Mashiul Alam was born in northern Bangladesh in 1966. He graduated in journalism from the Peoples’ Friendship University of Russia in Moscow in 1993. He works at Prothom Alo, the leading Bengali daily in Bangladesh. He is the author of a dozen books including Second Night with Tanushree (a novel), Ghora Masud (a novella), Mangsher Karbar (The Meat Market, short stories), and Pakistan (short stories).
গত কয়েকদিনের পত্রিকা সামারাইজ করলেই আশা করি বুঝে ফেলা যাবে আমাদের সমাজটা ঠিক কী রকম আর আমাদের প্রতিদিনের বেঁচে থাকাটা কী পরিমাণ মিরাকল। বইটার গল্পগুলো বেশ ভালো রকমের বিচিত্র। গল্পগুলো মোটামুটি ৯০ এর দশকে লেখা হলেও অনেক কিছুই মিলে যায় এই ২৩ সালে এসেও। কিছু গল্প খুবই ডার্ক... ভাল্লাগসে।
মশিউল আলম পড়েছি, আর মুগ্ধ হইনি এমনটা এখনও পর্যন্ত হয়নি। এ যাবৎ যে কয়টা বই পড়লাম তাতে এই ধারণা স্পষ্ট হলো যে মশিউল আলম গল্প বলেন সহজ-সাবলীল ভাষায়, অনেকটাই নিচু স্বরে। আর এই বর্ণনাভঙ্গির সারল্যতেই বারবার মোহিত করেন তিনি।
'মাংসের কারবার' গল্পগ্রন্থে তিনি তেরোটি গল্প বলেছেন, যেগুলোর প্রতিটিই আলাদাভাবে স্বকীয় হয়ে উঠেছে। সকালে মাংস কিনতে দোকানে গিয়ে জবাই হয়ে যায় আমিনুল ইসলাম। আসিফুর রহমানের বাসায় ঢুকে তিনটি ভূত 'দুপুরে আমাগো এট্টু সেক্স ওঠে' বলে তুলে নিয়ে যায় তার স্ত্রীকে। জনাকীর্ণ বিপণীকেন্দ্রে রেবেকা সুলতানার কোল থেকে শিশুকে আদর করার ছলে কোলে নেয় এক অচেনা আঙ্কেল, তারপর বলে বাচ্চাকে ফিরে পেতে হলে ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। অথবা, দরিদ্র কিষানী জুলেখার বুকে দুধ নেই বলে তার ছেলে কুকুরের দুধ খায়!
বেশিরভাগ গল্প ছিল সমাজের অপরাধ আর মানুষের পশুত্ব নিয়ে। মাংস কিনতে গিয়ে নিজেই জবাই হওয়া কসাইদের হাতে, ঘরে ডুকে ধর্ষণ করে যাওয়া, বাচ্চা কিডন্যাপ করে নিয়ে যাওয়া, মুক্তিযোদ্ধার সম্মান না পাওয়া, এমন অনেক নিরাপত্তাহীনতা আর ক্রাইম নিয়ে অনেকগুলো গল্প স্থান পেয়েছে। এতো ভায়োলেন্স অনেকসময় মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এমন গল্পের সাথে পাঠক খুব রিলেট করতে পারবে, কারণ এগুলো সবসময় ঘটছে আমাদের আশেপাশে।
তবে কিছু গল্প ছিল সামাজিক। আর বিষয়ের দিক দিয়ে সামাজিক বা সাধারণ হলেও গল্পগুলোর লেখা ছিল অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। যেমন - দুধ, আলেমানুষের হাত, স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্নের অর্থ খোঁজা, মোমেনার গল্প, এই গল্পগুলোতে বিষয়ের দিক দিয়ে সাধারণ মনে হলেও পরাবাস্তব বা জাদুবাস্তবতার অনুভূতি পাওয়া যাবে।
একটা কথা অবশ্যই বলতে হবে - দুধ গল্পটি আমার আরেকটা প্রিয় গল্প হয়ে থাকলো। বিদেশে অনেক সুনাম অর্জন করেছে, পুরষ্কৃত হয়েছে এই গল্পটা! আসলেই এমন সুনাম ডিজার্ভ করে গল্পটা। আমি অনেককে পড়িয়েছি দুধ গল্পটা (পুরো বই না পড়লেও এই গল্পটা পড়বেন। গুগল করলেই এই গল্পটা পেয়ে যাবেন)
