রাজনৈতিক দিক থেকে জন্মলগ্নে বাংলাদেশ ছিল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দুর্বার, উচ্ছল ও প্রাণবন্ত একটি দেশ। আর অর্থনৈতিক দিক থেকে ছিল একটি দারিদ্র্যপীড়িত ও সমস্যা- জর্জরিত রাষ্ট্র। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আজ নিম্নমধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানে দেশটিতে সুশাসনের প্রকট ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমাপে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপন্ন। এই বইয়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের বিশ্লেষণ এবং তা থেকে উত্তরণের পথ সন্ধান করা হয়েছে। রাজনৈতিক সমস্যার সামাধান দেওয়া এ বইয়ের উদ্দেশ্য নয় । আর কোনো একটি গবেষণাকর্মে তা সম্ভবও নয়। মূলত রাজনৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু করার তাগিদই বইটি লেখার পেছনে কাজ করেছে। আর সে বিতর্ক যাতে যুক্তির পথে পরিচালিত হয়, তার জন্য প্রয়োজনীয় মালমসলা বা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়েছে এ বইয়ে। বইটির প্রধান আকর্ষণ হলো এর রচনাশৈলী। একটি নির্ভেজাল গবেষণাগ্রন্থ লিখিত হয়েছে অনেকটা রম্যরচনার ঢঙে। ফলে রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে যাঁদের তেমন মাথাব্যথা নেই, এমনকি তাঁরাও এ বই পড়ে আনন্দ লাভ করবেন।
Akbar Ali Khan (Bengali: আকবর আলি খান) was a Bangladeshi economist and educationist who served as a bureaucrat until 2001. He was the SDO of Habiganj during the Bangladesh Liberation War, when he decided to join the war. Later he served as an official of the Mujibnagar Government. After the independence he joined back the civil serviceand reached to the highest post of Cabinet Secretary and also worked as a university teacher. His book Porarthoporotar Orthoniti (Economics of Other-minding) has been a popular book on economics à la Galbraith.
এদেশে বইপড়ুয়া জনসংখ্যার বিচারে অস্বাভাবিক কম। আবার পড়লেও বেশিরভাগ পাঠক থ্রিলার ধরানার লেখা পছন্দ করেন।সেই পরিস্থিতিতে ৫শ' ৬০ টাকা দিয়ে বই কিনে লোকে রাজনৈতিক সচেতনতা লাভ করতে খুবএকটা উৎসাহী হবে বলে মনে হয় না (বইটা কিন্তু খুব বিক্রি হচ্ছে) ।যাইহোক, রাজনীতিগত সচেতনতা সৃষ্টিতে সহায়ক হতো যদি পেপারব্যাক এডিশন বের হতো!
বইটিতে মূলত ১৪ টি প্রবন্ধ রয়েছে বহুবিধ বিষয়ে।এবার আলোচনায় আসি-
বিশ্বে প্রতি ৫০ জনে ১ জন বাংলাদেশি অথচ এদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কোনকালেই ছিল না। কিন্তু তারপরেও অর্থনৈতিক সাফল্য এসেছে। লেখকের ভাষায়,"১৯৭০ সালে প্রায় ৭০% জনগোষ্ঠী দারিদ্রসীমার নিচে ছিল।আজ এ হার ২৫% নিচে নেমে এসেছে।" অর্থাৎ, অর্থনৈতিক সাফল্যের জন্য রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এদেশের সাফল্য প্রভাব ফেলে নি।
"গত চারদশকে বাংলাদেশে সুশাসনের ক্রমঅবনতি ঘটেছে। " কিন্তু কুশাসনও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি।
উপমহাদেশে জাতিরাষ্ট্র তিনটি যথা-ভারত,পাকিস্তান ও বাংলাদেশ। এদের মধ্য বাংলাদেশের জাতিরাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। কেননা -
১.বাংলাদেশের জন্ম হঠাৎ নয়। ২.বেশিরভাগ লোকজনের ভাষা একই। ৩.বাংলাদেশের লোকজন ধর্মীয় দিক থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠ (মুসলিম)।
ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রবন্ধটি অতিমনোরম। লেখক লিখেছেন,
"যে দেশে গণতন্ত্র রয়েছে,সেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।গণতান্ত্রিক মানুষ সব সময়ই ধর্মনিরপেক্ষ।"
সংবিধানে একইসাথে রাষ্ট্রধর্ম আর ধর্মনিরপেক্ষতা কতখানি সাংঘর্ষিক তা বলতে ভোলেন নি প্রাবন্ধিক। একইসাথে লিখেছেন,
"আইনে ধর্মনিরপেক্ষতার অধিকার থাকতে হবে, কিন্তু আইন কখনো ধর্মনিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে পারে না। " মোটকথা, ধর্মনিরপেক্ষতা যতটা না আইনের বিষয় তারচে তা বহুলাংশে চর্চার বিষয়।
'৭২ এর সংবিধানের সমাজতন্ত্রেরর সংজ্ঞা সামরিক একনায়ক জিয়া বদলে দিয়েছিলেন। ফলে তা এক অদ্ভূত "সমাজতন্ত্রে"র রূপ পায়। আসলে,বাংলাদেশে সরাসরি সমাজতন্ত্রের চর্চা সম্ভব নয় তা বোঝাতে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সাহায্য নিয়েছেন।
বলা হচ্ছে,দেশে বেকারত্ব হ্রাস পাচ্ছে অথচ এটি কতখানি ভিত্তিহীন দাবি তা প্রমাণ করেছেন আকবর আলি খান।
প্রাচীন গ্রিসে যখন গণতন্ত্রের পত্তন ঘটে, তখন সরাসরি সবার মতামত নেয়া হতো। কিন্তু এখন সে যুগ নেই। প্রতিটি রাষ্ট্রেই বিপুল জনসংখ্যা। যার জন্য উদ্ভব ঘটেছে প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের।
