বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ নিয়ে দুই খণ্ডে লেখা "মধ্যাহ্ন" ঐতিহাসিক উপন্যাস হিসেবে কতটুকু সার্থক তা বিবেচনার দায় সাহিত্য সমালোচক ও বিশারদের । "মধ্যাহ্ন" হুমায়ূন আহমেদের প্রথম বা একমাত্র ঐতিহাসিক উপন্যাস না । তবে নিঃসন্দেহে তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলোর একটি ।
ঔপনিবেশিক সময় নিয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত ও জনপ্রিয় তিনটি উপন্যাস আছে । একজন লেখকের সাথে আরেকজন লেখক বা এক সাহিত্যকর্মের সাথে আরেক কর্মের তুলনা করা সবসময় সমীচীন নয় ।তবুও তুলনা এসে যায় এ কারণে যে, বিংশ শতাব্দীর ঐ সময়সীমা নিয়ে সাহিত্যকর্ম আছে এবং ভবিষ্যতেও লেখা হবে । কারণ কালপরিক্রমায় নির্দিষ্ট সময়সীমা কোন জাতিগোষ্ঠীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং অস্তিত্বের নিয়ামক হয়ে দাঁড়ায় ।
"মধ্যাহ্ন" বাঙালি জাতির একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের প্রতিফলন। অবিভক্ত ভারতের পূর্ব বাংলার একটি গ্রাম বান্ধবপুর। সেই গ্রামের মানুষ উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। যদিও শুরুতেই বলেছি ঐতিহাসিক উপন্যাস, কিন্তু জানিয়ে রাখি এখানে রাজনীতি, কূটনীতির কঠিন বিষয়গুলো লেখক শুধু এড়িয়ে গেছেন তাই না, চরিত্রদের উপরেও খুব বেশি প্রভাব ফেলতে দেন নি । হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্বভাবসুলভ লেখনীতে আশ্বিনের ঝড়ের মত হুটহাট কিছু প্রসঙ্গ অবতারণা করেছেন, তবে তা কাহিনীর গতির শ্লথ ভাব দূর করে চালু রাখার প্রয়াস মনে হয় । যেমন সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের চরিত্রদের তিনি বান্ধবপুর গ্রামে হাজির করেছেন, কিন্তু গ্রামের মানুষের উপরে এর কোন প্রভাব পড়তে দেন নি।
এই পর্যন্ত আমার লেখা পড়ে একটা নেতিবাচক ধারণা তৈরী হচ্ছে কি? অথচ শুরুতে আমি রেটিং দিয়েছি ৫ আর বলেছি অন্যতম শ্রেষ্ঠ কীর্তি । কেন? আরও পরে আসছি । তবে এই রাজনৈতিক ইস্যুর একটা ফায়সালা আগে করি। রাজনীতিকে পুঁজি না করে আমার দৃষ্টিতে লেখক ভুল করেন নি। কারণ বাংলার এক অজপাড়া গাঁ দেশভাগের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে এটা দেখলেই বরং ভ্রূ উপরে উঠত। এটা কল্পনা করা খুব কঠিনা না যে, সেই সময় বেশিরভাগ মানুষ তাদের জীবনে কি হতে যাচ্ছে সেই বিষয়ে অন্ধকারেই ছিল। দেশভাগ হয়ত অবধারিতই ছিল, কিন্তু এটা তো মিথ্যে নয় যে এ নিয়ে রাজনীতি কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত। প্রাগৈতিহাসিক সময় থেকেই সুবিধাভোগী ক্ষমতাবান মানুষেরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার কূটচালে ব্যস্ত থাকে এই বিষয় দেখাতে লেখক ভুলে যান নি ।
কাহিনী বিচারে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের "প্রথম আলো" কিংবা "পূর্ব-পশ্চিম" অনেক বেশি বাস্তব, অনেক বেশি ঐতিহাসিক, অনেক বেশি জমাট । তবে সেখানে শেষ পর্যন্ত কাহিনীই মুখ্য, চরিত্ররা সময় ও কাহিনীর সম্পূরক । সেই সময়কে গল্পে প্রতিফলিত করলেও চরিত্রের প্রতি কি পাঠক মমতা অনুভব করে, কিংবা নিজের আবেগ চরিত্রের সাথে মেশাতে পারে?
তুলনায় "মধ্যাহ্ন" অনেকটাই খাপছাড়া । লেখক অবশ্য ভূমিকায় বলছেন, ইতিহাস নয়, সময়কে তুলে ধরাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল । পড়া শেষে মনে হয়, এর আবেদন অন্য জায়গায় । হুমায়ূনের অন্য সব উপন্যাসের মত চরিত্ররাই গল্পকে ছাড়িয়ে, সময়, ইতিহাসকে পিছনে ফেলে প্রথমে চলে আসে, মুখ্য হয়ে ওঠে । একাধিক প্রধান চরিত্রের সমাবেশ ঘটেছে উপন্যাসে। আর চরিত্ররা তাদের স্বকীয়তা বজায় রেখেছে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। "মধ্যাহ" উপন্যাসে আপনি পাঠক হিসেবে নৈর্ব্যক্তিক থাকতে পারবেন না। চরিত্রগুলোর প্রতি আপনার নিজস্ব আবেগ অনুভূতি মিশে যাবেই। কোন চরিত্রের প্রতি তীব্র ভালবাসা, মমতা, শ্রদ্ধা অনুভব করবেন, কোন চরিত্রের প্রতি ঘৃণা, শ্লেষ। তাদের সৌভাগ্য আর দুর্ভাগ্যে আপনিও সহযাত্রী হবেন ।
এখানেই "মধ্যাহ্ন" উপন্যাসের সার্থকতা ।
শেষে আরেকটা প্রসঙ্গ আনতেই হচ্ছে। হুমায়ূন আহমেদ সম্ভবত পণ করেছিলেন হোক না হোক একটা "ঐতিহাসিক" উপন্যাসই লিখবেন। তাই হঠাত হঠাত কিছুটা অপ্রাসঙ্গিক ভাবেই সমসাময়িক বিভিন্ন ঘটনা ও চরিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, যার সাথে গল্পের কাহিনী বা চরিত্রের কোন সম্পর্ক নাই । তবে সেই অধ্যায়গুলো খুব একটা খারাপও লাগে নাই । তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় মজার অনেক তথ্য তুলে ধরেছেন । সেগুলা অনেকটা কমিক রিলিফের মত লেগেছে।