আর সহজ সাবলীল ঝরঝরে লেখা দিয়ে গল্পে পরিবেশ সৃষ্টি করা, আবহ সৃষ্টি করাতে ছিলো মশিউল আলমের মুন্সীয়ানা। সবমিলিয়ে খুব ভাল লাগলো এই গল্পসংকলন
বইটার গল্পগুলো আমার কাছে মোটামুটি ভালো লেগেছে। বেশ কয়েকটা ভালো লাগা গল্পের মধ্যে আছে - "দুধ", " অনুগমন", "মোমেনার গল্প", " স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্নের অর্থ খোঁজা"। তবে সবচেয়ে ভালো লেগেছে যেকোন দৃশ্যের একদম বাস্তব বর্ণনা, যাকে বলে ঠিক যেন চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি এমন - সে গ্রামেরই গল্প হোক বা শহরের। গ্রামের গল্পে আবার আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার - এটাও চমৎকার মানিয়েছে।
অন্য বই তো এখনও পড়িনি এই লেখকের, তবে এই বইতে পরিমিতিবোধের একটা অভাব মনে হল। ডার্ক থিমের লেখা পড়ার অভ্যাস কম বেশি আছে, কিন্তু "মারে ফেললাম, কাটে ফেললাম, এরপর রাইন্ধা খায়ে ফেললাম" এরকম উদ্ভট জিনিসপত্র লিখলেই আসলে সেটা ভালো লাগে না বা যে disastrous vibe টা দিতে চাইছে সেটা আসে না -"Truth is stranger than fiction" - বলেও তখন পার পাওয়া যায় না। আমি জানি ভালো লাগার উদ্দেশ্যেও এই বই লেখা নয়, ওই বিবমিষার অনুভূতিটা তৈরী করার জন্যই গল্প গুলো এভাবে লেখা। কিছু গল্পে সেটা সফল হয়েছেও। কিন্তু বেশ কয়েকটা গল্পে খানিকটা রাশটানা যেত মনে হয়। কারন Truth, truth ই, আর fiction, fiction ই। সত্য মানুষকে গিলিয়ে দেয়া লাগে না, মানুষ পরিস্থিতির শিকার হয়ে বা চোখে দেখে, কানে শুনে সত্যের সামনাসামনি হলে সেটা গ্রহণ করনে কি করবে না সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু ফিকশনের পরিমিতিগুন না থাকলে ওটা একেবারে বদহজম হয়ে যায়।
প্রচারবিমুখ লেখকদের তালিকা করলে মশিউল আলমের নাম প্রথম সারিতেই থাকবে। তাঁর লেখা নিয়ে আলোচনা তেমন একটা দেখা যায়না। বছর দুয়েক আগে প্রিসিলা বইটার মাধ্যমে উনার বইয়ের সাথে পরিচয়। 'আবেদালির মৃত্যুর পর' গল্পগ্রন্থ পড়েও মুগ্ধ হয়েছিলাম। সেই তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি বই 'মাংসের কারবার'।
'মাংসের কারবার' একটি গল্পগ্রন্থ। এখানে ১৩ টি গল্প স্থান পেয়েছে। বিষয়বস্তু বিচারে গল্পগুলো একই ধাঁচের তবে ভিন্ন স্বাদের। পড়ার পর কিছু গল্প উদ্ভট মনে হতে পারে তবে একটু গভীরভাবে ভাবলেই বোঝা যায় গূঢ়ার্থ। গল্পগুলোর রচনাকাল বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ হতে একবিংশ শতাব্দীর শুরু; এই মাঝামাঝি সময়ে।
'দুধ' গল্পে সলিমুদ্দির বউ জুলেখার বাচ্চা হয়েছে। কিন্তু মাস দুয়েক যেতে না যেতেই তার বুকের দুধ শুকিয়ে গেল। এখন বাচ্চাকে খাওয়াবে কী? এদিকে একটি কুকুরও বাচ্চা প্রসব করেছে কিন্তু পুরুষ কুকুর সেই বাচ্চাগুলোকে মেরে ফেলে। মাদি কুকুরের স্তন হতে দুধ ফেটে বের হওয়ার দশা। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দেয় জুলেখার ছেলে। কুকুরের দুধ খেয়েই দিন কাটে অবুঝ শিশুটির। কতদিন যাবে এইভাবে?
উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষার সংলাপে লেখা গল্প 'আলোমানুষের হাত'। খয়বর আলির ১০ বছরের ছেলে খবির একদিন খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে পানিতে প্রস্রাব করছিল। তখন তাকে ভৎসর্না করে সাদা পাঞ্জাবি পরা ফেরেশতার মতো দেখতে এক লোক। সেই লোক পঞ্চাশ টাকার একটি নোট দেয় তাকে কিছু কিনে খেতে। কিন্তু খয়বর আলি সেই টাকা জুয়া খেলতে নিয়ে যায়। দুঃখে খবির ভাবতে থাকে তার বাবা দুনিয়ার সবচেয়ে খারাপ বাবা!
আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে 'অনুগমন' গল্পটি। এই গল্পের প্রধান চরিত্র জয়নাল। বাবা-মা নেই। চাচা-চাচির ঘরে মানুষ। চাচার জমি না থাকায় মানুষের বাড়িতে রোজ কিংবা বছর চুক্তিতে কাজ করে নিজের পেট চালায়। হঠাৎ একদিন কোত্থেকে যেন জয়নাল বিয়ে করে আনে পরীর মতো সুন্দরী একটি মেয়েকে। সবাই ত অবাক হয়ে যায়, জয়নালের মতো ছেলের কাছে এত সুন্দর মেয়েকে কে বিয়ে দিল! সুখ-শান্তিতেই সংসার করতে থাকে তারা। খরার মৌসুম আসায় জমিতে কাজ ছিল না, তাই যে বাড়িতে কাজ করতো, সেই গৃহস্থ তাকে কাজ থেকে অব্যহতি দেয়। এদিকে সংসারে নতুন মানুষ। কষ্টেসৃষ্টে সংসার চলে কোনোরকম। একদিন জয়নালের বউয়ের জ্বর আসে এবং জ্বরের মধ্যে বউ ট্যাংরা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে চায়। তখনই জয়নাল যায় মাছের ব্যবস্থা করতে। জয়নাল কি পারবে বউয়ের এই ছোট আশা পূরণ করতে?
'মাংসের কারবার' গল্পটি উত্তম পুরুষে লেখা। কথক আমিনুল ইসলাম বউয়ের চিল্লাচিল্লিতে মাংস কিনতে বাজারে যায়। বাজারে গিয়ে কসাইয়ের সাথে তর্কাতর্কির জেরে নিজেই জবাই হয়ে যায়। তারপর কী হয়?
বিলয়, কলিমুদ্দির মৃত্যু, মোমেনার গল্পও ভালো লেগেছে। আসলে বইটির সবগুলো গল্পই সুন্দর। কিছু গল্পের ঘটনাস্থল উত্তরাঞ্চল আবার কিছু গল্প আমাদের রাজধানী ঢাকায় চিত্রায়িত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে সামাজিক নৈরাজ্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার দূর্বিষহ দিকটি ফুট��য়ে তুলেছেন লেখক। কিছু গল্পকে যেন লেখক ইচ্ছা করেই পাঠকের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন; যাতে করে পাঠক নিজ মস্তিষ্ক খাটিয়ে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পারে। সার্থক কিছু ছোটগল্পের ভুবনে আপনাকে স্বাগতম। হ্যাপি রিডিং।
আমিনুল ইসলাম দশ কেজি খাঁটি খাসির মাংস কিনতে যেয়ে নিজেই জবাই হয়ে যান আর তার পরিবর্তে তার শালা যে মাংস কিনে আনে তা তার বউ রান্না করে ভাইয়ের সঙ্গে খেতে বসে আর সে গোশ্ত বেশ উপভোগ করে। স্বামী ঘরে ফেরেনি তা নিয়ে তার তেমন চিন্তা নেই কিন্তু স্বামীর মাংসমিশ্রিত 'খাসি' খেয়ে তার বেশ তৃপ্তি হয়। এখন থেকে এমন মাংস খাবে বলেই সে যেন পণ করে।
এই বিভৎস অংশ 'মাংসের কারবার' ছোটগল্পের অংশবিশেষ। এখানে আমাদের সমাজের একটা ক্যানিবলিস্টিক চিত্র ফুটে উঠেছে। দ্বিমত করার কী কোন উপায় আছে?