লেখক বলেন, "যেসব দেশে এত ভোট বেশি পেলে কেউ নির্বাচিত বলে গণ্য হয়, সেসব দেশে সংখ্যালঘুদের ভোটে নির্বাচিত সরকারের পক্ষে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়।"
এখানে আকবর আলি খান আনুপাতিক হারে নির্বাচনের কথা সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই সিস্টেমে টোটাল ভোটের ৫১% পেতে হবে সরকার গঠন করতে। অথচ এদেশে কোনো দলই মোট ভোটের ৪০% এরবেশি কখনো পায়নি। সমাধান হতে পারে কোয়ালিশন সরকার।দৃষ্টান্ত হিসেবে ভারতসহ নানা দেশের কোয়ালিশন সরকারের কথা তুলে ধরেছেন।
এখানে আমি আকবর আলি খানের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করবো । এদেশে আওয়ামীলীগ আর বিএনপি কী কখনো একসাথে কোয়ালিশন সরকারে যোগ দিবে?
আপাতদৃষ্টে, কখনোই না। দুইদলের মূল নীতিই মিলবে না। ফলাফল ভাঙন, আবার নির্বাচন। আর জাতীয় নির্বাচন কতব্যয় সাধ্য তা কে না জানে! উল্লেখ্য, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যয় হয়েছিল ৭শ' কোটি টাকা ( ইভিএম বাদে)।
আনুপাতিক নির্বাচনের পক্ষে আরোএকটি জোরালে যুক্তি হিসেবে আকবর আলি বলেছেন,
"তিনলাখ ভোট জাল করতে হবে জিততে হলে। "
৩০ শে ডিসেম্বরের 'চমৎকার' নির্বাচনের পর নিশ্চয়ই বলার অপেক্ষা রাখে না মাত্র ৩লাখ ভোট জাল করা কোনো বিষয়ই নয়। আকবর আলি খানের যুক্তি এখানেও ধোপে টিকল না। এদেশের প্রক্ষাপটে প্রয়োজন শক্তিশালী (প্র্যাক্টিক্যালি) নির্বাচন কমিশন। এখানে আনুপাতিক হারে নির্বাচন অবাস্তব।
এখন তো উন্নয়নের বান ডেকেছে৷ অনেকেই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য গণতন্ত্রের শাপ-শাপান্ত করেন৷ যারা দাবি করেন উন্নয়ন আর গণতন্ত্র একসাথে চলতে পারে না, তাদের মুখে ঝামা ঘষে দিয়েছেন আকবর আলি। লি কুয়ান ইউ আর অমর্ত্য সেনসহ নানা তাত্ত্বিক আর বাস্তবভিত্তিক আলোচনায় তাই প্রতীয়মান হয়।
এদেশের সকল ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে। রাষ্ট্রপতি "ঠুটো জগন্নাথ " মাত্র। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা নিয়ে লেখকের পর্যবেক্ষণ -
"ক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ফ্রান্সের বুরবন সম্রাট, রাশিয়ার জার ও মোগল বাদশার সঙ্গে তুলনীয়। "
এর বিপক্ষে রয়েছে চমৎকার যুক্তি। খান সাহেব বলেন,
"প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা অবশ্যই বাড়াতে হবে। কিন্তু এ ক্ষমতা বাড়িয়ে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করা চলবে না। "
এ সমস্যার সমাধান হতে পারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। রাষ্ট্রপতি এক্ষেত্রে প্রাধান্য পেতে পারেন। তৃণমূলে ক্ষমতায়ন গণতন্ত্রকে বেগবান করবো যা সময়ের দাবি।
বিচারবিভাগ নিয়ে আলোচনায় প্রাসঙ্গিকভাবে বঙ্গবন্ধুকে কোট করে বোঝাতে চেয়েছেন বাস্তবতা কতখানি ভয়াবহ। কেন অতিসত্বর বিচারবিভাগকে নির্বাহীবিভাগ থেকে পৃথক করবার সিদ্ধান্তটি পালন করা দরকার তা এই প্রবন্ধটি পড়লে আরো পরিষ্কার হবে । রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধান ও অন্যান্য বিচারপতি নিয়োগের প্রস্তাবটি যথাযথ মনে হয়েছে।
মন্দ সিস্টেম সংস্কারের চেয়ে নতুন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা সহজ। এদেশের আমলাতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি আর রাজনীতি ঢুকে গিয়েছে। ফলাফল যেখানে দরকার ৫ টি পদ, সেখানে রাজনৈতিক স্বার্থে সরকার আমলাদের খুশী করতে তৈরি করছে ১৫ টি পদ। আর তাতে ব্যয় বাড়ছে, জনগণ হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। তাই আমলাতন্ত্রের রাজনীতিকায়ন থামাতে সংস্কার অথবা নতুন সিস্টেম প্রতিষ্ঠা আশুকর্তব্য।
আকবর আলি খান এদেশে প্রাদেশিক সরকার সিস্টেমের উপজীব্যতা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এদেশে প্রাদেশিক সরকারের তুলনায় সরকারের ওপর হস্তক্ষেপ বন্ধ করে তাদের প্রকৃতই ক্ষমতায়িত করলে ক্ষমতার যথাযথ বিকেন্দ্রীকরণ হবে বলেই আমার মনে হয়।
তত্ত্বাবধারক সরকারের বিকল্প হিসেবে তিনি বলেছেন, "যদি নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, তাহলে এ সমস্যার সহজ সমাধান হতে পারে। " সেই নিরপেক্ষ সরকারের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন যা বর্তমানে বিরাজমান সমস্যার সমাধান হতে পারে।
চমৎকার বই।বাংলাদেশের রাজনীতি, রাজনৈতিক সংকট সমাধানের পন্থা বুঝতে এই বইয়ের বিকল্প নেই।
টালমাটাল রাজনৈতিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আমরা কীভাবে জুলাই ২০২৪ এর মত ট্র্যাজিক অবস্থায় পৌছালাম?
