিয়ে যে পাণ্ডিত্য-মুন্সিয়ানা দেখান, তা নিয়ে আমি কিছুই বলছি না। শুধু এটুকু বললাম, তা দেখে সেখানের রাজা তাকে উপাধি দিলেন 'জোবো জেজ' বা, 'শিক্ষাগুরু'।
তো সেই শ্রীজ্ঞানের জীবনের সব দিককে লেখক একরাম আলী এই বইতে অল্প-বিস্তর তুলে এনেছেন। তবে তাতে ধর্মকথার চাইতে বেশী ওঠে এসেছে অতীশ দীপংকরের জীবন দর্শন। আমি আমার ভালো লাগা কিছু দিক একটু একটু দিলামঃ
♦ দীপংকর জীবন কে দেখেছিলেন নিজস্বার্থ ত্যাগ করে অন্যের সেবা করার মধ্য দিয়ে। তিনি নিজের জন্য কিছু চাওয়াকে তিনি বারণ করেছেন কঠোরভাবে, এ ব্যাপারে তার বক্তব্য, "কখনো নিজের জন্য কিছু করবে না। এমনকি নিজের জন্য বাড়িয়ে যাবেনা পুণ্যের সঞ্চয়।" তার ধর্মপ্রচারেও তার চিন্তা ভাবনা পরিস্কার ফুটে ওঠেছে। "ধর্ম কী?"- এমন প্রশ্নে তার উত্তর ছিল, " যারা অবসন্ন আর অসুস্থ, তাদের সেবা কর৷ আর বাবা-মা কে সেবা কর। তাতেই প্রকৃত ধর্ম রয়েছে।" কত সহজ কথায়, কত কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিলেন, ভাবা যায়?
♦ মানবজীবনের দুঃখ কষ্ট পর্যবেক্ষণ করে, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, আসলে এর মূলে আমাদের তৃষ্ণা... বস্তুগত জিনিষ আর সুখ পাবার অসম্ভব লোভ। তাই বারবার আওড়ে গেছেন, "যদি তুমি মুক্ত হতে চাও, তবে এই তৃষ্ণাকে ধ্বংস কর। তৃষ্ণার ক্ষয় হলে, দুঃখেরও ক্ষয় হবে।" একটা জিনিষ মিলে যায়, বেশীরভাগ মহাপুরুষেরাই এসব বস্তুগত চাওয়া-পাওয়াকে গুরুত্ব দিতেন না। আচ্ছা, আজকের সমাজে থাকলেও কী তারা তেমন ই বলতেন?
♦ চারিদিকের নৈরাজ্য, অশান্তি, সংঘাত কীভাবে মানুষকে যন্ত্রণা দেয় সেটি তাকে ভাবাত৷ অনেক চিন্তার পর পরিত্রাণের উপায় হিসেবে তিনি বলেছিলেন, "সংসারের দুঃখ-কষ্ট সীমাহীন। একটাই উপায়- ধ্যানাভ্যাস "। আরেক জায়গায় বলেছিলেন, " ভিড়ের ভেতরে বসবাস করার সময় এটা নয়। এখন নিঃসঙ্গতার মধ্যে আশ্রয় খুঁজে নিতে হবে।" হ্যাঁ, ধ্যান কে তিনি এতটাই গুরুত্ব দিতেন। এ নিয়ে একটা একটা ঘটনা বলি- রত্নভদ্র নামের একজন পুরোহিত এক সমস্যায় তার পরামর্শ চাইলে তিনি তাকে ধ্যান করার ব্যপারে বিস্তারিত বলেন। তারপর কী হলো শুনুন...