মশিউল আলমের এই ছোটগল্প সংকলনে দশোধিক গল্প আছে, প্রতিটাই নিজ মহীমায় গুণান্বীত। এখানে তিনি কঠোর বাস্তব, অতি বাস্তব এমনকি পরাবাস্তবতারও আশ্রয় নিয়েছেন নিজের কথা তুলে ধরতে।
তিনি 'দুধ', 'বিলয়' বা 'স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্নের খোঁজ' গল্পগুলোতে পরাবাস্ততার মাঝে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন, 'আমাদের শহরে এক ভারতীয়র নাগরিক' গল্পে তিনি দেশভাগের বেদনাকে এক পরাবাস্তব রূপ দিয়েছেন। তার বামপন্থী চিন্তা এক্ষেত্রে প্রকট। প্রেম ও কামনা, যৌনলিপ্সা, মাতৃত্বের হাহাকার- বাস্তবকে চমৎকারভাবে টেনে এনেছেন তাঁর 'অনুগমন' ও 'মোমেনার গল্প'-এ। সমাজের দুর্বত্তায়ন ফুটে উঠেছে তার 'এক সন্ধ্যা' আর 'দিনটা কেমন গেল' গল্পে। শেষোক্ত গল্প দু'টিতে তিনি অতি বাস্তবতার আশ্রয় নিয়েছেন খুব সফলতার সাথে। 'কলিমুদ্দির মৃত্যু' মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রাজ্যের আধিখ্যেতার উপখ্যান তুলে ধরেছেন খুবই বাস্তবতার নিরিখে। 'চেতনা' ব্যবসায়ের পাছায় একটা গদাং লাথি মেরেছেন বই কি!
বাংলা সাহিত্যে এমন একখানা ছোটগল্প সংকলন বিরল। মন্ত্রমুগ্ধের মতো প'ড়েছি গল্পগুলো। যারা বাংলা সাহিত্য বলতে রবীন্দ্র, সুনীল, হুমায়ুন বা শীর্ষেন্দুর (তাঁদের সব না) ইত্যাদি লেখকের রীতিমত ন্যাঁকা ন্যাঁকা উপন্যাসের বাইরে চিন্তা করতে পারেন না, তাদের আমি মশিউল আলমের গ্রহে আনতে চাই। সংগে শাহীন আখতার, মাহমুদুল হক, হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, মনজুরুল ইসলাম, মইনুল সাবের প্রমুখ এবং সর্বোপরি শহীদুল জহিরের দিকে- মশিউলের উপর শহিদুল জহীরের প্রভাব স্পষ্ট।
“কথা ছিলো ’আমাদের ধর্ম হবে ফসলের সুষম বন্টন’, আমাদের তীর্থ হবে শস্যপূর্ণ ফসলের মাঠ। অথচ পান্ডুর নগরের অপচ্ছায়া ক্রমশ বাড়ায় বাহু অমলিন সবুজের দিকে, তরুদের সংসারের দিকে। জলোচ্ছাসে ভেসে যায় আমাদের ধর্ম আর তীর্থভূমি, আমাদের বেঁচে থাকা, ক্লান্তিকর আমাদের দৈনন্দিন দিন।” -- রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ
প্রতিদিনের শঙ্কা, উৎকন্ঠা, অরাজকতা, অবিচার, শোষণ, ধর্ষণ, জোর, অন্যায় দেখতে দেখতে শব্দগুলো উঠে এসেছে অভিধানের মূল পাতায়। সুখ, প্রশান্তি, নিরাপত্তা শব্দগুলোর ঘটছে বিলুপ্তি। চলছে গাড়ি সিসিমপুরে। দেখছি হাওয়া, খাচ্ছি বাতাস। আমি মাঝেমধ্যেই বলি, আমাদের সমাজে স্বাভাবিক বেঁচে থাকাটা একটা মিরাকল। এখানে সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যু ডালভাত। মা-মেয়ে-বোন-বউ তথাপি নারী, যাদের দেখলে শুধুমাত্র দুপুরবেলা একটু সেক্স উঠে, একটু ধর্ষণ/মলেস্ট হয়েই যায় কোনো এক ভিনগ্রহী দোহাই দিয়ে তারা। শিক্ষায় মরবেন, প্রতিবাদ করলে মরবেন, রাজনীতি করলে মরবেন। ছিনতাই হবেন, চুরি যাবে। দস্যুরা কল্লা ফেলে দেবে... সবচাইতে বড় সন্ত্রাস নাকি পুলিশ! এসব শুনতে শুনতে কান পচে গেছে, না? বাদ্দেই তাহলে...