বাংলাদেশের সংবিধান, আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেছেন আকবর আলি খান। সেসব সমস্যা সমাধানের বাস্তবসম্মত প্রস্তাবও করেছেন কিছু। সেই প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা রাষ্ট্রের ভবিষ্যতের জন্য জরুরি, জুলাই ২০২৪ এর কসম, রীতিমতো জীবন মরণ জরুরি।
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন বিল পাস করতে সংসদে দুই তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হয়। যেহেতু বাংলাদেশে দুই তৃতীয়াংশ আসন পাওয়া খুব কমন একটা ব্যাপার, বিএনপি জোট ও আওয়ামী লীগ জোট দুই দলকেই নিরপেক্ষ সরকারের আয়োজিত ভোটে আমরা দুই তৃতীয়াংশ ভোট পেতে দেখেছি (২০০১, ২০০৯); অর্থাৎ সংবিধান পরিবর্তন সরকারি দলের খেয়াল খুশির ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ অবস্থা এড়াতে ভোটের পদ্ধতিতে সংস্কারের প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন আকবর আলি খান। সারাদেশের ভোট গণনা করে প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আনুপাতিক হারে সংসদে আসন বন্টন করা। পৃথিবীর বেশিরভাগ গণতান্ত্রিক দেশে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এবং সেসব দেশে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া দল সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় না, তারা কোয়ালিশন সরকার গঠন করে। এর ফলে বহুদলীয় গণতন্ত্র কার্যকর হয়, এবং প্রধান রাজনৈতিক দলের স্বেচ্ছাচারী হবার সম্ভাবনা কমে যায়। একইসাথে তিনি দুইকক্ষ বিশিষ্ট সংসদের ব্যাপারেও লিখেছেন।
জাতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কোন ইস্যুর ক্ষেত্রে গণভোটের প্রচলনের প্রস্তাব করেছেন লেখক। এরফলে গণতন্ত্র আরও কার্যকর হয়। যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষেত্রে গণভোট হলে দেশের মানুষের ইচ্ছা জানা যেতে পারতো।
সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীকে যে চরম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, চাইলে তিনি একনায়কদের মত ক্ষমতার ব্যবহার করতে পারেন। পুলিশ ও প্রশাসন সম্পূর্ণ তার হুকুমের অধীন। বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন তার প্রভাব বলয় থেকে মুক্ত হতে পারে না। লেখক নির্বাহী বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভাগাভাগির প্রস্তাব করেছেন। প্রকৃত স্বাধীন বিচার বিভাগ, এবং বিচার প্রক্রিয়া সচল করার ব্যাপারে আলাপ করেছেন বিস্তর। বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তার কথা লিখেছেন, এটার উপকারিতা ও অপকারিতার কথা লিখেছেন।
"অবাক বাংলাদেশ" আমাদের সাহসী মেধাবী তরুণদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা বই।
পরার্থপরতার অর্থনীতি পড়ার পর লেখকের ভক্ত হয়ে গিয়েছি। এই বই এ লেখকের তেমন ধার দেখতে পেলাম না। যদিও অসুস্থতার কারণে আকবর আলি খান নিজের হাতে এই বই লেখেননি।
বর্তমানে রাজনীতি মানুষের কাছে অত্যন্ত ঘৃন্য বিষয়। সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক ব্যাপার থেকে নিজেকে তাই দূরে রাখতে পছন্দ করে। কিন্তু লেখকের মতে দূর্নীতির সমাধান বিরাজনীতিকরণে নয়। বরং সাধারণ মানুষকে আরও সচেতন ভাবে রাজনীতি করতে হবে।
আকবর আলি খানের এই বই বাংলাদেশের ইতিহাস, রাজনীতি ও অর্থনীতির ছাত্রদের জন্য অবশ্যপাঠ্য করার দাবী রাখে। বাংলাদেশের রাজনীতি বুঝতে হলে এই বই পড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বই এর ভূমিকাতে লেখক বলেছেন, তিনি বিদ্যমান সমাজ ব্যবস্থায় বেশ কিছু ত্রুটি দেখেছেন, তা নিয়ে লিখেছেন, কখনো কখনো সমাধান দেবার চেষ্টা করেছেন। উনি বলেছেন, আমার বই নিয়ে আলোচনা হোক, তর্ক হোক। আমার সমাধানের সম্ভাব্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হোক। এই জন্য বই টা বাংলায় লিখা।
আকবর আলি খান বিশ্বাস করতেন, যদি আসলেই বাংলাদেশে কোন পরিবর্তন আসে তবে তা রাজনৈতিক দল থেকে না, যুব সমাজ থেকেই আসবে। যখন যুব সমাজ আগায়ে আসলো, ততদিনে লেখক মারা গেছেন।
