সেইণ্ট মেরি মিড। মিষ্টি, রৌদ্রোজ্জ্বল এক সকাল। কর্নেল ব্যাণ্ট্রি-র জন্যে সকালটা তিক্ত হয়ে উঠল, ঘুম থেকে উঠে যখন দেখলেন অচেনা এক তরুণীর লাশ পড়ে আছে তাঁর লাইব্রেরিতে। কে এই যুবতী? বাড়ির কেউ একে চেনে না। উত্তেজনার ঢেউ উঠল গাঁয়ের শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবনে। অবধারিতভাবে ডাক পড়ল মিস মার্পলের। এদিকে পরিত্যক্ত এক খনিতে, এক গাড়ির মধ্যে পাওয়া গেল আরেক মেয়ের অগ্নিদগ্ধ লাশ। আরও ঘোলাটে হয়ে উঠল পরিস্থিতি। দুটো লাশ, কয়েকজন সন্দেহভাজন...সব ধাঁধার সমাধান করে আসল সত্যটা যখন ছেঁকে বের করে আনলেন মিস মার্পল, তাক লেগে গেল সবার। একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ও চারটি গল্প নিয়ে আমাদের এ-আয়োজন।
সংকলনের সেরা গল্প হোমসের "বুড়ো আঙুলের ছাপ"। পার্কার পাইনের গল্পগুলো খুব একটা জমেনি। উপন্যাস মৃত্যুরহস্যে শেষেরদিকে যথারীতি মার্পেলের বুদ্ধির ঝলক থাকলেও মাঝখানে বড় একটা অংশে গল্পটা ঝুলে গিয়েছে, মাঝেমাঝে রীতিমতো বিরক্তিকর মনে হয়েছে। অনুবাদ চমৎকার ঝরঝরে।
স্যর আর্থার কোনান ডয়েল এবং রহস্য সম্রাজ্ঞী আগাথা ক্রিস্টিকে নতুন করে পরিচয় দেয়ার কিছু নেই।এই দুই মহারথীর দুই-দুই চারটি ছোটগল্প এবং আগাথা ক্রিস্টির একটি বড় গল্প স্থান পেয়েছে এই বইয়ে।বইয়ের অর্ধেকের বেশী পৃষ্ঠা জুড়ে থাকা আগাথা ক্রিস্টির বড় গল্প 'মৃত্যুরহস্য'-এর নামানুসারেই বইয়ের নামকরণ।
১৯১৪ সাল,আগস্ট মাস।জার্মানির চ্যান্সেলর ইংল্যান্ড আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।যুদ্ধের প্রস্তুতিকালে প্রচুর গুপ্তচরবৃত্তির প্রয়োজন হয়।সবার আড়ালে থেকে জার্মানির হয়ে সেটাই করছে ভ্যান বর্ক।সাঙপাঙ অনেকে ধরা পড়লেও আসল কালপ্রিট থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং শার্লক হোমসের দ্বারস্থ হয়েছেন বিষয়টা সমাধানের জন্য।ষাট বছর বয়সী হোমসের দায়িত্ব এবার দেশরক্ষার।সঙ্গী ওয়াটসনকে নিয়ে শার্লক হোমসের গুপ্তচর পাকড়াও নিয়ে বইয়ের প্রথম গল্প "হিজ লাস্ট বাউ"।
প্রফেসর জেমস মরিয়ার্টির মৃত্যুর পর অবসর সময় পার করছে শার্লক।তখনই হন্তদন্ত হয়ে ২২ নাম্বার বেকার স্ট্রিটে হাজির হলো হেক্টর ম্যাকফার্নেল।খুনের দায়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ঝুলছে তার উপর।কিছুদিন আগেই মি.জোনাস ওল্ডএকর নামে একজন ধনকুবের হুট করে হেক্টরকে তার সব সম্পত্তির মালিক করে দিতে চান।কিন্তু কালের ফেরে মি. ওল্ডএকরের খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত সে।স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইন্সপেক্টর লেস্ট্রাডসহ শার্লকও এক পর্যায়ে মেনে নিলো হেক্টরই দোষী।এরপর?মার্ডার মিস্ট্রি নিয়ে দ্বিতীয় গল্প "বুড়ো আঙুলের ছাপ"।
ব্যক্তিগত আপনি কি সুখী?সুখী না হলে মি.পার্কার পাইনের পরামর্শ নিন। পত্রিকার প্রথম পাতায় এমন বিজ্ঞাপন দেখলে স্বাভাবিকভাবেই আমরা হেসে উড়িয়ে দিবো।তেমনি উড়িয়ে দিয়েছিলেন মিসেস প্যাকিংটন।কিন্তু স্বামী যখন অন্য যুবতীর সাথে প্রেমে মত্ত,ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্লাবে,ডান্স করছে পার্টিতে অন্যদিকে নিজে সারাদিন ঘরে বসে নখ কুটা ছাড়া কিছুই করার নেই তখন পার্কার ভদ্রলোকের সাথে একবার দেখা করলে ক্ষতি কোথায়?ভদ্রলোক কিভাবে সমাধান করবেন এই সমস্যার?এই ঘরোয়া সমস্যা সমাধান নিয়ে বইয়ের তৃতীয় গল্প আগাথা ক্রিস্টির "বিগতযৌবনা"।