মশিউল আলমকে মাঝেমধ্যে একজন কঠোর পিতার মতো মনে হয়। এই যেন ঠাস করে গালে চড় বসিয়ে দেবেন রূঢ় সত্যটি বলে দিয়ে। কঠোর পিতার মেটাফোরটা আসলে ঠিক হলো কিনা কে জানে। শুনেছি ডাক্তাররা মৃত মানুষ দেখতে দেখতে অনূভুতি হারিয়ে ফেলেন। লেখক পেশায় একজন সাংবাদিক। প্রতিদিনের অরাজকতা লিখতে লিখতে লেখকও বোধহয় ফ্যাব্রিকেট করতে ভুলে গেছেন। ১৯৮০-৯০ এর দশকে লেখা গল্পগুলো এখনো সত্য। কি আশ্চর্য এই দেশের মানুষের নিয়তি। ক্ষমতা বদলায়, আবহাওয়া বদলায়, মানুষ বদলায়। বদলায়না অমানবিকতা। প্রতিটি গল্পেই ভিন্নতা আছে। এতো স্পষ্ট, এত প্রগাঢ় অনূভুতি দিয়ে লেখেন লেখক, দম বন্ধ হয়ে আসে। ভায়োলেন্স আছে বেশ কিছু গল্পে। সতর্কীকরণ। লেখক মশিউল আলমকে প্রচারবিমুখ প্রচারবিমুখ বলতে বলতে সব বিমুখও প্রচার হয়ে গেছে। ভালো একজন লেখক কেনো লাইমলাইটে আসছেন না, সেসব কথাও থাক! এটাও বাদ্দেই!! তারচেয়ে বরং ওনার একটা লাইন উদ্ধৃত করে শেষ করি...
“বানানো গল্পই নাকি 'উত্তম শিল্প'- সমালোচকেরা বলল। তারা বলে আর্ট কথাটার মানে কৃত্রিম, আগাগোড়াই বাস্তব হলে শিল্প হয়না।... একটা সামান্য খবরের গায়ে রঙ চড়িয়ে আমি এমন গল্প লিখি যে সমালোচকরা হাততালি দিয়ে বলে ওঠে, বাহঃ এই তো ম্যাজিক রিয়ালিজম!...”
'মাংসের কারবার' বইয়ে মোট তেরোটি গল্প আছে৷ প্রতিটা গল্পই আলাদা নিজস্ব ভঙ্গিতে গুণান্বিত৷ লেখক অধিকাংশ গল্পেই পরাবাস্তবতা/ অতি বাস্তবতা / জাদুবাস্তবতার ছায়াতলে চরিত্রদের মাধ্যেম যে নিমজ্জিত বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরেছেন— 'বিষ', 'এক সন্ধ্যা', 'দিনটা কেমন গেল' অনেকাংশেই বর্তমান দেশের বাস্তবতার উজ্জ্বল প্রতিবিম্ব৷ 'দুধ', 'মোমেনার গল্প' দেখতে পাই মাতৃত্বের চাপা শব্দহীন বিবর্ণ আর্তনাদ৷ ' আমাদের শহরে এক ভারতীয় নাগরিক ' দেশভাগের যন্ত্রণায় নিঃসঙ্গ শেরপার তৃষ্ণার্ত বেদনার আত্নহুতি৷ 'অনুগমন' গল্পটি সরল নিখাদ ভালোবাসার অপূর্ব সংজ্ঞা৷ আর শেষের 'মাংসের কারবার', 'বিভীষিকার ভগ্নাংশ' দুইটি গল্প বীভৎস anthropophagus কাঠামোর উৎকৃষ্ট উদাহরণ৷ _ 'মাংসের কারবার' গল্পের শেষ অংশবিশেষঃ ''আমার শ্যালক দশ কেজি খাসির মাংস কিনে বাসায় ফিরে এসেছে৷ এর মধ্য আমার নিজের দেহের উরু, বাহু এবং পাঁজরের মাংস রয়েছে, চর্বি রয়েছে, এবং বুকের ও পাজরের