বাংলাদেশের এর প্রেক্ষাপটে কোন কোন সংস্কার অতীব দরকার তা সঠিক ভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তার প্রতিকার ও যথাসম্ভব তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। একটি ভালো বই। সবার জন্য রেকমেন্ডড।
অথচ কয়েক দশক আগেও দুনিয়া এমন কোনো আলামত অনুভব করেনি কিন্তু আজকের ২১ শতকে এসে বিশ্বের প্রতি ৫০ জন মানুষের মধ্যে একজন বাংলাদেশি। উইনস্টন চার্চিলের ভাষায় যদি বলি, তাহলে বাংলাদেশ একটি রহস্যঘেরা প্রহেলিকাচ্ছন্ন হেঁয়ালি। আর দক্ষিন এশিয়ার ক্ষুদ্র এই দেশকে নিয়েই আকবর আলি খানের রম্যঢঙের গবেষণা গ্রন্থ 'অবাক বাংলাদেশ বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি'
লেখক বইয়ের শুরুতেই কইফিয়ত দিতে গিয়ে বলেছেন, দীর্ঘ সময় ধরে লেখা এই বইয়ে তিনি কোনো সমাধান দিচ্ছেন না। তিনি চাচ্ছেন শুধু বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা। তাই লেখক বইয়ের প্রথমে রাজনৈতিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন এবং এরপরে সমস্যার সমাধান খুঁজেছেন।
লেখক দেখিয়েছেন পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক আমলের তুলনায় এদেশে ২০০৯-১৫ সালে হরতালের পরিমাণ বেড়েছে ১৭৭৫ শতাংশ। যা স্পষ্ট ইঙ্গিত করে সহিংস রাজনীতির এবং সুশাসনের শূন্যতাকে। অন্যদিকে আশারবানী হলো, দক্ষিন এশিয়ায় বাংলাদেশেই জাতীয়তবাদ সবথেকে বেশি স্থিতিশীল।
কিন্তু প্রচলিত তত্ত্ব অনুসারে যেখানে সুশাসন নেই , সেখানে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না। ফালান্দ এবং পারকিনসন নামে দুজন অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের মত দুর্দশাগ্রস্ত দেশে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব হয়, তবে পৃথিবীর যেকেনো দেশেরই উন্নয়ন সম্ভব। কিন্তু লেখক বলেন, বাংলাদেশের ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য এই ধারণাকে রীতিমত চ্যালেঞ্জ করেছে।
অন্যদিকে আরেক তত্ত্ব অনুযায়ী সমরূপ জনগোষ্ঠীর জন্য জাতিরাষ্ট্র সৃষ্টি হলে সেখানে রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখানেও তত্ত্বকে ভুল প্রমান করে উল্টা পথে চলেছে। আকবর আলি খান লিখেছেন, "বাংলাদেশে রাজনীতি ও অর্থনীতি বিপরীত দিকে চলেছে। রাজনীতি পেছনের দিকে ছুটছে আর অর্থনীতি সামনের দিকে।"
রাষ্ট্রের পরিচালনার ক্ষেত্রে লেখক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হ্রাসের কথা কথা বলেছেন। লেখক দেখিয়েছেন কিভাবে বাংলাদেশ সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে একক কর্তৃত্ব প্রদান করেছে, যা পৃথিবীতে বিরল। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি পরিণত হয়েছে লেখকের ভাষায় 'ঠুঁটো জগন্নাথে।' এদিকে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোও বাধ্য হচ্ছে সংসদ সদস্যের 'মাস্তানি' সহ্য করতে। লেখক দেখিয়েছেন কেন সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য দরকার।
তিনি কথা বলেছেন আমলাতন্ত্রের ত্রুটি নিয়ে বিস্তারিত। নির্বাচিত ব্যবস্থায় সংস্কারের কথা বলতে গিয়ে বলেছেন আনুপাতিক নির্বাচনের কথা। নির্বাচনকালীন সংকট মোকাবেলায় তিনি দেখিয়েছেণ বেশ কয়েকটি উপায়। পুরো বইতে উঠে এসেছে কেন আমাদের দেশে সংস্কার অতীব জরুরী।
সবশেষে লেখক বলেন, "এই অদ্ভুত আঁধার থেকে মুক্তি না পেয়ে অনেকে ভাবছেন, রাজনীতি ছেড়ে দেওয়া ছাড়া কোনো সমাধান নেই। আসলে রাজনৈতিক ব্যর্থতার ওষুধ বিরাজনীতিকীকরন নয়। এর প্রকৃত ওষুধ হলো আরও প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করতে হবে।"
ডঃ খানের সুস্বাদু গদ্য এখানে প্রায় অনুপস্থিত। বাংলাদেশের রাজনীতি আর রাষ্ট���রীয় কাঠামোর ভালো বিশ্লেষণ। প্রচুর "র" ডাটায় ভরা - অনেক ছক আর সারণী ব্যবহার করা হয়েছে। ছক এতোই বেশি - যে ক্ষেত্রবিশেষে বইটা একঘেয়ে হয়ে গিয়েছে। এ বইয়ে ১৪টা প্রবন্ধ আছে - কিন্তু প্রতিটা প্রবন্ধ সমমানের হয় নাই। কিছু প্রবন্ধে আলোচ্য সমস্যার বিশ্লেষণ দুর্দান্ত হলেও সমস্যার কার্যকর কোন সমাধান পাওয়া যায় নাই। তবুও বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ত্রুটি - বিচ্যুতি এবং সেসব ত্রুটি নিরাময়ের একটা রূপরেখা পাওয়ার জন্য রাজনীতি সচেতন পাঠকের জন্য বইটা অবশ্যপাঠ্য। মূলতঃ রাজনীতি বিষয়ক অ্যাডভান্সড লেভেলের বই - যদিও সবাই পড়তে পারবেন - কিন্তু সবার কাছে সমান ভালো লাগবে না। আমার রেটিং 7/10.
বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি ক্ষেত্রকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে সমস্যা এবং এর সম্ভাব্য সমাধান অতি যত্নের সাথে তুলে এনেছেন লেখক। বইটি বেশ বড়, অতিরিক্ত সারণি ও অনেক পুস্তক-নির্ভর ভাষা থাকায় মাঝেমাঝে বিরক্তি এসে যায় বটে, তবে রাজনীতি প্রিয় মানুষদের জন্য বইটি শেষ না করে উঠা বেশ কঠিন। লেখক ভূমিকায় বই লেখার উদ্দেশ্য হিসেবে বাংলাদেশের মানুষদের অধিক রাজনৈতিক সচেতন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। দেশে যেহেতু সংস্কারকার্যে আগ্রহী কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই, তাই রাষ্ট্রযন্ত্রের সংস্কারের দাবি জনগণের কাছ থেকেই আসতে হবে।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন বলতে আমরা যা বুঝি- যাকে বেশি মানুষ চাইবে তিনি নির্বাচিত হবেন। এই পদ্ধতির দুর্বলতা হলো যাকে নির্বাচিত করা হয় ; তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নাও পেতে পারেন।যেমন কোন একটা নির্বাচনে ৫ জন প্রার্থী । প্রার্থীরা যথাক্রমে (১৯%, ২১%, ২০%, ১৫%, ২৫%) শতাংশ ভোট পেলেন। এদের মধ্যে মাত্র ২৫% ভোট পেয়ে একজন নির্বাচিত হয়ে যেতে পারে । অর্থাৎ ৭৫ শতাংশ মানুষ যাকে চায় না সে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত হতে পারে। এই পদ্ধতি তখনি কার্যকর হবে যখন মাত্র দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। গণতন্ত্রের সর্বোৎকৃষ্ট সংজ্ঞা দিয়েছেন আব্রাহাম লিঙ্কন। মজার ব্যাপার হলো- তিনি মোট ভোটের অর্ধেক ভোট না পেয়েও গণতান্ত্রিকভাবে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। ১৮৬০ সালে যখন লিঙ্কন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন যুক্তরাষ্ট্রে ৩৫টি অঙ্গরাজ্য ছিলো। সেগুলােতে মহিলাদের কোনাে ভােটাধিকার ছিল না। সম্পত্তির শক্ত শর্ত জুড়ে কালােদের ভােটাধিকার হরণ করা হয়। লিঙ্কন যখন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন আমেরিকার সব নাগরিকের মধ্যে ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশের বেশি লােকের ভােট দেওয়ার অধিকার ছিল না। এই ভােটারদের ৪০ শতাংশ ভোট, অর্থাৎ মােট নাগরিকদের ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ ভােট পেয়ে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।বিজেপি ২০১৬ সালের নির্বাচনে সারাদেশ থেকে ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল কিন্তু তারা শাসন ক্ষমতায় এসেছে এই পদ্ধতির কারণে। তার মানে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বেশি ভোট না পেয়েও নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ আছে । আবার বেশি ভোট পেয়ে নির্বাচিত না হওয়ায় উদাহরণ আছে । যেমন- ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে হিলারি ক্লিনটন বেশি ভোট পেয়েছিলেন। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছিলেন। এটা কিভাবে সম্ভব? আকবর আলি খান ব্রিটিশ নাট্যকার টম স্টপারকে স্মরণ করেছেন, 'It is not the voting that is democracy, it is the counting' যােসেফ স্তালিন ও বলেছেন, 'The people who cast the vote decide nothing, the people who count the vote decide everything.' অর্থাৎ জনগণের ভোট দেওয়ার ওপর প্রতিনিধি নির্বাচন নির্ভর করে না। বরং ভোট কোন পদ্ধতিতে কাউন্ট করা হবে সেটি দ্বারাই নির্ধারিত হয় কে নির্বাচিত হবেন। তাহলে এর সমাধান কোথায়? জানতে হলে পড়তে হবে আকবর আলী খানের 'অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি; বইটি ।