রত্নভদ্র যে ঘরে থাকতেন, সেই ঘরে যেতে তিনটি দরজার প্রথমটিতে লিখে রাখলেন- যদি পার্থিব কোন চিন্তা এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে উদিত হয়, তা হলে ধর্মের প্রহরীরা আমার মাথা চূর্ণ করে দিক। দ্বিতীয় দরজার গায়ে লিখলেন- যদি কোন ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে উদিত হয়, তা হলে ধর্মের প্রহরীরা আমার মাথা চূর্ণ করে দিক.. আর তৃতীয় দরজায় লিখলেন- যদি তুচ্ছ কোন চিন্তা এক মুহূর্তের জন্যও আমার মনে উদিত হয়, তা হলে ধর্মের প্রহরীরা আমার মাথা চূর্ণ করে দিক.. এভাবে টানা ১০ বছর সাধনা করে তিনি অতীশের কথার প্রমাণ পেলেন। চিন্তা করে বলেন দেখি, আমি বা আপনি এমন পারব কি না?
♦ যে দিকটা না বললেই নয়.. তিনি মানুষকে বিবেচনা করতেন তার কাজ দিয়ে৷ এবং অন্যের সেবা করাকে তিনি সবসময় আলাদা গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি তার 'বোধিমার্গ-প্রদীপ-পঞ্জিকা' বইতে লিখেছিলেনঃ
" মানুষকে তিন শ্রেনীর বলে জানবেঃ অধম, মধ্যম ও উত্তম। অধম সে-ই, যে শুধু নিজের স্বার্থ আর সংসার সুখের জন্য কাজ করে। সংসার-সুখের প্রতি উদাসীন আর কোন পাপকাজও করে না, অথচ যে শুধুই নিজের ভালোর কথা চিন্তা করে, সে হলো মধ্যম পুরুষ। আর উত্তম তাকেই বলা যায়, যে নিজেকে কষ্ট দিয়ে সর্বদা অন্যের কষ্ট দূর করার চেষ্টা করে।"
অতীশ দীপংকর আমাদের কাছে আলাদা গুরুত্ব পাবেন কারণ তিনি আমাদের-ই একজন। এই বাংলা-তেই তার জন্ম। তার কীর্তি জন্য হাজারো বছর পরেও তিনি বেঁচে থাকবেন। আমরা যে এতদিন পরেও তাকে ভুলিনি তার সাক্ষী বাংলাদেশের বিক্রমপুরের তার স্মারকফলক আর ধাকার কমলাপুর বৌদ্ধবিহার৷ বাংলাদেশ সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার চিতাভষ্ম তীব্বত থেকে নিয়ে এসেছে ১৯৭৮ এর ২৩ জুন...
এই তো.. জানি না, কথাগুলো আপনাদের কেউ আদৌ সঠিক ভাবেন কিনা। যদি এ ব্যাপারে জানার আগ্রহ জন্মে থাকে, তাহলে বইটি পড়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি..
অনেকদিন পরে এভাবে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেললাম বইটি। যুগে-যুগে, কালে-কালে যুগ-সংস্কারক সবসময়ই এসে আমাদের মত সাধারণ মানুষকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। বাংলার মাটিতে এরকম একজন মহামানবের জন্ম আমাদের জন্য আনন্দের, গর্বের। কিন্তু আমরা কি পারছি, এই চিরায়ত সত্যের বানীর ভিত্তিতে নিজেদের জীবনকে আলোকিত করতে? পারছি কি অন্যের জন্য অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দিতে?
বইটি পড়ে বৌদ্ধবাণী সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও অনেকগুণ বেড়ে গেল।
অতীশ দীপংকর। আমাদের এই বাংলার অতীশ দীপংকর। কত অজানাই না ছিল এই মহৎ ব্যক্তিটি, লেখকের সুন্দর সাবলীল লেখার কল্যাণে এই মহারতী সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আমার বিশ্বাস এ দেশের মানুষ যদি অতীশ দীপংকরের কাহিনী পড়েন তাহলে আমার মতই অবাক হবেন। জ্ঞানীর মূল্য এ দেশে বুঝি কোনদিনই দিতে শিখল না।