কিছু নরম হাড়ও রয়েছে৷ বোন বেশ যত্ন করে অনেক মশলাপাতিসহযোগে মাংস রান্না করে দুপুরবেলা একসাথে খেতে বসে৷ আমার স্ত্রী আমার বুকের একটা হাড়ে কামড় বসিয়ে তৃপ্তিভরে ভাইয়ের প্রশংসা করে, 'দারুণ মাংস এনেছিস রুবেল৷ এখন থেকে মাংসটা তুইই কিনতে যাস ভাই৷ তোর দুলাভাই কোনো কাজের ই না.. '' (সংক্ষেপে, আমিনুল সাহেব সকালে খাসির মাংস কিনতে যেতে বিরোধিতার এক পর্যায়ে কসাই কর্তৃক জবাই হয়ে যান৷ তারপর ভদ্রলোকের মাংস কেটে খাসির আর ভেড়ার সাথে ভেজাল করে বিক্রি করা হয়৷ সেখান থেকেই তার শ্যালক দশ কেজি মাংস নিয়ে বাসায় আসে!) _ গল্পগুলোতে ম্যাজিশিয়ান 'শহীদুল জহিরীয় নীতি'র ছাপ স্পষ্টতই লক্ষণীয়৷ ব্যাক্তিগতভাবে এই ধারার লেখা আমার খুব পছন্দ৷ যাবতীয় মসলা পরিমাণমত দিয়ে পরিবেশিত অতি সুস্বাদু এই 'মাংসের কারবার' পড়ে পাঠক তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলবেন এইটা নিশ্চিত বলা যায়৷ অবশ্যপাঠ্য৷ _
মোট তেরোটা গল্প; ওভার অল ভালোই লাগছে। দুধ, মোমেনার গল্প সবচেয়ে বেশি ভাল্লাগছে। আলো মানুষের হাত, স্বপ্নের ভেতর স্বপ্নের অর্থ খোঁজা, অনুগমন, বিষ এগুলিও ভালো লাগছে। কয়েকটা মনেহইছে গল্প সংকলনের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য লেখা। আর শেষ গল্প 'বিভীষিকার ভগ্নাংশ ' একেবারেই ভালো লাগে নাই। হুটহাট মাইরা ফেলল, কাইটাকুইটা রান্না কইরা খায়া ফেলল, মানে এসবের উদ্দেশ্য কী? আমার কাছে মনেহইছে এই গল্পের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শেষ দিকে ওই লাইনটা লেখা- ইলেকশনের আগে সবার উচিৎ হইবে সরকারি দলে যোগদান করা।
ইংরেজিতে খুব সুন্দর একটা প্রবাদ আছে–"The wearer knows where the shoe pinches" আমরা ঠিক অন্যের দুঃখ-কষ্ট বা পরিস্থিতি বুঝতে চাইনা যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা ওই একই পরিস্থিতির শিকার হই! দুর্ঘটনা ঘটলে আমার সামনের বা পেছনের মানুষটির ঘটবে, আমার কিছু হবেনা–এই মনোবল নিয়ে আমরা দিব্যি বেঁচে আছি। মানুষ হয়ে জন্মেছি কিন্তু দিনে দিনে এই 'মানুষ' তকমাটা আমাদের সাথে বড্ড বেমানান হয়ে যাচ্ছে। মশিউল আলমের 'মাংসের কারবার' বইয়ের 'বিষ', 'এক সন্ধ্যা ২০০১', 'মাংসের কারবার' শিরোনামের গল্পগুলো বারবার আমাকে যেন এই কথাগুলোই মনে করিয়ে দিচ্ছিলো!