বইটা বাংলাদেশের রাস্ট্রযন্ত্রের বর্ণনা। সংবিধানের মূলনীতি, রাজনৈতিক দল, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন পদ্ধতি - এই প্রতিষ্ঠানগুলো কি কারণে তৈরি করা, কেন ব্যর্থ হচ্ছে, এর জন্য কি কি করা যায় এসবের বিস্তারিত বর্ণনা। বাংলাদেশের পলিটিক্স নিয়ে চিন্তা করতে চাইলে এটা মাস্ট রিড।
"অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা, যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই-প্রীতি নেই-করুণার আলোড়ন নেই পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।" — জীবনানন্দ দাশ
২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইটা যখন প্রকাশ হয় তখনো কেউ জানতোনা যে একটা তাত্ত্বিক আলাপের বই আগস্ট,২০২৫ এর পর এসে এতটা প্রাসঙ্গিক হতে পারে। হ্যাঁ, সমস্যার কথা এবং সমাধানের পথ নিয়ে হয়তবা অনেকেই বড়বড় বই লিখেছেন, শতশত রিপোর্ট হয়ত আছে এ নিয়ে — কিন্ত গণমানুষের জন্য সহজবোধ্য লেখনী খুব একটা পাওয়া যায় না। এত বিরাট পরিবর্তন এই দেশে আসবে তা কে ভেবেছিলো? দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সংবিধানের চার মূলনীতি — গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদের দোষ-গুণ-বিশ্লেষণ, সংসদ-প্রধানমন্ত্রী-রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ভারসাম্য, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, আমলাতন্ত্র, নির্বাচনসহ গোটা দেশের তাবত খুঁটিনাটি নিয়ে এত সহজ-সুন্দর-যৌক্তিক আলোচনা অন্তত আমি কোথাও পাইনি।
বইটি প্রসঙ্গে চলুন শুনে আসি খোদ লেখক থেকেই। ভূমিকায় তিনি লিখছেন,
"প্রথমে ইচ্ছে ছিল ইংরেজি ভাষায় বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটি গবেষণাগ্রন্থ লিখব। পরে ভেবে দেখলাম ইংরেজিতে বই লিখে হয়তো কিছু পণ্ডিতের সাধুবাদ পেতে পারি কিন্তু তাতে আমার উদ্দেশ্য সাধিত হবে না। আমি চাই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ রাজনৈতিক সমস্যা নিয়ে চিন্তা করুক এবং নিজেরাই সংস্কারের পথ বেছে নিক। তাই সাধারণ পাঠকদের জন্য বইটি বাংলায় লেখা হয়েছে। গবেষণামূলক গ্রন্থ পাঠে সাধারণ পাঠকেরা আগ্রহবোধ করেন না।
এই বই লেখার উদ্দেশ্য একটিই আর সেটি হলো বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি। চার্লস দ্যগল বলতেন, 'Politics is too serious a matter to be left to the politicians'। শুধু চাপার জোরে নয়, যুক্তির ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাই এই বইয়ে দুটি বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, রাজনৈতিক সমস্যার বিশ্লেষণ করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি সমস্যার সমাধান খোঁজা হয়েছে। তবে আমি মনে করি না যে এ বইয়ে আমি যেসমস্ত সমাধান উপস্থাপন করেছি তাই-ই সর্বোত্তম। গণ তর্ক-বিতর্কের আলোকে সমাধানগুলোর চুলচেরা বিশ্লেষণ ও চূড়ান্ত করার প্রয়োজন রয়েছে। যদি এই বই পাঠকদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টিতে সফল হয়, তাহলেই আমার শ্রম সার্থক হবে।"
এই বই লেখার উদ্দেশ্য একটিই আর সেটি হলো বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি — যথার্থই তিনি তার কমিটমেন্ট রেখেছেন প্রায় সাড়ে চারশ পাতার এই বইয়ে। রাজনীতি নিয়ে সচেতন থাকতে চাওয়া প্রতিটি ব্যক্তির কর্তব্য এই বই কেনা, ধীরেসুস্থে পড়া, আত্নস্থ করা, চিন্তা করা, আলোচনা-সমালোচনা করা এবং অবশ্যই অন্যদের এ বইয়ের সন্ধান দেওয়া।
পুঁজিবাদের উৎকর্ষতার যুগে শিক্ষা হয়ে পড়েছে ব্যবসা এবং আধুনিক শ্রমিক তৈরির সামগ্রী। শিক্ষা এখন বিভিন্ন মোড়কে থাকা একটা পণ্য। পৃথিবী যারা চালায়, তাদের প্রয়োজন অফুরন্ত অর্গানিক শ্রমিক এবং সেই শ্রমিক উৎপাদনের বস্ত। চারিদিকে শত শত গ্র্যাজুয়েট, অথচ চিন্তাভাবনায় ৮০'র সময়কার একজন ম্যাট্রিকপাস ছাত্রের চাইতেও খারাপ। মুখস্ত পাশ টেকনিশিয়ানকে বলা হচ্ছে শিক্ষিত। শিক্ষিতকে করা হচ্ছে একঘরে। অথচ একটা যুগে গুরুর হাতে "সম্পূর্ণ" শিক্ষা অর্জনের পর ছাত্রের গোসল ��রে শিক্ষাপ্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটানোকে বলা হতো স্নাতক। কালের বিবর্তনে কত কিছু পরিবর্তন হয়ে যায়...