মেজর উইলব্রাহাম ফিরেছেন পুব আফ্রিকা থেকে মিশন শেষ করে।তিনি হাজির হয়েছেন মি. পার্কার পাইনের অফিসে।কবহ্যামের বাসিন্দা উইলব্রামের সমস্যা একঘেয়েমি।মিলিটারি মিশনের প্রতি মুহূর্তের উত্তেজনা,পা বাড়ালেই বিপদের হাতছানি এসব উপভোগ করতে চান আরো।পাইন পার্কারের পরামর্শে ইগলমন্টের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তিনি।সেখানে ঘটনাক্রমে পরিচয় হলো ফ্রেডা ক্লেগের সাথে।কে এই ক্লেগ?মেজর তার একঘেয়েমি কাটাতে পারবেন তো?জানতে হলে পড়তে হবে বইয়ের চতুর্থ গল্প "চাই রোমাঞ্চ"।
নিজের ঘরে আরামসে ঘুমাচ্ছেন।স্বপ্ন দেখছেন আড়মোড়া ভেঙ্গে ভোরের মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে চায়ের কাপে হাত রাখবেন।অলস পা দুটিকে টেনে নিয়ে যাবেন ওয়াশরুমে।তারপর…গুড়ে বালি।ঘুম ভেঙ্গেই মিস্টার আর মিসেস ব্যান্ট্রি শুনতে পেলেন তাদের লাইব্ররীতে অপরিচিত মেয়ের লাশ পড়ে আছে।গ্রামে এমন খুব একটা ঘটেনা।ঘটলে ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগেনা।স্বভাবতই দোষ কিছুটা হলেও পড়বে অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল ব্যান্ট্রির উপর।তার কথা ভেবেই মিসেস ব্যান্ট্রি খবর দিলেন মিস জেন মার্পলকে।জানালেন তাঁরা নির্দোষ।মিস মার্পলকে যে করেই হোক আসল খুনিকে পাকড়াও করতে হবে।
ঘটনার সূত্র ধরে তদন্ত-জিজ্ঞাসাবাদ যখন চলছে বিলাসবহুল হোটেল ম্যাজেস্টিকে তখন খবর পাওয়া গেলো দ্বিতীয় খুনের।পরিত্যক্ত খনির পাশে গাড়িসুদ্ধ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে অজ্ঞাতনামা কিশোরীকে।দুটি খুনের যোগসূত্র আছে?নাকি স্রেফ কাকতালীয়ভাবে একই সময়ে খুনগুলো করা হয়েছে?আর মেয়েগুলোই বা কে?মিস মার্পল কি পারবেন বন্ধু কর্ণেল ব্যান্ট্রিকে অপমানের হাত থেকে বাঁচাতে?ডবল মার্ডার মিস্ট্রি নিয়ে আগাথা ক্রিস্টির পূর্ণাঙ্গ উপান্যাস "মৃত্যুরহস্য"।
বেশ সময় নিয়ে পড়লাম।অভিজ্ঞতা মিশ্র।শার্লক হোমসের প্রথম গল্প এবং মি.পার্কার পাইনের গল্প দুটি মোটামোটি ভালো লাগলেও "বুড়ো আঙুলের ছাপ" নিঃসন্দেহে বইয়ের সেরা গল্প।ভিন্টেজ শার্লক হোমসকে যেনো খোঁজে পাওয়া যায়।
আগাথা ক্রিস্টির "দ্যা বডি ইন দ্যা লাইব্রেরী" থেকে অনূদিত "মৃত্যুরহস্য" বরাবরের মতো অসাধারণ।যদিও মাঝে অনেকটা একঘেয়ে লাগছিলো একজনকে বারবার করে জিজ্ঞাসাবাদের ব্যাপারটা।তবে ইনভেস্টিগেশনগুলো সম্ভবত এমনই হয়।যতটা না মিস মার্পলকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে তার থেকে বেশী তুলে ধরা হয়েছে কেসের কি পয়েন্টগুলো।ভালো লেগেছে।ভিন্ন স্বাদের উপন্যাস।
অনুবাদ করেছেন মারুফ হোসেন।সাবলীল অনুবাদ।কোথাও আটকে যাইনি।একটানা পড়ে গিয়েছি।সবথেকে ভালো লেগেছে উপন্যাসকে ছোট ছোট পরিচ্ছেদ করে দেয়াটা।উনার জন্য শুভকামনা।
সেবার বইয়ে বানান ভুল পাওয়া যায়না।বাঁধাই এভারেজ।যেমনটা হয় আরকি।প্রচ্ছদটা সম্ভবত প্রথম গল্পের সাথে মিল রেখে করা হয়েছে।সেবা প্রকাশনীর প্রচ্ছদ আহামরি হয়না কখনোই।সব মিলিয়ে খারাপ না।