'মাংসের কারবার' বইয়ে মোট তেরোটা গল্প আছে। প্রত্যেকটা গল্পেরই নিজস্বতা বেশ লক্ষনীয়! বিষয়বস্তু আর এন্ডিং প্রায় একই হওয়া সত্ত্বেও গল্পগুলো কিন্তু সব ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের। এ গল্প আপনার আমার শোনা গল্প, এ গল্প প্রতিনিয়ত আমাদের আশেপাশে বা আমাদের সাথে ঘটছে। একদম বাস্তবিক! তবে এত কঠিন আর রূঢ় বাস্তবতা এত সহজে গলাধঃকরণ করতে পেরেছি ব'লে লেখকের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবো। এত সহজ সাবলীল ভাষায় লেখক গল্প লেখেন! সত্যিই মশিউল আলমের লেখায় মুগ্ধতা ছড়ানো! 'মাংসের কারবার' ও 'বিভীষিকার ভগ্নাংশ' এ দু'টি গল্প ক্যানিবালিজমের চরম নিদর্শন। 'বিলয়', 'দিনটা কেমন গেল', 'আলো মানুষের হাত', 'স্বপ্নের ভিতরে স্বপ্নের অর্থ খোঁজা' এ গল্পগুলোয় অবাস্তব, পরাবাস্তবতা, ম্যাজিক্যাল রিয়েলিজম এর ব্যাপ্তি আছে। ছোটগল্প ভালোলাগলে অবশ্যই পড়বেন।
একবার মাঘ মাসে খুব বন্যা হয়েছিল - জনশ্রুতি সলিমুদ্দির বউ জুলেখা বাচ্চা জন্ম দেয়ার পরপরই তার বুকের দুধ শুকিয়ে গেল। এদিকে সবার অলক্ষে বাচ্চা বড় হচ্ছে কুকুরের দুধ খেয়ে। একদিন তাই দেখে সলিমুদ্দি কোদাল দিয়ে কুকুরটির মাথা চৌচিড় করে দিল । তারপর এক রাতে গাঁয়ের মানুষ ঢলের শব্দে জেগে উঠে দেখতে পায় দুধের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে চরাচর।
মধুপুরের দরিদ্র কামলা জয়নাল ভীষণ বউ পাগলা । সারা গাঁয়ে এ নিয়ে হাসি ঠাট্টা। তা ঘরে সুন্দরী বউ পেলে মানুষ বউ পাগলা না হয়ে যাবে কই শুনি? একদিন ট্যাংরা মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেতে চাইল জ্বরে কাতরাতে থাকা বউ। এরপর?
মাংসের কারবার একটি ছোটগল্প সংকলন। গল্পগুলো যেমন উদ্ভট তেমনি বিচিত্র এবং অতিবাস্তব। সহজ, সাবলীল লেখনীর এই গল্পগুলো পড়ার সময় কেমন যেন এক ঘোরলাগা ভাবে মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। আর পড়া শেষে মনে হয় এমন উদ্ভট গল্প ও কি সম্ভব? কথায় আছে, বাস্তবতা কল্পনার চেয়েও শক্তিশালী। মশিউল আলমের গল্পগুলো পড়ার সময় উদ্ভট লাগলেও ৯০ দশকে রচিত এই গল্পগুলোর প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে তখন গল্পগুলোর মূল ভাব যেন আমাদের সমাজে ঘটতে থাকা সকল অন্যায়,পাপাচারের এক দর্পণ হিসেবে কাজ করে। তাই তো মাংস কিনতে গিয়ে জবাই হয়ে যাওয়া কিংবা দুপুরে একটু সেক্স উঠে বলে ঘর থেকে স্ত্রীকে তুলে নিয়ে যাবার গল্প পড়ে তখন আর তেমন উদ্ভট মনে হয় না ।
১৩ টা গল্পের মধ্যে 'আলোমানুষের হাতে’, ’দিনটি কেমন গেল’, ’মোমেনার গল্প’ - এই ৩ টা গল্প ভালো লেগেছে। বইটার মূল সমস্যা গল্পগুলোর এন্ডিং। বেশিরভাগই মৃত্যু দিয়ে শেষ হয়েছে। বইটার একটা স্ট্রং মেসেজ আছে। কারো উপর নির্যাতন হলে আমরা ধরে নেই যে এই বিপদটা আমাদের উপর আসবে না। এভাবে আমরা একসময় নির্যাতনগুলো স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেই।
I never anticipated such a versatile writing to experience while picking up the book. Despite it managed to fill in the craving for a joyful writing at the end.