এই পোস্ট যারা পড়ছেন, ধারণা করি আপনাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন বা পড়ছেন। "অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি" বইটি প্রতিটি রাজনীতি সচেতন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের পাঠ অবশ্য কর্তব্য বলে আমি মনে করি। নিজের দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এতটুক জানা বেয়ার মিনিমাম। ফেসবুকে ফাউল জিনিসে সময় অপচয় না করে ৬৫০ টাকা দিয়ে এই একটা বই কিনেন, পড়েন, অনুধাবন করেন। চ্যালেঞ্জ করছি, বইটি পড়বার আগে-পরে আপনি একই মানুষ থাকবেন না। গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে রাজনৈতিক সচেতনতা জরুরি।
"The constitution only gives the people the right to pursue happiness. You have to catch it yourself." — Benjamin Franklin
বিশ্লেষণধর্মী লেখনীর কারণেই প্রয়াত আকবর আলী খান আমার প্রিয় লেখক।পরার্থপরতার অর্থনীতি'তে লেখক অর্থনীতির মতো স্টার্ক ডিসকোর্স ডাল ভাতের মত সহজ করে পাঠকের কাছে পরিবেশন করেছেন। আজব ও জবর আজব অর্থনীতি, পুরোনো সেই দিনের কথা'র পর ''অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি" আমার পড়া আকবর আলী খানের চতুর্থ বই। যথাসম্ভব সম্যক বিশ্লেষণে লেখক যুগোপযোগী এক সুখপাঠ্য রচনা করেছেন। . বাংলাদেশের রাজনীতি, আমলাতন্ত্র, পুলিশিং ইত্যাকার রাষ্ট্রযন্ত্রের বিবিধ কোষ, কলা ও তন্ত্র জানার এক অমোঘ রচনা বইটি। .
লেখক নির্মোহ ভাবে রাষ্ট্র পাকিস্তানের পতন ও বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পত্তনে আলোকপাত করেছেন। পাকিস্তানকে তুলনা করেছেন একটি জাতিবিহীন জাতীয়তাবাদ হিসেবে, সেই সঙ্গে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান ও এর ক্রম ক্ষয়িষ্ণুতার ক্লিষ্ট বিবরন দিয়েছেন। এ অঞ্চলের বাসিন্দাদের মাঝে তারা "মুসলমান-বাঙালি না কি বাঙালি-মুসলমান" তা নিয়ে রাজনৈতিক এক দ্বিমেরুর আবির্ভাব হয়েছে । বাঙালিয়ানার সাথে মুসলমানিত্বের সংমিশ্রণে বাঙালি জাতীয়তাবাদ এক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাড়িয়েছে।বাঙালি সংস্কৃতির ক্রমশ অবনমন ও এর ভবিষ্যৎ প্রেক্ষিতে লেখক পুরনো বাংলা লোকসংগীতের স্মৃতি আওড়িয়েছে এভাবে, ❝এক তারা বাজাইয়ো না, ঢাক ঢোল বাজাইয়ো না, গিটার আর বংগো বাজাও রে।। একদিন বাঙালী ছিলাম রে একদিন বাঙালী ছিলাম রে।।❞ . গণতান্ত্রিক পথে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়নে এ অঞ্চলে বাধা বিপত্তি ও এবিষয়ক আন্ত:রাজনীতির জটিল প্রহেলিকার সহজ সরল ব্যাখা ও সমাধান লেখক অকপটে দিয়েছেন। . বাংলাদেশের রাজনৈতিক মননে রাজনৈতিক দলের বিকল্প হয়ে উঠছে সেনা শাসন,যেখানে হওয়ার কথা ছিল সিভিল সমাজের। সিভিল সমাজের গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে অ্যান্থনি গ্রিন্ডলি রাষ্ট্রকে তেপায়া টেবিলের সাথে তুলনা করেছেন যার প্রথম দ্বিতীয় ও তৃতীয় পা যথাক্রমে সরকার, অর্থনীতি ও সিভিল সমাজ।বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সিভিল সমাজের অতটা উন্নতি ঘটেনি, শুধু সমান্তরালে নানা অসিভিল সমাজের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রায় ক্ষেত্রেই দেখা যায় সরকার ও সিভিল সমাজ একই রেখায় মিলিত হয়েছে। জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে সিভিল সমাজের অপারগতা লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সুন্দর ভাবে। . প্রচুর ডাটা ছক থাকায় পড়তে পড়তে মাঝে মাঝেই বিরক্ত এসে যায় কিছুটা। মনে হয়েছিল অ্যাকাডেমিক কোনো কোর্স পড়তেছি।তবে সুক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও প্রাঞ্জলতা সহজেই পাশ কাটিয়ে নেয় এই রিডিং ব্লক।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বরূপ অনুসন্ধানে এই বই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৬টি খণ্ডের ১৫টি অধ্যায়ে বিশদ বর্ণনা দেয়া হয়েছে সংবিধানের মূলনীতি, বিচারব্যবস্থা, আমলাতন্ত্র, নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নিয়ে। লেখকের লেখার ধরণ খুবই চমৎকার, তথ্য উপাত্ত আর বিভিন্ন অর্থনীতিবীদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতামত দিয়ে নিজের ধ্যানধারণাকে খুবই শক্তিশালীভাবে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন সমস্যার বর্ণনার পাশাপাশি কি ধরণের সংস্কার আনা যায় তবে বিদেশী সমাধান তুলে এনে বাংলাদেশে সরাসরি বসিয়ে দিলে যে কাজ করবে না তা এই সাবেক আমলা ভালো করেই জানেন। তাই তিনি সংস্কারের পথে কিভাবে আগানো যায় তাই বলেছেন।