সাহিত্যের যতোগুলো ধরন আছে: গদ্য, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ-সেগুলোর মধ্যে বোধহয় পদ্যই নিজের রূপ সম্পর্কে সবথেকে সচেতন।
রূপ মানে আক্ষরিক অর্থেই রূপ। বা আকৃতি, ইংরেজিতে যাকে বলে ফর্ম। কবিতার লাইন কীভাবে ভাঙা হচ্ছে, এক লাইনে কতোগুলো শব্দ রাখা হচ্ছে-এসবের ওপর ভিত্তি করে শুধু অর্থ বা শব্দের দিক থেকে নয়, রূপের দিক থেকেও কবিতাকে সাজানো সম্ভব। এই পদ্ধতিতে কবিতাকে ভেঙেচুরে ছবির আকৃতি দেওয়া যায়। সাদা পৃষ্ঠায় শব্দগুলোকে সেভাবে তুলে ধরা হয় যেভাবে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা হয় চিত্রকর্ম। এই পদ্ধতিকে বলে ক্যালিগ্রাম।
ফরাসি কবি আর পেইন্টার গিউম অ্যাপোলোনেয়ার (যাকে মোনালিসা পেইন্টিং চুরির দায়ে একবার গ্রেফতার করা হয়েছিলো) ক্যালিগ্রামের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী। এবং অ্যাপোলোনেয়ারের তীব্র প্রভাব লক্ষ করা যায় ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখায়। তার It's Raining কবিতাকে সরাসরি ওমাজ দিয়েছেন মাহমুদ নিজের ‘কান্নার ক্বাসিদা’ পদ্যে। অ্যাপোলোনেয়ার ফরাসি সাররিয়েলিস্টদের সমসাময়িক ছিলেন। মাহমুদের কবিতাতেও সাররিয়েলিজম স্পষ্ট। সাররিয়েল কবি ও চিত্রশিল্পীরা কাঠখোট্টা যুক্তির সীমাবদ্ধতা এড়িয়ে নতুন একধরনের শিল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন। যে শিল্পের অর্থ অনুধাবন করবে অবচেতন মন, সচেতন চিন্তা নয়। যেখানে বাস্তব আর স্বপ্ন মিলেমিশে নতুন এক রূপে সত্যকে উপস্থাপন করে। এই বিষয়টাও মাহমুদ চমৎকার দক্ষতার সাথে করতে পেরেছেন।
কালো কৌতুকের যে কবিতাগুলো বিশেষভাবে ভালো লেগেছে সেগুলো হচ্ছে:
চোখ। ক্যালিগ্রামের দারুণ উদাহরণ। ছোট্ট এই কবিতায় শব্দ, অর্থ আর রূপ সব একই হারমনিতে কাজ করেছে। চোখের আকৃতিতে লেখা পদ্যের বিষয়বস্তু হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি। মাত্র তের লাইনের মধ্যে সাবজেক্ট-অবজেক্টের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির যে বিভেদ, যে দেখছে আর যা দেখা হচ্ছে এই দুয়ের মধ্যে চিরন্তন যে দ্বন্দ, তা তুলে ধরা হয়েছে। ‘দর্শন’ শব্দের সবগুলো অর্থ যেন প্রকাশ পেয়েছে এই কবিতায়।
হারুণ। একইসাথে মজার এবং বিষাদের, এই কবিতায় যন্ত্রণায় আবদ্ধ একজন মানুষের জীবনের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। হারুণের অন্তহীন যন্ত্রণার সাথে মিল রেখে কবিতাটাকে একটা লুপ হিসেবে পড়া যায়। শেষ থেকে শুরুতে আসা যায়, বারবার, অসংখ্য বার।
ঈদ। এই কবিতাটা ক্যালিগ্রাম নয়, তবে প্রায় সব বাংলাদেশির জীবনের একটা ছোট্ট কিন্তু দুঃখজনক সত্য উঠে এসেছে এখানে। ঈদ (আসলে যেকোনো উৎসবের) আনন্দটা যে বয়স একটু বাড়ার সাথে সাথে দমে আসে, উল্লাসটা যে খাঁটি থাকে না আগের মতো-এমন কেন হয়? ইনোসেন্স হারানোর সাথে এই অনুভূতির সম্পর্ক আছে, দেখিয়েছেন কবি।
শূন্যস্থান। মাহমুদ কবিতায় মেটাফিকশন পছন্দ করেন। বেশ কয়েকটা কবিতায় চরিত্রেরা জানে তারা কবিতার চরিত্র। কোথাও কোথাও কবি নিজেই কবিতার চরিত্র। শূন্যস্থানকে তার মেটাফিকশনাল কবিতার সবথেকে ভালো উদাহরণ বলে মনে হয়েছে আমার। এখানে কবিতার লাইনের মাঝে যে সাদা শূন্যস্থান, সেই ইমেজারি, সেই রূপকের মাধ্যমে কবি বারবার কবিতার অধ্যায় বদলে দিয়েছেন, প্রেক্ষাপট বদলে দিয়েছেন, অর্থ বদলে দিয়েছেন। না পড়লে এই কবিতার ইমপ্যাক্ট বোঝানো খুবই কঠিন।
সবশেষে কিছু কথা: আমি কিছুদিন আগে জীবনানন্দের রূপসী বাংলা পড়লাম। সেটা মাস্টারপিস ছিলো সন্দেহ নেই, আর আমি তুলনায় যাচ্ছি না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে যদি বলি: আমি শহরের মানুষ, একবিংশ শতাব্দীর মানুষ। আমি যে সময়ে বসবাস করি, সেই সময় নদীতীরে অলস ভঙ্গিতে শুয়ে থাকার সুযোগ পায় না। মোটরগাড়ির চাকা হয়ে, জ্বলন্ত রকেট হয়ে তীব্র গতিতে ছোটে। আমার ইতিহাস ছোট্ট গ্রামের দৈনন্দিন জীবনে সীমাবদ্ধ নয়, আমার ইতিহাস হচ্ছে সারাবিশ্বের ইতিহাস। এই বিষয়গুলোর জন্যে ইমতিয়াজ মাহমুদের কবিতাকে মনে হয়েছে আমার জন্য কবিতা। আধুনিক জীবনের বিভ্রান্তি, দুঃস্বপ্ন, ক্লান্তি আর যন্ত্রণার জন্য কবিতা।
অসাধারণ বই।