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে একটি তথ্যনির্ভর গবেষণা গ্রন্থ ‘অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’। এখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, সিভিল সমাজ ইত্যাদি প্রসঙ্গ নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা হয়েছে। লেখক অবশ্য বইটি লিখেছেন কিছুটা রম্যরচনা, বিতর্ক আর তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক চিন্তাভাবনার সংমিশ্রণে। বইয়ে শুধু বাংলাদেশের চলমান সমস্যাগুলোই আলোচনা করা হয়নি, পাশাপাশি সমস্যার সমাধানে দেয়া হয়েছে নানাবিধ বিকল্প প্রস্তাব। আলোচনা প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্যাবলী। প্রতিটি বিষয়ের আলোচনার শুরুতেই লেখক বিষয়টিকে হালকা চালে উপস্থাপনার জন্য গল্প, কৌতুক বা মজার কোন উপমার অবতারণা করেছেন। তারপর সে বিষয়টির তাত্ত্বিক আলোচনা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ ও প্রায়োগিক সমাধানের পথে হেঁটেছেন। লেখক বাংলাদেশকে একটি রহস্যঘেরা প্রহেলিকাচ্ছন্ন হেঁয়ালি হিসেবে দেখেছেন। কারণ, এখানে প্রাকৃতিক সম্পদের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে সুশাসনের নিশ্চিত অবক্ষয় ঘটেছে। তিনি দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনীতির বাঁকে বাঁকে রয়েছে ব্যাপক বৈপরীত্য ও আপাতবিরোধী সত্য বা প্যারাডক্স। তাইতো, হেঁয়ালির বিচিত্র ছলনাজালে আবদ্ধ হয়ে আছে বাংলাদেশের রাজনীতি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট এই বইয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা এ অঞ্চলে নতুন নয়, সুদীর্ঘকাল ধরেই আমাদের ভূখণ্ডে চলে এসেছে নৈরাজ্য, দলীয়-উপদলীয় কোন্দল, মাৎসান্যায় ইত্যাদি। এছাড়া এই বইয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে রাষ্ট্রের মূলনীতিসমূহ, নির্বাহী ও বিচার বিভাগ বিষয়ক প্রেক্ষাপট, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা, নির্বাচন, সিভিল সমাজের ভূমিকা, সংস্কারের সম্ভাবনা ও সমাধানের উপায়। জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে দেখা যায়, ভারত ��� পাকিস্তানের অস্থিতিশীল জাতীয়তাবাদের তুলনায় বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদ অনেক বেশি টেকসই। অন্যদিকে, সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষতা থাকলেই রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয় না। গণতন্ত্র সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত না হলে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তিনি দেখিয়েছেন, আমাদের প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত প্রতিফলিত হয় না। সুষ্ঠু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লেখক মিশ্র আনুপাতিক নির্বাচন-পদ্ধতি প্রবর্তনের প্রস্তাব করেছেন। তিনি ব্রিটিশ কমন ল’ ভিত্তিক বর্তমান বিচার ব্যবস্থা সংস্কার করে ইউরোপীয় সিভিল ল’ ট্র্যাডিশনের ভিত্তিতে বিচারকদের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার সুপারিশ করেছেন। রাজনৈতিক দলের সংস্কার ও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়েও তিনি বেশকিছু সমাধানমূলক পথ দেখিয়েছেন। লেখক নিজেই বলেছেন, তাঁর এ গ্রন্থ লেখার উদ্দেশ্য হল জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এসব বিষয় নিয়ে গঠনমূলক বিতর্ক শুরু করা। গণবিতর্কের আলোকে এসব বিষয়ের বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং, তাঁর প্রদর্শিত সমাধান নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, যুক্তিনির্ভর বিতর্কের মাধ্যমে সমাধানের সবচেয়ে ভাল পথটি খুঁজার চেষ্টা করা যেতে পারে।